ভারতের রাজধানী কিসান সংসদের পদভারে শিহরিত

শঙ্কর রায়

 




সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক

 

 

 

পার্লামেন্ট ভবনের অদূরে যন্তরমন্তরে ২২ জুলাই থেকে শুরু হয়েছে ঐতিহাসিক কিসান সংসদ যার মূল লক্ষ্য নরেন্দ্র মোদি সরকার-মোদিত তিনটি কৃষি-বিরোধী ও কিসান-স্বার্থবিনাশী আইন বাতিলকরণ। এই তিনটি আইন— কৃষকের উৎপাদন ব্যবসা ও বাণিজ্য (প্রচার ও সুবিধাদি) আইন ২০২০, কৃষকদের (ক্ষমতায়ন এবং সুরক্ষা) মূল্য আশ্বাস এবং খামার পরিষেবা চুক্তি আইন ২০২০ ও অত্যাবশ্যকীয় পণ্য (সংশোধনী) আইন ২০২০। গত বছরের নভেম্বর থেকে সেই দাবিতেই হাজার হাজার কৃষক এই সংগ্রাম চালাচ্ছেন। কিসান সংসদ তার এক উন্নততর স্তর। প্রতিদিন সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত যন্তরমন্তরে এই সংসদের অনুমতি দিয়েছে দিল্লির আম আদমি পার্টির সরকার। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ-র অঙ্গুলিহেলনে চালিত দিল্লি পুলিশেরও অনুমতিক্রমে এই সংসদ অধিবেশন শুরু হয়েছে, চলবে ৯ আগস্ট অর্থাৎ মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধির ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন অবসানের দাবিতে ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলন’-এর ৭৯তম বার্ষিকী দিবস অবধি। বলা থাক, মোদি সরকারের মতাদর্শগত চালক রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক প্রভুদের তল্পিবাহক ছিল, প্রকাশ্যভাবে ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলন’-এর বিরোধিতা করেছে, কদাচ ভারতে ব্রিটিশ শাসনের অবসান চায়নি।

প্রথম দিকে দিল্লি পুলিশ এই কর্মসূচি পালনে সম্মতি দেয়নি। অনেক টানাপোড়েনের পরে কোভিড ১৯ প্রোটোকল মানার শর্তে ছাড়পত্র দিয়েছে। পুলিশের বক্তব্য অশান্তি আর অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে ওই এলাকায় কড়া নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। গত ২৬ জানুয়ারির ঘটনার পুনরাবৃত্তি যাতে না হয়, সে জন্যে আবার দিল্লি মেট্রোতেও বাড়তি নজরদারির কথা বলেছে পুলিশ। সাতটি স্টেশনে এই নজরদারির কথা বলা হয়েছে। প্রয়োজনে সেগুলি বন্ধ করে দেওয়ার সম্ভাবনাও আছে।

প্রতিদিন ২০৬ জন যাচ্ছেন— ২০০ জন সংযুক্ত কিসান মোর্চার ও ৬ জন কিসান মজদুর সংঘর্ষ কমিটির প্রতিনিধি। এঁদের দাবি ছিল সিংঘু সীমান্ত থেকে পায়ে হেঁটে যন্তরমন্তরে যাবেন, কিন্তু কোভিড ১৯ সংক্রমণবিধি মোতাবেক সে অনুমতি মেলেনি। পুলিশের ব্যবস্থাক্রমে প্রতিদিন চারটে বাস এঁদের বিয়ে যাচ্ছে ও পাঁচটার পরে সিংঘুতে দিয়ে আসছে। অতিমারির কথা মাথায় রেখে সামাজিক দূরত্ববিধি সহ সমস্ত করোনাবিধি মেনে চলা হচ্ছে।

