করোনা আর বায়ুদূষণের নিউ নর্মালে হ্রাস পাবে মানুষের জীবনকাল

করোনা আর বায়ুদূষণের নিউ নর্মালে হ্রাস পাবে মানুষের জীবনকাল -- অনাবিল সেনগুপ্ত

অনাবিল সেনগুপ্ত

 


লেখক বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী আন্দোলনের কর্মী

 

 

 

জন্মিলে মরিতে হবে
অমর কে কোথা কবে

কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত জীবনের এই চরম সত্যটা লিখেছিলেন। কিন্তু শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষের অনবদমিত ইচ্ছে ‘অমরত্ব’। সেই ইচ্ছেটা প্রকাশিত হয়েছে মানুষের প্রতিটি সৃজনশীল সৃষ্টিতেও। যেমন খ্রিস্টপূর্ব ৫ম শতকের হিন্দু মহাকাব্য মহাভারতে অমরত্বের জন্য ‘অমৃত রসে’র সন্ধান, যা সমুদ্রমন্থনের মাধ্যমে পাওয়া যায় এবং তা লাভ করার জন্য দেবতা ও অসুরগণ যুদ্ধ করে। অসুরদের ব্যর্থতা যেন মানুষের মরণশীলতার শিক্ষা। অমরত্ব হল অনন্ত জীবন বা চিরকালের জন্য বেঁচে থাকার ক্ষমতা। যেকোনও প্রাণীর জৈবিক কাঠামোর কিছু সহজাত সীমাবদ্ধতা রয়েছে যা মেডিক্যাল এবং ইঞ্জিনিয়ারিং-এর মাধ্যমে জয়লাভের যৎপরোনাস্তি প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে মানুষেরা। প্রকৃতিগতভাবে অন্তত এক প্রজাতির জেলিফিস রয়েছে যার নাম ‘টুরিটসিস ডোরনি’ যাকে সম্ভবত অমর হিসেবে ধরা হয়। তবে মানবসভ্যতার ক্রমবর্ধমান উৎকর্ষতার সঙ্গে বেড়েছে মানুষের গড় আয়ু। মানুষের জীবদ্দশার একটা সীমারেখা রয়েছে। সারা পৃথিবীতে বিভিন্নভাবে মানুষের মৃত্যু ঘটছে। কেউ বার্ধক্যজনিত কারণে, কেউ রোগে ভুগে, কেউবা অপমৃত্যুর শিকার হচ্ছেন। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যুদ্ধ বিগ্রহের কারণেও হাজার হাজার মানুষকে অকালেই প্রাণ দিতে হচ্ছে। আবার অনেক দেশে স্বাস্থ্যব্যবস্থার বঞ্চনার কারণে বিপুল সংখ্যক মানুষকে প্রাণ হারাতে হচ্ছে। গত শতকেই ভারত সহ উপমহাদেশের অন্যান্য অংশে চিকিৎসাব্যবস্থা ছিল অনুন্নত। যার ফলে তখন এক কলেরা রোগই গ্রামের পর গ্রামকে জনশূন্য করে দিত। এই কলেরায় মূলত আর্থিকভাবে দুর্বল শ্রেণির মানুষের মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি ছিল। জানা যায়, ভারতে বসবাসকারী ইউরোপিয়ানদের উপর সে সময় কলেরা সেভাবে প্রভাব ফেলতে পারেনি। মূলত বন্যার পরই জলবাহিত পেটের অসুখে সে সময় প্রাণ হারান হাজার হাজার মানুষ। ১৮০০ শতাব্দী পর্যন্ত মানুষের প্রত্যাশিত আয়ুষ্কাল ছিল মাত্র ৩৫ বছর। আপনি যদি উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের জীবদ্দশায় জন্মগ্রহণ করতেন তাহলে হয়ত আপনি ৩০ থেকে ৪০ বছর বেঁচে থাকতেন। কিন্তু যখন থেকে ডাক্তাররা অস্ত্রপাচার করার আগে পরে নিয়মিতভাবে হাত বৈজ্ঞানিকভাবে পরিষ্কার করা শুরু করল তখন থেকে মানুষের গড় আয়ু বাড়তে শুরু করল। যেমন পেনিসিলিন আবিষ্কার হওয়ার পর থেকে এবং হাসপাতালগুলোতে ব্যাপক স্যানিটেশনের সুব্যবস্থা থাকার কারণে মানুষের গড় আয়ুর হার আরও বেড়ে গিয়েছে। আধুনিক বিজ্ঞানের ছোঁয়ায় চিকিৎসাব্যবস্থায় বিরাট উন্নতি ঘটেছে। অধিকাংশ মানুষকেই চিকিৎসা পরিষেবার মধ্যে আনা গেছে। আধুনিক চিকিৎসা পরিষেবার কারণে পৃথিবী জুড়ে মৃত্যুহার কমার পাশাপাশি বেড়েছে গড় আয়ু। ১৯৫০ সালে বিশ্বে মানুষের গড় আয়ু ছিল মাত্র ৪৬ বছর। কিন্তু গত ২০১৫ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, সেটি দাঁড়িয়েছে ৭১ বছরে। অর্থাৎ গড় আয়ু বৃদ্ধি পেয়েছে ২৫ বছর! ২০২০ সালে দাড়িয়ে বর্তমান পৃথিবীতে মানুষের জনসংখ্যা প্রায় ৭৬০ কোটির মতো। যা ১৯১৮ সালে ছিল বর্তমানের জনসংখ্যার মাত্র ২০-২৮ শতাংশ, যা প্রায় ১৭৫ থেকে ২০০ কোটির মতো। এই বিপুল পরিমাণ জনসংখ্যা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ মানুষের গড় জীবনকালের উন্নতি। বর্তমানে উত্তর আমেরিকার মানুষের গড় আয়ু সবচেয়ে বেশি। এই অঞ্চলের মানুষের গড় আয়ু প্রায় ৮০ বছর। এরপরই রয়েছে ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকা। এই দুই মহাদেশের অধিবাসীদের গড় আয়ু যথাক্রমে ৭৭.৭ বছর ও ৭৫.১ বছর। তারপরের অবস্থানে রয়েছে এশিয়া মহাদেশ। এশিয়ার দেশগুলোতে বসবাসরত একজন মানুষের গড় আয়ু ৭২.৪ বছর। আর সবার নিচে রয়েছে আফ্রিকার সাব-সাহারা অঞ্চল। ওইসব এখানকার মানুষদের গড় জীবনকাল ৫৯.৩ বছর। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) ২০১৯-এর রিপোর্ট অনুযায়ী ভারতের গড় আয়ু ৬৯.৪ বছর (পুরুষ ৭০.৭ এবং মহিলা ৬৮.২)। ১৮৬টি দেশের মধ্যে ১৩০ তম স্থানে। অনেকটাই নিচে উন্নত দেশগুলোর থেকে। প্রতিবেশী দেশগুলো ভারতের থেকে গড় আয়ুতে কিছুটা হলেও এগিয়ে। যেমন, বাংলাদেশ গড় আয়ু ৭২.৮ বছর (১০৮তম), ৭১.৫ বছর গড় আয়ুতে ভুটান ১১৫তম, নেপালের গড় আয়ু ৭০.৫ বছর (১২৪তম)। তবে পাকিস্তানের অবস্থা আমাদের থেকেও খারাপ। সেখানে গড় আয়ু ৬৭.১ বছর (১৪০তম)। প্রথম স্থানে হংকং-এর গড় আয়ু ৮৪.৭ এবং দ্বিতীয় জাপানের ৮৪.৫ বছর। ৩৮তম স্থানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গড় আয়ু ৭৮.৯ বছর। দেশের মানুষের গড় আয়ু কিন্তু স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হওয়ার পেছনে অবশ্যম্ভাবীভাবেই রয়েছে দেশগুলোতে মানুষের সুখস্বাচ্ছন্দ্য। তাই বিবিসির ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেজ রিপোর্ট-২০১৭ এর ওপরের দিকের দেশের গড় আয়ু সর্বোচ্চ। শক্তিশালী ও বর্ধনশীল অর্থনীতি, স্বাস্থ্যসেবায় প্রচুর সুযোগ, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা এবং ক্যান্সারের ঝুঁকি কম। পুষ্টিসম্পন্ন খাবার। নেই প্রবল মানসিক চাপ। আর্থসামাজিক উন্নয়নে এগিয়ে। নেই স্বাস্থ্যসেবায় বৈষ্যম্য। পেছনে রয়েছে এইসব কারণ। উল্লেখযোগ্যভাবে ওই সকল দেশেতে বায়ুদূষণের মাত্রাও অনেক কম। অন্যদিকে ১৮৬তম স্থানে আফ্রিকার সেন্টাল রিপাবলিক অঞ্চলের মানুষের গড় জীবনকাল ৫২.৮ বছর। ১৮৪তম স্থানে আফ্রিকার চাদের গড় আয়ু ৫৪ বছর। ‘হু’-র রিপোর্ট অনুযায়ী, যে রাষ্ট্রসমূহের সামগ্রিক আয়ু সর্বনিম্ন সেগুলো হল সিয়েরা লিওন, কেন্দ্রীয় আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র, গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, গিনি-বিসাউ, লেসোথো, সোমালিয়া, সোয়াজিল্যান্ড, অ্যাঙ্গোলা, চাদ, মালি, বুরুন্ডি, ক্যামেরুন এবং মোজাম্বিক। এর মূল কারণ অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং অপুষ্টি। প্রাকৃতিক নানা বিপর্যয়ে বিধ্বস্ত দেশ। বিষয়টিকে আরও জটিল করেছে প্রতিবেশী দেশগুলোর হামলা। এছাড়াও এইডস মহামারির পরিমাণ এখানে দিনকে দিন বাড়ছে। এই স্বল্প গড় আয়ুর পেছনে দূষিত পরিবেশ, পুষ্টিহীনতা, রাসায়নিক ব্যবহার বৃদ্ধিসহ আরও অনেক কারণ বিদ্যমান। দেশগুলোর মানবসম্পদ রক্ষার্থে জাতিসংঘ আশপাশের রাষ্ট্রগুলোকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানায়। ভারতের সঙ্গে সাম্প্রতিক দ্বন্দ্বে জড়িত প্রতিবেশী দেশ রিপাবলিক চায়নার গড় আয়ু ৭৬.৭ বছর, পৃথিবীতে ৫৯তম স্থানে। সম্প্রতি চিনে প্রায় ২৫ শতাংশ কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন কমেছে। ২০০৮ সালে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দার সময়েও বায়দূষণের হার কমে গিয়েছে। দেশটি নিয়ন্ত্রণ করেছে গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণের জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী পরিবহন ব্যবস্থাকে। আবার ২০১৯-এর ডিসেম্বরে চিনের উহান শহর থেকেই  বিশ্বে প্রাদুর্ভাব ঘটে করোনা ভাইরাসের মহামারি। সাম্প্রতিক চিনের প্রেসিডেন্ট জি জিনপিং ঘোষণা করলেন জানালেন চিনে কার্বন নিঃসরণ সর্বনিম্ন হবে ২০৩০ সালের মধ্যে। এবং ২০৬০-এর মধ্যে চিন কার্বননিরপেক্ষ দেশ হিসেবে গড়ে উঠবে বলে জানিয়েছেন। বিশ্বজুড়ে করোনা পরিস্থিতি এবং আর্থিক মন্দার জন্যই কি দৃষ্টিভঙ্গি পরির্বতন?

সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ডোনাল্ড ট্রাম্প বিতর্কে দাবি করেন রাশিয়া, ভারত ও চিনের মাধ্যমেই বাতাসে দূষণের পরিমাণ বেড়ে চলেছে। বায়ুদূষণ রোধে আমেরিকা চেষ্টা করলেও এই তিন দেশকে কোনও উদ্যোগ নিতে দেখা যায় না বলেও অভিযোগ মার্কিন প্রেসিডেন্টের। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডাব্লিউএইচও বা হু), ইউনিসেফ এবং দ্য লেনসেট গঠিত একটি কমিশনের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে মাথাপিছু কার্বন নিঃসরণের দিক থেকে দায়ীদের মধ্যে শীর্ষে মধ্যপ্রাচ্য আর শিল্পোন্নত দেশগুলো৷ কাতার, মধ্যপ্রাচ্যের দেশটির মানুষ বছরে গড়ে ৪৯ টন কার্বন ছড়ানোর জন্য দায়ী৷ ২০৩০ সালের বৈশ্বিক এসডিজি লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে তাদের কার্বন ব্যবহার ১৭১৬ ভাগ বেশি। মাথাপিছু কার্বন ব্যবহারে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান অষ্টম৷ দেশটির মানুষ গড়ে ১৬ টন কার্বন ব্যবহার করে৷ এসডিজি লক্ষ্য অর্জন করতে হলে তা ৫০০ ভাগ হ্রাস করতে হবে৷ যুক্তরাষ্ট্রের উপরে রয়েছে অস্ট্রেলিয়া৷ চায়নার মানুষ গড়ে ৭.০৫ টন এবং রাশিয়ার মানুষ গড়ে ১১.৭৪ টন কার্বন নিঃসরণ করে। ভারতের মানুষের গড় কার্বন নিঃসরণ এদেশ গুলোর থেকে কম হলেও, বার্ষিক মোট কার্বন নিঃসরণে চায়না, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এর পারেই তৃতীয় স্থানে। চর্তুথ স্থানে রাশিয়া। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে মাথাপিছু সবচেয়ে কম কার্বন নিঃসরণকারী দেশ নেপাল৷ তাদের অবস্থান ২৬তম৷ অন্যদিকে এই অঞ্চলে মাথাপিছু সবচেয়ে বেশি কার্বন নিঃসরণকারী দেশ ভারত৷  মানুষ গড়ে এক দশমিক আট-চার টন কার্বন ছড়ানোর জন্য দায়ী৷ তবে মাত্রাটি এখনও এসডিজি লক্ষ্যের চেয়ে বেশ খানিকটা কম৷ বাংলাদেশ ৩৯তম৷ বছরে মাথাপিছু দশমিক ৫৩টন কার্বন ব্যবহার করে এই দেশের মানুষ৷ এসডিজিতে বেঁধে দেয়া মাত্রার চেয়েও যা আশিভাগ কম৷ বিশ্বের সবচেয়ে পরিবাশবান্ধব দেশগুলোর অবস্থান আফ্রিকা মহাদেশে৷ সবচেয়ে কম কার্বন নিঃসরণকারী দেশ বুরুন্ডি৷ মাথাপিছু মাত্র দশমিক শূন্য-পাঁচ টন৷ একই পরিসংখ্যান চাদ কিংবা সোমালিয়ার ক্ষেত্রেও৷ সবচেয়ে কম কার্বন নিঃসরনকারী ১৯টি দেশই এই মহাদেশের৷

