আমাদের দেশ… আমাদের পথ… আমাদের স্বাধীনতা…

শিমূল সেন

 


প্রাবন্ধিক, গবেষক

 

 

 

একটা পতাকা। ভিজছে। আদুর গায়ে। সামনে ছড়িয়ে ইতস্তত ও বিক্ষিপ্ত সাদা কিংবা ফুলের গোছা, ও দিকে, দীর্ঘ জড়িমাঘোর থেকে বের করে ধুয়েমুছে রাখা কোনও বিগত দেশনায়কের মলিন হাসিমুখ। যাবতীয় টুকরো-ছবি মিলিয়ে যে কোলাজটা তৈরি হয় শ্রাবণের শেষ দিনে, বিশ্বায়ন-অতিক্রান্ত সময়ের সন্তান আমরা তাকেই জেনেছিলাম পনেরোই আগস্ট বলে৷ নয়াদিল্লির খাসমহলা সুদৃশ্য সড়কে, সাঁজোয়া রাষ্ট্রীয় প্রণোদনায়, দূরদর্শন-বাহিত যে সুদৃশ্য ইমেজ তৈরি হত— আমাদের এই পাড়াতুতো ইমেজ অবশ্য রাশভারী ছিল না ততখানি। বরং কিঞ্চিৎ দুঃখী, কিঞ্চিৎ ময়লাটে। তখনও সম্বৎসর বপু ফুলিয়ে জাতীয়তাবাদী প্রমাণের ক্রান্তিকাল আসেনি। এই একটি দিন, তার আগে মধ্যরাত, সকালের ঝিরঝিরে বৃষ্টি, গুটিকয়েক লোক আর দু-চারটি বক্তৃতা শেষ-নব্বই আমাদের দিয়ে যেত এক লুপ্তপ্রায় সংস্কৃতির পাঠ।

সেই ইমেজ ধাক্কা খেল এক দিন। চোখ মেলে দেখলাম খবরের কাগজের প্রথম পৃষ্ঠায় ছবি: মস্ত রাক্ষুসে বন্যা গিলে খেয়েছে উত্তর-পূর্ব ভারতকে, দাঁড়িয়ে গেছে বুকসমান জল, আর তার মধ্যেও ১৫ অগস্টের নির্বিকার উড়ছে তেরঙা, জলের তোড়ে ডুবে যেতে যেতে হেডমাস্টারমশাই সভয়ে স্যালুট করছেন পতাকাকে। ২০১৮ সালের কথা এটা। ছবিটা বোধ হয় ছিল অসমের। উৎপলকুমারের কবিতার লাইন মনে পড়েছিল: হায় জাতীয়তাবাদী কৃমি, হায় শিশুর রুগ্নতা/আফিমবীজের চেয়ে পরিণতিহীন লক্ষ্যে এই দেশে উড়ে চলে তুলো৷ স্বাধীনতা যে কেবলই বন্ধন মোচন করে না, বরং নতুন শেকল পরায়, সে দৃশ্য স্পষ্ট হয়েছিল সে দিন। পনেরোই অগস্টের ভেতর যে দমনের এই বর্ণমালাও নিহিত, তা তাঁর বইয়ে দেখিয়েছেন রাজনীতি-তাত্ত্বিক শ্রীরূপা রায়। তাঁর মত: রাষ্ট্রযন্ত্র ফি-বছরের পনেরোই অগস্টের সাঁজোয়া কুচকাওয়াজে আমাদের ইন্দ্রিয়গুলির দখল নেয়, কায়েম করে তার আধিপত্য, উৎপাদন করে আম-নাগরিকের সম্মতি— জেমস স্কটের বুলি আওড়ালে: ‘সিইং লাইক আ স্টেট’। পনেরোই আগস্ট এ-হেন কূট রাষ্ট্রীয় প্রতিভাসের অংশবিশেষ— রাষ্ট্র যেখানে পারফর্ম করে, আর নাগরিক তাকায় বিমুগ্ধ ও সসম্ভ্রম।

