‘এক ভারত’ প্রজাতন্ত্র-বিরোধী এক রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডা

সুমন কল্যাণ মৌলিক

 


প্রাবন্ধিক, মানবাধিকার কর্মী

 

 

 

এই মুহূর্তে দেশের রাজধানী নয়াদিল্লিকে বেষ্টন করে বসে আছেন আমাদের অন্নদাতারা। গণ-আন্দোলনের স্পর্ধায় তৈরি হচ্ছে প্রতিরোধের নয়া কাব্য। এই আন্দোলনের কারণ নয়া কৃষি আইন। এই আইনের ভালোমন্দ বিচার করা এই নিবন্ধের উদ্দেশ্য নয় বরং স্মরণ করতে চাই যেভাবে পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্র বলে বিজ্ঞাপিত ভারতের সংসদে আইনটি পাশ হয়েছিল সেই প্রক্রিয়াটিকে। লোকসভায় নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে কোনও আলোচনা ছাড়াই বিলটি পাশ হয়। আর রাজ্যসভায় যেখানে বিরোধীদের জোর আছে সেখানেও কোনও আলোচনার সুযোগ না দিয়ে নিছক ধ্বনি ভোটে বিল পাশ হয়। উভয় কক্ষের বিরোধী সদস্যদের অনুরোধ সত্ত্বেও বিলটিকে আরও বিবেচনার জন্য সিলেক্ট কমিটিতে পাঠানো হয়নি। ঘটনাটি সবিস্তারে উল্লেখ করলাম কারণ ভারতীয় সংবিধানে যে ক্ষমতাবিন্যাস রয়েছে তাতে কৃষি সেই ৬৬টি বিষয়ের মধ্যে একটি যা রাজ্যতালিকার মধ্যে পড়ে। এটাই আজকের ভারতবর্ষ। বিশেষ করে ২০১৪ সালে ‘হিন্দু হৃদয় সম্রাট’ নরেন্দ্র মোদির শাসন শুরু হওয়ার পর রাজ্যের এক্তিয়ার, যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো— সবটাই কাগুজে শব্দে রূপান্তরিত হয়েছে। এই অবস্থায় যুগ্ম তালিকায় থাকা সত্ত্বেও রাজ্যের সঙ্গে কোনও আলোচনা না করেই জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ণ করা যায়। এই জমানায় দিল্লির সরকারের কাছে রাজ্য সরকারগুলি যেন এক এজেন্সি, কেন্দ্রীয় সরকারের কার্যক্রম ও ইচ্ছেপূরণ করাই যেন তার একমাত্র কাজ। আশির দশকে দূরদর্শনের কল্যাণে জনপ্রিয় হওয়া গান “মিলে সুর মেরা তুমাহারা/তো সুর বনে হামারা’ আজ ইতিহাস। নয়া জমানায় যা কিছু বৈচিত্র্য, যা কিছু বহুত্বের কথা বলে তা বিষবৎ পরিত্যাজ্য। এখন শাসক-নির্ধারিত এক সুরে বাজাটাই নিয়ম। কিন্তু এই এক ভারতের গল্পটাই কি আমাদের ভবিতব্য? বিভিন্নতা ও বৈচিত্র্যকে অস্বীকার করে আমাদের প্রজাতন্ত্র কি টিঁকে থাকতে পারবে? স্বাধীনতার ৭৫তম বর্ষের প্রাকমুহূর্তে এই প্রশ্নগুলোকে ফিরে দেখাই এই আলাপনের লক্ষ্য।

