পঁচাত্তরেও পরিবর্তন নেই: বুনিয়াদে অমিল বিজ্ঞানমনস্কতা

মানস প্রতিম দাস

 


বিজ্ঞান-বিষয়ক নিবন্ধকার ও সম্প্রচারক

 

 

 

হস্তিনাপুরের নিষাদ গোষ্ঠীর সর্দারের পুত্র ছিলেন একলব্য। তাঁর ইচ্ছে হয়েছিল তীরন্দাজিতে শ্রেষ্ঠ শিক্ষা লাভ করার। তাই পিতার অনুমতি নিয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন দ্রোণাচার্যের কাছে। একলব্যের পরিচয় জেনে কিছুক্ষণ ভাবলেন দ্রোণাচার্য। তারপর জানালেন যে ব্রাহ্মণ হয়ে শূদ্র শ্রেণির একলব্যকে শিক্ষা দেওয়া সম্ভব নয় তাঁর পক্ষে। একলব্য ফিরে গেলেন অরণ্যে যেখানে তাঁদের বসবাস। কাদামাটি দিয়ে দ্রোণাচার্যের মূর্তি তৈরি করে শুরু করলেন স্বশিক্ষা, তীরন্দাজিতে শ্রেষ্ঠ হয়ে উঠবেন বলে। একলব্য নামটা সঙ্গে থাক কিন্তু চেনা গল্পটাকে এইখানে একটু থামানো যাক। ১৯৮২ সালে মধ্যপ্রদেশে এই একই নামে তৈরি হয় একটি এনজিও। ছোট-ছোট ছেলেমেয়েদের শিক্ষাদানের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনতে চেয়েছিল তারা। আর তাই যোগ দেয় অসামান্য এক প্রকল্পে। দায়িত্ব নেয় হোসঙ্গাবাদ সায়েন্স টিচিং এক্সপেরিমেন্টের। কিশোর ভারতী এবং ফ্রেন্ডস রুরাল সেন্টার রাজ্য সরকারের সঙ্গে যৌথভাবে চালাচ্ছিল এই অভিনব শিক্ষাদানের কাজ। সেখানে নিজে প্রত্যক্ষ করা, প্রশ্ন করা আর হাতেকলমে কাজ করা ছিল বিজ্ঞান শিক্ষার ভিত্তি। হোসঙ্গাবাদের বাইরে অন্যান্য জেলার অনেক স্কুল ধীরে ধীরে যুক্ত হতে থাকে এই প্রকল্পে। পাঠ্যক্রমের নকশা তৈরি, প্রয়োজনীয় পরিবর্তন ও সম্পাদনের ভার ছিল একলব্যের উপর। এভাবেই পেরিয়ে গেল একে একে তিনটে দশক। তারপর এল এক প্রশাসনিক আদেশ। ২০০২ সালের আগস্টে জানানো হল যে মধ্যপ্রদেশের সব জেলায় একই ধরনের শিক্ষাক্রম চালু থাকবে এবং পাঠ্যবই পড়ে, পরীক্ষা দিয়ে বিজ্ঞান শিক্ষা সম্পন্ন করতে হবে। কোনও স্কুল যদি হোসঙ্গাবাদ সায়েন্স টিচিং এক্সপেরিমেন্ট ব্যবহার করতে চায় তবে সেটাকে সহযোগী বা সাপ্লিমেন্টারি ব্যবস্থা হিসাবে গ্রহণ করতে পারে। একলব্য বুঝল যবনিকা নেমে আসছে, বই মুখস্থ করে বিজ্ঞান শেখার সহযোগী হতে পারে না হোসঙ্গাবাদ পদ্ধতি। অনেক আবেদন, আলোচনাতেও নড়ল না প্রশাসনের সিদ্ধান্ত, শেষ হয়ে গেল অত্যন্ত কার্যকরী এবং বিজ্ঞানের প্রকৃত শিক্ষার এক কর্মসূচি। সায় দিল রাজ্যের প্রত্যেকটা প্রধান রাজনৈতিক দল।

