ইটস টু উইকেটস ডাউন, মেটস

সিসিফাস

 

 

ম্যাকগ্রাথ ফাউন্ডেশন দিয়ে হেঁটে আসছে একটা লম্বা লোক। চুলে রুপোলি বদল। বয়স। দেওয়ালে জেনের ছবি। পাশে সারা, জেমস, হলি, ম্যাডিসন। নিউ সাউথ ওয়েলসের ক্রনিউলা টাউনের ঘরের বারন্দায় বসে সবুজ পিচের আলো লেগে চোখ চকচক করে। ওখানে এখনও বল ফেলতে পারবেন? যেভাবে পারতেন ওইসময়? মার্টো, পান্টার, চার্চি, রয়, ব্রেট, মাইক, জাস্টিন— সেই দল। চকচক করে ওঠে গ্লেনের মুখ। জেনের ছবি। সেই ২০০৮। ঠোঁট ছোঁয়ানো ওর সেই বুক কীভাবে এত শত্রু হয়ে গেল হঠাৎ! ক্যান্সার, ক্যান্সার, ক্যান্সার। চারদিকে এত অসুখ কেন? এত দুর্ঘটনা কেন? জেনের বান্ধবী ট্রেসিকে নিয়ে মাঝে মাঝে সেইসব দিনের রোমন্থন। জেনের সম্মানে পিঙ্ক ডে টেস্ট। ম্যাকগ্রাথ ফাউন্ডেশনে ফ্রি ব্রেস্ট কেয়ার ট্রিটমেন্টের চ্যালেঞ্জ ছুঁয়ে কিছুটা হলেও ম্যাচটা জেতা দীর্ঘদেহী মানুষটার শরীরে পরিষ্কার বয়সের রেখা, তবু ৫২-য় এখনও ওভারে দিব্যি দুটো করে বাউন্সার খুব কি অসম্ভব? পিচে একটা কয়েন ফেলে ওখানেই বছরের পর বছর ধরে বল ফেলা? উচ্চতা থেকে, বয়স থেকে এসব ভাবতে ভাবতে জলীয় হয়ে যান অসম্ভব শক্ত গ্লেন ম্যাকগ্রাথ। নিজের পা দেখতে পান না। কাঁপে। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার নরম, ইনসিকিওর মাটিতে কাঁপে। কাঁধে হাত রাখে সারা। স্ত্রী, বন্ধু। কেউ থাকে। কেউ চলে যায়। আজও, এই কিছুক্ষণ আগেও। কয়েকটা মাসের ব্যবধানে। কামারাদেরি, টিমমেট। গ্লেন ম্যাকগ্রাথ পিচ থেকে ওই কয়েনটা তোলেন না।

গিলক্রিস্ট টেক্সট মেসেজটা দেখছিলেন। এখনও ফোনে থেকে গেছে। ডিলিট করা সম্ভব? রড চলে গেলেন মার্চের শুরুতে। ইন্সটাগ্রামে ভয়েস ওভার দিয়ে ব্যক্তিগত একটা ট্রিবিউট। টুইটারেও। আর তারপর ওয়ার্নির টেক্সট। চার্চি, ওয়ান্ডারফুল ট্রিবিউট টু রড মার্শ। সেই চার্চি। খেলা ছাড়ার পর, উইকেটের পেছনে দীর্ঘ যুগের ‘বোলিং শেন’ উচ্চারণের রিটায়ারমেন্টের পর এখনও সেই ডাক— চার্চি। একা ওই রেখে দিল। তারপর রডের চলে যাওয়া। সমসাময়িক না, সিনিয়র অনেক। তবু, ব্যাগি গ্রিন। মাই অস্ট্রেলিয়া। রডকে ভোলা যায়? ওই মানুষটাকে, ওই বন্ধুত্ব, ওই গ্লাভস ভোলা যায়? আর তাই ওই ট্রিবিউট। চার্চি, ওয়ান্ডারফুল ট্রিবিউট টু রড মার্শ। ওয়েল ডান অন দ্যাট স্যার…। তার আট ঘন্টা পর খবরটা। থাইল্যান্ডের হোটেল। তারপর কালকের কুইন্সল্যান্ড। টাউন্সভিল। থিঙ্ক অফ ইওর মোস্ট লয়্যাল, ফান, লাভিং ফ্রেন্ড হু উড ডু এনিথিং ফর ইউ। দ্যাটস রয়…। রাতের ঘুমের ভেতর থেকে মনে হচ্ছে আজ কে যাবে, কে। গিলক্রিস্ট বিড়বিড় করে বলছেন দ্যাট হার্টস…

