নাট্যকার বাদল সরকার ছিলেন মূর্তিমান বিবেক

প্রদীপ দত্ত

 

আমি… আমি… জানাব— সবাইকে জানাব। এবার কিছু হবে না। এখন— এখনকার মানুষদের— কিছু হবে না। কিন্তু পরে— পরে কোনওদিন— ভবিষ্যতে…

–পরে কোনওদিন, ১৯৬৬

ষাটের দশকের শেষ থেকে তিনি হয়ে উঠেছিলেন বাংলা প্রসেনিয়াম থিয়েটারের মধ্যমণি, একাধারে নাট্যকার, নির্দেশক এবং অভিনেতা। নাইজেরিয়ায় থাকাকালীন, ১৯৬৩ সালে, লিখেছেন ‘এবং ইন্দ্রজিৎ’। সেখান থেকে ফিরে আসার পর ১৯৬৫ সালে তা নিয়ে বাংলায় সাড়া পড়ে গেল, রেডিওতে ‘এবং ইন্দ্রজিৎ’ পাঠ বাংলা থিয়েটার মহলে বিস্ময় সৃষ্টি করল। তারই মধ্যে লিখেছেন ‘বাকি ইতিহাস’ (১৯৬৫), ‘প্রলাপ’ (১৯৬৬), ‘ত্রিংশ শতাব্দী’ (১৯৬৬), ‘পাগলা ঘোড়া’ (১৯৬৭), ‘শেষ নাই’ (১৯৬৯)। এই সবকটি নাটকই সেই সময় শম্ভু মিত্রের ‘বহুরূপী’ একের পর এক মঞ্চস্থ করে চলেছে। অর্থাৎ যা লিখছেন তাই অনবদ্য এবং ব্যাপক সাড়া ফেলছে।

তার আগে ১৯৬৭ সালে তাঁর নিজের নাটকের দল ‘শতাব্দী’ তৈরি হয়েছে। অমল, বিমল, কমল এবং ইন্দ্রজিৎ— এই চারটি চরিত্র নিয়ে অভিনীত হয়েছে ‘এবং ইন্দ্রজিৎ’। ‘শতাব্দী’ পরের পাঁচ বছর একের পর এক তাঁর নাটক মঞ্চস্থ করছে, প্রবল সাড়া ফেলছে। ১৯৬৯ সাল থেকে ‘শতাব্দী’ একই সঙ্গে হলের ভিতর এবং বিশেষ আলো, পোশাক, মেকআপ ছাড়া বাইরে মানুষের মধ্যে (অঙ্গনমঞ্চে) থিয়েটার করা শুরু করল। পরবর্তীকালে তিনি তার নাম দিলেন ‘থার্ড থিয়েটার’। শুরু হল কয়েকদিন ধরে গ্রামে-গঞ্জে নাটক নিয়ে ‘পরিক্রমা’ এবং ১৯৭৬ সাল থেকে কার্জন পার্কের অঙ্গনমঞ্চে প্রতি সপ্তাহে ‘শতাব্দী’র ‘থার্ড থিয়েটার’।

এইভাবে এক সময় প্রসেনিয়াম ছেড়ে তাঁর নাটকের দল ‘শতাব্দী’কে নিয়ে তিনি সরে এলেন অঙ্গনমঞ্চে। কারণ তাঁর মনে হল, থিয়েটার মানুষের অনুভবের জন্য, অথচ তা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে বিনোদন ও ‘বুদ্ধিবিদ্যার সুড়সুড়ি’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। থিয়েটার করতে যে অনেক টাকা লাগে এই বাস্তবের বাইরে বেরোনো দরকার। টিকিট কেটে বাণিজ্যিক থিয়েটার দেখতে আসার বদলে থিয়েটার যদি চলে যায় দর্শকের কাছে, তা হলে যেমন মানুষের টিকিটের প্রয়োজন হয় না, থিয়েটারের খরচও কমে। শব্দ ও আলোর কেরামতি, নাটকের জন্য বিশেষ পোশাক, মেকাপ বাদ দিলে অভিনেতার সঙ্গে দর্শকের দূরত্ব অনেকটা ঘুচে যায়। দর্শক মুখোশের আড়ালের স্বাভাবিক মানুষটাকে দেখে। তখন থিয়েটার মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগসূত্র হয়ে দাঁড়াতে পারে। ভাবতেন মানুষ মুখোশ না ছাড়লে ভাল কাজে, সমাজবদলের কাজে অংশ নেবে কী করে?

কিন্তু এই যে প্রসেনিয়াম থিয়েটারে তাঁর দারুণ সাফল্য অর্জন এবং তা ছেড়ে গিয়ে থার্ড থিয়েটার আন্দোলন গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ, তা যখন তিনি শুরু করলেন তখন তাঁর বয়স ৪৭ বছর! প্রতিভা ছাড়াও কতটা সদিচ্ছা, উদ্যম ও সাহস দরকার তা ভেবে দেখবার মত। ওই সময়ের মধ্যে দেশ মেনে নিয়েছে তিনি অতি বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব। ১৯৬৮ সালে পেয়েছেন সঙ্গীত নাটক অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড। ১৯৭১ সালে পেয়েছেন ‘জহরলাল নেহরু ফেলোশিপ’। ১৯৭২ সালে পেলেন পদ্মশ্রী খেতাব।

তাঁর একাধিক নাটকের সংলাপে মানুষের লড়াই ও সাম্যবাদের ভাবনার কথা এসেছে। নাটক তাঁর কাছে হয়ে উঠেছিল পরিবর্তনের হাতিয়ার। দর্শকদের সমাজবদলের কাজে উদ্বুদ্ধ করতে চেয়ে মঞ্চ থেকে নেমে এসে তৈরি করলেন অঙ্গনমঞ্চ। গড়ে তুললেন এমন নাটকের দল যাঁদের নিয়ে হাটে-মাঠে-ঘাটে চলে যাওয়া যায়। তৈরি করেছিলেন তেমনি মানুষ নিয়ে, নাটক করা ছাড়াও সুস্থ সমাজ গড়া ও সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠায় যাঁদের আগ্রহ তুমুল। দলের নানাজনকে নানা সময়ে বলেছেন, “নাটক অনেকেই করতে পারে, তার আগে দরকার ভাল মানুষ, ভাল মানুষ হও।” নিজে ছিলেন আটপৌরে, পোশাক-আশাকে সাধারণ। সৃজনশীল কাজ, নাটক রচনা, লেখা, বক্তব্য রাখা ও ভাবনায় অসাধারণ।

নাটকের দল ‘শতাব্দী’ যে গ্রাম-গঞ্জে পরিক্রমা শুরু করেছিল তা ছিল তাঁর অ্যাক্টিভিজিমের এক রূপ। অন্যদিকে পরমাণু বোমা ও শক্তির বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে, প্রয়োজনে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করতেন। তাঁর মত বড়মাপের গুণীজনকে এইরকম অ্যাক্টিভিস্টের ভূমিকায় সমাজ সাধারণত দেখে না।

নাটক ছাড়াও নানা বিষয়ে তাঁর আগ্রহ ছিল। কাগজ কেটে, আঠা লাগিয়ে জুড়ে আসাধারণ কোলাজ তৈরি করতেন। এক সময় এসপেরান্ত ভাষা শিখে অন্যদের শেখাতেন। তাঁর কাছে শুনেছিলাম এসপেরান্ত কারও মাতৃভাষা নয়, কোনও দেশের ভাষা নয়। ১৯৮২ সালে লিগ অব নেশনস এই ভাষাকে আন্তর্জাতিক দ্বিতীয় ভাষা হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছিল, তার আগে ইউনেস্কো দিয়েছিল ১৯৫৪ সালে। চিনের বহু বিদ্যালয় দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে এসপেরান্তকে গ্রহণ করেছে। ব্রিটিশ এসপেরান্ত সংস্থার গ্রন্থাগারে এ বিষয়ে চল্লিশ হাজারের বেশি বই রয়েছে। ১৯৮৫ সালে বাদলদা ওই ভাষাশিক্ষার বই লিখেছিলেন। তাঁর কর্মজীবন থেকে নাটক বাদ দিলে শুধু এসপেরান্ত শিক্ষক কিংবা কোলাজ তৈরিতেও তিনি বিশিষ্ট ছিলেন।

***

 