সংসদ অধিবেশনের কায়দায় পরিচালিত হচ্ছে প্রতিদিনের কিসান সংসদ।  একজন স্পিকার, একজন ডেপুটি স্পিকার থেকে শুরু করে চায়ের বিরতি, সবই অনুসৃত হচ্ছে। কিসান মজদুর সংঘর্ষ কমিটির পক্ষে স্বরাজ ভারতের নেতা যোগেন্দ্র যাদব আগেই জানিয়েছিলেন ‘সংসদ কীভাবে চালানো উচিত, সেটা আমরা দেখিয়ে দেব।’

প্রত্যেক আন্দোলনকারীকে পরিচয়পত্র বহন করতে হবে। সময় শেষ হয়ে গেলে তাঁদের পুলিশি নিরাপত্তাতেই ফিরিয়ে দেওয়া হবে সিংঘুতে। অন্যদিকে সংগ্রামী কৃষকরা জানিয়েছিলেন, তাঁদের বাদ দেওয়া হলে গ্রেপ্তারি বরণ করবেন। কৃষক সংগঠনগুলি সদস্যদের বলে রেখেছিল, ছ মাস পর্যন্ত হাজতবাসের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। আসলে তলায় তলায় উগ্র হিন্দু ফ্যাসিবাদী মোদি সরকার ও তার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ আন্দোলনরত কৃষকদের উপর নিপীড়নের রাস্তা তৈরি রাখছে, যদিও বাহ্যত গণতান্ত্রিক পরমতসহিষ্ণুতার আবরণ তুলে ধরেছে। কারণ, আগামী বছরের মধ্যে পাঞ্জাব ও উত্তরপ্রদেশে বিধানসভা নির্বাচন। এদিকে দিল্লির লেফটেন্যান্ট গভর্নর অনিল বাইজাল একটি নিপীড়নমূলক আদেশ জারি করেছে, যা সরকারি গেজেটে প্রচারিত হয়েছে। জাতীয় নিরাপত্তা আইন ১৯৮০-র ধারা ২(ঙ) প্রয়োগ করে সমাবেশের যে কোন আন্দোলনকারীকে পুলিশ আটক করতে পারে ও সেখানে উপস্থিত কোনও বিদেশিকে (এর মধ্যে প্রচ্ছন্ন কোন বিদেশি সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করার হুমকি নিহিত)। এই উপধারা প্রয়োগ করার অধিকার দিল্লি পুলিশের নগরপালের আছে। আর দিল্লি পুলিশ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নিয়ন্ত্রণাধীন। এই অধিকার প্রয়োগ করার এক্তিয়ার ২০২১ সালের ১৯ জুলাই থেকে ১৮ অক্টোবর (গেজেটে প্রকাশিত ১৯ জুলাই ২০২১) বহাল থাকবে।[1]

প্রতিবাদরত কৃষক নেতাদের সন্দেহ, ইজরায়েলি স্পাই সফটওয়্যার পেগাসাস ব্যবহার করে সরকার তাদের ওপর নজরদারি চালাচ্ছে। কৃষকদের নেতা শিবকুমার কাক্কা বলেছেন, “এটি একটি অনৈতিক সরকার। আমাদের সন্দেহ যে যাদের ওপর নজরদারি চালানো হচ্ছে, তাদের তালিকায় আমরাও আছি। এই নজরদারি চলছে কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশে। এটা স্পষ্ট এবং বিষয়টি ধরা পড়ে গেছে। আমরা জানি আমাদের দিকে নজর রাখা হচ্ছে।” যোগেন্দ্র যাদব বলেছেন ২০২০-২১-এ পেগাসাস-এর তথ্য প্রকাশ পেলে দেখা যাবে কিসান আব্দোলনের কোন কোন নেতার ফোনের ওপর গোপন নজরদারি চালানো হয়েছে।

