চৈতন্যের নীরব উন্মাদনা

রোমেল রহমান

 

লোকগুলো জড়ো হয়ে পরামর্শ করে। আমাদের এইসব দৃশ্য চেনা। আমরা জানি এলাকায় এইরকম যখন হয় তখন বুঝতে হয় যে, কোনও একটা ঘটনা প্যাঁচ খায়া গেছে এবং তা নিয়া সালিশে বসছে মুরুব্বিরা। কিন্তু আইজ আমরা দেখি আমাদের মাঝবয়সি এবং যুবকশ্রেণির ভাইয়েরা ঘোঁট পাকায়ে আছে। এবং তাদের আলাপের উত্তেজনা দেখে আমাদের মনে হয় যে বিষয়টা জটিল এবং গুরুতর। ফলে আমরাও ড্রেনের পাশের কালভার্টে হাঁটু ভেঙে বসি। মৃণালকাকার পোলা গণেশ আসে। গণেশরে জিজ্ঞাস করি, কী হইসে? সে কয়, আমিও জানি না। ফলে গণেশও আমাদের সঙ্গে হাঁটু ভেঙে বসে এবং একটা কাঠি দিয়ে দাঁত খুঁচাতে থাকে আর বলে, পিনুভাইরে নিয়া কেস হইসে নিকি? আমাদের অন্য কেউ বলে, কী কেস? পিনুভাই তো আমআদমি, কোনও ঘাই-ঘিচিংয়ের মইধ্যে নাই। তখন শওকত আসে। শওকত তার মাফলারের প্যাঁচ ঠিক করতে করতে বলে, কাম সারছে। পিনুভাই পুরা ফাঁপরে। তখন আমরা বলি, কী হইসে পিনু ভাইয়ের? শওকত বলে, যা হইসে তার আগামাথা নাই। তয় পিনুভাইয়ের মতন নির্বিবাদ আদমি এইবার পুরাই ঘের খায়া যাবে মনে হয়। আমাদের অন্যজন বলে, আরে বাল কী হইসে সেইটা ক! শওকত বলে, সেইটা এখনও ক্লিয়ার না। তয় এম্পি সাব আসতেছে শুনলাম। ফলে আমরা বুঝতে পাই বিষয়টা জটিল এবং ঘোরতর জটিল। পিনুভাই হইল পিনুভাই। রাত তিনটার দিকে কেউ যদি ফোন দিয়া বলে, পিনু আমি তো গেছি গা, জলদি হাসপাতালে নেও আমারে। তখন অন্য কেউ না এলেও পিনুভাই ঝাঁপায়ে পড়বে। ঝড়ের দিন হোক আর পৌষ মাসের হিম হোক পিনুভাই হাজির! রঙ্গনআপার সাথে পিনুভাইয়ের লাভ ইস্টোরি এলাকায় এখনও মিথ। কিন্তু একদিন মাস্টারবাড়ির মেয়ে রঙ্গনআপা, যিনি লম্বা বেণী করে কলেজে যেতেন আর নিচু স্বরে কথা বলতেন, সেই রঙ্গনআপারে তার চাচা এখলাস মাস্টার এক বিদাসি পাত্রের হাতে পাত্রস্থ করে বিদাস বিদায় করে দিয়া পিনুভাইরে বিরহের দরিয়ায় ভাসান দিয়া দেন। ফলে পিনুভাই তার পৈতৃক বাড়িতে এক শরবিদ্ধ নিভৃতচারী গল্পকারের জীবন যাপন করতে থাকে। পিনুভাইয়ের এই গদ্যশিল্পী প্রতিভা ছড়ায় না। কেননা সে গল্প প্রকাশ করে না। তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু সুবিমলদার কাছ থেকে আমরা জানতে পাই যে পিনুভাই শক্তিমান গদ্যশিল্পী। ফলে