মঙ্গলেশ ডবরাল: পাহাড়ের অন্ধকারে জ্বলে ওঠা লণ্ঠন

রূপায়ণ ঘোষ

 


কবি, গদ্যকার

 

 

 

রাত্রির অন্ধকারে শিয়র ছুঁয়ে যাচ্ছে হরিদ্বর্ণ এক পাহাড়
মহান শিখরের কাছে নতজানু তোমার দ্বিধান্বিত কণ্ঠস্বর।

– অন্তরাল/ পাহাড় পর লালটেন।

কবি মঙ্গলেশ ডবরাল। প্রগতিশীল বামপন্থী চিন্তা-চেতনায় বিশ্বাসী হিন্দি ভাষার এই জনপ্রিয় কবি তাঁর কবিতার অন্তর্নিহিত শরীরে নির্মাণ করেছেন সমাজ-বৈষম্যের সাঙ্কেতিক চিহ্নসমূহ। বহিরঙ্গে দেখলে, তাঁর কাব্যিক চেতনাকে এক মহানৈসর্গিক আলোকের বিচ্ছুরণ বলে ভ্রম হতে পারে কিন্তু আদতে তাঁর মৃদু অথচ তীক্ষ্ণ কণ্ঠস্বরে বরাবর স্থান পেয়েছে পুঁজিবাদী উন্মাদনার প্রতি তীব্র শ্লেষ তথা সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধ মানসিকতা।

মঙ্গলেশ ডবরালের জন্ম হয় ১৯৪৮ সালের ১লা মে তেহরি-গড়ওয়াল রাজ্যের কাফলপানি গ্রামে (বর্তমানে এটি ভারতের উত্তরাখণ্ড রাজ্যের অন্তর্গত)। পরবর্তীকালে তিনি দেরাদুনে নিজের পড়াশোনা শেষ করেন।

১৯৬০-এর দশকের শেষদিকে দিল্লিতে চলে আসার পরে ডবরাল ‘হিন্দু প্যাট্রিয়ট’, ‘প্রতিপক্ষ’ তথা আশপাশের স্থানীয় পত্রিকাতে জীবিকার জন্য কাজে যোগ দেন। বেশ কিছু সময় স্থানীয় সংবাদপত্রে কাজ করার পর ভারত ভবনের ‘পূর্বাগ্রহ’-এর সম্পাদক হিসাবে তিনি মধ্যপ্রদেশের ভোপালে চলে আসেন। সেখানে প্রায় বছর পাঁচেক চাকরির পর সাতের দশকের শেষ পর্যায়ে তিনি ‘জনসত্তা’-র সম্পাদক হন। ‘সাহারা সাময়ী’-তে যোগ দেওয়ার পূর্বে এলাহাবাদ ও লখনউ থেকে প্রকাশিত ‘অমৃত প্রভাত’-এর মতো পত্রিকাও তিনি সম্পাদনা করেন। পাশাপাশি পরামর্শক হিসাবে ‘ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট’ এবং হিন্দি মাসিক পত্রিকা ‘পাবলিক এজেন্ডা’-র সম্পাদক হিসাবেও তিনি কাজ করেছিলেন দীর্ঘদিন।

মঙ্গলেশ ‘জনসত্তা’-র রবিবারি পত্রিকার সম্পাদক হিসাবে প্রভূত খ্যাতি লাভ করেন। এ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত কবি যোগেন্দ্র যাদব বলেছেন, “এই পত্রিকার আড্ডায় তিনি অসংখ্য তরুণ হিন্দি লেখক ও তাঁদের সমগ্র প্রজন্মকে প্রশ্রয় এবং পথ– দুটোই দান করে গেছেন।”

প্রকৃত অর্থে, মঙ্গলেশ তাঁর অসামান্য কলমের জাদুতে সাহিত্য ও সাংবাদিকতার মধ্যে এক আশ্চর্য যোগসূত্র স্থাপনে সক্ষম হন।

তাঁর প্রধান পাঁচটি কাব্যগ্রন্থ, ‘পাহাড় পর লালটেন’, ‘ঘর কা রাস্তা’, ‘হাম যো দেখতে হ্যায়’, ‘আওয়াজ ভি এক জগাহ হ্যায়’, ‘নয়ে যুগ কে শত্রু’।

