‘দৈনিক ভাস্কর’-এর ওপরে হামলা— আরও স্পষ্ট হল ফ্যাসিজমের পদধ্বনি?

অমর্ত্য বন্দ্যোপাধ্যায়

 



ছাত্র, গবেষক, গদ্যকার

 

 

 

 

১৮০তে ১৪২। হ্যাঁ, পরিসংখ্যান এটাই বলছে। রিপোর্টারস উইদাউট বর্ডার্সের তথ্য অনুযায়ী সাংবাদিকদের স্বাধীনতার বিষয়ে পৃথিবীর ১৮০টি দেশের মধ্যে আমাদের দেশ এখন ১৪২ নম্বরে। গণতন্ত্রের চারটি স্তম্ভের মধ্যে অন্যতম হল এই সংবাদমাধ্যম বা মিডিয়া। কিন্তু সেই সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা বা সাংবাদিকদের স্বাধীনতা, এমনকি তাদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তাও এখন মোদি-শাহের জমানাতে এতটাই তলানিতে এসে ঠেকেছে। ‘দৈনিক ভাস্কর’-এর ঘটনা কেবল তারই সাম্প্রতিকতম উদাহরণ।

গত ২২শে জুলাই বৃহস্পতিবার সকালে, তল্লাশির নামে দেশের অন্যতম প্রধান হিন্দি দৈনিক সংবাদপত্র ‘দৈনিক ভাস্কর’-এর একাধিক অফিস এবং তার সম্পাদক, পৃষ্ঠপোষকদের বাসভবনে আয়কর দফতরের তরফে যে ন্যক্কারজনক হেনস্থার খবর (পড়ুন ‘অভিযানের খবর’) আমরা দেখলাম তার প্রতিক্রিয়াতে কেবল এদেশেই নয় বিদেশেও মোদি সরকারের মুখ পুড়তে শুরু করেছে। সিএনএন ইন্টারন্যাশনালের তরফে শিরোনাম দেওয়া হয়েছে ‘ইনকাম ট্যাক্স অফিসিয়ালস রেইড নিউজপেপার দ্যাট টুক অন নরেন্দ্র মোদি ওভার দ্য প্যানডেমিক’। গ্রেট ব্রিটেনের অন্যতম জনপ্রিয় সংবাদপত্র দ্য গার্ডিয়ানের পাতায় লেখা হয়েছে, ‘ট্যাক্স রেইডস টার্গেট ইন্ডিয়ান পেপার দ্যাট ক্রিটিসাইজড দ্য গভর্নমেন্ট ওভার কোভিড’। ভক্তেরা হয়তো আর কিছুদিনেই থালা-বাসন-কাঁসর-ঘন্টা-মৃদঙ্গ অথবা ঝুমঝুমির সুরেলা আওয়াজে চারিদিক মুখরিত করে আন্তর্জাতিক চক্রান্তের কথা ঘোষণা করতে পারেন। কিন্তু তাতে করেও এই সমালোচনার তুফানকে আটকানো যাচ্ছে না।

দেশে করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের সময় দৈনিক মৃত্যুর হার যখনই ৪০০০-এর গণ্ডি পেরুতে শুরু করল, সেই সময় থেকেই স্বাধীন ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলির যে একেকটি গোষ্ঠী অদ্ভুত সাহসিকতা এবং আত্মপ্রত্যয়ের সঙ্গে মহামারির স্পষ্ট রূপটিকে জনসমক্ষে তুলে ধরতে চেষ্টা করেছিল— সেগুলির মধ্যে ‘দৈনিক ভাস্কর’ নিঃসন্দেহে অন্যতম। অনেকেই নিশ্চয়ই ভুলে যাননি, ভোপালের ভগভদা শ্মশানঘাটে আকাশপথে ড্রোন ক্যামেরাতে তোলা অন্ধকারের বুকে, শরীরে রীতিমতো কাঁপন ধরানো— উজ্জ্বল শিখাতে সেই গোল হয়ে জ্বলতে থাকা সারিবদ্ধ সমস্ত চিতাগুলির মর্মান্তিক-মর্মন্তুদ ছবিটিকে? ছবিটি তুলেছিলেন আলোকচিত্রী সঞ্জীব গুপ্তা। ছবিটি ছাপাও হয়েছিল এই ‘দৈনিক ভাস্কর’-এরই পাতায়। ছবিটির শিরোনামে সম্পাদক হিন্দিতে যা লিখেছিলেন তার বঙ্গানুবাদ করলে দাঁড়ায়, “সরকার মৃত্যুর সংখ্যাকে নিয়ে মিথ্যে বলছে, চোখের সামনে এই জ্বলন্ত চিতাগুলিই সত্যিটাকে সবার সামনে তুলে ধরছে”। এমন সপাট ঔদ্ধত্য কি সরকারের পছন্দ হয়?