আমাদের যার যার পিনুভাইয়ের বাসায় যাওয়ার সুযোগ হয়েছে তারা জানি যে পিনুভাইয়ের বাড়িভর্তি বই। এবং তার নিঃসঙ্গ জীবনকে ঘিরে যেন হাজার হাজার বইয়ের চরিত্ররা ঘোরাফেরা করে। ফলে কেউ যখন পিনুভাইরে বলে একটা বিয়া কইরা ফেলো, পিনুভাই বলে, এখন আর দরকার নাই। চারদিকে হাজার হাজার গল্প। আমার গল্পটা এইরকমই শেষ হোক! ফলে এই কিসিমের উত্তরে প্রশ্নকারী পাল্টা প্রশ্ন করতে পারে না, ফলে তার একার জীবন একাই কাটতে থাকে। এবং একে একে তার বাবা-মা মারা গিয়ে তাকে যথার্থই নিঃসঙ্গ করে ফেলে যান। এবং তার একমাত্র বইন যার বিয়া হইছিল অনেকদিন আগে দেশের অন্য কোনও দূরবর্তী শহরে, যে হয়তো দুই বছরে একবার আসে তার ভাইকে দেখতে। ফলে পিনুর জীবনের শূন্যতা কাটে সকালে কলেজে যাওয়ার পথে ফারুকের দোকানে এক কাপ চা খাইতে খাইতে কারও সঙ্গে আলাপ করে কিংবা কোনও কোনও বিকালে সন্ধ্যামণি লাইব্রেরিতে এসে। তবে পাড়ার ছেলেমেয়েরা তারে ভীষণ পছন্দ পায়। এবং তার সময়ের বন্ধুরা তাদের প্রত্যেকের পারিবারিক অনুষ্ঠানে গুরুত্বের সঙ্গেই তার উপস্থিতি কামনা করে। এবং পিনুভাই সেইসব অনুষ্ঠানে যায়। তার মিতবাক স্বভাব এবং গুরুগম্ভীর লুকের ভেতর কোথায় যেন একটা ভীষণ অটল ভালোমানুষি আছে। যদিও পিনুভাই ধর্মকর্মের আচার পালন করে না যা নিয়া পাড়ার মুরুব্বিরা এক সময় পেরেশান ছিল। কেননা আমাদের এইসব পাড়ার লোকেদের, বিশেষ করে মুরুব্বিদের, অন্যের পোলামাইয়ার ব্যাপারে মাথাব্যথার দোষ আছে। ফলে কিছুদিন পর তারা টের পায় পিনুর লাইন আলাদা, তারা জোর করতে গিয়েও করতে পারে না কেননা পিনুর মরহুম বাবা একজন ক্ষমতাবান আদমি ছিলেন। ফলে শহরে তাদের অনেক শক্তিশালী লোকেরা কদর করে। ফলে মুরুব্বিরা পিনুরে ঘাঁটায় না। কিন্তু কিছুদিন পর রাষ্ট্রযন্ত্রের চালকের পরিবর্তন আসে এবং নয়া চালকদের আশকারায় অলিগলিতে সহস্র নতুন পতঙ্গের জন্ম হয়। এবং শহরে ডেভলপার বা বিল্ডার্স নামক প্রজাতিদের হাওয়া লাগে। যারা কিনা পুরানা বাড়ি ভেঙে নতুন নতুন দালান বানায়ে বাণিজ্য করে। দেশের রাজনৈতিক বদলে একদল লোক তৈরি হয় যারা আদিতে পাত্তা পাইত না কিন্তু ফাটকা টাকার জোরে আর দলের দালালি লিয়াজুগিরি করে আমান্দা টাকার বা ক্ষমতার অংশ হয়ে ওঠে। এইসব বেহুদা লোকেরা যারা