ছেলেটার কথা মনে পড়ছে রিকির। ফ্লেচার। ছ সপ্তার সময় মেনিঞ্জিটাইটিস। আইসিইউ। আট মাস পর হার্নিয়া সার্জারি। আবার আইসিইউ। তখন ক্রিকেট নেই। তখন পাশে জাপটে ধরা ওইসব মুখগুলো নেই। তখন শুধু রিয়ানা। ও অঝোরে কাঁদছিল। রিকির শুকনো মুখ। চলে যাবে ফ্লেচার? ব্যাগি গ্রিন। লড়াই। স্লগ ওভারের লড়াই। পঞ্চাশ ওভারের শেষ বল অবধি লড়াই। নিরানব্বইয়ের সেমিফাইনালের লড়াই। ইয়েস…। ফ্লেচার ফিরে এল। পন্টিং মুহূর্ত ধরে রাখতে পারেন। তারপর বিসিসিআই, অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট বোর্ড যোগাযোগ করল। নাহ, ঘরোয়া আইপিএল অবধি সম্ভব, সিরিয়াস আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আর না। রিয়ানাকে সময় দিতে হবে। ফ্লেচারকে সময় দিতে হবে। দুই মেয়ে, এমি আর মাতিসকে সময় দিতে হবে। শরীর, শরীর, শরীর। ইন্ডিয়ার স্পিন ট্র্যাকের চেয়েও ভয়ঙ্কর। একটু এদিক ওদিক হলেই স্ট্যাম্প ছিটকোবে। এই তো সেদিন সকালে এমি আর মাতিসকে নিয়ে নেটবলের দিকে যাচ্ছিলেন রিকি। রিয়ানা টেক্সট মেসেজ দেখাল। থাইল্যান্ড থেকে আসা একটা খবর। বিশ্বাস করতে পারলেন না। এখনও কি পারছেন? আই উড সে জাস্ট হাউ মাচ আই লাভ হিম। আর একবার যদি দেখা হত, আর একবার। আই ডিডন’ট সে দ্যাট টু হিম অ্যান্ড আই উইশ আই ডিড…। পান্টার ডাকনামটাও ওয়ার্নিরই দেওয়া না? টাউন্সভিলে রয়ের গাড়িটা উল্টে গেল। ভেতরে নিস্পন্দ রয়। গাড়ি থেকে তখনও বাজছে রয়ের ফেভারিট কান্ট্রি ফোক। ওর অ্যাবরিজিন আদিম কালো চকচকে জেদ, উচ্ছ্বাস, এক্সট্যাসি। ওর জড়িয়ে ধরার গন্ধ। ওর হাতের আরাম। ইফ রয় শুক ইওর হ্যান্ড ইউ হ্যাড হিজ ওয়ার্ড, দ্যাটস দ্য শর্ট অফ ব্লোক হি ওয়াজ অ্যান্ড দ্যাটস হোয়াই আই অলওয়েজ ওয়ান্টেড হিম অন মাই টিম…

শরীর নিয়ে কথা হচ্ছিল। স্ত্রী লিনেটের দুবার স্ট্রোক। ২০০৬, ২০২০। আর সেই কুড়িতে প্রিন্স অফ ওয়েলস প্রাইভেট হসপিটালে কী অসম্ভব যন্ত্রণার সেইসব দিন। আইসিইউতে দশ দিন। শরীরের সমস্ত নার্ভকে অ্যাটাক করল। দেড় বছরের লড়াই। আঃ, সেরে উঠল লিনেট। পাশে বছর পঁচিশের মেয়ে রোজি, আঠারোর লিলি আর একুশের অস্টিন। আর সবার আগে ছাপ্পান্ন-ছোঁয়া স্কিপার। ওয়া, স্টিভ ওয়া। লিনেট দেখেন, মানুষটা ওয়ার্নির প্রসঙ্গেই চুপ। কেন, তাও জানেন। লিনেটের বিশ্বাস লাভ-হেট-এর ভেতর তীব্রভাবে দোলা সম্পর্কটার শরীরে কোথাও একটা ভয়ঙ্কর প্যাশন আছে। গত পাঁচ মার্চ সেই প্যাশন থেকেই বেরিয়েছিল কথাগুলো, টু মেনি মেমোরিজ অ্যান্ড মোমেন্টস দ্যাট উইল নেভার বি ফরগটেন। ইট ওয়াজ এ প্লেজার টু প্লে অ্যালংসাইড ইউ…। মানুষটা সারাদিন মুখে নিল না কিছু। কিছুই…

