দিশি-বিলিতি ভূতেদের উৎসব

নবনীতা সেন

 

লেখক প্রাবন্ধিক, গল্পকার

 

 

 

 

এক ছিল পাঁড় মাতাল। নাম তার জ্যাক। সে বহুদিন আগেকার কথা। থাকত সে আয়ারল্যান্ডে। ঈশ্বর মৃত্যুদূত পাঠালেন তাকে স্বর্গে নিয়ে যেতে। বেহেড অবস্থায় জ্যাক দূতকে বলল, একটু শুঁড়িখানায় ঘুরে আসা যাক। সেথায় খানাপিনা শেষে দেখা গেল জ্যাকের পকেটে নেই কানাকড়ি। জ্যাকের অনুরোধে দূত নিজেকে রূপার টাকায় বদলে ফেলল, ওমনি তাকে পকেটস্থ করল জ্যাক। সে যাত্রায় তাকে আর স্বর্গে যেতে হল না। পরের বছর দূত আবার এল জ্যাকের কাছে। এবারে সে বলল, খালি পেটে কি জাহান্নামে যাওয়া যায়! নেহাতই সিধেসাধা দূতটি রাজি হলে জ্যাক চড়ে বসল আপেল গাছে। সে গাছে ঝোলানো ছিল যিশুখ্রিস্টের ক্রস। আবারও গোলকধাঁধায় পড়ে পাকাপাকি বন্দোবস্ত হল যে সামনের দশ বছর জ্যাকের স্বর্গযাত্রা স্থগিত থাকবে। কথামত দশ বছর পর দূত জ্যাককে নিয়ে সেন্ট পিটারের দরজাতে পৌছতেই ঈশ্বর বললেন এই ধুরন্ধর জ্যাককে তিনি স্বর্গে রাখবেন না। নরকের দেবতাও তাকে সেথায় স্থান দিতে নারাজ হল। অতএব ‘ফায়ার অফ ডেভিল’ থেকে জ্বলন্ত আগুন ফাঁপা ওলকপির মধ্যে পুরে লন্ঠন দোলাতে দোলাতে জ্যাক ধরাধামে ফিরে এল।

‘স্টিঙ্গি জ্যাক’ নামে এই আইরিশ লোককথার সঙ্গে জার্মান কিংবদন্তি ফাউস্টের আংশিক মিল রয়েছে। তবে ফাউস্টের কাহিনির সমাপতন মহাকাব্যিক, আর জ্যাকের কাহিনি প্রভাবিত করেছে পশ্চিমী দুনিয়ার সবথেকে জনপ্রিয় ভূতেদের উৎসবকে। হ্যালোইন। এই উৎসবের একটি বিশেষ প্রতীক হল ‘জ্যাকো লানটার্ন’ বা এই স্টিঙ্গি জ্যাকের ওলকপি দিয়ে তৈরি লণ্ঠন। যা পরে কুমড়োয় পর্যবসিত হয়।