কিন্তু, কেবলই ক্ষমতার কারসাজি? আজ থেকে বছর পনেরো আগে এক নাবালক তা হলে কী ভেবে ১৪-র মধ্যরাত থেকে ফেটে পড়ছিল অজানিত উত্তেজনায়, অপটু হাতে আঁকছিল তেরঙ্গা, অনভ্যাসে উঠে পড়েছিল সকাল ছটায়, প্রথম সূর্যের দিকে তাকিয়ে ‘অরুণপ্রাতে তরুণ দল’ কথাটার মাধুরী পাবে বলে হয়তো, একটা খুদে পতাকা, প্রায় জোর করে সেঁটেছিল তার বারান্দায়, পরম বিস্ময়ে? খাতায়কলমে নাগরিক হয়ে উঠতে তার এক দশকেরও বেশি সময় বাকি তখনও, সেই বয়সে সরকারি প্রচারযন্ত্রের ন্যূনতম আলোছায়াও টের পায়নি— বরং যে বয়সে মানুষ নাগরিক হয়, হেজিমনির আওতায় আসে, তখনই তার মনে হয়েছে যে স্বাধীনতা দিনকে কেবলই নির্মল ইনোসেন্সের উদ্বোধন হিসেবে সাব্যস্ত করা গুরুতর অন্যায়। কিন্তু এ কথাও তো ঠিক যে, স্বাধীনতা দিনকে নিয়ে শিশুতোষ মুগ্ধতায় উচ্ছ্বসিত হওয়াটা আমাদের যুগধর্ম নয়। স্বাধীনতার শেকল-ছেঁড়া বিততির মধ্যে, শৃঙ্খলমোচনের রাতজাগানিয়া স্বপ্নের ভেতর কতখানি দমনবোধ উপ্ত থাকে— আধুনিকতার এই সাম্প্রতিক পর্যটন আমাদের সামনে ফাঁস করে দিয়েছে তা-ও।

‘আধুনিকতাই হল প্রথম সমাজদর্শন, যা নিতান্ত সাধারণ মানুষের চেতনাতেও স্বাতন্ত্র্য আর কর্তৃত্বের স্বপ্নজাল সৃষ্টি করে,’— এক প্রবন্ধে লিখেছিলেন রাজনীতি-ভাবুক পার্থ চট্টোপাধ্যায়। প্রাগদত্ত বাস্তবতার সীমানা টপকে কোনও পরম, রম্য, শোভন অধীত আদর্শ সমাজে উপনীত হওয়ার এই খোয়াবনামা নিঃসন্দেহে আধুনিক— যদিও তার রেশ পাওয়া যাবে প্রাক্-আধুনিকের দুনিয়া ঢুঁড়লেও। আধুনিক সময়ে স্বাধীনতার ধারণা এল স্পেনীয় কবি হিমেনেথের উক্তির মত: ‘এ বার শিকড় ডানা মেলুক, ডানা মেলুক আকাশে’— যে স্বাধীনতায়, পাখির সহজে, প্রতিটি ব্যক্তি উত্তীর্ণ হবে বন্ধন-দূষণ পেরিয়ে এক কাঙ্ক্ষিত আধুনিক গন্তব্যের দিকে। অতঃপর, স্বাধীনতা কেবল রাষ্ট্র বা সংগঠন বা সমূহের যষ্টি থাকে না— হয়ে ওঠে মুক্তিকামী ব্যক্তির সনদনামাও। কান্ট বলেছিলেন না, আধুনিকতার টিপসই হল জানার ঝুঁকি— sapre aude— যখন সমস্ত প্রতিষ্ঠানকে মুছে ব্যক্তি জানার ঝুঁকি নেয় (কান্টের লেখার মধ্যেই তার সীমা চিহ্নিত রয়েছে, সে কথা আজ থাক), সেই স্বাধীনতাই সূচিত করে আধুনিকতাকে। গত আশি বছরের মধ্যে কালান্তক বিশ্বযুদ্ধ, যুক্তির ভয়াল ও বিষণ্ণ চেহারা, বিজ্ঞানের পুংদাপট, প্রান্তিকের উত্থান আর একগুচ্ছ বিরোধী স্বর এই একমেটে আধুনিকের প্রতাপকে ধসিয়ে দিয়েছে অবশ্য। আমরা চিনতে শিখেছি, ইন্ডিভিজুয়ালের স্বাধীনতা-প্রাপ্তি নেহাতই ধোকার টাটি, ক্ষমতার নিরন্তর আবর্তের বাইরে আমাদের জন্য কোনও অবশিষ্ট স্বাধীনতা বরাদ্দ নেই আর। ক্রমাগত নজরদারির ভেতর, কর্তৃত্বের ভেতর, দমনের ভেতর আর প্রশাসনিকতা-শ্লিষ্ট অবিরাম শৃঙ্খলের ভেতর, দলিত-মথিত হতে হতে, ব্যক্তি হয়ে উঠেছে ক্ষমতাতন্ত্রের নিধিরাম বোড়ে-বিশেষ।