ভারতীয় সংবিধান ও যুক্তরাষ্ট্রের ধারণা

নরেন্দ্র মোদির জমানায় যুক্তরাষ্ট্রীয় (ফেডারেল) কাঠামোকে আক্রমণের তাৎপর্য অনুধাবন করতে হলে আমাদের আলোচনা শুরু করতে হবে ভারতীয় সংবিধান থেকে। একথা সবার জানা যে ক্ল্যাসিকাল অর্থে যুক্তরাষ্ট্র (আদর্শ উদাহরণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া প্রভৃতি) বলতে যা বোঝায়, ভারতবর্ষ কখনওই তা নয়। সংবিধানের কোথাও ভারতকে যুক্তরাষ্ট্র বলে ঘোষণা করা হয়নি, একই সঙ্গে একথাও সত্য যে কোথাও ভারতকে এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা বলেও আখ্যায়িত করা হয়নি। আর্টিকেল ১ অনুযায়ী ভারত হল ‘union of states’। এই বাক্য থেকে এটা পরিষ্কার যে ভারত আদর্শ যুক্তরাষ্ট্র না হলেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তার অনেক সাদৃশ্য আছে। ভারতীয় সংবিধান বিশেষজ্ঞরা তাই ভারতকে এক ‘আধা-যুক্তরাষ্ট্র’ (quashi-federal) বলতে স্বচ্ছন্দ বোধ করেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় এর অর্থ এখানে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের মধ্যে ক্ষমতার বিভাজন থাকলেও এখানে কেন্দ্রের ক্ষমতা রাজ্যের চেয়ে বেশি, কেন্দ্র রাজ্যের বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে পারে এবং আইনের ক্ষেত্রে রাজ্য ও কেন্দ্রের মধ্যে বিবাদ উপস্থিত হলে কেন্দ্রের আইন কার্যকর হবে। চিরায়ত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের আরেকটি বড় পার্থক্য হল এখানে রাজ্যগুলির ভারত থেকে বিযুক্ত হওয়ার অধিকার নেই। কিন্তু আবার তাত্ত্বিকভাবে একথাও সত্য যে কেন্দ্র ও রাজ্য স্তরে আইনসভার অস্তিত্ব, ক্ষমতার বিন্যাস (কেন্দ্র, রাজ্য ও যুগ্ম তালিকা) ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় চরিত্রটিকে পরিস্ফুট করে। এককথায় বলা যেতে পারে ভারত এক আধা-যুক্তরাষ্ট্র, কারণ তার মধ্যে সংবিধানগতভাবে কেন্দ্রীকরণের ঝোঁক রয়েছে।

এখন প্রশ্ন উঠতে পারে সংবিধান-প্রণেতারা এইরকম এক আধা-খেঁচড়া যুক্তরাষ্ট্রের মডেল ভারতবর্ষের উপর চাপিয়ে দিলেন কেন! এ ব্যাপারে বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ফিলিপ মাহুড মন্তব্য করেছেন ভারতের মতো ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক, জাতি ও সম্প্রদায়গত, ভাষাগত বৈচিত্র্যের দেশে যুক্তরাষ্ট্রীয় মডেল সেরা হওয়া সত্ত্বেও কেন্দ্রাভিমুখী আধা-যুক্তরাষ্ট্রীয় মডেল গ্রহণের কারণ দেশভাগের তিক্ত অভিজ্ঞতার পর ভারতের শাসকশ্রেণি আর নতুন করে বিচ্ছিন্নতার শিকার হতে চাননি। এই কথার সত্যতা আমরা খুঁজে পাই সংবিধান সভায় ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুর বক্তব্যে— “it would be injurious to the interests of the country to provide for a weak central authority which would be incapable of ensuring peace, of co- ordinating vital matters of common concern and of speaking effectively for the whole country in the international sphere.” একদিকে এক শক্তিশালী দেশ যা একসুরে কথা বলবে আবার বাস্তবতার নিরিখে যুক্তরাষ্ট্রের আদর্শকে ঝেড়ে ফেলা যাচ্ছে না। এই টানাপোড়েন সংবিধানের অন্যতম রূপকার বাবাসাহেব আম্বেদকরের বয়ানেও স্পষ্ট— “The constitution is a federal constitution… the union is not a league of States… nor is the state agencies of the union, deriving power from it. Both the union and states are created by constitution.” তাই কেন্দ্রিকতা সত্ত্বেও ভারতীয় সংবিধানে কিছু বৈশিষ্ট্য আলাদা করে উল্লেখ করা দরকার যা তার যুক্তরাষ্ট্রীয় চরিত্র প্রকাশ করে। এর মধ্যে পড়ে কয়েকটি রাজ্যকে বিশেষ মর্যাদা দান, ইউনিয়ন টেরিটরি গঠন, পরবর্তী সেই টেরিটরিগুলিকে আবার রাজ্যের মর্যাদা দান, নতুন রাজ্যের গঠনের অধিকারকে স্বীকৃতি দান, রাজ্যের মধ্যে আবার বিভিন্ন অটোনমাস কাউন্সিল গঠন ইত্যাদি।

