লেনিনের সঙ্গে শেষ কিছুক্ষণ

লেনিনের সঙ্গে শেষ কিছুক্ষণ -- অশোক মুখোপাধ্যায়

অশোক মুখোপাধ্যায়

 

[১৬]

[১৭]

কমরেড স্তালিন প্রসঙ্গে আরও কিছু কথা।

তখন নতুন সোভিয়েত শিশু রাষ্ট্রকে গলা টিপে মারবার জন্য ইঙ্গ-ফরাসি সাম্রাজ্যবাদী চক্রের সঙ্গে হাত মিলিয়ে আরও গোটা বারো দেশ রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। ভেতরে জারের পুরনো সেনাবাহিনীর কিছু অফিসার নতুন করে শ্বেতবাহিনি তৈরি করে রাশিয়ার ভেতরে বিরাট অন্তর্ঘাতের জাল বিছিয়েছে। এক দিকে তাদের বিরুদ্ধে লালফৌজ গঠন করে লড়াই চালিয়ে যেতে হচ্ছে। অন্য দিকে, তখনও কলকারখানায় ভালো করে উৎপাদন শুরু করা যাচ্ছে না। কৃষিতেও পরিস্থিতি জটিল। কঠোর রেশনিং করে দেশ চালাতে হচ্ছে। যুদ্ধেরও কঠিন ফ্রন্টগুলিতে যাচ্ছেন স্তালিন। আবার ক্রেমলিনে ফিরে এসে খাদ্য বন্টনের দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে তাঁকেই। রাষ্ট্রের মাথায় যে চারজন পরিচালক, লেনিন, ত্রতস্কি ও স্বার্দলভের পাশে তার মধ্যে ছিলেন স্তালিন। স্বার্দলভ অসুস্থ হয়ে ১৯১৯ সালে মারা যান। ফলে লেনিনের পাশে তখন শেষ অবধি দুজন প্রধান মুখ।

উত্তপ্ত অবস্থার মধ্যেই লেনিন একদিন স্তালিনকে ডেকে পাঠালেন, আমাদের সোভিয়েত রাষ্ট্রের জন্য একটা সংবিধান রচনা করতে হবে।

–এখনই? এত তাড়াতাড়ি?
–হ্যাঁ, দেশের ভেতরে জনগণকে যদি বোঝাতে হয়, সোভিয়েত সরকার দুদিনের পান্থশালা নয়, রাশিয়ায় থাকতে এসেছে, বাইরের দুনিয়ার সর্বহারাশ্রেণিকেও যদি জানাতে হয়, আমরা শুধু শ্লোগান দিই না, যুদ্ধ করি না, নির্মাণও করি, তাহলে কাজটা শুরু করতে হবে কমরেড।
–বেশ বলুন কমরেড ইলিচ, আমার কী দায়িত্ব?

লেনিন বললেন, আপনি ইয়াকভকে সঙ্গে নিয়ে কাজে হাত দিন। খসড়া রচনা কমিটিতে কাদের নিতে হবে ঠিক করুন। আমাকে দুদিনের মধ্যে একটা প্রাথমিক রিপোর্ট দিন।

ত্রতস্কির জীবনীলেখক ও তাঁর একনিষ্ঠ অনুগামী ইজাক ডয়েশ্চার স্তালিনের জীবনী লিখতে বসে প্রথমেই খুব আক্ষেপ করেছেন, স্তালিন যখন দিনের পর দিন এই সব দায়িত্ব পালন করছিলেন, বাইরের প্রচারের আলো তাঁর উপর না পড়লেও তিনি দল ও রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে ক্রমাগত গুরুত্ব এবং জনপ্রিয়তা অর্জন করতে সক্ষম হন। যা প্রচারের শত ঝলকানির মাঝখানে থেকে ত্রতস্কি টেরই পাননি। ফলে কখন যে স্তালিন লেনিনের জীবদ্দশাতেই সোভিয়েত সরকার ও পার্টিতে লেনিনের পরেই দ্বিতীয় স্থানটি প্রায় পেয়ে গিয়েছিলেন, তার হদিশ ত্রতস্কি বা পরবর্তীকালে তাঁর অনুগামীদের পক্ষে বুঝতে অনেক দেরি হয়ে গেছে।

ইতিমধ্যে স্বার্দলভ মারা গেছেন। ১৯২০ সালের পরে অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি শান্ত হলে স্তালিন সংবিধানের একেবারে প্রাথমিক একটা খসড়া তৈরি করিয়ে লেনিনের কাছে নিয়ে এলেন। লেনিন শিরোনাম দেখেই প্রচণ্ড বিরক্ত হলেন।

–এ কী করেছেন?
–কেন কমরেড?
–রাশিয়ান সোভিয়েত ফেডারেটেড সোস্যালিস্ট রিপাব্লিক? এটা আমাদের নতুন রাষ্ট্রের নাম?

স্তালিন নিরুত্তর। লেনিনের এতে আপত্তি কোথায় তিনি বুঝতে পারছেন না।

আমরা যে নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাই তাতে শুধু রাশিয়া কেন, কোনও জাতিসত্তারই আধিপত্য থাকবে না। আর আপনি জানেন যে অ-রুশ জাতিগুলির রুশি জারের বিরুদ্ধে ঘৃণা থেকে রাশিয়া শব্দটির প্রতিই বিতৃষ্ণা রয়েছে। তাই না? সংবিধানে এই নাম থেকে যাওয়ার মানে হল, সাধারণ লোকে আমাদেরও সমাজতান্ত্রিক জার বলেই গণ্য করবে।

স্তালিন অনেকক্ষণ চুপ থাকার পর উত্তর দিলেন, সেক্ষেত্রে সংবিধান রচনার দায়িত্ব একজন অ-রুশ কমরেডকে দেওয়া বোধ হয় আপনার ঠিক হয়নি। আমি তো অ-রুশ জাত্যাভিমানের বিরুদ্ধেই কথা বলব।

লেনিন খুব দৃঢ়ভাবে বললেন, আপনি একজন সাধারণ মানুষ হলে, দলের একজন সাধারণ সভ্য হলে, আপনার কথাই ঠিক। কিন্তু আপনিও ঠিক ততটাই জর্জিয়ান নন, আমি যতটা রুশি নই। আমাদের জন্ম যেখানে যে অবস্থাতেই হোক না কেন, আমরা কমিউনিস্টরা নিজ নিজ জাতিগত পরিচয়, জাতিগত গর্ব, কাটিয়ে এসেছি। আন্তর্জাতিকতাই আমাদের একমাত্র পরিচিতি। কিন্তু সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের ভবিষ্যত নিয়ে ভাবতে গেলে আমাদের অবশ্যই পুরনো ইতিহাস মনে রাখতে হবে। জার শাসনের কোনও দাগ যাতে আমাদের গায়ে না লেগে থাকে সেই ব্যাপারে আমাদের পার্টিকে সদা জাগ্রত থাকতে হবে।

স্তালিন এবার ধরে ফেললেন লেনিনের আসল বক্তব্য। ধন্যবাদ কমরেড ইলিচ, আমি আপনার বক্তব্য অনুধাবন করতে পেরেছি। আমাদের প্রত্যেকের নিজের চেতনাগত স্বচ্ছতাই সব নয়, দলের পক্ষ থেকে আমরা সোভিয়েত নাগরিকদের উদ্দেশে কী বার্তা দিতে পারছি, সেটাই আসল কথা।

শেষ পর্যন্ত লেনিনের ইচ্ছা সেবারে গৃহীত হয়নি। লেনিনের মৃত্যুর পর যে প্রথম সংবিধান চালু হয় তাতে শিরোনামে কোনও পরিবর্তন হয়নি। তবে নেতাদের বাচনে রাশিয়া কথাটা ক্রমশ পেছনে সরে যেতে থাকে এবং সোভিয়েত রিপাব্লিক বা রাষ্ট্র কথাটাই সামনে আসতে থাকে। বিদেশে অবশ্য সোভিয়েত রাশিয়া শব্দবন্ধই প্রচলিত এবং জনপ্রিয় থেকে যায়। ১৯৩৬ সালে যখন আবার নতুন করে সংবিধান রচিত হয়, তখন স্তালিন কমরেড ইলিচের ইচ্ছাকে বাস্তবায়িত করে সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক জাতিসঙ্ঘ (Union of Soviet Socialist Republics বা সংক্ষেপে USSR) নামটির প্রবর্তন করেন।

