মোদি-ম্যাজিক: ব্যক্তি-মহিমা নাকি কর্পোরেট নির্মাণ?

রাজদীপ্ত রায়

 




লেখক গদ্যকার ও ইংরাজি সাহিত্যের অধ্যাপক

 

 

কোভিড-১৯ সংক্রমণ নিয়ে দেশ নানারকম আতঙ্কে ভুগছে। দ্বিতীয় পর্যায়ের লকডাউনের অর্ধেক সময় পার। আরো কোনও ধাপ হবে কিনা অজানা। মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। শেষ ভরসা ডাক্তার আর চিকিৎসাকর্মীরা। তাঁরাও ছাড় পাচ্ছেন না। সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, বিলিব্যবস্থা, হাসপাতাল বা রোগের পরীক্ষাগার সবই আশঙ্কাজনকভাবে কম। এক কেরল বাদে কোনও রাজ্যস্তরেই সুস্পষ্ট দিশা নেই। রাজস্থানের এক-দুটো জনপদ বিচ্ছিন্নভাবে সংক্রমণ বেঁধে রাখতে সমর্থ হয়েছে। কিন্তু সেই সাফল্যও পুরো রাজ্যের চিত্র নয়। কী হবে জানা নেই। গত পাঁচ-ছ বছরে ভারত রাষ্ট্রের যা সরকারি চলনবলন, তাতে একটা ব্লেমগেম প্রায় নির্ধারিতই ছিল। নিজামুদ্দিন মার্কাজের তবলিগি জমায়েত নিয়ে সে সবও শুরু হয়ে গেছে। এরই মাঝে প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদির আবেদনে সাড়া দিয়ে গোটা দেশ এক বিকেলে থালা বাটি কাঁসর বাজিয়েছে। এপ্রিল মাসের এক সন্ধ্যায় ঘর অন্ধকার করে মোম, প্রদীপ, হারিকেন, যাই হাতের কাছে পেয়েছে তাই জ্বালিয়েছে। এবং স্বীকার করতেই হবে যে, ভারতবর্ষের মূলত মধ্য বা উচ্চবিত্ত অংশের জনসমাজে দিয়া জ্বালানো বিপুল সফল। দেশের ওই অংশ, যারা বাজার পুঁজির কৃপাধন্য,  তাদের সাবেকি মিডিয়া ধন্য ধন্য করছে মোদি ম্যাজিকের। কথা উঠছে, মোদিজির অসামান্য ব্যক্তি মহিমার। উনি যা বলেন, দেশের সঙ্কটকালে তা সে শুনতে যতই আখাম্বা মনে হোক না কেন, দেশ তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে। মেনে চলে। হাসতে হাসতে বরণ করে নোটবন্দির লাইনে দাঁড়ানো মৃত্যু, অথবা সর্বমারির আতঙ্কপ্রহরে থালা বাজানোর আহ্বান। এহেন ধককে মহিমা আর ধকের ব্যক্তিটিকে ম্যাজিশিয়ান বলা হবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এটুকুই কী সব? এর কোনও পূর্বাপর কি সত্যিই নেই? একটু চোখ মেলে দেখা যাক।

পরিচিত প্রায় সব মিডিয়াই বলেছে যে মোদিজির ক্যারিশমার কাছে বিরোধীরা তো বটেই, এমনকি সেক্যুলার বলে পরিচিত গোটা অংশটাই নাকি জাস্ট একছক্কায় মাঠের বাইরে। এক্ষেত্রে সেক্যুলার শব্দের ভাবার্থ অবশ্য শুধু শাসনে বা শিক্ষায় ধর্মপরিচয়ের অনুপ্রবেশের বিরোধিতা করার মধ্যে সীমিত নয়। সাম্প্রতিক ভারতে ক্ষমতাসীন দলের কথাবার্তা, বা আরও সরাসরি বললে, শ্রী নরেন্দ্র মোদির কথাবার্তা, কাজকর্মের বিরোধিতা করলেই মোটামুটি সেক্যুলার বলে দেগে দেওয়া হয়। এক পা এগোলে “আর্ব্যান নকশাল”। তা সে যাই হোক, ভারতব্যাপী পর্যাপ্ত পরীক্ষা, চিকিৎসা বা সুরক্ষার ব্যবস্থা অথবা দিন আনি দিন খাই লোকগুলোর জন্য ন্যূনতম ভাবনা চিন্তা আয়োজন ব্যবস্থাপনা না করে দেশের সর্বোচ্চ নির্বাচিত প্রশাসনিক অবস্থান থেকে থালা বাটি বাজানো বা অকারণ মোম জ্বালানোর মতো প্যান-ইন্ডিয়ান ইভেন্ট মঞ্চস্থ করে মোদিজি অন্তত এই ধারণাটি গেড়ে দিতে পেরেছেন যে প্যানডেমিকের মোকাবিলায় তিনি খামখেয়ালি রাজার মতো যা নয় তাই করতে বা বলতে পারেন। আর সারা ভারত তাঁর ইচ্ছেকে মর্যাদা দিতে রুটি রুজি সংক্রমণ সুরক্ষার সমস্ত প্রশ্ন জলাঞ্জলি দিয়ে অনায়াসে প্রভুভক্ত প্রজার নিষ্ঠায় উদ্বাহু থালা বাটি কাঁসর বাজাতে পারে বা মোম জ্বালাতে পারে। এই বিপুল কাড়া নাকাড়ার গগনভেদী সমর্থনে বিরোধীদের একহাত নেওয়া যাবে সেটাই স্বাভাবিক। সঙ্গে পুনস্থাপিত হবে বা হয় অসামান্য মোদি-মহিমা! যেন কর্পোরেট মিডিয়ায় ক্লান্তিহীন প্রচার পাওয়া মোদিজির ব্যক্তি ক্যারিশমার কাছে থরথর বিহ্বলতায় দেশবাসী সকলে তাদের বোধ বুদ্ধি সব সঁপে দিয়ে মুখাপেক্ষী বসে আছে নির্বাণের আশায়! অর্থাৎ মোদিজি একজন অবতার গোছের কিছু, এবং তিনিই যন্ত্রী, বাকিরা সকলে যন্ত্র। ওনার একেকটা স্টান্সকে সাদা চোখে দেখলে তেমনটা ভাবাই স্বাভাবিক। কিন্তু একটু তলিয়ে দেখলে এই ব্যক্তিমহিমা প্রচারের সূক্ষ্ম ব্যবস্থাপনা বা তার প্রেক্ষিত রচনার কার্যকারণের অনুধাবন খুব অসম্ভব হয়তো নয়।

