লোকসংস্কৃতি: হারিয়ে যাচ্ছে টুসুর অতীত জৌলুস

অঞ্জুশ্রী দে

 


পুরুলিয়ার সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা অনেকেই সন্দিহান, আগামীদিনে টুসুকে হয়তো আর দেখতে পাওয়া যাবে না। আধুনিকীকরণ উপজাতীয় সংস্কৃতি এবং বিশ্বাসের উপর গভীর প্রভাব ফেলেছে এবং এই পরিবর্তন টুসুতেও পড়েছে। ফলে লৌকিক দেবতাকে ঘিরে লোকউৎসব আজ মানুষ ভুলতে বসেছে। অথচ, এই লোকউৎসবের নেপথ্যে আছে মানুষের সমাজ এবং সংসারের কাহিনি

 

ইতু গেল টুসু এল/অগ্রহায়ণ গেল, পৌষ এল/ইতুর বারি ভাসল…। ইতুর পর টুসু উৎসবে মেতে ওঠাই রাঢ় বাংলার মানুষের পরম্পরা। সেই উৎসবকে কেন্দ্র করে বসে গ্রামীণ মেলা। লোকসংস্কৃতিতে যা টুসুমেলা নামে পরিচিত। মেলায় বিক্রি হয় মহিলাদের হাতে তৈরি নানারকমের সুন্দর সুন্দর জিনিস, মাটির পুতুল, গয়না, বড়ি, আচার ইত্যাদি। টুসুমেলায় বিনোদনেরও শেষ নেই। ছৌ, ঝুমুর, বুলবুলি নাচ যেমন থাকে, তেমনই থাকে ঘোড়া নাচ, নাটুয়া নাচ। এই মেলার বিশেষ আকর্ষণ মোরগ লড়াই। এছাড়া চোখে পড়বে মেলার মাঠের কোনও এক কোণে একটি কুয়োর মধ্যে বাইকের খেলা। জীবন বাজি রেখে বাইক নিয়ে এই খেলার নাম মওত-কি-কুয়া। দিনের আলো কমে এলে মেলাতে চলে দেদার জুয়া। এই বিনোদনগুলি টুসুমেলার অঙ্গ। যা শুধু মানুষকে আনন্দ দেয় তা নয়, লোকসংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করে। সজীব রাখে গ্রামীণ অর্থনীতিকে। কারুশিল্পের চর্চাকে বাঁচিয়ে রাখতে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতি আনতে টুসু উৎসবের গুরুত্ব অপরিসীম। টুসু উৎসবের বাড়তি আকর্ষণ, তাকে ঘিরে কৃষিসংক্রান্ত আচার-অনুষ্ঠান। কয়েক বছর আগেও রাঢ় বাংলার মানুষ ঘটা করে টুসুর পুজো করতেন। অঞ্চলভেদে এই পুজো উৎসবের চেহারা নিত। এখন সেই ছবির রং অনেকটাই ফিকে। হারিয়ে যাচ্ছে টুসুর অতীত জৌলুস।

সেই খেদ ধরা পড়ল পুরুলিয়ার প্রতিজ্ঞা ফাউন্ডেশনের সভাপতি অধ্যাপক ডঃ জয়ন্ত হাজরার কথায়। তিনি বলছিলেন, “টুসু মূলত আদিবাসীদের মধ্যেই জনপ্রিয়। টুসু পরব আজও হয়, তাকে ঘিরে উন্মাদনাও আছে। তবে আজকের টুসু পরব অতীতের ছায়া মাত্র। পরের প্রজন্ম এই ঐতিহ্যকে ধরে রাখবে কিনা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। সময়ের সঙ্গে টুসু পরব এবং টুসুর গান তার কৌলিন্য হারাচ্ছে।”