যে স্বাধীনতার স্বপ্ন নিয়ে ক্ষমতা-হস্তান্তর হয়েছিল ১৯৪৭ সালে, সেই স্বাধীনতার অলীক খোয়াব, বলা বাহুল্য, পূর্ণ হয়নি। আমরা এক ক্ষমতা থেকে আর এক ক্ষমতায় পর্যবসিত হয়েছি কেবল— গোটাগুটি ক্ষমতাতন্ত্রের বাইরে বেরোতে পারিনি। যে জনতা স্বপ্ন দেখেছিল তার হক থাকবে এই নব্য সমাজ-সংগঠনে, নতুন সংবিধান-মোতাবেক গড়ে ওঠা রাষ্ট্রে স্বীকৃত হবে তার অধিকার— তার আকাঙ্ক্ষা ভেঙে খানখান। যে নাগরিক ভেবেছিল তার ভালোমন্দের দাবিগুলি প্রতিধ্বনিত হবে সংসদে, খোদ-তারই গণ-ইচ্ছায় মূর্ত হয়ে-ওঠা জনপ্রতিনিধির দৌত্যে— তার স্পৃহা আজ ভেসে গেছে। জনপ্রতিনিধি আর জনতায় রচিত হয়েছে এক অসেতুসম্ভব দুরত্ব। আজ যদি পেছনে ফিরে তাকানো যায়, ধরা যাক, যে-গরিবি এবং অর্থসম্পদ লুঠের প্রশ্ন উপনিবেশ-বিরোধী ভাবাদর্শকে তাড়া করে বেড়াল এত কাল (সম্পদের নিষ্কাশন তত্ত্ব ভাবা যায়), সেই গরিবি, স্বাধীন দেশে হয়ে উঠল ‘গরিবি হটাও’-এর মত আদ্যন্ত বুরোক্রেটিক স্লোগান-আয়ুধ (এ প্রসঙ্গে বিশদ লিখেছেন সুদীপ্ত কবিরাজ)। ঠিক এই তরিকায়, ‘অধিকারে’র নায্য দাবিগুলি গেল হারিয়ে— লিবারাল ক্ষমতাকাঠামোয় জাঁকিয়ে বসল শাসনতান্ত্রিক দাপট। এই ব্যবস্থায়, তার পুরনো ‘ধর্মনীতি’-সমেত (ঋণ: পার্থ চট্টোপাধ্যায়) নাগরিক আর সার্বভৌম ও হকদার কর্তা হয়ে থাকতে পারল না— সে প্রকারান্তরে হয়ে উঠল সুযোগসুবিধে-মুখাপেক্ষী জনকল্যাণবাদী সরকারের পরোক্ষ গ্রহীতাবিশেষ। তীব্র নৈরাশ্যে হাড় হিম হয়ে যায় ভাবলে, এই ব্যবস্থায় বস্তুত নাগরিকের যাবতীয় অধিকার বাজেয়াপ্ত৷ জরুরি অবস্থার কথাই ধরুন না। নাগরিক অভিজ্ঞতার নিরিখে প্রকাণ্ড দুঃসময়— যে সামাজিক চুক্তির ভিত্তিতে নাগরিক এই ব্যবস্থার বৈধ অংশীতে পরিণত হয়েছিল, সেই চুক্তিই বাতিল! অথচ— পার্থ চট্টোপাধ্যায় দেখিয়েছেন, নৃতত্ত্ববিদ এমা টারলো-র সমীক্ষা উদ্ধৃত করে: দিল্লির ঝুপড়ি বাসিন্দারা ১৯৭৫-এর অভিজ্ঞতা নিয়ে সাংঘাতিক হ্লাদিত, কেন না আমলাতান্ত্রিক পরিষেবাগুলির সুফল তারা একমাত্র তখনই চুটিয়ে পাচ্ছে। খদ্দেরভিত্তিক রাজনীতি-ব্যবসা আমাদের স্বাধীনতা-স্মৃতিকে ঢেকে দিল। নব্বইয়ের দশকে নেহরুবাদী অর্থনীতি ভেসে গেল নয়া উদারবাদী বানের তোড়ে— রাজনীতি হয়ে পড়ল আরও বেশি মাত্রায় প্রশাসনিকতা-নির্ভর। আজ এই লেখা লিখছি যখন, পেগাসাস-কাণ্ড ঝড় তুলছে সংসদে। সে কথা বাদও দিই যদি: নির্বাচন, যা স্বাধীন ভারতবর্ষে ছিল এত কাল ধরে স্বাধীন নাগরিকের পক্ষে জন-ইচ্ছে প্রকাশ করার সৎ লিবারালবাদী আয়না-বিশেষ— সেখানেও ছড়ি ঘোরাতে চলে এসেছেন মধ্যস্থ প্রশান্ত কিশোররা। এতে আঁতকে ওঠার কিছু নেই, কেন না, নির্দিষ্ট জ্ঞানতত্ত্বের কাঠামোয়, নাগরিককে জড় ও পরোক্ষ ‘পপুলেশন’-এ পরিণত করার রেওয়াজ ক্ষমতাতন্ত্রেই উপ্ত, দীর্ঘকালীন। লিবারাল ক্ষমতার ভেতরেই এই স্ববিরোধ লুকিয়ে। হয়তো, আসন্ন সময়ে আরও একচ্ছত্র বাড়বে এআই-এরও দাপট, আরও প্রকাশ্য হয়ে পড়বে উৎকট ক্ষমতাতন্ত্র। স্বাধীনতার মূল্য, বা ওয়েজেস অফ ফ্রিডম আমাদের চুকিয়ে যেতে হবে এভাবেই। ক্ষমতার এ-হেন অনন্ত ভুলভুলাইয়া থেকে বেরোনোর কোনও রাস্তা আমাদের জানা নেই। কেবল মনে হয়, শেকল থেকে মুক্ত হয়ে নিরালম্ব দাঁড়ানোর যে তরিকার পাঠ দিয়েছিল আধুনিকতা— ক্ষমতার বিষ-ছোবলে তার নানা আলোছায়া আজ প্রকাশ্য, এই স্বাধীনতা-আয়োজনের প্রতিও আমরা সমান সন্দেহগ্রস্ত ও বিদ্বিষ্ট। এই সাড়ে সাত দশকী নাগরিক অভিজ্ঞতা খুব মধুর নয় যে। ক্ষমতার সঙ্গে আপস আর রফা করতে করতেই তার এত কালের চলন।

