মাই ফাদারস গার্ডেন ও আদিবাসী জীবনের সমাজচিত্র: একটি আলোচনা

সোমরাজ ব্যানার্জী

 

হাঁসদা সৌভেন্দ্র শেখরের বৃহত্তর সাহিত্যজগতে প্রথম আত্মপ্রকাশ তাঁর বহু আলোচিত ছোটগল্প সঙ্কলন The Adivasi Will Not Dance-এর মাধ্যমে। পাঠক মহলে আলোড়ন তৈরি করা এই বইটার উপরে ২০১৭ সালে নিষেধাজ্ঞা জারি করে ঝাড়খণ্ড সরকার। বলা হয়, এই লেখায় ঝাড়খণ্ডের জীবনকে নিচু করে দেখানো হয়েছে। তবে হাঁসদার লেখা থেমে থাকে না, সময়ের সাথে সাথে আরও তীক্ষ্ণ, আরও ধারালো হয়ে ওঠে। যার নিদর্শন লেখকের চতুর্থ বই My Father’s Garden। ১৯২ পাতার পরিসরে হাঁসদা আপসহীনভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন আদিবাসী জীবনের ইতিবৃত্ত যা বর্তমান সময়ের ভারতীয় ইংরেজি সাহিত্যে একটা গুরুত্বপূর্ণ জায়গা করে নেয়।

My Father’s Garden উপন্যাসটিকে তিনটি স্পষ্ট পর্বে ভাগ করেছেন লেখক— ‘প্রেমিক’ (‘Lover’), ‘বন্ধু’ (‘Friend’) আর ‘বাবা’ (‘Father’)। গল্পের কথকই এখানে প্রধান চরিত্র যিনি নির্মাণ করে চলেন তাঁর জীবনের নানান অধ্যায়। পেশায় ডাক্তার এই চরিত্রটির চোখ দিয়ে পাঠক প্রবেশ করেন সমকালীন আদিবাসী সমাজের মর্মস্থলে, প্রত্যক্ষ করেন তাদের জীবন, সমাজ ও রাজনীতি। প্ৰখ্যাত লেখিকা ও সমাজকর্মী মহাশ্বেতা দেবী তথাকথিত অসভ্য বলে অবদমিত এই আদিবাসী মানুষদের ‘সবচেয়ে বেশি সভ্য’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। তিনি আরও বলেন যে এই দেশ এখনও একটা অন্ধকার পর্দার পেছনে রয়েছে। যে পর্দা সমাজের মূল স্রোত থেকে এর গরিব ও বঞ্চিত মানুষদের আলাদা করে রাখে। হাঁসদার এই উপন্যাসে আবেগের বাহুল্য নেই, রয়েছে যথাযোগ্য অভিব্যক্তির বহিঃপ্রকাশ, ঘটনাপ্রবাহের স্বাভাবিক গতিময়তা, চরিত্রয়নের নিজস্ব ছন্দ।

উপন্যাসের প্রথম অংশে (‘লাভার’) ধরা পড়ছে কথকের একাধিক সমকামী সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার কাহিনি। মেডিকেল কলেজে পড়ার সময়ে তাঁর এই যৌনসত্তা বাহ্যিকরূপে প্রকাশ পায়। সমীর, লাকি বা সুনীল— প্রত্যেক ক্ষেত্রেই কথক শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের পাশাপাশি করে চলেছেন মানসিক পরিপূর্ণতার খোঁজ। বারবারই শিকার হয়েছেন বঞ্চনার, প্রতারণার। শরীরের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করতে পারলেও তিনি তাঁর প্রেমিকদের মন পাননি সেভাবে, বরং তাঁকে ব্যবহার করা হয়েছে বারবার। এই পর্বের লেখনীতে লেখক তাঁর অভিব্যক্তি প্রকাশে অত্যন্ত ক্ষুরধার। সমকামিতা সম্পর্কিত ট্যাবুগুলো ভেঙে তিনি বের করে আনছেন তাঁর দগদগে ক্ষতচিহ্ন, শারীরিক চাহিদারা ভাষা পাচ্ছে তাঁর লেখায়, উঠে আসছে আবেগতাড়িত এক মননের নিজের যৌনসত্তাকে প্রকাশ করার দৃঢ়তা। সমকামিতার ভাষাকে লেখক জুড়ে দিচ্ছেন সাবঅল্টার্ন মানুষের জীবনের সাথে, ভেঙে দিচ্ছেন এতদিনের তৈরি হয়ে থাকা দেওয়ালগুলো।