১৯২২ সালে দলের একাদশ কংগ্রেসে একদিকে কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যসংখ্যা বৃদ্ধি করা হয় অপরদিকে লেনিনের প্রস্তাব অনুযায়ী তাতে সাধারণ সম্পাদকের একটি পদ সৃষ্টি করা হয়। এত কাল পর্যন্ত বলশেভিক দলের কোনও ঘোষিত শীর্ষপদ ছিল না। কেন্দ্রীয় কমিটির সভা বসলে সচরাচর লেনিন বা জিনোভিয়েভ সভাপতিত্ব করতেন। তাতে অসুবিধা হত না, কেন না, ১৯০৩ সাল থেকেই আরএসডিএলপি বলশেভিক গ্রুপের এবং ১৯১২ সাল থেকে বলশেভিক দলের সর্বোচ্চ অবিসংবাদিত নেতা হিসাবে লেনিনকে সকলেই মেনে চলতেন।

লেনিন তখন খুবই অসুস্থ। ১৯১৮ সালে মস্কোর এক কারখানা থেকে বেরনোর সময় তাঁকে খুব কাছ থেকে গুলি করে একজন মহিলা, ফ্যানি কাপলান, তখনকার সোস্যালিস্ট রেভলিউশনারি দলের সদস্য। তাঁর কাঁধে ও বুকে গুলি ঢুকে যায়। তৎকালীন সোভিয়েত চিকিৎসাব্যবস্থায় লেনিনকে কোনওরকমভাবে প্রাণে বাঁচানো সম্ভব হলেও তাঁকে আর পুরোপুরি সুস্থ করে তোলা যায়নি। মৃত্যু আসন্ন বুঝেই তিনি এমন একজনকে দলের সামনে তুলে আনতে চাইছিলেন, যিনি তাঁর মৃত্যুর পর দলের এবং দেশের হাল শক্ত হাতে ধরতে পারবেন। কংগ্রেসে পাঠানো তাঁরই প্রস্তাবে উপরোক্ত পদ সৃষ্টির পর তাতে স্তালিন সর্বসম্মতভাবে মনোনীত হন। ১৯২২-এর এপ্রিল মাস থেকে স্তালিন দলের সাধারণ সম্পাদকের পদে যোগদান করেন এবং আমৃত্যু (৫ মার্চ ১৯৫৩) এই পদে আসীন ছিলেন। অনেকেই মনে করেন, লেনিন এইভাবে তাঁর সম্ভাব্য উত্তরাধিকারীকে মনোনীত করে দিয়ে গেলেন। বা পরবর্তী নেতাদের মধ্য থেকে তাঁর পছন্দটা পার্টিকে জানিয়ে দিলেন।

কাজটা কঠিন ছিল।

লেনিন সেদিন স্পষ্টই বুঝতে পারছিলেন, দলে দ্বিতীয় কোনও নেতা সর্বসম্মতভাবে গ্রাহ্য অবস্থানে এখনও নেই। জুগাসভিলি অনেক বেশি দায়িত্ববান, স্থিতধী, প্রচারবিমুখ, সংগঠন ধরে রাখতে পারেন। এবং সর্বোপরি কাজপাগল। ইলিচকে নেতা বলে মানতে তাঁর কোনও দ্বিধাদ্বন্দ্ব নেই। ত্রতস্কি বিপ্লবের প্রস্তুতির সময়ে অনেকবার দল ছেড়ে গেছেন আবার ফিরে এসেছেন, তাঁর দায়িত্ববোধে ধারাবাহিকতা নেই। কিন্তু ভালো পড়াশুনা করেছেন, তত্ত্বের উপর দখল আছে। প্রচার, লেখা এবং ভাষণে তুখোর তাঁর দক্ষতা (এবং কমিউনিস্ট ঐতিহ্যে পরবর্তীকালে এইসব ক্ষমতাকে একটু অবমূল্যায়ন করা হলেও লেনিন জানতেন এবং মানতেন, বিপ্লবের জন্য এগুলো এক একটা অত্যন্ত দরকারি গুণ এবং বিরল ক্ষমতা)। তবে, এই দুই নেতার মধ্যে খুব ভালো বোঝাপড়া নেই। স্বভাবতই লেনিনের মৃত্যুর অব্যবহিত পরে দলের কাণ্ডারী কে হবেন তা নিয়ে এই দুজন নেতার মধ্যে দ্বন্দ্ববিরোধ দেখা দেবে। সেই বিরোধের সুনিষ্পত্তি না হলে হয়ত দলে ভাঙন ধরে যাবে। এই অবস্থায় তাঁর মতটা জানলে হয়ত কেন্দ্রীয় কমিটিতে বা কংগ্রেসে দলের প্রতিনিধিদের মধ্যে কিছুটা হলেও প্রভাব ফেলতে পারে।

বিছানায় শুয়ে শুয়েই তিনি ১৯২২ সালের ডিসেম্বর মাস থেকে পরের বছরের জানুয়ারি মাসে পর পর কয়েকটি ছোট ছোট নোট পাঠান কেন্দ্রীয় কমিটির দপ্তরে। কখনও মারিয়া ভলোদিচেভা, কখনও লিদিয়া ফতিয়েভা তাঁর কথা থেকে শর্টহ্যান্ডে নোট নিয়ে টাইপ করে নোটগুলি পাঠান। তিনি তখন বেশিক্ষণ কথা বলতে পারেন না। অল্প ডিক্টেশন দিয়েই ক্লান্ত হয়ে পড়েন। নোটগুলির বাক্য গঠন এবং অনুচ্ছেদ আকার দেখলেই তাঁর শারীরিক কষ্টের কিছুটা হয়ত অনুভব করা যায়। আর বয়ান পড়ে তাঁর মানসিক উদ্বেগ।

এরকমই দু-একটি নোটে তিনি দুই নেতার মধ্যে অতি সংক্ষেপে একটা তুলনামূলক ছবি আঁকেন। তাতে স্তালিনের খানিক সমালোচনা উল্লিখিত ছিল।

লেখ মারিয়া, লেনিন তাঁর প্রিয় কমরেড কোবা সম্পর্কে বলেন, সাধারণ সম্পাদক হওয়ার পর কমরেড স্তালিনের হাতে এখন প্রভূত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত। আমি জানি না, তিনি এই কর্তৃত্ব কতটা বিচক্ষণতার সঙ্গে ব্যবহার করতে পারবেন।

আরও দু চারটে বাক্য লেখানোর পর সেদিন আর তিনি কিছু বলতে পারেননি। ক্লান্ত হয়ে ঝিমিয়ে পড়েছেন।

পরের দিন তিনি আবার বলতে শুরু করেন, কমরেড স্তালিন একটু রুক্ষ স্বভাবের। আমাদের মধ্যে এতে কাজ চলে যায় এবং আমরা কমিউনিস্টরা এরকম স্বভাবের মোকাবিলা করতে পারি। কিন্তু সাধারণ সম্পাদকের ক্ষেত্রে এমনটা হলে মেনে নেওয়া যায় না। সুতরাং আমি কমরেডদের কাছে পরামর্শ রাখছি, স্তালিনকে ওই পদ থেকে সরিয়ে অন্য এমন একজনকে বসানোর কথা ভাবুন, সব ব্যাপারেই স্তালিনের থেকে আলাদা হয়েও যাঁর একটা ভালো দিক আছে, অর্থাৎ, তিনি আরও সহিষ্ণু, আরও নিষ্ঠাবান, আরও বিনম্র এবং কমরেডদের প্রতি আরও ধৈর্যশীল, খামখেয়ালিপনা কম, ইত্যাদি।

প্রায় মৃত্যুশয্যায় শুয়ে শুয়ে অতি কষ্টে বিবৃত লেনিনের এই সব নোট নিয়ে অনেক জল ঘোলা হয়েছে। এই নোটগুলো লেনিন প্রকাশ্যে আলোচনার জন্য বলেননি। এ ছিল কেন্দ্রীয় কমিটির কাছে প্রদত্ত নোট, যা বড় জোর প্রয়োজনে পার্টি কংগ্রেসে প্রতিনিধিদের সামনে পাঠ করা যেতে পারে। স্তালিনের মৃত্যুর পর ১৯৫৫ সালে নিকিতা খ্রুশ্চভ দলের সাধারণ সম্পাদক হয়ে পরের বছর দলের বিংশতিতম কংগ্রেসে এই কথাগুলি প্রকাশ্যে আনার সিদ্ধান্ত নেন। তখন থেকে দুনিয়ার স্তালিন সমালোচকদের অনেকেই মুখর হয়ে ওঠেন। ইতিমধ্যে স্তালিন সম্পর্কে পশ্চিমি দুনিয়ায় তোলা অভিযোগগুলির প্রায় সবই নিকিতার দুনম্বরি রিপোর্টেও উঠে আসে সোভিয়েত ইউনিয়নের সরকারি স্বীকৃতি হিসাবে। স্তালিন নামক এক ভয়ঙ্কর দানবের ছবি যেন দেবতার ছদ্মবেশ কেটে খুলে বেরিয়ে আসে।

