ফ্যাসীবাদের বিরুদ্ধে ব্রেশ্‌ট-এর সংগ্রাম

সত্য বন্দ্যোপাধ্যায়

 

পিএলটি-খ্যাত মঞ্চাভিনেতা সত্য বন্দ্যোপাধ্যায়-লিখিত 'ব্রেশ্‌ট ও তাঁর থিয়েটার' বই থেকে নিচের অংশটুকু তুলে দেওয়া গেল। বলাই বাহুল্য, এই লেখা পুনরুদ্ধারের মূল উদ্দেশ্য ব্রেশটের ১২৫তম জন্মজয়ন্তী যাপন, এবং এই সময়ে, সারা দেশের শরীরে ফ্যাসিবাদ যখন ক্যান্সারের মত, ছোঁয়াচে চর্মরোগের মত ছড়িয়ে পড়ছে, তখন আমাদের পাঠকদের এই লেখা পড়তে নতুন করে উদ্বুদ্ধ করা।

 

ব্রেশ্‌ট-এর জীবনে ১৯৩৩ সালের ৩০শে জানুয়ারীর মত বিপর্যয় আর কখনো ঘটেনি। ফ্যাসিস্ত স্বৈরাচারী শাসকশ্রেণী যখন বিপ্লবী শ্রমিকশ্রেণীর বিরুদ্ধে তার সমস্ত পশুশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে তখন ব্রেশ্‌ট শ্রমিকশ্রেণী ও তার পার্টীর সহযোদ্ধা ও সংগ্রামের অংশীদার।

রাজনৈতিক মঞ্চে হিটলারের প্রবেশ—১৯৩২ সালের শেষ কয়েক মাসে জর্মন একচেটিয়া পুঁজির চরম ও গুরুত্বপূর্ণ সংকটের প্রতিষেধক হিসেবে। এই চেহারা সবচেয়ে প্রকট হয়ে ওঠে ১৯৩২ সালের নভেম্বর মাসে প্রেসিডেণ্ট হিণ্ডেনবুর্গকে লেখা জর্মন পুঁজিপতিদের এক চিঠিতে:

ক্রমবর্ধমান জাতীয় আন্দোলনের চেহারা দেখে আমরা অনুভব করছি যে শ্রেণীসংগ্রামের দ্বারাই জর্মন অর্থনীতিকে পুনরায় উজ্জীবিত করা যাবে। আমরা জানি এই সংগ্রাম অনেক বড় স্বার্থত্যাগ দাবী করছে। এই জাতীয় আন্দোলনের সবচেয়ে বড় শরিক যদি শাসকশ্রেণীর সংগে হাত মিলিয়ে কাজ করে তাহলে এই আন্দোলনের সাফল্য অবশ্যম্ভাবী।

—ডকুমেণ্টেশন ডেঅর ৎসাইট— বার্লিন ১৯৫৩

এই চিঠি থেকেই স্পষ্ট হয় কোন্‌ শক্তির সাহায্যে হিটলার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। এ থেকেই ফ্যাসীবাদের শ্রেণীচরিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে— যা, “একচেটিয়া পুঁজির সাম্রাজ্যবাদী ঝোঁক— চরম প্রতিক্রিয়াশীল সন্ত্রাসবাদী একনায়কত্ব হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।” অনেকেই হিটলারের নানা প্রতিশ্রুতির দ্বারা বিভ্রান্ত হয়ে ফ্যাসীবাদের শ্রেণীচরিত্র সম্বন্ধে ভ্রান্ত ধারণা পোষণ করেন এবং হিটলারের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পথ প্রশস্ত করেন। সোশ্যাল ডেমোক্রাটিক পার্টীর নেতারা হিটলারের এই সব উগ্র কথাবার্তায় আপত্তিজনক কিছুই দেখেন নি, পরিবর্তে তাঁরা তৎকালীন রাজনৈতিক অবস্থার বিশ্লেষণ অনুযায়ী জনগণকে ফ্যাসিস্তদের সংগে ঐক্যবদ্ধ হবার ডাক দেন। অটো বাউয়ের যখন ফ্যাসীবাদের চরিত্র বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বলেন—

ফ্যাসীবাদ হোলো নিছক একটি শাসনব্যবস্থার নামান্তর যা বুর্জোয়া ও প্রোলেতারিয়েত উভয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

—তখন স্পষ্টই বোঝা যায় তিনি বা তাঁরা ফ্যাসীবাদী উগ্র বক্তৃতার শিকার হয়েছেন। ব্রিটিশ সোশ্যালিস্ট ব্রেলস্‌ফোর্ড যখন বলেন—

ফ্যাসীবাদ হোলো বিপ্লবী পেটিবুর্জোয়া কর্তৃক শাসকশ্রেণীর হাত থেকে ক্ষমতা দখলের আর এক নাম।