এইসমস্ত কথাগুলো, মুহূর্তগুলো, বয়সগুলো ব্যাগি গ্রিনে লেখা আছে। গাব্বা, পার্থ, সিডনি, কিংবা গ্লোবের একটু দূরে, জোহানেসবার্গ, কেপটাউন, জামাইকা— অথবা লাস্ট ফ্রন্টিয়ার ইন্ডিয়ার স্পিনিং ট্র্যাক। পরপর ষোলো। এক প্রজ্ঞার ছেড়ে যাওয়া সাম্রাজ্য কলার তুলে রাজ করা আরেক প্রজ্ঞা, আথলিট, পুলমাস্টার। দিল্লি ক্যাপিটালসে কোচিংজীবন। সেই চকচকে লাল বল, সেই মুখগুলো, সেই টিমমেটস, মার্টোর সঙ্গে জুটি, সেই আগুনে বোলিং— কোথায় ম্যান? কোথায়? ক্রিকেট থেকে অনেকটা দূরে ডেমিয়েন মার্টিন। কুইন্সল্যান্ডের সমুদ্রসৈকতে সোশ্যাল মিডিয়ায় দেওয়া পোস্টে চেনা যায় না মানুষটাকে। আনসাং হিরো। শোয়েব আখতার যার সম্পর্কে বলছিলেন, দ্য গ্রেটেস্ট অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটসম্যান আই হ্যাভ এভার ফেসড, হি মেড মি লাইক অ্যান অর্ডিনারি বোলার।

অথবা ল্যাঙ্গার, মাটি কামড়ে পড়ে থাকা হাসিমুখের জাস্টিনের সবকিছু এভাবে ভুলে গেল ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া। পাশে দাঁড়ালেন গ্লেন, ম্যাথিউ, মার্টো, পান্টার, মাইক হাসি। একান্ন পেরোনো ওপেনারের মুখে স্মিত হাসি— আই সিট হিয়ার ফিলিং রিয়েলি কন্টেন্ট। ভেতরে জ্বালা। মাত্র ছ মাসের কন্ট্যাক্ট ধরিয়ে দেওয়ার অপমান। ছুড়ে মারা রেজিগনেশন লেটার। পান্টার বললেন— এ স্যাড ডে ফর অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট। স্ত্রী কাইলির সঙ্গে সম্পর্ক ভাঙা, আবার গড়া— লাভ-হেটে দোলা মাইকেল ক্লার্কের মুখেও বয়স। নিজের জীবনের পরিধির কঠিন, বিষাক্ত চৌকাঠের চেয়েও অনেকটা নিচু, কম অবিশ্বাসী ছিল সাবকন্টিনেন্টের স্পিনিং ট্র্যাক, চার পাঁচ নম্বরে নেমে হাল ধরার সেইসব গোল্ডেন ডেজ। সেই মাইকেল ক্লার্কও বুড়ো হচ্ছেন।

একটা ঘর, ভেঙে গেছে বহুদিন। বাসিন্দারা কেউ বুড়ো, কেউ অকালপ্রয়াত, কেউ সেইসব দিন থেকে অনেক দূরে। রোমান স্টয়েক দার্শনিক সেনেকার সেইসব কথাগুলো— হি ওয়াজ ডুইং এভরিথিং পসিবল, বাট দ্য হাউস ওয়াজ ওল্ড…

অস্ট্রেলিয়ান ফোক-কান্ট্রি সিঙ্গার জন উইলিয়ামসনের ট্রু ব্লু। হে, ট্রু ব্লু, ডোন্ট সে, ইউ হ্যাভ গান/ সে ইউ হ্যাভ নকড অফ ফর আ স্মোকো/ অ্যান্ড ইউ’ল বি ব্যাক লেটার অন…

ওয়ার্নি। অ্যান্ড্রু। ইটস টু উইকেটস ডাউন, মেটস। কিপ অন লিভিং…

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3842 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...