ফলিত জ্যোতিষ

মেঘনাদ সাহা

 

চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম-এর আগস্ট সংখ্যার স্টিম ইঞ্জিন বিভাগে বিশিষ্ট জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানী অধ্যাপক মেঘনাদ সাহা-র ফলিত জ্যোতিষ বিষয়ক একটি রচনার অংশবিশেষ উদ্ধৃত করা হল৷ পাঠককে জানিয়ে দেওয়া দরকার এই সময় এই নির্দিষ্ট রচনাটি পুনঃপ্রকাশ করার একটি বিশেষ উদ্দেশ্য আছে। কেন্দ্র সরকারের শিক্ষাদপ্তর ইন্দিরা গান্ধি মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠক্রমে অতি সম্প্রতি জ্যোতিষশাস্ত্রের উপর একটি দুই বছরের স্নাতকোত্তর শিক্ষাক্রম চালু করেছেন। সরকারের এই বিজ্ঞানবিরোধী পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেছেন দেশের ওয়াকিবহাল বিজ্ঞানীমহল ও যুক্তিবাদীরা। এই সুযোগে আমরা আরেকবার ফিরে দেখতে চাই এই বিষয়ে জাতির পথপ্রদর্শক, আপসহীন যুক্তিবাদী ও বিজ্ঞানসাধক ডঃ মেঘনাদ সাহার অবস্থানকে। ১৯৩৮ সালে শান্তিনিকেতনে কবির আমন্ত্রণে অধ্যাপক সাহা একটি ভাষণ দেন যা ভাববাদীদের একাংশের মনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। পরবর্তীকালে এই ভাষণটি A New Philosophy of Life নামক নিবন্ধের আকারে বিশ্বভারতীর নিউজ পোর্টালে প্রকাশিত হয়। এই নিবন্ধের প্রত্যুত্তরে পণ্ডিচেরী নিবাসী জনৈক শ্রী অনিলবরণ রায় একটি তীব্র সমালোচনা লেখেন যা 'ভারতবর্ষ' পত্রিকার বৈশাখ ১৩৪৬ (ইং ১৯৩৯) সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। জৈষ্ঠ, আষাঢ়, পৌষ, ফাল্গুন— ভারতবর্ষ পত্রিকার পরবর্তী এই চারটি সংখ্যায় অধ্যাপক সাহা সমালোচকের  যুক্তিকে পর্বে পর্বে যুক্তি ও তথ্যসহকারে খণ্ডন করেন। বর্তমান প্রবন্ধটি জৈষ্ঠ সংখ্যায় প্রকাশিত। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস— ডঃ মেঘনাদ সাহার এই লেখাটি এই কঠিন সময়ে মানুষের যুক্তিবাদী ও দেশপ্রেমের ভাবনাকে পথ দেখাবে।
মেঘনাদ সাহা

এই ভারতীয় নিজস্ব জ্যোতিষ যাহা ১৪০০ পূঃ খ্রিঃ অব্দ হইতে শককাল (৮০ খ্রিঃ অব্দ) পর্যন্ত প্রচলিত ছিল, তাহা কত অশুদ্ধ যে একটি সামান্য দৃষ্টান্তেই বোঝা যাইবে। এই সিদ্ধান্তমতে ৩৬৬ দিনে বৎসর হয় অর্থাৎ বৎসর গণনায় পিতামহ ব্রহ্মা প্রায় ১৮ ঘণ্টা ভুল করিয়াছিলেন। কিন্তু ইহার বহু পূর্বেই অর্থাৎ খ্রিঃ পূঃ পঞ্চম শতাব্দী হইতেই Egyptian, Babylonian, এবং কিছু পরে Greek ও Roman-গণ প্রায় ৩৫৬ ১/৪ দিনে যে বৎসর হয় তাহা জানিতেন। প্রথম খ্রিঃ অব্দ পর্যন্ত পঞ্চবৎসরাত্মক যুগগণনাপ্রথা এবং পাঁচ বৎসরে দুই অধিমাস গণনার প্রথা চলিত ছিল- তাহাতে বৎসরে প্রায় ৩ ৩/৪ দিনের ভুল হইত। অথচ খ্রিঃ পূর্ব ৪০০ অব্দে বেবিলনে যে অধিমাস গণনাপ্রণালী প্রচলিত ছিল তাহাতে ১৮ বৎসরে মাত্র ২ ১/৬ ঘণ্টার ভুল হইত। সুতরাং ইহা আশ্চর্যের বিষয় নয় যে ৮০ খ্রিঃ অব্দ ও ৪০০ খ্রিঃ অব্দের মধ্যে হিন্দু পণ্ডিতেরা পিতামহ ব্রহ্মার Authority সত্ত্বেও প্রাচীন গণনাক্রম পরিত্যাগ করিয়া গ্রিক রোমান ও Chaldeam Astronomy অনুসারে গণনা আরম্ন করিতে দ্বিধা করেন নাই। এই সময়ের পরে ভারতীয় জ্যোতিষের সম্যক উন্নতি হয় এবং ইহাই দীক্ষিতের ‘সিন্ধান্তযুগ’। কিন্তু যদিও সিদ্ধান্ত জ্যোতিষ পিতামহ ব্রহ্মার জ্যোতিষ হইতে অনেক উন্নতস্তরের, উহাকে Glalieo-র সমসাময়িক European.জ্যোতিষের সমতূল্য মনে করা প্রলাপ বই কিছুই নয়। কারণ বলিতেছি–