তাঁরা বলতে থাকেন, এই দেখ, লেনিন নিজেও স্তালিন সম্পর্কে অসন্তুষ্ট ছিলেন। লেনিন সেদিনই বুঝে গিয়েছিলেন, কাকে তিনি এতটা উপরে তুলে এনেছেন। স্তালিন নিজের সমালোচনা বলে এগুলোকে এতকাল চেপে রেখেছিলেন। এইবার সত্যটা জানা গেল।

স্তালিন লোকটা ভয়ানক রকমের খারাপ।

আগেই বলেছি, কমিউনিস্ট আন্দোলনে স্তালিনের ভক্ত সংখ্যা এখনও খুব কম নয়। সেই সব স্তালিন সমর্থকরা এর জবাবে আমতা আমতা করে বলেন, এগুলো অসুস্থ অবস্থায় লেনিনের লেখা। এতে অত গুরুত্ব দেওয়া ঠিক হবে না। কেউ কেউ এমনও বলেন, আসলে সেই সময় চিকিৎসকের পরামর্শে নাদেজদা ক্রুপস্কায়াকেও লেনিনের কাছে যেতে বাধা দেওয়া হয়, যাতে তিনি ভাবাবেগে অস্থির না হয়ে পড়েন। স্তালিনই নাকি বাধা দেন। লেনিন তখন অতি কষ্টে স্তালিনকে ফোন করে এর কৈফিয়ত তলব করেন। সেইসব মুহূর্তে এই লেখার খুব বেশি মূল্য নেই।

দুই পক্ষের এই রকম কথা শুনতে শুনতেই আমরা কৃষ্ণকেশ থেকে শুভ্র (ও বিরল) কেশে পরিণত হয়েছি। তার ভিত্তিতে আজ বলতে পারি, আমার মতে, এইসব মন্তব্যের কোনওটাই সত্য নয়। লেনিন খুব ভেবেচিন্তেই মন্তব্যগুলি করেছিলেন। নিছক আবেগ বা ব্যক্তিগত রাগবিদ্বেষ থেকে এত কথা তিনি লেখেননি। মানুষ হিসাবে তাঁর উচ্চতা তাঁকে দিয়ে এরকম কাজ করাতেই দিত না। এসবের পেছনে তাঁর লক্ষ্য ছিল বহুবিধ:

  • অত ছোট ছোট মন্তব্যের মধ্যেও তিনি যে স্তালিনের এত বিস্তৃত সমালোচনা করেছিলেন, তার কারণ, তিনি শেষ পর্যন্ত স্তালিনের উপরই ভরসা করতে চেয়েছিলেন দেশের এবং দলের ভবিষ্যতের স্বার্থে। ত্রতস্কির উপর যদি তাঁর বেশি আস্থা থাকত, তাহলে তিনি তা স্পষ্ট করেই বলে যেতে পারতেন। এবং তাঁর সমালোচনাই বেশি করে লেখাতেন।
  • কমরেড স্তালিনকে তিনি সাবধান করে যেতে চেয়েছিলেন। তুমি যেহেতু আগামী দিনে দলের হাল ধরতে চলেছ, তোমাকে আরও সহনশীল হতে হবে। সমস্ত খুঁটিনাটি কাজে আরও যত্নবান, আরও বিনম্র এবং কমরেডদের প্রতি আরও দরদি হতে হবে, নিজের ইচ্ছাকে প্রয়োজন মতো নিয়ন্ত্রণ করে রাখতে শিখতে হবে, অন্যদের ভুলত্রুটি সম্পর্কে অতিরিক্ত কঠোর হলে চলবে না, ইত্যাদি। এই সব দোষ কাটিয়ে উঠতে না পারলে দলের ভেতরে অচিরেই নানা রকম বিপত্তি দেখা দেবে। ত্রুটিগুলির উল্লেখ খুব লক্ষণীয়।
  • সবচাইতে বড় কথা, পাশাপাশি দলের সমস্ত নেতা ও কর্মীদের কাছে পরোক্ষভাবে একটা অমোঘ বার্তাও তিনি দিয়ে যেতে চেয়েছিলেন, সকলেই খুঁজে দেখলে বুঝবে, স্তালিনের বিকল্প এখনও দলে নেই। স্তালিনের গুণগুলির সবই বেশি বেশি করে আছে, আর তাঁর ত্রুটি থেকে পুরোপুরি মুক্ত— এমন কাউকে লেনিন দলে দেখতে পাননি। পেলে তাঁর নাম করেই বলে যেতেন। অন্যদের উদ্দেশে বলেছেন, তোমরাও দেখো, এমন কেউ আছেন কিনা। দেখবে, নেই।

এই পরোক্ষ বার্তাটা স্তালিনের পক্ষে বিপক্ষে প্রায় কেউই ধরতে পারেননি। এমনকি স্বয়ং কমরেড স্তালিনও না। কেন্দ্রীয় কমিটির লেনিনোত্তর প্রথম সভায় যখন খাম থেকে এই সব নোট বের করে পড়া হয়, তিনি বরং এতে বেশ আহতই হয়েছিলেন। লেনিনের মৃত্যুর এক বছর পরে যে প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী স্মরণ সভা হয়, সেখানে ভাষণ দিতে গিয়ে স্তালিন লেনিনের নাম না করেই প্রবল অভিমানভরে বলেন, হ্যাঁ, কমরেড স্তালিন দেশের শত্রুদের প্রতি রুক্ষ, … হ্যাঁ কমরেড স্তালিন দলের বিশ্বাসঘাতকদের প্রতি রুক্ষ, … হ্যাঁ, কমরেড স্তালিন সমাজতন্ত্রের বিরোধীদের প্রতি রুক্ষ, ইত্যাদি। এক বছর আগে, লেনিনের মৃত্যুর অব্যবহিত পরে শোকসভায় দাঁড়িয়ে উচ্চারিত বয়ানের সঙ্গে এই বক্তব্যের আকাশপাতাল প্রভেদ। আমার মনে হয়, সেদিন যদি তিনি লেনিনের সমালোচনা গ্রহণ করে নিজেকে শুধরাবার শপথ গ্রহণ করতেন, সোভিয়েত সমাজতন্ত্র এবং বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনের পক্ষে তা অনেক শুভতর হতে পারত। তা শুধু হল না, তাই নয়, সেই দিন থেকে তিনি, হয়ত নিজের অগোচরেই, লেনিনের কর্মপন্থা থেকে অল্প অল্প করে সরে যেতে লাগলেন। দশ বছর পরে যা আর অলক্ষ্য থাকেনি।

মৃত্যুপথযাত্রী লেনিনের আস্থা এবং আশঙ্কা দুইই সত্য প্রমাণিত হয়েছিল। শরীর অক্ষম হলেও মন তাঁর সব কিছুই লক্ষ্য রাখছিল। তখনও তিনি নিজের স্বাস্থ্যের চাইতে বেশি করে ভাবছিলেন সমাজতন্ত্র এবং দলের ভবিষ্যতের কথা। সদ্যোজাত সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সামনে তখন হাজারও সমস্যা। দৈনন্দিন বিভিন্ন সমস্যার মোকাবিলায় স্তালিনের তন্নিষ্ঠার ব্যাপারে তাঁর কোনও সংশয় ছিল না। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সেই সব সমস্যা সামলাতে চাই স্থিতপ্রজ্ঞ বুদ্ধিমান নেতৃত্ব, চাই দলের সকলের সম্মিলিত প্রয়াস। একেবারে উপরের স্তরে ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে সংঘাত যে সেইসব প্রয়াস নষ্ট করে দিতে পারে সেই আশঙ্কাও তাঁর ছিলই।

লেনিনের আস্থাকে সঠিক প্রমাণ করে সোভিয়েত সমাজতন্ত্র এগোতে থাকে নানা দিকে। শিল্পে কৃষিতে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি নানারকম বৈচিত্র্য নিয়ে শক্তি সঞ্চয় করতে থাকে। জ্ঞানে বিজ্ঞানে শিক্ষায় স্বাস্থ্যে প্রযুক্তির বিকাশে বিশ বছরের মধ্যে সোভিয়েত জাতিসঙ্ঘ উন্নত পশ্চিম ইউরোপকে প্রায় ধরে ফেলে। সবচাইতে পশ্চাদপদ জাতিগুলির— এশিয়ার অন্তর্গত প্রজাতন্ত্রগুলির উন্নয়ন হয় দ্রুততর গতিতে। বিপ্লবের দশ বছরের মধ্যে সমগ্র সোভিয়েত ভূখণ্ড থেকে পতিতাবৃত্তি সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়, যা মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক বিরলতম ঘটনা। কাব্যসাহিত্যে এমন সমস্ত গল্প কবিতা উপন্যাস নাটক জন্ম নেয়, রুপোলি পর্দায় এমন সব সিনেমা তৈরি হয়ে উঠে আসে, যে তার প্রতিটি বিস্ময়ের উদ্রেক করে— কী বিষয়বস্তুতে, মর্মবাণীতে, কী তার শিল্পশৈলীতে। সেই সময় রমাঁ রলাঁ বুঝতে চান সকলেই কেন সোভিয়েতের নিন্দা করছে। জর্জ বার্নার্ড শ বলেন, রুশী সমাজতন্ত্র যদি অত খারাপ সত্যিই হত, যতটা এরা প্রচার করছে, তাহলে ইঙ্গ-মার্কিন-ফরাসি চক্র একে মাথায় তুলে নাচত! রবীন্দ্রনাথ প্রায় আশি বছর বয়সে রাশিয়া ভ্রমণ করে এসে বলেন, তীর্থ দর্শন করে এলুম। ভারততীর্থের বাইরে আর এই একটাই।

