মছলিবাবার অভিনয় রহস্য এবং মনু মুখোপাধ্যায়

প্রিয়ক মিত্র

 



গদ্যকার, প্রাবন্ধিক

 

 

 

‘যেমন-তেমন সাধু হলে হত না। কিন্তু এর মধ্যে একটা রহস্যের গন্ধ পাচ্ছেন না আপনি? মছলি-বাবা– নামটাই তো ইউনিক!’ জটায়ুর বয়ানে ‘বারাণসীর মছলি বাবা’-র এই দ্যোতনা চরিত্রটাকে ঘিরে যে রহস্যের বাতাবরণ তৈরি করেছিল, গোটা উপন্যাসজুড়েই তা বাহিত হয়েছে। গল্পে নিরঞ্জনবাবু মছলিবাবার নাম দিয়েছিল ‘আবলুসবাবা’। সেই নামকরণ সার্থক– সে কথা জানিয়ে তোপসে বলেছিল, যে মছলিবাবার গায়ের রং নাকি এতটাই ‘মসৃণ কালো’ যে তা দেখতে লাগে ‘সাপের খোলস’-এর মতো। এমন আশ্চর্য একটি চেহারার বর্ণনা, ইলাস্ট্রেশনে সেই চেহারার আভাস ফুটিয়ে তোলা এবং সাধুবাবার জাদুটোনার পিছনে অপরাধ এবং ষড়যন্ত্রের জাল– সবটা মিলিয়েই চরিত্রটার একটা আভাস তৈরি হয়েছিল। আশ্চর্য লাগে, ছবি করার সময় সত্যজিৎ সেই আভাস এড়িয়ে গেলেন কীভাবে! মছলিবাবা কাল্ট হয়ে রইল, কিন্তু সেটার আদত কারণ সিনেমায় মছলিবাবা চরিত্রটির গঠন নয়, ভালো করে লক্ষ করলে দেখা যায়, কটিমাত্র অনুঘটক এই চরিত্রটির চিরস্মরণীয় হয়ে থাকার। রেবা মুহুরীর গলায় দুটি মীরার ভজন, মছলিবাবার বাণী দেওয়ার একটি দৃশ্য, আরেকটি দীর্ঘ দৃশ্য যেখানে ফেলুদা মছলিবাবার ছদ্মবেশের আড়ালের রহস্য ভেদ করছে‌, এব‌ং শেষে স্বয়ং ফেলুদার মছলিবাবা সাজা। তাহলে মনু মুখোপাধ্যায়কে ‘মছলিবাবা’ হিসেবেই মনে রাখার কারণ কী?

এর একটাই কারণ, বাঙালির বিস্মরণ এবং সহজে মনে রাখার রোগ। ভেবে দেখলে, কেন মনু মুখোপাধ্যায় মছলিবাবা হয়ে উঠলেন– এই প্রশ্নের উত্তরে মনু মুখোপাধ্যায়ের অভিনয়গত দক্ষতার যে তাস লুকনো, তা অনায়াসে দর্শকের চোখ এড়িয়ে গিয়েছে। এই ছবিতে মছলিবাবার সেই স্পেস নেই, যা উপন্যাসে রয়েছে। সেই রহস্যময় ইলাস্ট্রেশনে যে মছলিবাবাকে দেখা যায়, তার সঙ্গে সিনেমার মছলিবাবার কোনও মিল নেই। উপন্যাস শুরু হয় মছলিবাবাকে দিয়ে, শেষে মছলিবাবার সূত্রেই রহস্যের পর্দা খোলে। উপন্যাসের ক্লাইম্যাক্সে মছলিবাবার গঙ্গায় ডুব মারা যেদিকে মোড় নেয়, ভাবলে গায়ে কাঁটা দেয়। আর এখানেই তো পরিচালকের মুনশিয়ানা! লেখক নিজেই যখন পরিচালক, তখন তিনি নিজেরই উপন্যাসের অমন লোভনীয় সিনেম্যাটিক সম্ভাবনা এড়িয়ে গিয়ে অপেক্ষাকৃত সরল আখ্যান তৈরি করলেন, অথচ সেটাকেই আইকনিক করে তুললেন।