যাই হোক, ফিরে আসা যাক গল্পে। একলব্যের পারদর্শিতা দেখে ভয় পেলেন ব্রাহ্মণ দ্রোণাচার্য। যাকে শিক্ষা দেননি তিনি সে কিনা তাঁর শিষ্য, ক্ষত্রিয় বীর অর্জুনের থেকেও দক্ষ হয়ে উঠেছে! কী করা যায় তাহলে? ‘গুরুদক্ষিণা’ চাইলেন তিনি, দাও তোমার দক্ষিণ হস্তের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ। একলব্য ‘না’ বলেননি, বুড়ো আঙুল কেটে রেখে দিলেন গুরুর পায়ের কাছে। এরপর গুরু কী আশীর্বাদ করেছিলেন তা যেখানে লেখা আছে সেখানেই থাক। যেটা ঘটল তা হল, দেশের শাসকশ্রেণির একজন প্রতিনিধি ইতি টেনে দিলেন একলব্যের দক্ষতায়। সেটা কত হাজার বছর আগেকার কথা। অস্বীকার কি করতে পারি, একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হল একবিংশ শতকের শুরুতে এ দেশেরই এক রাজ্যে!

হোসঙ্গাবাদ সায়েন্স টিচিং এক্সপেরিমেন্ট

এবার একটা প্রদর্শনীর কাহিনি, কিছুটা বিস্তারে। তার দায়িত্ব পেয়েছিলেন দেশের অগ্রগণ্য বিজ্ঞানী পুষ্পমিত্র ভার্গব। ১৯৭৭ সালে হায়দ্রাবাদে তৈরি হওয়া সেন্টার ফর সেলুলার অ্যান্ড মলিকিউলার বায়োলজির প্রতিষ্ঠাতা-অধিকর্তা তিনি।  ১৯৭৫ সালের মে মাসে তাঁকে প্রস্তাব দেন ন্যাশনাল কাউন্সিল অফ এডুকেশনাল রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিংয়ের (NCERT) অধিকর্তা রইস আহমেদ, বলেন বিজ্ঞানের নীতি ঘিরে একটা প্রদর্শনী গড়ে তুলতে। ততদিনে একজন দক্ষ বিজ্ঞানলেখক হিসাবেও সুপরিচিত হয়েছেন ভার্গব, বিজ্ঞানের মেজাজ গড়ে তোলা নিয়ে তাঁর নানা প্রবন্ধ নজর কেড়েছে সংশ্লিষ্ট মহলে। ভার্গব লেগে পড়লেন কাজে। শুধু বিজ্ঞানের মডেল রাখলেই তো আর এমন একটা প্রদর্শনী সার্থক হয় না, দরকার হয় উপযুক্ত চিত্র ও ভাষ্যের। সে সবের দায়িত্ব তিনি দিলেন বাছাই করা লোকজনকে। কাজ যখন এগোচ্ছে তখন বোঝা গেল NCERT যে অর্থ দেবে তা দিয়ে গোটা কাজ শেষ হবে না। অতএব বেসরকারি শিল্প সংস্থার কাছে আবেদন করা হল এবং সেই সময়ে এক লক্ষ টাকার প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেল একটা সংস্থার কাছ থেকে। এদিকে দেশে তখন জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। তাতে অবশ্য এই কাজে বাধা পড়ল না যেহেতু রইস আহমেদকে তাঁর পদ থেকে সরানো হয়নি। দেশের ও বিদেশের প্রখ্যাত সব প্রতিষ্ঠানের সাহায্য নিয়ে কাজ যখন এগিয়ে চলেছে তখন শুরু হল এর জন্য উপযুক্ত জায়গা নিয়ে ভাবনা। শেষমেশ ঠিক হল যে দিল্লির বাল ভবনের পোলিশ প্যাভিলিয়নে এই প্রদর্শনী রাখা হবে। ১৯৭৭ সালের মার্চে শেষ হল কাজ এবং ঠিক হল যে পরের মাসে প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধন করবেন প্রদর্শনীর।

