লেখা নিয়ে কথা: একটি সূচনা

একটি আলোচনা

 

কথা বলেছেন: তপন পালিত, তরুণ ব্যানার্জি, দেবজ্যোতি চক্রবর্তী, পিয়ালী সেন, প্রবীর লাহিড়ী, মলয় দাশ, শ্যামলতরু মুখোপাধ্যায়, সুব্রত সেন, সৌম্য চট্টোপাধ্যায়; সংযোজনা: কৌশিক দত্তশর্মা

বাংলাভাষায় প্রকাশিত লিটল ম্যাগাজিনের বিপুল বৈচিত্রময়তা ও ঐতিহ্যের মধ্যে ‘মানুষের বাচ্চা’ এক ব্যতিক্রমী কাজ। স্বল্পায়ু এই পত্রিকার মাত্র পাঁচটি সংখ্যা বেরিয়েছিল আশির দশকের শেষে ও নব্বইয়ের গোড়ায়। সেসময় সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটেছে। বামপন্থী শিবিরে মানুষজন আহত, হতভম্ব, বিরোধী শিবির উল্লসিত। ঠিক এই সময় ‘মানুষের বাচ্চা’ সুব্রত সেনের সম্পাদনায় মেরুদণ্ড সোজা রেখে নিজের কথা বলেছিল, সুস্পষ্ট ঘোষণা করেছিল যে লেখালেখি পুরোমাত্রায় একটি রাজনৈতিক কার্যকলাপ। এই পত্রিকাটির শেষ সংখ্যা থেকে একটি কথালাপের অংশবিশেষ প্রকাশ করা হল, পূর্বসূরিদের সম্মান প্রদর্শন ও নতুন প্রজন্মকে বলিষ্ঠ পত্রিকাটির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে।
‘মানুষের বাচ্চা’ পত্রিকার প্রচ্ছদ, প্রথম পাতা এবং শেষ সংখ্যার সূচিপত্র

বা ঠিক সূচনাও নয়, সূচনার প্রস্তাব: লেখা নিয়ে কিছু কথা ফের লিখে ছেপে রাখা গেল, এই পর্যন্ত, আদৌ কোন গুরুত্ব আছে কি না তার বা হবে কিনা বোঝার মত নিজস্ব জ্যোতিষ/ গোয়েন্দা আমাদের নেই; নেই, কারণ আমরা চাই না; নেই, কারণ সন্দেহ ঘোর ও গভীর এবং তা যুগপৎ বক্তব্য ও বিষয় সম্পর্কে। এমন আন্দোলন কি ঘটানো সম্ভব, যে খোঁড়াকে টানার জন্য সাতঘোড়ার রথ পাঠালে প্রথমেই সে সারথি ও সাতঘোড়ার অধিকারকে চ্যালেঞ্জ জানাবে?

আকাশ ভাঙ্গছে, আশার রঙিন (বা নিরাশার কালো) ছাতা খুলে মাথা বাঁচানো যাবে?

কতিপয় মুমূর্ষু লেখকের কতিপয় মরণশীল ধ্বনিসজ্জা কতিপয় মরণ অবোধ চোখ ও কানের কাছে সমর্পণ করা ছাড়া এই কালিতে ছোপানো ইকড়িমিকড়ি শুকনো পৃষ্ঠাসমূহের আর কোনও ভূমিকা নেই, ও যখন সমর্পণের অর্থ এস. ও. এস, এবং যখন জীবনধারণের যোগ্যতা নির্ধারক পরীক্ষায় আমরা অনায়াসে উত্তীর্ণ হতে পারব সে আশা ক্ষীণ।

বস্তুত, আজ, প্রতিটি কথার পিছনের কথাটা হোল: মৃত্যু কত দূরে?

কেন লিখি?

 

সৌম্য: আমি মূলত কবিতা লিখি— তা লেখার সময় আমার মনে হয় অন্যান্য কবিতা যা আমরা দেখি তার চেয়ে আমরা অন্যরকম ভাবে লেখার চেষ্টা করছি— সেটা— আমি যখন লিখতে বসি তখন প্রথমেই একটা কথা কিন্তু আমি মাথার মধ্যে নিয়ে নিই যে আমি যেভাবে লিখবো সেটা ঠিক মানে যে ধরনের লেখা আমরা দেখি বা পড়ি সেরকম নয়— এটা কিন্তু মাথার মধ্যে নিয়ে নিই।