—তখন বোঝা যায় শ্রমিকশ্রেণীর চোখ থেকে তাদের প্রকৃত শত্রুকে আড়াল করা হচ্ছে। সোশ্যালিস্ট পার্টীর দক্ষিণপন্থী নেতৃত্ব শ্রমিকশ্রেণীকে হিটলারের ক্রমবর্ধমান বর্বরতার বিরুদ্ধে সংগঠিত করেন নি। ঐক্যবদ্ধ ফ্রণ্ট গঠন করে এই পশুশক্তির বিরুদ্ধে মোকাবিলা করার যে প্রস্তাব বারংবার কমিউনিস্ট পার্টীর পক্ষ থেকে দেওয়া হয় তা তাঁরা প্রত্যাখ্যান করেন এবং বুর্জোয়াদের সংগে হাত মিলিয়ে সানন্দে কাজ করতে থাকেন। দক্ষিণপন্থী সোশ্যালিস্টদের এই রাজনীতি ঐক্যবদ্ধ ফ্রণ্ট গড়ে তোলার ব্যাপারে বাদ সাধে এবং হিটলারের ক্ষমতা দখলের পথ সুনিশ্চিত করে তোলে। কমিউনিস্ট পার্টী হিটলার ক্ষমতা দখলের সংগে সংগে ফ্যাসীবাদী বর্বরতার বিরুদ্ধে সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দেন এবং বলেন:

ফ্যাসীবাদী একনায়কত্বের বর্বরতম প্রতিভূ নয়া ক্যাবিনেট খোলাখুলিভাবে জর্মন শ্রমিকশ্রেণী ও জর্মন জনগণের ওপর যুদ্ধের বিপজ্জনক অবস্থা চাপিয়ে দিচ্ছে।”

—ৎসুর গেশিশ্‌টে ডেঅর কমিউনিস্‌টিশে পারটাই, ডয়েট্‌শ্‌ লান্‌ড পৃঃ ৩৫৩

এই চরম বিপজ্জনক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সোশ্যালিস্ট পার্টী ট্রেড ইউনিয়ন ও অন্যান্য ফ্রণ্টে সমস্ত ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের প্রস্তাব নাকচ করে বলেন যে হিটলার আইনসম্মতভাবে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছেন। কিন্তু উল্লেখযোগ্য হোলো, হিটলার শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েই জরুরী অবস্থা ঘোষণা করে এক বিজ্ঞপ্তি মারফত শাসনব্যবস্থা সম্বন্ধে সমস্ত সমালোচনা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। শ্রমিকশ্রেণী এই সংকট মুহূর্তে শতধাবিভক্ত হওয়া সত্ত্বেও ফ্যাসীবাদী শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে সংগ্রাম অব্যাহত রাখেন। সমগ্র জর্মনী জুড়ে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ ধ্বনিত হয় এবং গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলিতে ব্যাপকভাবে সাধারণ ধর্মঘট পালিত হয়। দক্ষিণপন্থী সোশ্যাল ডেমোক্রাটিক নেতৃত্ব নীরব দর্শকের ভূমিকাই পালন করতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত ফ্যাসিস্তরা রাইখস্ট্যাগে অগ্নিকাণ্ড ঘটিয়ে সমস্ত শ্রমিক সংগঠনের ওপর ব্যাপক অত্যাচার ও নির্যাতন শুরু করেন এবং হাজার হাজার কমিউনিস্ট ও সোশ্যাল ডেমোক্রাটিক কর্মীদের গ্রেপ্তার করেন। ১৯৩৩ সালের ২৭শে ফেব্রুয়ারী পুলিশ, এস. এস. ও ঝটিকা বাহিনী শ্রমিক সংগঠন ও ফ্যাসীবিরোধী মানুষের ওপর একসংগে পাশবিক অত্যাচার শুরু করেন।

এই নির্যাতন ও বর্বরতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে একমাত্র কমিউনিস্ট পার্টীই হিটলারের ফ্যাসীবাদী আক্রমণের মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল জর্মনীতে ফ্যাসিস্ত শাসনব্যবস্থাকে বিধ্বস্ত করে গণতান্ত্রিক চিন্তাধারার পুনঃপ্রবর্তন ও যুদ্ধের আকাঙ্ক্ষাকে চিরতরে নির্মূল করা। ১৯৩৫ সালে ব্রাসেল্‌স্‌ পার্টী সম্মেলন সমস্ত হিটলার বিরোধী শক্তির এক ঐক্যবদ্ধ ফ্রণ্ট গড়ে ফ্যাসীবাদকে চিরতরে কবর দিতে উদ্যোগী হন। ব্রাসেল্‌স্‌ সম্মেলনের এই প্রস্তাব জর্মনীতে এবং বিদেশে ফ্যাসীবাদ বিরোধী সংগ্রামের এক নতুন ধাপ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।