লেনিনের আশঙ্কাকে সঠিক প্রমাণ করে সোভিয়েতের ভেতরে একদিকে নানা রকম দ্বন্দ্বসংঘাত, অন্তর্ঘাত, নাশকতামূলক কার্যকলাপ, গুপ্তহত্যা বাড়তে থাকে; অপরদিকে বেড়ে চলে রাষ্ট্রের তরফে সন্দেহ, অবিশ্বাস, যাকে তাকে গুপ্তচর বলে ধরে এনে মেরে ফেলা। বহু গুপ্তচর গুপ্তঘাতক ধরা পড়ে— এও যেমন সত্য, বহুজন বিনা দোষে স্রেফ সন্দেহের কারণে শাস্তি পায়— এও পাশাপাশি সত্য। সাজাপ্রাপ্ত মাত্রই— খ্রুশ্চভের থিসিস অনুযায়ী— ভালো লোক, নিরপরাধ, স্তালিনের ব্যক্তিগত শত্রু, এমনটা ছিল না; আবার অনেকেই যে কোনও অপরাধ না করেই বিশ্বাসঘাতক লেবেল নিয়ে ফায়ারিং স্কোয়াডের গুলিতে প্রাণ দিয়েছেন সে কথাও অস্বীকার করা যাবে না।

সিপিএসইউ (বি) দলে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের অস্ত হয় ১৯৩০-এর দশকের মধ্য গগনেই। ১৯৩৯ সালে দলের অষ্টাদশ কংগ্রেসে আগের কংগ্রেসের প্রায় ৯০ শতাংশ প্রতিনিধি অনুপস্থিত— আসলে নিহত অথবা জেলে বন্দি। কিন্তু স্তালিনের সাধারণ সম্পাদকের রিপোর্টে তিনটে মস্কো বিচারের এই বিসদৃশ ফলাফল সম্পর্কে এক লাইনের একটি ন্যানো মন্তব্যের বাইরে আর কোনও সবিস্তার ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ নেই; আনুষ্ঠানিক দুঃখপ্রকাশ তো দূরের কথা।

সেই সময়ে সোভিয়েত রাশিয়ায় বিজ্ঞানের অগ্রগতিও ঘটেছে বিস্ময়কর, আবার লাইসেঙ্কোর অপবিজ্ঞানও দলের সমর্থনে বাড় বেড়েছে সেই সময়েই, ভ্যাভিলভের মতো উদ্ভিদ বিজ্ঞানের বিরল প্রতিভা পদ হারিয়ে সাইবেরিয়ার জেলে পচে মরেছেন এবং ইউক্রেনবাসী হওয়ার সুবাদে লাইসেঙ্কো শুধু স্তালিন নয়, খ্রুশ্চভেরও আস্কারা পেয়ে গেছেন ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত। বরিস হেসেনের মতো বিশাল প্রতিভাবান পদার্থবিজ্ঞানীকেও— যিনি মার্ক্সবাদের সমাজতাত্ত্বিক আলোকে প্রথম বিজ্ঞানের ইতিহাসের এক ক্ষুদ্র কিন্তু অনুপম খণ্ড নির্মাণ করেছিলেন— স্রেফ বুখারিনের অনুচর সন্দেহে মেরে ফেলা হয়েছিল— কার্যত বিনা বিচারে। মস্কো ট্রায়াল থেকে কার্ল রাদেক বা নিকলাই বুখারিনের অপরাধ কিছুই প্রমাণিত হয় না এবং সেদিনও হয়নি। আরও অনেকের ক্ষেত্রে এই কথা সমানভাবে প্রযোজ্য। বুখারিন হত্যার প্রাক্কালে সেই বিচারকাণ্ডকে রলাঁ ফ্রান্সে ল্যাভোয়াশিয়কে বিপ্লবের শত্রু বলে মেরে ফেলার সঙ্গে তুলনা করে স্তালিনকে চিঠি লেখেন।

জার্মানির বীভৎসতম যুদ্ধযন্ত্রকে সোভিয়েত সেনাবাহিনি চূড়ান্তভাবে একক শক্তিতে তাড়া করে পরাস্ত ও ধ্বংস করেছিল— এইজন্য সারা বিশ্ব আজও সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং মার্শাল স্তালিনের কাছে কৃতজ্ঞ। আবার সেই স্তালিনই পরীক্ষিত চরিত্র মলোতভ ভরোশিলভ প্রমুখকে দলের নেতৃত্ব থেকে দূরে সরিয়ে দিয়ে খ্রুশ্চভ সুশলভ মিকোয়ানের মতো ভাবী বদমাসগুলোকে সামনের সারির নেতৃত্বে তুলে আনেন, যারা অচিরেই খুব নিপুণ যত্নে সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ভেঙে ফেলার কাজে হাত লাগাবে। গণতন্ত্রের অনুপস্থিতি, নেতৃত্বের আমলাতান্ত্রিকতা, সদস্যদের অন্ধ আনুগত্য, সেই ভাঙার ষড়যন্ত্রকেও সমাজতন্ত্রের বিকাশ বলে দেখাতে থাকে।

আমাদের মনে পড়ে, লেনিন স্তালিনকে চিনেছিলেন, ভালোমন্দ সহ। সমকালে অন্যদেরও মেপে নিয়েছিলেন। স্তালিন কিন্তু খ্রুশ্চভদের সঠিক মাপ নিতে পারেননি।

স্তালিন ঐতিহ্য থেকে আর আসে দুনিয়াজোড়া এক নিরঙ্কুশ যুক্তিহীন অন্ধতার অন্ধকার রাজ। স্তালিন মানেই নির্ভুল। নেতা মানেই অভ্রান্ত। দেশে দেশে কমিউনিস্টরা— এমনকি জন ডেসমন্ড বার্নালও— লাইসেঙ্কোর ভুতুড়ে বিজ্ঞানের পক্ষে হাস্যকর সমর্থন জানাতে থাকবেন, উপায়ান্তরে মুখ না খুলে চুপ থাকবেন স্রেফ স্তালিন যুগের ফসল বলে; এবং তাঁরা বরিস হেসেনের মৃত্যুকে নির্বাক চোখে অগ্রাহ্য করে যেতে থাকবেন সেই একই কারণে। বরিস মিখাইলোভিচ হেসেনের কাজের দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়েই বার্নাল যে বৃহদায়তন বিজ্ঞানের ইতিহাস বইটা লিখলেন, তাতে হাজার পৃষ্ঠায় খুব আশ্চর্যজনকভাবে সেই নামটি একবারের জন্যও আসে না।

স্তালিন মারা গেছেন, খ্রুশ্চভ হয়ে স্তালিনের কর্মরীতি প্রায় শেষ, এমনকি সেই সোভিয়েত দেশও আজ আর নেই। কিন্তু সেই আশ্চর্য অন্ধতা আজও কমিউনিস্ট আন্দোলনের মূল ধারায় অবিচল রয়ে গেছে। স্তালিন সমর্থকরা দেশে দেশে আজও লাইসেঙ্কো বা বরিস হেসেনের ব্যাপারে সত্য উচ্চারণের সাহস অর্জন করে উঠতে পারেননি।

আমরা অবাক হয়ে দেখেছি, ১৯৫৬ সালের পর বুখারিন, হেসেন সবাইকে নিকিতার দল এসে মরণোত্তর নিরপরাধ ঘোষণা করে দিল। কিন্তু ১৯৯০ সাল পর্যন্ত বুখারিনের কোনও বই, বরিস হেসেনের রচনাবলি সেই দেশ থেকে বেরোল না— না রুশ ভাষায়, না অন্য ভাষায় অনুবাদে। অর্থাৎ, স্তালিনকে দোষী সাজানোর বাইরে খ্রুশ্চভ একটাও কার্যকর পদক্ষেপ নেননি।