এখন সমালোচক কর্তৃক উদ্ধৃত পুরাণবচনের আলোচনা করা যাউক। প্রথমে দেখিতে হইবে যে পুরাণগুলি কোন সময় রচনা। পুরাণগুলি মহাভারতের পরবর্তীকালে লিখিত একথা সম্ভবত সমালোচক স্বীকার করিবেন। না করিলেও প্রমাণ দেওয়া কষ্টকর হইবে না। আমি ধরিয়া নিতেছি যে তিনি উহা স্বীকার করেন।

প্রায় সমস্র পুরাণেই ভবিষ্যরাজবংশের বর্ণনাকালে অন্ধ্রদের বা আন্ধ্র ভৃত্য রাজাদের কথা আছে। অন্ধ্রদের পতন হয় প্রায় ২২০ খ্রিঃ অব্দে। অনেক পুরাণে গুপ্তরাজাদেরও কথা আছে। তাঁহাদের প্রাদুর্ভাবকাল ৩১৯ খ্রিঃ অব্দ। সুতরাং বলিলে ভুল হইবে না যে প্রাচীন পুরাণগুলি ১০০ খ্রিঃ অব্দ হইতে ৪০০ খ্রিঃ অব্দের মধ্যে বা পরে সঙ্কলিত হইয়াছিল। এই সমস্ত পুরাণে যে সমস্ত জ্যোতিষিক বর্ণনা আছে, তাহাতেও দেখা যায় যে তাহারা সিদ্ধান্ত যুগের পূর্ববর্তী বা সমসাময়িক এবং বেদাঙ্গজ্যোতিষের পরবর্তী। পূর্বেই বলা হইয়াছে বেদাঙ্গজ্যোতিষ ৮০ খ্রিঃ অব্দ পর্যন্ত প্রচলিত ছিল।

এখন হিন্দু জ্যোতিষের তথাকথিত উৎকর্ষতা সম্বন্ধে আলোচনা করা যাউক। (১) পুরাণকার বলিয়াছেন যে—

সবর্বগ্রহাণামেতেষামাদিরাদিত্যরুচ্যতে

এর অর্থ যে এই সমস্ত গ্রহের আদি আদিত্য অর্থাৎ সূর্য। কিন্তু ‘পৃথিবী’ যে গ্রহ তাহা পুরাণকার কোথায় বলিয়াছেন? হয়ত এই বাক্যে বলা হইয়াছে যে সূর্য অপর পাঁচটি গ্রহের কেন্দ্রস্থানীয় (মঙ্গল, বুধ, বৃহস্পতি, শুক্র ও শনির) কেন্দ্রস্থানীয়। কিন্তু তাহাই বা কোথায় স্পষ্ট বলা হইয়াছে?