প্রতিজ্ঞা ফাউন্ডেশন পুরুলিয়ার আকরবাইদ ও দামোদরপুর গ্রামে শবরদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে কাজ করে। স্বাধীনতার ৭৫ বছর পরেও পিছিয়ে পড়া শবর জনজাতির প্রতি বঞ্চনা, তাদের বেঁচে থাকার লড়াই প্রত্যক্ষ করতেই জয়ন্তবাবুর আমন্ত্রণে পুরুলিয়া যাওয়া। তবে, অন্য একটা আকর্ষণ ডঃ হাজরা আমার ভাবনায় জুড়ে দিয়েছিলেন— তা হল টুসু উৎসব। সেইমতোই দিন-ক্ষণ স্থির করে ‘আকরবাইদ শবরপল্লী’তে যাওয়া। তবে আমরা যেদিন গেলাম সেদিন তাঁদের ব্যস্ততা তুঙ্গে। তাঁরা যাবেন চৌডোল নিয়ে কংসাবতীর তীরে, ডুমুরশোলের মেলায়। সারামাস ধরে রাত জেগে কাশিঘাস এবং খেজুরপাতা দিয়ে তৈরি করেছেন বিশেষ এই চৌডোল। শবর মহিলাদের নিজে হাতে বানানো চৌডোল অংশ নেবে ডুমুরশোলের মেলায়— ‘চৌডোল প্রতিযোগিতায়’। চৌডোলের কত নাম। কেউ একে চোড়ল বলেন, কেউ বলেন চৌড়োল। আসলে চতুর্দোলা। যা টুসু পরবের অপরিহার্য অঙ্গ।‌‌ আর আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষদের সব থেকে বড় উৎসব হল টুসু। পুরুলিয়ায় এই উৎসব মকর পরব নামে পরিচিত। মকর পরব একটি লোকউৎসব। চৌডোল প্রতিযোগিতা মকর পরবের বিশেষ আকর্ষণ।

 

শহুরে মানুষজন, প্রায় সবাই টুসু পরবের কথা শুনেছেন। তবে টুসু আসলে কে? কোথা থেকে তার উৎপত্তি? লোকসংস্কৃতিতেই বা তার গুরুত্ব কতখানি! সেটা অনেকেরই অজানা।

 

টুসু ও টুসু পরব

টুসু পরব সর্বজনীন। তার শিকড় অনেক গভীরে। এই পরবের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের জীবনসংগ্রাম। তিন মাস ধরে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, প্রকৃতির নানা বাধাবিপত্তি উপেক্ষা করে যখন কোড়া, ভূমিজ, মাহাতো, মুণ্ডা, লোধা, সাঁওতাল সম্প্রদায়ের মানুষ ফসল ঘরে তোলেন, তখন তাঁদের সব ক্লান্তির অবসান। সেই চরম সুখের মুহূর্তে তাঁদের ঘরে আসে টুসু। অর্থাৎ এর গভীরে আছে শস্য। আদর করে ফসল বোনা, যত্ন করে তাকে পরিচর্যা করা। চোখের সামনে সেই ফসলের পরিপক্কতা। শেষে বিপুল আনন্দে সেই সাফল্যকে ঘরে তোলা। প্রান্তিক মানুষগুলির কাছে টুসু তাই সাফল্যের প্রতীক।