কিন্তু এই মার্চ মাসেই সাধারণ নির্বাচনে ঘটে গেল রাজনৈতিক পরিবর্তন। নতুন যে ব্যবস্থা তৈরি হল তাতে প্রদর্শনী উদ্বোধনের আশা খুব একটা উজ্জ্বল দেখাল না। এমন শক্তির প্রবেশ ঘটল প্রশাসনে যারা বিজ্ঞানের নিয়ম মেনে প্রশ্ন করা, ব্যাখ্যায় মনোযোগী হওয়া, চিরাচরিত ধ্যানধারণার পরিবর্তনে একেবারেই আগ্রহী নয়। রইস আহমেদ পদত্যাগ করলেন NCERT-র অধিকর্তার পদ থেকে। বাল ভবনে প্রদর্শনীর যাবতীয় সরঞ্জাম তালাবন্ধ রেখে এবং প্রচুর আর্থিক দেনা নিয়ে হায়দ্রাবাদ ফিরে এলেন ভার্গব। নিজের যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে নিশ্চিত করে এলেন যে জিনিসপত্রগুলো যেন মাঝে-মাঝে পরিষ্কার করা হয়। অবহেলায় পড়ে না থেকে প্রদর্শনীর যাতে একটা স্থায়ী ঠিকানা হয় তার জন্য সরকারি ও বেসরকারি বহু জায়গায় কথাবার্তা চালালেন ভার্গব। ১৯৭৮ সালের ৭ আগস্ট দিল্লি থেকে বার্তা এল যে প্রদর্শনীর যাবতীয় সাজসরঞ্জাম চুরি হয়ে গিয়েছে বাল ভবন থেকে। ভার্গব বেশ বুঝলেন যে প্রশাসনিক সহযোগিতা ছাড়া এই দুষ্কর্ম সম্ভবও নয়। তড়িঘড়ি দিল্লি ছুটলেন তিনি, সাংবাদিক সম্মেলন ডেকে বিষয়টা জানালেন সবাইকে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করলেন তিনি কিন্তু উষ্ণ অভ্যর্থনা পেলেন না। অন্ধ্রপ্রদেশে ইন্ডিয়ান র‍্যাশনালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন সেখানকার হাইকোর্টে রিট পিটিশন দাখিল করল এ ব্যাপারে। তার শুনানিও হল। কিন্তু সাজসরঞ্জামের হদিশ নেই! অন্ধ্রপ্রদেশের সরকার ব্যাপারটা নিয়ে উদ্যোগী হওয়ায় অবশেষে সব কিছু পাওয়া গেল NCERT-র একটা গুদামে। বোঝা গেল যে বিজ্ঞান-বিরোধী মানসিকতার স্বেচ্ছাকর্মী দিয়েই সরানো হয়েছে জিনিসগুলো। অন্ধ্রপ্রদেশের সরকার জিনিসগুলো ফিরিয়ে নিয়ে এল হায়দ্রাবাদে। নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী এই উদ্যোগ।

পুষ্পমিত্র ভার্গব

১৯৮০ সালে অন্ধ্রপ্রদেশ স্টেট পাবলিক লাইব্রেরির দোতলায় ঠাঁই হল প্রদর্শনীর। অন্ধ্রপ্রদেশ সায়েন্স সেন্টার দায়িত্ব নিল পরিচালনার। ব্যাপারটা বেশ ভালোই চলল এবং বহু মানুষ ঘুরে দেখল প্রদর্শ বস্তু এবং লাইভ শো। এর পরে অবশ্য একটা সময় উপযুক্ত স্বেচ্ছাসেবকের সংখ্যায় টান পড়ল এবং দর্শকের সংখ্যাও কমতে লাগল। এবার বিড়লা সায়েন্স সেন্টারে সরে গেল প্রদর্শনী, সেখানকার অধিকর্তার আগ্রহে। কিন্তু বেশ এলোমেলোভাবে সেখানে রাখা হল প্রদর্শ বস্তুগুলোকে। এই নিয়ে ভার্গবের আক্ষেপ শুনে বিশিষ্ট যুক্তিবাদী বাসব প্রেমানন্দ সেটাকে সরিয়ে নিয়ে যেতে চাইলেন কেরলে। এই সেই প্রেমানন্দ যিনি পুত্তাপার্থীর সত্য সাঁই বাবার অলৌকিক দাবির বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালান। আদালতে আবেদন, বই লেখা ইত্যাদি করে সাঁই বাবার আজগুবি কারবার নিয়ে সচেতন করেন মানুষকে। যাই হোক, প্রেমানন্দ আগ্রহ ব্যক্ত করার পরেই জানা গেল যে বিড়লা সায়েন্স সেন্টার সব কিছু সরিয়ে ফেলেছে। তাদের যুক্তি ছিল যে জিনিসপত্রগুলো খুব খারাপ অবস্থায় পৌঁছে গিয়েছিল, তাই ফেলে দেওয়া হয়েছে। এভাবেই শেষ হল বিজ্ঞানের নীতি নিয়ে প্রদর্শনী সাজানোর এক অভিনব উদ্যোগ।