লেনিনের সেই কথা, যে ত্রুটি নিজেদের মধ্যে মেনে নেওয়া চলে, তা যিনি সাধারণ সম্পাদকের পদে বসে আছেন, তাঁর ক্ষেত্রে মানা যায় না। মানতে হলে অনেক ক্ষতি হয়। হলও।

পরবর্তীকালে মাও-উত্তর চিনের ক্ষেত্রেও দেখা গেল, বাজারি সমাজতন্ত্রের নামে বিসমার্কীয় ধনতন্ত্র চালু করার পরেও এদেশে এবং অন্য বহু দেশে এখনও একদল কমিউনিস্ট তাকে সমাজতন্ত্রের অগ্রগতি বলে দু-হাত দু-পা তুলে লাফাচ্ছে। ঠুলি শব্দটা শুধু ধনপতিদের বনেদি নেতারা নয়, সমাজতন্ত্রের নামাবলি গায়ে নব্য ধনতন্ত্রের প্রবক্তারাও দারুণ আয়ত্ত করেছে এবং কাজে লাগাচ্ছে। এই অন্ধ বোধির উৎস খুঁজতে শুরু করলেও আমরা অবশেষে ১৯৩০-এর সোভিয়েত ইউনিয়নে গিয়ে পৌঁছব। ক্রেমলিনের আশেপাশে খানিক সেই সূত্র দেখতে পাব।

তবুও মানতেই হবে, লেনিনের দূরদৃষ্টিতে ধরা পড়েছিল, সেদিন স্তালিনের কোনও শ্রেয়তর বিকল্প ছিল না কেউ। আমরা যদি আজ লেনিনকে বুঝতে চাই, তাঁর থেকে কিছু নিতে চাই, তাহলে এই দূরদৃষ্টিপাতের ক্ষমতা আয়ত্ত করায় যত্নবান হতে হবে, তার আনুষঙ্গিক যুক্তিবাদী খোলা মন গড়ে তুলতে হবে। স্তালিনকেও বুঝতে হবে লেনিনের চোখ দিয়ে।

স্তালিনকে বোঝার— পক্ষে এবং বিপক্ষে— চশমাগুলো পাল্টে ফেলার সময় হয়েছে।

[১৮] শেষ পর্ব

কমরেড স্তালিনের তত্ত্বগত অবস্থান প্রসঙ্গে আরও কিছু কথা না বললে এই স্মৃতিকথা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।

লেনিনের জীবদ্দশাতেই, এবং সামান্য সময়ের ব্যবধানে বলশেভিক দলের অভ্যন্তরে যে কয়েকজন তাত্ত্বিক নেতার দেখা পাই, তাঁদের মধ্যে নানা কারণে স্তালিনই সবচাইতে বেশি গুরুত্ব পেয়েছেন। কিন্তু অন্যরাও খুব পিছিয়ে ছিলেন না। যথা: ত্রতস্কি এবং বুখারিন। শেষ পর্যন্ত স্তালিনের নামই শুধু সোভিয়েত ইউনিয়নে নয়, সারা দুনিয়ার সামনেই উঠে আসে মুখ্য তাত্ত্বিক প্রবক্তা হিসাবে।

স্তালিন তাঁর রাজনৈতিক জীবনের গোড়ার পর্বে কিছু মৌলিক রচনায় হাত লাগিয়েছিলেন। তাঁর Anarchism or Socialism (১৯০৬), The Proletarian Class and the Proletarian Party (১৯০৫), Marxism and the National Question (১৯০৪ এবং ১৯১৩), ইত্যাদি ছোট ছোট বইগুলি বিপ্লবের আগে বলশেভিক মতবাদ প্রচারের পক্ষে যথেষ্ট কার্যকরী হয়েছিল। তারপর থেকে তাঁর প্রায় সমস্ত রচনাই কেজো লেখা, সমকালিক ঘটনা ও চরিত্র নিয়ে লেখা। ১৯২৪ সালের এপ্রিল মাসে তাঁর এক বক্তৃতা সিরিজ থেকে বই আকারে বেরোয় Foundations of Leninism (১৯২৪)। আবার ১৯৩৬ সালে সিপিএসইউ (বি)-র ইতিহাস রচনা কমিশনের তরফে যখন সেই ইতিহাস বইটা বেরোয়, তাতে এক অধ্যায়ে দেখা দেয় একটি তাত্ত্বিক রচনা— দ্বন্দ্বমূলক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদ (১৯৩৮)। এটিও পরে স্তালিনের রচনা হিসাবে পুস্তিকা আকারে প্রকাশিত হয়। আর একেবারে জীবনের শেষ পর্বে, মৃত্যুর আগে তিনি দুটি মৌলিক রচনা প্রকাশ করেন: Marxism and Problems of Liguistics (১৯৫০) আর Economic Problems of Socialism in the USSR (১৯৫২)। সাধারণভাবে এই বইগুলি কমিউনিস্ট আন্দোলনে আজ অবধি মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদ আয়ত্ত করার উদ্দেশ্যে অবশ্যপাঠ্য হিসাবেই ব্যবহার ও চর্চা করা হয়। যদিও ত্রতস্কিবাদী সংগঠনগুলির তরফে এগুলোর বিরুদ্ধে অনেক বিসংবাদ তোলা হয়ে থাকে।

ত্রতস্কিপন্থীদের অধিকাংশ সমালোচনার সঙ্গে একমত না হলেও আমার নিজের কিছু সমালোচনা আছে কয়েকটি পুস্তিকা সম্পর্কে। আপাতত তিনটি বই সম্পর্কে সেই কথাগুলি আমি এখানে পাঠকদের সঙ্গে ভাগ করতে চাই (চতুর্থ বইটির ক্ষেত্রে আমার আপত্তির কথা বলতে গেলে অনেক কিছু আলোচনা করতে হবে; এখানে পাঠকদের উপরে সেই গুরুভার চাপাতে চাই না)। যদি আমার কোথাও ভুল হয়ে থাকে কেউ না কেউ নিশ্চয়ই গালাগালি না করে তথ্য ও যুক্তি দিয়ে ভুল ধরিয়ে দেবেন— এই আশা নিয়ে কথাগুলো তুলব।

[] লেনিনবাদের ভিত্তি: প্রথম বক্তব্য লেনিনবাদের ভিত্তি বইটির বিষয়বস্তু নিয়ে।

স্তালিন লেনিনবাদকে সাম্রাজ্যবাদ ও সর্বহারা বিপ্লবের যুগের মার্ক্সবাদ হিসাবে অভিহিত করেন। তাঁর মতে মার্ক্স আর এঙ্গেলসের তত্ত্বগুলি প্রাক-বিপ্লব পর্বের মার্ক্সবাদ, আর লেনিনের কাজগুলি সর্বহারা বিপ্লবী পর্বের মার্ক্সবাদ। খুব মোটা দাগে এই ভাগাভাগিতে অসুবিধা নেই। কিন্তু সূক্ষ্মভাবে বিচার করলে দেখা যাবে, এইরকম বিভাজনের মধ্যে একটা স্থূল কৃত্রিমতা রয়েছে। একে তো বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের জন্য যে জ্ঞানচর্চার প্রয়োজন তার অনেক কিছুই মার্ক্স এবং এঙ্গেল্‌সের রচনাবলিতে পাওয়া যায়। তার উপর, সোভিয়েত ইউনিয়নে এবং লাল চিনে সমাজতন্ত্রের পতনের/অধঃপতনের পর, অর্থাৎ, প্রতিবিপ্লব সম্পন্ন হওয়ার পর এখন (এই প্রতিবিপ্লবের যুগে) কমিউনিস্ট আন্দোলনে লেনিনবাদের কার্যকারিতা আছে বলে আমরা মানব কিনা ভেবে দেখতে হবে। যদি আমরা তা মানতে রাজি থাকি, তাহলে স্তালিনের সংজ্ঞাকে সংশোধন করতে হবে। কালের নিরিখে একদিক খোলা রেখে মার্ক্স-এঙ্গেলস উত্তরকালের মার্ক্সবাদী সংযোজন হিসাবেই লেনিনের তত্ত্বগত অবদানকে মেনে নিতে হবে।