এই অবতার হয়ে ওঠাটা কি সত্যিই ওনার ব্যক্তিসত্তার সহজাত সাফল্য নাকি বাজার রাজনীতির রমরমে বেসাতিতে সূক্ষ্ম রাজনীতি দিয়ে গড়ে তোলা কোনও সচেতন দলীয় নির্মাণ? ভারতবর্ষের এক-দুটো জরুরি সামাজিক বা রাজনৈতিক সাধারণ বৈশিষ্ট্যের ওপর চোখ বোলালে কিন্তু মোদিজির ব্যক্তিপ্রভার চাইতে অনেক বেশি চোখে পড়ে বিজেপি দলের এই কর্পোরেট লালিত নব্য অবতারের তরফে ওনার আইকন নির্মাণের ক্রমান্বয় প্রচারসর্বস্ব ধাপগুলো। কেন্দ্রীয় সরকারের নেওয়া হালের অর্থনৈতিক নীতিগুলো এবং জনসংযোগের নিরিখে বিচার করলে দেখা যায় মোদি-শাহ প্রাধান্যের সাম্প্রতিক ক্ষমতাসীন বিজেপি প্রায় সম্পূর্ণত পপুলিজমের রাস্তায় এসে দাঁড়িয়েছে। সেখানে মোদিজির ব্যক্তি ক্যারিশমাময় আইকন নির্মাণ বিজেপির দলীয় ভাবাদর্শ প্রয়োগের থেকেও অনেক বেশি জরুরি। এই ব্যক্তি-আইকন নির্মাণকে সুনির্দিষ্ট ধর্মীয় মতবাদ নির্ভর দক্ষিণপন্থী বিজেপি দলের এযাবত রচিত ইতিহাসের দিক থেকেও একটা বিরাট পার্থক্য বা শিফট হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে। খোঁজখবর করলে এই পপুলিস্ট নির্মাণের আড়ালে বিজেপি দলের অন্দরমহলে একটা চ্যুতিরেখাও হয়তো দৃশ্যমান হবে। মহিমাঘন নতুন আইকন হিসেবে মোদিজিকে জনসমক্ষে হাজির করা এবং সেই পরস্মৈপদী নির্মাণের বিপুল জনসাফল্যের পেছনে কী কী কারণ থাকতে পারে সে অনুসন্ধানটাই আপাতত করা যাক। সাবেক ভারতীয় সমাজের কিছু সাধারণ সূত্র মাথায় রেখে।