হ্যালোইন উৎসবের প্রাথমিক উৎসে আছে আয়ারল্যান্ডের কেলটিক জাতির শস্য উৎসব ‘সাওয়েন’ (Samhain)। প্রায় দু হাজার বছর আগে ইউরোপের উত্তরাংশ জুড়ে বাস করত এই জাতি। কেলটিক ক্যালেন্ডারে বছরের দুটি ভাগ, আলোক এবং অন্ধকার। আলোক অংশের শেষদিন, ৩১শে অক্টোবর এই উৎসবটি হত। এটি ছিল ফসল ঘরে তোলার শেষদিন। পরদিনই কেলটিক নতুন বছর এবং শীতের অন্ধকার মরশুমের সূচনা। এরা মনে করত পুরনো এবং নতুন বছরের সন্ধিক্ষণে এই বিশেষ দিনে ইহ ও পরলোকের মাঝের সীমারেখা সঙ্কীর্ণ হয়ে আসে তাই মৃতেরা  ফিরে আসে পৃথিবীতে। এই বিদেহী আত্মাদের দূরে রাখতে বনফায়ার বা আগুন জ্বালানো হত, পূর্বপুরুষদের উৎসর্গ করে পশু বলিদান হত। বাচ্চারা পশুর চামড়া, লোম দিয়ে তৈরি পোষাকে ভূত সেজে একে অপরকে চমকে দেবার রীতি ছিল। রোমানরা ইউরোপের বিস্তীর্ণ দখল করার পর খ্রিস্টান ধর্মের প্রসারের জন্য সুকৌশলে স্থানীয় পেগ্যান ধর্মের মূল উৎসবগুলিকে খ্রিস্টধর্মে রূপান্তরিত করতে থাকে। সপ্তম শতাব্দীতে পোপ গ্রগরি দ্য থার্ড নভেম্বরের পয়লা তারিখে মৃত খ্রিস্টান সন্তদের উদ্দেশ্যে ‘অল সেন্টস ডে’ বা ‘হ্যালোমাস’ প্রবর্তন করেন। ‘হ্যালো’ (Hallow) শব্দের অর্থ পবিত্র। এর আগেরদিন সাওয়েন উৎসবকে বলা হতে লাগল ‘অল হ্যালোস এভিনিং’। যা পরে সঙ্কুচিত হয়ে দাঁড়াল হ্যালোইনে। এভাবে সাওয়েন শস্য উৎসব পরিবর্তিত হল খ্রিস্টান হ্যালোইনে।

আয়ারল্যান্ডে ১৮৪৫-৪৯এ আলুর মড়কের সময় বহু আইরিশ পরিবার আমেরিকায় নতুন বসতি স্থাপন করে এবং তাদের হাত ধরে হ্যালোইন এসে পৌঁছায় মার্কিন দেশে। মধ্যযুগ থেকেই  ইউরোপে হেমন্তকালে প্রচুর পরিমাণে ওলকপি, আপেল উৎপন্ন হত, যার গায়ে নকশা কেটে, ভেতরে মোম পুরে বাচ্চারা আলো জ্বালাত হ্যালোইনে। আমেরিকার হেমন্তকালীন ফসল কুমড়ো। আয়তনে বড় হওয়ায় এতে নকশা কেটে ভূতুড়ে চোখ-মুখ আঁকার বিশেষ সুবিধা। তাই বিংশ শতকের শুরু থেকে ‘স্টিঙ্গি জ্যাকে’র জ্যাকো ল্যানটার্নে ওলকপির পরিবর্তে কুমড়ো দিয়ে তৈরি লন্ঠন হ্যালোইনের সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রতীক হয়ে উঠল। অক্টোবর মাস জুড়ে আমেরিকায় সমস্ত বাড়ির দরজায় দেখা মিলবে বিভিন্ন নকশাকাটা এবং ভিতরে আলো দিয়ে সাজানো কুমড়োর। সঙ্গে প্রতিটি বাড়ির বর্হিসজ্জায় থাকে ঝুলন্ত কঙ্কাল, মাকড়শার জাল, ভূতুড়ে অবয়ব। ৩১শে অক্টোবর বাচ্চারা ফাঁপা কুমড়ো হাতে ভূত সেজে ’ট্রিক অর ট্রিট’ বলে পাড়াপড়শিদের থেকে চকলেট সংগ্রহ করে। এই ঐতিহ্য রয়েছে দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলিতেও।