স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে যুক্তরাষ্ট্রের অভিজ্ঞতা

সংবিধানে যে শাসনতান্ত্রিক কাঠামোর উল্লেখ করা হয়েছে, স্বাধীনতার প্রথম পঞ্চাশ বছরে তার যাপিত অভিজ্ঞতাকেও আলোচনার বৃত্তে আনা জরুরি। এক্ষেত্রে প্রথমে উল্লেখ থাকা দরকার যে এই সময়ের সিংহভাগ জুড়ে ভারতের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু ছিল ভারতের জাতীয় কংগ্রেস। এই সময়পর্বে কংগ্রেসের রাজনৈতিক আদর্শ ছিল মূলত ভারতের শাসকশ্রেণির বিভিন্ন গোষ্ঠীর মতামতের একটা মঞ্চ। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের অনেকেই তাই কংগ্রেসকে রাজনৈতিক দলের পরিবর্তে একটি ফোরাম বলে আখ্যায়িত করেন। এই পঞ্চাশ বছরে কংগ্রেসের রাজনীতির অন্তর্বিরোধ যুক্তরাষ্ট্রের ধারণাকে বহুলাংশে প্রভাবিত করেছে। কংগ্রেসের প্রথম পর্বে বিশেষ করে জওহরলাল নেহেরুর ভাবনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল যা আলাদা উল্লেখের দাবি রাখে। ভারত কখনওই নিজেকে ‘জাতি রাষ্ট্র’ (nation state) হিসাবে গড়ে তোলার মডেলকে গ্রহণ করেনি। বরং তার লক্ষ্য ছিল নিজেকে ‘state nation’ হিসাবে গড়ে তোলা যা ভারতের বহুধা সামাজিক-সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে অক্ষুন্ন রেখে এক শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসাবে গড়ে উঠবে।

এই কারণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশ্নে প্রথম ৫০ বছরে আমরা মিশ্র অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হই। একদিকে কাশ্মির ও ভারতের উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলিতে ক্রমবর্ধমান স্বাধীনতা, আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবিগুলি যেমন ভারতকে সামরিক হস্তক্ষেপ ও কেন্দ্রীকরণের দিকে নিয়ে যায়। প্রকৃত অর্থে কাশ্মিরের বিশেষ মর্যাদা সংক্রান্ত ধারাটিকে (৩৭০) বারংবার সংশোধন করে তাকে প্রায় অকার্যকরী তুলেছিল জাতীয় কংগ্রেস। উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলির ক্ষেত্রে বিভিন্ন দানবীয় আইনগুলিকে ব্যবহার করে (বিশেষ করে উল্লেখযোগ্য আর্মড ফোর্সেস স্পেশাল পাওয়ার অ্যাক্ট) কংগ্রেস সেই রাজ্যগুলিতে কেন্দ্রীয় এজেন্সির শাসন প্রতিষ্ঠা করে। এছাড়া ইন্দিরা গান্ধি ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে রাজনৈতিক বিরোধিতাকে দমন করতে রাজ্যগুলিতে রাজ্যপালের অফিসকে নির্লজ্জভাবে ব্যবহার করে নির্বাচিত রাজ্য সরকারগুলির উপর নজরদারি শুরু হয়। একই সঙ্গে সংবিধানের ৩৫৬ নং ধারা ব্যবহার করে সরকার ফেলে দেওয়ার ঘটনা জলভাত হয়ে দাঁড়ায়।