এইবার, এই সূত্রেই আসা যাক সিনেমার মছলিবাবার প্রসঙ্গে। এবং মনু মুখোপাধ্যায় কতটা ফাংশনাল অভিনেতা– সেই আলোচনায়। একটু ভালো করে দুটো দৃশ্যের কথা ভাবুন। একটা দৃশ্যে মছলিবাবা তার ছদ্মবেশে। সেখানে প্রথম দেখা যাচ্ছে তাকে। গান চলছে। রেবা মুহুরীর আশ্চর্য গলা! রহস্য, চক্রান্তের আলোআঁধারি নেই। নেই, কারণ সত্যজিৎ কোনও নিও নয়্যার কাঠামোর ভিতরে ঢুকতেই চাননি। বরং, সাদা চোখে যা নেহাতই সহজ ভক্তিমূলক আসর বলে মনে হচ্ছে, তার ভেতরের আসল কিসসা উন্মোচনের কাজটা তিনি করতে চেয়েছেন অন্য একটি দৃশ্য মারফৎ। যেখানে ফেলুদা বেনারসের গলি দিয়ে ঢুকে পড়ছে ওই আগের দৃশ্যের ব্যাকস্টেজে।

এই ‘ব্যাকস্টেজ’ কথাটার মধ্যে একটা সূক্ষ্ম ইঙ্গিত লুকিয়ে আছে। সেই ইঙ্গিতটা আর কিছুই নয়, সেই আসরে মছলিবাবার বাণী দেওয়ার ভেতরে একটা দ্বিস্তরীয় পারফরমেন্সের খেলা রয়েছে। একটা পারফরমেন্স ছদ্মবেশী মছলিবাবাই দিচ্ছেন। তিনি সত্যিই বাবাজি হলে সেই পারফরমেন্স জায়েজ, কারণ ভক্তদের সামনে তিনি যা দেখাবেন, তা একরকম পারফরমেন্স তো বটেই। আরও একটি সূত্র হল, মছলিবাবা আসলে বাবাজিই নন, ‘সাজানো বাবাজি’। সেই সাজার জন্য আসলে তিনি যা করছেন, তাও একরকম অভিনয়, পারফরমেন্স। মনু মুখোপাধ্যায় যদি দুটি দৃশ্যে দুরকম অভিনয় করেও থাকেন, তা আসলে একটিই চরিত্রে অভিনয়, এবং সেটা অভিনেতা হিসেবে তাকে জেনেই করতে হচ্ছে। বিষয়টা দেখতে বা ভাবতে যতটা সহজ, আদতে একেবারেই তা নয়। এক্ষেত্রে প্রথম দৃশ্যের অভিনয়ের দাপট যে আসলে অভিনয়ের ভেতরের অভিনয়– তা চিত্রনাট্যমাফিক কোথাও গিয়ে মাথায় রাখতেই হচ্ছে। এবার ভাবুন, তার পরের দৃশ্যটার কথা। গঙ্গাস্নান সেরে উঠতেই মছলিবাবা-রূপী মনু মুখোপাধ্যায়ের হাতের উলকি চোখে পড়ে গেল ফেলুদার। তারপর বেনারসের গলিঘুঁজি ধরে শুরু হচ্ছে অনুসরণ। এই অনুসরণ-পর্বে দর্শক আদতেই সঙ্গী হচ্ছে ফেলুদার। আর মছলিবাবা এই অনুসরণের গোটা বিষয়টাই বুঝতে পারছে না। ফলে তার চোখেমুখে হাঁটাচলায় রোজনামচার নির্লিপ্তি। কারণ সে জানে, ভক্তিতে মজে থাকা বেনারসের রাস্তায় তাকে কেউ চিনবেই না। আবহসঙ্গীতে অদ্রীশ বর্ধনের ভাষায় ‘অসহ্য সাসপেন্স’ তৈরি হচ্ছে, অথচ মছলিবাবার হাবেভাবে আত্মবিশ্বাস, সে পুজো দিয়ে বেরোচ্ছে, খাবার কিনে এনে খেতে বসছে স্বাভাবিক দিনলিপিমাফিক। যখন বাক্স ঘেঁটে তার চুলদাড়ি, পিস্তল বের করছে ফেলুদা, আর ব্যাকস্টেজে বাজছে স্টেজের আবহ, অর্থাৎ রেবা মুহুরীর গান, তখন মছলিবাবার আড়ালের এই অভিনেতা কিন্তু নেহাতই নিশ্চিন্ত!

