সেই চাঁদের পাহাড়

অয়নেশ দাস

 

পূর্ব প্রকাশিতের পর

জলকন্যা ত্রুগানিনির কথা

ছোটবেলায় বৃষ্টি কি এখনের থেকে বেশি হত? আবহাওয়া আপিসের বছর-ফেরতা সেন্টিমিটার চার্ট দেখলে হয়তো জানা যাবে। কিন্তু তিন-চার দিন ধরে অবিশ্রান্ত বৃষ্টির স্মৃতি আমার সারা ছোটবেলা জুড়েই গিঁথে আছে। বৃষ্টি যখন ধরে আসত, হয়তো এক দুপুরবেলায়, মোটা কাপড়ের কাঠের ছাতায় আশরীর ঢেকে দৌড়ে গিয়ে বসতাম পুকুর-ঘাটে। মাছেরা বৃষ্টিতে আনন্দে খেলা করে, এ আমার স্বচক্ষে দেখা। তাদের নিচে পুকুরের জল যে গভীরে পৌঁছে এক আধিভৌতিক কালো পাতাল বেয়ে নীচে নেমে গিয়েছে, সেখানে ধূসর লোহার চামড়া নিয়ে জেগে উঠত আমার কল্পনার নটিলাস। সদ্য বাংলা তর্জমায় শেষ করেছি টোয়েন্টি থাউজ়়্যান্ডস লিগস আন্ডার দ্য সি। এরকমই পুকুরঘাটের এক মেঘলা নির্জন দুপুরে, হঠাৎ বৃষ্টিশেষের ভরভরন্ত ইষৎ সবুজ কাচের মতো ক্লান্ত জলে, উল্টোপাড়ের বুনো কলমির ঝাড় উজিয়ে ওদের ছায়াগুলো যখন লম্বা হয়ে পড়ত, আমি চোখ বুজিয়ে ছাতার তলায় আরও একটু বেশি করে সেঁধিয়ে যেতাম।

নটিলাসের কালো-ধূসর গায়ে এসে পড়ত কালো-কালো ছিপছিপে বেতের মতো চেহারাদের ছায়া। মাথাভর্তি বড়-বড় অগোছালো চুল। কোমরে একফালি সাদা কাপড় শক্ত করে পেঁচানো। হাতে বেতের টান-টান ধনুকে বেতের তীর। না, যেমন করে নটিলাসের সাক্ষাৎ হয়েছিল রহস্যময় দ্বীপের আদিম অধিবাসীদের সঙ্গে, তেমনটা নয়। মফস্বল শহরের সরু রাস্তাতেও ষাট ওয়াটের বাল্ব ছেড়ে, টিউবলাইট ছেড়ে তখন কোথাও কোথাও জ্বলতে শুরু করেছে হলদে হ্যালোজেন বাতি। পুকুরপাড়ের পিছনে বিবর্ণ কাস্তে-হাতুড়ি-তারা রঞ্জিত দেওয়ালে বড় করে সাঁটা থাকত ৭০ মিমি সিনেমাস্কোপের মর্দ, শোলে অথবা তুফান ছবির পোস্টার। আর বিশ্বায়নের দিকে গুটি গুটি এগোনো এই আধা-নাগরিক আবহে মূর্তিমান স্ববিরোধের মতো হাজির হত ওরা— পুরুলিয়া-বীরভূম-বাঁকুড়া তো বটেই, এমনকি হাওড়া-হুগলি-বর্ধমান-মেদিনীপুরের জেলা শহরের পথে-ঘাটে, দীঘির পাড়ে, পুরোনো বাড়ির ভগ্নস্তুপে— ওরা আমাদেরই আদিম প্রতিবেশী, আমাদের প্রাচীন ইতিহাসের শেষ ফসিলের মতো শেষ শিকারি-কুড়ুনি প্রতিনিধি।