তা হলে, স্বাধীনতা? মনে পড়ে, বছরকয়েক আগের কথা৷ কী অলৌকিক সমাপতন, সম্পূর্ণ ভুল করেই এক পনেরো আগস্ট ল্যাপটপে দেখতে বসে গেছিলাম সুবর্ণরেখা। আশ্চর্য ছায়ামন্দ্র দিন ছিল সেই পনেরোই আগস্ট, তার ওপর সে বছর আবার ওই তিথিতেই ঝুলনপূর্ণিমা পড়েছিল। আরতি মুখোপাধ্যায় ঠিক এমন দিনে কলাবতী রাগে মাঠরোদ্দুর খেতখামার ঝরিয়ে সুর গেঁথে দিয়েছেন: ‘আজু কি আনন্দ/ঝুলনে ঝুলত শ্যামচন্দ্র।’ ছবির শেষে, আমাদের সকলেরই জানা, বিনু তার মামাকে আকুল জিগ্যেস করে: ‘আমরা কি আমাদের নতুন বাড়িতে যাচ্ছি?’ বাইরে হা-স্তব্ধ স্বাধীনতা দিবসের মেঘলা সকাল। পাক খেতে খেতে আছাড় মারে, বিদীর্ণ করে ওই ক-টি শব্দ: ‘আমরা কি আমাদের নতুন বাড়িতে যাচ্ছি?’ আর নতুন বাড়ির সন্ধানে যাঁরা ঘরহারা, তাঁদের দেখেছি, অতীতের ট্রেনভর্তি ভিড়ঠাসা সেপিয়া-ফটোয়। সন ১৯৪৭। একই সঙ্গে, দেখে চলেছি গত বছর থেকে। সন ২০২০। খাতায়কলমে ‘পরিযায়ী’ শ্রমিক, ঘরছাড়া— শ্রমের নানা চাহিদায় যাঁর স্বাধীনতা বিদীর্ণ। চেনা ও প্রাচীন হাইওয়ে জুড়ে উদ্বাস্তুদের চির-পদপাত। এবং, আবহে সকরুণ বেজে ওঠে, ‘আমরা কি আমাদের নতুন বাড়িতে যাচ্ছি?’

সেই কোন দেশে আমরা যাচ্ছিলাম… কোন পথ দিয়ে আমরা যাচ্ছিলাম…

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3608 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Trackback / Pingback

  1. স্বাধীনতা ৭৫ — পঞ্চম বর্ষ, চতুর্থ যাত্রা – ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

আপনার মতামত...