গঙ্গা নদী শুধুমাত্র ভারতীয় ধর্মীয় ঐতিহ্য ও বিশ্বাস নয়। ভারতের ইতিহাস বলতে মূলত সিন্ধু-গাঙ্গেয় সমভূমির তটে গড়ে ওঠা মানববসতির ইতিহাসকেই বোঝানো হয়। ভারতীয় উপমহাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে সিন্ধু সভ্যতার উন্মেষ ও প্রসারের সঙ্গেই প্রায় সমগ্র গাঙ্গেয় সমভূমি অঞ্চলে মহাজনপদ নামে পরিচিত ১৬টি প্রধান প্রধান রাজ্য-তথা-জনবসতির উত্থান ঘটে। বর্তমানে সিন্ধু-গাঙ্গেয় সমভূমি অঞ্চলটি গোটা পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি জনঅধ্যুষিত এলাকার একটি। এখানে প্রায় ৯০ কোটি লোক বাস করে, যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার এক-সপ্তমাংশ। সেই ঐতিহ্যবাহী গঙ্গা নদী বিশ্বের পাঁচটি সবচেয়ে দূষিত নদীর একটি। বারাণসীর কাছে এই নদীতে ফেসাল কলিফর্মের পরিমাণ ভারত সরকার নির্ধারিত সীমার চেয়ে একশো গুণ বেশি। গঙ্গাদূষণ শুধুমাত্র গঙ্গাতীরে বসবাসকারী কয়েক কোটি ভারতীয়েরই ক্ষতি করছে না, করছে ১৪০টি মাছের প্রজাতি, ৯০টি উভচর প্রাণীর প্রজাতি ও ভারতের জাতীয় জলচর প্রাণী গাঙ্গেয় শুশুকেরও। গঙ্গাদূষণ রোধে গঙ্গা অ্যাকশন প্ল্যান নামে একটি পরিকল্পনা গৃহীত হয়েছিল। কিন্তু দূর্নীতি, প্রযুক্তিগত অদক্ষতা, সুষ্ঠ পরিবেশ পরিকল্পনার অভাব, বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠনগুলির অসহযোগিতার কারণে এই প্রকল্প ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। বর্তমানে কেন্দ্রীয় সরকারের তৎপরতায় এবং কোটি কোটি টাকা ব্যয় বরাদ্দে যদি গঙ্গা নদী দূষণমুক্ত হয় সেই আশায় বুক বেঁধেছে অনেকেই।  কিন্তু গাঙ্গেয় উপত্যকার এই সমৃদ্ধ ও সর্বোচ্চ জনবহুল অঞ্চলের আকাশে কালো ছায়ার মতো আরেকটা বিপদ এসে হাজির হয়েছে বায়ু দূষণ রূপে।

শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের এনার্জি পলিসি ইনস্টিটিউট (ইপিআইসি) পরিচালিত এয়ার কোয়ালিটি লাইফ ইনডেক্সের তথ্য বিশ্লেষণে দেখিয়েছে, বায়ু দূষণে বিশ্বব্যাপী মানুষের গড় আয়ু প্রায় ৩ বছর হ্রাস পেয়েছে। ভবিষ্যতে গাঙ্গেয় উপত্যকার সাত রাজ্য পাঞ্জাব, চণ্ডীগড়, হরিয়ানা, দিল্লি, উত্তরপ্রদেশ, বিহার এবং পশ্চিমবঙ্গের মানুষের গড় আয়ু কমে যেতে পারে সাত বছর। ফলে, দেশের প্রায় ৪৮ কোটি মানুষের জীবনে এর উপরে মারাত্মক প্রভাব পড়বে। দেশের জনসংখ্যার প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষের গড় আয়ু কমে যাবে সাত বছর। বিশ্বের সব থেকে দূষিত রাজধানীর মধ্যে সবার উপরে দিল্লি। বর্তমানে দিল্লির ও তার আশেপাশের আশেপাশের রাজ্যের দূষণ পরিস্থিতির জন্য বিশ্বের সব থেকে দূষিত রাজধানী। তারপরে রয়েছে বাংলাদেশের  ঢাকা। আমাদের কলকাতার বায়ুদূষণের প্রকোপ খুবই উদ্বেগজনক। বর্তমানে দিল্লির আশেপাশের রাজ্যের দূষণের পরিস্থিতি এতটাই জটিল আকার ধারণ করেছে যে ‘হেলথ ইমারজেন্সি’ ঘােষণা করেছিলো সুপ্রিমকোর্ট। সাধারণত ‘এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স’ যদি শূন্য থেকে ৫০ পর্যন্ত থাকে, তবে তা ভালো৷ ৫১-১০০ ঠিকঠাক৷ ১০১-২০০ হলে মোটামুটি পর্যায়ে৷ ২০১-৩০০ খারাপ৷ ৩০১-৪০০ খুব খারাপ৷ ৪০১-৫০০ হলে মারাত্মক৷ তার বেশি হলে ‘অতি মারাত্মক’৷ গত ২০১৯ সালের ১ ও ২ নভেম্বর দিল্লি-এনসিআর অঞ্চলের বায়ু দূষণের মাত্রা ছিল গড়ে ১২০০! সহজেই অনুমেয় পরিস্থিতি কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে৷ তবে, কয়েক দিন পরে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে৷ যা ‘অতি মরাত্মক’ থেকে ‘মারাত্মক’এ নেমে এসেছে৷

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা ‘হু’ জানিয়েছে ভারতে অকাল মৃত্যুর জন্য অনেকাংশে দায়ি এই দূষণ। কেন্দ্রীয় পরিবেশ মন্ত্রী প্রকাশ জাভড়েকর সম্প্রতি সংসদে জানিয়েছেন, যে দূষণ ও মানুষের আয়ু কমে যাওয়ার মধ্যে কোনও সম্পর্ক আছে, তা আদৌও কোনও ভারতীয় সমীক্ষা দেখাতে পারেনি। মন্ত্রী বলেন, ‘‌যে সব সমীক্ষাগুলি ভারতে হয়েছে সেগুলি দূষণ ও মানুষের জীবন সংক্ষিপ্ত করে দেওয়ার মধ্যে কোনও সম্পর্ক দেখাতে পারেনি। তাই মানুষের মধ্যে অযথা আতঙ্কের সৃষ্টি না করাই ভাল।’‌ পরিবেশ মন্ত্রীর এ দাবি প্রসঙ্গে ‘হু’–এর ডিরেক্টর বলেন, ‘‌তীব্র বায়ু দূষণ যে মানুষের স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলে তার জোরালো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ রয়েছে। এরপরও আমরা সরকারের কাছে আর্জি জানাব যে দূষণ হ্রাস করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে, কারণ এই বায়ু দূষণ ভয়ানকভাবে দেশের নাগরিকের শরীরের ওপর প্রভাব ফেলছে, বিশেষ করে সেইসব শহরে যেখানে ‘হু’–এর প্রস্তাবিত নির্দেশিকার চেয়েও বায়ু দূষণের পরিমাণ উচ্চতর।’‌