খুব যখন ছোট ছিলাম, ভয়ে ছাতার তলায় সেঁধিয়ে যেতাম আমি। পরে ওরাই হয়ে উঠেছিল আমার বাল্যের পরম বিস্ময়-পুরুষ। অনাবিল আগ্রহে লক্ষ করতাম কী অসামান্য নিপূণতায় ওরা শিকার করে নিয়ে যেত সাপ, ব্যাং এমনকি মেঠো ইঁদুর পর্যন্ত। এরপর এল নব্বই-এর দশক। পিছনের দেওয়ালে তখন সাঁটা হচ্ছে ঝকঝকে রঙিন লিথোয় ছাপা স্টার ওয়র্স অথবা জ়িরো জ়িরো সেভনের পোস্টার। আর এল না ওরা। না, আর দেখিনি ওদের সেই পুকুরপাড়ে। হারিয়ে গিয়েছিল ওরা আমার কৈশোর থেকেই। সে কি আদিমতা আধুনিকতায় বাতিল বলে, নাকি আধুনিকতা আদিমতায় বেমানান বলে? কীভাবে হারিয়ে গিয়েছিল তাসমানিয়ার আদিম অধিবাসীরা? ত্রুগানিনিরা?

অস্ট্রেলিয়ায় আদিম অধিবাসীদের ছিল ৬৫ হাজার বছরের ইতিহাস। আর ১৭৭০ সালের ১৯ এপ্রিল, আরেক বিখ্যাততম ব্রিটিশ পর্যটক, নেভিগেটর, কার্টোগ্রাফার ক্যাপ্টেন জেমস কুক-এর জাহাজ এন্ডেভার-এর অস্ট্রেলিয়ার পূর্ব উপকূলের তট স্পর্শ করার মাত্র একশো ছয় বছরে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল তাসমানিয়ার আদিম অধিবাসীদের শেষ জীবনচিহ্নটুকু। ১৮৭৬ সালের ৮ মে শেষবারের মতো চোখ বন্ধ করে ওদের শেষ জীবন্ত প্রতিনিধি, ত্রুগানিনি।

ত্রুগানিনি

সে অনেক দিনের কথা। ১৮০০ সালের শুরু থেকেই ব্রিটিশ সেটলার, নির্বাসনে দণ্ডিত কয়েদি, তিমিশিকারি, জাহাজিদের দাপটে নির্মমভাবে কমে আসতে থাকে শান্ত শিকারি-কুড়ুনি জীবনে অভ্যস্ত অস্ট্রেলিয়া ও তাসমানিয়ার আদিবাসীদের সংখ্যা। ১৮২৪ সালে জর্জ আর্থার তাসমানিয়ার (তখন তার ঔপনিবেশিক নাম ভ্যান ডিমেন’স ল্যান্ড) গভর্নর হয়ে আসার পরে ঔপনিবেশিক দাপট জেনোসাইডের রূপ নেয়। নতুন সভ্যতা জেনোসাইডের ঝড়ে গ্রাস করতে থাকে কাদামাটির মানুষদের। কয়েক দশকের মধ্যেই ছিঁড়ে-খুঁড়ে মুছে যেতে বসে ৬৫ হাজার বছরের বেঁচে থাকার অনুপম আলপনা। এই সময়ে জর্জ অগাস্টাস রবিনসন নামের এক প্রবাসী মিশনারি তখনও বেঁচে থাকা আদিম অধিবাসীদের বাঁচানোর একটা শেষ চেষ্টা করেন। ঔপনিবেশিক সরকারের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত এড়িয়ে এই হতভাগ্য মানুষগুলি নিজেদের জায়গা ছেড়ে দিয়ে ফ্লিন্ডার্স আইল্যান্ডে যাতে বসতি তৈরি করে, সেই চেষ্টা করেন রবিনসন।[1] এই সময়ই তিনি ওদের মধ্যে থেকে খুঁজে পান ত্রুগানিনিকে।

