তবু ধর্ম টিঁকে আছে কেন

আশীষ লাহিড়ী

 



বিজ্ঞানের দর্শন ও ইতিহাসের গবেষক, প্রবন্ধকার, অনুবাদক

 

 

 

 

 

শিরোনামের প্রশ্নটা পল এড্রিয়ান মরিস ডির‍্যাক-এর। এই মানুষটিকে কেউ কেউ আইনস্টাইনের চেয়েও বড় গণিতবিদ মনে করেন। যেমন ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পদার্থবিজ্ঞানী আবদুস সালাম। তিনি মনে করতেন, পল ডির‍্যাক ছিলেন বিশ শতকের শ্রেষ্ঠতম তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানী। সালামের মাস্টারমশাই ফ্রেড হয়েল জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তুমি কি আইনস্টাইনের কথা মনে রেখে একথা বলছ? উত্তরে সালাম যা বলেছিলেন তা এই:

আইনস্টাইন যে-অঙ্কটা করেছিলেন সেটা তিনি নিজে উদ্ভাবন করেননি। কিন্তু ডির‍্যাক তাঁর নিজের অঙ্ক নিজে উদ্ভাবন করে নিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, তিনিই প্রথম পরিষ্কার করে বোঝান যে তত্ত্বীয় পদার্থবিদ্যায় প্রকৃত উপলব্ধিতে পৌঁছতে হলে একমাত্র পথ হল বিমূর্ত গণিত, ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের গণিত নয়।

শুনে মাস্টারমশাই ফ্রেড হয়েল মন্তব্য করেছিলেন, আমরা যারা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের গণিতের বেশি কিছু আয়ত্ত করবার আশা রাখি না, একথা শুনলে তাদের মন খারাপ হয়ে যাওয়া স্বাভাবিক; কিন্তু সালামের কথাটার মধ্যে এতটুকু ভুল নেই।[1]

কলকাতায় পল ডির‍্যাক, পূর্ণিমা সিংহ, সত্যেন্দ্র্‌নাথ বসু। ১৯৫০-এর দশকে

বিজ্ঞানের ইতিহাসে সত্যেন্দ্রনাথ বসুর সঙ্গে পল ডির‍্যাকের নাম অচ্ছেদ্য বন্ধনে জড়িয়ে আছে। যেসমস্ত কণা বোস-আইনস্টাইন পরিসংখ্যান মেনে চলে, তাদের বলা হয় ‘বোসন’, একথা আমরা সবাই জানি। ১৯৪৬ সালে বসুর সম্মানে এই নামটি দেন স্বয়ং ডির‍্যাক। বসু রয়্যাল সোসাইটির ফেলো নির্বাচিত হন অনেক বয়সে, ১৯৫৮ সালে। শোনা যায়, এর পিছনেও ডির‍্যাকের ভূমিকা ছিল। উনিশ শতকের পঞ্চাশের দশকে কলকাতার রাজাবাজার সায়েন্স কলেজে এসে সত্যেন্দ্রনাথের সঙ্গে আলাপ করে, বর্ষীয়ান পৃথিবীবিখ্যাত বিজ্ঞানী ‘এস এন বোস’ রয়্যাল সোসাইটির ফেলো নন, শুনে ডির‍্যাক তাজ্জব হয়ে যান। দেশে ফিরে গিয়ে তিনি রয়্যাল সোসাইটির কছে এ বিষয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেন। শোনা যায়, তারই পরে নাকি সোসাইটির বোধোদয় হয়। বসু নিজে অবশ্য এসব ব্যাপারে নির্বিকার ছিলেন।