১৯৮৬ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের চেরনোবিলের চার নম্বর চুল্লিতে ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটে গেল। দু-এক বছর আগে ডাক্তার মনন গাঙ্গুলী ও ডাক্তার দীপঙ্কর সেনগুপ্তের উদ্যোগে ‘অ্যান্টিনিউক্লিয়ার ফোরাম’ গঠিত হয়েছে। ফোরামের পাঠাগারে পরমাণু চুল্লি ও বোমা বিষয়ে যে বইপত্র ছিল— তা কিছু কিছু পড়েছি। তারও দু বছর আগে চুল্লির বিপদ নিয়ে বাংলায় লেখাপত্র ছাপা শুরু হয়েছে, বুকলেট প্রকাশিত হয়েছে। তাই কলকাতায় আমরা কয়েকজন হইহই করে উঠলাম। কারণ পরমাণু চুল্লির দুর্ঘটনার ফল যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে তা বুঝতাম। কিন্তু তখনও আমরা এতটাই অপ্রস্তুত ছিলাম যে রুশ কন্সুলেটে গিয়ে প্রতিবাদ জানানোর মিছিলে লোকই হল না।

এরপর ১৯৮৭ সালে পশ্চিমবঙ্গে প্রথম পরমাণু বিদ্যুৎ চুল্লি স্থাপনের কথা উঠল। সরকার বলল, মেদিনীপুরের দাঁতনে পরমাণু চুল্লি স্থাপন করা হবে। আশির দশকের প্রথমদিকে আশিটির বেশি বিজ্ঞান সংগঠনকে নিয়ে ‘গণবিজ্ঞান সমন্বয় কেন্দ্র’ তৈরি হয়েছিল। পরমাণু চুল্লি স্থাপনের বিষয়টি নিয়ে সমন্বয় কেন্দ্রের মিটিং হল কাঁচরাপাড়ায়। সেখানে আহ্বায়ক নির্বাচিত হয়ে পূর্ণোদ্যমে লেগে পড়লাম। সমন্বয় কেন্দ্রের উদ্যোগে বিভিন্ন বিজ্ঞান সংগঠন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে পরমাণু চুল্লি স্থাপনের বিরুদ্ধে চিঠি দিল। কিছুদিন পর পরমাণু চুল্লি নিয়ে আর কোনও কথা শোনা গেল না।

এরইমধ্যে আমরা নানা পত্র-পত্রিকায় লেখা ছাপানো, মিটিং ইত্যাদি ছাড়াও নাটকের মাধ্যমে বিষয়টা সাধারণ মানুষের কাছে নিয়ে যাওয়ার কথা ভাবছি। নাট্যকার অমল রায়ের সঙ্গে যোগাযোগ হল। সব শুনে অমলবাবু নাটক লেখায় আগ্রহ দেখালেন, আমরা তাঁকে তেমন রসদ দিতে পারিনি। শুকনো তথ্যের ওপর ভিত্তি করে নাটক লেখা কতটা মুশকিল তা বুঝতাম না।

আমার দাদার সতীর্থ প্রীতি দত্ত বাদল সরকারের দলে নাটক করতেন। সেই সূত্রে বাদলদার সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। তার আগে ১৯৭৮ সালে একবারই থিওজফিক্যাল সোসাইটির হলে বাদল সরকারের নাটক দেখেছি এবং মুগ্ধ হয়েছি। এমনভাবে যে নাটক করা যায় তা জানতামই না। তিনি তখন থাকতেন লেকটাউনের গ্রিনপার্কে। একদিন সকাল আটটা নাগাদ সেখানে হাজির হলাম। তখন আমি টগবগে যুবক, সমাজের চিন্তায় ঘুম হয় না। বাদলদার সঙ্গে কথা বলে অফিস যাব। প্রথম দর্শনেই এত কথা হল যে আর অফিস যাওয়া হল না। বিশাখাদি বাদলদাকে বললেন, ওকে আমাদের দলে নাও না। বাদলদা বললেন, সবাই নাটক করলে অন্য সব কাজ কে করবে, ওর কাজটাও গুরুত্বপূর্ণ। সেই যে ভাব হল, আজীবন রয়ে গেল।

চেরনোবিল বিপর্যয়ের পর, ১৯৮৭ সাল থেকে পর পর কয়েক বছর কলকাতায় ‘চেরনোবিল ডে’ (২৬ এপ্রিল) পালন করা হয়েছিল। বাদলদা সেখানে আসতেন। একবার বক্তৃতাও দিয়েছেন। কলকাতার স্টুডেন্টস হলে ষাট-সত্তরজন শ্রোতাকে বার বার দেখে দুঃখ করে বলতেন, উই আর প্রিচিং টু দি অলরেডি কনভার্টেড, নতুন লোক কোথায়?

কিছুদিন পর বিজ্ঞান আন্দোলনের লোকজন এবং নাট্যকর্মীরা মিলে যৌথভাবে তিনদিন ধরে ‘মৃত্যু বিরোধী নাট্যোৎসব’ করার প্রস্তাব দিলেন। ঠিক হল প্রথমে হবে নির্দিষ্ট বিষয়ে এক গুণীজনের আলোচনা এবং তার সঙ্গে সাযুজ্য রেখে পেশ করা হবে নাটক। প্রেসিডেন্সি কলেজের বেকার হলের বাইরের বড় উঠোন উপযুক্ত স্থান বলে নির্বাচিত হল। সেই চত্বরে চারদিক ঘিরে বসলে শ-দুয়েক দর্শকের স্থান হয়। নানা বিষয়ের বক্তাদের মধ্যে একদিন মৃণাল সেন থাকবেন বলে ঠিক হল। বাদলদা হাজির থাকবেন এবং তাঁর নাটক পরিবেশিত হবে শুনে এক বাক্যে রাজি হলেন। সে সময় বাদলদার প্রতি তাঁর অকুণ্ঠ শ্রদ্ধার কথা জানিছিলেন। অন্যদিনের বক্তারা ছিলেন সুজয় বসু ও শুভেন্দু দাশগুপ্ত।

খুব জমে ছিল সেই নাট্যোৎসব। প্রতিদিন সন্ধ্যায় ভিড় উপচে পড়ত। ভিড় দেখে বাদলদা খুবই উৎসাহিত হয়েছিলেন। দর্শক ও শ্রোতাদের বেশিরভাগই ছিলেন অঙ্গনমঞ্চের কাছে নতুন মুখ। চত্বরের বাইরে, গেটের পাশে প্রতিদিন তৃতীয় ধারার নাটকের বই টেবিলে সাজিয়ে বিক্রি করা হত। সেখানে বাদলদাও বসতেন। অনুষ্ঠানের শেষে সতরঞ্চি গোটানো হয়ে গেলেও দেখা যেত বই বিক্রির হিসাব মেলাতে বাদলদা মাথার চুল ছিঁড়ছেন। কিছুতেই পঁচিশ পয়সার হিসাব মিলছে না। রাতে দূর দূর থেকে আসা নাট্যকর্মীদের বাড়ি ফেরার তাড়া, তাঁকে রেখে চলে যাওয়া উচিত হবে না, অথচ কারও সাহস হচ্ছে না যে বলে, পঁচিশ পয়সার হিসাব বাদ থাকুক। সবাই জানত যতই সময় লাগুক তিনি হিসাব না মিলিয়ে ছাড়বেন না।

পরে কয়েকবার বলেছেন, “ওইরকম নাট্যোৎসব আবার করা যায় না?” ততদিনে আমি গণবিজ্ঞান সমন্বয় কেন্দ্রের দায়িত্ব থেকে সরেছি, তাই আর নাট্যোৎসব আয়োজন করার সাহস পাইনি।

কিছুদিন পর মৃণাল সেন বাদলদার ‘মিছিল’ নাটকটি কার্জন পার্কে উপস্থাপনার আয়োজন করতে আমায় অনুরোধ করলেন। তিনি ‘ফ্রান্সের জন্য কলকাতা’ নিয়ে তথ্যচিত্র তৈরি করছিলেন, সেখানে ‘মিছিলে’র কয়েকটি দৃশ্য ব্যবহার করতে চান। নির্ধারিত দিনে, এক শনিবার বিকালে নাটক চলাকালীন একটি দৃশ্যে ক্যামেরাম্যান তার বিরাট ক্যামেরা নিয়ে ছবি তুলতে তুলতে এরেনার মধ্যে ঢুকে পড়লেন। প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়ে নাটক শেষে বাদলদা বললেন, এটা ওরা কী করল? এভাবে ছবি তুললে যে পার্ট ভুল হয়ে যায় তা কি ওরা জানে না? এটা তো ছেলেখেলা হচ্ছে না! অনুষ্ঠান শেষে অনুদানের জন্য চাদর পাতা হলে, কেউ দশ টাকা দিলেন, কেউ বেশি, মৃণাল সেন পঞ্চাশ টাকা দিয়েছিলেন।