যেন সমুদ্র ও পাহাড়ের মিলনে জন্মে ছিল ত্রুগানিনি নামে মেয়েটি। তাসমানিয়ার উপকূলে পৃথিবীর সবথেকে সুন্দর জায়গাগুলির মধ্যে একটি, ব্রুনি আইল্যান্ডের[2] সমুদ্রতটে এক জলকন্যার মতো ছিল ত্রুগানিনির বেড়ে ওঠা। রূপকথার জলকন্যাদের মতোই প্রশান্ত মহাসাগরের স্বচ্ছ কাচজলে ঝাঁপ দিয়ে অসামান্য দক্ষতায় ক্রে মাছ তুলে আনতে পারত সে। যেমন করে আমার বাল্যের সেই সাঁওতাল পুরুষদের দেখতাম চোখের পলকে ক্ষিপ্রতম সাপটিকেও অনায়াসে করতলবন্দি করতে। রবিনসনের সঙ্গে যখন ত্রুগানিনির সাক্ষাৎ হয়, সে জলকন্যা তখন বদলে গিয়েছে। ততদিনে তার মাকে মেরে ফেলেছে নাবিকের দল, কাকাকে হত্যা করেছে ঔপনিবেশিক সৈন্য, তিমিশিকারিরা তুলে নিয়ে গিয়েছে তার বোনকে, কাঠের কারবারিরা নির্মমভাবে হত্যা করেছে তার প্রিয় প্রেমিককে। নিজেও সে বারবার শ্বেতাঙ্গ ধর্ষকামে ক্ষতবিক্ষত হয়েছে। পালটে যাওয়া ত্রুগানিনি মধ্যস্থতার চেষ্টা করে রবিনসন ও নিজের মানুষদের মধ্যে। বেঁচে থাকা একশোজনের একটি দলকে নিয়ে ১৮৩০ সালে রবিনসন একটি বসতি (যাকে ক্যাম্প বলাই ভালো) গড়ে তোলেন ফ্লিন্ডার্স আইল্যান্ডে। ধর্মান্তকরনের উদ্দেশ্যে একটি গির্জাও তৈরি হয় সেখানে। কিন্তু একটি মানুষও ধর্মান্তরিত হয়নি সেখানে। জামাকাপড় বদলে গেলেও বদলাতে পারেনি তাদের শিকড়ে ফেরার আকাঙ্খা। বরং জমাট কুয়াশার মতো তাদের গ্রাস করতে থাকে তীব্র অবসাদ আর হোমসিকনেস। ১৮৫৬ সালের মধ্যেই ত্রুগানিনিকে নিয়ে তাদের সংখ্যা নেমে আসে ১৪তে। এর মধ্যে রবিনসন ইংলন্ডে ফিরে গেলে ত্রুগানিনিরা উঠে আসে ওইস্টার কোভের ক্যাম্পে।

তাসমানিয়ার আদিম অধিবাসীরা

…14 persons, all adults, aboriginals of Tasmania, who are the sole surviving remnant of ten tribes. Nine of these persons are women and five are men. There are among them four married couples, and four of the men and five of the women are under 45 years of age, but no children have been born to them for years.[3]

ওইস্টার কোভের ক্যাম্পে বাকি কজনও ফৌত হয়ে গেলে দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় জলকন্যার ফসিলের মতো একা বেঁচে থাকে ত্রুগানিনি। অবশেষে পৃথিবীর একটি সুন্দরতম প্রান্তের কাদামাটির মানুষ-মানুষীর ৬৫ হাজার বছরের ইতিহাস এই গ্রহের বুক থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় ১৮৭৬ সালে তার শেষ নিঃশ্বাস ফেলার সঙ্গে সঙ্গেই। আর ঠিক তার চার বছর আগেই স্বর্ণসন্ধানীরা নিউ ইংলন্ড টেবিল পাহাড়ের বিঙ্গারা উপত্যকায় খুঁড়ে বার করে ফেলেছে অস্ট্রেলিয়ার প্রথম হিরের টুকরোটি। জেমস কুকের স্বপ্ন সফল হয়েছে। অস্ট্রেলিয়া তখন সম্পূর্ণভাবে সফল ব্রিটিশ উপনিবেশ।

 