অত্যন্ত অন্তর্মুখী, অমিশুক, এমনকী অসামাজিক মানুষ বলে বদনাম ছিল ডির‍্যাকের। উঁচু গলায় কথা বড় একটা বলতেন না, কথাই বলতেন না বিশেষ, কেবল ভাবতেন।[2] সেই ডির‍্যাক একদিন কোনও এক বিরল আড্ডার মেজাজে হাইসেনবার্গের সঙ্গে ধর্ম নিয়ে আলোচনায় মেতেছিলেন। হাইসেনবার্গ ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান না মানলেও নিরীশ্বরবাদী ছিলেন না। ১৯২৭ সালে ডির‍্যাক তাঁকে বেশ ঝাঁজের সঙ্গে প্রশ্ন করেছিলেন:

আমি তো ভেবে পাই না কেন আমরা শুধুমুধু ধর্ম নিয়ে আলোচনা করে সময় নষ্ট করছি। আমরা যদি সৎ হই— বিজ্ঞানীদের তো সৎ হওয়ারই কথা— তাহলে একথা আমাদের অবশ্যই মানতে হবে যে ধর্ম কতকগুলো ভুয়ো বিবৃতির তালগোল-পাকানো পিণ্ড মাত্র, বাস্তবে যার কোনও ভিত্তি নেই। ঈশ্বরের ভাবনাটাই তো মানুষের কল্পনার ফসল। আদিম মানুষ কেন ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে নিয়ন্ত্রণের অতীত বিভিন্ন প্রাকৃতিক শক্তিকে ব্যক্তিরূপ দিয়েছিল সেটা বোঝা যায়। আমাদের তুলনায় তারা ওইসব শক্তির হাতে ঢের বেশি বিপর্যস্ত হত। কিন্তু আজ যখন আমরা প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াগুলোর অনেকটাই বুঝি, তখন ওইসব সমাধানের আর কোনও প্রয়োজন আমাদের নেই। আমি মরে গেলেও বুঝতে পারি না, সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের ধারণাটি কীভাবে কোন দিক থেকে আমাদের কাজে লাগতে পারে। আমি তো বরং দেখতে পাই, ওই অনুমানটি আমাদের অনর্থক কিছু নিষ্ফল প্রশ্নের মুখে ঠেলে দেয়। যেমন, ঈশ্বর কেন এত দুঃখদুর্দশা আর অবিচারকে, বড়লোকদের হাতে গরিবদের শোষণকে, আরও কতসব ভয়ঙ্কর জিনিসকে অনুমোদন দেন। তিনি তো এগুলোকে ঠেকাতে পারতেন। আজও যে ধর্মশিক্ষা দেওয়া হয়, তার কারণ এ নয় যে ধর্মভাবনা আমাদের মনে এখনও প্রত্যয় জাগায়; তার সোজাসাপটা কারণ হল, আমরা অনেকেই সমাজের নিম্নশ্রেণির লোকেদের ভুলিয়ে শান্ত রাখতে চাই। যারা গলা ফাটিয়ে বিক্ষোভ জানায়, তাদের তুলনায় শান্ত লোকেদের শাসন করা যে অনেক সহজ। তাদের শোষণ করাও অনেক সহজ। ধর্ম এক ধরনের আফিম, যা একটা জাতিকে ঘুম পাড়িয়ে স্বপ্নকল্পনায় বুঁদ করে রেখে মানুষের প্রতি অবিচারের কথা ভুলিয়ে রাখে। সেই কারণেই রাষ্ট্র আর চার্চ এই দুই বিশাল রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে এত গলাগলি। অবিচারের বিরুদ্ধে যারা রুখে দাঁড়ায় না, যারা খুব শান্ত থেকে, বিনা অভিযোগে দায়িত্ব পালন করে চলে, দয়াময় ঈশ্বর তাদের পুরস্কার দেবেন, ইহলোকে না-হোক পরলোকে— এই বিভ্রমটা ওই দুটো শক্তিরই কাজে লাগে। আর ঠিক সেই কারণেই, ঈশ্বরের ভাবনাটা যে নিছক মানুষেরই কল্পনাপ্রসূত, এই সৎ বিবৃতির উচ্চারণ একটি জঘন্যতম পাপ বলে গণ্য হয়।[3]