মুক্ত বাজার অর্থনীতির সর্বগ্রাসী পুঁজিবাদের কাছে ভারতের আত্মসমর্পণের নির্দিষ্ট বছর সাল মাস সবই ইতিহাসে লেখা আছে। মোটের ওপর এই বাজারসর্বস্ব পুঁজির স্রোতে আমাদের সমাজজীবনের সম্পূর্ণ গা ভাসিয়ে দেওয়ার সূত্রপাত একুশ শতক শুরুর কিছুদিন পর থেকে। প্রায় অভূতপূর্ব সব পরিবর্তনগুলো যখন থেকে আমাদের দৈনন্দিনতায় ধীরে ধীরে “নিউ নর্ম্যাল” হয়ে উঠতে লাগল, খুব অলক্ষ্যে আমাদের রাজনৈতিক চিন্তা চেতনাতেও সেইসব পরিবর্তনগুলো তার বিকার ছড়ানো আরম্ভ করল। মোদি-শাহ জমানার আগে যে বিজেপি সরকার দেশ দেখেছে, তার দায়িত্বে ছিলেন প্রায় লেজেন্ডে পরিণত হওয়া ব্যক্তিত্ব শ্রী অটলবিহারী বাজপেয়ি। সঙ্গে ছিলেন দলে, সঙ্ঘে বা দলের বাইরেও মহা প্রতাপশালী বলে পরিচিত শ্রী লালকৃষ্ণ আডবানি। লক্ষ্যণীয় এই দুজন নেতাই কিন্তু ব্যক্তির চাইতে দলকে বেশি গুরুত্ব দিতেন। যত বড় নিন্দুকই হোন না কেন, বিজেপিকে কেউ অন্তত ভাবাদর্শহীন রাজনৈতিক দল বলে চিহ্নিত করেন না। অন্তত আগে তেমনটাই ছিল। কিন্তু মোদিজির জমানার একটা একটা বড় বৈশিষ্ট্যই হল ইদানিং প্রায় সবক্ষেত্রেই দলের চাইতে ব্যক্তিকে বড় বলে গণ্য করা হচ্ছে। এবং সেটা করা হচ্ছে প্লেবিয়্যান রাজনীতির নিয়মিত কতগুলো সূত্র মেনে। অর্থাৎ যে ম্যাজিকের কথা আমরা আলোচনা করছি, তার মূলে মোদিজির ব্যক্তিত্বের চাইতে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে জনগণ কিভাবে মোদিজিকে দেখতে চায়, সেই প্রশ্নটা। এমন কথা কেউ বলবেন না যে বাজপেয়িজির ব্যক্তি ক্যারিশমা ছিল না। ছিল, এবং বেশ ভালো মাত্রাতেই ছিল। কিন্তু কর্পোরেটের বাজার নির্ভর অর্থনীতির মনপসন্দ যে আজকের পপ্যুলিস্ট ইমেজ, বাজপেয়িজির রাজনীতিতে দক্ষিণপন্থার প্রতি আনুগত্য থাকলেও সেই ব্যক্তি ইমেজ তৈরির দায় ছিল না। উলটোদিকে মোদিজি নিজেকে তৈরি করেছেন সম্পূর্ণ বিপরীত পথে।

বিশ শতকের শেষদিক পর্যন্ত ভারতীয় নাগরিক জনমানসে শিক্ষিত, উদারবাদী, সেক্যুলার এবং মার্জিত রুচিসম্পন্ন জননেতার একটা মানস প্রতিমা গড়া ছিল। একদিক দিয়ে একে একধরনের রেনেসাঁস মডেল বলা চলে। বাজপেয়িজি কবিতা লিখতেন। কাব্যগুণ বিচার না করেই বলা যায় যে তাঁর এই আলোকপ্রাপ্ত নান্দনিকতার কদর করাটা ঔপনিবেশিক শিক্ষায় শিক্ষিত রাজনীতি সচেতন নাগরিকের মনে একরকম প্রথা হিসেবেই গাঁথা ছিল। এই একই বৃত্তে নেহরুজিও পড়বেন। কমরেড জ্যোতি বসু বা ইএমএস নাম্বুদ্রিপাদও। রেনেসাঁস শিক্ষায় শিক্ষিত, সেক্যুলার, মার্জিত এবং নাগরিক যুক্তিবোধের আইকন হিসেবে সে কারণেই দীর্ঘদিন তাঁরা নন্দিত ছিলেন।