টুলস অব ইম্পিরিয়ালিজম

১৭৭০ সালের এন্ডেভারের সমুদ্রযাত্রায় জেমস কুকের সঙ্গে ছিল আরও দুই গুরুত্বপূর্ণ অভিযাত্রী। দুই বোটানিস্ট— একজন ব্রিটিশ, জোসেফ ব্যাঙ্কস; অপরজন সুইডিশ, ড্যানিয়েল সোলান্ডার। আমরা যে আজ ইউক্যালিপটাস, আকাসিয়া, বোগেনভিলিয়া গাছগুলিকে অতি সহজেই চিনি; এই প্রত্যেকটি গাছের সঙ্গে জড়িয়ে আছে জোসেফ ব্যাঙ্কসের নাম। প্রত্যেকটি গাছই ঔপনিবেশিক আবিষ্কার। সে যাই হোক। জোসেফ ব্যাঙ্কস আর সোল্যান্ডারকে নিয়ে জেমস কুক অস্ট্রেলিয়ার (তখনও নিউ হল্যান্ড) পূর্ব উপকূলে পৌঁছন। দুই বোটানিস্টের কাজের কথা মাথায় রেখে যে জায়গার পরে নামকরণ হয় বোটানি বে। এখানকার প্রকৃতি-জলবায়ু পরীক্ষা করে ব্যাঙ্কস আর সোল্যান্ডার যে সিদ্ধান্তটিতে পৌঁছন তাতেই মূহূর্তে স্থির হয়ে যায় ত্রুগানিনিদের অদূর ভবিষ্যতের ভাগ্যলিপি। দুই বোটানিস্টেরই সিদ্ধান্ত হয় যে বোটানি বে হল ব্রিটিশ পত্তনির জন্য আদর্শ ভূখণ্ড। পরের এক শতাব্দীর মধ্যে অস্ট্রেলীয় ভূখণ্ডের যাবতীয় ভূবৈচিত্র্য ও ভূসম্পদের মালিকানা বদলে গিয়েছিল। এই বিজয়স্মৃতি বহন করে কুইন্সল্যান্ড হার্বারের কুকটাউনে আজও নোঙর করে আছে আস্ত এন্ডেভারের রেপ্লিকা।

জেমস কুক পৌঁছলেন বোটানি বে

আজ যদি ত্রুগানিনির আত্মা এসে সেই দণ্ডায়মান রেপ্লিকার সামনে চোখ তুলে প্রশ্ন করে— হে মহান অভিযাত্রী জেমস কুক, তুমি আমাদের জন্য কী নিয়ে এসেছিলে? কী উত্তর দেবেন কুক? একই প্রশ্ন যদি রোয়ান্ডা-তাঞ্জানিয়া-জ়াম্বিয়ার গৃহযুদ্ধে যত মৃত মানুষ সার বেঁধে এসে লিভিংস্টোন মেমোরিয়ালের ম্‌পুন্দু মহাবৃক্ষটির[4] নিচে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করে— হে মহামতি যাজক, তুমি আফ্রিকাকে কী দিয়েছ? কী উত্তর দেবেন ডঃ লিভিংস্টোন? দুই হাত কাটা মানুষের সারি যদি কঙ্গো নদীর বাঁকে স্ট্যানলি পুলে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করে— ওহে মহান অভিযাত্রী, কঙ্গোর জন্য তুমি কী নিয়ে এলে? কী উত্তর দেবে দুর্ধর্ষ অভিযাত্রী হেনরি মর্টন স্ট্যানলি? কী উত্তরই বা ছিল শঙ্করের কাছে? জাহাজ? স্টিমার? রেলপথ? রাস্তাঘাট? ইলেক্ট্রিসিটি?

এই সমস্ত কিছুকেই মার্কিন ঐতিহাসিক ড্যানিয়েল আর হেড্রিক বলেন— ‘দ্য টুলস অব ইম্পিরিয়ালিজ়়ম’।

The ship’s guns that fire on a continent. The railway that is to ease the plundering of the continent. The river steamer that carries Europeans and their arms into the heart of the continent.