মনে করানো দরকার, ডির‍্যাক কিন্তু মার্কসবাদী ছিলেন না, রাজনীতি নিয়ে মাথাই ঘামাতেন না। তবু এই ধর্ম/আফিম উপমার সাদৃশ্য আমাদের অবধারিতভাবেই মার্কসের কথাটা মনে পড়িয়ে দেয়:

ধর্ম হল নিপীড়িত জীবের দীর্ঘশ্বাস, হৃদয়হীন এই জগতের হৃদয়, আত্মাহীন পরিস্থিতিগুলির আত্মা। ধর্ম জনগণের আফিম।[4]

ডির‍্যাক-এর মতো শান্ত অপ্রগল্‌ভ মানুষ যেসময় হাইসেনবার্গকে এই ক্রুদ্ধ প্রশ্ন করেছিলেন তার বছর চারেক আগে একজন অ-মার্কসবাদী কবি ও নাট্যকার তাঁর বিশুপাগল (যে প্রাক্তন শ্রমিক) নামক এক চরিত্রর মুখ দিয়ে বলিয়েছিলেন,

আমাদের না আছে আকাশ, না আছে অবকাশ; তাই বারো ঘণ্টার সমস্ত হাসি গান সূর্যের আলো কড়া করে চুঁইয়ে নিয়েছি একচুমুকের তরল আগুনে। যেমন ঠাস দাসত্ব তেমনি নিবিড় ছুটি।

মদের নেশায় আসক্ত কাঠখোট্টা শ্রমিক ফাগুলাল অত দার্শনিকতার ধার ধারে না, সে সোজাসুজি বলে:

দেখনি ওদের মদের ভাঁড়ার অস্ত্রশালা আর মন্দির গায়ে গায়ে?

এরপর সর্দার আর গোঁসাই আসে এবং স্থির হয় ট-ঠ পাড়ার এবং দন্ত্য-ন পাড়ার শ্রমিকরা ‘একটু নড়্‌নড়্‌ করছে’ বলে তাদের ‘মধুর রসে মজাবার’ জন্য একটু বিশেষ রকম নামগান শোনানো দরকার। যাবার আগে বিচক্ষণ গোঁসাইজি বলেন:

তবু আরো ক’টা মাস পাড়ায় ফৌজ রাখা ভালো। … ফৌজের চাপে অহঙ্কারটার দমন হয়, তার পরে আমাদের পালা।

এর মধ্য দিয়ে রক্তকরবী-র রবীন্দ্রনাথের— ঈশ্বরবিশ্বাসী, অ-মার্কসবাদী রবীন্দ্রনাথের— শোষণ = বলপ্রয়োগ = ধর্ম সমীকরণটা মার্কসের চেয়েও জ্যান্ত হয়ে ফুটে ওঠে চোখের সামনে। শ্রমজীবী মানুষকে মদ আর ধর্ম এই দুই নেশায় বুঁদ করে শোষকরা তাদের শাসন বজায় রাখতে চায়। সুতরাং বিজ্ঞানের এত উন্নতি সত্ত্বেও ধর্ম কেন টিঁকে আছে এ প্রশ্নের রাজনৈতিক উত্তরটা আমাদের জানা।

 

দুই

এবার প্রশ্ন: শাসকদের এই বিপুল প্রয়াস সত্ত্বেও সত্যিই কি বিশ্বে ধর্মের দাপট বিজ্ঞানের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে? অনেকের তাই ধারণা। বিশেষ করে শিল্পোন্ন্‌ত এবং বিজ্ঞানোন্ন্‌ত দেশগুলো নাকি প্রাচুর্যের ভারে নুয়ে পড়ে ধর্মের দ্বারে মুক্তির জন্য্‌ মাথা খুঁড়ছে। সত্যিই কি তাই?

