সর্বজনীন গণবণ্টন ব্যবস্থার বিকল্প নেই

প্রতীপ নাগ

 





লেখক ট্রেড ইউনিয়নিস্ট ও রাজনৈতিক কর্মী

 

 

 

২৩ মার্চ, রাত আটটায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঘোষণা করেছিলেন ২৪ মার্চ করোনা ভাইরাস সংক্রমণজনিত কারণে দেশ জুড়ে লকডাউন শুরু হবে। ভারতের মত দেশে মাত্র চার ঘণ্টার নোটিসে লকডাউন ঘোষিত হওয়ার ফলে দেশের শ্রমশক্তির ৯৩ শতাংশ অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকরা বিশেষত পরিযায়ী ও দিন আনা দিন খাওয়া শ্রমিকরা চরম বিপদে পড়ে যান। মাসের একেবারে শেষে তাঁদের হাতে টাকার স্বল্পতা আর অন্যদিকে লকডাউনের আতঙ্কে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য মজুতের হিড়িকে বাজার অগ্নিমূল্য হয়ে ওঠে।

২৬ মার্চ, ২০২০ পশ্চিমবাংলা সরকার এক নোটিফিকেশনের[1] মাধ্যমে জানায় যে আগামী ছয় মাসের জন্য ৭.৮৮ কোটি AAY (অন্তোদয় অন্নপূর্ণা যোজনা), SPHH (অগ্রাধিকার ভুক্ত পরিবার), PHH (বিশেষ পরিবার), RKSY (রাজ্য খাদ্য সুরক্ষা যোজনা) রেশন কার্ড যাদের আছে তাদের চাল ও গম/আটা বিনামূল্যে দেওয়া হবে।

সরকারি বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী প্রতি মাসে কারা কতটা পাবে দেখে নেওয়া যাক।

  • AAY-এর ক্ষেত্রে পরিবার পিছু বিনামূল্যে ১৫ কেজি চাল, ২০ কেজি গম বা ১৯ কেজি আটা।
  • PPH ও SPHH এর ক্ষেত্রে প্রতি কার্ড পিছু বিনামূল্যে ২ কেজি চাল ও ৩ কেজি গম বা ২.৮৫০ কেজি আটা পাবে।
  • RKSY-I এর ক্ষেত্রে বিনামূল্যে প্রতি কার্ড পিছু ২ কেজি চাল ও ৩ কেজি গম পাবে।
  • RKSY-II এর ক্ষেত্রে প্রতি কার্ড পিছু ১ কেজি চাল ১৩ টাকা দরে ও ১ কেজি গম ৯ টাকা দরে পাবে।

সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী বরাদ্দ যদি সবাই পায়, তবে লকডাউন চলাকালীন খাদ্যের অভাবের বেশ কিছুটা সুরাহা হত। কিন্তু সমস্যা অন্য জায়গায়।

কলকাতাকে কেন্দ্র করে উত্তর ও দক্ষিণ শহতলি ও গঙ্গার পশ্চিম পারের শিল্পাঞ্চলের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বিপুল সংখ্যক শ্রমজীবী মানুষেরা— বিশেষত গৃহ পরিচারিকা, ভ্যান-রিক্সা চালক, মুটে মজদুর, হকার, নির্মাণ মজদুর— রাজ্যের বিভিন্ন জেলা ও বাইরের রাজ্য থেকে আগত। চার ঘণ্টার নোটিসে লকডাউন ঘোষণা হওয়ার ফলে তাঁরা গ্রামে ফিরে যেতে পারেননি। এঁদের অধিকাংশেরই রেশন কার্ড গ্রামে। এই বিপুল শ্রমজীবী মানুষের অবস্থা শোচনীয়।

আরও দুটি বিষয়ের উল্লেখ করা প্রয়োজন। এক, বহু মানুষ আছেন যাঁদের পুরনো সাদা রেশন কার্ড এখনও ডিজিটাল কার্ডে পরিবর্তিত হয়নি। দুই, বহুসংখ্যক মানুষ AAY, PPH, SPHH, RKSY-I এর অন্তর্ভুক্ত হওয়ার যোগ্য হলেও, দুর্নীতি আর স্বজনপোষণের কারণে তাঁরা অন্তর্ভুক্ত হতে পারেননি।

ফলে, সমস্যা আরও বেড়েছে। পরিযায়ী শ্রমিকদের অবস্থা তথৈবচ। মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেছিলেন যাঁদের কার্ডের সমস্যা আছে সবাই রেশন পাবেন ফুড কুপনের মাধ্যমে। সরকারি বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী দেখা যাচ্ছে, যাঁরা ডিজিটাল কার্ডের জন্য আবেদন করেছেন ও যাঁদের আবেদন গৃহীত হয়েছে, অথচ, যাঁরা হাতে ডিজিটাল কার্ড পাননি, তারাই ফুড কুপন পাবেন। অর্থাৎ, সমস্যা থেকেই গেল। ঘোষণার পর প্রায় এক মাস অতিক্রান্ত হয়ে গেলেও বহু এলাকায় ফুড কুপন যায়নি। সরকারি ব্যবস্থায় ফুড কুপন বণ্টন হওয়ার কথা বলা হলেও তা বণ্টিত হচ্ছে অনেক ক্ষেত্রেই শাসক দলের বদ্যানতায়। ফলে, বাড়ছে দুর্নীতি আর স্বজনপোষণ। অনেক জায়গায় রেশনের দ্রব্য বিলিবণ্টন হচ্ছে শাসক দলের ছাপ মেরে ত্রাণ হিসেবে। তাছাড়া অনেক জায়গায় রেশন ডিলাররা প্রাপ্যের থেকে কম দিচ্ছে বলে অভিযোগ।