ব্রেশ্‌ট ফেব্রুয়ারী ১৯৩৩-এর এই উত্তাল রাজনৈতিক অবস্থায় অসুস্থতাবশতঃ ডাঃ মায়ারের ক্লিনিকে অপারেশনের জন্য ভর্তি হয়েছিলেন। ঠিক একই সময়ে ভিয়েনাতে ‘ডী মাসনাহমে’ নাটকের উদ্বোধন রজনী অনুষ্ঠিত হতে চলেছিল। ২৭শে ফেব্রুয়ারী ভিয়েনা থেকে তাঁর বন্ধু বিখ্যাত সংগীতকার হান্‌স আয়েস্‌লার টেলিফোনে তাঁকে নাটকের ব্যাপক সাফল্যের সংবাদ জানান। ঐদিন রাত্রেই রাইখস্ট্যাগে অগ্নিকাণ্ড ঘটে এবং সংগে সংগে ব্রেশ্‌ট আত্মগোপন করতে বাধ্য হন এবং কয়েকদিনের মধ্যেই জর্মনী ছেড়ে পালান। পুলিশ তাঁর হার্ডেন বের্গারস্ট্রাসে-র বাড়ীতে হামলা করে এবং মাত্র কয়েকদিন আগে প্রকাশিত ‘ডী মুট্টার’ নাটকটি বাজেয়াপ্ত করে। রাতারাতি তিনি উদ্বাস্তু হয়ে হাজার হাজার শ্রমিক যেখানে ফ্যাসিস্তদের হামলা থেকে রক্ষা পাবার জন্য আত্মগোপন করেন তাঁদের সংগে সেখানে আশ্রয় নেন। অন্যান্য সাহিত্যিকদের মত জর্মনীর বাইরে ঘোরার অভিজ্ঞতা তাঁর খুবই কম ছিল। এখন তিনি উদ্বাস্তু হিসেবে দেশ থেকে দেশে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন।

প্রাগ ও ভিয়েনা হয়ে তিনি প্রথম পৌঁছলেন সুইট্‌জারল্যাণ্ডে এবং সেখান থেকে ফ্রান্সে। ফ্রান্সে থাকাকালীন তিনি বিখ্যাত লেখিকা কারিন মিকেলিস্‌-এর কাছ থেকে ডেনমার্কে থাকার আমন্ত্রণ পান। কারিন মিকেলিস্‌ একজন বুর্জোয়া লেখিকা যিনি ফ্যাসীবাদী অত্যাচারে দেশ ছেড়ে পলাতক অনেককে নানাভাবে সাহায্য করেন। তাঁর বাড়ীটি ছিল বহু ফ্যাসীবিরোধীদের আশ্রয়। ১৯৪০ সালে ফ্যাসিস্ত সৈন্যবাহিনী ডেনমার্ক অধিকার করলে তিনি নিজেই দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন। তিনি ব্রেশ্‌ট-এর স্ত্রী হেলেনে ভাইগেল-এর বন্ধু ছিলেন। ব্রেশ্‌ট যখন দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন সংগে ছিল দু’টি শিশুসন্তান— বারবারা ও স্টেফান— তাই কারিন মিকেলিস্‌-এর আমন্ত্রণ তিনি সাদরে গ্রহণ করেন। পরবর্তীকালে অবশ্য ব্রেশ্‌ট কারিনের আবাসস্থলের নিকটবর্তী দ্বীপ ফ্যুনেন-এর একটি বাড়ীতে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। ১৯৩৩ সালের এপ্রিল থেকে ১৯৪০ সালের এপ্রিল পর্যন্ত তিনি সুইডেনে বসবাস করেন।

নির্বাসিত জীবনে ব্রেশ্‌ট নানা অসুবিধাজনক পরিস্থিতির মধ্যেও তাঁর শত্রুর বিরুদ্ধে আরো কঠোর এবং আপোষহীন মনোভাব গ্রহণ করেন। ডেনমার্কের সেই দ্বীপের আবাসে বসেই তিনি হিটলারের পতনের জন্য নানা প্রচেষ্টা চালান। জর্মন ফ্যাসীবিরোধীদের কাছে ডেনমার্কের এই জীবন রাজনৈতিক কার্যকলাপের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখান থেকেই বেআইনী জর্মন কমিউনিস্ট পার্টীর সংগে যোগাযোগ রক্ষা করার গুরুত্বপূর্ণ কাজ সমাধা হোতো। উত্তর জর্মনীতে রাজনৈতিক কার্যকলাপের জন্য ডেনমার্কের স্থান ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তবু ডেনমার্কে বসে হিটলার বিরোধী কাজ চালানো সহজ ছিল না, কারণ ডেনমার্কের শাসকশ্রেণী হিটলারী শাসনব্যবস্থার সংগে একজোট হয়ে কাজ করতেন। কোপেনহেগেন-এ অবস্থিত জর্মন রাষ্ট্রদূত ডেনমার্কে অবস্থিত ফ্যাসীবিরোধীদের সমস্ত কার্যকলাপ সম্বন্ধে যথাযথ খবরাদি জর্মনীতে পাঠাতেন উপরন্তু ডেনমার্কের পুলিশ বিভাগের সংগে হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করতেন।

এই প্রতিকূলতা সত্ত্বেও ডেনমার্কে এক ব্যাপক ফ্যাসীবিরোধী আন্দোলন গড়ে ওঠে যার ফলে ১৯৩৩ সালের এপ্রিল মাসে স্ক্যাণ্ডিনেভিয়ান দেশগুলির ফ্যাসীবিরোধী সম্মেলন সাফল্যলাভ করে। উক্ত সম্মেলনে বিখ্যাত অঁয়ি বারবুস তাঁর বক্তব্য রাখেন এবং ডেনমার্কের জনগণের পার্টিজান যুদ্ধ অব্যাহত থাকে। ফলে জর্মন ফ্যাসীবিরোধী উদ্বাস্তু এবং ডেনমার্কের শ্রমিক ও বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে এক অটুট সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