আত্মগত ধারণার বশে সিদ্ধান্তে না-এসে কিছু নির্জলা পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে এর উত্তর খোঁজার চেষ্টা করব। পৃথিবীর মধ্যে বিজ্ঞানে সবচেয়ে উন্নত প্রথম দশটি দেশ বেছে নিয়ে দেখবার চেষ্টা করব, সেসব দেশে ধর্মের দাপট বাড়ছে না কমছে? দেখা যাক অঙ্ক কী বলে, সে তো মিথ্যে কথা বলে না।

নেচার পত্রিকার ২০.৪.২০২০-র সমীক্ষা অনুযায়ী বিজ্ঞানে সবচেয়ে উন্নত দশটি দেশ হল: ১) আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র ২) চিন ৩) জার্মানি ৪) যুক্তরাজ্য ৫) জাপান ৬) ফ্রান্স ৭) ক্যানাডা ৮) সুইটজারল্যান্ড ৯) দক্ষিণ কোরিয়া ১০) অস্ট্রেলিয়া।[5]

এইবার এই দশটি দেশের মানুষের ধর্মবিশ্বাস আর ধর্মাচরণ বিষয়ে কিছু তথ্য পেশ করা যাক।[6]

আমেরিকা: সর্বশক্তিমান আমেরিকান ডলারের গায়ে ছাপা থাকে: “In God We Trust”। ১৯৫৬ সালে আমেরিকার সংসদে একটি যৌথ প্রস্তাবে অনুমোদনসূচক স্বাক্ষর দিয়ে রাষ্ট্র্‌পতি আইজেনহাওয়ার “In God We Trust”-কে জাতীয় প্রতিজ্ঞাবাক্য (মটো) বলে ঘোষণা করেন। ১৯৫৭ সাল থেকে কাগজে ছাপা ডলারের নোটে ওই প্র্‌তিজ্ঞাবাক্য ছাপা হয়ে আসছে।

অথচ আজ আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রর ৩৯ শতাংশ মানুষ নিরীশ্বরবাদী। যারা সরাসরি নিরীশ্বরবাদী নয় কিন্তু সংশয়ী, তাদের সংখ্যাটা শুধু বিপুল নয়, ক্রমবর্ধমান, বিশেষ করে অল্পবয়সীদের মধ্যে। খ্রিস্টধর্মের প্রতি এঁদের বিশ্বাস এতই কমেছে যে আমেরিকার ইতিহাসে সেটা নিম্নতম। সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, এর কারণ হল উত্তরোত্তর বেশি করে বহু-সাংস্কৃতিক, বহু-জাতিক, বহু-বর্ণ সমাজের সঙ্গে পরিচয় ও মেলামেশা (যেটা বন্ধ করার জন্য আপ্রাণ কিন্তু ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়েছিলেন শ্বেত-প্রাধান্যবাদী ডোনাল্ড ট্রাম্প), যার ফলে একটা কোনও বিশেষ ধর্মের চোখ দিয়ে বিশ্বকে দেখবার অভ্যেসটা ক্রমশ ক্ষীণ হচ্ছে। ধর্মীয় ভাবনায় আসছে বহুত্ববাদ। যারা ধর্মবিশ্বাসী তারাও প্রথাগত ধরনে ধর্মবিশ্বাসী নয়।

চিন: চিনে সরকারিভাবে শতকরা ৯০ জন মানুষ নিরীশ্বরবাদী। তাঁরা অনেকেই অবশ্য কিছু মহাজাগতিক আচার অনুষ্ঠান পালন করেন, চান্দ্র পঞ্জিকা অনুযায়ী উৎসব উদ্‌যাপন করেন, যেগুলির কোনওটিকেই প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম বলে গণ্য করা চলে না।

জার্মানিতে শতকরা ৬০ জন নিরীশ্বরবাদী। জার্মান জনগণের মাত্র ১০ শতাংশ ঈশ্বরের অস্তিত্বে স্থিরবিশ্বাসী, ৫০ শতাংশ সংশয়ী।