কাছাকাছি সময়ে পৃথিবীর অন্য গোলার্ধে, আমাদের বাংলায় দেখা মেলে আকাশপ্রদীপের। জলবিষুব সংক্রান্তি থেকে ষড়শীতি সংক্রান্তি অর্থ্যাৎ সমগ্র কার্তিক মাস জুড়ে বাড়ির ছাদে বাঁশের মাথায় ঘি বা তেলের প্রদীপ দেওয়া হয়। কার্তিক মাস বিষ্ণুভক্তদের কাছে দামোদর মাস হিসেবে পবিত্র। এইমাসে বিষ্ণুর প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করে বিষ্ণুস্তব সহ আকাশপ্রদীপ জ্বালানো হয়। সঙ্গে পিতৃলোক, প্রেতলোকের পূর্বপুরুষরাও যাতে পথ চিনে আশীর্বাদ করতে মর্ত্যে আসতে পারে সেইজন্য এই প্রদীপের ব্যবস্থা। বছরের কৃষ্ণতম কার্তিক মাসের দীপান্বিতা অমাবস্যা তিথিতে হয় কালীপূজা। তার আগের দিন ভূত চর্তুদশী। এই উপলক্ষে পুকুরে তক্তায় প্রদীপ ভাসানো, বাড়ির অন্ধকারাচ্ছন্ন কোণে চৌদ্দটি প্রদীপ জ্বালাবার রীতি আছে। প্রদীপগুলিকে বলা হয় যমপ্রদীপ। যম এবং তার সাঙ্গপাঙ্গদের দূরে রাখার জন্য এ ব্যবস্থা। এই চর্তুদর্শীকে আবার নরক চতুর্দশীও বলে এবং শিবভক্ত নরকাসুর বলি এইদিন তার ভূতপ্রেত অনুচরসমেত মর্ত্যে নেমে আসেন। তাই তাদের তাড়াতে চৌদ্দ প্রদীপের ব্যবস্থা। কখনও বলা হয় চৌদ্দপুরুষের জন্য উৎসর্গীকৃত বলে প্রদীপের সংখ্যাটি চৌদ্দ। আবার ঊর্দ্ধলোক অর্থ্যাৎ ভূ, ভূবর, স্ব, মহ, জন, তপ, সত্য এবং অধঃলোক অর্থ্যাৎ অতল, বিতল, সুতল, তলাতল, মহাতল, রসাতল, পাতাল ইত্যাদি চৌদ্দ লোকের সমস্ত বাসিন্দাদের উদ্দেশ্যে চৌদ্দটি প্রদীপদান। এমন নানান পুরাণকথা এবং পুরাণ বর্হিভূত লোককথা জড়িয়ে আছে ভূতচর্তুদর্শীর সঙ্গে। আর অবশ্যই ঘনঘোর তমসা এবং পরলৌকিক মায়াময় ভয়ের জগৎ।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ভূতদের বিবিধ উৎসব পালিত হয়। দোসরা নভেম্বর সমস্ত মৃতদের স্মৃতির উদ্দেশ্য খ্রিস্টানদের একটি উৎসব ‘অল সোলস ডে’। মধ্যযুগীয় ইউরোপে এইদিনের বিশেষ রীতি ছিল ‘সোলিং’। পারগেটরি বা প্রেতলোকে যে সমস্ত আত্মারা আটকে পড়েছে, তাদের সদগতির জন্য দরিদ্র, শিশুরা প্রার্থনা করত এবং পরিবর্তে প্রতি বাড়ি থেকে সোল কেক (ড্রাই ফ্রুটস দিয়ে তৈরি কেক) পেত। এই হল ‘সোলিং’। অস্ট্রিয়া, হাঙ্গেরি, ফ্রান্স, ইটালিসহ ইউরোপে এখনো এইদিনে কখনো খাদ্য, পানীয় দিয়ে সাজানো টেবিল উৎসর্গ করা হয় পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে, কখনও উৎসর্গ করা হয় পরিপাটি বিছানা। আবার সমাধিক্ষেত্রে সপরিবারে পিকনিক করার রেওয়াজও আছে। মেক্সিকোতে নভেম্বরের পয়লা এবং দোসরা তারিখে হয় ‘ডায়া ডে লোস মুয়েরতোস’ বা ডেডস ডে। ক্যাথলিক চার্চ প্রণীত হলেও এই উৎসবের শিকড় রয়েছে সহস্র প্রাচীন আজটেক সভ্যতায়। চিনি দিয়ে কঙ্কালের খুলি বানিয়ে তা সাজানো হয়, পূর্বপুরুষদের খাবার, ফুল দেওয়া হয় এবং বিচিত্র ভূতুড়ে পোষাকের বর্ণাঢ্য মিছিল নামে রাস্তায়। চীনে সৌরপঞ্জিকার সপ্তম মাসের পনেরতম দিনে হয় ‘ইউলান’ বা হাঙ্গরি ঘোস্ট ফেস্টিভ্যাল। ফাঁকা আসনে পাত পেড়ে পূর্বপুরুষদের খাওয়ানো হয়, জ্বালানো হয় কাগজের লন্ঠন, কাগজ দিয়ে তৈরি ভূত-পুতুল পোড়ানো হয়। প্রায় একইসময়ে জাপানে পালিত হয় ‘ওবন’। পূর্বপুরুষদের আত্মা যাতে ফিরে আসতে পারে তাই জাপানিরা সমাধিক্ষেত্র পরিষ্কার করে, ‘ওকুরিবি’ নামে আগুন জ্বালায়, চলে নাচগানের উৎসব। মমিদের দেশ মিশরেও মৃতদের উৎসব ‘ওয়াগ’ হয় আগস্ট মাসে। মৃত্যুর দেবতা ওসিরিসের উদ্দেশ্যে জলে ভাসানো হয় নৌকা।