ইউরোপে ‘গ্যালিলিও’ (১৫৬৪-১৬৪২ খ্রিঃ অব্দ) যে সর্বপ্রথমে পৃথিবী ‘চলমান’ বলিয়াছেন, সমালোচক এই তথ্য কোথায় পাইলেন? তিনি বোধহয় অবগত নহেন যে প্রথম Anaximander of Sparta প্রায় ৫৬০ পূঃ খ্রিঃ অব্দে পৃথিবীর আবর্তনবাদ গ্রিসদেশে প্রচার করেন। হয়ত এই বাদ তাহার বহুপূর্বেও প্রচলিত ছিল কিন্তু সেরূপ কল্পনারও কিছু দরকার নাই। মোটের উপর পুরাণকার যদি উক্ত উদ্ধৃত বাক্যে পৃথিবীর আবর্তনবাদ বুঝিয়া থাকেন, তাহা হইলে তিনি তাহার প্রায় ৮০০ বৎসরের পূর্ববর্তী গ্রিক পণ্ডিতদের মতবাদের প্রতিধ্বনি করিয়াছেন মাত্র৷ লেখকের ভ্রান্তি নিরসনের জন্য এই বিষয়ের আরও বিস্তৃত বিবরণ দেওয়া যাইতেছে।

পৃথিবীর গতি সম্বন্ধে তিনটি বিষয়ে পর পর ধারণা করিতে হইবে– প্রথমে পৃথিবীর গোলত্ব ও নিরাকারত্ব; দ্বিতীয়ত নিজের মেরুরেখায় চতুর্দিকে পৃথিবীর আবর্তন– যাহাতে দিনরাত্রি হয়। তৃতীয়ত সূর্যের চতুর্দিকে বার্ষিক প্রদক্ষিণ। প্রাচীন গ্রিসদেশে এই তিনটি বাদের কীরকমভাবে পর পর উৎপত্তি হয়, তাহার সময়ানুযায়ী বিবরণ দেওয়া যাইতেছে।

ইনি গ্রিসদেশে প্রথমে পৃথিবী যে নিজের মেরুরেখায় চতুৃর্দিকে আবর্তন করিতেছে এবং তজ্জন্য দিবারাত্র হয় এই মত প্রচার করেন। Anaximander of Sparta 560 B.C.

ইনি প্রথমে পৃথিবীর ব্যাস মাপেন। তাঁহার দেওয়া পরিমাণ বর্তমানে জানা পরিমাণ অপেক্ষা বিশেষ তফাৎ নয়। পৃথিবী যে গোল এই মত বোধহয়, আরও ঢের প্রাচীনকালেও পণ্ডিতদের মধ্যে প্রচলিত ছিল। Eratosthenes of Alexandera 276-196 B.C.

ইনি প্রথম প্রচার করেন যে পৃথিবী ও অপরাপর গ্রহ সূর্যের চতুর্দিকে নিজ নিজ কক্ষে ভ্রমণ করে৷

কিন্তু এই সমস্ত মত পাশ্চাত্যে গৃহীত হয় নাই। প্রায় ১৬০ খ্রিঃ অব্দে প্রসিদ্ধ গ্রিক পণ্ডিত Klaudius Ptolemy আলেকজান্দ্রিয়া নগরে প্রসিদ্ধ ‘Syntaxis’ গ্রন্থ রচনা করেন। এই পুস্তকে তিনি পৃথিবীর গোলত্ব অস্বীকার করেন না, পরন্তু বর্তমান ভৌগলিকগণ যেরূপ অক্ষরেখা ও দ্রাঘিমা দ্বারা পৃথিবীর উপর কোনও স্থানের অবস্থান নির্ণয় করেন তিনিও সেইরূপ করিয়াছিলেন। কিন্তু Ptolemy পৃথিবীর আবর্তনবাদ ও Aristarchus of Samos কর্তৃক পরিকল্পিত সৌরজগতের সৌর কেন্দ্রিকতা অথবা Heliocentric Theory of the Solar system মানেন নাই। প্রধানত Ptolemy -র বিরুদ্ধতায় প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ইউরোপে Aristarchus এর মত ত্যক্ত হয়। প্রায় তেরো শত বৎসর পরে ১৪৪৪ খ্রিঃ অব্দে Poland দেশীয় সন্ন্যাসী Copernicus পুনরায় এই মতবাদ প্রচার করেন যে পৃথিবী ও অপরাপর গ্রহ সূর্যের চতুর্দিকে ভ্রমণ করে ও সূর্য সৌরজগতের কেন্দ্রে নিশ্চল হইয়া বর্তমান থাকে।