এত দীর্ঘ বর্ণনার পরে প্রাসঙ্গিক হতে পারে একজন বিজ্ঞানীর একটা ছোট্ট বক্তব্য। কলকাতায় বসে সাংবাদিককে সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন আমেরিকা-প্রবাসী বাঙালি বিজ্ঞানী আনন্দমোহন চক্রবর্তী। ট্যাঙ্কার লিক করে সমুদ্রে ছড়িয়ে পড়া খনিজ তেল শোষণ করে নিতে পারে এমন জীবাণু আবিষ্কার করেছিলেন তিনি। নিজের গবেষণার কথা বলতে গিয়ে মন্তব্য করেন, দেশে থাকলে এই কাজ সম্ভবও হত না এবং স্বীকৃতিও জুটত না।

সমস্যা শুরু থেকেই

খুব কি ভুল বলেছিলেন আনন্দমোহন? বিজ্ঞান গবেষণা মানে তো কেবল কয়েকটা ঘরে কিছু আধুনিক যন্ত্রপাতি চালানোর ব্যাপার নয়। মানুষের অনুসন্ধিৎসাই সবথেকে বড় কথা। যে ভূমিতে মনের সেই দিককে উৎসাহিত করা হয় না, যেখানে দীর্ঘদিনের চালু ব্যবস্থাকে প্রশ্ন করা অন্যায় সেখানে কি বিজ্ঞানের গবেষণা উৎসাহ পেতে পারে! স্বাধীন দেশের পথচলার শুরুতে অবশ্য এতটা হতাশা ছিল না। দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহরু ‘সায়েন্টিফিক টেম্পার’ কথাটার জন্ম দেন ১৯৪৬ সালে তাঁর বই ‘দ্য ডিসকভারি অফ ইন্ডিয়া’তে। আমাদের রাজনীতিবিদদের মধ্যে সম্ভবত তিনিই প্রথম যিনি মানবসভ্যতার বিকাশে ধর্মের গুরুত্ব স্বীকারে নিয়েও বিজ্ঞানের সঙ্গে তার সঙ্ঘাত নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। শুধু লেখালেখিই নয়, অন্য কাজের মাধ্যমেও নিজের এই মানসিকতাকে স্পষ্ট করে তোলেন তিনি। ১৯৫৫ সালে ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেসের অধিবেশনে সায়েন্টিফিক টেম্পারের উল্লেখ করে তিনি বলেন যে কোনও বাঁধা ধারণার (dogma) দাসত্ব করেন না তিনি। কিন্তু এর অনেক আগে তাঁর বিজ্ঞানমনস্কতা এসেছিল জনসমক্ষে। ১৯৪৭ সালের জানুয়ারিতে প্রতিষ্ঠিত অ্যাসোসিয়েশন অফ সায়েন্টিফিক ওয়ার্কারস অফ ইন্ডিয়ার প্রথম প্রেসিডেন্ট হন তিনি। এটা ছিল, এক অর্থে, বিজ্ঞানীদের ট্রেড ইউনিয়ন। সবাই জানেন, সমর্থক আর বিরোধীদের নিয়েই গড়ে ওঠে রাজনীতিকের জীবন, জহরলাল নেহরুর জীবন তার ব্যতিক্রম নয়। ফলে অনেকেই হয়ত তাচ্ছিল্য করতে পারেন এই উদ্যোগকে। কিন্তু এশিয়া মহাদেশের সামগ্রিক অবস্থা বিবেচনা করলে এটা নিঃসন্দেহে এক ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ। খুব বেশি দিন চলেনি এই সংগঠন কিন্তু একটা দিশা দেখিয়ে গিয়েছিল। সেই পথে চলে দেশের সম্মানীয় মহাকাশবিজ্ঞানী সতীশ ধাওয়ান এবং পুষ্পমিত্র ভার্গব উদ্যোগ নেন একটা ভিন্ন সংগঠন তৈরি করার। এর নাম দেওয়া হয় সোসাইটি ফর প্রোমোশন অফ সায়েন্টিফিক টেম্পার। ১৯৬৪ সালে হায়দ্রাবাদে জীববিজ্ঞানের এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে এই সোসাইটির উদ্বোধন হয়। উপস্থিত ছিলেন দেশবিদেশের গণ্যমান্য বিজ্ঞানীরা, সবাই তাঁদের সমর্থন জানান মুক্তকণ্ঠে।