টুসু বাংলার লৌকিক দেবী। স্থানীয় চাহিদা থেকে সৃষ্টি হয়েছে বলেই লৌকিক দেবতা হিসেবে এর পরিচিতি। লৌকিক দেবতারা বেশিরভাগই পুজো পেয়েছেন অ-ব্রাহ্মণ মহিলাদের হাতে। টুসুও তার ব্যতিক্রম নয়। টুসু মূলত বিমূর্ত। তবে কোথাও কোথাও কাল্পনিক মূর্তি যে গড়া হয়নি তা নয়। টুসুকে কেন্দ্র করে দীর্ঘ এক মাস ধরে চলে টুসু উৎসব। এটি কৃষিভিত্তিক লোকউৎসব। যার সঙ্গে লোকসংস্কৃতির যোগ অবিচ্ছেদ্য। রাঢ় বাংলার অন্যতম এই লৌকিক দেবীকে কুমারী হিসেবে কল্পনা করা হয়। ফলে, কুমারী মেয়েরাই টুসুপুজোর মূল ব্রতী। টুসুকে ঘিরে পরব রাঢ় বাংলার ঐতিহ্য। মানুষদের কাছে টুসু একটা আবেগ! অগ্রহায়ণের সংক্রান্তিতে মাঠ থেকে একগোছা নতুন আমন ধান মাথায় করে এনে খামারের পিঁড়িতে রেখে দেওয়া হয়। ওইদিন সন্ধ্যাবেলায় গ্রামের কুমারী মেয়েরা একটি পাত্রে চালের গুঁড়ো লাগিয়ে তাতে তুষ রাখে। তারপর তুষের ওপর ধান, বাছুরের গোবরের মণ্ড, দূর্বাঘাস, আতপচাল, আকন্দফুল, বাসকফুল, কাচফুল, গাঁদাফুলের মালা প্রভৃতি রেখে পাত্রটির গায়ে হলুদ রঙের টিপ লাগিয়ে পাত্রটিকে পিঁড়ি বা কুলুঙ্গির ওপর রেখে স্থাপন করা হয়। কুমারী মেয়েরা এই পাত্রটিকে প্রতিদিন সন্ধ্যার পরে টুসুদেবী হিসেবে পুজো করে। ভাল ফসলের আশায় টুসুর কাছে তারা প্রদীপ জ্বালিয়ে প্রার্থনা জানায়। এখানে অল্পবয়সি মেয়েরা নতুন ফসলের প্রতীক। এইভাবে নারীর উর্বরতা জমির উর্বরতার সঙ্গে মিলেমিশে একাকার। ঋতুমতী বা বিবাহিত মহিলারা আচার-অনুষ্ঠানে অংশ নেয় না। পৌষমাসের প্রতি সন্ধ্যায় কুমারী মেয়েরা দল বেঁধে টুসুর কাছে তাদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক অভিজ্ঞতা সুর করে নিবেদন করে। ধামসা, মাদলের (ঢোল) সঙ্গে চলে লোকগান।

 

টুসু উৎসবে পৌষমাসের শেষ তিনদিনের আলাদা বিশেষত্ব। শেষ তিনদিন হল চাউড়ি, বাউড়ি, মকর। চাউড়ির দিন ঘরের মেয়েরা উঠোন গোবর দিয়ে নিকিয়ে চালের গুঁড়ো তৈরি করে। বাউড়ির দিন সেই গুঁড়ো দিয়ে নানারকম পিঠে বানান। তাতে চাচ্ছি, তিল, নারকেল বা মিষ্টি পুর দেন। সেই পিঠের আকার যেমন ভিন্ন নামেও তেমন ভিন্নতা। কেউ বলে গড়গড়া পিঠে, কেউ বলে বাঁকা বা উধি পিঠে। কেউ আবার পুর পিঠেও বলে। বাউড়ির দিন রাত দশটা থেকে টুসুর জাগরণ অনুষ্ঠিত হয়। মেয়েরা ওইদিন ঘর পরিষ্কার করে ফুল, মালা ও আলো দিয়ে সাজায়। জাগরণের রাতে টুসুর ভোগ হিসেবে মিষ্টি, ছোলাভাজা, মটরভাজা, মুড়ি, জিলিপি ব্যবহার করতে দেখা যায়। পৌষসংক্রান্তি বা মকরসংক্রান্তির ভোরে মেয়েরা দল বেঁধে টুসুগান গাইতে গাইতে টুসুদেবীকে সাজানো চতুর্দোলায় বসিয়ে নদী বা পুকুরে নিয়ে যান। সেখানে প্রত্যেক টুসু দল একে অপরের টুসুর প্রতি ব্যঙ্গ করে গান গায়। গান শেষ করে দেবীকে বিসর্জন দেয়। সেরকমই একটি গান—

আমার টুসু মুড়ি ভাজে, চুড়ি ঝলমল করে গো
উয়ার টুসু হ্যাংলা মিয়া, আঁচলা পাতে মাগে গো!

এটা মজার হলেও, একেবারে শেষবেলায় বিষণ্ণতা ছুঁয়ে যায় গায়িকাদের সুরে। ছল-ছল চোখে তখন মনখারাপের গান—

আমার বড় মনের বাসনা
টুসুধনকে জলে দিব না।

টুসু বিসর্জনের পরে মেয়েরা স্নান করে নতুন বস্ত্র পরেন। ছেলেরা খড়, কাঠ, পাটকাঠি দিয়ে ম্যাড়া-ঘর বানিয়ে তাতে আগুন লাগান। চৌডোলে করে টুসুর ভাসানের প্রতীকী অর্থ নাকি প্রাক্-বয়ঃসন্ধিকালীন মেয়ের চতুর্দোলায় করে স্বামীর বাড়িতে আসা, সেখানে তার বিয়ে হওয়া এবং নতুন জীবন শুরু করা। লোকসংস্কৃতির গবেষকরা টুসুর এই বিদায়কে ফসল কাটার এবং কৃষিচক্রের সমাপ্তির সঙ্গে রিলেট করেছেন।

