অন্তেবাসী — ১৮তম পর্ব

পীযূষ ভট্টাচার্য

 

পূর্ব প্রকাশিতের পর

নানমাসির কথাতে ছিল মহাপ্রলয়ের কথা। তিনি কিন্তু একবারের জন্যও ভূমিকম্পের কথা উচ্চারণ করছেন না। ঘুরেফিরে সেই মহাপ্রলয়। তাঁর কথার মধ্যে আছে যিশু নিজেই রুষ্ট হয়ে এই কাণ্ড ঘটিয়েছেন, তাই এই প্রলয়। নন্দন কাননের অবাধ্যতায় তিনি এতটাই রেগে গিয়েছিলেন যে মানুষকে করুণাক্ষেত্র থেকে তাড়িয়ে দেন। এরপর মানুষের একটিই উপায়। তাঁর সঙ্গে একাত্ম করতে হলে এমনভাবে উৎসর্গ করতে হবে তা যেন কৃত পাপের সমান হয়।

ঠিক এ-ধরনের কথা কি নানমাসি বলেছিলেন তা অবশ্য মনে নেই। আর যদিও বা বলে থাকেন বোঝার মতন বোধবুদ্ধি তখন হয়নি। তবে মনে হচ্ছে গির্জাটি ধ্বংস হওয়ার প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন পুনরুত্থান শব্দটি। এবং এই শব্দটির ওপর বিশেষ করে জোর দিচ্ছিলেন। সেদিন কিন্তু বুঝিনি। মনে হচ্ছিল নিজের প্রথম শোনা পুনরুত্থান শব্দটি আঁকড়ে আছেন যেন। আসলে এটা যে বাইবেল থেকে নেওয়া তা জানতে নিজেকে মধ্যবয়সে পৌঁছতে হয়েছে।

এই সবকিছুই যেন ১৮৭৩-এর ভূমিকম্পের স্মৃতি থেকে বেরিয়ে আসবার প্রচেষ্টা মাত্র। আবার এও হতে পারে কোনও বিশ্বাসের মূল যদি নড়ে যায়, তবে মূলসুদ্ধ বিশ্বাসকে পুনরায় স্থাপন করে বাঁচিয়ে রাখবার জন্য জীবন সঁপে দেওয়া। এরকম এক বিশ্বাসের মধ্যে গির্জার দরজা খুলে দিতেই আমরা সকলেই হতবাক।

কেননা শেষবেলার রোদ গির্জাঘরের ডানদিকের দেওয়ালের শার্সিতে পড়ে যিশুর মূর্তি আলোকিত হচ্ছে ক্রমাগত। আবার আলোর বিচ্ছুরণ পড়ছে অপরদিকের দেওয়ালের শার্সিতে। সেখানেও ফুটে উঠছে যিশুর ছবি। গির্জার স্থাপত্যটাই এরকম— সকালে বামদিকের শার্সি উজ্জ্বল, বিকালে ডানদিকের। এসব দেখার পর মাথার ভিতর খেলা করেছিল— রাত্রি নামলে সব অন্ধকার— বর্ণময় আলোর বিচ্ছুরণ নেই— তখন কি যিশুর সব মূর্তিগুলো দেওয়ালের শার্সি থেকে নেমে ক্রুশবিদ্ধ যিশুর সঙ্গে মিলে যায়?

এইসব ভাবনার ভেতর কখন যে পায়ের ক্যাম্বিসের জুতো খুলে গির্জার ভেতরে প্রবেশ করেছি জানি না। যিশুর ছবি নিয়ে মিছিল যেভাবে শুরু হয়েছিল সেভাবে কিন্তু শেষ হল না। কেননা বাবলু দরজায় দাঁড়িয়ে আছে ভেতরে না ঢুকে। জিজ্ঞেস করতেই বলে তার পায়ে স্যু। একবার খুললেই ফিতে আর বাঁধতে পারবে না।

–ফিতে তো আমিও বাঁধতে পারি…
–তুই তো ক্যাম্বিসের জুতোতে পারিস। এটা তো স্যু, একমাত্র ডলিদিই পারে, ফিতে দিয়ে কী সুন্দর প্রজাপতি করে দেয়…

ওর কথা সম্পূর্ণ না শুনেই এক দৌড়ে মার পাশে দাঁড়িয়ে পড়ি। মা প্রথম দেখাতেই বলে ওঠে “কোথায় গিয়েছিলি?” কিন্তু উত্তরের অপেক্ষা না করেই দরজায় বাবলুকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বলে ওঠে “ওখানে কী করছিস?”

এবারে উত্তরটা আমিই দিয়ে দিলাম— ওর স্যুর প্রজাপতি নষ্ট হয়ে যাবে। জুতো খুলে ঢুকতে হবে তো!

–রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে কী করবে? জুতো পরেই ঘুমোবে নাকি?