কিন্তু সীমিত সংখ্যক বিজ্ঞানীরা যে আদর্শ নিয়ে শুরু করলেন তার সঙ্গে গলা মেলাতে স্পষ্ট আপত্তি জানিয়ে দিলেন দেশের বাকি বিজ্ঞানীরা। সোসাইটি উদ্বোধনের সময় সায়েন্টিফিক টেম্পার নিয়ে যে ঘোষণাপত্র লেখা হয়েছিল তাতে স্পষ্ট শব্দে বলা হয় যে সংগঠনের প্রত্যেক সদস্য মনে করে যে মানুষের চেষ্টাতেই জ্ঞান অর্জন হয়, কোনও অলৌকিক শক্তির মাধ্যমে তা প্রকাশিত (revelation) হয় না। এমন শক্তির আশীর্বাদ প্রার্থনা না করে মানুষের বৌদ্ধিক সম্পদ দিয়েই যাবতীয় সমস্যার মোকাবিলা করা উচিত। একের পর এক বিজ্ঞানী আপত্তি জানালেন এই ঘোষণাপত্র বা অঙ্গীকারপত্রে স্বাক্ষর করতে। ফলে খুব অল্প দিনের মধ্যেই ইতি পড়ল সোসাইটির যাত্রায়।

সংবিধানের সমর্থন ও তারপর

আমাদের সংবিধান আয়তনে বিশাল, আমাদের জাতীয় জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান এটা। বহু বিতর্কে আমরা সাংবিধানিক বৈধতার প্রশ্ন তুলে থাকি। সংবিধানে উপযুক্ত ধারার সমর্থন পেলে অনেক কাজ নির্বিঘ্নে করা সম্ভবও হয়। আবার এই সংবিধানে নানা ধারা যুক্ত করা বা ধারার সংশোধন আনাটাও আমাদের গণতান্ত্রিক কাঠামোয় স্বীকৃত। এমনভাবেই এক সংশোধন আনা হয়েছিল ১৯৭৬ সালে, সংবিধানে যুক্ত হয় Article 51-A(h). মৌলিক কর্তব্যের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত এই উপধারা অন্য অনেক কিছুর সঙ্গে আর একটা  কর্তব্য স্থির করে দেয় ভারতীয় নাগরিকের জন্য— ‘to develop the scientific temper, humanism and the spirit of enquiry and reform’. খেয়াল রাখতে হবে যে ১৯৭৫ সালের ২৫ জুন থেকে শুরু হওয়া একুশ মাসের জরুরি অবস্থা চলছে তখনও। ফলে পরিস্থিতির গণতান্ত্রিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন যে কেউ। তবে চাইলে পরে তো কেউ বাদ দিতেও পারতেন এই উপধারা! তা হয়নি এখনও অবধি।

সংবিধানে কোনও সংশোধন এলে রাতারাতি বদলে যায় না জাতীয় জীবনের গতিপথ। একটা পঙক্তি পাল্টাতে পারে না ডাইনি অপবাদ দিয়ে পুড়িয়ে মারা, পীর-ফকির-বাবাজিদের ভিত্তিহীন প্রচার বা বাণিজ্যে অবৈজ্ঞানিক বিজ্ঞাপনের রমরমা। সব কিছু চলতে লাগল একইভাবে। তবে উল্টোদিকে কিছু আশাব্যঞ্জক ঘটনাও ঘটল। ১৯৮০ সালের অক্টোবর মাসে পর্যটনকেন্দ্র উটির কাছে কুন্নুরে এক দল অধ্যাপক ও বুদ্ধিজীবী মিলিত হলেন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায়। কিছু দিন আলোচনা করে তাঁরা যে বিবৃতি তৈরি করলেন তার শিরোনাম A Statement on Scientific Temper. ১৯৮১ সালের জুলাই মাসে প্রকাশিত সেই বিবৃতিতে আর্থসামাজিক উন্নতির জন্য সায়েন্টিফিক টেম্পারের প্রয়োজন তুলে ধরা হল। কিন্তু বুদ্ধিজীবীরা বললেন আর সরকার তাঁদের নির্দেশিত পথে হাঁটতে শুরু করলেন, এটা আমাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় আশা করা বৃথা। আসলে ইমেজ রক্ষার জন্য সরকারকে অনেক কাজই করতে হয় আর কুন্নুরের সভা থেকে উঠে আসা ঘোষণা সম্ভবত তেমনই একটা ব্যাপার।