কিন্তু চালচিত্রের আরেকটা দিকও ছিল। স্বাধীনতার কয়েকবছর পর কংগ্রেস এমন কিছু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয় (দেশজোড়া গণ-আন্দোলনের চাপে) যা আবার যুক্তরাষ্ট্রের ধারণাকে শক্তিশালী করে। এগুলি হল ভাষার ভিত্তিতে রাজ্য পুনর্গঠন, ত্রিভাষা সূত্র ও রাষ্ট্রভাষা হিসাবে হিন্দিকে ঘোষণা করার সিদ্ধান্তকে চূড়ান্ত না করা। এই বিপরীতমুখী ধারণাগুলির সহাবস্থানের কারণে অনেকে কংগ্রেসকে ‘reluctant federalist’ বলে বর্ণনা করেন। কিন্তু নব্বইয়ের দশকের সূচনায় কর্পোরেট-স্বার্থকে পূরণ করতে বিশ্বব্যাঙ্ক সহ আন্তর্জাতিক লগ্নি সংস্থাগুলির চাপে ভারতে ‘উদারীকরণ-বেসরকারিকরণ-ভুবনায়ন’-এর নীতি চালু হয় তখন কংগ্রেস নেতৃত্ব আরেকবার যুক্তরাষ্ট্রের ভাবনায় আঘাত হানে। এক্ষেত্রে যুক্তি হিসাবে হাজির করা হয় রাষ্ট্রের আর্থিক শৃঙ্খলাকে বজায় রাখতে, সব এলাকার আর্থিক বিকাশের জন্য ও রাষ্ট্র কর্তৃক নাগরিকদের জন্য যে সমস্ত পরিষেবা দেওয়া হচ্ছে তার পরিচালনা নিখুঁত করতে আর্থিক ব্যবস্থার কেন্দ্রীকরণ দরকার। আজ একথা আরেকবার মনে করিয়ে দেওয়া দরকার যে ভ্যাট, জিএসটি কার্যকর করার কর্মসূচি (এগুলি প্রযুক্ত হওয়ার পর থেকে রাজ্যগুলির আর্থিক ক্ষমতা আরও বেশি কেন্দ্রের মুখাপেক্ষী হয়ে পড়ে) মূলত কংগ্রেসের প্রোগ্রাম ছিল।

এক ভারত— তাত্ত্বিক রূপরেখা

১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি যে সংবিধানকে সাক্ষী রেখে ভারতীয় প্রজাতন্ত্র তার যাত্রা শুরু করে তার মূল প্রতিপাদ্যগুলিকে কংগ্রেস সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল মেনে নিলেও হিন্দুত্ববাদী শক্তিগুলি (বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ ও তার প্রভাবিত বিভিন্ন সংগঠনগুলি) কখনওই তা মেনে নেয়নি। সংবিধানের ক্ষেত্রে তাদের বিরোধিতা ছিল নীতিগত ও ধারাবাহিক।

আমরা এই নিবন্ধে হিন্দুত্ববাদীদের সংবিধান-বিরোধিতার বিভিন্ন কারণের মধ্যে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের প্রসঙ্গে তাদের বিরোধিতা নিয়ে আলোচনা সীমাবদ্ধ করছি। যুক্তরাষ্ট্রের বিপরীতে ‘এক ভারত’ (হিন্দুত্ববাদীরা তাদের আলোচনায় ‘অখণ্ড ভারত’ শব্দবন্ধটি ব্যবহার করে)-এর ইতিহাস খুঁজতে হলে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে ১৯২৩ সালে যখন বিনায়ক দামোদর সাভারকর তার অখণ্ড ভারতের ভাবনা তুলে ধরেন সেই সময়ে। এই ভাবনার মূল কথা হল নেপাল থেকে বার্মা এবং উত্তর-পশ্চিমে আফগানিস্তান পর্যন্ত হিন্দু সাংস্কৃতিক ঐক্য সাধনের মধ্যে দিয়ে এক বৃহত্তর ভারত গঠন। এই ভাবনায় ভারতমাতা এক একক, কেন্দ্রীয়, হিন্দু পরিচিতি-সত্তা যা বাঙালি, অসমিয়া বা তেলেগুর মতো প্রাদেশিক সাংস্কৃতিক অস্তিত্বকে স্বীকার করে না। এটাকে বলা হয় ‘one nation — one people’।