সাম্রাজ্যবাদ কি এমনি এমনি ছড়িয়ে পড়তে পারে? আদিম পুঁজির গন্ধ চিনে নিতেও লাগে প্রতিভা। পেতে হয় স্ট্যানলির মতো দুঃসাহসী অভিযাত্রী, দিয়েগো সাও-এর মতো দুর্ধর্ষ নাবিক, জেমস কুকের মতো নিখুঁত কার্টোগ্রাফার, জোসেফ ব্যাঙ্কসের মতো প্রতিভাবান বোটানিস্ট। ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যের মশাল হাতে এরা পৌঁছনোর ক্ষমতা রাখে আদিম অদেখা মহাদেশের আদিমতম, কাদামাটির অন্তরতম অংশে। পেছন পেছন প্রশিক্ষিত সারমেয়র মতো সেই আদিমতার অন্তরাত্মা ভেদ করে তার যাবতীয় ঐশ্বর্য বের করে আনতে উপস্থিত হয় তিন সি— সিভিলাইজেশন, ক্রিস্টিয়ানিটি, কমার্স।

 

রবিনসন ক্রুশো আর ফ্রাইডে আর তাসমানিয়ার ত্রুগানিনি

আরেক ড্যানিয়েল, ড্যানিয়েল ডেফো-র এক বিখ্যাত ঔপনিবেশিক নির্মাণ রবিনসন ক্রুশোর দিকে চোখ রাখা যাক। এতই বিখ্যাত এই উপন্যাস যে পাঠককে এর গল্প বলতে যাওয়াটা অনর্থক হবে। শুধু এটুকু বলার, গোটা উপন্যাসের কুড়িটি অধ্যায়ের মধ্যে চোদ্দটি অধ্যায় জুড়েই থাকে একজন দৃঢ়চেতা, ভগবানসদৃশ ইউরোপীয় উপনিবেশীর একটি আদিম দ্বীপভূমি, সেখানকার অজানা জন্তু-জানোয়ার ও বর্বর অধিবাসীদের সভ্য করে তোলার আখ্যান। আদিম দ্বীপের আদিম মানুষ ফ্রাইডে-কে যেভাবে বশে আনে ক্রুশো, সেই ছকেই বয়ে চলে পৃথিবীর সমস্ত আদিমপ্রান্ত জুড়ে ঔপনিবেশিক সম্প্রসারণের ঢেউ। ক্রুশো আর ফ্রাইডের সম্পর্কটিকে অনায়াসে ‘কলোনাইজার’ আর ‘কলোনাইজড্‌’-এর আন্তঃসম্পর্কের একটি কেস স্টাডি হিসেবে দেখা যেতে পারে। যেখানে ফ্রাইডে নামের বর্বর মানুষটির যাবতীয় মনস্তত্ত্বে প্রাথমিক ঝটকার মতো স্ট্যানলি বা সিসিল রোডসের ম্যাক্সিমগানের মতোই ক্রুশোর বন্দুকটিও ছিল একইরকম কার্যকর। ভয়, যা প্রথম শর্ত থাকে সাম্রাজ্যবাদী সম্প্রসারণের, তাই ছিল রবিনসনেরও হাতিয়ার।

…because he did not see me put anything into the gun; but thought that there must be some wonderful fund of death and destruction in that thing, able to kill man, beast, bird, or anything near or far off.

বিস্ময় এবং ভয়ে হতবাক ফ্রাইডে নীল-ডাউন করে শ্বেতাঙ্গ ভগবানের সামনে। যেমন করে নীল-ডাউন হয়েছিল অশান্টির[5] রাজা প্রেম্পেহ্‌। ১৮৭৪-৭৬ সালের প্রথম অশান্টি যুদ্ধে প্রবল লড়েও ইউরোপীয় মারণাস্ত্রের প্রযুক্তিতে কচুকাটা হওয়ার পর ১৮৯৬ সালের দ্বিতীয় অশান্টি যুদ্ধে লড়াই ছাড়াই শর্তহীন আত্মসমর্পণ করেন অশান্টিরাজ প্রেম্পেহ্‌। ব্রিটিশ ম্যাক্সিমগান থেকে একটি বুলেটও খরচা করতে হয়নি। ম্যাক্সিমগানের এমনি মহিমা যে বিস্কুটের টিনের ওপর বসে থাকা দ্বিতীয় শ্রেণির ব্রিটিশ অফিসারদের সামনে হামাগুড়ি দিয়ে ক্ষমাভিক্ষা করতে বাধ্য হন একসময়ের মহান অশান্টি সাম্রাজ্যের মহামান্য মহারাজা ও রাজমাতা।