কিন্তু Copernicus প্রবর্তিত মতও তৎকালীন ইউরোপে গৃহীত হয় নাই। শুধু যে ‘পাদ্রিরা’ এই মতের পরিপন্থী হন তাহা নয়, Tycho Brahe-র মত প্তসিদ্ধ জ্যোতিষজ্ঞ পণ্ডিত এই মত মানিতেন না। Tycho বলিতেন পৃথিবী বিশ্বজগতের কেন্দ্রে স্থির আছে এবং সূর্য ইহার চতুর্দিকে ঘুরিতেছে৷ Tycho Brahe-র মত সুবিখ্যাত জ্যোতিষী বৈজ্ঞানিক কারণেই Copernicus-এর মতবাদ অস্বীকার করেন এবং এই মতবাদ ইউরোপেও সম্পূর্ণ পরিত্যক্ত হইত, যদি Kepler না জন্মিতেন।

Kepler গ্রহগতি সম্বন্ধে তাঁহার সুপরিচিত তিনটি নিয়ম আবিষ্কার করিয়া সৌরজগতে ‘পৃথিবী কেন্দ্রিকতা’ বাদকে চিরকালের জন্য সমাধিস্থ করেন৷ তৎপর Galileo গতিতত্ত্ব ও Newton (1742-1727) মাধ্যাকর্ষণশক্তি আবিষ্কার করেন এবং Newton উভয়তত্ত্ব প্রয়োগ করিয়া গ্রহগণের গতির সম্যক ব্যাখ্যা প্রদান করেন৷

এখন সমালোচকের হিন্দু জ্যোতিষের উৎকর্ষের দাবি কতটা বিচারসহ তাহা আলোচনা করিয়া দেখাইতেছি৷ প্রথমেই দেখিয়াছি যে ‘পৈতামহ সিদ্ধান্তের’ কাল অর্থাৎ খ্রিঃ অব্দের ৮০ সন পর্যন্ত ভারতীয় নিজস্ব জ্যোতিষ বা কালগণনা প্রণালীব্ল অতিশয় অশুদ্ধ ছিল এবং তৎপূর্ববর্তী মহাভারত ইত্যাদি গ্রন্থে কুত্রাপি পৃথিবীর গোলত্ব, আবর্তনবাদ ও সূর্যের চতুর্দিকে প্রদক্ষিণবাদ স্বীকৃত হয় নাই। আনুমানিক ১০০ খ্রিঃ অব্দের পরে বোধহয় উজ্জয়িনীর শক রাজাদের সময় হইতে (যাহারা পারশিক প্রভাবান্বিত ছিলেন) পাশ্চাত্য Chaldean ও Greek জ্যোতিষ ভারতে আসিতে আরম্ভ করে। তখন ভারতীয় জ্যোতিষিকগণ পৃথিবীর গোলত্ব, আবর্তনবাদ ইত্যাদি স্থূলভাবে স্বীকার করিতে আরম্ভ করেন৷

কিন্তু এই মতবাদ যখন বেবিলনে ও গ্রিসদেশে প্রায় ভারতের প্রথম প্রচলিত মতের অন্যূন তিনশত বর্ষ পূর্বেই প্রচলিত ছিল এবং যখন প্রমাণ পাওয়া যাইতেছে যে গ্রিক জ্যোতিষ সেই সময় ভারতে সম্যক প্রচারিত হইয়াছিল, তখন স্বীকার করিতে হইবে যে পৃথিবীর গোলত্ব, নিরাধারত্ব, আবর্তন ও প্রদক্ষিণবাদ সম্বন্ধে যদি কিছু পরবর্তীকালের হিন্দুপুরাণে বা জোতিষে থাকে, তাহা বিদেশ হইতে ধার করা। পৃথিবীর গোলত্ব হিন্দু পণ্ডিতগণ চিরকালই স্বীকার করিয়াছেন, যদিও তাহাদের দেওয়া পৃথিবীর ব্যাস গ্রিকদের দেওয়া পরিমাণ হইতে বিশুদ্ধতর নয়৷ ভূর্ভ্রমণবাদ সম্বন্ধে প্রথম প্রামাণ্য উক্তি পাওয়া যায় কসুমপুর অর্থাৎ পাটলীপুত্র নিবাসী আর্যভটের (জন্ম ৪৭৬ খ্রিঃ অব্দ) রচিত গীতিকাপাদে।

অনুলোমগতিনৌস্থঃ পশ্চাত্যচলং বিলোমগং যদবত
অচলানি ভ্যানি তদবৎ সমপশ্চিমগানি লঙ্কায়াম—–