এইসব উৎসবগুলির বহিরঙ্গে যেমন মিল আছে তেমন অভ্যন্তরে রয়েছে মৌলিক ঐক্য। মানবজাতি আদিমকাল থেকেই অনুমান করেছিল নানান নৈসর্গিক ঘটনার পেছনে রয়েছে অতিপ্রাকৃত দুর্লঙ্ঘ্য শক্তি। এই শক্তিকে সন্তুষ্ট করে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা যেমন লৌকিক ধর্মের প্রাথমিক উৎস তেমনি এই শক্তির প্রতি ভয় থেকে ভূতপ্রেতের কল্পনা। নৃবিজ্ঞানের অ্যানিমিজমের ধারণায় বলা হয়, প্রাচীনকাল থেকে মানুষের বিশ্বাস আত্মা অমর এবং মৃত্যুর পর মৃত মানুষের আত্মা পরিণত হয় ভূতে। সেইজন্য অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সমস্ত ধর্মের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই ভূতরূপী পূর্বপুরুষরা যাতে অনিষ্ট না করে তাই এদের সন্তুষ্ট রাখতে এবং তাদের প্রজ্ঞা, শক্তি, আশীর্বাদ বহমান রাখার চেষ্টা থেকে বিচিত্র সংস্কারের উদ্ভব। তারমধ্যে একটি এই ভূতেদের উৎসব। দেশ, জাতি, সংস্কৃতি নির্বিশেষে ভূতেদের উৎসবের সাযুজ্য এই কথাই প্রমাণ করে। আরেকটি বিষয় এখানে উল্লেখযোগ্য তা হল প্রাচীন সময়ের কৃষিভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থার অনিশ্চয়তা। উপরিউক্ত সমস্ত উৎসবই সংঘটিত হয় দক্ষিণায়নে। অর্থ্যাৎ, ফসল তোলা হয়ে গেছে, দিনের পরিধি কমছে, এরপরেই শীতের রুক্ষ সময় আসন্ন। বিশেষ করে ইউরোপ, আমেরিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে শীতকাল প্রায় ফসলহীন থাকে, যা মৃত্যুরই নামান্তর। পরবর্তী মরশুমে ফলনের আকাঙ্খা এবং অনিশ্চয়তা থেকেও অতিপ্রাকৃত শক্তিকে তুষ্ট রাখা, পিতৃপুরুষদের স্মরণ এই উৎসবগুলির আর একটি কারণ। সবশেষে বলা যায়, ভূত এবং ভৌতিক সংস্কার সামগ্রিকভাবে পৃথিবীর সমস্ত জনজাতির সামাজিক, সাংস্কৃতিক বিবর্তনের একটি বিশিষ্ট নিয়ামক। এইসমস্ত প্রাগৈতিহাসিক প্রপিতামহরা ভূতরূপে আমাদের ঐতিহ্যে, বিশ্বাসে, গল্পকথায়, উদযাপনে আজও সজীব এবং সমকালীন হয়ে আছে।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3165 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...