যুক্তরাজ্য: আমাদের একদা-প্রভু এই দেশটির শতকরা ৬৯ জন নিরীশ্বরবাদী। ২০১১-র সরকারি আদমশুমারিতে সরাসরি প্রশ্ন রাখা হয়েছিল: ‘আপনার ধর্ম কী?’ উত্তরদাতাদের মধ্যে যাঁরা ধর্মবিশ্বাসী তাঁরা অধিকাংশই খ্রিস্টান। অন্যান্য ধর্মের লোকও ব্রিটেনে কিছু কিছু আছেন। কিন্তু এত বেশি লোক ‘আমার কোনও ধর্ম নেই’ বলে নাম লিখিয়েছিলেন যে অনেকেই আজ ব্রিটিশ সমাজকে ‘খ্রিস্টোত্তর’ বা ‘ধর্মবিযুক্ত’ সমাজ বলে চিহ্নিত করতে চাইছেন। সরকারি আদমশুমারির বাইরে বেশ কিছু সমীক্ষা চালানো হয়েছে যাতে অত সরাসরি ধর্মবিশ্বাসের কথা জিজ্ঞেস করা হয়নি। তা থেকে যে ছবি বেরিয়ে আসে তাতে দেখা যাচ্ছে, যুক্তরাজ্যের বেশিরভাগ মানুষ কোনও ধর্মে বিশ্বাস করেন না।

জাপান: ঐতিহাসিকভাবে জাপান শিন্তো ধর্মর দেশ, কিন্তু সমীক্ষায় মাত্র ৩ শতাংশ সে-কথা জানিয়েছেন। অনেক জাপানি নিজেদের ‘ধর্মহীন’ (মুশিকিয়ো) বলেন।

ফ্রান্স: ঐতিহাসিক কারণে ক্যাথলিক খ্রিস্টধর্মই ফ্রান্সের প্রধান ধর্ম। কিন্তু সক্রিয় ধর্মাচরণ হু হু করে কমেছে ফরাসিদের মধ্যে। এমনকী ক্যাথলিকদের মধ্যেও নমো নমো করে ফি-রবিবার চার্চে ‘ম্যাস’ উদ্‌যাপনকারীদের সংখ্যা ৫ শতাংশে নেমে এসেছে। ফ্রান্সের শতকরা ৫০ জন নিরীশ্বরবাদী। ধর্ম-বিযুক্ততা আধুনিক ফ্রান্সের এক প্রধান ভিত্তিস্তম্ভ। যুক্তরাজ্যে, বহু ইউরোপীয় দেশে ও আমেরিকা মহাদেশের নানা দেশে প্রধান প্রধান জাতীয় স্মরণদিবসগুলিতে রাজনৈতিক নেতারা চার্চের ধর্মানুষ্ঠানে যোগ দেন; ফ্রান্সে এটা কখনও হয় না। একইভাবে চার্চের উচ্চপদস্থ যাজকরাও কদাচিৎ কোনও সরকারি অনুষ্ঠানে যোগ দেন। একমাত্র বিবাহ কিংবা অন্ত্যেষ্টি অনুষ্ঠান যদি চার্চে হয়, তখন এই রাজনৈতিক কিংবা সিভিল নেতারা হয়তো চার্চে আসেন। উল্লেখ্য, ফ্রান্সে আইনসিদ্ধ বিবাহ সম্প্‌ন্ন্‌ হয় শহরের টাউন হল-এ, এবং কোনও যাজক তাতে পৌরোহিত্য করেন না, করেন শহরের মেয়র।[7]

ক্যানাডা: শতকরা ৫৭ জন নিরীশ্বরবাদী। যুক্তরাজ্যের মতো ক্যানাডাকেও অনেকে ‘খ্রিস্টোত্তর’ এবং ‘ধর্মবিযুক্ত’ সমাজ বলে বর্ণনা করেন। নামে খ্রিস্টান হলেও, এমনকী ঈশ্বরে বিশ্বাসী হলেও, দৈনন্দিন জীবনে অধিকাংশ ক্যানাডিয়ানই ধর্মকে অকিঞ্চিৎকর এবং একান্তই ব্যক্তিগত একটি ব্যাপার বলে মনে করেন। ফি-রবিবার ক্যাথলিকদের ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ চার্চে ম্যাস উদ্‌যাপনের জন্য যান।