কিন্তু এসবের আড়ালে একটা অন্যদিক বরাবরই ছিল। এবং সেটা ছিল বেশ ভালো মাত্রাতেই। হয়তো সদ্য উপনিবেশ মুক্ত হওয়া ভারত নির্মাণের দুনিয়ায় তুলনায় অনালোচিত বা অপাংক্তেয়ভাবে ছিল সে অংশ, কিন্তু সেটাই যে সংখ্যাগুরুর ভারতবর্ষ এবং সামাজিক আধিপত্যে প্রবল, সেটা টের পাওয়া গেল অনেকটাই পরে। ভারতীয় জনসমাজের এই সংখ্যাগুরু অংশ ওপরে বলা ওই নাগরিক অভ্যেসের বা প্রথাবদ্ধ ঔপনিবেশিক ভাবনার বাইরে বাস করেছে বরাবর। খেয়াল করলে দেখা যাবে ভারতীয় সমাজে একই সঙ্গে অনেকগুলো সময়ক্রম ধরা থাকে বা আছে। সংখ্যাগুরু ভারতীয়র মনে মানুষ হিসেবে বা নেতা হিসেবে মান্য হওয়ার যে মূল প্রত্নরূপটা প্রায় তাদের যূথ নির্জ্ঞানের অন্তরে খোদাই করা আছে, সে মডেল কখনওই পশ্চিমের রেনেসাঁস মডেল নয়। তার কল্পনা, রূপ, রস— সবটাই মূলত মধ্যযুগীয়। সেখানে রেনেসাঁসের উদারবাদী দর্শনের চাইতে অনেক বেশি সহজাত ধর্ম এবং জাতপাতভিত্তিক জীবনদর্শন। রেনেসাঁস মডেলের বিপরীতে এহেন পিতৃতান্ত্রিক এবং জাতিভেদভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গিতে নারীবর্জিত একলা পুরুষে সন্ন্যাসীর মহিমা আরোপ করা এবং তাকে নায়ক হিসেবে দেখা প্রায় রুটিন মানসিকতার প্রতিফলন। দেশের বিখ্যাত মনীষীদের ক্ষেত্রেও এর অন্যথা যে হয়নি, তার প্রমাণ ভুরি ভুরি দেওয়া যায়। আর এই কর্মঠ, নারীবিহীন জীবনে অভ্যস্ত এবং মেধার অনুশীলনের বদলে চটজলদি সিদ্ধান্ত নেওয়া পেশীনির্ভর বীরত্বকেই যে আম ভারতবাসী “পৌরুষ” বলে দেখতে অভ্যস্ত, রামায়ণের মহিমা কীর্তন থেকে গড়পড়তা মূল ধারার ভারতীয় ছায়াছবির সফল নায়ক নির্মাণের রহস্য পাঠ করলেই তার হদিশ পাওয়া যায়। মোদ্দা কথা, উচ্চবর্ণের সাংস্কৃতিক আধিপত্যের হাতে নিপীড়িত এবং দারিদ্রসীমার নিচে বাস করা সংখ্যাগুরু ভারতে আজও ব্রাহ্মণ্যবাদই নৈতিক মূল্যবোধ আর কল্পনার প্লেবিয়্যান শিকড় তৈরি করে, করে চলেছে। সেখানে আলোকপ্রাপ্ত ঔপনিবেশিক শিক্ষার উদার এবং সেক্যুলার মানবতাবাদ কখনওই “পৌরুষ” নির্মাণের সহায়ক নয়।

মোদিজির ম্যাজিকের পেছনেও এই আদ্যোপান্ত লিঙ্গবৈষম্যভিত্তিক পিতৃতান্ত্রিক আদর্শের আদলে নিজেকে গড়ে তোলার তাগিদ আছে। অর্থাৎ, তাঁর মহিমায় থালা বাটি বাসন বাজে কিনা বা মোম জ্বলে কিনা প্রশ্নসাপেক্ষ। কিন্তু যাঁরা প্যানডেমিকের আতঙ্কের মাঝে পর্যাপ্ত চিকিৎসা আয়োজনের চরম গাফিলতিতেও ঐ জাতীয় কান্ডগুলো সোৎসাহে ঘটালেন, দেশ ব্যাপী, তাঁদের অবচেতনে যে এরকম একবগগা একজন “পুরুষ নেতা”র মুর্তি পরম মমতায় বাঁধানো আছে, সে প্রায় নির্ভেজাল সত্যি কথা। এই জনতা উৎসব বা ইভেন্ট চায়, আর মোদিজি সেই চাহিদা অনুযায়ী ইভেন্ট আবিষ্কার করেন। স্বাধীনতার সত্তর বছরেও কাঙ্ক্ষিত শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা চাকরির বন্দোবস্ত না হওয়া সংখ্যাগুরু ভারতবাসীর চাহিদায় যদি রেনেসাঁস মডেলের উদারতাবাদে অনীহা এবং প্রত্যাখ্যান এসে থাকে, এবং আজকের যেনতেনপ্রকারেণ মুনাফা সুনিশ্চিত করা বাজার পুঁজি যদি সে রোষ প্রকাশের সুগম পথ তৈরি করেই রাখে, তাহলে সুচিন্তিতভাবে মধ্যযুগীয় পৌরুষের আদলে নিজেকে গড়ে তোলা এবং “সিনা ছাপ্পান ইঞ্চ কা হ্যায়” বলে হাঁক পাড়া পেশীবহুল মোদিজিই যে থালা বাটি বাজানোর নয়নের মণি হবেন তাতে আশ্চর্য হওয়ার কোনও অবকাশ থাকার কথা নয়। আজকের নব্য বিজেপির অভ্যন্তরে ঠিক এই ছাঁচের সাম্প্রতিক পপুলিজমের ছোঁয়াচটাই সবচাইতে বেশি। সংখ্যাগুরু, রেনেসাঁস বিদ্বেষী/বিরক্ত জনতা ঠিক যেভাবে দেখতে চায়, আজকের বিজেপি নেতারা নির্বাচনী মাঠে টিঁকে থাকার জন্য ঠিক সে আদলেই নিজেকে গড়ে নিতে বা তুলে ধরতে প্রস্তুত। উদাহরণ হিসেবে বঙ্গের রাজ্য নেতৃত্ব থেকে দিল্লিতে মোদিজি পর্যন্ত সকলের নামই আসতে পারে। কাজেই শ্রী দিলীপ ঘোষ মশাই যখন অমর্ত্য সেনকে নিয়ে শিক্ষিত শ্রবণে বিসদৃশ হাঁক পাড়েন, তখন আন্দাজ করতে কষ্ট হয় না যে ওনার টার্গেট ভোটার ঠিক করাই আছে যাদের গড়পড়তা মানসিকতার ছাঁচে তিনি নিজেকে নির্মাণ করে নিচ্ছেন। মোদিজির ম্যাজিকের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। এখানে জাদুকরের নিজস্ব কোনও মহিমা নেই। সূত্র মেনে কর্তার ইচ্ছায় হাততালি হয়নি বা হয় না। আসলে যিনি হাততালি দেবেন, পপুলিজমের চেনা রীতি মেনে তাঁর ইচ্ছে অনুযায়ী খেলাই জাদুকর দেখান। হাততালির আবহ তৈরি ছিল। থাকে। শুধু চটাপট পড়াটাই যা বাকি। দলীয় ভাবাদর্শের চাইতেও গুরুত্বপূর্ণ এখানে কর্পোরেটের ইচ্ছেয় ক্ষমতায় টিঁকে থাকা। আর সে আশীর্বাদ যতক্ষণ অটুট, ততক্ষণ সংখ্যাগুরুর রুচি অনুযায়ী আইকন নির্মাণ করে নেওয়াটাই নব্য জৌলুশ (গী দি’বোর্ড আলোচিত Spectacle) সংস্কৃতির দস্তুর।