দ্বিতীয়ত, যেমন মার্ক্স এঙ্গেলসের, তেমনই লেনিনেরও, এমন বহু কাজ আছে যা যুগোত্তর। বিশেষ কালের সমস্যার সমাধান বাতলাতে গিয়ে তাঁরা এমন কিছু কিছু তত্ত্বগত প্রস্তাবনা করেছেন যা কালের প্রয়োজন মিটিয়ে ভাবীকালের জন্যও কিছু অবদান এবং আবেদন নিয়ে উপস্থিত হয়েছিল। যেমন, দর্শন এবং বিজ্ঞানের দর্শন সংক্রান্ত তাঁদের বেশ কিছু মূল্যবান আলোচনা। সেই সব রচনায় তর্কবিতর্কের গায়ে সমসাময়িকতার অনেক চিহ্নই হয়ত রয়ে গেছে। কিন্তু সেই সব ছাড়িয়ে সাধারণ শিক্ষাগুলির দিকে তাকালে আমরা বুঝতে পারব, তাঁদের সেই সব কাজকে কোনও একটা সময়সীমার মধ্যে বেঁধে ফেলার প্রচেষ্টা তাকে সীমিত করারই সমতুল্য। সাম্রাজ্যবাদ যখন সারা বিশ্বে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে, মানবসমাজ যখন সাম্যবাদের পথে যাত্রা শুরু করবে, সেদিনও এঙ্গেলসের ড্যুরিং সমালোচনা বা লেনিনের বোগদানভ সমালোচনার দার্শনিক মূল্য অটুট থেকে যাবে।

স্তালিনের বইটিতে লেনিনবাদের যে সমস্ত উপাদানকে চিহ্নিত করা হয়েছে সেগুলি খুব আগ্রহব্যঞ্জক: পদ্ধতি, তত্ত্ব, সর্বহারার একনায়কত্ব, কৃষক প্রশ্ন, জাতিসত্তার প্রশ্ন, রণনীতি ও রণকৌশল, দল, কর্মকুশলতা। এই বিষয়গুলি লেনিনের অবদান আলোচনার সময় উত্থাপন ও অনুশীলন করা নিঃসন্দেহেই জরুরি কাজ। এর মধ্যে অনেকগুলি সমস্যাকেই স্তালিন যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে সবিস্তারে উপস্থাপন করেছেন।

কিন্তু আবার অনেকগুলি জরুরি জিনিস তিনি হয় বাদ দিয়েছেন, অথবা উপযুক্ত গুরুত্ব দেননি। যেমন, তত্ত্বের অধ্যায়ে দর্শনের প্রশ্নটিকে শুধুমাত্র উল্লেখ করেই এক অনুচ্ছেদে তাঁর আলোচনা সমাপ্ত করেছেন। অথচ এই ক্ষেত্রে লেনিনের কাজটি ছিল যথার্থই যুগান্তকারী। মার্ক্সবাদকে মাখপন্থী প্রত্যক্ষবাদী চিন্তাধারার প্রভাব থেকে রক্ষা করা এবং বিজ্ঞানের যে কোনও নতুন আবিষ্কারকে দ্বন্দ্বমূলক ও ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গিতে আত্মস্থ করার কাজটি তিনি যে সামগ্রিক গুরুত্ব দিয়ে সম্পন্ন করেছেন, তা একটা অনুচ্ছেদ নয়, পুরো একটা অধ্যায় দাবি করে।

আরও দুঃখের কথা হল, লেনিনকে বড় করতে গিয়ে সেখানে স্তালিন সম্পূর্ণ অনাবশ্যকভাবে প্লেখানভ সম্পর্কে একটা মিথ্যা কথা বলেছেন। প্লেখানভ নাকি সেই সময় মাখবাদের বিরুদ্ধে কোনও গুরুভার রচনা লেখেননি। আজ হয়ত অনেকেরই জানা নেই, লেনিনের সঙ্গে একই সময়ে, ১৯০৭ থেকে ১৯১০ সালের মধ্যে, প্লেখানভ বোগদানভের উদ্দেশে খোলা চিঠির আকারে Materialismus Militans নাম দিয়ে তিনটি প্রবন্ধ-গুচ্ছ প্রকাশ করেছিলেন, এবং তার মূল লক্ষ্য ছিল মার্ক্সীয় দার্শনিক জমিতে দাঁড়িয়ে মাখ দর্শন ও তার অন্তর্নিহিত প্রত্যক্ষবাদ এবং ভাববাদকে খণ্ডন করা। এছাড়াও তিনি আরও দুটো বড় প্রবন্ধ লিখেছিলেন সেই বিষয়ে। প্লেখানভের সেই প্রবন্ধগুলি অত্যন্ত সুগঠিত ও বলিষ্ঠভাবে মাখ-চিন্তার বিভ্রান্তিগুলিকে চিহ্নিত করেছিল, এবং মার্ক্সবাদের দার্শনিক সারসত্যগুলিকে যথেষ্ট সহজ ও সাবলীল ভাষায় তুলে ধরেছিল। বস্তুত, একথা স্বীকার করতেই হবে যে সাধারণ পাঠের দিক থেকে লেনিনের বইটির তুলনায় প্লেখানভের রচনা অনেক বেশি সহজবোধ্য ও মননগ্রাহ্য। যদিও একথা ঠিক যে প্লেখানভ লেনিনের মতো করে বিজ্ঞানের দর্শনের প্রশ্নগুলিকে ধরে আলোচনা করতে পারেননি। সেই অর্থে তাঁর মাখ সমালোচনা ছিল অসম্পূর্ণ। অন্য পক্ষকে লোকের চোখে হেয় করার জন্য এই নীতিহীন মিথ্যার চাষ স্তালিনের উচ্চতা থেকে প্রবেশ করে কমিউনিস্ট আন্দোলনে একটা দুরারোগ্য বদভ্যাসে পরিণত হয়েছে, যার কবল থেকে এখনও আমরা বেরিয়ে আসতে পারিনি।

রাষ্ট্র ও বিপ্লব সম্পর্কে লেনিনের বক্তব্যকেও তিনি তুলে আনেননি। কিংবা সমাজতন্ত্র নির্মাণ সম্পর্কে সামান্য হলেও লেনিনের কিছু মূল্যবান পর্যবেক্ষণ ছিল, যেগুলি স্তালিনের এই বইতে নেই।

এর ফলে লেনিনবাদের যে কাঠামোটি তিনি তুলে ধরেন এবং দীর্ঘ একশো বছর ধরে কমিউনিস্টরা যার চর্চা করে চলেছে পরম বিশ্বাসে, তাতে লেনিনের চিন্তার মূল্যবান অংশের অনেকটাই অনুপস্থিত। এই বইটি বেরনোর পরেও তিনি ২৯ বছর বেঁচে ছিলেন এবং প্রচুর লেখালেখি করেছেন। কিন্তু এর আর কোনও সংস্করণ বা উন্নতিসাধন হয়নি। অন্যত্রও নতুন কোনও বিষয়ের উত্থাপন করেননি। যাঁরা স্তালিন সমর্থক, তাঁরা মনে করেন, লেনিনবাদের স্তালিনীয় উপস্থাপনাই তার একমাত্র সঠিক ব্যাখ্যা। ফলে তাঁরাও এই আংশিক ঐকদেশিক ব্যাখ্যাতেই খুশি হন এবং লেনিনের অনেক কিছু অবদান সম্পর্কেই জীবনভর অনবহিত থেকে যান প্রায় স্বেচ্ছায়।

আর একটা বড় আকারের ক্ষতি তিনি করে যান এই আলোচনার রণনীতি ও রণকৌশল অংশে।

সেখানে তিনি লেনিনের কিছু কথার উদ্ধৃতি দিয়ে দাবি করেন, সোস্যাল ডেমোক্রেটিক রাজনীতিকে পরাস্ত না করে পুঁজিবাদকে ধ্বংস করা যাবে না। তাঁর এই কথাটা একরকম বেদবাক্যের মতো কমিউনিস্ট আন্দোলনে ঝড়ের গতিতে ছড়িয়ে পড়ে। দেশে দেশে কমিউনিস্টরা নিজেদের বাদ দিয়ে অন্যদের সোস্যাল ডেমোক্র্যাট ধরে নিয়ে একে অপরের বিরুদ্ধে যে জিনিসটি ছুঁড়তে শুরু করে তার বস্তুগত পরিচয় হচ্ছে কাদা। অনেক ক্ষেত্রেই মূল কর্মকাণ্ডের চাইতেও সোস্যাল ডেমোক্রেসিকে খতম করাই মুখ্য উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়ায়। কমিনটার্নও এই লাইনেই প্রচার চালায় এবং দিকনির্দেশ দিতে থাকে।

সবচাইতে ক্ষতি হয় জার্মানিতে। ১৯১৯ থেকে ১৯৩২ পর্যন্ত নাৎসি পার্টির বিরুদ্ধে কমিউনিস্ট এবং সোস্যাল ডেমোক্রেটিক দল যদি মিলিতভাবে দাঁড়াতে পারত, তাহলে ১৯৩৩ সালে হিটলারের অভ্যুত্থান হয়ত সম্ভব হত না। অনেক মূল্য দিয়ে সেই ক্ষয়ক্ষতি উপলব্ধি করার পর ১৯৩৫ সালে কমিনটার্নের সপ্তম কংগ্রেসে নীতি বদল করে বৃহত্তর ঐক্যের ডাক দেওয়া হয়।