সুইটজারল্যান্ড: শতকরা ৫৮ জন নিরীশ্বরবাদী। ২০১৭ সালে পিউ রিসার্চ সেন্টার পরিচালিত সমীক্ষা অনুযায়ী সে-দেশে খ্রিস্টান ধর্মভুক্ত বলে পঞ্জিবদ্ধদের মধ্যে মাত্র ২১ শতাংশ মাসে অন্তত একবার করে চার্চে যান; অধিকাংশ খ্রিস্টান একেবারেই চার্চে যান না। সমীক্ষিত জনসমষ্টির ৪ শতাংশ জানিয়েছেন, তাঁরা অ-খ্রিস্টীয় কোনও ধর্মে বিশ্বাসী।

দক্ষিণ কোরিয়ায় শতকরা ৬০ জন নিরীশ্বরবাদী। ২০১৫ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী ৫৬.১ শতাংশ অ-ধার্মিক, ১৯.৭ শতাংশ প্রোটেস্টান্ট, ১৫.৫ শতাংশ বৌদ্ধ, ৭.৯ শতাংশ ক্যাথলিক। খেয়াল করব, বৌদ্ধ ধর্ম ঈশ্বরবর্জিত।

অস্ট্রেলিয়ার শতকরা ৬৩ জন নিরীশ্বরবাদী। ২০১৬র এক সমীক্ষায় ৩০.১ শতাংশ অস্ট্রেলীয় জানিয়েছিলেন, তাঁদের কোনও ধর্ম নেই, আরও ৯.৬ শতাংশ এ প্রশ্নের কোনও উত্তর দিতে চাননি।

বিজ্ঞান আর ধর্মের সম্পর্কের কী চিত্র এ থেকে বেরিয়ে এল তা আশা করি স্বয়ংপ্রকট, তার আর কোনও ব্যাখ্যার প্রয়োজন আছে মনে করি না। কেবল এইটুকু বলার আছে, এই পরিসংখ্যানের ভিত্তি কিন্তু প্রতিটি দেশের মোট জনসমষ্টি; যদি শুধু বিজ্ঞানী আর প্রযুক্তিবিদদের মধ্যে সমীক্ষা সীমাবদ্ধ রাখা হত, তাহলে পাল্লাটা একেবারেই অ-ধর্মের দিকে ঝুঁকে পড়ত, সন্দেহ নেই।

কেউ যদি আগ্রহী হন সেজন্য জানিয়ে রাখি: আমাদের এই উপমহাদেশে বাংলাদেশ, পাকিস্তান আর ভারতের নিরীশ্বরবাদীদের শতকরা অনুপাত যথাক্রমে ১৯, ৬ এবং ৫।

সুতরাং কালীঘাট, মায়াপুর আর বেলুড়ের দিকে তাকিয়ে যাঁরা বলেন, দুনিয়া জুড়ে ধর্মপ্রাণদের সংখ্যা হু হু করে বাড়ছে, তাঁদের জগৎটা এই উপমহাদেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ। চোখের ঠুলি খুললেই তাঁরা বুঝবেন, বিজ্ঞানে উন্নত দেশ মাত্রেই ধর্মের প্রতি মানুষের টান কমছে। নজরুল কবেই বলে গিয়েছিলেন, থাকব না কো বদ্ধ ঘরে, দেখব এবার জগৎটাকে, কেমন করে ঘুরছে মানুষ যুগান্তরের ঘূর্ণিপাকে।[8] আর কতদিন আমরা বদ্ধ ঘরে থাকব?