এই ভাবনা দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ সংবিধানে আলোচিত যুক্তরাষ্ট্রের ধারণাকে সরাসরি আক্রমণ করে। ষাটের দশকে সরসংঘচালক এম এস গোলওয়ালকর বলেন সংবিধান তৈরি করেছেন যে নেতারা তারা যুক্তরাষ্ট্রের স্বপ্নে মশগুল ছিলেন। ফলে ভারতের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক একক সত্তাটি (oneness) তাঁরা উপলব্ধি করতে সমর্থ হচ্ছেন না। এক্ষেত্রে তার প্রস্তাব ছিল— “The….. effective step will be to bury deep….. a federal structure of our country’s constitution, to sweep away the existence of all ‘autonomous’ or semi-autonomous ‘states’…. and proclaim ‘one country, one state, one legislature, one executive.”[1]

রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের যুক্তরাষ্ট্র প্রশ্নে এই বিরোধিতাকে ভারতের রাজনৈতিক জীবনে উপস্থিত করে তাদের নির্বাচনী শাখা ভারতীয় জনসংঘ (আজকের বিজেপির পূর্বসূরি)। তারা বলে প্রথমত ভারতকে জাতীয় ঐক্য ও আঞ্চলিক সংহতিকে নিশ্চিত করতে হলে এক কঠোর কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। এক্ষেত্রে তারা দেশভাগ ও ধর্মীয় বিরোধের স্মৃতিকে নানানভাবে জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করে। দ্বিতীয়ত, আমাদের দেশের সাংস্কৃতিক, ভাষাগত ও সম্প্রদায়গত বৈচিত্র্যকে অস্বীকার করে ১৯৭৩ সালে তারা ঘোষণা করে— ‘people of a country become a nation only when they are united by one culture.’ তৃতীয়ত, এই এক সাংস্কৃতিক পরিচিতির বাইরে অন্য কোনও বিকল্প পরিচিতিকে (যেমন একই সঙ্গে ভারতীয় এবং বাঙালি) তারা দেশগঠনের পক্ষে প্রতিবন্ধক মনে করে। চতুর্থত, এই যুক্তিক্রমকে অনুসরণ করে তারা বলে ধর্ম ও সম্প্রদায়ের ভিত্তিতে কোনও সংখ্যাগুরু বা সংখ্যালঘু অস্তিত্ব বা সংরক্ষণের প্রয়োজন থাকতে পারে না। পঞ্চমত, একইভাবে কোনও রাজ্য বা অঞ্চলকে কোনও কারণেই পৃথক মর্যাদা দেওয়া যাবে না। কাশ্মিরের ক্ষেত্রে তারা এই কারণে ৩৭০ ধারার তীব্র বিরোধিতা করে। শুধু কাশ্মির নয়, তারা একইভাবে দেশের নিরাপত্তা বিপন্ন হবে এই ধুয়ো তুলে নাগাল্যান্ড রাজ্য গঠনেরও তীব্র বিরোধিতা করে। সংক্ষেপে এই হল তাদের এক ভারতের গল্প।