 

পৌষসংক্রান্তি বা মকর-সংক্রান্তির দিন টুসুকে বিদায় জানিয়ে শেষ করা হয় টুসু পরব। তাই মকরসংক্রান্তির দিন সকাল থেকে টুসু-বিদায়ের বেদনার সুর মানভূমের আনাচেকানাচে। মকরের পরের দিন আখান যাত্রা। সেইদিন থেকে সূর্যের উত্তরায়ণ শুরু! সূর্যের গতির দিক পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আখান যাত্রা! সূর্যের যাত্রার সঙ্গে সাযুজ্য রেখে আখানের দিনই হল আদিবাসীদের নববর্ষ। এদিন সকালে আড়াই পাক লাঙল চালিয়ে ‘হাল পুণ্য’র মাধ্যমে শুরু হয় নতুন বছরের। ওইদিন চাষি দুপুরে দই-চিড়ে খেয়ে দেবীর কাছে প্রার্থনা করেন— “আমার সন্তান যেন থাকে দুধেভাতে”।

 

টুসু গান

‘ভাল থেকো’ বা ‘কর্ণসুবর্ণের গুপ্তধন’ সিনেমায় টুসু গানের ব্যবহার শহুরে দর্শকদের মন ভরিয়েছে। এটা টুসু গানের একপ্রকার বাণিজ্যিকীকরণ। বাস্তবে, টুসু গান ছাড়া টুসু উৎসবের কোনও অস্তিত্ব নেই। কারণ শুধুমাত্র গানে গানেই টুসুর বন্দনা করা হয়। টুসুর সামনে মেয়েরা সুর করে ব্যক্তিগত ও সামাজিক যে অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করে তাই “টুসু গান”। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে টুসু গান মুখে মুখে সঞ্চারিত হয় বলেই একে লোকগান বলে। এই লোকগান গায়িকার কল্পনা। টুসু গানে সুখ, দুঃখ, আনন্দ যেমন ফুটে ওঠে তেমনই ফুটে ওঠে মেয়েলি ঝগড়া, হিংসা, রাগ ও ঘৃণা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই গানে মিশে গেছে সমসাময়িক রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট। কখনও শাসকের বিরুদ্ধে তীব্র শ্লেষও ফুটে ওঠে টুসু গানের ছত্রে ছত্রে। এছাড়া বিভিন্ন সামাজিক সচেতনতার কথা টুসু গানে দেখা যায়। কুমারী মেয়েদের সঙ্গে বিবাহিত নারী ও বয়স্কা মহিলারাও তাঁদের সাংসারিক সুখদুঃখকে ব্যক্ত করতে টুসু গানকে কাজে লাগিয়েছেন। এরকমই এক টুসু গান—

থাকিতে না পারি ওই শ্বশুরঘরে
আমি থাকব বল কী করে
খেতে দিতে দেরি হলে
ঘর থেকে বাহির করে
আবার সজনা খাড়া ভেঙে মারে
মারে মেজ দেওরে
থাকিতে না পারি ওই শ্বশুরঘরে।

বধূ নির্যাতনের যন্ত্রণার এর চেয়ে ভাল প্রকাশ আর কীভাবে হতে পারে? সামাজিক অবক্ষয়ের করুণ কাহিনিও টুসু গানে ধরা পড়েছে। এক পিতৃহীন অসহায় মেয়েকে তার কাকা বিয়ে দিয়েছেন এক বুড়ো লোকের সঙ্গে। তাও সামান্য অর্থের লোভে। মেয়েটি পতি-পরিচয় দিতে লজ্জা পায়। টুসু গানে ফুটে উঠেছে মেয়েটির সেই যন্ত্রণা—