ডেনমার্কের এই নির্বাসিত জীবনের প্রতিটি রাজনৈতিক সমস্যাগত প্রশ্নের ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক প্রচেষ্টাকে নানাভাবে বানচাল করার প্রচেষ্টা চলে, যা হিটলারের ভয়াবহ অভ্যুত্থান সত্ত্বেও প্রতিরোধ করা যায় নি। স্ক্যাণ্ডিনেভিয়ায় আশ্রয়গ্রহণকারী জর্মন উদ্বাস্তুরা অসংখ্য ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে ছিলেন। ফলে নানা উদ্বাস্তু কমিটি তৈরী হয়, যাদের পরস্পরের মধ্যে কোনো ঐক্যবদ্ধ ফ্রণ্ট গড়ে ওঠে নি। উদ্বাস্তুদের কমিটির ব্যাপারটি যে কিরকম আপাতবিরোধে পরিপূর্ণ ছিল তার প্রমাণ সুপরিচিত ইন্‌টারনাশিওনালে রোটে হিলফে (আই. আর. এইচ)-র তত্ত্বাবধানে পরিচালিত ‘এমকো’-র পাশাপাশি ‘ব্ল্যাক ফ্রণ্ট’ নামক উদ্বাস্তু কমিটি ছিল। এই কমিটির অন্তর্ভুক্ত ছিলেন উদ্বাস্তু ন্যাশনাল সোশ্যালিস্টরা এবং তাঁদের একমাত্র লক্ষ্য ছিল কমিউনিস্ট বিরোধিতা। যদিও তাঁদের রাজনৈতিক প্রোগ্রামের সংগে হিটলারের কার্যক্রমের কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিরোধ ছিল না, তবু তাঁদের একমাত্র লক্ষ্য ছিল ফ্যাসীবাদ বিরোধী আন্দোলনকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করা। এঁদের এই কমিউনিস্ট বিরোধী মনোভাবের ফলে এঁরা সোশ্যাল ডেমোক্রাটদের সংগে একই সারিতে গিয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন। ‘ব্ল্যাক ফ্রণ্টে’র এই সভ্যরা যদিও ফ্যাসিস্তদের অত্যাচারে দেশ ছেড়ে বিদেশে গিয়ে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিলেন, কিন্তু স্পষ্টই বোঝা যায় ১৯৩৩ সালের ঘটনা থেকে তাঁরা কোনো শিক্ষা লাভ করতে পারেন নি। এই সব প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে পার্টীর কাজ চালু রাখা নিরতিশয় কঠিন হয়ে উঠেছিল। হিটলারের অভ্যুত্থানের ফলে জর্মন শ্রমিকশ্রেণীর জীবনে যে দুর্যোগ ঘনিয়ে ওঠে উদ্বাস্তু জীবনের রাজনৈতিক কাজকর্মেও তার ছায়া পড়ে।

কমিউনিস্ট পার্টীর যে সব সদস্যরা হিটলারের চোখে ধুলো দিয়ে ডেনমার্কে উপস্থিত হতে পেরেছিলেন তা নিতান্তই আকস্মিক ঘটনা। যদিও এই সদস্যদের মধ্যে নির্বাসিত জীবনে পার্টীর ক্রিয়াকলাপের কৌশল সম্পর্কে প্রচণ্ড মতানৈক্য ছিল তবু সংগ্রাম ছিল অব্যাহত। পার্টীর একনিষ্ঠ কর্মীরা অতএব তাঁদের নির্বাসিত জীবনের প্রথম ভাগে একদিকে দক্ষিণপন্থী বিচ্যুতি অন্যদিকে সংকীর্ণতাবাদ এই দ্বিমুখী সংগ্রাম চালাতে বাধ্য হয়েছিলেন।

সংখ্যার দিক থেকে ডেনমার্কে জর্মন কমিউনিস্টদের সংখ্যা ছিল নিতান্তই নগণ্য, তবু অন্য রাজনৈতিক মতাবলম্বী লোকেদের মধ্যে তাঁদের রাজনৈতিক প্রভাব নগণ্য ছিল না। যেখানেই পার্টী সদস্যদের পার্টীর প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ ছিল সেখানেই তাঁরা পার্টীর নির্দেশানুযায়ী গণফ্রণ্টের শ্লোগান কার্যকরী করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছিলেন। দক্ষিণপন্থী সোশ্যাল ডেমোক্রাট এবং ট্রট্‌স্কিপন্থীরা প্রতিপদে এই গণফ্রণ্টের কার্যক্রম বানচাল করতে উদ্যত ছিলেন। তাই যদিও এখানে রাজনৈতিক অবস্থা ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের জন্য সম্পূর্ণভাবে অনুকূল ছিল তবু ফ্রান্সের মত এখানে গণফ্রণ্টের ডাক কার্যকরী হয় নি।