পুঁজির আধুনিক খেলা সর্বদাই জৌলুশ নির্ভর। আজকের বিশ্ববাজার পুঁজি এযাবত দেখা বিশ্ব পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সবচাইতে ভয়ঙ্করতম রূপ বললে খুব অত্যুক্তি হবে বলে মনে হয় না। প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ, দুভাবেই মন থেকে মাথা বা সাধারণ চিন্তাভাবনা থেকে জীবনের দৈনন্দিন অভ্যেস সর্বত্র এই নব্য পুঁজিবাদী ধ্যানধারণার মায়াবী বিস্তার। এমনকি তথাকথিত বিপ্লবী চেতনাও বহুক্ষেত্রে স্টিরিওটাইপ হয়ে এই বাজারে কো-অপ্টেড বা অন্তর্লীন হয়ে যায়। এহেন শক্তিশালী বাজার পুঁজির কর্পোরেট নির্ধারিত আধিপত্য বিস্তারের অন্যতম সফল কৌশলই হল নিত্যনতুন জৌলুশ তৈরি করা। সাম্প্রতিক বিশ্ব রাজনীতির চালচিত্রে চোখ রাখলে দেখা যায় যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প থেকে আমাদের প্রধানমন্ত্রী মোদিজি পর্যন্ত সকলেই চোখধাঁধানো জৌলুশ নির্মাণে দড়। খুব বড়সড় ব্যাখ্যায় না গিয়েও বলা যায় যে আপোলোনিয়ান নয়, আমাদের সার্বিক ডায়ানোসিয়ান সত্তা এই চোখধাঁধানো জৌলুশের সহজ টার্গেট। চিন্তাচেতনাহীন প্রশ্ননিরপেক্ষ যে সামাজিক অভ্যেসের প্রথাবাহক হিসেবে আমাদের প্লেবিয়্যান কল্পনা প্রসারিত হয়, রূপ পায়, কর্পোরেট শাসিত বাজার পুঁজির জৌলুশ বা Spectacle ঠিক সেই নিয়ম মেনেই এবং সেই সাধারণ রুচির মন্দ ভালোকে মান্যতা দিয়েই নিজেকে নির্মাণ করে। অর্থাৎ স্থিতাবস্থার সম্পূর্ণ সহায়ক হিসেবে এই জাতীয় পপুলিজমের নির্মাণ; কখনওই তাকে বদলানো বা দিক পরিবর্তনের জন্য নয়।