কিছুদিন পর থেকে কার্জন পার্কে অঙ্গনমঞ্চের নাটক করা বন্ধ হয়। সে-সময় কিছু বিশিষ্ট ব্যক্তির উদ্যোগে সেখানে ‘লালন মঞ্চ’ তৈরি হয়। তৈরি হওয়ার সময়ই বাদলদা বলেছিলেন, ওঁরা আর এখানে নাটক করতে দেবে না। একদিন, ২০ জুলাই, শনিবার, কার্জন পার্কে শহীদ প্রবীর দত্ত স্মরণে কার্জন পার্কের গাছতলায় অনুষ্ঠান শুরু হবে, সেই সময় লালন মঞ্চের মাইক বাজতে শুরু করল। খালি গলায় কথা বললে শোনার আর উপায় রইল না। সেদিন আজিজুল হক এসে বললেন, চলুন না আমরা এক সঙ্গে অনুষ্ঠান করি। উত্তরে বাদলদা বললেন, তা কি করে সম্ভব! আমরা তো এইদিনে প্রবীরকে স্মরণ করে অনুষ্ঠান করি। সেই থেকে সেখানে অঙ্গনমঞ্চের নাটক বন্ধ হয়ে গেল। পরে নন্দন চত্বরে তাঁরা নতুন করে নাটক শুরু করেছিলেন।

১৯৮৯ সালের দোসরা জানুয়ারি সন্ধ্যাবেলা অমৃতবাজার পত্রিকা অফিসে গিয়ে খবর পেলাম, এক আলোচনাচক্রে পরমাণু শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যান এম আর শ্রীনিবাসন বক্তৃতা দিতে আসছেন। আমরা ঠিক করলাম, তাঁর উপস্থিতিতে কালই পরমাণু শক্তির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দেখাতে হবে। মুশকিল হল, হাতে একেবারেই সময় নেই, মোবাইল ফোনের চলও হয়নি। বাদলদার কাছে গিয়ে ব্যাপারটা বললাম। বললেন, কোনও একটা নাটক পুরোটা করার মত সময় হাতে নেই। দলের সবাইকে জানাতে হবে, এত অল্প সময়ে তা সম্ভব নয়। কয়েকজনকে নিয়ে ‘ত্রিংশ শতাব্দী’ ‘খাটমাট ক্রিং’ ও ‘ভোমা’র নির্বাচিত অংশের কোলাজ উপস্থাপন করা যেতে পারে। এখন ভাবলে অবাক লাগে, রাতে কথা হচ্ছে, টিমের বাকি সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ হয়নি, রিহার্সালের সুযোগ নেই, তাও পরের দিন সকালে কিছু একটা পরিবেশন করবেন বলে কথা দিলেন। অত বড় নাট্যব্যক্তিত্বের এত বড় দায়বোধের কথা ভাবলে এখন অবাক লাগে!

সুজিতদার (সেই সময় এ রাজ্যে গড়ে ওঠা স্বাস্থ্য আন্দোলনের পুরোধা ডঃ সুজিত দাস) বাড়ি গিয়ে ব্যাপারটা বললাম। জ্যোতিকে (ডঃ জ্যোতির্ময় সমাজদার) বললাম, রাস্তার উপর ফুল দিয়ে বড় করে লিখতে হবে ‘স্পেয়ার আস অ্যাটমিক ডেথ’। আগের বছর বেঙ্গালুরুর আইএসআই-এ অনুষ্ঠিত দুদিনব্যাপী আলোচনাসভায় এই কথা বলেছিলেন কন্নর সাহিত্যিক-অ্যাক্টিভিস্ট কে এস করন্থ। যতটা সম্ভব সবাইকে খবর দেওয়া হল। ভোরবেলা হাওড়া থেকে দুই বন্ধু সঞ্জয় (সঞ্জয় বিশ্বাস) ও প্রভাত (অধ্যাপক প্রভাত মণ্ডল) দু ব্যাগ গাঁদাফুল কিনে আনল।

শীতের সকাল নটার মধ্যে আমরা ৩০-৪০ জন প্রতিবাদী হাজির হলাম। বিদ্যুৎ ভবনের পিছনের রাস্তা (এখন সেখানে রাস্তা নেই) জুড়ে ফুল দিয়ে লেখা হল— ‘স্পেয়ার আস অ্যাটমিক ডেথ’। আমরা স্লোগান দিচ্ছি— পরমাণু চুল্লি চাই না। বিক্ষোভ উপলক্ষে ওই সকালেই দু-একজন সাংবাদিক ও ফটোগ্রাফার হাজির হয়েছিলেন। অ্যাটমিক এনার্জি কমিশনের চেয়ারম্যান শ্রীনিবাসনের গাড়ি ধীরে ধীরে রাস্তা বেয়ে প্রেক্ষাগৃহের দিকে চলে গেল। বিক্ষোভ দেখে উত্তেজিত শ্রীনিবাসন সেমিনারে শুরুতেই বক্তৃতা দিতে গিয়ে উল্লেখ করেছিলেন যে বাইরের রাস্তায় পরমাণু শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ হচ্ছে। সেকথা শুনে সেখানে উপস্থিত সাংবাদিক ও চিত্রসাংবাদিকদের অনেকে বিক্ষোভস্থলে চলে এলেন। বাদলদা দলের কয়েকজনকে নিয়ে নাটকের এক আশ্চর্য কোলাজ উপস্থাপন করলেন। ক্যামেরায় অনেক ছবি উঠল।

আমাদের মধ্যে কে যেন বললেন, নিদেনপক্ষে শ্রীনিবাসনের গাড়ির কাচে ঢিল মারা দরকার ছিল, তা না হলে কি আর খবর হয়! পরের দিন কিন্তু অনেকগুলো খবরের কাগজে আমাদের বিক্ষোভ ও পথনাটিকার খবর হল। ইংরাজি দৈনিক অমৃতবাজার-এ প্রথম পৃষ্ঠার উপরে ডানদিকে বাদলার নাটকের ছবি সহ খবর ছাপা হল। তিনি না থাকলে বিক্ষোভ বা খবরের গুরুত্ব কমত।

সে বছর এপ্রিল মাসে গোখেল রোডে ইন্সটিটিউশন অফ এঞ্জিনিয়ার্স-এর হলে সারাদিনের জন্য পরমাণু শক্তি নিয়ে বিতর্কসভার (কনভেনশন) আয়োজন করা হয়েছিল। সুজয়দার (অধ্যাপক সুজয় বসু) বুদ্ধিতে সেই উদ্যোগের শুরুটা হয়েছিল এইভাবে— ‘নিউক্লিয়ার পাওয়ার অ্যান্ড ইটস একসেপ্টেবিলিটি বিষয়ে বিতর্কের আয়োজন করা হলে আমরা আয়োজক কমিটির উপদেষ্টা হতে রাজি আছি’— এই মর্মে দু-তিন লাইন লেখার নিচে স্বাক্ষর করলেন বাদলদা ও সুজয়দা। এরপর সেই সম্মতিপত্রে চিত্রপরিচালক মৃণাল সেন, গায়ক ভূপেন হাজারিকা, সুচিত্রা মিত্র, চিত্রশিল্পী গণেশ পাইন, গণেশ হালুই, শানু লাহিড়ি, বিজ্ঞানী বি ডি নাগচৌধুরী, বিনায়ক দত্তরায়, সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, সুনীল গাঙ্গুলী প্রমুখ বিশিষ্ট একত্রিশজন স্বাক্ষর দিলেন। টের পেলাম আমাদের দেওয়া কাগজে দু লাইন লেখার পর প্রথমে বাদলদার স্বাক্ষর ছিল বলে তার নিচে অনেকের স্বাক্ষর পাওয়া সহজ হয়েছে।