মজার কথা হল, স্তালিনের সিদ্ধান্তটা কিন্তু ভুল ছিল না। পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে বিপ্লব করে ক্ষমতা দখল করার আগে শ্রমিকশ্রেণির উপরে সোস্যাল ডেমোক্রেসির প্রভাব খতম করতে হবে— এর মধ্যে কোনও ভুল নেই। কিন্তু এই থিসিসকে তখন যান্ত্রিক ও অন্ধভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছিল গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে ফ্যাসিবাদের অভ্যুত্থানের কালে শ্রমিক কৃষক ও লিবারেল জনগণের শ্রেণি ও দলগত ঐক্যের প্রশ্নের উপর। ক্ষতিটা সেখানেই হয়ে যায়। স্তালিনের এই থিসিসে অনেকেরই এত প্রগাঢ় বিশ্বাস ছিল যে ১৯৪৮ সালে ভারতে একটা নতুন মার্ক্সবাদী দল তৈরি হলে তারা তাদের প্রথম দলিলে কমিনটার্নের ১৯৩৫ সালে গৃহীত পরিবর্তিত সিদ্ধান্তের জন্য তাকে corrupt এবং inefficient বলে নিন্দা করে ফেলে। আজও দেশে দেশে কমিউনিস্টরা স্তালিনের এই থিসিসের কবল থেকে নিজেদের বের করে আনতে পারেনি। এখনও এই থিসিস হাতে হাতে ঘুরতে দেখা যাচ্ছে। ভারতবর্ষের বর্তমান পরিস্থিতিতে এর ক্ষতিকারক প্রভাব অপরিসীম।

[] দ্বন্দ্বমূলক ঐতিহাসিক বস্তুবাদ: এই বইটিও বহুল প্রচলিত একটি মার্ক্সীয় ধ্রুপদী পাঠ। ভালো করে বিচার করলে বোঝা যাবে, স্তালিন অনেক কাল আগে Anarchism or Socialism নামে যে পুস্তিকা রচনা করেছিলেন, তাকেই খানিকটা পরিমার্জিত করে তিনি এই বইটির রূপরেখা দাঁড় করান। এতে মার্ক্সীয় দর্শন এবং ঐতিহাসিক বস্তুবাদ সম্পর্কে একটা খুব সংক্ষিপ্ত ধারণা তুলে ধরার চেষ্টা হয়েছে। যদিও এর লেখার ধরন অনেকটা সরল পাঠ্যপুস্তক বা প্রাইমারের মতো। এই পুস্তিকা পড়ে মার্ক্সবাদ সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা যা পাওয়া যায় তা ভুল নয়, বরং মোটামুটি সঠিকই বলা যেতে পারে। মার্ক্স এঙ্গেলস ও লেনিনের প্রাসঙ্গিক অনেক উদ্ধৃতিও এতে উল্লিখিত।

বইটিতে খুব আশ্চর্জনকভাবে দ্বন্দ্বতত্ত্বের তিনটি সূত্রের মধ্যে দুটির উপর বিস্তৃত আলোচনা আছে, অথচ মোচনের মোচন (negation of negation) সূত্রটির উপর কোনও বক্তব্য নেই। যদি স্তালিন মনে করে থাকেন যে দ্বন্দ্বতত্ত্বে আজ আর এই সূত্রের কোনও প্রয়োজন নেই, তাহলে তিনি সেই অনুযায়ী বক্তব্য রেখে বিষয়টি পরিষ্কার করে যেতে পারতেন। কেন না, এঙ্গেলসের অ্যান্টি-ড্যুরিং বইতে এর উপর বেশ বিস্তারিত আকারে আলোচনা আছে।

দ্বিতীয়ত, বইটির উপস্থাপন নিয়েও গভীর সংশয় রয়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টি (বলশেভিক)-এর ইতিহাস গ্রন্থে, দলের ইতিহাস সালানুক্রমিক ভাবে বিবরণ দিতে দিতে, হঠাৎ করে তারই একটা অধ্যায়ে কেন এই পুস্তিকার আবির্ভাব ঘটেছিল, তার কোনও ব্যাখ্যা আমাদের কাছে নেই। বইটিতে এরকম একটা আভাস দেওয়ার চেষ্টা আছে যে বলশেভিক দলের ইতিহাস বুঝতে হলে দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের উপলব্ধি পাকাপোক্ত হওয়া দরকার। ঠিক আছে, এটা মেনে নিতে কোনও অসুবিধা নেই। কিন্তু এই একই কথা তো আরও অনেক কিছু বোঝার ক্ষেত্রেই সত্য। তা সেই সব বইতে তো স্তালিন এরকম কোনও অধ্যায় যোগ করেননি। শুধু এই বইতেই কেন?

দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের (যদি ধরে নিই) সঠিক উপলব্ধি থাকা সত্ত্বেও স্তালিন নিজেই লাইসেঙ্কোর পরিঘটনা বুঝতে পারেননি, বরং তার হাতের ক্রীড়নক হিসাবে খেলেছেন এবং বদনাম কুড়িয়েছেন। কেন না সূত্রাকারে দর্শন আয়ত্ত করলে তার দ্বারা বিজ্ঞানের নিজস্ব এলাকার সমস্যাগুলির বাস্তবিক সমাধান আপনিই কেউ বুঝে ফেলবেন, বিষয়টা এত সরল নয়। বিজ্ঞানের সমস্যাগুলি বোঝার জন্য বিজ্ঞানকেও ভালো করে এবং সঠিকভাবে পাঠ করতে হবে, অনুধাবন করতে হবে। লাইসেঙ্কো স্তালিনের পুস্তিকার সঙ্গে মিলিয়ে তাঁর ভ্রান্ত থিসিসের গায়ে একটা করে মার্ক্সবাদী লেবেল লাগিয়েছেন আর তাতে স্তালিন বিশ্বাস স্থাপন করেছেন। সুতরাং দলের ইতিহাস বইতে এই পুস্তিকা সংযোজন করেও যে বিশেষ লাভ হয়েছিল, তা ভাবার কোনও কারণ নেই। বরং পুরো পরিকল্পনাটাই একটা যান্ত্রিক ছকের মতো লাগে।

তা সত্ত্বেও বইটার নিজস্ব মূল্য ও আবেদন কম নয়।

[] মার্ক্সবাদ ভাষাতত্ত্বের সমস্যা: এই বইটি যখন প্রথম বেরয় কমিউনিস্ট বিশ্বে একটা বড় মাপের সাড়া পড়েছিল। যত্রতত্র বইটা থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে যে যা পারছিল প্রমাণ করছিল এবং স্তালিনের দূরদৃষ্টির লাগামহীন প্রশংসা করছিল। একটা উদাহরণ দিই। আমাদের দেশে ননী ভৌমিক ১৯৫০ সালের পরিচয় পত্রিকায় “শিল্প সাহিত্য প্রসঙ্গে স্তালিন” নামে এক বড় প্রবন্ধে এই বই থেকে অজস্র কোটেশন দিয়েছিলেন। দুঃখের বিষয়, তিনি যা বলতে চাইছিলেন, স্তালিনের উদ্ধৃতিগুলোতে সেই জাতীয় বক্তব্য প্রায় ছিল না বললেই চলে। অন্ধতার এক চমৎকার উদাহরণ হিসাবে ননীবাবুর সেই লেখাটিকে ব্যবহার করা যেতে পারে।

ভাষা নিয়ে বইটিতে স্তালিন যা বলেছিলেন, তার অধিকাংশ কথাই ভাষাতত্ত্বের দিক থেকে সাদামাটা সরল সত্য। ইংরেজিতে এদেরকে বলা হয় trite; এই সব বলার জন্য স্তালিনকে বা তাঁর মাপের কাউকে লাগে না। যে কোনও লোক সেই কথাগুলি বলতে পারে। পক্ষান্তরে, সমাজবিকাশের ইতিহাসের সঙ্গে মিলিয়ে ভাষার বিকাশের ইতিহাস প্রসঙ্গে তিনি এমন কিছু সাধারণীকৃত মন্তব্য করেছিলেন, যেগুলি অধিকাংশ ভাষার ক্ষেত্রেই খাটে না। সংস্কৃত বা লাতিন কেন ভাষা হিসাবে মৃত হয়ে গেল, প্রাচীন জার্মান বা প্রাচীন আরবি ভাষা কীভাবে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিবর্তিত হয়ে আধুনিক ভাষায় পরিণত হল, এর ব্যাখ্যা অত সরলভাবে দিলে হবে না।