প্রশ্ন হল, কোভিড-১৯ সংক্রমণের ভয়ের আবহে সাধারণভাবে জৌলুশবিরোধী কোনও নাগরিক কি ভেবেছিলেন যে সামান্য কিছু যুক্তির কথা বা উষ্মায় দেশব্যাপী বাসন বাজানো বা মোম জ্বালানো বন্ধ হবে! মনে হয় না। মোদিজির রাজনৈতিকভাবে নির্মিত সচেতন আইকনের সামাজিক কার্যকারণ আঁচ করেও সকলে জানতেন যে শ্রাব্য এবং দৃশ্য উৎসবগুলো হবে। ঠিক যেমন তাঁরা আঁচ করেইছিলেন যে এই সর্বমারির প্রাক্কালে আধুনিক বিজ্ঞানে মান্যতা না পাওয়া আয়ুষের দ্বারস্থ হওয়ার আহ্বান আসবে কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে, টিভি চ্যানেলে আয়ুর্বেদের উপকারিতা নিয়ে জমকালো আসর বসবে বা এই লেখা তৈরি হওয়ার সময় বেরুনো ইউজিসির বিজ্ঞপ্তিতে ছাত্রসমাজকে আয়ুষের মাধ্যমে ভালো থাকবার নিদান দেওয়া হবে। যুক্তিবোধে আস্থাবান হওয়ার ঔপনিবেশিক শিক্ষাপ্রসূত যে আলোকায়ন বহুদিন দেশের নির্ণায়ক নাগরিক সমাজে মান্যতা পেত, এই মুহূর্তের ভারতে সেই অভ্যেস এক বিরাট প্রতিবন্ধকতার সামনে দাঁড়িয়ে। প্রতিস্পর্ধী অভ্যেস হিসেবে উঠে আসছে অধিবিদ্যা আর অযুক্তি সম্বলিত এক অন্য ভারতীয় আচারবিচার, যাকে প্রশ্রয় দেওয়াটাই পপুলিস্ট রাজনীতির অন্যতম কৌশল এখন। নিয়তিও বটে। আর আইকন নির্মাণের রাজনীতিটাও সেখানেই বাঁধা।

প্রধানত ব্রাহ্মণ্যবাদী, পিতৃতান্ত্রিক এবং মনুবাদী অভ্যেসে বাঁধা পড়ে থাকা সামাজিক নির্মাণের প্রায় কার্নিভ্যালের মতো একটা উত্থান ঘটেছে মুক্ত বাজারের গ্লোবাল অর্থনীতিতে। এই উত্থানের রাজনৈতিক, আর্থ-সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক কারণ অনেক। কিন্তু পিতৃতান্ত্রিকতায় ভরপুর এই প্রাথমিক ভারতীয় অভ্যেসটাই আখেরে মোদিজির আপাত ক্যারিশম্যাটিক পৌরুষের “ইমেজ” তৈরি করেছে বললে বোধহয় বাড়িয়ে বলা হবে না। ইভেন্ট ম্যানেজার হিসেবে বাড়ির বড় কর্তাকে দেখবার ইচ্ছেটা আমাদের সমাজের যূথ নির্জ্ঞানে ভালোভাবেই গেড়ে বসা। অনেক দিন ধরে। সুপার ব্র‍্যাট নেতা দেখবার বহু পুরনো পিতৃতান্ত্রিক আকাঙ্খার কর্পোরেট রূপায়ন হল সযত্নে তৈরি করা আধুনিক জনমোহিনী রাজনৈতিক সংস্কৃতির ম্যাজিক্যাল আইকন। সেখানে ট্যাগ হিসেবে শুধু নেতা বা নেত্রীর নামটুকুই বদলে যায়। এতে দেশের চেতনা এগোয় না, কিন্তু দেশের স্থিতাবস্থাকে বজায় রেখে ক্ষমতায় টিঁকে থাকা যায়। অন্তত বাজারের স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রাখার কারণে তো বটেই। অন্যদিকে বাজারও ক্ষমতাসীনের স্বার্থ দেখে। মিডিয়ায় ম্যজিকের গুণগান চলে। নির্মিত আইকনকে স্বকীয় অবতারে রূপান্তর করার মোহনীয় প্রচার চলে সর্বত্র।

ভারতীয় রাজনীতির সাম্প্রতিক প্রেক্ষিতে মোদিজির এই সুপরিকল্পিত আইকন নির্মাণের নির্দিষ্ট ইতিহাস ও অভিমুখ আছে। গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন তিনি একটি রাজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলেন, যেখানে কংগ্রেস প্রধান বিরোধী হিসেবে ছিল ক্রম-অপসৃয়মান। যখন প্রধানমন্ত্রী হলেন, ভারতীয় রাজনীতিতে ততদিনে এক বড়সড় প্যারাডাইম শিফট হয়ে গেছে। বিশ্ববাজার চেপে বসেছে। কর্পোরেট পুঁজির চাপে ছোট দেশীয় বাজারের নাভিশ্বাস শ্রী মনমোহন সিংহের সময়েই সম্পন্ন। যতটুকু আড় ছিল, মোদিজি ক্ষমতায় আসার পর তার পুরোটাই কেটে গেছে। ছোট দেশীয় বাজারের প্রায় সর্বার্থেই পতন হয়েছে। মুনাফা এবং ছাড় দুইই একতরফাভাবে পেয়েছে এবং পেয়ে চলেছে বহুজাতিক সংস্থা বা অতিবড় পুঁজিপতিরা। এই সর্বগ্রাসী বিশ্ববাজার পুঁজি ততদিনে ভারতীয় রাজনীতির সর্বোচ্চ নির্ধারকও হয়ে উঠেছে বটে। উত্তরোত্তর বৃদ্ধি অক্ষুণ্ণ রাখতে তাদের শুধু একটা ক্ষমতাসীন মুখের প্রয়োজন ছিল, কোম্প্যানি ট্যাগের মতো, যা সামনে ঝুলিয়ে গোটা অর্থনীতির রাশ তারা হাতে নিতে পারে।

