সাহিত্যের সীমা

স্বাতী ভট্টাচার্য

 

মেয়েরা যেমন করে কাঁথা সেলাই করে, তেমন করে গল্প বলেন গীতাঞ্জলি শ্রী। এক একটা কাঁথা তৈরি হয় কত না শাড়ির টুকরো জোড়া দিয়ে দিয়ে। সে সব শাড়ি যারা বুনেছে আর যারা পরেছে, সকলের গল্প লেগে থাকে তাদের গায়ে। তাদেরই নকশা পাড় থেকে সুতো টেনে টেনে ছোট ছোট ফোঁড়ে ফুটে ওঠে নতুন নতুন গল্প। সবাই অবাক হয়ে দেখে, যে রেখাটা জলের ঢেউ হয়ে শুরু হয়েছিল, সেটাই কখন হয়ে গিয়েছে লেজ-তোলা মাছ, তারপর পদ্মের মৃণাল, আবার কখন জল ছেড়ে স্থলে উঠেছে ধানের শীষ হয়ে। সেগুলো দুলতে দুলতে কখন হাতে হাতে ধরে নেচে উঠেছে বালিকার দল হয়ে, আবার হয়তো হাতি হয়ে কদমফুলের বনে গিয়েছে। এরা সবাই রয়েছে একই ফ্রেমে, একই সঙ্গে, স্বস্থিত অথচ নিয়ত গতিশীল, বিশিষ্ট তবু অভিন্ন। মাছ তো হাতি নয়, অথচ যে রেখা জলে খেলে-বেড়ানো মাছ হয়েছে তা হাতির মাথায় ঝরে-পড়া কদমরেণু না হয়ে শেষ হতেই পারত না, তা ছবিই বলে দেয়। কাঁথার ফোঁড়, চিত্রকরের তুলি, লেখকের কলম যে গল্প বলে, সে কোনও একজনের গল্প নয়, একটা গল্পও নয়, আর তা শেষ হওয়ারও নয়। লোকের সামনে যা ধরে দেওয়া হয়, সেটুকু আরও বড় গল্প শোনার নেমন্তন্ন করে যায় কেবল।

‘টুম অব স্যান্ড’ বইতে যাঁরা একবার প্রবেশ করেছেন, তাঁরা শেষ পাতায় পৌঁছনোর বহু আগেই জেনেছেন সে কথা। যে বিপুল বেদনা মানুষকে অহং-শূন্য করেও আত্মানুসন্ধানে বাধ্য করে, তা কিছু ঘটনার বিবরণে, কিছু চরিত্রের পরিণতিতে শেষ হওয়ার নয়। যেন প্রতীকীভাবে, সাতশো পঁচিশ পাতার বৃহৎ উপন্যাস শেষ হওয়ার পরেও লেখক ছ পাতার যে ‘উত্তরকথা’ (এপিলগ) লিখেছেন, বইয়ে সে পাতাগুলোতে কোনও নম্বর নেই। বৃহৎ এই কাহিনির শেষ বাক্যগুলো এইরকম, “আমি লাফ দিয়ে এলাম জানলার বাইরে। যেন সেটা জানলা নয়, ক্যানভাসের একটা কোণ যেখানে এখনও কোনও রং লাগানো হয়নি, যেখানে অজস্র নতুন গল্প আর চরিত্র অপেক্ষা করছে সেই মুহূর্তের, যখন তারা আকার পাবে।”