এই ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন প্রথম সফল হয় দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের শেষার্ধে সুইডেনে। ১৯৩৮ সাল থেকেই সুইডেনে গণফ্রণ্ট কমিটি কাজ করছিলেন এবং তাঁদের পত্রিকা ‘নর্ড ডয়েট্‌শে ট্রিবিউনে’ স্ক্যাণ্ডিনেভিয়ার ফ্যাসীবিরোধী কার্যকলাপের অসুবিধার কথা উল্লেখ করে গুরুত্বপূর্ণ নানা প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। ফলে ১৯৪৪ সালের শেষার্ধে এক কমিটি তৈরী হয় যেখানে সমস্ত জর্মন ফ্যাসীবিরোধী সংগঠন, ট্রেড ইউনিয়ন ও সাংস্কৃতিক সংস্থা প্রতিনিধিত্ব করেন।

সুইডেনে ফ্যাসীবিরোধী সংগ্রামের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা যখন চরম সাফল্য লাভ করে তখন ব্রেশ্‌ট আমেরিকায়। কিন্তু জর্মন উদ্বাস্তু ফ্যাসীবিরোধীদের পার্টী পরিচালিত অংশের সংগে তিনি অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে যুক্ত ছিলেন। ব্রেশ্‌ট তাঁর সামগ্রিক কার্যকলাপের মাধ্যমে পার্টী কর্তৃক নির্দিষ্ট কর্তব্যকেই এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। হিটলারের মুখোস উন্মোচনের প্রচেষ্টায় লিখিত তাঁর নাটকগুলি— ‘ডী রূনড্‌ক্যোপফে’, ‘ডী গেহ্বরে ডেঅর ফ্রাউ কারার’, ‘ফুর্চট উন্‌ড এলেন্‌ড’ ইত্যাদি নিঃসংশয়ে উপরিউক্ত রাজনৈতিক কর্তব্যকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যেই লিখিত। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের আগে লেখা তাঁর এই নাটকগুলি হিটলারী শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে শাণিত অস্ত্র যা শ্রমিকশ্রেণীর বিপ্লবী কর্তব্য সম্পাদন করে এবং আপামর জনসাধারণের ফ্যাসীবিরোধী সংগ্রাম ত্বরান্বিত করে। তাই তাঁর সাহিত্যসৃষ্টি ফ্যাসীবাদের বিরুদ্ধে পার্টীর নিরন্তর সংগ্রামী প্রচেষ্টা হিসাবেই চিহ্নিত। এই প্রসংগে তাঁর নাতিদীর্ঘ প্রবন্ধ— ‘সত্য লেখার পাঁচটি অসুবিধা’ [ফুন্‌ফ (শ্‌ভী আরিশ্‌) কাইটেন বাএম শ্রাইবেন ডেঅর ভারহাইট]— এই কাজের সবচেয়ে উৎকৃষ্ট উদাহরণ; এই প্রবন্ধটি বে-আইনী প্রচার পুস্তিকা হিসেবে প্রচারিত হয়। এই প্রবন্ধে তিনি প্রতিক্রিয়াশীল শাসকের বিরুদ্ধে জনগণকে কনফুশিয়াস থেকে লেনিন পর্যন্ত প্রত্যেকের শিক্ষা উপদেশ গ্রহণ করার কথা উল্লেখ করেন। সর্বোপরি তিনি দৈনন্দিন রাজনৈতিক সংগ্রামের ভঙ্গী সম্বন্ধে আলোচনা করেন, যা ফ্যাসীবিরোধী সংগ্রামের প্রথম পর্যায়ে যথেষ্ট কার্যকরী হয়।

ফ্যাসীবাদী আক্রমণের হাত থেকে সংস্কৃতিকে বাঁচাবার জন্য ১৯৩৫ ও ১৯৩৭ সালে প্যারিস ও মাদ্রিদে আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলন আহ্বান করা হয়। প্যারিস সম্মেলনে ব্রেশ্‌ট-এর বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল ফ্যাসীবাদের শ্রেণীচরিত্র বিশ্লেষণ; এই বক্তব্য উপস্থিত করে তিনি বলেন, ফ্যাসীবাদকে তাঁরাই প্রতিরোধ করতে সক্ষম হবেন যাঁরা তার কারণ সবিশেষ অবগত। ফ্যাসীবাদী অভ্যুত্থানের ইতিহাস ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন সোভিয়েট ইউনিয়ন পৃথিবীর একমাত্র দেশ যেখানে ফ্যাসীবাদের করাল ছায়া দেশের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা আচ্ছন্ন করতে সক্ষম হয়নি। ফ্রান্সে অবস্থিত জর্মন সাহিত্যিকদের নিরাপত্তা সংক্রান্ত সংগঠন তাঁদের সাধারণ সম্মেলন উপলক্ষে ব্রেশ্‌টকে একটি চিঠি দেন। জবাবে ব্রেশ্‌ট সমস্ত শক্তি দিয়ে পার্টীর গণফ্রণ্টের শ্লোগানকে সমর্থন করেন এবং বলেন, কমিউনিস্টরা সমগ্র জর্মন জনগণের মুক্তি এবং গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার ব্যাপারে অবিরাম সংগ্রাম করে চলেছেন এবং তার জন্য যে কোনো স্বার্থত্যাগে পিছ্‌পা নন। তিনি আরও বলেন:

সুযোগ্য সহকর্মীবৃন্দ,

শুনতে পেলাম ইদানীং নানা কার্যকলাপের ফলে উদ্বাস্তু ফ্যাসীবিরোধী সাহিত্যিক ও শিল্পীদের মধ্যে চরম মতানৈক্য সৃষ্টি করার অপচেষ্টা চলেছে। কিছু কিছু লেখক ফ্যাসীবিরোধী সংগ্রাম থেকে কমিউনিস্টদের বিচ্ছিন্ন করতে চেষ্টা করছেন। এর জবাবে আমার বক্তব্য হোলো: আমাদের মধ্যে কমিউনিস্টরা জর্মনীতে মুক্তি ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য স্বার্থত্যাগ করে চলেছেন। ফ্যাসীবিরোধী সংগ্রামে লিপ্ত সমস্ত মানুষের কাছে এটাই কাম্য। এ সময়ে ক্রমবর্ধমান বিভ্রান্তি সৃষ্টির অপচেষ্টার বিরুদ্ধে ফ্যাসীবিরোধী সাহিত্যিকের একমাত্র কাজ হোলো মুখ্য ও গৌণ কর্তব্যের মধ্যে বিচার বিশ্লেষণ করা। এখন একমাত্র কর্তব্য হোলো সমস্ত শক্তি দিয়ে ফ্যাসীবাদের বিরুদ্ধে ব্যাপকতম গণফ্রণ্ট সৃষ্টি করা।

বিপ্লবী অভিনন্দন সহ—
বের্টল্ট ব্রেশ্‌ট

“নয়ে ভেল্‌টব্যুহনে”, প্রাগ ১৯৩৭
সংখ্যা ৪৬, পৃঃ ১৪৬৪

এই চিঠির বক্তব্য থেকেই বোঝা যায় ব্রেশ্‌ট সব সময় পার্টীর গণফ্রণ্টের শ্লোগানকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করেন।

ডেনমার্কে কমিউনিস্ট পার্টীর সংগে কাজ করার যে চেষ্টা তার সংগে জর্মনীতে থাকাকালীন কাজের ভঙ্গীতে পার্থক্য রয়েছে। ১৯৩১-৩২ সালে তিনি সর্বহারার বিভিন্ন সংগঠনের সংগ্রামে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে ছিলেন। ১৯৩৩ সালের আগে তিনি একটি গোষ্ঠীর সংগে কাজ করতেন যাঁরা ছিলেন পার্টীর সক্রিয়কর্মী এবং যাঁদের সংগে তিনি ঐক্যবদ্ধ ভাবে প্রতিটি কাজের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন। কিন্তু পরবর্তীকালে সব কিছুই পালটে যায়। ফ্যাসিস্তরা শ্রমিক আন্দোলনের প্রথম শ্রেণীর নেতৃস্থানীয়দের নানাভাবে অকর্মণ্য করে দেয়। ব্রেশ্‌ট-এর বন্ধু স্থানীয় অনেকেই হয় কারাভ্যন্তরে চলে যান নয়তো দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন। ব্রেশ্‌ট স্বয়ং ডেনমার্কে চলে যান। এই নির্বাসিত জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল পার্টী সদস্যদের ঐক্যবদ্ধ করা। এ ব্যাপারে পার্টীর বিরুদ্ধে শত্রুপক্ষের প্রচার এক বিশেষ প্রতিকূল শক্তি হিসাবে কাজ করেছিল। উপরন্তু বিশ্বাসঘাতক কিছু কর্মী যারা পার্টী সদস্যদের মধ্যে মতানৈক্যের অপচেষ্টা চালাচ্ছিল তাদের এই ঘৃণ্য অপচেষ্টাকে ব্যর্থ করার জন্য ব্রেশ্‌ট পার্টী সদস্যদের সংগে আরো ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখতে বাধ্য হন। ফলে উদ্বাস্তু কমিউনিস্টদের সংগে ঐক্যবদ্ধ ভাবে কাজ করার রীতিমত সুযোগ এসেছিল। তবে, ব্রেশ্‌ট তাঁর সাহিত্যগত কাজের দ্বারাই ফ্যাসীবিরোধী কাজকে সবচেয়ে বেশী সমর্থন করতে সক্ষম হন।