পরমাণু চুল্লির বিপদ নিয়ে তখন কারও বিশেষ কোনও ধারণা ছিল না। এ নিয়ে তথ্যও সহজলভ্য ছিল না। অ্যান্টি নিউক্লিয়ার ফোরামের কিছু বই অবশ্য ছিল। চুল্লির বিপদ নিয়ে যেন ধারণা তৈরি হয় সেই উদ্দেশ্যে অমৃতবাজার পত্রিকার সানডে সাপ্লিমেন্টে প্রকাশিত আমার দুটি কভার স্টোরি বিশিষ্টজনদের দিয়েছিলাম। দিয়েছিলাম মানে, লেটারবক্সে গুঁজে রেখে এসেছিলাম। তাঁদের উপদেষ্টা করে ‘সিটিজেন্স অর্গানাইজিং কমিটি’ তৈরি হল, লেটারহেড তৈরি হল। উপদেষ্টাদের ভারে আলোচনাসভার গুরুত্ব বাড়ল। পরমাণু শক্তির পক্ষে বলার জন্য ডিএই-র (ডিপার্টমেন্ট অফ অ্যাটমিক এনার্জি) তরফে চার প্রতিনিধি উপস্থিত হলেন। বিপক্ষের বক্তা ছিলেন— অধ্যাপক ধীরেন্দ্র শর্মা, অধ্যাপক সুজয় বসু, ডঃ সুরেন্দ্র গাদেকর, ডাক্তার স্মরজিৎ জানা। শুরুতে অশোক মিত্র (আইসিএস) ও অম্লান দত্তের বক্তব্যের পর বিতর্কসভা, তারপর লাঞ্চব্রেক। দ্বিতীয়ার্ধে সাধারণ আলোচনা। বিশিষ্টদের মধ্যে বাদলদা ছাড়া বক্তব্য রাখলেন তাপস সেন প্রমুখ। সারাদিন ধরে জোরদার, গুরুগম্ভীর আলোচনা ও বিতর্ক চলেছিল। বাদলদা গোড়া থেকে শেষ পর্যন্ত উপস্থিত ছিলেন। সেদিনের সভা খুব পছন্দ হয়েছিল। পরে অধ্যাপক ধীরেন্দ্র শর্মার কথা উল্লেখ করে বলতেন, সত্যিই কাল যদি নবায়নযোগ্য শক্তির জন্য সরকার দশ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করে এই পরমাণুবিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদেরা সুযোগ পেলে সেই উদ্যোগে সামিল হবেন এবং বলতে শুরু করবেন নবায়নযোগ্য শক্তি একমাত্র পথ। আসলে এঁরা অর্থ ও ক্ষমতার দাস।

কয়েক মাস পর, সে বছর থেকেই ত্রৈমাসিক পত্রিকা ‘সেফ এনার্জি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট’ প্রকাশ শুরু হয়। বছর পাঁচেক তা নিয়ে খুব ব্যস্ত ছিলাম। কয়েকবার মানিকতলার বাড়িতে গিয়ে বাদলদাকে পত্রিকা দিয়ে এসেছি। নানা ধরনের কর্মকাণ্ড থেকে সরে এসে পত্রিকা চালানোয় ব্যস্ত হয়ে পড়েছি বলে যোগাযোগ কমল।

এরই মধ্যে স্রেফ কিছু ভাল ভাল বই পড়া এবং তা নিয়ে চর্চার মজা নিতে বৃদ্ধ বয়সে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পারেটিভ লিটারেচার বিভাগে ভর্তি হলেন। সেখানকার শিক্ষকদের মধ্যে আলোড়ন পড়ে গেল। তবে ছাত্র-ছাত্রীদের খুব স্ফুর্তি, বাদল সরকারের সঙ্গে আড্ডা দেওয়া যায়। সন্তানতুল্য ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে তিনি দিব্যি মিশতেন। শুনেছি শিক্ষকরা কিন্তু তটস্থ থাকেন। শঙ্খ ঘোষের সেখানে ক্লাস নেওয়ার কথা। তিনি বাকি শিক্ষকদের বললেন, আপনাদের খুব সাহস, আপনারা ক্লাস নিন, ক্লাসে উনি বসে থাকলে আমি পারব না। পরবর্তীকালে তাঁর ব্যাচের কয়েকজন ছাত্র ও শিক্ষক তাঁদের অভিজ্ঞতার কথা নানা স্থানে বিস্তারিত লিখেছেন। কিন্তু যেটা কেউ আশা করেননি, শেষে পাশের জন্য তিনি পরীক্ষাও দিয়েছিলেন।

কার্জন পার্কের থার্ড থিয়েটার প্রথমে উঠে এসেছিল অ্যাকাডেমির বাইরের ফুটপাথে, সেখান থেকে পরে নন্দন চত্বরে, ‘আমন্ত্রণ’-এর সামনে। মাসের প্রথম ও তৃতীয় শনিবার আজও অঙ্গনমঞ্চের নাটক হয়। সেখানে ‘মিছিল’ নাটক চলাকালীন একবার পশ্চিমবঙ্গের তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের গাড়ি এসে থামল। গাড়ি থেকে নেমে তিনি নাটকের অঙ্গনে এসে দাঁড়ালেন। বাদলদাকে দেখে নাটক শেষে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলেন, কেমন আছেন বাদলদা? বললেন, অনেকে তো অনেক কিছু চাইল, আপনি তো কিছু চাইলেন না? বলুন থার্ড থিয়েটারের জন্য আমার কি কিছু করণীয় আছে?

১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট যখন প্রথম ক্ষমতায় এসেছিল, পশ্চিমবঙ্গের শিল্প ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ মানুষদের নিয়ে একটা আলোচনাসভা ডেকেছিল। বাদলদাও গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি থার্ড থিয়েটার শো করার জন্য নির্ধারিত একটি হলের কথা বলেছিলেন। পাকাপাকি বন্দোবস্ত না হলেও সেই সময় গগনেন্দ্র শিল্প প্রদর্শশালায় কয়েকদিন ধরে থার্ড থিয়েটারের নাট্যোৎসব হয়েছিল। ভাল জায়গায় অনেক দর্শকের সামনে নাটক করে নাট্যকর্মীরা সবাই খুশি হয়েছিলেন। কিন্তু ওই একবারই, আর কখনও তা হয়নি।

বাদলদা বললেন, এই জায়গাটায় আমরা যেন মাসের প্রথম ও তৃতীয় শনিবার নাটক করতে পারি তা যদি দেখেন ভাল হয়। ওই দুটো দিন নাটক করায় যেন বাধা না আসে। নন্দন কর্তৃপক্ষ সেই চত্বরে নাটক করা নিয়ে আপত্তির কথা জানিয়েছিল। বুদ্ধদেববাবু বললেন, আপনি আর কিছু বলবেন না? বাদলদা বললেন, না।

বুদ্ধবাবু চলে গেলে নাট্যকর্মীরা তাঁকে ঘিরে ধরে বললেন, ওই গগনেন্দ্র শিল্প প্রদর্শশালাটার জন্য আরেকবার বলুন না, আরেকবার আমরা বড় করে ফেস্টিভাল করি। তিনি বললেন, না, ওইটুকু চাওয়ার জন্য অনেক কিছু দিতে হবে, তাই ইচ্ছে করে না।

১৯৯০ সালে খুব অসুস্থ হয়ে তিনি রিপোজ নার্সিংহোমে ভর্তি হলেন, কয়েকদিন ধরে জ্ঞান নেই। দলের বেশ কিছু নাট্যকর্মী বাইরে দিবারাত্রি অপেক্ষা করছে। মন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের বাসা নার্সিংহোম থেকে খুব দূরে নয়। খবর পেয়ে তিনি এসে কানুদাকে (বাদলদার অতি প্রিয় বন্ধু অধ্যাপক অজিতনারায়ণ বসু) বললেন রাজ্য সরকার তাঁর চিকিৎসার ভার বহন করতে চায়। কানুদা তাঁকে কিছুক্ষণ দাঁড় করিয়ে রেখে আমাদের কাছে এসে বললেন, আমি যতটা বুঝি বাদল যদি জ্ঞানে থাকত তাহলে রাজ্য সরকারের থেকে নিজের চিকিৎসার খরচ নিত না, তবে এখানে চিকিৎসা ব্যয়বহুল, সরকারের পক্ষ থেকে যদি পিজিতে চিকিৎসার ব্যবস্থা করে আমাদের আপত্তি থাকার কথা নয়, তোরা কি বলিস? একবাক্যে সবাই তাঁর কথায় সায় দিলাম। অপেক্ষারত মন্ত্রীকে তখনই তিনি সে কথা জানিয়ে দিলেন। এ পর্যন্ত চিকিৎসার খরচ নেওয়া হল না, তবে সে রাতেই তাঁকে পিজিতে ভর্তির ব্যবস্থা হল। কয়েকদিন পর সুস্থ্ হয়ে মানিকতলার বাড়িতে ফিরলেন।

বিয়ের পর একদিন স্ত্রীকে নিয়ে গেলাম তাঁর সঙ্গে আলাপ করাতে। গল্প করার পর ধাঁধার বই (বইয়ের নাম ‘ছবির খেলা’, রেখা ও লেখা বাদল সরকার, শিশু সাহিত্য সংসদ) উপহার দিলেন। আমি তো অবাক, ধাঁধা নিয়েও ভাবেন?