কে লাফিয়ে গেল অমন করে জানলা-ক্যানভাসের শূন্য কোণে? খানিক আগেই সে নিজের পরিচয় দিয়েছে কাহিনির এক অতি-প্রান্তিক, অতি-সামান্য চরিত্র হিসেবে— সে কাহিনির মুখ্য চরিত্র বৃদ্ধা ‘মা-জি’-র নাতির বন্ধু, জৈব সারের ব্যবসায়ী, পরিবারের নানা সঙ্কটের সাক্ষী। কয়েকটি অনুচ্ছেদ পরে সেই কথকই যখন জানলা দিয়ে উড়ে যায়, পাঠক অনায়াসে বুঝতে পারে এ হল সেই কাকটা, যে অশীতিপর মায়ের খবর নিয়ে আসে তাঁর বড়ছেলের কাছে। কখনও শহরেরই অন্য পাড়া থেকে, যেখানে গৃহকর্তার বোনের বাড়িতে ছিলেন মা-জি। কখনও সীমান্তের অন্য পার থেকে, যেখানে সেনাদের পাহারায় বন্দিদশায় দিন কাটছে বৃদ্ধার। যদিও এ কাকটা সেই কাকটাই, নাকি তার ছেলে, তা নিয়ে ধন্দ আছে বড়ছেলের। কাঁথার ফোঁড়ের মতো, কথার ফোঁড় এমন সব আপাত-বিচ্ছিন্নতাকে অনায়াসে বুনে যায়।

গীতাঞ্জলীর হিন্দি উপন্যাস ‘রেত সমাধি’ (বালুকা সমাধি) তেমন কোনও সাড়া ফেলেনি, ডেজ়ি রকওয়েল ইংরেজিতে অনুবাদ করার পরেও না। শোরগোল শুরু হল বইটি ইন্টারন্যাশনাল বুকার প্রাইজ়ের শর্টলিস্টে আসার পরে, পুরস্কার পাওয়ার পরে রীতিমতো হইচই। বইটির পরিচয় দিতে গিয়ে অনেকে একে ‘পার্টিশন নভেল’ বলেছেন। দেশভাগ অবলম্বনে গড়ে-ওঠা সাহিত্যের ধারায় যে এটা এক গুরুত্বপূর্ণ এবং অভিনব সংযোজন, তাতে সন্দেহ নেই। লেখক নিজেও এ বিষয়ে সচেতন। কাহিনি যখন আসছে ওয়াগা সীমান্তে, তখন তিনি কল্পনা করছেন, যেন সেই সীমান্তে দেশভাগ-সাহিত্যের বিখ্যাত লেখকরা বসে আছেন নৈশভোজে, প্রত্যেকের সামনে রাখা আছে তাঁর নাম-লেখা কার্ড— ভীষ্ম সাহানি, বলবন্ত সিং, যোগীন্দর পাল, মান্টো, রাহি মাসুম রাজ়া, ইন্তিজ়ার হুসেন কৃষ্ণা সোবটি, খুশওয়ান্ত সিং, আরও কত জন। মান্টোর গল্পের চরিত্র বিষণ সিং এসে তাঁকে জিজ্ঞাসা করছেন, ‘তোবা টেক সিং কোথায়?’ মান্টো বলছেন, ‘কোথায় আর? যেখানে সে চিরকাল ছিল।’ তারপর বিষন সিং-এর অপ্রতিরোধ্য পাগলামিতে কী করে যেন পাকিস্তান-প্রান্তে ভারতের, আর ভারত-প্রান্তে পাকিস্তানের পতাকা উঠে যায় দিনের শেষে। একটি সম্পূর্ণ অধ্যায় গীতাঞ্জলি লিখেছেন এই কল্পিত সীমান্ত-সন্ধ্যা নিয়ে, বিদ্রুপ, হাস্য ও করুণ রসের সার্থক সংমিশ্রণে। দেশভাগ-কেন্দ্রিক সব সাহিত্যই বস্তুত দুপারের মানুষের সম-বেদনার গল্প। এই বই সেই ধারার সার্থক ধারক-বাহক, তাতে সন্দেহ নেই। তবু একে কেবল দেশভাগ-সাহিত্য বললে এর সবটা ধরা যায় না। এ কাহিনিতে বহু সীমান্ত পার করেছেন লেখক— পুরুষ ও নারীর সীমান্ত, সমকাল আর কালোত্তীর্ণের সীমান্ত, মানুষ ও পশু-পাখির সীমান্ত, প্রাণী ও উদ্ভিদের সীমান্ত। এই কঠিন কাজের উপযুক্ত ভাষা লেখককে তৈরি করতে হয়েছে, ইংরেজি অনুবাদ তার আভাস দিয়ে যায় শুধু। অনুবাদক অবিচ্ছিন্নতার বোধ তৈরি করতে প্রায়ই ‘কমা’-র মতো যতিচিহ্ন না দিয়ে পরপর অনেকগুলো শব্দ ব্যবহার করেছেন, কখনও বা একাধিক শব্দকে একসঙ্গে লিখে একটি শব্দ তৈরি করেছেন। সীমান্ত-বিনির্মাণের উপযুক্ত এমন নানা কৌশলের প্রয়োজন হয়েছে।