কংগ্রেস দলের যা হাল, তাতে করে সে মুখ সরবরাহ করা তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। উচ্চশিক্ষিত রুচিশীলতার যে রেনেসাঁস মডেলে তাদের নেতৃত্ব এখনও আস্থাশীল, শ্রী রাহুল গান্ধির আদবকায়দায় যা সুস্পষ্ট, দরকষাকষির পাল্লায় নতুন করে উত্থান হওয়া অনুদার মনুবাদী সমাজ তাকে চিহ্নিত করেছে পশ্চিমী আধুনিক, সেক্যুলার এবং উদারতাবাদী বলে। আর ভারতীয় প্রেক্ষিতে সংখ্যাগুরুর মনুবাদী পিতৃতান্ত্রিক ভাবনাকে বহন করে যে নব্য নির্বাচকের উত্থান হয়েছে, তাদের নিরিখে পশ্চিমী আধুনিক, সেক্যুলার এবং উদারতাবাদী হওয়াটা রীতিমতো অ-পুরুষালি, কাজেই এফিমিনেট বলে দেগে দেওয়া, সুতরাং পরিত্যাজ্য। তার ওপর আছে জওহরলাল নেহরুর মোটের ওপর সমাজতান্ত্রিক চিন্তাচেতনার লেগেসি। যে চেতনা বাজার পুঁজির একান্ত না-পসন্দ। ফলত, পুরুষসিংহ হিসেবে মোদিজির আবাহন।

কিন্তু সেখানেও একটা ছোট অন্তরায় ছিল। সেটা তাঁর দল, বিজেপি নিজে। এর আগে বিজেপির ভাবাদর্শগত একটা নিজস্ব কাঠামো ছিল, যেখানে দল সর্বদা ব্যক্তির চাইতে বড় বলে গণ্য। বিজেপির পুরনো প্রজন্ম সেভাবে ভাবতে এবং চলতেই অভ্যস্ত ছিলেন। ব্যক্তিমাহাত্ম্য সেখানে একেবারেই অচল। কিন্তু লক্ষ করবার মতো বিষয়, মোদিজির নব্য বিজেপির চলনবলন হালহকিকৎ পুরনো দলটার ভাবাদর্শগত চলন থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। শ্রী অটলবিহারী বাজপেয়ির ঘরানাতেও তাদের নেহরু-নীতির বিরোধিতা ছিল, কিন্তু ভিশনারি এবং শিক্ষিত নেহরুর ইমেজ বা আইকনের বিরোধিতা ছিল না। নেহরুর সেক্যুলারিজম সেখানে কোনও ইস্যু হয়ে ওঠেনি কোনওদিন। কিন্তু কর্পোরেট বান্ধব মোদিজির জমানায় সেই দলীয় ভাবাদর্শ আশ্রিত বিজেপির খোলনলচে অনেকটাই বদলে গেছে। পুরনো নেতারা, শ্রী লালকৃষ্ণ আডবানি বা তাঁর মতাদর্শপ্রাণিত সকলে অবধারিতভাবে পেছনের সারিতে চলে গেছেন। পুরনো প্রজন্ম এবং মূল্যবোধের শেষ সলতে হিসেবে টিঁকে যাওয়া শ্রীমতী সুষমা স্বরাজও যে কদিন ছিলেন, মোদি-শাহ অধ্যুষিত নব্য বিজেপির রাজনৈতিক পরিসরে নিষ্প্রভই ছিলেন। গত দশ বছরে কর্পোরেটের পরিকল্পনা অনুযায়ী মোদিজির সরকার ক্রমাগত চেষ্টা করেছে নেহরুর লার্জার দ্যান লাইফ ইমেজকে প্রথমে প্রশ্ন করে, তারপর চূর্ণ করে, তারপর মুছে দিয়ে এবং শেষে অন্য কোনও আইকন দিয়ে যুতসইভাবে প্রতিস্থাপিত করতে। যাতে করে ন্যূনতম সেক্যুলার এবং সমাজতান্ত্রিক কোনও Spectre বা ভূত তাদের কর্পোরেট বিজয়ের পথে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকতে না পারে। এখানে মনে রাখা দরকার, বৃহত্তর ভারতবর্ষ তার সামাজিক রাজনীতিতে এখনও দক্ষিণপন্থী। ভারতের নব্বই শতাংশ গোষ্ঠী বা সমাজচেতনায় ধর্মীয় সংস্কৃতি যারপরনাই প্রবল। তুলনায় সেখানে বামপন্থী সেক্যুলারিজমের ছিঁটেফোঁটাও নেই। কাজেই সেই আমূল ভারতীয় সাংস্কৃতিক পরিসরে একটি কর্পোরেট দোসর উগ্র দক্ষিণপন্থী দল হিসেবে নব্য বিজেপির একমাত্র মাথাব্যথার কারণই ছিল নেহরুর ভাবধারা অধ্যুষিত কংগ্রেসি মতবাদ। যে মতের সার্বিক Erasure তাদের শুধু কাঙ্ক্ষিতই ছিল এমনটা নয়, প্রয়োজনও ছিল।