একশো টাকা নিলি কাকা দিলি রে বুড়া বরে
বুড়ার সঙ্গে চলতে গেলে রানিগঞ্জের শহরে
রানিগঞ্জেরে লোকে বলে, ওটি তোমার কে বটে
লাজলজ্জা শরম সজ্জা, ঠাকুরদাদা হয় বটে।

আবার টুসু যে কৃষিভিত্তিক লৌকিক দেবী তার পরিচয়ও রয়েছে টুসু গানে—

জলে হেলা, জলে খেলা, জলে তোমার কে আছে
অন্তরে ভেবে দেখো মা, জলে তোমার সব আছে।

যার অর্থ হল “তুমি জলে আনন্দময়, তুমি জলে খেলো। আসলে জলই হল তোমার বৈবাহিক পরিবার।” অর্থাৎ চাষের জন্য জল অপরিহার্য।

আধুনিক প্রজন্ম ডিজিটাল যুগে ঢুকে পড়েছে। ডিজে-র তালে তাল মেলাচ্ছে। উদ্দাম সংস্কৃতির কাছে হার মেনেছে টুসু গান। ফলে টুসু গানের সে রমরমা আর নেই। অঞ্চলভেদে টুসু গানে বদল চোখে পড়ছে। তবে মূলগত দিক থেকে তার কোনও তফাত ঘটেনি।

 

টুসুর উৎপত্তি

টুসুর উৎপত্তি কোথা থেকে? এই প্রশ্নের সঠিক কোনও উত্তর জানা নেই। টুসুর উৎপত্তি নিয়ে নানা মত প্রচলিত আছে। অঞ্চলভেদে তার ব্যাখ্যাও আলাদা। কারও মতে ‘টুসু’ শব্দটি অস্ট্রিক ভাষা থেকে এসেছে। যার অর্থ বাচ্চা মেয়ে। কারও কারও মতে তস্য নক্ষত্র থেকে ‘টুসু’ র নামকরণ। অনেকে আবার ‘টুসু’ পরবের সঙ্গে গ্রিকের ‘অ্যাডোনিয়া’ উৎসবের মিল খুঁজেছেন। তবে ‘টুসু’ শব্দের উৎপত্তি নিয়ে তিনটি প্রচলিত গল্প গ্রামবাংলার বয়স্করা শুনিয়ে থাকেন। প্রথম গল্পে, কুমোরকন্যা তুসুমনির বিয়ে হয় এক রাজপুত্রের সঙ্গে। তাঁর মৃত্যুতে, তুসুমনি সহমরণে যান। দিনটি ছিল মকরসংক্রান্তি। সেই থেকে ওইদিনে টুসু উৎসব পালিত হয়। দ্বিতীয় গল্পে, এক রাজা তুসুমনিকে বিয়ে করেন। তুসুমনি অল্প বয়সে মারা যান। সেই শোকে রাজা পাগল হয়ে যান। তাকে সুস্থ করতে গ্রামবাসীরা তুসুমনির একটি মূর্তি স্থাপন করে পুজো করতে থাকেন। এভাবেই নাকি টুসু পরবের শুরু। অন্য গল্পটি হল, একজন মুঘল সম্রাট তুসুমনির প্রেমে পড়েন এবং বিয়ে করতে চান। কিন্তু তুসুর বাবা বিয়েতে রাজি হননি। রাগে ক্ষোভে সম্রাট গ্রামবাসীদের উপর অত্যাচার শুরু করেন। তখন গ্রামের দরিদ্র মানুষদের বাঁচাতে তুসুমনি আত্মহত্যা করেন। সেই আত্মদানের সময় থেকেই টুসু উৎসবের সূচনা।