‘দ্য ল্যানসেট জার্নালে’ প্রকাশিত এক সমীক্ষায় দেখা গিয়েছিল যে, ২০১৭ সালে আটজনের মধ্যে একজনের মৃত্যু বায়ু দূষণের ফলে হচ্ছে। এই সমীক্ষায় এও দেখা গিয়েছে যে বিশ্বের জনসংখ্যায় ভারতে সবচেয়ে বেশি বায়ু দূষণের ফলে স্বাস্থ্যের ক্ষতি হয়েছে, যা বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য ক্ষতির মধ্যে সর্বাধিক। ২০১৭ সালে শুধুমাত্র বায়ু দূষণের কারণেই দেশে ১২.‌৪ লক্ষ মৃত্যু হয়েছে। বিষযুক্ত বায়ুই দেশে মৃত্যুর সংখ্যা ক্রমশ বাড়িয়ে দিচ্ছে। আগের বছরও দিল্লির বায়ু দূষণ ঘুম কেড়েছিল বাসিন্দাদের। দিওয়ালির পর থেকেই দূষণের পরিমাণ ক্রমশঃ বাড়তে শুরু করে দেয়। শ্বাস নেওয়া একপ্রকার অসম্ভব হয়ে পড়ে দিল্লিবাসীর কাছে। সুপ্রিম কোর্টের কাছে ভৎর্সিত হয় রাজ্য ও কেন্দ্র সরকার। ‘হু’ ডিরেক্টর বলেন, ‘‌সরকার যত শীঘ্র পদক্ষেপ নেবে তত তাড়াতাড়ি মানুষ মৃত্যুর ফাঁদ থেকে রেহাই পাবে। দেরি করলে আরও অনেকে এই বায়ু দূষণের শিকার হতে পারে।’‌ বায়ুদূষণের কারণে সারাবিশ্বে অকালে মারা যাচ্ছে প্রায় ৮৮ লাখ মানুষ। দিল্লির গবেষনা সংস্থা সেন্টার ফর সাইন্স অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট (সিএসই) পরিচালিত গবেষনায় দেখিয়েছে, শুধুমাত্র ২০১০ সালেই ৬২০,০০০ অকাল মৃত্যু বা শিশু মৃত্যুর ঘটনা ভারতে ঘটেছে যার পিছনে অন্যতম কারন হলো বায়ু দূষনের ক্ষতিকর প্রভাব।

২০১৬ সালে ইনস্টিটিউট ফর হেলথ ম্যাট্রিকস অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশন (আইএইচএমই) এর ‘গ্লোবাল বার্ডেন অব ডিজিজ’ রিপোর্ট অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন রোগে যতজন মৃত্যুবরণ করেছেন তার মধ্যে ১৬ শতাংশ মানুষের মৃত্যু ঘটেছে মস্তিষ্কের রক্তনালীর রোগে। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে হৃদরোগ। এই রোগে দেশে শতকরা ১৪.৩ শতাংশ মানুষের মৃত্যু হয়। এর পরের তিনটি অবস্থানে রয়েছে দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগ (সিওপিডি), ডায়াবেটিস ও শ্বাসতন্ত্রের নিচের অংশের সংক্রমণ (লোয়ার রেসপিরেটরি ইনফেকশন)। সর্বাধিক মানুষ মারা যাচ্ছে, সে রোগগুলো হওয়ার পেছনে উচ্চ রক্তচাপ, বায়ুদূষণ, বাতাসে ভাসমান ক্ষুদ্র বস্তুকণা, রক্তে অতিরিক্ত শর্করা এবং ধূমপান দায়ী। বিশেষ করে সেরিব্রোভাসকুলার ডিজিজ (স্ট্রোক) হওয়ার পেছনে সবচেয়ে দায়ী ধূমপানসহ সামগ্রিকভাবে বায়ুদূষণ। এর জন্য ধূমপানসহ বায়ুদূষণের উপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা জরুরী। সচেতনতাও প্রয়োজন। যক্ষ্মা, এইচআইভি বা এইডস ও ধূমপানের চেয়েও অনেক ক্ষেত্রে মানুষের আয়ু কমানোতে বেশি প্রভাব ফেলে বায়ু দূষণ। এই দূষণ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বের প্রায় এক চতুর্থাংশ মানুষ বাস করে দক্ষিণ এশিয়ার চারটি দেশ- বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল এবং পাকিস্তানে। যা বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০১৪ সালেই প্রতিবেদনে জানিয়েছিল, পৃথিবীর সবথেকে বেশি দূষিত ২০টি শহরের মধ্যে ১৩ টিই আছে ভারতে। সাম্প্রতিকতম রিপোর্টে ‘হু’ জানিয়েছে, সবথেকে দূষিত শহর হলো উত্তর প্রদেশের কানপুর। সেখানে শূন্যে ভাসমান কণার পরিমাণ নিরাপদ স্তরের থেকে প্রায় ১৭ গুণ বেশি। দুই দশক আগের তুলনায় এখন দূষণের মাত্রা ৪৪ শতাংশ বেড়ে যাওয়ায় এসব দেশে বসবাসরত মানুষের গড় আয়ু পাঁচ বছর কমেছে। এখন যেন বায়ুদূষণের বিশ্ব-মহামারী হতে চলছে। আন্তর্জাতিক জার্নাল ‘কার্ডিওভাসকুলার রিসার্চে’ প্রকাশিত একটি গবেষণায়, বায়ুদূষণকে ‘মহামারী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তেল, গ্যাস, কয়লা ও জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে উৎপন্ন দূষণ সৃষ্টিকারী কণার প্রভাব মানুষের ফুসফুসে প্রায় এক বছর পর্যন্ত থাকতে পারে। জনস্বাস্থ্যের উপর বায়ু দূষণের প্রভাব ধূমপানের চেয়েও ক্ষতিকর। পুনর্নবীকরণযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার করে এই ক্ষতি কমানো সম্ভব। মহামারীর তুলনায় বায়ু দূষণেই বেশি মানুষের অকাল মৃত্যু হচ্ছে। ম্যালেরিয়ার তুলনায় ১৯ গুণ এবং এইডসের তুলনায় প্রায় নয় গুণ বেশি মানুষ বায়ু দূষণের কারণে অকালে মারা যাচ্ছেন। বায়ু দূষণ থেকে কেবল ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করছে প্রায় ছয় শতাংশ মানুষ। এর প্রভাবে ফুসফুসের অন্যান্য রোগ, উচ্চ রক্তচাপ এবং ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দিনদিন বাড়ছে। বায়ু দূষণের কারণে চীনে ৪.১, ভারতে ৩.৯ এবং পাকিস্তানে ৩.৮ বছর গড় আয়ু কমেছে। ‘প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ অকাল মৃত্যুর জন্য মূলত মানবসৃষ্ট দূষণই দায়ী। জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে বছরে প্রায় ৫৫ লাখ মানুষকে অকাল মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচানো সম্ভব।’ বায়ুদূষণের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাবসমূহ জাতীয় এবং আঞ্চলিক পর্যায়ে প্রভাব ফেলে। বায়ুদূষণের প্রভাব একেক দেশে একেকরকম হয়। আফ্রিকার চাঁদে বায়ুদূষণেরে কারণে গড় আয়ু কমেছে ৭ বছরের বেশি। আবার কলম্বিয়াতে কমেছে ৪ মাসের কিছু বেশি সময়। পৃথিবীর দুই তৃতীয়াংশ অকাল মৃত্যুর কারণ দূষণ তা মূলত মানুষের সৃষ্টি। এখুনি দেশের নীতিনির্ধারক এবং বিশেষজ্ঞদের বিষয়টির প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। কেবল জীবাশ্ম জ্বালানি নির্গমন যদি শূন্যে নামিয়ে আনা যেত, তাহলে মানুষের গড় আয়ু অন্তত এক বছর বাড়ানো যেত। পৃথিবীতে নানা ধরণের রোগ, মহামারী এবং অপ্রত্যাশিত ঘটনা মানুষের গড় আয়ুর ওপরে প্রভাব ফেলেছে। একটা সময়, এখনকার তুলনায় সংক্রামক রোগব্যাধির এক্ষেত্রে অনেক বড় ভূমিকা ছিল। ১৯৯০ সালে প্রতি তিনজনের একজনের মৃত্যুর কারণ ছিল সংক্রামক এবং ছোঁয়াচে রোগ। ২০১৭ সালে এসে তা দাঁড়িয়েছে প্রতি পাঁচজনে একজনে।