ইতিমধ্যে স্পেনের গৃহযুদ্ধ শুরু হবার কয়েক মাসের মধ্যেই তিনি ‘ডী গেহ্বরে ডেঅর ফ্রাউ কারার’ নাটকটি লেখেন। উদ্বাস্তু ফ্যাসীবিরোধীদের মধ্যে ট্রট্‌স্কিপন্থীরা সর্বদাই স্পেনের ঘটনায় ডেনমার্কে উপস্থিত ফ্যাসীবিরোধীদের ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক সংগ্রাম নানাভাবে বিধ্বস্ত করতে সচেষ্ট হন। এরকম অবস্থায় ব্রেশ্‌ট-এর এই নাটক পার্টীর ফ্যাসীবিরোধী রাজনীতিকে নানাভাবে সাহায্য করতে সক্ষম হয়। ডেনমার্কে উপস্থিত পার্টী সদস্যদের পক্ষে পার্টীর যে-কাজ প্রায় অসম্ভব ছিল, ব্রেশ্‌ট-এর এই ক্ষুদ্র নাটক সেকাজ সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়।

ব্রেশ্‌ট ও তাঁর স্ত্রী হেলেনে ভাইগেল, ডেনমার্কে থাকাকালীন উদ্বাস্তু সাহিত্যচক্রের গোড়াপত্তন করেন। বিশ্বাসঘাতকদের দ্বারা ফ্যাসীবাদের চেহারাকে নানা প্রলেপ দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করার সুবিধাবাদী মনোভাব যখন প্রকাশ পেতে থাকে, যখন জনগণের মধ্যে এই প্রচার চালানো হতে থাকে যে বর্তমানে ফ্যাসীবাদের সেই ১৯৩৩-৩৪-এর ভয়াবহ চেহারা আর নেই, সে সময়ে ব্রেশ্‌ট তাঁর লেখার মাধ্যমে পার্টীর সঠিক রাজনীতিকে তুলে ধরতে সচেষ্ট হন। অসংখ্য মানুষের কাছে পৌঁছতে থাকে জর্মন শ্রমিক শ্রেণীর বিপ্লবী পার্টীর ফ্যাসীবাদ বিরোধী বে-আইনী কার্যকলাপের পদ্ধতি। শ্রেণী-সচেতন শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে অনেকে যাঁরা এই উদ্বাস্তু জীবনের নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মনোবল হারিয়ে ফেলেছিলেন তাঁরা ব্রেশ্‌টের কথায় ও কবিতায় পুনরায় শ্রমিক শ্রেণীর অজেয় শক্তির কথা শুনে মনোবল ফিরে পান।

কমিউনিস্ট পার্টীর উদ্বাস্তু সদস্যদের স্মৃতিকথায় ব্রেশ্‌ট ও হেলেনে ভাইগেল-এর নাম অসংখ্যবার উচ্চারিত হয়। এই সদস্যরা তাঁদের সাহায্য ও সমর্থনের কথা সমস্ত ফ্যাসীবিরোধী কার্যকলাপ ও শ্রমিক সংগঠনের সভায় সুযোগ পেলেই উল্লেখ করতেন। ১৯৩৯ সালের ২৩শে এপ্রিল ব্রেশ্‌ট ডেনমার্ক থেকে সুইডেনে গিয়ে বসবাস শুরু করেন। সুইডেনে অবস্থানকালে তিনি সেখানকার উদ্বাস্তু জর্মন সাহিত্যিকদের সংগঠনের চেয়ারম্যান ছিলেন।

১৯৩৩ সাল থেকেই ফ্যাসিস্ত শাসকরা তাঁদের জরুরী আইন মারফত পেশাদার নাট্যশালায় সমাজসচেতন নাট্যকারদের নাটক নিষিদ্ধ করেন। শ্রমিকশ্রেণীর বিপ্লবী সংগঠনগুলি তথাপি নানাভাবে সেইসব নাটক মঞ্চস্থ করার প্রচেষ্টা চালাতে থাকেন। কিন্তু গোপন সূত্রে খবর পেয়ে এই সব নাট্যানুষ্ঠান ও সংগঠনগুলিও তারা ভেঙে তছনছ করে দেয়, নাট্যকার ও অভিনেতাদের শারীরিক নির্যাতন করে সাংস্কৃতিক কর্মীদের মনোবল ভেঙ্গে দিতে চেষ্টা করে। এই অবস্থায় ব্রেশ্‌ট, ভোল্‌ফ ও ভান্‌গেন্‌হাইম দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন। ঠিক এই বিপর্যস্ত সাংস্কৃতিক পরিবেশে ফোল্‌কস্‌ব্যুহনে-র বিশাল সংগঠন ফ্যাসিস্তদের সংগে হাত মিলিয়ে বর্বর শাসকশ্রেণীর কাছে নতিস্বীকার করে শ্রমিকশ্রেণীর সংগে বিশ্বাসঘাতকতা করেন।