আর একটি দৃশ্যের অবতারণা এ প্রসঙ্গে করতেই হয়। না করলে ভাবের ঘরে চুরি হবে। তা হল, ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’-এর শেষ দৃশ্য, ক্লাইম্যাক্স। পাঠকের মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে, সেই দৃশ্যে মনু মুখোপাধ্যায় কই? ফেলুদা তো সেখানে মছলিবাবা সেজেছে! কিন্তু এখানেই সত্যজিতের একটি সূক্ষ্ম কৌশল রয়েছে। যতক্ষণ না পর্যন্ত মগনলাল প্রণাম ঠুকে মাথা তুলছে এবং পিস্তল থেকে ধীরে ধীরে ক্যামেরা গিয়ে স্থির হচ্ছে মছলিবাবা-রূপী ফেলুদার মুখে, তার আগে অবধি দূর থেকে যে কটি ফ্রেমে মছলিবাবাকে দেখা যায়, একটি ফ্রেমেও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় নেই, আছেন মনু মুখোপাধ্যায়। সন্ধানী দর্শকের চোখে এটা ধরা পড়তেই পারে, কিন্তু আগেই সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে দেখে ফেললে চমক যেত নষ্ট হয়ে, তা মোটেই ভালো হত না। কাজেই এখানে মনু মুখোপাধ্যায় সচেতনভাবেই প্রক্সি দিচ্ছেন। কিন্তু একই সঙ্গে, দর্শকের চোখে যে ইলিউশন পরিচালক তৈরি করতে চাইছেন, তা যাতে সার্থক হয়, ওই দূরবর্তী ফ্রেমগুলোতে থেকে সে দায়িত্বও পালন করছেন তিনি।

অতএব, মছলিবাবা হয়ে পারফরমেন্সের বাইরে আর কোনও সংলাপ না থাকা একটি চরিত্রকে শুধু উপস্থিতি দিয়েই দর্শকের মনে গেঁথে দেওয়ার ক্ষমতা রাখতেন মনু মুখোপাধ্যায়। ফাংশনাল না হলে, চরিত্র এবং চিত্রনাট্য এবং সিনেমার নির্মাণ প্রক্রিয়ার গতিবিধি না বুঝলে এমনটা করা যায়?