উত্তরপ্রদেশের গঙ্গাতে যখন লাশের পাহাড় ভাসতে শুরু করল, তখন এই ‘দৈনিক ভাস্কর’ই দেশজ ভাষার সংবাদপত্রগুলির মধ্যে প্রথম এই খবরটিকে নিয়ে বিশেষ কভারেজ করে। এমনকি এই কাগজেরই অন্যতম সম্পাদক ওম গৌর, গঙ্গাতে বহমান এই বেওয়ারিশ শবদেহগুলির নিয়ত শোভাযাত্রার উপরে নিউ ইয়র্ক টাইমসের পাতায় একটি আমন্ত্রিত, বিশেষ সম্পাদকীয় কলাম লেখেন। যার শিরোনামে লেখা হয়, ‘দ্য গ্যাঞ্জেস ইজ রিটার্নিং দ্য ডেড, ইট ডাজ নট লাই’।

দেশের মাটিতে করোনাকে নিয়ন্ত্রণ করতে মোদি-শাহের সরকার যে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ, ‘দৈনিক ভাস্কর’-এর মতো একেকটি সংবাদপত্র বা সংবাদমাধ্যমের অসম সাহসিকতার কারণেই সেই খবরকে বিশ্বের দরবারে পৌঁছিয়ে দেওয়া গেছে। তাতে দেশের গৌরববৃদ্ধি হয়নি ঠিকই, কিন্তু মোদি-শাহের দ্বিচারিতা ও লাগাতার মিথ্যাভাষণকে অন্তত ভরা হাটের মাঝখানে হাঁড়িটি ভেঙে দেখিয়ে দেওয়া গেছে; আর আজ সেই কাজেরই স্বীকৃতি পাচ্ছেন ‘দৈনিক ভাস্কর’-এর কর্ণধার থেকে শুরু করে কলাকুশলীরা।

৩০টিরও বেশি স্থানে, ১০০ জনেরও বেশি সংখ্যাতে আয়কর বিভাগের অফিসারেরা গত ২২ জুলাই, ২০২১ তারিখে ‘দৈনিক ভাস্কর’-এর কার্যালয়, দপ্তর, স্টুডিও— এমনকি মালিক ও অন্যান্য পৃষ্ঠপোষকদের ব্যক্তিগত বাসভবনেও তল্লাশির নামে হানা দেন। সংবাদপত্রের বক্তব্য অনুযায়ী এই সময় তদন্তের নামে আয়কর অফিসার ও পুলিশ আধিকারিকেরা নাইট ডিউটিতে থাকা সাংবাদিক, চিত্র-সাংবাদিকদেরও হেনস্থা করেন, এমনকি তাঁদের মোবাইল ফোন ও অন্যান্য ইলেকট্রনিক সামগ্রীকেও বাজেয়াপ্ত করা হয়। যদিও অর্থ দপ্তরের প্রতিমন্ত্রী অনুরাগ ঠাকুর জানিয়েছেন, এই তল্লাশির সঙ্গে রাজনীতির কোনও যোগসাজশ নেই। মোদি সরকার নাকি আয়কর দপ্তর-সহ এমন সমস্ত সংস্থার প্রশাসনিক স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। [তার যে নমুনা আমরা গত সাত বছর ধরে দেখে আসছি, সে আর বলার অপেক্ষা রাখে না।]

এর আগে সরকারের বিরুদ্ধে নানা ইস্যুতে সরব হওয়ার পরে পরেই পরিচালক অনুরাগ কাশ্যপ, অভিনেত্রী তাপসী পান্নুকে আয়কর হানার মুখে পড়তে হয়। একই অভিজ্ঞতার শিকার হন অভিনেত্রী দীপিকা পাড়ুকোনও। দেশের মাটিতে সমস্ত রকমের বিরোধী কণ্ঠস্বরকে নির্বিচারে দাবিয়ে দেওয়ার নিষ্ঠুরতম উদ্দেশ্যকে নিয়েই যে আজকের এই কেন্দ্রীয় সরকার নির্লজ্জ চিত্তে, দিনেরাতে কাজ করে চলেছে, এই বিষয়টি বোধহয় আজ দিনের আলোর চাইতেও পরিষ্কার, স্ফটিকস্বচ্ছ নদীর জলের চাইতেও পরিষ্কার।