আমি লেখার সময়— প্রিলিমিনারি ব্যাপারগুলোয় আমি যাচ্ছি না— ছন্দটন্দ ইত্যাদি— সেগুলো তো থাকবেই— আবার কখনো নাও থাকতে পারে— তা নিয়ে অন্তত আমি মাথা ঘামাই না— আমি চেষ্টা করি কবিতার— যে ধরনের কবিতা লেখা হয়— তার যে টেক্সট— এই টেক্সটের বাইরে একধরনের টেক্সট তৈরি করা— সেটা আমি এইভাবে আনার চেষ্টা করি যে যে ব্যাপারগুলো তথাকথিত শিল্পসাহিত্যের বিষয়ের মধ্যে পড়ে না— যেমন জিওমেট্রি ইকনমিক্স ফিজিক্স— আরো এধরনের নানারকম জিনিস— সেইগুলো নিয়ে আসি। ধর ফিজিক্সের কোন একটা জিনিস পড়ছি— আমার পড়ার সময় মনে হল এই যে মানেটা দাঁড়াচ্ছে এই মানেটা আমি যে কবিতা লিখছি তার মধ্যে আনা যায়— সিমিলারিটি— মানে এই মানেটা না হলেও এই ধরনের মানে তৈরি করা যায় আনা যায়।

মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে একটা টেক্সট তৈরি করা যেটা সম্পূর্ণ আলাদা— হয়ত এখনও ঠিক লিখতে পারছি না বা বোঝাতে পারছি না সেইজন্য আমার লেখা থেকেও ঠিকভাবে বেরিয়ে আসছে না— এটা তো খানিকটা সময়সাপেক্ষ ব্যাপারও বটে— এখনও তো সে জায়গায় নিজেও আসিনি— তো চেষ্টাটা অবশ্যই প্যারালালি পাশাপাশি একটা টেক্সট তৈরি করা।

দেবজ্যোতি: মোটামুটি যেটা করতে চাইছ সাহিত্যের বাইরের বিষয়গুলো নিয়ে এসে প্যারালাল একটা ট্রেন্ড তৈরি করতে চাইছ?

সৌম্য: ট্রেন্ড তৈরি করা টেক্সট তৈরি করা।

তপন: ট্রাডিশনাল সাহিত্যের মধ্যে নেই এমন কোন বিষয় নিয়ে আসা— আসল ব্যাপারটা হচ্ছে যে ট্রাডিশনাল সাহিত্য বলতে ঠিক কী বোঝায়— মানে ঠিক আমার আগে অবধি যে রাস্তাটা পেরিয়ে এসে এই চৌকাঠে পা রাখলাম পেছন দিকটার পুরো সময়টাকেই কী ট্রাডিশন ধরব না কি আলাদা আলাদা ভাবে কিছু ধরব— জাস্ট আমার আগে যে ঘটনাটা ঘটে গ্যাছে সেটা কি ট্রাডিশনের মধ্যে পড়বে— পুরোটাই ইতিহাস— নাকি ইতিহাস আর বর্তমানের মাঝখানে কোন একটা কমন জায়গা আছে?

দেবজ্যোতি: এই প্রশ্নটা তোমার আছে?

তপন: এই প্রশ্নটা আছে। সাহিত্যের বিষয় আসলে কী— এই ধরনের কোন ফার্ম জায়গা আছে কিনা এটাও আমার একটা সন্দেহ— বা ট্রাডিশনাল সাহিত্যে যে জিনিসটা ছিল সে জিনিসটার বাইরে এমন কোন জিনিস করা যাবে কিনা— এরকম কোন ব্যাপার এখনও আছে কিনা যা ট্রাডিশনাল সাহিত্যে ছিল না— অর্থাৎ যদি আমি আমার চৌকাঠের আগের অবস্থা অবধি ট্রাডিশন এরকম ধরি আরকি।

দেবজ্যোতি: মোটামুটি তোমার বক্তব্যটা কি এরকম যে ট্র্যাডিশন ব্যাপারটাই তোমার কাছে পরিষ্কার নয়?

তপন: হ্যাঁ। এরপর আরেকটা প্রশ্ন আসে যে সাহিত্যে আসেনি এরকম্ কোন বিষয় আর আছে কি? আর এ প্রসঙ্গে ধর লেখালেখির মধ্যে কোন জিনিসটা এলে সে ব্যাপারটা কেমন হবে? ব্যাপারটা নিশ্চয়ই তার সে জায়গাটা হারিয়ে ফেলবে— যেটা সে পার্টিকুলার সেই সাবজেক্টটার যে প্রেমিসটা সেটা হারিয়ে ফেলবে— লেখালেখির মধ্যে ঢুকে পড়বে অর্থাৎ তার একটা পার্টিকল হয়ে উঠবে— মানে এভাবেই লেখালেখিতে বিভিন্ন বিষয় আসে আরকি।