কেন্দ্রীয় কৃষিমন্ত্রী নরেন্দ্র তোমার বলেছেন যে আন্দোলনরত কৃষক নেতাদের সঙ্গে আলোচনার জন্য সরকারের দরজা খোলা আছে। তিনটি আইনই নাকি কৃষকদের পক্ষে ও দেশের মানুষ নতুন আইনগুলিকে সাধুবাদ জ্ঞাপন করেছে। এর অর্থ মোদি-শাহ সরকার ঐ আইনগুলি প্রত্যাহারে নারাজ। এ যাবত কিসান সংঘর্ষ সমিতির সঙ্গে কেন্দ্রীয় কৃষিমন্ত্রীর ১১ বার বৈঠক হয়েছে। প্রতিটিই ব্যর্থ হয়েছে। কেন্দ্রীয় কৃষিমন্ত্রীর কপট বিবৃতিকে কটাক্ষ করে যোগেন্দ্র যাদব বলেছেন, বিক্ষোভকারী কৃষকরা বোকা নন। তাঁদের বোকা বানানোর অপচেষ্টা যে ব্যর্থ হবে, সেটা প্রতিপন্ন করতেই তাঁরা যন্তরমন্তরে এসেছেন।

কিসান সংসদে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে যে প্রথম আইনটি (কৃষকের উৎপাদন ব্যবসা ও বাণিজ্য (প্রচার ও সুবিধাদি) আইন, ২০২০) রাজ্যগুলির রাজস্ব সংগ্রহে বড় রকমের ক্ষতিসাধন করবে। কারণ, কৃষকরা নিবন্ধিত মান্ডিগুলির বাইরে তাদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রয শুরু করলে রাজ্য ‘ম্যান্ডি ফি’ পাবে না। আর যদি সম্পূর্ণ কৃষিবাণিজ্যই মান্ডির বাইরে চলে যায়, সেই ক্ষেত্রে রাজ্যের নিযুক্ত ‘কমিশন এজেন্টদের’ কোনও ভূমিকা থাকবে না, ন্যূনতম সমর্থন মূল্য ব্যবস্থার অবসান ঘটাবে।

দ্বিতীয় আইনটি (কৃষকদের (ক্ষমতায়ন এবং সুরক্ষা) মূল্য আশ্বাস এবং খামার পরিষেবা চুক্তিআইন, ২০২০) অর্থাৎ চুক্তি চাষ বিধি। এতে কৃষকরা ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। তাঁরা চুক্তির লেনদেন পদ্ধতির সঙ্গে পরিচিত নন, দরাদরিতেও দক্ষ নন। বরং বড় বড় বেসরকারি সংস্থাগুলি ও রফতানিকারী, পাইকারি ব্যবসায়ী বা প্রক্রিয়াকারকরা বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে ছোট কৃষকদের সহজেই ঠকিয়ে নেবে।

তৃতীয় আইনটি (অত্যাবশ্যক পণ্য (সংশোধনী) আইন, ২০২০) বড় সংস্থাগুলিকে পণ্য মজুত করার লাগামছাড়া স্বাধীনতা অর্জন করবে, কৃষকদের ওপর যথেচ্ছ শর্ত আরোপ করার সুযোগ পাবে। চাষিরা কৃষিপণ্যের লাভজনক মূল্য পাবে না।

ভারতের রাজধানীর ভরকেন্দ্র আজ সংগ্রামী ও দেশপ্রেমিক কিসান জনতার পদভারে কম্পিত। দেশের ১৩৮ কোটি মানুষের স্বার্থবিধ্বংসী বিজেপি সরকারের অস্তিত্বসঙ্কট সূচিত করেছে দেশের কৃষক জনতা। হাজার হাজার মানুষকে জেলে (পোশাকি নাম সংশোধনাগার) পুরেছে, সেই সব ‘ভীম কারার ভিত্তি’ আজ নড়ে উঠেছে। ফ্যাসিবাদী সরকার বেপরোয়া নিপীড়নের পথে যেতে পারে। তার মোকাবিলায় অহিংস কৃষকসমাজও প্রস্তুত।


[1] https://twitter.com/LiveLawIndia/status/1418800506445647877

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3501 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...