ইহা পৃথিবীর আবর্তন সম্বন্ধীয় মতবাদ, কোনপ্রাচীন হিন্দু জ্যোতিষী সূর্যের চারিদিকে পৃথিবীর প্রদক্ষিণ সম্বন্ধে কোনও রূপ মন্তব্য প্রকাশ করিয়াছেন কিনা তাহা আমার জানা নাই। আর্যভট নিজে Epicyclic Theory দিয়া গ্রহণের গতি বুঝাইতে চেষ্টা করিয়াছেন– তাহাতে পৃথিবীকে সৌরজগতের কেন্দ্র বলিয়া ধরা হইয়াছে।

কিন্তু আর্যভটের ভূর্ভ্রমণবাদ পরবর্তী কোনও হিন্দু জ্যোতিষী গ্রহণ করেন নাই। ব্রহ্মগুপ্ত লল্ল, মুঞ্জাল, ভাস্করাচার্য প্রভৃতি পরবর্তীকালের সমস্ত খ্যাতনামা জ্যোতিষীই ভূর্ভ্রমণবাদ খণ্ডন করিতে প্র‍য়াস পাইয়াছেন (বিশদভাবে শ্রীযুক্ত যোগেশচন্দ্র রায়-কৃত — ‘আমাদের জ্যোতিষ ও জ্যোতিষী’ গ্রন্থ দ্রষ্টব্য। সুতরাং ইউরোপে প্রাচীন গ্রিকদের ভূর্ভ্রমণবাদের যে দশা হইয়াছিল, ভারতেও আর্যভটের ভূর্ভ্রমণবাদেরও (যাহা সম্ভবত গ্রিকদের নিকট হইতে ধার করা) সেই অবস্থা হয়। ভূর্ভ্রমণবাদে আর্যভট পৃথিবীর দৈনিক আবর্তনমাত্র বুঝিয়াছেন, তিনি অথবা কোনও ভারতীয় পণ্ডিত যে পৃথিবী সূর্যের চতুর্দিকে ভ্রমণ করিতেছে, এই মতবাদ প্রচার করিয়াছিলেন তাহার কোনও প্রমাণ পাওয়া যায় না। আর্যভটকে তর্কের খাতিরে কোপারনিকাসের সমতূল্য ধরিলেও এদেশে পরবর্তীকালে Kepler, Galileo, Newton- এর জন্ম হয় নাই, একথা নিশ্চিত বলা যাইতে পারে।

সিদ্ধান্ত জ্যোতিষকালে (৪০০-১১০০ খ্রিঃ অব্দ) ভারতে কালগণনার অনেক উন্নতি সাধন হয়। বৎসর ও মাসের পরিমাণ, গ্রহদিগের ভ্রমণকাল হিন্দু পণ্ডিতেরা অধিকতর শুদ্ধভাবে নিরূপণ করেন৷ জ্যোতিষিক গবেষণা করিতে যাইয়া, তাঁহারা জ্যামিতি, ত্রিকোণমিতি, বীজগণিতে অনেক মৌলিক আবিষ্কার করেন৷ কিন্তু এ সমস্ত আবিষ্কার pre-renaissance যুগের ইউরোপীয় জ্যোতিষের সমতূল্য– এমনকি কোনও কোনও অংশে মধ্যযুগের আরব জ্যোতিষেরও সমতূল্য নয়। হিন্দু

ও গ্রিকদের নিকট জ্যোতিষশাস্ত্র শিখিয়া মধ্যযুগের আরবগণ ( ৭০০-১৫০০ খ্রিঃ অব্দ) জ্যোতিষে বহু উন্নতি সাধন করেন। প্রায় ১৭৩০ খ্রিঃ অব্দে সম্রাট মহম্মদ সাহের আদেশে জয়পুররাজ সবাই জয়সিংহ ভারতে উন্নততর আরব জ্যোতিষের প্রচলন করিতে চেষ্টা করেন। তাঁহার আদেশে তৈলঙ্গ পণ্ডিত জগন্নাথ সংস্কৃত ভাষায় ‘সিদ্ধান্তসম্রাট’ নামক গ্রন্থ রচনা করেন, উহা Ptolemy- র Syntaxis-এর আরব্য সংস্করণের (যাহা Almagest নামে বিখ্যাত) অনুবাদ মাত্র। তাঁহার প্রতিষ্ঠিত মানমন্দিরসমূহ মধ্য এশিয়ার উলুঘবেগের মানমন্দিরের আদর্শে গঠিত।