পূর্বের আর কোনও সরকারের আমলে বোধহয় এমনভাবে একই সঙ্গে প্রশাসনিক এবং, (এমনকি) বিচারব্যবস্থারও প্রতিটি সংস্থা বা প্রতিটি স্তম্ভকে এতখানি বিপদের মুখে এসে দাঁড়াতে হয়নি। এতখানি অস্তিত্বের সঙ্কটের সামনে পড়তে হয়নি। মানুষ নয়, আজ আমরা গণতন্ত্রেরই অসহায়তাকে প্রত্যক্ষ করেছি। ২০১৭ সালে গৌরী লঙ্কেশকে হত্যা করা হয়েছিল। আদালতের চোখে, আইনের চোখে এখনও অবধি সেটিকে খুন বলেই বিবেচনা করা হবে। কিন্তু, ফাদার স্ট্যান স্বামীকে যে পদ্ধতিতে ‘হত্যা’ করা হল— তার বিচার করবে কে? সরকারের প্রতি প্রতিটি স্বাধীন সংস্থার নগ্নের চেয়েও নগ্নতর আনুগত্য আজ বড় বেশি করেই প্রকাশ্যে এসে যাচ্ছে। ফ্যাসিজমের প্রতিটি বিশেষত্বকেই আমরা পরতে পরতে এদেশের বুকে ফুটে উঠতে দেখছি। এই সময় কেবল উপলব্ধির সময় নয়। এই সময় প্রতিরোধের সময়।

যেভাবে, মোদি সরকারের সমালোচনার পরিপ্রেক্ষিতে ‘দৈনিক ভাস্কর’-এর বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় সংস্থাকে লেলিয়ে দেওয়া হল, প্রতিটি বিরোধী রাজনৈতিক দল একবাক্যে এর বিরোধিতা করেছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে শুরু করে অরবিন্দ কেজরিওয়াল, অখিলেশ যাদব থেকে শুরু করে রাহুল গান্ধি অবধি সমস্ত বিরোধী নেতানেত্রীরা একবাক্যে ‘দৈনিক ভাস্কর’-এর পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু কেবল এইটুকুতেই পেট ভরবে না। মনে রাখতে হবে ফ্যাসিজম যখন সমাজের প্রতিটি স্তরে, অঙ্গপ্রত্যঙ্গে নিজের ডালপালা বিকশিত করতে শুরু করে— তখন সেই বিষকে বিতাড়নই একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। আর কেবল তাইই নয়, সেই বিষকে বিতাড়ন করতে গেলে দলমতজাতিনির্বিশেষে যদি এককাট্টা না হওয়া যায় তাহলে সেই ছিন্নবিচ্ছিন্ন বিরোধিতার খামখেয়ালি টুকরোগুলিকে নির্বিচারে ধূলিসাৎ করতে ফ্যাসিজমের বড় একটা সময়ও লাগে না। রাজনীতির দখল ওরা আগেই নিয়েছে। প্রশাসনিক কাঠামোরও পচন শুরু হয়েছে অনেকদিন। এই পচনকে রুখবে কে?

আমাদের ‘সামাজিক (ও রাজনৈতিক) দূরত্বে চরম বিশ্বাসী’ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি কি সত্যিই পারবে কোনওদিন এককাট্টা হয়ে এই ফ্যাসিস্টদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে সামিল হতে?

২০১৭-তে গৌরী লঙ্কেশ খুন হয়েছিলেন। ২০১৭-তে এনডিটিভির প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদকের বাড়িতে আয়কর-হানা হয়েছিল। ২০২১-এ প্যানডেমিকের এই টালমাটাল অবস্থার মধ্যেই আমরা ‘দৈনিক ভাস্কর’-এর উপরে নেমে আসা আক্রমণকে দেখলাম। এর শেষ কোথায়? আমরা তো ইতিমধ্যেই বজরং দল অথবা অ্যান্টি-রোমিও স্কোয়াডের মতো গেস্টাপো অথবা ব্ল্যাক শার্টদের মতো একেকটি আউটফিটকে গজিয়ে উঠতে দেখেছি। ইডি, সিবিআই থেকে শুরু করে ইনকাম ট্যাক্সের মতো প্রতিটি দপ্তরকে ব্যবহার করে সরকারের চূড়ান্ত প্রতিহিংসামূলক আচরণকে প্রত্যক্ষ করেছি। ইহুদিদের হাতে হাতে পরিচয়পত্র ধরানোর মতো, বিশেষ ভাবে ‘ভারতীয়’ নাগরিকদের ‘ভারতীয়ত্ব’ প্রমাণের উদ্দেশ্যে সিএএ-এনআরসির মতো ঘৃণ্য একেকটি নেক্সাসকে জন্ম নিতে দেখেছি। এ সময় বড় সুখের সময় নয়। ‘দৈনিক ভাস্কর’ এতকিছুর পরেও লড়াইতে থাকার অঙ্গীকার জানিয়েছে। আমরাও কি তাদের প্রতি সহমর্মিতা জানাব না?

এখন কেবল কান পাতলেই শুনতে পাচ্ছি— চোপ! সরকার চলছে! ঘাড় ঘোরালেই বিপদ।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3501 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...