সবশেষে একটা কথা, হয়তো এটাই মোক্ষম কথা। আধুনিক বিজ্ঞানের বয়স চারশো বছর। ধর্মের বয়স কত? অন্তত পাঁচ হাজার বছর। এক দুধের শিশুর সঙ্গে লড়ছেন বহু যুদ্ধের বিজয়ী বীর পিতামহ ভীষ্ম! চারশো বছরের ডেভিড হাড়ে কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছে পাঁচ হাজার বছরের অভিজ্ঞতায় পরিপক্ব গোলিয়াথের। বাইবেলে আছে, সামান্য ‘ফিঙ্গা ও পাথর দিয়ে’ গোলিয়াথকে পরাস্ত করার পর ডেভিড ‘তারই তরবারি খাপ থেকে খুলে নিয়ে তার মাথা কেটে ফেললেন। ফিলিস্তিনীরা তাদের বীর যোদ্ধাকে পরাজিত হতে দেখে পালাতে শুরু করল।’


[1] Gordon Fraser, Cosmic Anger: Abdus Salam – The First Muslim Nobel Scientist, Oxford University Press, 2008, p.84
[2] Graham Farmelo, The Strangest Man: The Hidden Life of Paul Dirac, Quantum Genius, Faber and Faber, London 2009
[3] Paul Dirac, Wikipedia.
[4] “Religion is the sigh of the oppressed creature, the heart of a heartless world, and the soul of soulless conditions. It is the opium of the people.”
[5] The ten leading countries in natural-sciences research. Nature. 29 April 2020
[6] Most Atheist Countries 2021. World Population Review
[7] Religion in France, past and present. about-france.com
[8] সংকল্প

থাকব না কো বদ্ধ ঘরে, দেখব এবার জগৎটাকে,-
কেমন করে ঘুরছে মানুষ যুগান্তরের ঘুর্ণিপাকে।
দেশ হতে দেশ দেশান্তরে
ছুটছে তারা কেমন করে,
কিসের নেশায় কেমন করে মরছে যে বীর লাখে লাখে,
কিসের আশায় করছে তারা বরণ মরণ-যন্ত্রণারে।।

কেমন করে বীর ডুবুরী সিন্ধু সেঁচে মুক্তা আনে,
কেমন করে দুঃসাহসী চলছে উড়ে স্বরগ পানে।
জাপটে ধরে ঢেউয়ের ঝুঁটি
যুদ্ধ-জাহাজ চলছে ছুটি,
কেমন করে আঞ্ছে মানিক বোঝাই করে সিন্ধু-যানে,
কেমন জোরে টানলেসাগর উথলে ওঠে জোয়ার বানে।

কেমন করে মথলে পাথার লক্ষী ওঠেন পাতাল ফুঁড়ে,
কিসের অভিযানে মানুষ চলছে হিমালয় চুড়ে।
তুহিন মেরু পার হয়ে যায়
সন্ধানীরা কিসের আশায়;
হাউই চড়ে চায় যেতে কে চন্দ্রলোকের অচিন পুরেঃ
শুনবো আমি, ইঙ্গিত কোন ‘মঙ্গল’ হতে আসছে উড়ে।।

কোন বেদনার টিকিট কেটে চন্ডু-খোর এ চীনের জাতি
এমন করে উদয়-বেলায় মরণ-খেলায় ওঠল মাতি।
আয়ার্ল্যান্ড আজ কেমন করে
স্বাধীন হতে চলছে ওরে
তুরষ্ক ভাই কেমন করে কাঁটল শিকল রাতারাতি!
কেমন করে মাঝ গগনে নিবল গ্রীসের সূর্য-বাতি।।

রইব না কো বদ্ধ খাঁচায়, দেখব এ-সব ভুবন ঘুরে-
আকাশ বাতাস চন্দ্র-তারায় সাগর-জলে পাহাড়-চুঁড়ে।
আমার সীমার বাঁধন টুটে
দশ দিকেতে পড়ব লুটে
পাতাল ফেড়ে নামব নীচে, ওঠব আবার আকাশ ফুঁড়ে
বিশ্ব-জগৎ দেখব আমি আপন হাতের মুঠোয় পুরে।।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3604 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...