ফ্যাসীবিরোধী উদ্বাস্তু সাহিত্যিকদের মধ্যে নাট্যকারদের অবস্থাই ছিল সবচেয়ে সংকটময়, কারণ নাট্যপ্রযোজনার জন্য মঞ্চের প্রয়োজন। কিন্তু হিটলারের রাজত্বকালে সমস্ত মঞ্চগুলিই তাদের কুক্ষিগত হয়। ফলে সোভিয়েট ইউনিয়ন ছাড়া কোথাও উপরোক্ত ফ্যাসীবিরোধী নাট্যকারদের নাটক অভিনীত হওয়া সম্ভবপর ছিল না। ফ্যাসীবিরোধী কোনো নাটক মঞ্চস্থ করার জন্য যদি কেউ কোনো থিয়েটারে ঝুঁকি নিতেন, হিটলারের শাসনব্যবস্থা তৎক্ষণাৎ কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে সে নাটক বন্ধ করতেন। একমাত্র ব্যতিক্রম ছিল ফার্দিনান্দ রীজার পরিচালিত জুরিখ শাউশ্‌পীল্‌ হাউস, যেখানে ফ্যাসীবিরোধী নাট্যপ্রযোজনার কিছুটা সুযোগ ছিল। এখানেই ব্রেশ্‌ট ও ভোল্‌ফ-এর নাটকের উদ্বোধন হয়। এই থিয়েটারের প্রতিটি অভিনয় রজনীতে ফ্যাসিস্তরা ছলচাতুরীর দ্বারা অনুষ্ঠান বন্ধ করার অপচেষ্টা চালাতেন। এ ব্যাপারে ১৯৩৪ সালে ফ্রীডরিশ ভোল্‌ফ-এর ‘প্রোফেসর মাম্‌লক’ নাটকের উদ্বোধন রজনীর দাঙ্গা উল্লেখযোগ্য। কূটনৈতিক চাপ দ্বারা যখন নাট্যানুষ্ঠান বন্ধ করা সম্ভবপর হোতো না, তখন ফ্যাসিস্তরা সুইট্‌জারল্যাণ্ডে তাদের এজেন্ট ‘ফ্রণ্টলের’-এর মাধ্যমে থিয়েটারের সামনে এক তীব্র দাঙ্গা সৃষ্টি করতেন, যার ফলে নিরাপত্তার খাতিরে পুরো থিয়েটারটিকে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে কর্তৃপক্ষ ঘিরে রাখতে বাধ্য হন। এতৎসত্ত্বেও, জুরিখ শাউশ্‌পীল্‌ হাউসের নাট্যপরিচালকরা ফ্যাসীবিরোধী নাটকগুলির উচ্চ শিল্পগত মানের জন্যই সেগুলি তাঁদের নাট্যতালিকার অন্তর্ভুক্ত করতেন।

নতুন বিষয়বস্তু নতুন দর্শকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা হিটলারের রাজত্বকালে ব্রেশ্‌ট-এর পক্ষে সম্ভবপর হয়নি। তথাপি তিনি সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শে দীক্ষিত নাট্যশিল্পকে প্রায় ঐ অসম্ভব অবস্থাতেও এগিয়ে নিয়ে যাবার প্রচেষ্টা চালিয়ে যান। ত্রিশ দশকের প্রারম্ভে নির্বাসিত জীবনের প্রথম বছরে তিনি ছোট নাট্যসংস্থার জন্য নাটক লেখেন যেগুলি উদ্বাস্তু ফ্যাসীবিরোধী অভিনেতৃবৃন্দ ও অপেশাদার অভিনেতাদের সমন্বয়ে প্রযোজিত হয়। যদিও এসময়ে নাট্যপ্রযোজনার ব্যাপারটিই ছিল চরম কঠিন তবু এক্ষেত্রে তিনি তাঁদের রাজনৈতিক বক্তব্যকে কার্যে রূপান্তরিত করতে চেষ্টা করেন। পরবর্তীকালে অবশ্য ফ্যাসীবিরোধী ঐক্য ও সংহতির উন্নতির পর পেশাদার রঙ্গালয়ে, যেগুলি যুদ্ধবিধ্বস্ত হয়নি, ফ্যাসীবিরোধী নাট্যপ্রযোজনা চলতে থাকে। কিন্তু গোটা ইউরোপে ক’টিই বা থিয়েটার ছিল যা যুদ্ধের বিভীষিকাকে এড়িয়ে যেতে পেরেছিল?

ব্রেশ্‌ট থিয়েটারের এই সংকটময় পরিস্থিতিতেও থিয়েটারের কাজ অব্যাহত রাখতে চেষ্টা চালিয়ে যান। ব্রেশ্‌ট লিখেছিলেন ধনতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় আদৌ কোনো থিয়েটার করা যায় কিনা এ প্রশ্ন মানুষকে জিজ্ঞেস করা দরকার। জবাবে অবশ্য তিনি নিজেই ব্যঙ্গ করে বলেছিলেন— ধনতান্ত্রিক সমাজে থিয়েটার করা যায় বেশ্যালয়ে, যেখানে মাদকদ্রব্য বিক্রী হয়, যেখানে গুণ্ডাদের পোশাক ভাড়া পাওয়া যায় এবং নানা দৌরাত্ম্য চলে।

নতুন দর্শকের সামনে নতুন আঙ্গিকের পরীক্ষা সম্ভবপর হয়েছিল যুদ্ধের শেষে এক স্থিতিশীল সামাজিক পরিবেশে। যে পরিবেশের জন্য তিনি বিশ দশকের শেষার্ধ থেকে নিরন্তর সংগ্রাম চালিয়ে এসেছেন।


*বানান অপরিবর্তিত

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4557 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...