জয়পুররাজ প্রাচীন ভারতীয় সিদ্ধান্ত-জ্যোতিষ পরিত্যাগ করিয়া আরব্য জ্যোতিষের প্রবর্তন করিতে সচেষ্ট হন কেন? কারণ, সিদ্ধান্ত জ্যোতিষের গণনাপ্রণালী ৪০০ খ্রিঃ অব্দের পক্ষে প্রশংসনীয় হইলেও সম্পূর্ণ শুদ্ধ ছিল না এবং প্রায় ১৩০০ বৎসরের গতানুগতিকতার ফলে উহা সম্পূর্ণ ‘দূরবিভ্রষ্ট’ হইয়া পড়িয়াছিল। সিদ্ধান্ত-জ্যোতিষকালের হিন্দু পণ্ডিতগণ মনে করিতেন যে অয়নচলন ক্রমান্বয়ে একদিকে নয়, খানিকদূর যাইয়া পেন্ডুলামের গতির মতো প্রত্যাবর্তন করিবে। সেইজন্য তাহারা সায়ন বৎসর (Tropical) গণনা না করিয়া নিরয়ন বর্ষ (Sidereal) গণনা করিতেন এবং এখনও করেন। এইজন্য এবং নিরয়ন বৎসরের পরিমাণে যে ভুল ছিল দুই-এ মিলিয়া তাহাদের বৎসরমান প্রকৃত সায়নবর্ষ মান অপেক্ষা প্রায় ০.১৬ দিন বেশি হয় এবং প্রায় ১৪০০ বৎসরে হিন্দু-বর্ষ মানে ভুল প্রায় ২৩ দিনে পৌঁছিয়াছে। হিন্দু পঞ্জিকায় ৩১ চৈত্রকে মহাবিষুব সংক্রান্তি বলা হয়। কিন্তু বাস্তবিক মহাবিষুব সংক্রান্তি হয় ৭ কিংবা ৮ চৈত্র। যদিও পৃথুদক স্বামী প্রায় ৮৫০ খ্রিঃ অব্দে স্পষ্ট করিয়া বলেন যে অয়নচলন একদিকেই হয়, তথাপি একাল পর্যন্ত দুই একজন ব্যতীত কোনও হিন্দু জ্যোতিষীই বর্ষমানের সংস্কারের আবশ্যকতা উপলব্ধি করেন নাই। বাস্তবিক পক্ষে ১২০০ খ্রিঃ অব্দের পর হইতে হিন্দু জ্যোতিষিক পণ্ডিতগণ বেহুলার মত মৃত সভ্যতার শব আলিঙ্গন করিয়া নিশ্চেষ্ট বসিয়া আছেন এবং বর্তমান সময় পর্যন্ত অতি ভুল পদ্ধতিতে বর্ষগণনা করিতেছেন৷ মৎ সম্পাদিত ‘Science and Culture’ পত্রিকায় প্রকাশিত কয়েকটা প্রবন্ধে দেখাইতে চেষ্টা করিতেছি যে হিন্দুর তিথি ইত্যাদি গণনা, শুভ অশুভ দিনের মতবাদ, কতকগুলি মধ্যযুগীয় ভ্রান্তির উপর প্রতিষ্ঠিত এবং প্রচলিত হিন্দুপঞ্জিকা একটা কুসংস্কারের বিশ্বকোষ মাত্র।

সিদ্ধান্ত জ্যোতিষ সম্বন্ধে প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ভারতীয় জ্ঞানের কথঞ্চিৎ পরিচয় দেওয়া হইল। আশা করি সমালোচক আমার বিবরণে ভুল বাহির করিবেন, না হয় তাঁহার হিন্দু জ্যোতিষের উৎকর্ষ সম্বন্ধে অতিশয়োক্তি প্রত্যাহার করিবেন৷ সম্যক অধ্যয়ন ও বিচার না করিয়া অতীতের উপর একটা কাল্পনিক শ্রেষ্ঠত্ব আরোপ করা শুধু আত্মপ্রবঞ্চনা মাত্র এবং এরূপ ‘আত্মপ্রবঞ্চকদের’ পক্ষে পরকে উপদেশ দিতে যাওয়া অমার্জনীয় ধৃষ্টতা।

সমালোচক পুনরায় বলিয়াছেন, ‘এই বিশ্বজগতের পশ্চাতে এক বিরাট চৈতন্যশক্তি আছে, তাহা হইলে সূর্য চন্দ্র গ্রহাদির পশ্চাতেও সে শক্তি রহিয়াছে, অতএব এই সকলকে দেবতা বলিলে ভুল হয় না।’