গদ্যগ্রন্থ হিসাবে ‘লেখক কী রোটি’ ও ‘কবি কা আকেলাপন’ আলাদাভাবে উল্লেখের দাবি রাখে। তিনি অরুন্ধতী রায়ের বুকার পুরস্কার জয়ী “The Ministry of Utmost Happiness” গ্রন্থটি হিন্দিতে “অপার খুশি কা ঘরানা” নাম দিয়ে অনুবাদ করেন।

মঙ্গলেশ তাঁর কবিতা সংগ্রহ ‘হাম যো দেখতে হ্যায়’-এর জন্য ২০০০ সালে সাহিত্যে ভারত সরকারের দেওয়া সর্বোচ্চ সম্মান ‘সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার’-এ ভূষিত হন। তাঁর কবিতাগুলি সমস্ত প্রধান প্রধান ভারতীয় ভাষাসহ ইংরেজি, রাশিয়ান, জার্মান, ডাচ, স্প্যানিশ, পর্তুগিজ, ইতালিয়ান, ফরাসি, পোলিশ এবং বুলগেরিয়ান ছাড়া আরও বেশ কয়েকটি বিদেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। তিনি আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ওয়ার্ল্ড রাইটার্স প্রোগ্রাম’-এ সম্মানীয় অতিথি হিসেবেও অংশগ্রহণ করেন।

মঙ্গলেশ ডবরাল বর্তমান ভারত সরকারের সোচ্চার সমালোচক ছিলেন এবং সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে তাঁর কণ্ঠ বারংবার উচ্চকিত হয়েছে। এমএম কালবুর্গির হত্যার প্রতিবাদে ২০১৫ সালে তিনি সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার ফিরিয়ে দেন। তাঁর সাম্প্রতিক রচনা ‘নয়ে যুগ মে শত্রু’ আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে দেশের বর্তমান সঙ্কটময় অবস্থার প্রতিফলিত কাব্যিক ভাষ্য হিসাবে বিবেচিত হয়েছে।

সমসাময়িক হিন্দি ভাষার কবিদের মধ্যে ডবরালকে শীর্ষস্থানীয় বিবেচনা করা হত। নিম্নবিত্তের মুখের ভাষা যেমন তাঁর কবিতার কণ্ঠ হয়ে উঠেছে তেমনই সেই চিত্রকল্পের সুনির্দিষ্ট ব্যবহার সমসাময়িক হিন্দি কবিতাকে দিয়েছে একটি নতুন সামাজিক সংবেদনশীলতা– যা নির্মাণের কৃতিত্ব একান্তই তাঁর।

হিন্দি কবি আসাদ জায়েদী উল্লেখ করেছেন, “কবি হিসেবে তাঁর কোনও দেখনদারি ছিল না তবে তাঁর ভাষার সাবলীলতা এবং সর্বস্তরের সমাজবর্গকে কবিতার ভূমিতে বাঙ্ময় প্রতিষ্ঠা দেওয়ার সারল্য হিন্দি কবিতায় নতুন সম্ভাবনার বীজ বপন করেছিল।” মঙ্গলেশ কখনোই তাঁর অস্তিত্ব থেকে পাহাড়কে ত্যাগ করেননি। তাঁর যাবতীয় কবিতা পাহাড়ের প্রতি তীব্র আকাঙ্ক্ষা, সরলতা, সেই কর্মঠ সমাজ-সংস্কৃতির উল্লাসকে প্রকাশ করেছে কখনও মহাকাব্যিক রোমান্সে তো কখনও চূড়ান্ত প্রতিবাদী সত্তায়। আসলে তাঁর কবিতা ব্যক্তি তথা রাষ্ট্রের বিপন্নতা, সংবেদনশীলতা এবং অসহায়ত্বের কথা বলে। জনসত্তার চেয়ে বৃহৎ মতবাদ তাঁর কাছে কিছুই নেই, তাই তিনি মনে করতেন কবি ও সাংবাদিকদের কাজ হল, সমাজের সমস্তরকম একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলা এবং সেই মর্মে সাহিত্যকে যদি এর মাধ্যম হতে হয় তবে সমাজের সাংস্কৃতিক পরিকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে তা হল সর্বোত্তম উপায়। অথচ স্থানে স্থানে তিনি আক্ষেপ করেছেন, এ দেশের সাহিত্য ধীরে ধীরে ক্ষমতার ঘেরাটোপে প্রবেশ করে দাসসুলভ আচরণে মত্ত হয়েছে। ভাষার হিংসা ক্রমশ গ্রাস করেছে সমাজের হৃদয়কে; আসলে ভাষার আড়ালে ক্ষমতার সার্বিক দখলই ফ্যাসিবাদের মূলমন্ত্র। এর বিরুদ্ধেও প্রতিনিয়ত কলম সোচ্চার থেকেছে তাঁর –