পরবর্তী পর্বে (‘ফ্রেন্ড’) কথক চাকরিসূত্রে পাকুড়ে চলে আসেন সেখানকার সরকারি হাসপাতালের ডাক্তার হিসেবে যেখানে তাঁর বন্ধুত্ব হয় সেখানকার প্রশাসনিক কাজে নিযুক্ত হেড ক্লার্ক-এর সঙ্গে। তাকে সবাই বড়বাবু বলে ডাকে। এলাকায় সব মানুষ তাকে খুব সমীহ ও শ্রদ্ধা করে। যেকোনও বিপদে বড়বাবুই তাদের ভরসা। কথকের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব হওয়ার পর তিনি বিভিন্ন উপলক্ষে বারবার নিমন্ত্রিত হয়ে আসেন বড়বাবুর বাড়ি। ঘটনাপর্যায়ে একসময় এই কাহিনি একটি বিশেষ দিকে মোড় নেয়। এলাকার বস্তি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। সেই বস্তির জমিতেই অবস্থিত বড়বাবুর বাড়িটিও ভাঙা পড়ে। কথক প্রথমে এই বিষয়ে তাঁর বন্ধুর প্রতি খুব সহানুভূতিশীল হয়ে পড়লেও ধীরে ধীরে জানতে পারেন বড়বাবুর আসল চরিত্র। হাঁসদা এখানে বারবার আঙুল তুলছেন দালালচক্রের ভয়াবহ পরিণতির দিকে, যারা নিজেদের সুবিধের জন্যে নিরুপায় মানুষদের সর্বনাশ করতে পিছপা হয় না। বস্তি জবরদখলের সময় দাঁড়িয়ে থাকা দর্শকদের উল্লাস দেখে কথক ভাবেন, ‘কী ভাঙা হচ্ছে বলে ওরা মনে করছে? বাবরি মসজিদ?’

এরপরে, শেষ অংশে (‘ফাদার’) মনঃক্ষুণ্ণ কথক ফিরে আসেন তার নিজের বাড়ি ঘটশিলায়। ঝাড়খণ্ড সেপারেটিস্ট মুভমেন্টের সঙ্গেও অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে আছে এই গল্পের কাহিনি। কথকের বাবা ও দাদু দুজনেই সেই সময়ের রাজনীতির পরিসরে সর্বান্তকরণে যুক্ত হন। সাঁওতালদের নিপীড়িত জীবনে তাঁরা আনেন স্পর্ধা। তাদের চাহিদাগুলোকে ভাষা দেওয়ার চেষ্টা করেন; রুখে দাঁড়ান অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে, আদিবাসী মেয়েদের উপর নির্যাতনের বিরুদ্ধে, যুগ যুগ ধরে চলে আসা অসাম্যর বিরুদ্ধে। কলেজ শেষ করে চাকরি করতে করতেই বিচ্ছিন্ন ঝাড়খণ্ড রাজ্যের দাবিতে হিন্দু ইন্ডিয়া পার্টির সঙ্গে যুক্ত হন কথকের বাবা। সেই দল, যেখানে উচ্চবর্ণের হিন্দুদের প্রাবল্য ও আধিপত্য, সেখানে একমাত্র আদিবাসী হয়ে নিজের সবকিছু দিয়ে তিনি চেষ্টা করেন নির্বাচনে জিতে এই আদিবাসী মানুষদের হয়ে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করবেন। একের পর এক সাফল্যের নজির গড়লেও শেষ অবধি তাকে শিকার হতে হয় প্রতারণার। ভগ্ন হৃদয়ে তিনি মন দেন বাগান সাজানোর কাজে। তাঁর স্বপ্নে যে সুদিনের খোঁজ তিনি করেছেন, তার এই পরিণতি মেনে নিতে পারেন না তিনি। এই বাগানই এখন তাঁর কাছে নিজের সন্তানের মত যাকে বড় করার মধ্যে দিয়ে তিনি সেই শান্তি ও মনের সুখ খুঁজে পান যেটা আর অন্য কোনওকিছুই তাকে দিতে পারে না।