বায়ুদূষণ দ্বারা সৃষ্ট রোগের সঙ্গে সাদৃশ্যকারী এবং ‘মরার উপর খাড়ার ঘা’য়ের মতো মানব শরীররে এখন হানা দিয়েছে ‘গুরুতর তীব্র শ্বাসযন্ত্রীয় রোগলক্ষণসমষ্টি সৃষ্টিকারী'(সিভিয়ার একিউট রেসপিরেটরি সিনড্রোম) করোনাভাইরাস বা সংক্ষেপে সার্স-কোভ-২ নামক আরএনএ ভাইরাস। এটি মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমিত হয়ে একটি রোগের সৃষ্টি করে, যার নাম কোভিড-১৯। বিশেষজ্ঞদের মতে এই রোগে বেশি অসহায় করেছে, প্রতি ছ’জন আক্রান্তের মধ্যে, একজনের আগের থেকেই শ্বাসকষ্টজনিত গুরুতর অবস্থা ছিলো। যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, এবং যারা বয়স্ক ( বিশেষত যাদের উচ্চ-রক্তচাপ, হার্টের সমস্যা বা ডায়াবেটিস রয়েছে) তাদের এই ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে। এইসব রোগপ্রতিরোধী ক্ষমতাকেই চ্যালেঞ্জ করে বায়ুদূষণ! আমাদের মানবসভ্যতা ঠিক যেন ঘূর্ণাবর্তের পাঁকে আঁটকে গিয়েছে! এই ভাইরাসঘটিত রোগটি ২০২০ সালের ৩০শে জানুয়ারি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা একে ‘বৈশ্বিক জরুরি স্বাস্থ্য সতর্কতা’ এবং ১১ই মার্চ ২০২০ তারিখে করোনাভাইরাস রোগ ২০১৯ কে ‘বৈশ্বিক মহামারী’ ঘোষণা করে। বর্তমানে এই ভাইরাস পৃথিবীর ২১৭ দেশে প্রায় সাড়ে চার কোটি মানুষকে সংক্রমিত করেছে। এখনো পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে প্রায় বারো লক্ষ মানুষের। করোনাভাইরাসে মৃতদের মধ্যে ৮৫ শতাংশেরই বয়স ৪৫ বছরের ওপরে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এখনো পর্যন্ত এই ভাইরাসের দাপট সবচেয়ে বেশি পরিলক্ষিত হয়েছে। তারপরেই ভারতেও উত্তরোত্তর এর প্রভাব বেড়েই চলেছে।  প্রায় দেড় লক্ষ মতো মানুষের মৃত্যু হয়েছে। তবে সুস্থতা হার এখন প্রায় ৮২ শতাংশ ছাড়িয়ে যাচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, ২০২১ সালের আগে সার্বিকভাবে টিকাকরণের সম্ভাবনা নেই। এই মহামারীর  প্রভাবে মানবসভ্যতার ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কোথায় পৌঁছাবে এখুনি বলা অসম্ভব। করোনাভাইরাসের সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়তে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। বেশিরভাগ দেশই লকডাউনের পথ বেছে নিয়েছে। জানা গেছে, বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৩৫০ কোটিরও বেশি মানুষ লকডাউনে থাকতে বাধ্য হয়েছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে ২১৭টি দেশে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। তার মধ্যে ৯০ টি দেশ পুরোপুরি বা আংশিকভাবে লকডাউন প্রয়োগ করেছে। কিন্তু এই লকডাউনে পুরো অর্থনীতি অচল হয়ে পড়েছে। বিশ্ব খাদ্য সংস্থা সতর্কবাণী দিয়েছে যে, অর্থনীতি এভাবে চলতে থাকলে বিশ্বের অন্তত তিন কোটি মানুষ অনাহারে মারা যেতে পারে। লকডাউনের ফলে কোথাও কোথাও ৫-৬ মাসের বেশি সময় ধরে ঘরবন্দি মানুষ। চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছে তাদের খাদ্য ব্যবস্থা। বিমান, রেলসহ সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ থাকায় সরবরাহও থমকে গেছে। এ অবস্থায় অনাহারে অর্ধাহারে দিন কাটছে কোটি কোটি মানুষের। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, করোনাভাইরাস সম্ভবত কোটি কোটি মানুষের জন্য একটা বিপর্যয় ডেকে এনেছে। বিশ্বজুড়ে আধুনিক স্বাস্থ্য পরিষেবাও এইসময়ে ব্যপকভাবে বিধ্বস্ত। সাধারণ মানুষের করোনা ব্যতীত অন্যান্য শারীরিক অসুস্থতা কিম্বা সার্বিক স্বাস্থ্যবিধান কর্মসূচি বাস্তবায়নে ব্যপকহারে অবনমন চলছে। যা পৃথিবীর সামগ্রিকভাবে মানবসমাজের গড় জীবনকালকে কমিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট!