শ্যামলতরু: আমাদের লেখালেখি নিয়ে যদি বলা যায়— মানে হোয়াট ইজ অ্যান অথার বলে যে ব্যাপারটা— ক্রিয়েটিভ প্রসেসটার ওপরে নিয়ন্ত্রণ— সেটাই আসলে একজনকে অথার করে তোলে।

লেখালেখির ব্যাপারটাই আমার কাছে মনে হয় মেকি বানানো মিথ্যে জিনিস— লিটারেচার শব্দটা আমার কাছে অত্যন্ত ক্লিশে— তবু মানুষ যে লিটারেচর পড়ে নিশ্চয়ই অন্য কিছু আছে— মানুষ হয়ত মিথ্যে পছন্দ করে— মিথ্যে না হলে তার চলে না।

লেখালেখির সম্বন্ধে বিভিন্ন লোক বিভিন্ন ধরনের ধারণা দিয়ে থাকে— একজনের মতে এটা নাকি একধরনের ট্রানসফরমেশন অফ অ্যানাদার টেক্সট বা টেক্সট জিনিসটাই এমন যার কোন সেলফ আইডেন্টিটি— অরিজিন বলে কিছু হয় না— এণ্ড বলে কিছু হয় না— আর সৌম্য যে কথাগুলো বলল— লেখার মধ্যে যে ফিজিক্স দিল কি অঙ্ক দিল এগুলো আমার মনে হয় লেখার সময় আমার মাথায় বিশেষ কাজ করে না— ফিজিক্স নিয়ে আমার যদি কিছু করার থাকে তবে আমি ফিজিক্সই করব— কিন্তু শিল্পসাহিত্য— তাতে ফিজিক্স আসতে পারে— কিন্তু সেটা কমপ্লিটলি ডিফারেন্ট।

তাত্ত্বিক দিক থেকে লেখালেখি নিয়ে— যদি দেরিদাকে নিই— লেখালেখি সম্পর্কে যে কথাগুলো বলছে সেটা আবার দেখলাম টোডোরভ বলে একজন সে অন্য আরেকটা কথা বলছে— দুটো ডিফারেন্ট— বা আগে স্ট্রাকচারিস্টর যে কথাগুলো বলছিল সেগুলো অনেকটাই নিগেট করে দেওয়া হয়েছে— ব্যাপারটা পার্ট অফ লিঙ্গুইস্টিক কিনা— গেম থিয়োরী কিনা— এগুলো সমস্তই হচ্ছে লেখালেখির উপর লেখালেখি।

আর একধরনের ক্রিয়েটিভ স্পিরিট— যেটা সম্পূর্ণ আমার— আমার অর্থে বানানো আমার— তার সঙ্গে রিয়ালিটির কোন যোগাযোগ নেই— মানে আমার রিয়ালিটি— তা অন্যের রিয়ালিটি কিনা আমি জানি না— আমি যে জিনিসটা চেষ্টা করি— একটা লেখায় মগজ সম্বন্ধে একটা ধারণা দেবার চেষ্টা করেছিলাম— মগজের গঠন বা র‍্যাশনাল বীয়িং সম্বন্ধে যে লেখাগুলো আছে— ব্রেন সম্বন্ধে আমার যে ধারণা— এগুলো আমি লেখালেখিতে আনতে চাই না— এগুলো আমার সাবজেক্ট না— তাই যদি পারতাম তাহলে আমি ওটাই করতাম— লেখালেখি করতাম না— লেখালেখিটা কমপ্লিটলী ডিফারেন্ট।

মলয়: প্রথমেই যে ব্যাপারটা— সেটা হচ্ছে যে— প্রথমেই পুরো বডিটাকে চেঞ্জ করা— একদম ভেঙে দেওয়া— যেখান থেকে এত কথা আসে আর কি— প্রথমেই আমি চেষ্টা করি— হোল বডিটা পুরো স্ট্রাকচারটাকে ভেঙে দেওয়া— আর তাতে শব্দের ব্যাপারে খুব জোর পড়ে…

দেবজ্যোতি: তুমি কি কোন প্রিনসিপল মেনটেন কর?

মলয়: আমি প্রথমে যেটা— যে ভার্বগুলোকে নাউন হিসেবে ব্যাবহার করি— এটা আমার প্রথমদিককার লেখাতে— আবার ইদানিং দেখা যাচ্ছে আমার শব্দগুলো— যে মানে ধর শব্দ না দেখে আমি লিখতে পারি না— মানে আমাকে শব্দগুলো দেখতে হয় এবং দেখার প্রতিফলন আমার কবিতার মধ্যে থাকে— শব্দের গঠনটা লেখার সময় পাল্টে পাল্টে যায়…

সুব্রত: তুমি ভাঙতে গেলে কেন?