মোদি জমানায় এক ভারতে’র আগ্রাসন

জনসংঘ ১৯৭৭ সালে ইন্দিরা গান্ধির পতনের পর গঠিত প্রথম কেন্দ্রে অকংগ্রেসি জনতা সরকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও মোরারজি দেশাইয়ের সরকারে সংখ্যার অভাবে যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো-বিরোধী কোনও অ্যাজেন্ডাকে সামনে আনতে পারেনি। এমনকি অটলবিহারি বাজপেয়ির নেতৃত্বে যে এনডিএ সরকার প্রতিষ্ঠা হয় সেখানেও সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে শরিকি নির্ভরতা তাকে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের কর্মসূচিকে সেভাবে সফল করতে দেয়নি। কিন্ত ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপি সরকার প্রতিষ্ঠার পর অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। সরকারে নরেন্দ্র মোদি আসীন হওয়ার পর সংঘ প্রভাবিত বিভিন্ন কাগজপত্রে বলা হয় পৃথ্বীরাজ চৌহানের পর আবার দিল্লিতে প্রকৃত অর্থে হিন্দু শাসন শুরু হল। এই পর্ব থেকেই এক ভারতের প্রশ্নটি অনেক পরিকল্পিতভাবে ভারতীয় রাজনীতিতে হাজির হয়।

২০১৪-পরবর্তী সময়ে যেহেতু দেশের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে বিজেপির সরকার ছিল তাই এবার ৩৫৬ ধারার প্রয়োগ বা রাজ্যপালের অফিসকে ব্যবহার করে রাজ্যের এক্তিয়ারে হাত দেওয়ার প্রশ্নটি ছিল না। এবার সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোকে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু করা হল। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ঘটনা হল জম্মু-কাশ্মিরে ৩৭০ ও ৩৫ ক ধারার বিলোপ। বলা যেতে পারে যে সমস্ত নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিকে ঘিরে স্বাধীনতা-পরবর্তী হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি আবর্তিত হয়েছে তার সর্বাধিক আলোচিত অ্যাজেন্ডাটি রূপায়িত হল। এক্ষেত্রে যে শর্ত ও বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে কাশ্মির ভারতভুক্তির প্রস্তাবে সম্মত হয়েছিল তাকে একতরফাভাবে কেন্দ্রীয় সরকার ভঙ্গ করল। এই গোটা প্রক্রিয়াতে জম্মু-কাশ্মিরের কোনও বক্তব্য রাখার সুযোগ তো থাকলই না বরং তারা তাদের অঙ্গরাজ্যের মর্যাদাটুকুও হারাল।

এরপর আরও কিছু সংশোধনীর উল্লেখ করা প্রয়োজন যা এককেন্দ্রিক ভারতের আক্রমণকে আরও স্পষ্ট করে। এগুলি হল ‘নাগরিকত্ব সংশোধন আইন’ (২০১৯), ‘তথ্যের অধিকার আইনে সংশোধন’ (২০১৯), ‘ইউএপিএ সংশোধন আইন’ (২০১৯), ‘এনআইএ সংশোধন আইন’ (২০১৯)। এগুলি আরও বেশি করে কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতাকে শক্তিশালী করে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অবশ্যই আলাদা করে উল্লেখ করা প্রয়োজন জিএসটির। বাস্তবত এই করব্যবস্থা চালু হওয়ার পর মদ, পেট্রোপণ্য ছাড়া আর সেরকম কোনও গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে কর বসাবার ক্ষমতা রাজ্য সরকারগুলির হাতে থাকল না। কেন্দ্রের ওপর অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এই নির্ভরতা কী ভয়ঙ্কর তা আমরা এই অতিমারির সময় ভালোভাবে উপলব্ধি করেছি। ২০২০-২১ আর্থিক বর্ষে জিএসটি থেকে প্রাপ্য দাবি করার পর কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন পরিষ্কারভাবে জানান এই টাকা দেওয়া যাবে না, পরিবর্তে রাজ্য সরকারগুলির বাজার থেকে ঋণ নেওয়ার যে মাত্রা তাকে বৃদ্ধি করা হচ্ছে।