অনেকে বলছেন, ইতিহাস যেন তার পুনরাবৃত্তি করেছে! তার ফলেই ১৯১৮ সালে যেমন বিশ্ব কেঁপে উঠেছিল স্প্যানিশ ফ্লু এর ধাক্কায়, তেমনই ২০২০ সালে কাঁপছে কোভিড–১৯ এর প্রকোপে। স্প্যানিশ ফ্লু ১৯১৮ সালের বসন্তকালে ইওরোপের জার্মানি, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, স্পেন এবং আমেরিকাতে ছড়িয়েছিল। স্প্যানিশ ফ্লু এরপরে মারণ ভাইরাস (‘এইচ১এন১ ইনফ্লুয়েঞ্জা’ নামে চিহ্নিত) এর আকারে তা গ্রাস করে নেয় সারা বিশ্বকে। ১৯১৯ সাল পর্যন্ত চলা ওই মহামারীতেই সারা বিশ্বের প্রায় ২ কোটি মানুষের মৃত্যু হয়। এই মারণ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন প্রায় ৫০ কোটি মানুষ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের চরম অব্যবস্থার সময়ই ছড়িয়েছিল এই মহামারী। বিশেষজ্ঞের মতে, এইচ১এন১ ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস সাইটোকাইন স্টর্মকে বাড়িয়ে যুবক, যুবতীদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নষ্ট করে দিয়েছিলো। ২০ থেকে ৪০ বছর বয়সীদের সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বযুদ্ধের সময় হাসপাতাল, সেনাশিবির বা জনবসতির ঘিঞ্জি, অপরিচ্ছন্ন পরিস্থিতি, অপুষ্টিজনিত একাধিক কারণে সাধারণ ইনফ্লুয়েঞ্জা মারণ স্প্যানিশ ফ্লু হয়ে ওঠে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় মেডিসিন লাইব্রেরীর (এন.সি.বি.আই.) তথ্য অনুযায়ী,  স্প্যানিশ ফ্লু এর প্রভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেনা ছাউনিতে মৃত্যুহার প্রায় ৫ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। মৃত্যুর হার ভারতের ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে সাদা চামড়ার মানুষদের ৯.৬ শতাংশ এবং ভারতীয়দের ২১.৯ শতাংশ বাড়িয়ে দেয়। স্প্যানিশ ফ্লু মহামারীর প্রভাব এত মারাত্মক ছিল যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মানুষের গড় আয়ু প্রায় ১0 বছর কমে যায়। গোটা বিশ্বেও মানুষের গড় আয়ু এক ধ্বাক্কায় অনেকটাই কমে যায়। আজকের কোভিড–১৯ এর মতোই স্প্যানিশ ফ্লু ও ছিল নিঃশ্বাসজনিত ভাইরাস। তাই তার থেকে বাঁচতে তৎকালীন বিশ্বেও একইরকম সুরক্ষা বিধি নেওয়া হয়েছিল। যেমন রোগী থেকে চিকিৎসক, সাফাইকর্মী থেকে পুলিশ অফিসার, সবার মুখেই দেখা যেত মাস্ক। এছাড়া অসুস্থ মানুষদের তখনও আজকের মতোই কোয়ারানটাইনে রাখা হয়েছিল। আর কোয়ারানটাইনে থাকা, সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া মানুষদের একাকিত্ব ঘোচাতে, যেহেতু তখন সোশ্যাল মিডিয়া বা টিভি ছিল না, তাই ভরসা ছিল টেলিফোন। মানুষকে মাস্ক সম্পর্কে সচেতন করতে এবং কোয়ারানটাইনে থাকা মানুষদের পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত রাখতে টেলিফোনে কথাবার্তার বিজ্ঞাপন সেসময় ঘুরপাক খেত বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম বা বিজ্ঞাপনী প্রচারে।

মহামারীর ধাক্কায় মানুষের জীবনকাল কমে যাওয়ার একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ, ১৯৮০ এর দশকে এইচআইভি, এইডস সংকট। এই মহামারী গোটা বিশ্বকে নাড়া দিয়েছিল। বিশেষ করে উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোয় মানুষের গড় আয়ুষ্কালের ওপর এটির প্রভাব ফেলে ছিল উল্লেখ করার মতো। বেঁচে থাকার প্রবণতায় কয়েক দশক ধরে উন্নতির পথে থাকলেও এরজন্য তা উল্লেখযোগ্য ভাবে হ্রাস পায়। এন্টি-রেট্রোভাইরাল থেরাপি, চিকিৎসা এবং এই রোগ প্রতিরোধের ব্যাপারে গণ সচেতনতা বিস্তার হওয়ায় সঙ্গে, বিশ্বব্যাপী এইডসের কারণে মৃত্যু মাত্র এক দশকের মধ্যেই হ্রাস পেয়েছে । প্রায় ২০ লাখ থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ১০ লাখে। তখন থেকেই দেশগুলো তাদের আয়ুষ্কালের চিত্র কিছুটা  পুনরুদ্ধার করতে শুরু করে। এখনো পর্যন্ত আফ্রিকার এইসকল অঞ্চলের গড় আয়ু ৫০-৫৫ বছরের মধ্যেই সীমিত!