কুন্নুর থেকে বিবৃতি প্রকাশের তিরিশ বছর পরে ২০১১ সালে হিমাচল প্রদেশের পালামপুরে এক সভা আয়োজিত হল যেখানে আবার দৃষ্টিপাত করা হল সায়েন্টিফিক টেম্পার নিয়ে বিবৃতির উপর। স্বীকার করে নেওয়া হল যে অসাম্যে ভরা সমাজে বিজ্ঞানের মেজাজ ছড়িয়ে পড়তে পারে না। যে দেশে পঞ্চাশ শতাংশ মানুষ বাস করে দারিদ্র্যসীমার নীচে আর যেখানে নাগরিকদের প্রায় সত্তর শতাংশ প্রকৃত অর্থে নিরক্ষর সেখানে সেখানে এই বিজ্ঞানমনস্কতা আশা করা বৃথা। অতএব সামাজিক ন্যায়, পর্যাপ্ত শিক্ষাদান এবং ব্যাপক বিজ্ঞান প্রচারের প্রয়োজন। মেনে নেওয়া হল যে এই তিরিশ বছরে কুসংস্কার আর ধর্মীয় বিশ্বাসকে নিশানা করে সায়েন্টিফিক টেম্পারের প্রবক্তারা খুব একটা সাফল্য পাননি। বরং জীবনের সর্বস্তরে বেড়ে গিয়েছে ধর্মবিশ্বাসের ভিত্তিতে নানা কাজের আয়োজন। বিজ্ঞানীরাও ‘গুরু’ আর ‘বাবাজি’দের প্রতি তাঁদের আস্থা প্রকাশ্যে জানিয়ে এই পরিস্থিতিকে আরও সঙ্গীন করে তুলেছেন। আদর্শ মানুষ হিসাবে যুক্তিবাদের পক্ষে দাঁড়াবেন যাঁরা তাঁরাই এমন কাজ করলে মানুষের সায়েন্টিফিক টেম্পারের পক্ষে জনসমর্থন আদায় শক্ত। গণমাধ্যমে কুসংস্কারের প্রচার বেড়েছে হু হু করে, টেলিভিশন ব্যবহৃত হয়ছে যথেচ্ছভাবে। পরিহাসের বিষয় এটাই যে বিজ্ঞানের আধুনিক দান ব্যবহার করে অবৈজ্ঞানিক কাজকর্মের স্রোত বেড়েছে। সবশেষে জীবনের সব ক্ষেত্রে আবার সায়েন্টিফিক টেম্পারের প্রচলন করে পরিস্থিতি বদলের জন্য আহ্বান করা হয়। যাঁরা এই আবেদন করলেন তাঁদের অনেকেই সরকার পোষিত বিজ্ঞান-প্রচার সংস্থা ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স কমিউনিকেশন অ্যাণ্ড ইনফর্মেশোন রিসোর্সেসের (NISCAIR) সঙ্গে যুক্ত। পরিস্থিতির কি বদল হল তাতে?

বিজ্ঞানীদের পুজোপাঠ

মহাকাশ গবেষণায় ভারতের অবদান আজ স্বীকৃত। আমেরিকা, চিন বা ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সির থেকে অনেক ক্ষেত্রে পিছিয়ে তাহলেও নিজেদের শক্তিতে মহাকাশ যান প্রেরণে ভারতের গৌরব বিশ্বে স্বীকৃত। একইসঙ্গে পরিচিত ভারতের মহাকাশ গবেষণা সংস্থার (ISRO) বিজ্ঞানীদের পুজোপাঠের আগ্রহ। যে কোনও উৎক্ষেপণের আগে তিরুপতি মন্দিরে পুজো দিতে ছোটেন এই সংস্থার বিজ্ঞানীরা। চন্দ্রযান বা মঙ্গলযান উৎক্ষেপণের আগেও তার কোনও ব্যতিক্রম হয়নি। এদিকে কুসংস্কারের প্রতি টানও প্রবল এখানে। আমাদের গর্বের রকেট PSLV-র নানা সংস্করণ তৈরি হয়েছে এবং সাফল্য পেয়েছে। এগুলোর নামের সঙ্গে সংখ্যা যুক্ত থেকেছে যেমন PSLV-C11 বা PSLV-C12. কিন্তু হঠাৎ করে দেখা গেল যে ১৩ সংখ্যাটা উধাও অর্থাৎ PSLV-C13 নামে কোনও রকেট রইল না। ISRO-র কর্তারা নিউমেরোলজিস্টের সঙ্গে ‘পরামর্শ’ করে বুঝেছেন যে ১৩ সংখ্যাটা বাদ রাখাই সমীচীন! সর্বাধুনিক GSLV Mk III উৎক্ষেপণের আগেও পুজোপাঠ হয়েছে নিষ্ঠা সহকারে।