১৯৯২ সালে গ্রন্থালয় থেকে ‘চেরনোবিল’ বইটি প্রকাশিত হয়। বইমেলার আগে প্রকাশের তাগিদে লেখা ও ছাপার কাজ অল্প সময়ে শেষ করা হয়েছিল। অসম্পূর্ণ, আগোছালো পাণ্ডুলিপি দিন দুয়েকের মধ্যে পড়ে বাদলদা মুখবন্ধ লিখলেন— ‘এই হনন আত্মহনন রুখতে হবে’। থার্ড থিয়েটারের তিনদিনের নাট্যমেলায় নাটকের অন্য্যান্য বই ও পত্রিকার পাশে এই বইটিও রাখতেন। নিজেই দাম মিটিয়ে গ্রন্থালয় থেকে দশটি করে বই তুলে নিতেন। পরমাণু শক্তি বিরোধী আন্দোলনের কর্মী হিসাবেই তা করতেন। মুখবন্ধে লিখেছিলেন “এই বিষয়ে চোঙা হাতে রাস্তাঘাটে চিৎকার না করাটাও অপরাধ।” লিখলেন, “আমাদের সামনে এখন দুটো পথ। বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বহু মানুষকে নৃশংস পদ্ধতিতে হত্যা করতে করতে আত্মহত্যা— একটা পথ। আর অন্য পথটা হল এইরকম বই, কাগজ পড়ে অবহিত হয়ে চোঙা হাতে চেঁচিয়ে যাওয়া, যতক্ষণ না জনমতের চাপে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের তথাকথিত ‘শান্তিপূর্ণ’ হনন-আত্মহননের ব্যবস্থা বন্ধ হয়।” মনে আছে বাদলদাকে পরমাণু শক্তির বিপদ নিয়ে হেলেন ক্যাল্ডিকটের ‘নিউক্লিয়ার ম্যাডনেস’ বইটা পড়তে দিয়েছিলাম। এরই মধ্যে তিনি লিখলেন ‘ক চ ট ত প’। স্বাভাবিকভাবেই ওই নাটকে পরমাণু শক্তির বিপদের কথাও এল।

তিনি বলতেন, আমাদের মত যাঁদের ঈশ্বরে বিশ্বাস নেই সেই অধার্মিকদের একটা গোষ্ঠী, দল তৈরি করা দরকার। চাকরির ক্ষেত্রে জানাতে হয় আমি হিন্দু না মুসলমান। ধর্ম যে মানি না সে কথা বলার সুযোগ নেই।  দুর্গাপুজো বা কালিপুজোয় চাঁদা দিতে হয়। নানা আন্দোলনে, সংগঠনে অনেক মানুষকে দেখেছি যাঁরা ঈশ্বর বা আল্লায় বিশ্বাস করতেন না, ধর্ম মানেন না বলে কেউ কেউ পুজোয় চাঁদাও দিতেন না, তবে তার জন্য হয়রানির শিকার হতেন। ধর্মনিরপেক্ষ দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রে সরস্বতী, গণেশ ও বিশ্বকর্মারও পুজো হয়! এখন পরিস্থিতি এমন যে অনেক মহলে ঈশ্বরে বিশ্বাস নেই কথাটা বললেও বোঝে না। বুঝতে পারি, অবিশ্বাসীরা দল করতে পারেনি বলে সমাজে তাঁরা কোণঠাসা।

নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি ‘সেফ এনার্জি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট’ প্রকাশ বন্ধ করার পর থেকে কয়েক বছর স্বেচ্ছায় জগৎবিচ্ছিন্ন হয়েছিলাম। বেরোলাম ১৯৯৮ সালের মে মাসে, ভারতের পরীক্ষামূলক পরমাণু বিস্ফোরণের ধাক্কায়। আমাদের রাজ্যে বিস্ফোরণের বিরুদ্ধে খুব প্রতিবাদ— মিটিং-মিছিল-কনভেনশন— হয়েছিল। লেখার অনুরোধ, টিভি-রেডিওতে কথা বলা ইত্যাদি শুরু হল যে কয়েক বছরের স্বেচ্ছাবন্দি অবস্থা ঘোচাতেই হল। ভেবে অবাক লাগত যে, দেশে পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র চালু হওয়া এবং ১৯৭৪ সালে প্রথম পরীক্ষামূলক পরমাণু বিস্ফোরণের (ইম্প্লোশন) পরও মানুষ যেন নিশ্চিন্তে ছিলেন যে ভারত পরমাণু বোমা তৈরি করবে না। তাঁরা সরকার ও সরকারি বিজ্ঞানীদের ইম্প্লোশন-এর বুজরুকিতে ঠকেছিল।

বাদলদাও প্রতিবাদ, কনভেনশনে যোগ দিতেন। শনিবার বিকেলে নন্দন চত্বরে নাটক পরিবেশনের আগে ভারতের পরমাণু বিস্ফোরণের বিরুদ্ধে জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিয়েছিলেন। আগের প্রায় চার-পাঁচ বছর বাদলদার সঙ্গে যোগাযোগ ছিল না, ফোনও করিনি। এতদিন পরে এক সভায় দেখা হতেই মজা করে বললেন, “ওরে বাবা, তোমাকে ঘর থেকে বার করতে বাজপেয়িকে পাঁচ-পাঁচটা বোমা ফাটাতে হল?”

কয়েকদিন পর তাঁর বাড়িতে গেলে বললেন, এক মহিলাকে খুব বকেছেন। পরমাণু বিস্ফোরণের বিরুদ্ধে এক কনভেনশনে আমন্ত্রিত হয়ে সেখানে গিয়ে প্রথমেই আমার খোঁজ করেছেন। কনভেনশনের আহ্বায়ক মহিলা অধ্যাপক বলেছেন, ও তো কারও সঙ্গে যোগাযোগ রাখে না তাই ডাকা হয়ে ওঠেনি। এতে রুষ্ট হয়ে বাদলদা সেখানেই তাঁকে খুব বকেছেন। সভা শেষ হলে রাতে সেই আহ্বায়ক ফোনে তাঁকে ফের আমাকে না ডাকের কারণ ব্যাখ্যা করতে গেলে তিনি আবার বকে দিয়েছেন। নানা কারণে বাদলদার ধারণা হয়েছিল কলকাতায় পরমাণু বোমা বা চুল্লি নিয়ে যে কোনও সভায় আমার উপস্থিতি অনিবার্য।

সংবাদপত্রে কোনওদিনই লেখেননি। একবারই ব্যাতিক্রম হয়েছিল। ১৯৯৮ সালে আনন্দবাজার পত্রিকায় তাঁর একটি লেখা ছাপা হয়। সেদিন দুপুরে তাঁর বাড়ি গিয়েছিলাম, বিকেলে তাঁর সঙ্গে বেরিয়ে কার্জন পার্কে অঙ্গনমঞ্চের অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছলাম। তাঁকে দেখামাত্র স্নেহভাজন দু-একজন নাট্যকর্মীকে হাসিমুখে কাছে এগিয়ে আসতে দেখে বললেন, এত খাতির কিসের? আনন্দবাজার পত্রিকায় লেখা ছাপা হয়েছে বলে?

তাঁর তিনটি নাটকে প্রবলভাবে পরমাণু বোমার কথা এসেছে— ‘ভোমা’, ‘খাটমাট ক্রিং’ ও ‘ত্রিংশ শতাব্দী’। তিনি বলতেন বিদেশে থাকাকালীন হিরোশিমার পরমাণু বোমার বীভৎসতা নিয়ে লেখা একটা বই তাঁকে খুব নাড়িয়ে দিয়েছিল, বইটির নাম তাঁর স্মরণে ছিল না (পরবর্তীকালে ষাটের দশকের বুলেটিন অফ দ্য অ্যাটমিক সায়েন্টিস্ট-এ সেই অসাধারণ বইটির রিভিউ পড়েছি, নাম আমারও আর মনে নেই)। ইংল্যান্ডে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশ নেওয়া শারীরিকভাবে পঙ্গু মানুষও দেখেছেন। তারই পরিণাম ওইসব নাটক। পরমাণু চুল্লি সম্বন্ধে জেনেছিলেন আশির দশকে দ্বিতীয়ার্ধে।

সাধারণত তাঁর কাছে যেতাম বিকেলে। সন্ধ্যার আগে চায়ের সঙ্গে সান্ধ্যকালীন জলখাবার হিসাবে জেলি মাখানো পাউরুটি আসত। খাব কিনা জেনে নিয়ে তিনতলার সিঁড়ির মুখ থেকে হাঁক দিয়ে একতলার রান্নাঘরে জানিয়ে দিতেন। চিরকালই দেখেছি চেয়ার-টেবিলে বসে হয় লিখছেন, নয় পড়ছেন। দুপুরে ঘুমোতেন না। ব্রঙ্কিয়াল অ্যাজমা ছিল বলে শেষ ১০-১৫ বছর সিগারেট খাওয়া কমানোর চেষ্টা করেছেন। তা দু-টুকরো করে কেটে রাখতেন। গ্লাস থেকে ঢেলে চা পানের পর এক টুকরো ধরাতেন।