রবিনসন ক্রুশো ও ফ্রাইডে

ভয় দিয়ে বশ করার পর ফ্রাইডেকে সভ্য করার দিকে মন দেয় ক্রুশো। প্রথমেই তার ভাষা কেড়ে নেয়। পরিবর্তে ফ্রাইডে ইংরেজি শিখতে থাকে। তার পুরনো নামটিও মুছে গিয়ে কোথায় হারিয়ে যায়। নতুন নামের ফ্রাইডে ইংরেজিতে ক্রমশ দক্ষ হয়ে উঠতে থাকে। কিন্তু তার শব্দমালায় সেই সব শব্দই ঘুরে ফিরে আসে যা একজন ভৃত্যের প্রভুর প্রতি ব্যবহার্য। ক্রুশোকে ‘মাস্টার’ বলে সম্বোধন করা ছিল ফ্রাইডের শেখা প্রথম ইংরেজি শব্দ। এরপর যেন অবধারিতভাবেই আসে ক্রিস্টিয়ানিটির পর্বটি। ফ্রাইডে জানতে পারে যা ছিল তার এতদিনের নিজস্ব টোটেম ধর্মবিশ্বাস, তা আসলে একরাশ আবর্জনাময় মিথ্যে ছাড়া কিছুই নয়।

… the pretense of their old men going up the mountains to say O to their god Benamuckee was a cheat; and their bringing word from thence what he said was much more so; that if they met with any answer, or speak with any one there, it must be an evil spirit.

এরপর ফ্রাইডের খ্রিস্টান হওয়া শুধু সময়ের অপেক্ষা। ডেফোর নির্মাণে প্রাঞ্জল হয়ে উঠেছে ঔপনিবেশিক ছক। প্রথমে ভয় পাওয়াও— পরবর্তীতে নিজস্ব সংস্কৃতির আমূল ধ্বংস করো— আদিম আত্মপরিচয়ের সমস্ত উপাদান ঔপনিবেশিক ঘৃণার অতলে তলিয়ে দাও। নিজস্ব আত্মপরিচয়হীন, সংস্কৃতিহীন, ভাষাহীন ‘অপর’ ফ্রাইডে অবশেষে তার যাবতীয় নিজস্বতা, স্বাধীনতা, আজন্মলালিত ভাবনা, বিশ্বাস, অনুভব হারিয়ে পরিণত হয় শ্বেতাঙ্গ সভ্যতার প্রতিনিধি রবিনসন ক্রুশোর প্রথম শ্রেণির প্রশিক্ষিত দাসে।

… when he espied me, he came running to me, laying himself down again upon the ground, with all the possible signs of a humble, thankful disposition, making a great many antic gestures to show it. At last he lays his head flat upon the ground, close to my foot, and sets my other foot upon his head, as he had done before; and after this, made all the signs to me of subjection, servitude, and submission imaginable, to let me know how he would serve me so long as he lived.

বিদ্যুতের ঝলকের মতো অব্যর্থ লক্ষ্যে সাগরের জলে ঝাঁপিয়ে ক্রে মাছ তুলে আনতে পারা জলকন্যা ত্রুগানিনির অবস্থা কি ফ্রাইডের মতো করেই তুলতে পেরেছিলেন আরেক রবিনসন, জর্জ অগাস্টাস? সেই জন্যই ফ্লিন্ডার্স আইল্যান্ডে হয়েছিল ক্যাম্পের ব্যবস্থা? তৈরি হয়েছিল গির্জা? যতদূর জানা যায় বেঁচে থাকা তাসমানিয়ার আদিম অধিবাসীরা কেউই খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত হয়নি। ত্রুগানিনিও না। তবে তাদের সংস্কৃতি, পরিচ্ছদ এবং খাদ্যাভ্যাসে অবশ্যম্ভাবী পরিবর্তন এসেছিল। নতুন জীবন তাদের জীবনের মানেই কেড়ে নিয়েছিল নিশ্চিত। না হলে কেনই বা মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে ফৌত হয়ে যাবে একটা জাতি?