পাড়ার মুরুব্বিদের মানে না আর যেইখানে সেইখানে দাঁড়ায়ে বিড়ি ফুঁকে কিংবা মেয়েছেলে হাইটা আসতে দেখলে বাইক থামায়া ড্রেনের পাশে দাঁড়ায়া মোতারে পৌরুষের অংশ মনে করে, সেইসব লোকেদের কেউ কেউ পিনুভাইরে বলে, জমি ডেভলপারদের দিয়া দিতে। সে একা মানুষ একটা বড় ফ্লাট নিয়া থাকবে ঝিম মাইরা আর ভাগের অন্য ফ্লাটগুলার ভাড়া তুলবে। কিন্তু পিনুভাই রাজি হয় না। তখন তারা কেউ কেউ পিনুভাইরে প্রেশার দেয় এই বইলা যে, দেখো জমি দিয়া দেয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ, নাইলে আবার অন্য লোকেরা যদি ফাইলে ফেলায়া নিয়া নেয় তখন কিন্তু বিপদ হবে। তাছাড়া তোমাগর পাশের বাড়িটা হইল শত্রুসম্পত্তি। শুনা যায় তোমাগর এই জমিনও আছিল আংশিক ওর ভিত্রে। এইগুলান সমস্যা না, আবার সমস্যাও! ধরো, এইসব জিনিস যদি জাগে তাইলে তুমি সামলাইতে পারবা না। ফলে পিনুভাই তার ত্যাড়া ঘাড় উঁচিয়ে বলে, পাশের জমি শত্রুসম্পত্তি, এইটা কে বলল? তোমরা কি ঐটা দখলের ধান্দা করতেছ? ফলে ওইসব দলের দলালেরা প্রেশার খায়। পিনুভাই তাদের কাউরে কাউরে বলে, কোর্টকাচারি হলে আমি কোর্টকাচারিতে গিয়া সমস্যার সমাধান করব। তোমরা তো কেউ পড়ালেখাটাও ঠিকঠাক জানো না, আমি নিশ্চয় তোমাগর চাইয়া বেশিই বুঝব? ফলে তারা অপমান বোধ করে এবং বলে, পড়ালেখা দিয়া কি আর সব কিছু হয় পিনুভাই, ক্ষমতা; ক্ষমতা লাগে। এই দেশে কোর্টকাচারি মানে কার দড়ি কত শক্ত। ফলে পিনু বলে, আমি শিকল। তোমাগর মতন ভাইসা আইসা কলাগাছ ধরা আদমি না। ফলে তারা চেপে যায়। এবং তাদের ভিড় কমে আসে। যদিও আমাদের সেইসময় ধারণা হয় এইসব বাজে দলবাজ দালাল শ্রেণির লোকেরা পিনুভাইরে নজরে রাখে। তারা তারে একটা সাইজ দিতে তক্কে তক্কে জিকির করে। ফলে আজ যখন আমারা দেখি আমাদের পাড়ার মুরুব্বিরা না, কিন্তু তার পরের জেনারেশন এবং তাদের পরের জেনারেশনের হারামজাদাগুলা এক জায়গায় বিরাট হাউকাউ করে এবং যখন জানতে পাই— সেই হাউকাউ পিনুভাইয়ের মতন মানুষরে নিয়া তখন আমাদের খারাপ লাগে; চিন্তা হয়। ফলে আজমল আসে এবং সে বলে, পিনুভাইর পাশে কেউ নাই। লোকটা একা পইড়া গেছে। ফলে আমাদের একজন বলে, খানকির পুতগুলার চেহারা দেখছস? আমাদের কেউ একজন বলে, কারা? তখন সে বলে, ঘোঁট পাকায়ছে যেইগুলা।