একবার বললেন, দেখো কেতকী কী লিখেছে! গোটা গোটা হস্তাক্ষরে কেতকী কুশারী ডাইসনের বড় চিঠি। বাদলদার নাটক ও ভাবনা প্রসঙ্গে নিজের যা মনে হয়েছে সেই কথা, সঙ্গে অকুণ্ঠ শ্রদ্ধাজ্ঞাপন। এসব আলোচনায় দড় ছিলাম না। নাটক, সাহিত্য— কোনও কিছু নিয়েই কথা বেশি দূর গড়াত না। তখন আমি খুব কেজো লোক, কাজ ছাড়া কারও কাছে যাই না। সমাজব্যবস্থা নিয়ে অবশ্য কথা হত।

১৯৯৯ সালে কলকাতায় এসটিডি/এইচআইভি প্রজেক্টের ডিরেক্টর ডঃ স্মরজিৎ জানার (স্মরজিৎদা) অনুরোধে যৌনকর্মীদের ক্ষমতায়ন কতটা হয়েছে তা নিয়ে একটা পঞ্চাশ-ষাট পাতার বই লেখার কাজ নিলাম। তার জন্য যৌনকর্মীদের সঙ্গে কথা বলা দরকার। সুযোগমত নানা যৌনপল্লীতে ঘুরে কথা বলা শুরু করলাম। এঁদের জীবনের কথা শোনার নেশা চেপে গেল। বাদলদা ব্যাপারটা জানতেন। স্মরজিৎদার অনুরোধে তিনি তখন দুর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটির শাখা কোমলগান্ধারের ছেলেমেয়েদের নিয়ে নাটকের ওয়ার্কশপের জন্য সোনাগাছিতে যাচ্ছেন। একদিন বললেন, ওদের কথা শুনতে আমিও তোমার সঙ্গে দু-এক জায়গায় যাব। ঠিক হল একদিন টালিগঞ্জ পল্লীতে যাবেন। তিনি রবীন্দ্র সরোবর স্টেশনে সময়মতো পৌঁছবেন, তারপর একসঙ্গে যাব। বাদলদা মেট্রোর সিঁড়ির কাছে অপেক্ষা করছিলেন। আমার পৌঁছতে পাঁচ-ছ মিনিট দেরি হল, সময় রাখতে না পারায় তীব্র ভর্ৎসনা করলেন। একটু পরেই গলা নামিয়ে বললেন, তোমাকে বকাটা ঠিক হয়নি। আসলে সব সময়ই আমি অ্যাপয়েন্টমেন্টের অন্তত দশ-পনেরো মিনিট আগে পৌঁছই, আজ রাস্তায় এভাবে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খারাপ লাগছিল। পাঁচ মিনিট দেরি তো হতেই পারে, দোষটা আমার ওই অভ্যেসের।

একদিন বৌবাজার পল্লীতে গেলাম। দোতলায় বেশ বড় একটা ঘর, পশ্চিমদিকে দুটো দরজা। পশ্চিমদিকে দুটো কি তিনটে বড় চৌকি জোড়া দিয়েও ঘরের অন্যদিকের মাটিতে অনেকটা জায়গা ফাঁকা। একটা বন্ধ দরজার কাছে চৌকির একটা অংশ কাপড় দিয়ে ঢেকে ঘরের মত করা, বাইরে থেকে বন্ধ দরজার তালা খুলে ঢুকলে সেখানে কে এল বোঝা যায় না। ঘরের প্রধান অংশে না ঢুকেও সেখানে ঢোকা যায়। মাঝেমধ্যে কোনও মেয়ে এসে চাবি নিয়ে যাচ্ছে, একটু পরে ফেরত দেওয়ার সময় একটা পাঁচ টাকার কয়েন দিয়ে যাচ্ছে। আমরা কয়েকজন মেয়েদের সঙ্গে ঘরের মাটিতে বসে কথা বলছিলাম। এক সময় চৌকি খুব জোরে, একটা ছন্দে নড়তে শুরু করল। কী চলছে বুঝতে আর বাকি রইল না, অথচ ওই অবস্থাতেও গম্ভীরভাবে কথা বলছি ও শুনছি। বাইরে বেরিয়ে বাদলদাই প্রথম হেসে বললেন, এইরকম অবস্থায় তো কখনও পড়িনি, কী চলছিল বুঝতে তো পারছি অথচ কিছুই ঘটেনি ভেবে গম্ভীর থাকতে হচ্ছে, করুণ অবস্থা। কিছুদিনের মধ্যেই যৌনকর্মীদের জীবন নিয়ে নাটক লিখলেন ‘অন্ধকারে’। হাতে লেখা নাটকের জেরক্স কপি পড়বার জন্য দিলেন।

একটা ঘটনায় তাঁকে নিয়ে নিজের তৃপ্তির কথা বলেছিলেন স্মরজিৎদা। একবার সোনাগাছিতে কোনও একটা অনুষ্ঠান উপলক্ষে বাদলদার নাটক চলছে, বাদলদা নিজেও আছেন। পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী সে অঞ্চলের কিছুটা জমি দুর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে দান করবেন বলে কলকাতার মেয়র সুব্রত মুখার্জী এলেন। সমিতির মেয়েদের মধ্যে সাড়া পড়ে গেল। ভিআইপিরা কোনও অনুষ্ঠানে বেশিক্ষণ থাকেন না। স্মরজিৎদাকে তাঁরা সে কথা জানাল। তিনি তাঁকে বসিয়ে রাখতে বলে চুপ করে নাটক দেখতে থাকলেন। মেয়রও আধ ঘন্টার বেশি বসে থেকে নাটক দেখতে বাধ্য হলেন। নাটক না থামিয়ে বাদলদা এবং তাঁর দলকে সম্মান জানানোর ওই স্মৃতি স্মরজিৎদাকে আনন্দ দিত।

শারীরিকভাবে কাহিল থাকলেও সকালে মিনিট কুড়ি ব্যায়াম কিন্তু চালিয়েই গেছেন। শতাব্দী শেষ হওয়ার আগের বছর ‘মিলেনিয়াম’ রব উঠল। ব্যবসায়িক তাগিদেই সেই রব তোলা হয়েছিল। বাদলদা খুবই বিরক্ত বোধ করেছিলেন। সেই সময় ‘উৎস মানুষ’ পত্রিকার জন্য তাঁর সাক্ষাৎকার নিলাম। ‘মিলেনিয়াম’ রব উপলক্ষে কর্পোরেটদের ধান্দার কথা খুব জমিয়ে বলেছিলেন।

আজকাল কারও বাড়ি যেতে হলে সবাই ফোন করে কথা বলে যায়। এখন ভাবলে লজ্জা পাই, আমি তা করতাম না। বাদলদা ছাড়াও কয়েকজন বড় লোকের সঙ্গে কমবেশি যোগাযোগ ছিল, কারও কাছেই কখনও আগে থেকে ফোন করে যাইনি, অপ্রস্তুতও হইনি। দিনকাল বোধহয় তেমনই ছিল। কদাচিৎ তাঁকে ল্যান্ডফোনে যোগাযোগ করেছি, ওপার থেকে শব্দ ভেসে আসত, ‘হ্যালো বাদল বলছি’। এমনই ছিলেন বাদলদা।

একবার তুমুল উৎসাহে থাইল্যান্ড ভ্রমণ বৃত্তান্ত বর্ণনা করলেন। দিন কয়েক আগেই থাইল্যান্ড ঘুরে এসেছেন। ছবিতে দেখলাম বুকের কাছে জামার উপর কয়েকটা বিষাক্ত কাঁকড়াবিছা নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। পূর্ণবয়স্ক বাঘকে জড়িয়ে ধরেছেন, বাঘের বাচ্চাকে দুধ খাওয়াচ্ছেন, শুঁড়ে পেঁচিয়ে হাতি বাদলদাকে শূন্যে তুলেছে। বললেন, ভয়ডর আমার বরাবরই কম, ওরা এইসব করছে দেখে আমিও করতে চাইলাম। বেড়ানোর খরচের পাইপয়সার হিসেব দিলেন। বললেন থাইল্যান্ড ভ্রমণের খরচ আহামরি কিছু নয়, দক্ষিণভারত ভ্রমণের মতই। উৎসাহ দিলেন যেন আমরাও সেখানে ঘুরতে যাই। কিছুদিন পর ‘বিস্ময়কর শ্যামদেশ’-এ থাইল্যান্ড বেড়ানোর কথা বিস্তারিত লিখলেন।