তবে, মার্ক্সবাদের দিক থেকে দুটি সিদ্ধান্ত তিনি টেনেছিলেন, যার খানিক তত্ত্বগত মূল্য আছে। এক, ভাষার কোনও শ্রেণিচরিত্র হয় না। দুই, ভাষা হচ্ছে অনেকটা উৎপাদিকা শক্তির মতো। একে উপরকাঠামোর উপাদান হিসাবেও দেখা চলে না।

এর বাইরে ভাষাতত্ত্বের দিক থেকে বইটিতে একটিও গুরুত্বপূর্ণ বা শিক্ষণীয় কিছু নেই। অজানা নতুন কথা কিছু নেই। আর সবচাইতে আশ্চর্যের কথা, ভাষা ও চিন্তার অঙ্গাঙ্গী সম্পর্কের প্রশ্নে সোভিয়েত ইউনিয়নের নিজস্ব অবদান, পাভলভ ও ভাইগতস্কির অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক গবেষণার সামান্যতম উল্লেখ পর্যন্ত নেই স্তালিনের এই বইতে।

কেন? অনেক ভেবেও আমি এর উত্তর খুঁজে পাইনি।

কিন্তু রাজনৈতিক সাংগঠনিক দিক থেকে এর মধ্যে একটা গুরুত্বপূর্ণ বার্তা আছে। অন্তত সেদিন ছিল।

অনেকেই জানেন, ১৯৪৮ সালে এক কৃষিবিজ্ঞান সম্মেলনে সোভিয়েত ইউনিয়নে স্তালিনের নাম করেই প্রবল হুররা ধ্বনির মধ্য দিয়ে অত্যন্ত সফলভাবে আধুনিক (“বুর্জোয়া”) জিনতত্ত্বের গবেষণায় চূড়ান্ত তালাচাবি পড়ে যায় এবং লাইসেঙ্কোর আজগুবি বংশগতির গল্প “সোভিয়েত বিজ্ঞান” হিসাবে গৃহীত হয়। এই ঘটনায় আন্তর্জাতিক শিক্ষিত মহলে সোভিয়েত ইউনিয়নের এবং ব্যক্তি স্তালিনের ব্যাপক দুর্নাম হয়। হিটলারের ঝোড়ো বাহিনীকে পর্যুদস্ত করে যে সুনাম অর্জিত হয়েছিল, তার অনেকটাই হাতছাড়া হতে থাকে। ব্রিটিশ কমিউনিস্ট পার্টির বিশিষ্ট সদস্য এবং জীববিজ্ঞানী জেবিএস হলডেন নিঃশব্দ প্রতিবাদে দল ছেড়ে বেরিয়ে আসেন এবং ইংল্যান্ড ছেড়ে ভারতে পাড়ি দেন। কলকাতার ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিকাল ইনস্টিটিউটে যোগদান করে তিনি যেদিন সেখানে আসেন, এক বিরাট ব্যানার টাঙিয়ে তাঁকে অভ্যর্থনা দেওয়া হয়, যাতে লেখা ছিল— লাইসেঙ্কোর সৌজন্যে আমরা হলডেনকে পেলাম।

স্তালিনের কানে এইসব খবর মনে হয় পৌঁছেছিল। তিনি সম্ভবত বুঝেছিলেন, লাইসেঙ্কোর কাণ্ডটা শেষমেশ ভালো হল না। দেশবিদেশের আরও বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত ছিল।

আচ্ছা, এমন কি হতে পারে, লাইসেঙ্কো কেলেঙ্কারির পর স্তালিন অজানা আশঙ্কায় পাভলভ প্রমুখর নাম উচ্চারণ করে আবার নতুন করে বেকুব বনতে চাইছিলেন না? কে জানে!

ঠিক সেই সময়, সেই ১৯৫০ সালেই, সোভিয়েত ইউনিয়নে পাভলভের শারীরতাত্ত্বিক শিক্ষার উপরেও এক বিরাট সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। তারও লক্ষ্য ছিল, শারীরতাত্ত্বিক ও স্নায়ুশারীরতাত্ত্বিক গবেষণার ক্ষেত্রে একটা পার্টি লাইন অনুমোদিত পাভলভীয় ধারা এবং দলবিরোধী অপাভলভীয় ধারার নামে দুটো গোষ্ঠী দাঁড় করিয়ে একটি গোষ্ঠীকে কোনঠাসা করে সমস্ত প্রাতিষ্ঠানিক কাজের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা এবং কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় বিজ্ঞানীকে কয়েদখানায় পাঠানো।

স্তালিনকে লাইসেঙ্কোরা এবং তাঁর সমালোচকরা যতটা বোকা এবং অকর্মণ্য ভাবেন, তিনি আসলে তা নন। ন্যাড়া হয়ে একবার বেলতলায় গিয়ে মাথা ফাটার পর এবার তিনি যথেষ্ট সাবধান হয়ে গেলেন। বইটিতে পত্রোত্তরের আকারে স্তালিনের কিছু কথা আছে। ভাষাতত্ত্বের বিভিন্ন সমস্যা আলোচনাকালে সেই সময় মার নামক একজন রুশী ভাষাবিদের বিরুদ্ধে অনেকে নানারকম তর্ক তুলেছিলেন। স্তালিনও মারের কঠোর সমালোচনা করেন। তাতে একজন জানতে চান, তাহলে কি আমরা এখন মারের বই পড়ানো বন্ধ করে দেব? মারকে তাঁর কাজকর্ম থেকে হঠিয়ে দেব?

স্তালিন জানালেন, না এবং না। মারের বই বন্ধ করা একেবারেই সঠিক কাজ হবে না। যদিও সমালোচনার প্রক্রিয়া বজায় থাকবে। দ্বিতীয়ত, আমাদের সঙ্গে মতে না মিললেও তাঁকে তাঁর কাজ চালিয়ে যেতে দিতে হবে।

আমার দৃঢ় বিশ্বাস, স্তালিন সেদিন এটা বলার ফলে সেই শারীরতাত্ত্বিক সম্মেলনের সিদ্ধান্তে আর লাইসেঙ্কোর মতো রাজনৈতিক জবরদস্তি করা গেল না। যাঁর গবেষণার “লাইন” যাই হোক, তাঁকে তাঁর কাজ করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা বা কয়েকজনকে ধরে সাইবেরিয়ায় শ্রম শিবিরে আত্মসংশোধন করতে পাঠানো গেল না।

ভাষাতত্ত্ব সম্পর্কে স্তালিনের বইটির, আমার মতে, এটাই সবচেয়ে বড় অবদান। আজ মনে হয়, স্তালিন যদি এটা আর দু বছর আগে বুঝতে পারতেন!

আপাতত এই ক্রমিক আখ্যায়িকা থেকে বিদায়!

***

লেনিন সম্পর্কে কথন ছলে কিছু ঘটনা, কিছু তথ্য, কিছু তত্ত্ব তুলে ধরে এই ক্রমিকায় তাঁর মহান চরিত্রের সাধনা ও সংগ্রামের কিছু অংশকে পরিস্ফূট করতে চেয়েছি। সামান্যই সম্ভব হয়েছে। আমার সীমিত ক্ষমতায় এই সু-উচ্চ মানুষটির অনেক গুণই সম্ভবত অধরা থেকে গেছে। কাহিনির আকার দিতে গিয়ে বিভিন্ন জায়গায় কিছু সংলাপ আমাকে কল্পনা করে নিতে হয়েছে। চেষ্টা করেছি, যত দূর সম্ভব বাস্তবানুগ থাকতে। জ্ঞানত তথ্য কোথাও বিকৃত করিনি। তথ্যগুলি কয়েকটি প্রামাণ্য বই থেকে পেয়েছি। আর, ইন্টারনেট ব্যবহার করেও অনেক জিনিস হাতে এসেছে।

 

তথ্যসূত্রের আংশিক তালিকা

  • Sdobnikov (ed.) – Lenin in Our Life; Moscow 1967;
  • Lenin’s Comrades-in-arms – A group of authors; Moscow 1969;
  • Sergei Antonov – A Light in the Distance: Stories about Lenin; Moscow 1984;
  • Albert Rhys Williams – Through the Russian Revolution; Moscow 1973;
  • Lenin: a biography – A group of authors; Moscow 1983;
  • I. Lenin – Collected Works (different volumes); Moscow;
  • Wiki Resources on various personalities mentioned here.

 

চিত্র পরিচিতি

  1. বরিস হেসেন এবং তাঁর বই
  2. নিকোলে ভ্যাভিলভ
  3. লাইসেঙ্কো
  4. কমরেড স্তালিন
  5. ‘লেনিনবাদের ভিত্তি’র প্রচ্ছদ
  6. ‘মার্কসবাদ এবং ভাষা সমস্যা’র প্রচ্ছদ

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3607 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...