একটি ভাষায় অ লিখতে চাই
অ-এ আঙুর, অ-এ অপরূপ
কিন্তু লেখা হয় অ-এ অনর্থ, অ-এ অত্যাচার!
ক-এ সর্বদা কলম কিংবা ক‍রুণা লিখতে চেয়েছি
অথচ ক-এ ক্রোধ, ক-এ ক্রূরতাই লেখা হয়।

–বর্ণমালা/ হাম যো দেখতে হ্যায়

নিজস্ব অস্তিত্বের বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেছেন, এতদিন কবিতা লিখে এসেছি তাই আমি কবিতা লিখি। প্রকৃতপক্ষে তিনি মনে করেন, বর্তমান সময়ে সভ্যতার চতুর্দিকে যে শক্তি বিরাজমান তা আদতে ‘বাজারবাদী’ বৈষয়িক আগ্রাসনের শক্তি। এই শক্তি সমাজের যে কোনও রচনাত্মক পদক্ষেপের পরিপন্থী। সৃষ্টি ও নির্মাণের প্রতি বিন্দুমাত্র প্রেম তথা সহানুভূতি তাদের নেই। সুতরাং এই চতুর্মাত্রিক লালসার চক্রব্যূহে যদি টিকে থাকতে হয় তবে রচনাত্মক ভঙ্গিতেই থাকতে হবে এবং প্রতিমুহূর্তে সময়ের পরিবর্তনশীলতাকে ধারণ করে যাবতীয় অন্যায়ের বিপক্ষে অগ্রসর হতে হবে।

এ বিষয়ে সন্দেহের কোনও অবকাশ নেই যে, মঙ্গলেশ ডবরালের নির্ভীক কলম সমাজের প্রান্তিক শ্রেণির দৃঢ় কণ্ঠ রূপে উত্থিত হয়েছে। সাংবাদিক মৃণাল পাণ্ডে এ প্রসঙ্গে বলেছেন, “মঙ্গলেশ ডবরাল হিন্দি ভাষার অন্যতম সদর্থক ও প্রতিবাদী মননের অধিকারী ছিলেন।”

তাঁর কবিতা যেমন সামাজিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে বারবার উদ্বেলিত হয়েছে তেমনই সৃষ্টির চিরকালকালীন রহস্যকে কখনোই অস্বীকার করেনি। সদা অন্তর্মুখী এই কবি তাঁর রচনাগুলিকে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে বহির্মুখী করে তুলছেন, কারণ তিনি মনে করেন কবিতার সামান্য কোনও পঙক্তিও যদি সাধারণের ভিতরে স্পন্দন তুলতে পারে তবেই তা যথার্থ রচনাত্মক চেতনার ক্রমোন্নতির ধারক –

কিছু শব্দ চিৎকার করে,
কিছু শব্দ তাদের পোশাক ছিঁড়ে প্রবেশ করে
তীব্র মোহান্ধকারে!
কিছু শব্দ ক্রীতদাস উল্লাসে
নীরব হয়ে যায় ক্ষমতার বিবর্ণ ইতিহাসে।

–শব্দ/ পাহাড় পর লালটেন।

মঙ্গলেশ ডবরালের মৃত্যু যে হিন্দি তথা ভারতীয় সাহিত্যের ক্ষেত্রে এক অপূরণীয় শূন্যতা সেকথা বলার অপেক্ষা রাখে না। তাঁর কবিতার মতো করেই তিনি নক্ষত্রপ্রতিম উজ্জ্বলতায় পাহাড়ের উপ‍র উঠে যাচ্ছেন, হাতে ধরা বিমুক্ত লণ্ঠন। আমরা সেদিকে দেখতে থাকি, তিনি আরও উচ্চ শিখরের দিকে ধাবমান; আমরা দেখতেই থাকি- কীভাবে শৃঙ্গের অহঙ্কার জয় করে আলো।

Facebook Notice for EU! You need to login to view and post FB Comments!
About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3901 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...