বিভিন্ন মহামারী আগেও গোটা বিশ্বকে নাড়া দিয়েছিল। প্রতিরোধযোগ্য টিকাকরণ রোগে মৃত্যুর হারও কমে এসেছে। এছাড়া স্যানিটেশন, পরিচ্ছন্নতা জ্ঞান, পুষ্টি, টিকা এবং মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা পরিস্থিতি উন্নয়নে  ভূমিকা রেখেছে। পরিসংখ্যান বলছ, ২০১৭ সালে বিশ্বের প্রায় পাঁচ কোটি ৬০ লাখ মানুষ মারা যান। ১৯৯০ সালের তুলনায় এই সংখ্যা এক কোটিরও বেশি হলেও মৃত্যুর হার কম। তার কারণ অবশ্যই বিশ্বব্যাপী জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং মানুষ গড়ে বেশি সময় ধরে বাঁচছে। মহামারী রুখতে জারি হওয়া লকডাউনে মানুষ ঘরবন্দি থাকায় সুফল মিলেছে প্রকৃতিতে। মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ন্যাশনাল অ্যারোনটিকস অ্যান্ড স্পেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন জানাচ্ছে যে, ‘এই লকডাউনের ফলেই ভারতের বায়ু দূষণ একধাক্কায় অনেকটা কমে গেছে। গত ২০ বছরের মধ্যে এই প্রথম উত্তর ভারতের বায়ুমণ্ডলের মধ্যে একটা বড় পরিবর্তন দেখতে পাওয়া যায়। বিশেষ করে গঙ্গা অববাহিকায় বছরের এই সময়  নাসার উপগ্রহ চিত্রে দেখা গেছে, লকডাউনের বাতাসে অ্যারোসোলের মাত্রা এতটাই নেমে গেছে যে তা একরকম ঐতিহাসিকই বলা চলে। এই অ্যারোসোল হ’ল এমন ছোটছোট শক্ত বা তরল কণা যা বাতাসের সঙ্গে মিশে দৃশ্যমানতা কমিয়ে দেয়। এটি বাতাসের সঙ্গে মিশে থাকায় মানুষের ফুসফুস এবং হৃদযন্ত্রেরও ক্ষতি করে বলেই জানা যায়। করোনা মোকাবিলায়  লকডাউন পর্বের সময়ের সার্বিক পরিস্থিতিকে পূর্ববর্তী পাঁচ বছরের সঙ্গে তুলনা করে দেখা গেছে, এই সময়সীমায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে বায়ুদূষণের মাত্রা। বাণিজ্যনগরী মুম্বইয়ের বাতাসে ভাসমান ক্ষতিকর কণার মাত্রা কমেছে ১০ শতাংশ এবং দিল্লিতে কমেছে ৫৪ শতাংশ। কলকাতাসহ অন্য তিনটি শহরে বায়ুদূষণ হ্রাসের মাত্রা ছিল ২৪ থেকে ৩২ শতাংশের মধ্যে। দীর্ঘ দিনের এই লকডাউন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল আমাদের জীবনযাপন পৃথিবীর ওপর কী প্রভাব ফেলছে‌। পরিবহন ব্যবস্থা ২৩ শতাংশ বিশ্বে কার্বন নিঃসরণ করে থাকে। এই নির্গমনের মাত্রা কমেছে স্বল্পমেয়াদে জারি হওয়া লকডাউনে, যা কোভিড-১৯ এর দরুন জনস্বাস্থ্যের জন্য ব্যবস্থা নেওয়া। করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধে আরোপিত লকডাউনের সবচেয়ে বড় সুফল হয়েছে, সমগ্র পৃথিবীর সব মানুষ অনেকটাই দূষণমুক্ত বায়ুতে নিঃশ্বাস নিতে পারছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে সমগ্র পৃথিবীতে শুধু শহরে বসবাসকারী শতকরা ৮০ ভাগেরও বেশি মানুষ এমন বায়ুর সংস্পর্শে আসে, যা বায়ুপরিশুদ্ধতামানের নিরাপদসীমার চেয়ে অনেক বেশি। পৃথিবীর অনুন্নত দেশগুলোর অবস্থা এক্ষেত্রে আরো খারাপ, যেখানে ৯৮ শতাংশ শহরই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত সীমার মধ্যে বায়ুপরিশুদ্ধতামান রাখতে ব্যর্থ। ‘বোস্টনের স্টেট অব গ্লোবাল এয়ারে’র ২০১৫ সালের রিপোর্টে জানানো হয়েছে, ‘দূষণের কারণে ভারতের মানুষের মৃত্যুর হার বাংলাদেশের থেকে প্রায় ১৩ গুন এবং পাকিস্তানের চেয়ে ২১ গুন বেশি। পরিসংখ্যানে উল্লেখ করা হয়েছে, পৃথিবীর প্রায় ৯২ শতাংশ মানুষ দূষিত বাতাসের মধ্যে বসবাস করছে। সারা পৃথিবী জুড়েই বাষুদূষণ উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। গবেষকদের দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টায় দেখা গেছে, ১৯৯০ সালের পর থেকে ১৯৫টি দেশে প্রায় ৩০০ রোগের প্রকোপ বেড়েছে। যার পেছনে সবচেয়ে বেশি দায়ী বাষুদূষণ।’

পৃথিবী জুড়ে মানব সভ্যতা যখন করোনাভাইরাসের সামনে অসহায় আত্মসমর্পণ করে মুক্তির প্রতীক্ষায় প্রহর গুনছে, কবে প্রতিরোধী ভ্যাকসিন আসবে। তখন প্রকৃতিই যেন ভারসাম্য রক্ষার আনন্দে মেতেছে। পৃথিবীর প্রায় সব দেশের কম বেশি সব শহরই লকডাউনের কারণে মানুষের গৃহবন্দী হওয়ায় প্রাণীকূলও মেতে উঠেছে। সামাজিক মাধ্যমে আমার বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন শহরে বিভিন্ন প্রাণীর পদচারণা দৃশ্য প্রতিদিনই দেখতে পারছি। এর অন্যতম প্রধান কারণ অবশ্যই পৃথিবীতে নিত্যকার  মানুষের কার্যক্রম  এবং মানবসৃষ্ট বিভিন্ন দূষণের মাত্রা কমে যাওয়া।

পরিবেশ যে কতটা পরিচ্ছন্ন এবং শুদ্ধ হতে পারে কোভিড-১৯ এর জন্য দীর্ঘ লকডাউন সেটা বোঝারও সুযোগ করে দিল জনগণকে। এই বোধ পরবর্তীতে পরিবেশ রক্ষা সংক্রান্ত ব্যাপারে বড় ভূমিকা নিতে পারে এবং পরিবেশ রক্ষার নীতি নির্ধারণেও বিশেষ বার্তা দিতে পারে। করোনা পরবর্তী বিশ্ব তথা দেশে কোনটা স্বাভাবিক তা আমাদেরই নির্ধারণ করতে হবে। লকডাউনে পরিবেশ সংক্রান্ত এই পাঠ অবশ্যই ভবিষ্যতে আলোচনা এবং বিতর্কের সুযোগ করে দেবে।

সাম্প্রতিককালের এই বায়ুপরিশুদ্ধতা মানের উন্নয়ন চিরস্থায়ী করতে গেলে জীবাশ্ম জ্বালানিকে পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি এবং অন্যান্য স্বল্প কার্বনযুক্ত শক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে প্রতিস্থাপন করতে হবে। সারাদেশের জন্য একটি নির্দিষ্ট নিঃসরণ মাত্রা (এমিশন স্ট্যান্ডার্ড) নির্ধারনের দাবীর, পাশাপাশি বিশেষজ্ঞরা অধিকমাত্রায় গণপরিবহন চালুরও দাবী জানাচ্ছেন। এর অর্থ এই নয় যে প্রচুর পরিমানে বাস কিনে সেগুলো গণপরিবহন বহরে যুক্ত করা । বরং যেটি করা উচিত তা হচ্ছে এমন ব্যবস্থা চালু করা যাতে নাগরিকরা ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারের পরিবর্তে সেই সব গণ পরিবহন ব্যবহার করতে শুরু করে। কারন শহরাঞ্চলে বায়ু দূষনের জন্য ৭০ ভাগ দায়ি হচ্ছে এসব ব্যক্তিগত গাড়ি। স্বল্প সময়ের জন্য দূষণমুক্ত পরিবেশ কোভিড-১৯ এর মহামারীর কালো আকাশে এক চিলতে আলো হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদের জন্য এটা আমাদের একটা বার্তা হতে পারে। পরিবেশ দূষণের কারণে সমগ্র পৃথিবীতে শুধু মানুষ যে মারা যাচ্ছে তা নয়। জন্ম নিচ্ছে নিত্য নতুন রোগব্যাধির। করোনার মতো ভাইরাসের আবির্ভাব হচ্ছে, যা মহামারী রূপে আক্রান্ত করছে কোটি কোটি মানুষকে। গভীর মৃত্যুর দিকে নীরবে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে পৃথিবীকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সালফার-ডাই-অক্সাইড, নাইট্রোজেন-ডাই-অক্সাইড, কার্বন মনোস্কাইড, পিএম ২.৫, পিএম ১০ এবং ওজন (ও৩), অ্যামোনিয়া-সহ নানা উপাদান বাতাসে স্বাভাবিক মাত্রা পার করলেই মানব শরীরের নানা ক্ষতিসাধন করে। এলার্জি, ফুসফুসে ক্যানসার, হৃদরোগ, সিওপিডি, হাঁপানি, ব্রঙ্কাইটিসের হওয়ার সম্ভাবনা কয়েকগুন বাড়িয়ে দেয়। তবে লকডাউনের কারণে আপাতত কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে বাতাস। পরিবেশের জন্য তবে কি লকডাউন ভবিষ্যৎ পৃথিবীর দাবি হতে চলেছে ?