বহু স্থানে স্থানীয় পঞ্চায়েত সদস্য বা কাউন্সিলারের উদ্যোগে চাল, ডাল দেওয়া হচ্ছে। অভিযোগ তা ধারাবাহিক নয়। বহু ক্ষেত্রেই সেসব জিনিস অত্যন্ত নিম্নমানের, যা অখাদ্য। এমনকি, কিছু জায়গায় মানুষ এই অখাদ্য চাল, ডাল ফিরিয়েও দিয়েছেন।

আসুন এক সমীক্ষার দিকে নজর দেওয়া যাক। ‘আমরা এক সচেতন প্রয়াস’ এক স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান ভাটপাড়া পৌরসভার ৮ নং ওয়ার্ডের জুট মিল শ্রমিকদের বস্তিতে (দরবা লাইন, ৪ নং লাইন, ৬ নং লাইন) সমীক্ষা করে। প্রসঙ্গত, এই অঞ্চলটি ২০১৯ সালের সাধারণ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দাঙ্গাবিধ্বস্ত। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও ছিল যথেষ্ট। ঐ সংগঠনটি এলাকার ৯২৭টি পরিবারের মধ্যে সমীক্ষা চালায়। সমীক্ষায় জানা গেছে, গত ২১ দিনে স্থানীয় কাউন্সিলারের উদ্যোগে মাত্র দুবার তাঁরা চাল, ডাল, আলু পেয়েছেন। এই অঞ্চলের জুট শ্রমিকদের অনেকেরই রেশন কার্ড নেই বা দাঙ্গার সময়ে নষ্ট হয়ে গেছে। ফুড কুপন পাওয়ার কথা থাকলেও তা পাওয়া যায়নি। নতুন ডিজিটাল রেশন কার্ড নেই, তাই ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে দোকান থেকে। এক বড় অংশের জুট ও অন্যান্য শ্রমিকরা এখনও RKSY কার্ড পাননি। মরার উপর খাঁড়ার ঘা। সরকারি নিয়ম নীতি মেনে জুট মিল বন্ধ করা হয়েছে। কিন্তু কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের বিজ্ঞপ্তি মেনে লকডাউনের সময়কালে জুট শ্রমিকদের মজুরি দেওয়া হচ্ছে না। মালিকরা মিল গেটে নোটিস দিয়েছে, ‘No Work, No Pay’। অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের এই বসতিগুলির শ্রমিকদের কাছে সাবান বা ডিটারজেন্ট ব্যবহার বাতুলতা মাত্র। কোনমতে বেঁচে আছেন তাঁরা গণসংগঠন আর স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের ভরসায়।

১৮ এপ্রিল মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং বলেছেন, রাজ্যে ১০ শতাংশ মানুষ রেশন থেকে বঞ্চিত। খাদ্য সচিবকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। সংবাদে প্রকাশ খাদ্যমন্ত্রীকেও এই বিষয় নিয়ে সতর্ক ও তিরস্কার করা হয়েছে।

রেশনে দেওয়া হচ্ছে চাল আর গম। মানুষের পুষ্টির জন্য চাই সুষম খাদ্য। কিন্তু বাকি খাদ্যদ্রব্য কিনতে হচ্ছে বাজার থেকে। অনেকেই তা কিনতে অপারগ।  অতিমারির সঙ্গে সঙ্গে বাড়বে অপুষ্টিতে ভোগা মানুষের সংখ্যা। যদি, কেরল বিনামূল্যে ১৭টি দ্রব্য রেশন মারফত দিতে পারে, আমরা পারি না কেন?

আসলে প্রথমে APL, BPL-এ ভাগ করা হয়। তারপরে বহুরকমের বিভাগ তৈরি করে জটিলতার সৃষ্টি করা হয়েছে। একসময়ে রাজ্যের দেওয়ালে দেওয়ালে লেখা হত ‘সকলকে গণবন্টন ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত করতে হবে’ ও ‘১৪টি নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য সরকারকে একই দামে সরবরাহ করতে হবে’। ১৯৯০ দশকের নয়া উদারবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার হাত ধরে সার্বজনীন গণবন্টন ব্যবস্থা প্রায় তুলে দেওয়া হয়েছে। আজ এই অতিমারি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে গেল সর্বজনীন গণবণ্টন ব্যবস্থার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা।


[1] Memo No. 1205-FS/Sectt./Food/14 R-01/2013 (Pt.III)

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3090 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...