বিজ্ঞানীদের এই কাজ কতটা বিপজ্জনক হতে পারে সমাজের পক্ষে তার প্রমাণ পাওয়া গেল কিছু দিনের মধ্যেই। ২০১৭ সালের জুনে কর্নাটকের জলসম্পদ মন্ত্রী কৃষ্ণা ও কাবেরী নদীতে পুজো দেন যাতে বৃষ্টির দেবতা রাজ্যের প্রতি সুনজর দেন। এর সমালোচনা হলে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে ইসরোর বিজ্ঞানীরা যদি নিয়মিত পুজোপাঠ করতে পারেন তবে তাঁর কাজের মধ্যেও কোনও অসঙ্গতি নেই। এই নিয়ে চিরপরিচিত রাজনৈতিক তরজা হল এবং তারপর ইস্যুটা হারিয়ে গেল কাগজের পাতা থেকে।

বিজ্ঞান কংগ্রেসে শোরগোল

২০২০ সালে বিজ্ঞান কংগ্রেসের ১০৭তম অধিবেশনের প্রাক্কালে সংগঠকরা জানালেন যে তাঁরা বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছেন যাতে ছদ্মবৈজ্ঞানিক (pseudo-scientific) প্রবন্ধ বা বক্তৃতা ঢুকে না পড়ে অধিবেশনে। কেন প্রয়োজন হল এমন একটা ঘোষণার? কারণ খুঁজতে খুব বেশি দূরে যেতে হবে না। লাভলি ইউনিভার্সিটিতে ঠিক এর আগের অধিবেশনে অন্ধ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য জি নাগেশ্বর রাও বলেছিলেন যে স্টেম-সেল প্রযুক্তি এবং টেস্টটিউব বেবি তৈরির কৌশল ব্যবহার করেই জন্ম হয়েছিল মহাভারতের কৌরবদের। তিনি এও যোগ করেন যে রাম আর রাবণের যুদ্ধ হয়েছিল গাইডেড মিসাইল ব্যবহার করে। ২০১৫ সালে এমনই কিছু নিয়ে চর্চা হয়। সেবার বৈদিক যুগে এরোপ্লেনের উপস্থিতি নিয়ে চর্চা শোরগোল ফেলে দেয়। ক্যাপ্টেন আনন্দ বোদাস গণমাধ্যমকে এও জানান যে বৈদিক যুগে এরোপ্লেনের আকার ছিল বিশাল এবং সেটা শুধু পৃথিবীতে নয়, এক গ্রহ থেকে অন্য গ্রহেও যাতায়াত করতে পারত। আরও এক ধাপ এগিয়ে তিনি বলেন যে সেই সময়ের এরোপ্লেন শুধু সামনের দিকেই নয়, পেছনের দিকেও চলতে পারত। যুক্তিবাদীরা তাঁর বক্তব্যের বিরোধিতা করেছেন ঠিকই কিন্তু উপযুক্ত জায়গায় তাঁর সমর্থকের সংখ্যা যে কম নয় তা বোধহয় বলা বাহুল্য।

এই প্রসঙ্গেই উল্লেখ করা যায় যে বৈদিক শ্লোকের দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে ১৮৯৫ সালে শিবকর তলপাড়ে নামে জনৈক বম্বে নিবাসী রাইট ভাইদেরও আগে এরোপ্লেন ওড়ানোর কাজ করেন বলে শোনা যায়। তিনি বিশেষ করে প্রভাবিত হয়েছিলেন ‘বৈমানিক শাস্ত্র’ নামে একটা পুঁথির দ্বারা। তলপাড়ের সাফল্যের কোনও প্রমাণ না থাকলেও তাতে বিশ্বাসীর বাধে না। এই শাস্ত্র খুঁটিয়ে পড়ে ব্যাঙ্গালোরের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স ১৯৭৪ সালে জানায় যে পুঁথির বক্তব্য ভিত্তিহীন এবং পুঁথির বয়স বড়জোর সত্তর বছরের। হাজার-হাজার বছরের পুরনো পুঁথি হওয়ার দাবি বাতিল হল এইভাবে। এতদসত্ত্বেও ২০১৮ সালে বৈমানিক শাস্ত্র নিয়ে একটা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় মুম্বাইতে। সেখানে বিশ্বাসীরা দলে ভারী থাকলেও দু-একজন যুক্তিবাদীর উপস্থিতির কারণে প্রচুর বাগবিতণ্ডা তৈরি হয়। এই প্রসঙ্গে বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহার ‘সবই ব্যাদে আছে’ শীর্ষক রচনা যদি কারও মনে পড়ে যায় তবে সেটা অস্বাভাবিক হবে না। সেখানে এক জায়গায় তিনি লেখেন,