সাম্প্রতিক প্রকাশিত দুটো গবেষণা পত্র উপরে উল্লেখিত বিষয়সমূহ কে পরিতুষ্ট করেছে। প্রথমটি, করোনার ভাইরাস সংক্রমণ নিয়ে গবেষণায় পিএলওএস ওয়ান জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে যে, কোভিড -১৯ বিশ্বব্যাপী মানুষের আয়ুতে প্রভাব ফেলতে চলেছে। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকার দেশগুলিতে করোনার ভাইরাস সংক্রমণের প্রভাবে গড় বয়স ১০ শতাংশ কমে যেতে পারে। এই গবেষণায় এক প্রকার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে যে, যদি স্বাস্থ্যসেবা, আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি এবং শিক্ষার ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী সংস্কার না করা হয় তবে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি অত্যন্ত মারাত্মক হবে। দ্বিতীয়টি,স্টেট অব গ্লোবাল এয়ার রিপোর্ট (‘সোগা’) উদ্বেগজনক খবর জানিয়েছে, শুধু বায়ুদূষণের জন্যই গত বছর ভারতে মৃত্যু হয়েছে ১৬ লক্ষ ৬৭ হাজার মানুষের। প্রকাশিত ওই রিপোর্ট বলছে ভারতে শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের মৃত্যুতে সবচেয়ে ব়়ড় কারণ হয়েছে বায়ুদূষণ।

যুগের পর যুগ ধরে কোটি কোটি মানুষকে প্রাণ হারাতে হয়েছে স্বাস্থ্য বিপর্যয়ে বা মহামারিতে। অনেক বিখ্যাত মনীষীও আক্রান্ত হয়েছেন এসব রোগে। অনেকেই ছিলেন গৃহবন্দি হয়ে। ফ্রান্সের রাজা অষ্টম চার্লস, ক্রিস্টোফার কলম্বাস, হার্নেন কার্তেজ, লিও তলেস্তয়, নিৎসে, বদলেয়ার, মোপাঁসা, জার্মান কবি হেনরিক হাইনে, মুসোলিনি, হিটলার, লেনিন, বিখ্যাত ডাচ চিত্রকর রামব্রেন্ড, বাংলার শরৎচন্দ্র, রবিঠাকুর পর্যন্ত। সেই অস্বাভাবিক বিপর্যয়ের দিনগুলোতে তাঁদের রচনা বিশ্বসাহিত্যে অনন্য স্থান করে নিয়েছে। আবার মহামারী বা দুরারোগ্য ব্যধিতে কেড়ে নিয়েছে অনেকে বিখ্যাত প্রতিভাবান মনীষীদের। শিশুসাহিত্যিক ও ভারতীয় সাহিত্যে “ননসেন্স ছড়া”র প্রবর্তক সুকুমার রায় তৎকালীন মহামারী কালাজ্বরে (লেইশ্মানিয়াসিস) আক্রান্ত হন। মাত্র সাঁইত্রিশ বছর বয়সে এই বিরলতম প্রতিভার জীবনাবসান ঘটে। শরীরে প্রথম ম্যালেরিয়া ও পরে দুরারোগ্য ক্ষয়রোগে আক্রান্ত হয়ে কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য মাত্র ২১ বছর বয়সে আমার তাঁকে হারিয়েছি। একিভাবে বিখ্যাত কবি জন কিটস যক্ষায় মাত্র ২৫ বছর বয়সে মারা যান। বিভিন্ন দুরারোগ্যব্যধিতে ধ্রুপদী পাশ্চাত্য সঙ্গীত যুগের বিখ্যাত অস্ট্রীয় সুরকার আমাডেউস্‌ মোৎসার্ট এর জীবনকাল ৩৫ বছর বয়সেই শেষ হয়ে যায়। ভারত তথা বিশ্বের হিন্দুধর্মের মহামানব, যুগাবতার স্বামী বিবেকানন্দ মাত্র ৩৯ বছর বয়সে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন। অনেকে বিশেষজ্ঞ বলেছেন ‘সেরিব্রাল স্ট্রোক’ কারণ হতে পারে এই মহাপ্রয়াণের।

বিশ্বজুড়ে চলা মারণ করোনাভাইরাস আর বায়ুদূষণের যৌথ মহামারীর ধ্বাক্কায় মানুষের জীবনের আয়ুষ্কাল কতটা অবনমন ঘটবে তা ভবিষ্যতেই জানা যাবে। এই মহামারীদ্বয়ের দাপটে নব্য-স্বাভাবিক (নিউ নর্মাল) পৃথিবীতে মানুষের মৃত্যুর হার বৃদ্ধি কতটা হয়, গবেষকদের ভবিষ্যত গবেষণায় জানাযাবে। পরিশেষে যেটা বলা যায়, মানুষ হিসেবে আমরা অবশ্যই ভালোভাবে মৃত্যুবরণ করতে চাইবো, সেটাই স্বাভাবিক। তবে জীবনকে উপভোগ্য করার পাশাপাশি সুস্থ সুন্দরভাবে সুদীর্ঘ কাল বেঁচে থাকার জন্য চাই সুপরিকল্পিত সার্বিক স্বাস্থ্যপরিষেবা সঙ্গে মহামারী নিয়ন্ত্রিত জীবন। বর্তমানে ‘অসুররূপী’ দূষণ পৃথিবীর প্রাণ শক্তিকেই চ্যালেঞ্জ করছে। “যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ/প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল,/এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি—/নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।”  জীবনের এই অঙ্গিকারকে দৃঢ়ভাবে এগিয়ে নিয়ে যেতে না পারলে হয়তো ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের দোষারোপ করার জন্যও সূর্যের আলো পর্যন্ত দেখতে পাবে না!


তথ্যসূত্র:

  1. বিবিসি নিউজ,
  2. স্ট্যান্ডফোর্ড ম্যাগাজিন,
  3. উইকিপিডিয়া,
  4. এনআইইএইচএস ওয়েবসাইট,
  5. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় মেডিসিন লাইব্রেরীর (এনসিবিআই) তথ্য এবং
  6. বিভিন্ন সংবাদপত্রের প্রকাশিত সংবাদ

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3608 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...