দেশীয় রাজনীতিতে যখন ভীষণভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ছে ধর্মান্ধতা, উচ্চ-নীচ জাতিভেদ, ব্রাহ্মণ্যবাদের প্রাবল্য, ঠিক সেই সময়ে উল্লেখযোগ্যভাবে হাঁসদার লেখায় উঠে আসছে আদিবাসী জীবনের অসহায়তার কথা। তিনি পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন হিন্দু সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে থাকা জাতিপ্রথা ও অস্পৃশ্যতার দিকে। কথকের ঠাকুরদা বা বাবা, সবাই এই অসভ্যতার শিকার  হয়েছেন। স্কুলে তাদের সম্মুখীন হতে হয়েছে এই বঞ্চনার, তাদেরকে বারবার মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে, ‘অসভ্য ছেলে, কোন সাহসে তুই ওটা ধরলি.. আমি আর কোনওদিন এই চকটা ব্যবহার করতে পারব না।’ রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও এই কটাক্ষ তাদের পিছু ছাড়েনি, ‘এখন কি বাঁদরও আসবে সভাতে?’ ডঃ বি আর আম্বেদকর, তাঁর লেখায় সবসময়তেই সরব হয়েছেন হিন্দু সমাজের ভেতরে সদর্পে বাসা করে থাকা এই কুপ্রথার বিরুদ্ধে। উত্তর-ঔপনিবেশিক সময়ে শোষণের একটা ভিন্ন রূপ হিসেবে তিনি এই প্রথাকে দেখেছেন যা অনেকটা বিদেশি শাসকের আগ্রাসী মনোভাবকেই প্রতিফলিত করে। ফলে স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক— সব দিক থেকেই এই শ্রেণির মানুষের জন্য এই প্রথার উপস্থিতি ঔপনিবেশিক শাসনের নামান্তর মাত্র। হাঁসদা এমন একটা সমাজের কথা বলেছেন, যেখানে আদিবাসী গরিবদের ঘর ভেঙে গুড়িয়ে দেওয়া হয়, উল্লসিত কণ্ঠে স্লোগান ওঠে ‘জয় শ্রী রাম’, আবহে শোনা যায় গৃহহীন মানুষের ক্রন্দনরোল। মানুষের পুনর্বাসনের কথা ভাবে না সরকার। রাত পেরিয়ে কথকের কানে ভেসে আসে ধ্বংসের বুকের উপরে পড়তে থাকা বৃষ্টির শব্দ: ‘ধ্বংসের ঠিক পরেই গত ক’দিন ধরে বৃষ্টি পড়ছে। মনে হয় কোথাও পড়েছিলাম যে হিরোসিমা নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণের পরেও এরকমই বৃষ্টি হয়েছিল। আবার কোথাও পড়েছিলাম ভোপাল গ্যাস লিকের পরেও নাকি এরকম হয়েছিল। রানি দীঘি প্যাটেলের বাড়িগুলো ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর পাকুড়েও নাগাড়ে বৃষ্টি হয়ে যাচ্ছে।’ অর্থাৎ, সারা পৃথিবী জুড়ে মানুষের অসহায়তার রূপ যেন অভিন্ন, তাদেরকে স্থান কালের নিরিখে আলাদা করা গেলেও তাদের অভিব্যক্তি একই। মনে পড়ে যায় পাবলো নেরুদার সেই বিখ্যাত লাইন, ‘কোন ভাষায় এইসব যন্ত্রণাক্লিষ্ট শহরের উপরে বৃষ্টি পড়ে?’

হাঁসদার বিভিন্ন লেখাতেই তিনি পাকুড় ও সেই সংলগ্ন ঝাড়খণ্ডের বিভিন্ন এলাকায় দ্রুত নগরায়নের ফলে উদ্ভূত সমস্যাগুলোর প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। যেখানে পুরনো বাড়িগুলোর সঙ্গে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে গজিয়ে উঠেছে উঁচু উঁচু অট্টালিকা। ঝাড়খণ্ড আলাদা রাজ্য হয়ে যাওয়ার পর এই ঘটনা অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। কথকের মন্তব্য, ‘পাকুড় নামের গ্রামটা একদিন সকালে উঠে হঠাৎ করে দেখল যে সে একটা শহর হয়ে গেছে আর এখন থেকে সে-ই গ্রামের প্রশাসনিক কেন্দ্র।’ বাড়ির জানলা দিয়ে বাইরের বাড়িগুলোর দিকে তাকালে মনে হয়, ‘ষাটের দশকের বাংলা থেকে তুলে এনে তাদেরকে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই নগরায়নের ফলে উদ্ভুত উদ্বাস্তু সমস্যা ও গৃহহারা মানুষের কথাও বিশেষ জায়গা পায় এই লেখায়। তার অন্য উপন্যাস, The Mysterious Ailment of Rupi Baskey-র মতোই এই বইতেও সাঁওতাল জীবনের সামাজিক ও ধর্মীয় রীতিনীতি, প্রকৃতির সঙ্গে সংযুক্ত তাদের দৈনন্দিন জীবনের টানাপোড়েন, বিশ্বাস, ভয়, অলৌকিকতা— প্রতিটি বিষয়েই লেখক জোর দিয়েছেন ভীষণভাবে। উপন্যাসের বিন্যাস বা ন্যারেটিভে বিশেষ বৈচিত্র্য না থাকলেও সংলাপ রচনায় লেখকের মুন্সিয়ানার পরিচয় পাওয়া যায়। মাঝে মাঝেই আদিবাসীদের সংলাপে হিন্দি, এমনকি বাংলার ব্যবহার বিশেষভাবে নজরে পড়ে। দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে ২০১৯ সালে JCB পুরস্কারের জন্য শর্টলিস্টেড হাঁসদার এই উপন্যাস আদিবাসী জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে পাঠকের মনে বিশেষ জায়গা করে নেবে।

Book: My Father’s Garden
Author: Hansda Sowvendra Sekhar
Publisher: Speaking Tiger (Hardcover)
Year: 2019
Price: Rs. 499

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3090 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...