১৯৯৯ সালে কথা উঠল সুন্দরবনে পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হবে। আমার ব্যস্ততা বাড়ল। চারিদিকে মিটিং সেমিনার কনভেনশন চলছে, কলকাতার বাইরেই বেশি। বাদলদা বলতেন, তোমাদের কথা শুনতে চাই শ্রোতা হিসেবে। সেই অনুযায়ী তাঁকে খবর দিলাম যে, মৌলালি যুবকেন্দ্রে সভা হবে। তাঁর মানিকতলার বাড়ি থেকে খুব দূরে নয়। সংগঠকদের বললে তাঁরা আনন্দে লাফিয়ে উঠবে, তাঁকে বক্তা করতে চাইবে জানি, কিন্তু বাদলদা তা চান না, তাই বলিনি।

মঞ্চে কারা ছিলেন এখন আর সবটা মনে নেই। তবে কলকাতা হাইকোর্টের দুজন প্রাক্তন বিচারপতি ছিলেন, আমিও বক্তা। কোনও কারণে ক্লান্ত ছিলাম, সভা শেষে তাড়াতাড়ি ঘরে ফিরব। রাস্তায় বেরিয়েছি, দু-পা যেতে না যেতে এক বিচারপতি গাড়ি নিয়ে আমার পাশে এসে কোনদিকে যাব জিজ্ঞেস করে তাঁর গাড়িতে উঠে আসতে বললেন। এমন সময় দেখি বাদলদাও হল থেকে বেরিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। বিচারপতিকে বললাম ওঁকেও তুলুন, কথাটা তাঁর পছন্দ হল না। বললাম, উনি বাদল সরকার। বাদলদা বললেন, তুমি যাও, আমি ঠিক চলে যাব। কী বুদ্ধি হল গাড়ি থেকে নামলাম না। বাদলদা হেঁটে এগিয়ে গেলেন। এরপর এমন অস্বস্তি শুরু হল যে বিচারপতির কথার ভাল করে উত্তর দিলাম না। বাদলদা যাচ্ছেন হেঁটে, আর আমি গাড়িতে। ঘটনাটা এখনও মনে পড়লে খারাপ লাগে। তবে শুধু সে কারণেই কথাটা বললাম না, এত বড় মাপের মানুষ, জনারণ্যে চুপচাপ বসে বক্তৃতা শুনতে চলে এসেছেন— এমন কি কখনও কেউ শুনেছেন?

এক প্রকাশনা সংস্থা বাদলদার তিনটি নাটক নিয়ে একটি বই ছেপে দামের দশ পার্সেন্ট হিসাবে এগারোশো বইয়ের রয়্যালটির টাকা প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই দিয়ে দিয়েছিল। বাদলদা খুশি হয়েছিলেন। এরপর অসুস্থতার জন্য তাঁর আর্থিক চাপ তৈরি হলে আমার মাধ্যমে ডাক্তার প্রকাশককে রচনাসমগ্র ছাপার প্রস্তাব দিলেন। প্রকাশক এক কথায় রাজি। বাদলদা পনেরো খণ্ডের পরিকল্পনা পাকা করে ফেললেন। প্রকাশক আমাকে নিয়ে দোতলায় উঠে তাঁর মেয়ের মতামত চাইলে মেয়ে কিছুতেই রাজি হলেন না। প্রকাশকের বয়স হয়েছিল, তাঁর অবর্তমানে মেয়েই মালিক হবে। অগত্যা বয়স্ক প্রকাশক মত বদল করতে বাধ্য হলেন। তাঁর সঙ্গে যোগাযোগটা ঘটেছিল আমার মাধ্যমে। বাদলদা সারা জীবনে এতটা অপমানিত সম্ভবত কখনওই হননি। কিন্তু তাঁর নাটকের বইটা পরবর্তীকালে বিশ্বভারতীর পাঠ্যবই হিসাবে ঘোষিত হলে প্রথম সংস্করণের এগারোশো কপি অচিরেই শেষ হল। দ্বিতীয় সংস্করণ আর ছাপা যায়নি (বাদলদার রচনাসমগ্রর তিন খণ্ড প্রকাশ করেছে মিত্র অ্যান্ড ঘোষ। বাকি সব খণ্ড অপ্রকাশিতই রয়েছে)।

এই প্রক্রিয়ার মাঝখানে আমি ছিলাম বলে আমার তখন ‘ধরণী দ্বিধা হও’ অবস্থা। প্রকাশকের সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করলাম। বাদলদার কাছে যেতেও দ্বিধা হত। তবে শুধু এ ঘটনাই নয় দু হাজার সালের শেষে কলকাতার উত্তর-পূর্ব থেকে দক্ষিণে গিয়ে, কয়েকবার বাড়ি বদল করে আমি তখন বিধ্বস্ত, পারিবারিকভাবেও নাজেহাল। তাই যোগাযোগ কমল।

২০০১ সালের শেষে একদিন মানিকতলার বাড়িতে গিয়ে দেখি বাদলদার বাঁ হাতের চেটো রীতিমতো ক্ষতবিক্ষত। বললেন, রাত এগারোটা নাগাদ সিগারেট কিনতে বাইরে গিয়েছিলেন। মানিকতলার মোড়ে কয়েকজন ট্রাফিক পুলিশ জটলা করে গল্প করছিল। সেখান দিয়েই রাস্তা পেরোচ্ছেন, হঠাৎই একটা লরি ডানদিকে টার্ন নিল, অথচ তা হওয়ার কথা নয়। অপ্রস্তুত বাদলদা সরাসরি লরির নীচে। পুলিশ হয়তো ভাবল, লুঙ্গি পরা ভবঘুরে বৃদ্ধটি মারা গেছেন। চ্যাংদোলা করে তাঁকে গাড়িতে তুলে কাছের এক নার্সিংহোমে নিয়ে চলল। দু-একজন পুলিশ সিটে বসে ফুটবোর্ডে ফেলে রাখা বাদলদার শরীরের ওপর পা রাখল। তিনি যে জ্ঞান হারাননি তা তারা বোধহয় বোঝেনি।

কয়েক বছর আগেই (১৯৯৭ সালে) বাদলদা সঙ্গীত নাটক অ্যাকাডেমির রত্ন সদস্য হয়েছেন। সেটাই পারফর্মিং আর্টস-এ ভারত সরকারের সর্বোচ্চ সম্মান (যে কারণে পরে, ২০১০ সালে, সরকার পদ্মভূষণ খেতাব দিতে চাইলে তা নিতে অস্বীকার করেন)। বাদলদা বলতেন, এটা দেয় তো খুব কম লোককে, তাই লম্বা লাইন থাকে, কেউ মারা না গেলে অন্য কাউকে ঢোকানো যায় না।

সে সময় অ্যাকাডেমির সভাপতি ছিলেন ভূপেন হাজারিকা। ভেবেছিলেন তাঁকে লিখবেন, দেখো, দুর্ঘটনায় তোমার এক রত্ন সদস্যের কী হাল হয়েছে। পরে ভাবলেন, বাজপেয়ী ক্ষমতায়, ভূপেন হাজারিকা বিজেপির সমর্থক, তাঁকে চিঠি লিখলে বিজেপি মাইলেজ পেয়ে যাবে। শেষে ঠিক করলেন প্রেস কনফারেন্স করে সাংবাদিকদের বিস্তারিত জানাবেন। পরামর্শ করার জন্য আমাকে তলব করলেন। তারপর ভোটের আগে বামফ্রন্ট সরকারের অস্বস্তির কথা ভেবে সে পথ থেকে সরে এলেন।

দিনকয়েক পর লালবাজারের এক অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার ফুলের তোড়া হাতে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এলেন। আরও পরে মানিকতলা থানার এক সাব-ইন্সপেক্টর ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ লিখে নিয়ে গেলেন। কিন্তু যেসব পুলিশ মানিকতলার মোড়ে জটলা করছিল আদৌ তাদের শাস্তি হল কিনা তা জানা যায়নি।

