কবিতা পাক্ষিক-এ দুর্মুখ আমাকে ব্যালেন্স করত সুভদ্র নাসের

প্রভাত চৌধুরী

 


কবি, গদ্যকার ও সম্পাদক

 

 

 

শুরু থেকেই বলি। আমি কবিপত্র, অমৃত পত্রিকা, পরিচয় পত্রিকা ইত্যাদি থেকে উঠে আসা মানুষ। কবিতা লিখছি ১৯৬৫ সাল থেকে। মাঝে অমৃত পত্রিকা উঠে গেল। আমিও রাজনৈতিক কারণে কবিতা লেখা থেকে সরে এলাম। ফিরলাম বছর দশেক পর। সেই সময়ই নাসেরের সঙ্গে আলাপ হল। আলাপ করালেন শান্তিময় মুখোপাধ্যায়। আমি রাইটার্সে কাজ করতাম। আর নাসের কাজ করত রাইটার্সের অ্যানেক্স বডিতে, সরকারি করণিক হিসেবে। বহরমপুরের ছেলে। কবিতা লিখছে সত্তরের দশকের শেষ থেকে। যাই হোক, কবিতা পাক্ষিকের জন্ম হল ওর সঙ্গে আলাপের পর। সালটা ১৯৯৩। তারপর থেকেই আমার সঙ্গে ওর বন্ধুত্ব শুরু হল, যাতে কোনওদিন চিড় ধরেনি।

কবিতা পাক্ষিকে আমি দুর্মুখ ছিলাম যারপরনাই। আমি মনে করতাম, একশো বছরে খুব বেশি হলে পাঁচজন কবি আসেন। আর নাসের ছিল এক্কেবারে অন্য মানুষ। ও খুব ভালো মানুষ ছিল। সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব ছিল, সবাইকে ভালবাসত, সবার কবিতাই পছন্দ করত। তাই, ও আর আমি একে ওপরের পরিপূরক ছিলাম। নাসের আমাকে, আমি নাসেরকে ব্যালেন্স করতাম বলা যায়। কবিতা পাক্ষিকের সব কিছুই ও করত। আমার চেয়ে অনেক বেশি খাটত। আসলে নাসের ইকুয়ালস টু কবিতা পাক্ষিক বললেও হয়ত ভুল বলা হবে না। কবিতা পাক্ষিক নিয়ে যে এত কিছু আলোচনা হয়, তার সিংহভাগ কৃতিত্ব ওর। আমার মনে হচ্ছে, নাসের নেই, ওকে ছাড়া আর আমরা কবিতা পাক্ষিক বের করতে পারব না। একটা সংখ্যা ও তৈরি করে রেখে গেছে। পরের সংখ্যা আর বেরোবে কিনা তা নিয়ে আমরা শিগগির আলোচনায় বসব।

আর সম্পাদনার বাইরে লেখক হিসেবেও নাসের খুব বড় মাপের ছিল। কবিতা ও গদ্য— দুইয়েই। ওর মধ্যে একধরনের নিখাদ ভারতীয়ত্ব ছিল যা আজ খুব বিরল। কবিতা পাক্ষিকে ছাপা ওর সমস্ত লেখা যদি পরপর সাজানো যায় তাহলে তা ভারতের ইতিহাস চেতনার একধরনের দলিল হয়ে যাবে এক অর্থে। একটা জাতির, একটা ভাষার ইতিহাস রচিত হয়ে যাবে। আর একটা কারণ, আমাদের মতো কোনও বাণিজ্যিক কিছুতে যুক্ত না হয়েও ও কিন্তু যেকোনও বিষয়েই সহজে লিখে দিতে পারত। এটাও ওর একটা মস্ত বড় গুণ ছিল।

ওর অসুস্থতার কথা মনে আছে এবছরেরই শুরুর দিক করে। কলকাতা বইমেলার শেষ দিন আমরা বইপত্রের বাঁধাই করে চলে এসেছিলাম। তার পরের দিন ও আমার বাড়িও এসেছিল। এসব করে হঠাৎ দু-একদিনের মধ্যে ফোন পেলাম। ও নিজেই ফোন করল। বলল, বন্ধুরা ওকে মেডিকায় ভর্তি করেছে। প্লেটলেট কমে গেছে। বেশ কিছু রোগেই প্লেটলেট, সঙ্গে হিমোগ্লোবিন কমে যায়। ওর এমনই এক দুরারোগ্য অসুখ হয়েছিল। অ্যাপ্লাস্টিক অ্যানিমিয়া। শুনছি, ও চলে যাওয়ার পর লোকে বলছে, পত্রপত্রিকায় লেখা হচ্ছে ব্লাড ক্যান্সারের কথা। সেটা সম্পূর্ণ ভুল। ওর ক্যান্সার হয়নি, অ্যাপ্লাস্টিক অ্যানিমিয়া হয়েছিল। যা ওকে প্রায় বছরখানেক ধরে কষ্ট দিল। কী রোগ হয়েছে সেটা বুঝতেই সময় লেগেছিল কিছুটা। অনেক খোঁজ নিয়ে জানা গেল কোঠারিতে সবচেয়ে ভালো চিকিৎসা হয় এর। সেখানেই চিকিৎসা করা হল ওর। আমরা কিছুই করতে পারিনি। বয়সের ভারে আমি তো ছুটোছুটি করতেই পারি না। ওর চিকিৎসার যাবতীয় দায়ভার, খরচা বা পরিশ্রম যাই বলা যায়, সবই করেছিল ওর অফিসের সহকর্মীরা। ওর বয়স যে খুব বেশি হয়েছিল বলা যাবে না। অবসর নিয়েছিল অবশ্য। কিন্তু ওকে অফিস থেকে ছাড়া হয়নি। এক্সটেনশনে ছিল। নতুন ছেলেকে নেওয়ার চেয়ে পুরনো এফিসিয়েন্ট লোকজনকে কম মাইনে দিয়ে বেশি কাজ করানোর ফন্দি আর কী। নাসের সহ আরও অনেকেই সরকারের এইসব পরিকল্পনার শিকার।

সবকিছুই মিলেই নাসের আমার অন্তরঙ্গ বন্ধু, কবিতা পাক্ষিকের প্রাণ এবং নিখাদ এক ভারতীয়ত্ব বজায় রাখা এক কবি ও গদ্যকার ছিল। সবচেয়ে বড় কথা ও খুব ভালো মানুষ ছিল। ওর শেষকৃত্য হল বহরমপুরে। মাটি দেবার সময় অসংখ্য আত্মজনেরা উপস্থিত ছিলেন। ওকে কবরে রেখে সকলে ফিরে এল। দীর্ঘকালের সঙ্গী একজন ভালো মানুষ, ভালো বন্ধুকে খুব তাড়াতাড়ি হারালাম আমি।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3545 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...