ফলে তখন এক ঝাঁক মোটরবাইকের বুম বুম আওয়াজ হইতে থাকে, এবং শত শত হর্নের আওয়াজ এলাকাটা পুরা নরক বানায়া ফেলায়। তখন আমাদের সবার মনের মধ্যে আতঙ্ক ভর করে। পাড়ার মহিলা পুরুষেরা প্রত্যেকের জানালার পাশে, বারান্দার গ্রিলের পাশে এসে দাঁড়ায়। ফলে মোটরবাইকের হেডলাইটের আলোয় আচমকা গলির আবছায়া জ্বলেপুড়ে ছারখার হয়ে যায়, যেন তীব্র সার্চলাইটের আলোতে থতমত দাড়ায়ে থাকে পিনুভাইয়ের একতলা বিরাট বাড়িটা। এম্পি এসে পৌঁছায় না তখনও। ফলে স্থানীয় নেতা আর তাদের ক্যাডারেরা কেডস পায়ে টিশার্ট-জিন্স মোড়কে, হাতে অষ্টধাতু ব্রেসলেট লুকে মোটরবাইক থেকে নামে। যেন বিরাট দায়িত্ব তাদের কান্ধে, সেই দায়িত্ব উদ্ধারে তারা নাজেল হয়েছে। যেন তারা দখল হয়ে যাওয়া চর উদ্ধারে তৎপর। প্রথমে তারা কিছুক্ষণ গোল হয়ে থাকে। জটলার ভেতরের লোকগুলান তাদেরকে পুরা কাহিনি বয়ান করে আর তারপর ক্রমে বৃহৎ জটলার মধ্যে গুঞ্জন বাড়তে থাকে এবং সেই গুঞ্জন থেকে একজন কেউ চিৎকার দিয়ে বলে, অই শুয়োরের বাচ্চা পিনু বাইর হ। ফলে আমাদের বুকের মধ্যে ভয় ভর করে। তারা আবার চিৎকার দেয় এবং তাদের আরও অনেকে চিৎকার হুঙ্কার দিতে থাকে পিনুভাইয়ের জ্ঞাতিগুষ্টির নাম জপে। ফলে ফস করে পিনুভাই তার পাজামার উপর শার্ট পরা, চোখে কালো ফ্রেমের মোটা চশমার লুক নিয়ে গেট ঠেলে বের হয়। এবং কোনও প্রশ্ন করার আগেই সন্ত্রাসীদের দঙ্গল হায়েনার মতো তার উপর ঝাঁপিয়ে পরে বলতে থাকে, ধর্ম নিয়া টিটকারি দেও শুয়োরের বাচ্চা। নিজে নষ্ট, এহন পোলাপানগুলার মাথাও খাইতে চাও? মুহূর্তের ভেতর আলোকিত সেই ভিড়ের মধ্যে একটা উন্মাদনা নেচে ওঠে। ভিড়ের চারপাশে দাঁড়ানো সাধারণ অনেক লোক যারা দর্শকের ভূমিকায় ছিল তারাও মত্ততা বোধ করে। তারাও খ্যাপাটে ষাঁড়ের মতন ফোঁস ফোঁস করে। আর যখন উন্মাদনা থেমে যায়, এবং বাইকে চড়ে আসা সন্ত্রাসীগুলো বাইকে বুম বুম শব্দ তুলে তীব্র তীক্ষ্ণ হর্ন মেরে বাইরায় যেতে থাকে হেডলাইটের আলোক নিয়ে, তারপর আমরা দেখি পাড়ার পরের পোলার পোন্দে লাগা মুরুব্বিরা পুলিশে ফোন দেয়। পুলিশ আসে যখন তখন আমরা জানতে পাই তারা একটা এম্বুলেন্সে করে পিনুভাইয়ের মৃতদেহ হাসপাতালে নিয়ে যায়। ফলে আমরা আচমকা এই ঘটনায় সন্ত্রস্ত হয়ে যাই এবং পরের দিন আমরা বিকালবেলায় যখন পরস্পরের সঙ্গে মিলিত হই, সবাই সবাইরে একটাই প্রশ্ন জিজ্ঞাস করি, পিনুভাই কী কারণে মরল? পেপারে তো আসছে, ধর্মীয় অনুভুতিতে আঘাতের অপরাধে স্পর্শকাতর জনতার গণপিটুনিতে একজন নিহত। ফলে আমরা জিজ্ঞাস করি, কোথায় কারে কী বলছিল পিনুভাই? একজন বলে, ফারুকের চায়ের দোকানে চা খাওয়ার সময় নাকি কী আলাপ করতেছিল কার সাথে ধর্ম নিয়া। ফলে আমাদের কেউ কেউ বলে, কে শুনছে সেইটা? একজন বলে, শুনছে শুনছে। তখন অন্য কেউ বলে, কেডা সে যে শুনছে? তখন আগেরজন বলে, আছে আছে শোনার লোক আছে! ফলে অন্য কেউ বলে, কিন্তু যারা তার সালিশ করল তারা তো সব নষ্ট লোক। আগেরজন বলে, নষ্টরাই আইজ সব কিছুর জিম্মাদার।

 

১১/১১/২০১৭

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4046 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...