২০১৯ সালে লোকসভা নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদির অভূতপূর্ব সাফল্য বিজেপির অখণ্ড ভারতের কর্মসূচিকে আরও উদ্দীপনা জোগায়। যত দিন যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোকে ভেঙে কেন্দ্রীয় শাসনের নীল নকশা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। যেমন জিএসটির ক্ষেত্রে বিষয়টা হল ‘এক দেশ-এক বাজার-এক ট্যাক্স’। একইভাবে নির্বাচনী ব্যবস্থার সংশোধনী আনা হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য নির্বাচনী সংস্কারের দাবিটি নিয়ে প্রথম অ্যাপ্রোচ পেপার প্রকাশ করে নীতি আয়োগ। পরিষ্কার বলা হচ্ছে ‘এক দেশ-এক নির্বাচন’। আগামী দিনে ভারতে যাতে এক রাষ্ট্রপতি-নির্ভর শাসনব্যবস্থা কায়েম হয় তার জন্য ইতিউতি আলোচনা শুরু হয়েছে। একইভাবে গণবণ্টন ব্যবস্থার জন্য ‘এক দেশ-এক রেশন কার্ড’, বিদ্যুতের ক্ষেত্রে ‘এক দেশ-এক গ্রিড’ চালু করার কথা বলা হচ্ছে।

উপসংহারের বদলে

‘এক ভারত’ সম্পূর্ণভাবে এক রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডা। সরকার যতই প্রশাসনিক ও আর্থিক সুবিধার কথা বলুক না কেন, আদতে বিজেপির লক্ষ্য আঞ্চলিক বৈচিত্র্য, স্বাভিমান, সংস্কৃতি, ভাষাকে ধ্বংস করে অভিন্ন এক দেশ তৈরি করা যা হবে ‘হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান’-এর প্রায়োগিক মডেল। এই ব্রাহ্মণ্যবাদী ব্যবস্থার অভিশাপ বর্ণব্যবস্থাকে মান্যতা দিয়ে এই প্রকল্প সংরক্ষণকে অস্বীকার করবে, সংখ্যালঘুর প্রতি তার কোনও দায় থাকবে না, কারণ সে বিশ্বাস করে সংখ্যালঘুরা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক। তাত্ত্বিকভাবে বিশ্বায়নী বাজারব্যবস্থা বিকেন্দ্রীকরণের পক্ষে, কিন্তু এই মডেলে যেহেতু এক বাজার-এক ট্যাক্সের কথা উচ্চকিতভাবে আছে তাই কর্পোরেট পুঁজিও বিজেপির এই কর্মসূচিকে স্বাগত জানাবে। আর চিন্তার বিষয় হল সংসদীয় রাজনীতিতে আর যে দলের সর্বভারতীয় অস্তিত্ব আছে সেই ভারতের জাতীয় কংগ্রেসও কেন্দ্রীকরণের বিরুদ্ধে কোনও নীতিগত অবস্থান নিতে পারবে না। বিজেপির মতো তাত্ত্বিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধী তারা না হলেও, বিগত সময়ে তাদের অবস্থান আমাদের জানা। সবচেয়ে বড় কথা হল এই ‘এক ভারত’ মডেলে যে কর্মসূচিগুলি আনা হচ্ছে তাতে জনমোহিনী একটা আবরণ আছে। যেমন রেশন কার্ড হলে দেশের যে কোনও জায়গায় রেশন পাওয়া যাবে, অনেক করের বদলে একটা কর চালু হলে সবার সুবিধা হবে, ইত্যাদি। কিন্তু এই প্রকল্প প্রজাতন্ত্র হিসাবে আমাদের অস্তিত্বকেই বিপন্ন করবে। এই ভাবনাটাই আলোচনার বৃত্তে আজ ফিরিয়ে আনাটা জরুরি।


[1] Bunch of Thoughts. p. 180

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3545 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...