তবে এই ফাংশনাল হওয়ার বিষয়টা দর্শক হিসেবে আমার কাছেও অপরিষ্কার থাকত, যদি না কথা হত প্রদীপ্ত ভট্টাচার্যর সঙ্গে। ‘বাকিটা ব্যক্তিগত’ ছবিটা হয়েছিল মকুমেন্টারি ঢংয়ে। তথ্যচিত্রর ঢংয়ে বানানো, কিন্তু তথ্যচিত্র নয়। সেই ছবিতে সেই অলীক মেসবাড়ির অলীক বৃদ্ধ নরেন শাসমলের অভিনয়, বিষাদ এবং তুঙ্গ ভালোবাসার টান যে চরিত্রকে রঙিন করে তোলে– তা ভোলা যায় না। প্রেমে পড়ার কথা বলেন খুব আবছা লজ্জা ঢেকে রেখে, অথচ কী যেন একটা হল না, সেই বিষাদ, কখনও বা খিটখিটে। মুখের রেখায় বয়সের ত্রিকোণমিতি ঠেলে অদ্ভুত আলোয় ভেসে ওঠা মনু মুখোপাধ্যায়। কিন্তু এমন ফরম্যাটের ছবিতে মনু মুখোপাধ্যায় কীভাবে কাজ করেছেন, তা প্রদীপ্তদার মুখে শুনে চমকে যেতে হল। ‘মনু মুখোপাধ্যায়ের কথা ভেবেই চরিত্রটা লেখা। বার দুই-তিনেক গিয়েছিলাম ওঁর কাছে। কসবার বাড়িতে। আমি একটা বিষয় নিয়ে চিন্তিত ছিলাম। অ্যাকটি‌ং প্যাটার্ন নিয়ে। মানে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে অভিনয়টা করবেন, মনে হবে দেখে অভিনয় করছেন না, এতটাই রিয়েল হতে হবে ব্যাপারটা। কিন্তু আবার অতিরিক্ত রিয়েল হবে না। সেটা আমি ওঁকে অনেকবার বলেছিলাম। উনি বলেছিলেন, চলো না দেখা যাবে কী হয়। শুটিংয়ের দিন সব রেডি-টেডি হল, তারপর উনি বললেন, শুনুন, (তখন ওঁর বয়স আশি, আমার বত্রিশ, আজ থেকে দশ বছর আগের কথা) আমি কিন্তু শট দেওয়ার আগে ডিরেক্টরের সঙ্গে একটা সিগারেট খাই। তারপর কন্টিনিউয়াস শুট হয়েছিল। আমি ডিরেক্টর, অথচ আমি শুটিংয়ের মাঝেই মোহিত হয়ে দেখছি ওঁর কাজ। ক্যামেরা পোজিশনটা ঝটপট বুঝে নিলেন। ডিএসএলআরে ছবি হচ্ছিল। কোনও সিনে ক্যামেরার বালাই নেই। উনি মিনিট দশেকে ব্যাপারটা ধরে নিয়েছিলেন। ক্যামেরার সামনে ঋত্বিক (চক্রবর্তী) অভিনয় করছে, ক্যামেরার পেছনে অমিত (সাহা)। আর পুরোটাই সিঙ্ক সাউন্ডে কাজ। ডাবি‌ং হবে না। সেটা আমি ওঁকে বলেও ছিলাম। উনি ধরে নিয়েছিলেন বিষয়টা। যাওয়ার সময় আমাকে ‘নমস্কার’ বলে গেলেন।’ প্রদীপ্তদার এই কথা থেকে একজন আশি বছরের ভেটেরেন অভিনেতার যে ছবি পাওয়া গেল, সেটা সত্যিই অতুলনীয়! আর অমন চরিত্রও মনু মুখোপাধ্যায় পাননি বিশেষ।

আর সবশেষে বলতে হয় গোবিন্দ বিশ্বাস। ‘পাতালঘর’ যে কারণে ম্যাজিকের মতো ভালো ছবি, সেই ছবিতে অদ্ভুতুড়ের হাস্যরস আসলে টগবগ করে ওঠে রহস্যঘেরা স্মার্টনেসের ঝিলিকে। গোবিন্দ বিশ্বাস দিনের আলোয় অপয়া হয়ে গান গাইছেন যখন, তখন দর্শকের হাসি চওড়া হতেই পারে, কিন্তু সন্ধেবেলা জালের আড়ালে বসে যখন দৃষ্টি দেওয়ার বরাত নিচ্ছেন, তখন গা ছমছম করে ওঠে। অপয়া তকমার সামাজিক বেদনাকে চ্যালেঞ্জ করে ওই কেত নেওয়া, এবং হাড় হিম করিয়ে দেওয়ার কাজটাও মনু মুখোপাধ্যায়ের পক্ষেই সম্ভব। তাই নিয়ে আলাদা মহাকাব্য লিখে ফেলা যায়! সে না হয় অন্যদিন হবে!

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3608 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...