প্রচলিত গল্প যাই থাক, টুসু পরবের সূত্রপাত কবে তার সঠিক দিনক্ষণ কোথাও লিপিবদ্ধ নেই। এ-বিষয়ে নানা মুনির নানা মত। গবেষকদের মতে রাঢ় বাংলায় টুসু পরবের সূচনা নাকি আর্যরা ভারতে আসার বহু আগে থেকে। মাঝে জৈন, বৌদ্ধ, এবং ইসলামিক যুগ। পরে ব্রিটিশ আমল। শাসকের বদল হলেও রাঢ় বাংলার লাল মাটিতে টুসুর পুজো বন্ধ হয়নি। গ্রামেগঞ্জে আমন ধান জমি থেকে খামারে উঠে এলেই প্রান্তিক কৃষিজীবী মানুষ আনন্দে ডগমগ হয়ে ওঠেন। সারা বছরের কষ্ট সাময়িকভাবে ভুলে টুসু উৎসবে মেতে ওঠেন। গ্রামের গরিবগুর্বো মানুষগুলোর কাছে টুসু পরব শস্যোৎসব। তাদের বিশ্বাস ধানের খোসা তুষ, তা থেকেই টুসুর জন্ম। তিনি হলেন ধনদেবী। মা লক্ষ্মীরই লৌকিক রূপ। তবে টুসু তাঁদের ঘরের মেয়ে। তাই টুসু পরবে নেই কোনও বাহুল্য, রয়েছে শুধুই গ্রাম্য সারল্য। ভক্তির পরিবর্তে ভালবাসাই উৎসবের প্রধান উপাদান।

 

টুসুর আধিপত্য

রাঢ় বাংলার পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, ঝাড়গ্রাম, পশ্চিম মেদিনীপুর, পশ্চিম বর্ধমান, কিছুটা বীরভূমে টুসু উৎসব পালিত হয়। পুরুলিয়াতে অধিকাংশ স্থানে পুরাতন প্রথা অনুযায়ী এই উৎসব পালিত হয়। যেখানে কোনও মূর্তির প্রচলন নেই, কিন্তু পুরুলিয়ার বান্দোয়ান ও বাঁকুড়ার খাতড়ার টুসুমেলায় টুসুমূর্তি দেখা যায়। অশ্ববাহিনী বা ময়ূরবাহিনী মূর্তিগুলির গায়ের রং হলুদ ও শাড়ি নীল রঙের হয়ে থাকে। মূর্তির হাতে কখনও শঙ্খ, কখনও পদ্ম, কখনও পাতা বা কখনও বরাভয় মুদ্রা দেখা যায়। আধুনিক নগরসভ্যতার চাপে টুসুকে নিয়ে উন্মাদনা অনেকটাই কমেছে। এ-কথা মানছেন বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই। কিন্তু তার মধ্যেও পৌষমাস পড়লেই পুরনোরা অনেকেই ফিরে যান অতীতে। নিজের মতো করে টুসু গান বানান। তাঁদেরই একজন পুরুলিয়ার অকারবাইদ গ্রামের সাবিত্রী শবর। তিনি দুঃখ করছিলেন, “আমার নাতনিরা সবসময় মোবাইল ফোন নিয়ে ব্যস্ত। টুসু গান শেখার কোনও আগ্রহই তাদের নেই। বরং ডিজের সঙ্গে নাচ তাদের বেশি পছন্দ।” সাবিত্রীদেবীর নাতনি ক্লাস টেনের অঞ্জলির গলায় সেই কথারই অনুরণন— “টুসু গান নিয়ে আমার কোনও আগ্রহ নেই। স্কুল, টিউশন করে সময় পেলে মোবাইলে গান শুনি বা ভিডিও দেখি। ঠাকুমার কাছে গিয়ে টুসু গান শেখা আর হয় না।”

 