এই মন্তব্য বিশ্বাসের কথা, যুক্তির কথা নয়। যাঁহারা Shamanism-এ বিশ্বাস করেন, তাঁহারা সমালোচকের মত মানিয়া লইতে পারেন৷ আমি যুক্তিবাদী যুক্তি মানিতে রাজি আছি, Shamanism মানিতে আমার কোনও আগ্রহ নাই। এইরূপ বিশ্বাস যদি সভ্যতার উৎকর্ষ প্রতিপন্ন করে, তাহা হইলে Mexico-নিবাসী Aztec গণের মত সভ্যজাতি পৃথিবীতে জন্মে নাই। কারণ তাহারা সূর্যকে দেবতা বলিয়া মানিত এবং মনে করিত, যে পর্বে পর্বে নরবলি না দিলে সূর্যের ক্ষুধা মিটিবে না, সূর্যের শক্তি হ্রাস হইবে এবং তাপ বিকিরণের ক্ষমতা লোপ পাইবে, পৃথিবীতে দূর্ভিক্ষ ও মহামারি আরম্ভ হইবে।  সুতরাং পর্বে পর্বে তাহারা সূর্যের ক্ষুধানিবৃত্তির জন্য সহস্র সহস্র নরবলি দিত।

সূর্যকে দেবতা মনে করা একটা প্রাচীন ও মধ্যযুগের ধারণা মাত্র, এই যুগে সেই ধারণার কোনও সার্থকতা নাই। এখন অতি সাধারণ শিক্ষাপ্রাপ্ত লোকও জানে যে সূর্য পূজা করিলে গ্রীষ্মের আধিক্য বা অনাবৃষ্টি ইত্যাদি দূরীভূত হয় না। কিন্তু বিজ্ঞানের প্রসাদে সূর্যের উত্তাপকে যন্ত্রযোগে সর্ববিধ কাজে লাগান সম্ভবপর এবং উহাকে মানুষের সর্ববিধ সুবিধা, যেমন শক্তি উৎপাদন, refrigeration (শৈত্যোৎপাদন), air-conditioning, cooking (রন্ধন), water-raising (জলত্তোলন) ইত্যাদি যাবতীয় প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন হয়৷ সুতরাং যাঁহারা সমালোচকের মতো গ্রহাদিকে দেবতাজ্ঞান করেন, তাঁহারা শুধু একটি মধ্যযুগীয় কুসংস্কারের মোহে নিমজ্জিত আছেন, তাঁহাদের অপেক্ষা  যাঁহারা যন্ত্রযোগে সূর্যের উত্তাপকে সর্ববিধ কাজে লাগাইতে সচেষ্ট আছেন, তাঁহারা অনেক উন্নতস্তরের জীব৷ বিশ্বজগতের পশ্চাতে চৈতন্যই থাকুন বা অচৈতন্যই থাকুন, তাহাতে মানবসমাজের কী আসে যায়, যদি সে ‘চৈতন্য’ কোনও ঘটনা নিয়ন্ত্রণ না করে অথবা কোনও প্রকারে সেই ‘চৈতন্যকে’ আমরা আমাদের উদ্দেশ্যের অনুকূলে চালিত না করতে পারি? প্রাচীন Chaldean জ্যোতিষীরা মনে করিতেন যে গ্রহগুলি দেবতার প্রতীক এবং সেই দেবতারা মানবের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করে। এই বিশ্বাসের বশবর্তী হইয়া তাঁহারা ফলিত জ্যোতিষ বা হোরাশাস্ত্র উদ্ভাবন করেন এবং কোষ্ঠী, গ্রহনক্ষত্রের অবস্থানজনিত ফলাফল গণনা করিতেন। ভারতে বৌদ্ধদের বাধা সত্ত্বেও তাহার উপর গ্রহপূজা আরম্ভ হয়। কিন্তু Chaldean  সভ্যতার ধ্বংস ও ভারতীয় সভ্যতার অধঃপতন হইতে মনে হয় যে ফলিত জ্যোতিষ সম্পূর্ণ নিরর্থক। বর্তমান বিজ্ঞানে ফলিত জ্যোতিষের কোনও সার্থকতা উপলব্ধি হয় না।


*বানান অপরিবর্তিত

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3553 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...