নানমাসিও হেসে ওঠে মার সঙ্গে। সেই সুযোগে বলে উঠে আমি ঘণ্টাঘরটা দেখতে চাই। তার সঙ্গে সঙ্গে সেদিন রাত্রে ঘণ্টার যে সুরেলা ধ্বনি ছড়িয়ে পড়েছিল তা এখান থেকেই শুরু হয়েছিল কিনা তার একটা মীমাংসা চাইছিলাম। কিন্তু নানমাসি বলে ওঠেন— ঘণ্টা তো আবার বড়দিনে বাজবে।

এ কথা শুনে চুপ করে যেতেই নানমাসি হেসে উঠে আমার চুল অবিন্যস্ত করে দিয়ে বলেন— গির্জাঘরের পাশে ঘড়িঘর, সেখানেই ঘণ্টা থাকে। তার উপরে একটা ঘুলঘুলি আছে। ওখান থেকেই আমরা সূর্যোদয় দেখি।

–বাবলু যে বলল টাইগার হিল ছাড়া সূর্যোদয় দেখা যায় না?

তখনই মার ম্যালে যাওয়ার কথা মনে পড়ে গেল। এবং বোনকে অনেকক্ষণ দুধ খাওয়ানো হয়নি, সেকথাও। তাই আমার ঘণ্টাঘর দেখা আপাতত বাতিল। এসবের মধ্যে ফিসফিস করে কিছু একটা বলতেই নানমাসি আমাদেরকে নিয়ে আসে রেস্টরুমে। সেখানেই বাবলু নিবিষ্টভাবে লক্ষ করে আমার ক্যাম্বিসের জুতোতে প্রজাপতি তৈরি করা। প্যাঁচটা শিখতে চায় এবং তা শিখিয়েও দিই। একসময় নিজের স্যুতে তা করতে পেরেই চিৎকার করে ওঠে— ফুল মাসি আমিও পারছি!

–ভেরি গুড। এবার ম্যালে যাওয়া যাক।

নানমাসি নিজে সঙ্গে না গিয়ে একজন অল্পবয়সি নানকে জুড়ে দেয়— যে অনায়াসে বাবলুকে সামলাতে পারবে ঘোড়ার কাছে না-যাওয়া থেকে, আবার মাকে সামলাতে পারবে বিশেষ করে সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামার সময়। বাবলু অবশ্য একবারই মাত্র ঘোড়ার কাছে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল। মার চোখই তাকে সাবধান করে দেয়, সেই নানের কোনও দরকার পড়েনি এক্ষেত্রে। তার পরপরই বাবলু ‘বুড়ির চুল খাই’ বলে নতুন নানের হাত ছাড়িয়ে এক দৌড় দেয়। এবার আমি নতুন নানকে আশ্বস্ত করি— “চিন্তার কোনও কারণ নেই, আমি দেখছি।” বলে নিজেও এক দৌড়ে পৌঁছে যাই।

কথাটা সেদিন বড়দের মতো বলেছিলাম বলে আজও মনে আছে। কিন্তু বুড়ির চুল কী পদার্থ দেখবার জন্য চরম বিস্ময়ে দেখলাম একটা যন্ত্র থেকে চুলের মতন গোলাপি রঙের বেরিয়ে আসছে এবং তাকে কাঠিতে জড়িয়ে বাবলুর হাতে দিতেই বাবলু আরও তিনটের কথা বলে। কিন্তু নতুন নান হেসে জানিয়ে দেয় তার জন্য না নিতে।

মার জন্য যেটা তৈরি হল সেটা পৌঁছে দিতে গিয়েই দেখি মা নেই সেখানে, কেবলই কুয়াশা! কিন্তু যতই এগোচ্ছি কুয়াশা ভেদ করে ততই অস্পষ্ট অবয়ব ফুটে ওঠে, একসময় স্পষ্ট হয়ে যায়। যদিও চতুর্দিকে কুয়াশা, মা মধ্যে স্থির হয়ে বসে আছে। মাকে জড়িয়ে কেঁদে ফেলেছিলাম— “তোমাকে খুঁজে পাচ্ছিলাম না!” “দূর বোকা, আমি তো কুয়াশায় ডুবে ছিলাম। তোদেরকেও দেখতে পাচ্ছিলাম। এখন দ্যাখ, সব পরিষ্কার।”

নতুন নান বাবলুর এক হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে। বাবলু কুয়াশার কোনও ধার না ধেরেই আপন মনে খেয়ে চলেছে। সব কিন্তু মেজমাসির বয়ামের পয়সায় কেনা শুনেও একটা কামড় বসিয়ে দিল বুড়ির চুলে। তখন আমি বললাম— বুড়ির চুল খাচ্ছি এই প্রথম।