টুসু পরবে ভাটা

পুরুলিয়ার সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা অনেকেই সন্দিহান, আগামীদিনে টুসুকে হয়তো আর দেখতে পাওয়া যাবে না। তাঁদের কথায়, “এক মাস ধরে টুসুর গান চলত। মহিলারা নিজেরাই নানা বিষয়ের উপর গান তৈরি করতেন। টুসুর গানে প্রতিবাদের সুরও শোনা যেত। এখন মকরে নদীর ঘাটেও সম্মিলিত টুসু গান আর শুনতে পাওয়া যায় না। ভাসানের চৌডোলও হাতে গোনা কয়েকটা আসে।” অথচ টুসু-ভাসান টুসু পরবের খুব গুরুত্বপূর্ণ অংশ। লেখক সুজিত রক্ষিত বলছিলেন, টুসুভাসানের এই করুণ ছবির পিছনে নগরায়ন ও সমাজমাধ্যমের বাড়বাড়ন্তই দায়ী। তাঁর কথায়, “আগে মকরসংক্রান্তির দিন মহিলারা দল বেঁধে টুসু গান গাইতে গাইতে চৌডোল নিয়ে নদীতে টুসু-ভাসানে যেতেন। সংক্রান্তির দিন সকালে পুরুলিয়া শহরের সমস্ত রাস্তায় এই ছবি চোখে পড়ত। এখন শহরে জনসংখ্যা এত বেশি, হাঁটতে গেলে হোঁচট খেতে হয়। তাই এখন দল বেঁধে টুসুর ভাসানে যাওয়ার ছবি খুব একটা চোখে পড়ে না। অন্য সমস্যা হল টুসুভাসানের পর স্নান। নদীতে টুসু ভাসিয়ে মেয়েরা দল বেঁধে স্নান করতেন। স্নান করে বাড়ি ফিরতেন। সেই স্নানের ছবি সমাজমাধ্যমে সহজেই ভাইরাল হয়ে যাচ্ছে। নিজেদের লজ্জা ঢাকতে, এখন মেয়েরা নিজেদের বাড়িতে স্নান সেরে টুসুর ভাসানে যাচ্ছেন। একদিকে শহুরে ভিড়ের ফলে চৌডোলের সংখ্যা যেমন হাতেগোনা, অন্যদিকে আধুনিক যন্ত্রের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে বন্ধ হতে বসেছে টুসুর স্নান।” এভাবেই কি টুসু পরবের অলঙ্কার একটা একটা করে খসে পড়বে? অনেকের মতে টুসু পরব এখন পিকনিকের রূপ নিয়েছে। আধুনিকীকরণ উপজাতীয় সংস্কৃতি এবং বিশ্বাসের উপর গভীর প্রভাব ফেলেছে এবং এই পরিবর্তন টুসুতেও পড়েছে। ফলে লৌকিক দেবতাকে ঘিরে লোকউৎসব আজ মানুষ ভুলতে বসেছে। অথচ, এই লোকউৎসবের নেপথ্যে আছে মানুষের সমাজ এবং সংসারের কাহিনি।

দ্রুত নগরায়ন, সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নারীর স্বনির্ভর হয়ে ওঠার চেষ্টা, লৌকিক দেব-দেবীদের গুরুত্ব অনেকখানি কমিয়ে দিয়েছে। শিল্পায়ন ও নগরায়নে কৃষিজমির পরিমাণ যেমন কমেছে, তেমনি চাষের উপর নির্ভরতাও কমেছে। টুসুর মতো দেবীরা বেশিরভাগই পুজো পেয়েছেন শস্যের দেবতা হিসেবে। ফলে কৃষিনির্ভরতা কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই লৌকিক দেবীদের পুজো যেন পড়তির দিকে। টুসু পুজো পেতেন কুমারীদের হাতে। আধুনিক যুগের কুমারীরা নিজেদের কেরিয়ার নিয়ে অনেক বেশি সচেতন। ফলে সারা মাস ধরে পুজো করা তাদের পক্ষে অসম্ভব। সমাজবদলের ছোঁয়ায় লৌকিক দেবতারা ক্রমশ লুপ্ত হচ্ছেন বা অনেকটাই চাপা পড়ে যাচ্ছেন। হারিয়ে ফেলছেন তাঁদের কৌলীন্য। আজ আধুনিকতা যেভাবে টুসুর উপর প্রভাব ফেলেছে, সমাজ-গবেষকদেরকে তা ভাবাচ্ছে। হয়তো একদিন টুসুর মতো লোকপুজো, তাকে ঘিরে লোকউৎসব সমাজে প্রাসঙ্গিকতা হারাবে! তবে লোকসংস্কৃতির এই উজ্জ্বল ধারা একেবারেই ভেসে যাতে না যায় সে চেষ্টা সবারই করা উচিত। এত দোলাচলের মধ্যেও আশার কথা শোনালেন মানভূম কালচারাল অ্যাকাডেমির এক সদস্য। তাঁর কথায়, “এখনও বহু টুসু গান রচিত হচ্ছে। এছাড়া নিজেদের কৃষ্টি এবং সংস্কৃতি কিছুতেই ভোলা সম্ভব নয়। তাই পুরুলিয়ার মানুষ কোনওদিনই টুসুকে ভুলবে না।”

 

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4658 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...