সে অনেক দিনের কথা। তখনও ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যের খেলায় হাত পাকেনি জার্মানির। অন্যান্য ইউরোপীয় শক্তির এ খেলার দর্শকমাত্র সে জাতি। জার্মান লেখক গিওর্গে গেরল্যান্ড ১৮৬৮ সালে প্রকাশিত বই ‘অন দ্য এক্সটিঙ্কশন অব প্রিমিটিভ পিপলস্‌’-এ আলোকপাত করেছিলেন এই বিষয়ে। আদিম জনজাতির ক্রমাবলুপ্তির পেছনে তিনি তাদের নিজস্ব পশ্চাদপদতা, ইউরোপীয়দের আমদানি করা জীবাণু, তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া প্রত্যক্ষ হিংসার সঙ্গে যোগ করলেন আরেকটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ‘কালচারাল ভায়োলেন্স’ বা ‘সাংস্কৃতিক হিংসা’। গেরল্যান্ড বললেন— প্রকৃত প্রস্তাবে প্রত্যক্ষ হিংসার থেকেও অনেক বেশি কার্যকর হল সাংস্কৃতিক হিংসা। চেনা জলবায়ু ও প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড়, অচ্ছেদ্য বন্ধনে ছন্দোবদ্ধ আদিম অধিবাসীদের জীবনে হঠাৎ পরিবর্তন হল তাদের ধ্বংসেরই নামান্তর। সে পরিবর্তন সভ্যতার দৃষ্টিকোণ থেকে যতই সভ্যতাগর্বী হোক না কেন, তাতে কিছুই যায় আসে না। যেমন, তাদের কৌম জীবনে ব্যক্তিগত সম্পত্তির ধারণা চালু করলে তাদের জীবনপ্রক্রিয়ার ভিত্তিটিই নড়ে যায়। তাদের বিশ্বাস, তাদের অনুভব, তাদের ভাবনা প্রতিনিয়ত ধ্বস্ত হয় ঔপনিবেশিক প্রক্রিয়ায়। যখন জীবন তার অর্থই হারিয়ে ফেলে তখন সে জীবন অচিরেই ঝরে যায়।

এভাবেই কি ঝরে গিয়েছিল তাসমানিয়ার আদিম অধিবাসীরা। এভাবেই কি ঝরে যাচ্ছে আমার ছোটবেলার মফস্বলের আদিম প্রতিবেশীরা? গেরল্যান্ডের লেখা পৌঁছনোর কথা নয় শঙ্করের হাতে। তখন সাম্রাজ্যের যুগ। সাম্রাজ্যের মহিমার যুগ। সেই মহিমা পিছলে সে বই পৌঁছনোর কথা নয় বাংলার এঁদো গ্রামে। স্বাভাবিক, শঙ্করের মন উড়ে যেতে চায় লিভিংস্টোন, স্ট্যানলির মতো, হ্যারি জনস্টন, মার্কো পোলো, রবিনসন ক্রুশোর মতো…। সেখানে খোঁজ থাকে না ফা হিয়েনের, অতীশ দীপঙ্করের, এমন কি সুদূর হাঙ্গেরি থেকে নিজের আত্মপরিচয়ের উৎস খুঁজতে বেরিয়ে এই দার্জিলিং-এর রাস্তায় চিরকালের মতো ঘুমিয়ে পড়া কোরসি-ডি-চোমা-র। যেন শঙ্করের উড়ে যাওয়ার ডানা দুটি আসলে ঔপনিবেশিক ইন্দ্রজালের ডানা। তাই সে ডানায় জুড়ে থাকে রেলওয়ে পাতার গল্প, স্টিমারে কঙ্গো পারের শব্দ, উইনচেস্টারের বারুদের গন্ধরা। হীরা নিয়ে শঙ্কর জাহাজে ওঠে। যেমন করে পর্তুগিজ বা ব্রিটিশ কারাভেলের আপার ডেকে নতুন সংগৃহীত হীরার টুকরোর ক্যারাটের হিসেব নিয়ে জমে উঠত জমাট আড্ডা আর ডেকের নিচে একে অপরের সঙ্গে মোটা লোহার শিকলে বাঁধা জন্তুর মতো অর্থহীন জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে উন্মত্ত কাদামাটির মানুষ নিজেকেই কামড়ে, নিজের মাংস নিজেই ছিঁড়ে ক্ষতবিক্ষত করে চলত!