…“অল্পবিদ্যা-ভয়ঙ্করী” শ্রেণীর তার্কিকগণ ভুলিয়া যান যে ভাস্করাচার্য কোথাও পৃথিবী ও অপরাপর গ্রহ সূর্যের চতুর্দিকে বৃত্তাভাস (elliptical) পথে ভ্রমণ করিতেছে একথা বলেন না। তিনি কোথাও প্রমাণ করেন নাই যে, মাধ্যাকর্ষণ শক্তি ও গতিবিদ্যার নিয়ম প্রয়োগ করিলে পৃথিবীর ও অপরাপর গ্রহের ভ্রমণ কক্ষ নিরূপণ করা যায়। সুতরাং ভাস্করাচার্য বা কোন হিন্দু, গ্রীক বা আরবী পণ্ডিত কেপলার-গ্যালিলিও বা নিউটনের বহুপূর্বেই মাধ্যাকর্ষণতত্ত্ব আবিষ্কার করিয়াছেন, এরূপ উক্তি করা পাগলের প্রলাপ বই কিছুই নয়। …

১৯৪০ সালে এই রচনা প্রকাশের পর নিশ্চয়ই মেঘনাদ সাহাকে সবাই সমর্থন করেননি। বৈজ্ঞানিক প্রমাণে আস্থা নেই যাঁদের তাঁরা ধরেই নিয়েছিলেন যে পাশ্চাত্য শিক্ষায় প্রভাবিত হয়ে তিনি ভারতীয় সংস্কৃতির ‘অপমান’ করছেন! সেই সব বিরোধীদের উত্তরসূরিরা আজও যে একই সুরে গান গাইছেন তা দেখে আশ্চর্য হওয়ার কোনও মানে হয় না।

মেঘনাদ সাহা

১৯৯০ সালে কোচিনে বিজ্ঞান কংগ্রেসের অধিবেশনে অধ্যাপক যশপাল তাঁর সভাপতির অভিভাষণে বলেছিলেন যে আমাদের সমাজে এমন একটা ধারণা দেওয়ার চেষ্টা হয় যে বিজ্ঞান বড়জোর একটা যন্ত্রবিশেষ, অতিরিক্ত একটা ব্যাপার, আরামদায়ক জীবন এনে দেওয়ার একটা পথ এবং অন্যদের উপর প্রভাব খাটানো ও ক্ষমতা দখলের একটা হাতিয়ার। তিনি আবেদন করেন যে এই ধারণা ঝেড়ে ফেলে বিজ্ঞানকে আবশ্যিক সংস্কৃতির অঙ্গ করতে পারলে সমৃদ্ধি আসবে এমনিতেই এবং এমনভাবে তা আসবে যাতে আঘাত হয়ে না দাঁড়ায়। আজ যাঁরা বৈদিক যুগে সব আবিষ্কার হয়ে গিয়েছিল বলে মনে করেন তাঁদের কাছে এই সংস্কৃতির আবেদনে কোনও ফল হবে বলে মনে হয় না। ইতিমধ্যেই দেশের বহু জায়গায় বিজ্ঞানের পাঠ্যবই বদলে যাচ্ছে এমনভাবে যা কাঙ্খিত নয়। হোসঙ্গাবাদ সায়েন্স টিচিং এক্সপেরিমেন্টের মতই হাতেকলমে বিজ্ঞান শেখার পথ বাতিল হচ্ছে। তবে সেগুলো বোধহয় বড় কথা নয়। যশপাল সেই সময়ের প্রশাসনের সমর্থন পেয়েছেন বলেই বিজ্ঞান কংগ্রেসে বলতে পেরেছিলেন বিজ্ঞান-সংস্কৃতির কথা। আজ যিনি পাবেন তিনিও একইভাবে বলবেন নিজের কথা, সেটা বৈজ্ঞানিক হোক বা অবৈজ্ঞানিক। অর্থাৎ প্রশাসন বা রাজনীতি থেকে পৃথক হয়ে, এই সব শক্তির প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে বিজ্ঞানচর্চার একটা মুক্ত নীতি বোধহয় গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি এদেশে। ফলাফল আমাদের চোখের সামনেই রয়েছে। ১৯৩০ সালে একবারই বিজ্ঞানে নোবেল এসেছিল এদেশে। স্বাধীন ভারতে বিজ্ঞানের আবিষ্কারের জন্য নোবেল পদক অর্জন করেননি কেউ। তাতে কার কতটা আসে যায় সেটা ভেবে দেখার।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3545 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...