সেই লক্ষ্যে, আইকন হিসেবে প্রথমে আনা হল বল্লভভাই প্যাটেল কে। মুর্তি হল। ইউজিসির নির্দেশে অ্যাকাডেমিক প্রচারও হল। লৌহমানব নামের অছিলায় নিশ্চিত “পুরুষ” মহিমার প্রচার। কিন্তু চিঁড়ে ভিজল না। বাজারের চাহিদা মেনেই কর্পোরেট পুঁজির দরকার ছিল এমন এক আইকন যা মুখ হিসেবে দৈনন্দিনতায় ভেসে থাকবে, ইতিহাসের ভারবাহী হবে না। কারণ বাজারের লাভের সূত্র সবসময়ই বর্তমানের চাহিদা মেনে চলে, ইতিহাস ঘেঁটে নয়। কাজেই গোলওয়ালকর, সাভারকর এমনকি নাথুরাম গডসে পর্যন্ত চেষ্টা করা হল। কিন্তু, চালানো গেল না। অগত্যা মধুসূদন এমন এক জীবিত মুখ, যিনি ভোটে জিতবেন, কর্পোরেট পুঁজির সমস্ত শর্ত বিনা প্রশ্নে মেনে চলবেন, সুবিধে দেবেন, দেশীয় পুঁজির বিলগ্নিকরণ করবেন। যাঁর মধ্যে নেহরুর বিপরীত এক সম্পূর্ণ পিতৃতান্ত্রিক এবং মনুবাদী পুরুষকে খুঁজে পাবে দেশ। কেননা, যত আর্থিক দিশা বা নিশ্চয়তা হারিয়েছে দেশ ততই সে তার দৈনন্দিন আচার থেকে আচরণে বা কল্পনায় মনু আর ব্রাহ্মণ্যবাদ appropriate করে নিয়েছে। খুঁজেছে এমন এক “পুরুষ”, যে আশি শতাংশের জাতিবিদ্বেষ বা ইসলামোফোবিয়া বা পিতৃতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতিভূ হয়ে দেখা দেবে। নিশ্চিহ্ন করবে নেহরুর তার্কিক এবং সেক্যুলার অবস্থান। নিশ্চিত করবে লিঙ্গ রাজনীতির ভ্রান্ত পৌরুষ, যেখানে শান্তি নয়, যুদ্ধ বা যুদ্ধের বিক্রম অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য।

আসলে কর্পোরেট রাজনীতির বিপুল চাপে হেরে যাওয়া একটা দেশ প্রাণপণে একটা খড়কুটো চাইছিল বা চাইছে, যা আঁকড়ে সে তার শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চাকরি, ব্যবসা সবকিছুতে হেরে যাওয়া ভুলে থাকতে পারে। প্রশ্রয় পায় উৎসব জাতীয় উদযাপনের জৌলুশ-নির্ভরতায়। আমাদের যূথ নির্জ্ঞানে এই ডিফেন্স মেকানিজম লেখা আছে। এই মেকানিজম আমাদের মনে যে টক্সিক আইকনের আকাঙ্খা নির্মাণ করে, সেই জনপ্রিয় আইকন হিসেবে কর্পোরেট মিডিয়া, বিশ্ববাজার আর পুঁজি গড়ে তুলছে সুপরিকল্পিত ব্যক্তি-ম্যজিকের উপাখ্যান। এই নির্মাণের পরিপুষ্টিতেই মোদিজির পপুলিজম। আবার এখানেই বিজেপি দলের দলীয় চরিত্রের সার্বিক আত্মহত্যাও বটে। যে দলে ভাবাদর্শ ব্যক্তির চাইতে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল, সে দলেই ব্যক্তি হিসেবে মোদিজিকে করে তোলা হল দলের চাইতে বড়। উনি আগামীকাল থালা বাটি না মোম, কী ঘোষণা করবেন, তা দলও জানে না। অপেক্ষায় বিভ্রান্ত থাকে। ঘোষণাকে মান্যতা দিতে প্রাণপণে ঘোষণা পরবর্তী আরও বিভ্রান্ত যুক্তি সাজায়। অর্থাৎ, আইকন হিসেবে ব্যক্তি মোদিজির দলের চাইতে বড় হয়ে ওঠা আদতে কোনও মহিমার ফসল নয়। নেহাতই কর্পোরেট পুঁজির বাজার বাঁচানোর জন্য পরিকল্পিত ইমেজ ম্যানেজমেন্ট। যে ইমেজ কোনও এক সেক্যুলার এবং সমাজতান্ত্রিক আদর্শের ঐতিহাসিক ভূতকে ভারতীয় প্রেক্ষিতে যুঝে নেওয়ার জন্য কর্পোরেট দোসর নব্য বিজেপির এ মুহূর্তে বড়ই প্রয়োজন।

 

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4718 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...