মলয়: আমি যেভাবে লিখতে চাই সেটা ট্রাডিশন নিয়ে লেখালেখি দিয়ে— সেটা বোধহয় আমি বলতে পারছিলাম না।

সুব্রত: ট্র্যাডিশনাল বলতে কী বোঝাচ্ছ?

মলয়: ট্র্যাডিশনাল বলতে ছন্দের ব্যাপারটা বলতে পারো— তারপর অলঙ্কার বলতে পারো— তারপর ভিস্যুয়াল ব্যাপারটা বলতে পারো— মানে আমি একটা শব্দকে একটা শব্দ হিসেবেই ব্যবহার করতে চাই— চেষ্টা করি আরকি— ফলে পুরো ব্যাপারটা আমাকে তলিয়ে ভাবতে হয়েছে।

সুব্রত: বাংলা ভাষায় কবিতা লেখার যে চল তা তোমার রিয়ালিটির বোধকে প্রকাশ করতে পারছে না এই কারণেই কি ভাঙলে, না কি ধরনটা চালু এই কারণেই তার উপর তোমার রাগ ছিল?

মলয়: সবগুলোই ছিল— প্রথমত ব্যাপারটা উদ্দেশ্যমূলক ছিলই— আমি নতুনভাবে লিখব— কোন একটা হ্যামারিং ছিলই— এটাই প্রথমে আসে— তারপর কেন ভাঙছি ভাবতে ভাবতে আরো চেঞ্জ হচ্ছে এরকম আর কি— এরকম বোধহয় বলা যায় না কোনটা আগে এসেছে কোনটা পরে।

সুব্রত: লেখালেখি ব্যাপারটাকে আমি শুধুই লেখালেখির স্তরে রেখে ভাবি না— সাহিত্য হচ্ছে কি হচ্ছে না সাহিত্য করছি কি সাহিত্য করছি না সে নিয়ে আমার একটা গোপন বেকুবি ছাড়া খুব কিছু মাথাব্যাথা নেই— বরং আমার কাছে ব্যাপারটা এরকমই যে লেখালেখি নামক ইনডেফিনিট জিনিসটাকে আমি কতটা পোলিটিকাল পারফরমেন্স— অ্যাকটিভ পোলিটিকাল পারফরমেন্সের দিকে নিয়ে যেতে পারি।

ট্র্যাডিশনাল সাহিত্যের কনসেপ্টটা একটা পোলিটিকাল কনসেপ্ট আর ট্র্যাডিশনাল সাহিত্য একধরনের পোলিটিকাল ডগমা— পোলিটিকস শব্দটা এই অর্থে ব্যবহার করছি যে কোন না কোন পাওয়ার কোন না কোন ভাবে বাকি ভয়েসগুলো ডমিনেট করছে— ক্ষমতার খেলা— যতরকম ভাবেই একটা সিস্টেমের মধ্যে ক্ষমতা তার খেলা দেখায় পোলিটিকস শব্দটা চলে আসে— সে অর্থে লেখালেখি ভিত্তিক যে ক্ষমতার খেলা চলে সেটা সবসময়েই অনুচ্চারিত থাকে— কখনোই তেমনভাবে আন্ডারলাইন করা হয় না— যখন লেখার বিষয় ব্যবহারিক রাজনীতি তখনো না— শাশ্বত নিরপেক্ষতার ছবি— ফলতই যেটা পোলিটিকালি আরো এফেকটিভ হয়ে ওঠে— ক্রুড রিপ্রেশনের বদলে সূক্ষ্ম আইডিওলজিকাল ইনভেনশন— ব্যাপারটা ইন্টারেস্টিং— আর তখন সাহিত্য নিউট্রাল— লেখা জিনিসটা নিউট্রাল— পড়া জিনিসটা নিউট্রাল— সেই নিউট্রালিটির ইল্যুসনটা ভেঙে যাচ্ছে— কী করে?— তার পুরোটা এভাবে বলা যায় না— কোন কমপ্লিট পিকচার আমার নেইও— তবে কিছু কিছু সিগনাল আছে— যেখানে বুঝি আমার এই এই জায়গায় আটকাচ্ছে— যে কথাগুলো শিখেছি সেগুলো স্বতঃসিদ্ধ বলে মেনে নিতে পারছি না…

 


*বানান অপরিবর্তিত

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3842 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...