তখন আজকের মত হেলথ ইন্সিওরেন্সের ধূম পড়েনি। চিকিৎসায় লক্ষাধিক টাকা খরচ হয়ে গেলে তিনি চিন্তিত হয়ে পড়লেন। জমানো টাকা খরচ হলে তার সুদও কমবে। তাতে বাকি জীবন কাটানো মুশকিল হবে। অবশ্য ললিতকলা অ্যাকাডেমির রত্ন সদস্যের উপযুক্ত চিকিৎসার খরচ কেন্দ্রীয় সরকারই বহন করে। কিন্তু সরকারকে তিনি জানাবেন না, চিকিৎসার টাকাও নেবেন না। সারাজীবন টাউন প্ল্যানার হিসাবে ভারত, ইংল্যান্ড ও নাইজেরিয়ায় চাকরি করেছেন। পঞ্চাশ বছর বয়সে নাটক লেখা ও থিয়েটারে আারও বেশি সময় দেওয়ার জন্য চাকরি ছেড়েছেন, পেনশনও ছিল না। বয়সকালে ব্রঙ্কিয়াল অ্যাজমায় খুবই ভুগতেন। বলতেন, ভেবেছিলাম টাকা যা পেয়েছি তাতে ভালভাবে জীবন কেটে যাবে, এত যে ভুগব তা যেমন বুঝিনি, এত বছর বাঁচব বলেও ভাবিনি। এতদিন বাঁচা, শরীর খারাপ ও অ্যাক্সিডেন্টের খরচের সম্ভাবনার কথা আগে ভাবেননি। ছেলেমেয়ের কাছ থেকেও টাকা নেবেন না। শেষ বয়সে তাই বেশ আর্থিক চাপে পড়ে গিয়েছিলেন। আর্থিক চাপ থেকে উদ্ধার পেতে শেষ বয়সে তাঁকে হোমি ভাবা ফেলোশিপ গ্রহণ করতে হয়েছিল। বলতেন, বছর দুয়েক পরে একটা কিছু লিখে দিলেই হবে। নাটকের জগতে যিনি এত বড় কাণ্ড ঘটিয়েছেন তাঁর কাছে নাটক নিয়ে গবেষণাপত্র লেখা আহামরি কিছু নয়।

অন্যান্য লেখা ছাড়াও অন্তত পঞ্চাশটা নাটক লিখেছেন। তাঁর আঙুলগুলো ক্ষতবিক্ষত, লিখতে আর আঙুল চলে না, তখনও মানুষটার নাটক করার এত ইচ্ছে যে পরশুরামের তিনটে গল্প নিয়ে একটা সিরিজ বানিয়েছিলেন। নাটক তোলার কাজও শুরু হয়েছিল, নানা কারণে সেটা আর হয়ে ওঠেনি। ওই শারীরিক অবস্থায় বড় একটা বাইরে যেতেন না। কিছুদিন পর ‘পুরনো কাসুন্দি’ লেখা শুরু করলেন। প্রতি শুক্রবার বিকেলে একটা করে অধ্যায় নাট্যকর্মী সুমিত, কল্যাণদের পড়ে শোনাতেন। সন্ধ্যাবেলায় তাদের সঙ্গে লরেটো ডে স্কুলে যেতেন, বাসে চড়েই। সম্ভবত ২০০০ সাল থেকে শিয়ালদার লরেটো ডে স্কুলের ভিতরের চত্বরে শুক্রবার সন্ধ্যায় নাটক পরিবেশন শুরু হল। কিছুদিন পর থেকে অবশ্য শুক্র-শনি-রবি— তিনদিন ধরে মাসে একবার নাটকের উৎসব হত, ২০১১ সাল পর্যন্ত তা চলেছে।

একবার শিয়ালদার লরেটো ডে স্কুলে দেখা হতে সহাস্যে বললেন আমার আর এখন অর্থাভাব নেই। মেয়ে চাকরি ছেড়েছে, বললাম চিন্তা করিস না, যে টাকা পাব মাসে মাসে তোকেও কিছু দিতে পারব। আরেকবার বললেন, এটা কীরকম কথা, একটা ফোনও তো করতে পারো! তারপর বললেন, এখন আর অন্য কিছু নিয়ে (সুস্থ সমাজ গড়া ও সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠায় আন্দোলন) তেমন ভাবি না। যা মনে আসে যতটা পারি লিখে যাই। বললেন, ওদের (আমার বউ ও মেয়ে) অনেকদিন দেখিনি, একদিন নিয়ে এসো। শেষের কয়েক বছর কিছুতেই তাঁর কাছে যাওয়া হয়ে ওঠেনি।

বাদলদা এদেশে অনেক বিখ্যাত ব্যাক্তির প্রেরণা। তাঁরা নানা জায়গায় সে কথা জানিয়েছেন। যেমন গিরিশ কারনাড, মীরা নায়ার, সত্যদেব দুবে, অমল পালেকার। অভিনেতা ও ডিরেক্টর অমল পালেকার একবার তাঁর সঙ্গে বাড়িতে দেখা করতে এলেন। ফিরে গিয়ে পুনেতে ২০০৯ সালের জুলাই মাসে, তাঁর ৮৫তম জন্মদিন উপলক্ষে, অনেকে মিলে ’বাদল উৎসব’ আয়োজন করলেন। শ্রুতি নাটকের মত করে ‘সারা রাত্রি’, ‘পাগলা ঘোড়া’ ইতাদি কয়েকটি নাটক পাঠ করেন রোহিণী হাত্তাঙ্গারি, অমল পালেকার, নানা পাটেকার, ওম পুরী, নাসিরুদ্দিন শাহ। বাদলদাও অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলেন। অনুষ্ঠান থেকে যে আয় হয়, সেই টাকা তাঁরা তাঁর হাতে তুলে দিয়েছিলেন। তার আগে ২০০৫ সালে অমল পালেকারের উদ্যোগে নাট্যব্যক্তিত্ব বিজয় তেন্ডুলকারের সন্মানে পুনাতেই হয়েছিল ‘তেন্ডুলকার মহোৎসব’। অনুষ্ঠানের সূচনার দিন বাদলদার উপর একটি ডিভিডি এবং তাঁর জীবন নিয়ে লেখা বই মুক্তি পায়।

শেষ কয়েক বছর মাসের অর্ধেকের বেশি সময় অসুস্থ থাকতেন। যখন তাঁর শরীর আর চলে না, ২০১০ সালের ডিসেম্বর মাসে, কলকাতার মেট্রো চ্যানেলে অপারেশন গ্রিনহান্টের বিরুদ্ধে নাগরিক উদ্যোগে প্রতিবাদী সাংস্কৃতিক সভায় হাফপ্যান্ট পড়ে, অশক্ত শরীর নিয়ে হাজির হয়েছিলেন। সেখানে তেলেঙ্গানার কবি ও লোকগায়ক গদ্দর এসেছিলেন। সেদিন তিনি বলেছিলেন, আমি মানুষের জন্য কতটা কী থিয়েটার করেছি জানি না, তবে এঁর মানুষের জন্য তৈরি গান ভীষণ কার্যকর হয়েছে তা বলতেই হবে। সেই বছরই ভারতীয় থিয়েটারে লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্টের জন্য কেরল সঙ্গীত নাটক অ্যাকাডেমির ‘আম্মানুর পুস্কারম’ পুরস্কার লাভ করেন।

অবশেষে ২০১১ সালের ১৩ মে রাতে তপুদির ফোনে তাঁর মৃত্যুসংবাদ পেলাম। পরের দিন সকালে এনআরএস হাসপাতালে বাদলদার দেহ দান করা হবে। অঙ্গনমঞ্চের বন্ধুরা সবাই এবং থার্ড থিয়েটারের বাইরে আমরা কয়েকজন উপস্থিত। না কামানো বড়, সাদা চুল-দাড়ি নিয়ে প্রসন্ন মুখে শুয়ে রয়েছেন আমাদের প্রাণের মানুষ। উঠে বসে আর তিনি তিরস্কার করবেন না— কী ব্যাপার আমাকে এত গুরুত্ব দিচ্ছ কেন! ল্যান্ডফোনে ফোন করলে ওপারে আর কেউ বলবে না, হ্যালো বাদল বলছি। অ্যানাটমি বিভাগের ভিতর তাঁকে নিয়ে যাওয়ার আগে শেষ বিদায় জানাতে গাওয়া হল ‘মিছিল’-এর গানের সুর। কথা নয় শুধু সুর। এবার হাসপাতালের এক কর্মী ট্রলি টেনে ওই বীর বিপ্লবী নাট্যকারকে চোখের আড়ালে নিয়ে গেলেন। আমরা মাটিতে চোখ নামালাম।

তিনি চলে চলে গেলেও বেঁচে আছেন ‘শতাব্দী’, ‘পথসেনা’, ‘আয়না’ ও অন্যান্য দলের নাট্যকর্মীরা। বেশিরভাগেরই অনেকটা বয়স হলেও নিজেরা নাটক করার পাশাপাশি থার্ড থিয়েটারের মশাল জ্বেলে রাখতে যুবদের তৈরি করছেন।

 


কৃতজ্ঞতা স্বীকার: এই রচনায় বিশিষ্ট নাট্যকর্মী শ্রী সুমিত কুমার বিশ্বাসের থেকে জানা কিছু তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3960 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...