“আমরাও”, বলে মা হেসে ওঠে শব্দ না করে।

বাবলু অবশ্য বুড়ির চুল খেয়ে ফেলেই চকলেটের দোকানের দিকে রওনা হয়। যে চকলেটগুলো সোনাদাতে পাওয়া যায় না সেগুলো কিনে নেয়। অবশ্য আমার জন্যও কেনে, তবে তার মধ্যে কিছু বিদেশি। তা দেখে নতুন নান বিড়বিড় করে বলে ওঠে— এত পয়সা বাচ্চা ছেলেকে দিতে নেই।

–ওকে কেউ দেয়নি। খুচরো পয়সার বয়াম থেকে নিয়েছে। ওরা সকলেই নেয়।
–পয়সার হিসেব থাকবে না?
–এ পয়সার হিসেব নেই। বলে, চুপ করে গেলাম। নতুন নান কী বুঝলেন তিনিই জানেন। তবে এ বিষয়ে আর একটাও কথা বলেননি। শুধু বলেছিলেন— সন্ধে হয়ে এল, ফিরতে হবে।

সামান্য পথটুকু যেতেই সন্ধে হয়ে গেল। তবে, অত ঘোর নয়। অন্ধকার ঘনত্বে পৌঁছায়নি। আবছা। এতে মা সবচেয়ে খুশি। কেননা গির্জায় উঁচু সিঁড়িগুলি কারও সাহায্য ছাড়াই বোনকে নিয়ে উঠতে পারবে বলে। নিজে কিন্তু আটকে গেলাম ইংরেজিতে St. Andrew’s Church লেখা বোর্ডটিতে। প্রতিটি অক্ষর চিনি, কিন্তু উচ্চারণ করতে পারছি না কেননা এস-টির পরে ফুলস্টপের কী অর্থ তাই জানি না। বোর্ডের আলো জ্বলে গেছে। পাঠোদ্ধারের হিমশিম অবস্থা থেকে নানমাসি উদ্ধার করেন।

–তুমি ইংরেজি অক্ষর চেনো?

মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলতেই বুঝিয়ে দিলেন এসটি ফুলস্টপ হচ্ছে সেন্ট। “তোমাদের সন্ন্যাসীদের মতো। সেন্ট অ্যান্ড্রুজ চার্চ এটা। বুঝলে?”

ততক্ষণে মা অবশ্য বাবলুকে নিয়ে রেস্ট হাউসে চলে গিয়েছে। কেননা বোনের খাওয়ার সময় হয়ে গেছে। সেজন্য যেকোনও সময় বোন হামলে উঠতে পারে মার বুকের উপর অথবা কান্না জুড়ে দিতে পারে। সেই কান্নায় গির্জার গাম্ভীর্য খানখান হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে বলেই হয়তো মা চলে গেছে। কিন্তু নানমাসি বলেই চলেছেন— সেন্ট অ্যান্ড্রুজ ছিলেন স্কটল্যান্ডের অধিবাসী আর এখানে ছিল স্কটল্যান্ডের প্রচুর মানুষজন। কেউ চা বাগান কেউ সেনাবাহিনীতে কাজ করত। প্রভুর যে মূর্তিটা দেখলে গির্জা নতুন করে পুনরুত্থানের সময় স্কটল্যান্ড থেকে জাহাজে করে ভাস্কর এসে তৈরি করেছিলেন।

গির্জাটা কেন যে পাহাড়ের গায়ে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এ কথা বলবার আগেই রেস্ট রুমে পৌছে যাই। নানমাসিও বেরিয়ে যান সন্ধ্যার টিফিনের ব্যবস্থা করতে।

আবারও আমি ঘণ্টাঘরের কথা নানমাসিকে মনে করিয়ে দিতেই মা বলে ওঠে— ছেলেটার মাথা থেকে ঘণ্টাঘর যাচ্ছে না।

আমি উত্তর দেওয়ার আগেই নানমাসি বলে ওঠেন “যাবে কী করে! ঘণ্টার ঢং ঢং ধ্বনিই তো জীবনের রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা। ও হয়তো কোথাও শুনে থাকবে…”

রাত যখন ভোর হয় তখনই ঘণ্টার ধ্বনি বেজে ওঠে। তারপর সকাল, সকাল গড়িয়ে দুপুর, এবং তা গড়াতে গড়াতে রাতে পৌঁছে যায়। রূপান্তরিত একেকটা দিন শেষ, এই শেষ হয়ে যাওয়ার মধ্যেই থাকে ঘণ্টার গম্ভীর সুর।

এখন অবশ্য একবারই বাজে বড়দিনে। নিউ ইয়ারে বাজে কিনা জানতে চাইলে তিনি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে ওঠেন— ও তো বড়দিন শেষ হওয়ার ঘোষণা মাত্র।

 

আবার আগামী সংখ্যায়


সমস্ত পর্বের জন্য ক্লিক করুন: অন্তেবাসী – পীযূষ ভট্টাচার্য

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3545 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Trackback / Pingback

  1. অন্তেবাসী — ১৯তম পর্ব – ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

আপনার মতামত...