হীরা নিয়ে শঙ্কর নতুন ভবিষ্যতের দিকে পা বাড়ায়। আর ফুল ঝরে যাওয়ার মতো করে ঝরে যায় ত্রুগানিনিরা। তাসমানিয়ার জল-পাহাড়ের সামুদ্রিক জলকন্যারা। সেই গল্পে অর্থহীন হয়ে ওঠে রেলওয়ে পাতার গল্প, স্টিমারে কঙ্গো পারের শব্দ, উইনচেস্টারের বারুদের গন্ধ, হীরা প্রসপেক্টিং-এর যাবতীয় দুঃসাহসী আখ্যানমালা। এখন টানা বৃষ্টি হলে ছোটবেলার ওই পুকুরের জল উপচে ভেসে যায়। সেই তোড়ে ভেসে যায় বুনো কলমিশাকের ঝাড়, বুনো ফুল। কালো অতল থেকে নটিলাস আর জেগে ওঠে না। তার বদলে একদা শান্ত, ভরভরন্ত পুকুরের জল তোলপাড় করে ছুটে বেড়ায় সভ্যতার ডেস্ট্রয়ার।

There’s a road train going nowhere
Roads are cut, lines are down
We’ll be staying at the Roma Bar
Till that monsoon passes on

The backbone of this country’s broken
The land is cracked and the land is sore
Farmers are hanging on by their fingertips
We cursed and stumbled across that shore

I hear much support for the monarchy
I hear the Union Jack’s to remain
I see Namatjira in custody
I see Truganini’s in chains.[6]

 

[চলবে]


[1] অনেকের মতে রবিনসন জর্জ আর্থারের দুমুখো নীতি মেনেই এই কাজ করেছিলেন। আসলে এটাও এক ধরনের কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প বৈ কিছুই নয়।
[2] তাসমানিয়ার অধিবাসীদের মুছে যাওয়া ভাষায় ব্রুনি আইল্যান্ডের খুব সুন্দর এক নাম আছে। নামটি হল— লুনাওয়ানা-আলোনাহ্‌ (Lunawanna-alonnah)।
[3] ১৮৬১ সালে ব্রিটিশ সরকারের কলোনিয়াল অফিস-এর একটি রিপোর্ট উদ্ধৃত করে ‘দ্য টাইমস্‌’ পত্রিকায় একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। নিবন্ধটির শিরোনাম ছিল ‘Decay of Race’।
[4] লিভিংস্টোনের মৃত্যুর পর তাঁর দুই অতি অনুগত অনুচর চুমা ও সুসি তাঁর হৃৎপিণ্ডটি এই ম্‌পুন্দু গাছটির নীচে সমাহিত করে। আজকের জাম্বিয়ায় ওই জায়গাটিতে এখন লিভিংস্টোন মেমোরিয়াল।
[5] আজকের রিপাবলিক অব ঘানায় ছিল সেদিনের অতি শক্তিশালী, ঐতিহ্যবাহী অশান্টি সাম্রাজ্য।
[6] অস্ট্রেলিয়ান ব্যান্ড ‘মিডনাইট অয়েল’-এর ত্রুগানিনিকে নিয়ে বাঁধা গান। ১৯৯৩ সালে ‘আর্থ অ্যান্ড সান অ্যান্ড মুন’ অ্যালবামে এই গানটি রিলিজ করে।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3960 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...