সেই সঙ্গে অসামান্য কিছু দৃশ্যকল্প এই বইকে তার কাহিনির চাইতে অনেক, অনেক দূর প্রসারিত করেছে। তার একটি বৃদ্ধা মা-জির (এই বৃদ্ধাই কাহিনির কেন্দ্রীয় চরিত্র) বড়ছেলেকে নিয়ে। সরকারি অফিসার সে, হোমরা-চোমরাপণার আস্তরণ তাকে কখনও নিজের মনের কথা সহজভাবে প্রকাশ করতে দেয় না, অন্যকে নির্দেশ দেওয়া তার অভ্যস্ত সংলাপরীতি। স্ত্রীয়ের সঙ্গে সর্বদাই কলহ, বোনের সঙ্গে কথা নেই। বোন যখন অসুস্থ মাকে নিয়ে গেল নিজের কাছে, অভিমানে বড়ছেলে তাকে দেখতে যায় না, অথচ মাকে দেখার তাড়নাও দমন করতে পারে না। শেষে একদিন সে বোনের বাড়ির বাইরে একটা গাছ বেয়ে ওঠে, উঁকি দিয়ে মাকে দেখবে বলে। মায়ের প্রতি ভালবাসার এক বিচিত্র প্রকাশ দেখা যায়— সে এক এক করে যেন স্বপ্নে দেখে সেই সব শাড়ি, যে সব পরে মাকে দেখেছে সে, যেগুলো সে নিজে কিনে দিয়েছে মাকে। একটা টাকওয়ালা লোককে গাছে উঠতে দেখে মিটিংরত কাকেরা গোড়ায় মারমুখী হয়ে উঠলেও, কাকেদের নিজস্ব অন্তর্দৃষ্টিতে তারা বড়ছেলের মনের ভিতরের শাড়িগুলো দেখতে পায়— কোটা, গাদওয়াল, কলমকারি, পচমপল্লী ইক্কত শাড়ি যেমন যেমন বড়ছেলের মনে আসে, তেমন তেমন এক এক করে গাছের ডালে ঝুলতে থাকে। মুগ্ধ কাকেরা ঠোঁট দিয়ে একটি কালো কাঞ্জিভরম শাড়ি ঠোঁট দিয়ে ছুঁতে গিয়ে এক প্রবীণা কাকের কাছে ধমক খায়— ছিঁড়ে যাবে না? তারা তখন শাড়িগুলো স্পর্শ করে ডানার আগাটুকু দিয়ে।

এমন নানা অলৌকিক মুহূর্ত বুনে বুনে গল্প যখন সীমান্ত পেরিয়ে, ভিসার তোয়াক্কা না-করা এক বৃদ্ধাকে পৌঁছে দেয় থর মরুভূমিতে, এবং তারও পরে খাইবার পাসে, ততক্ষণে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের সীমান্ত ভেঙে গিয়েছে, পাঠকচিত্ত প্রসারিত হয়েছে এক অ-সম্ভব বাস্তবভূমিতে। ভারতের এক হিন্দু বিধবা পাকিস্তানে তার মুসলিম প্রথম স্বামীকে খুঁজতে যাবে, এবং খুঁজেও পাবে, তাতে অবাক হওয়ার কী আছে? পারিপার্শ্বিক চরিত্ররা বুড়ির কাণ্ড দেখে, কথাবার্তা শুনে হতবাক, কিন্তু সেই বৃদ্ধা— আপাতদৃষ্টিতে যিনি ভীমরতিগ্রস্ত, প্রলাপ বকছেন— নিজের মধ্যে বহন করছেন সব আপাত-অর্থহীনতার অন্তরালের গভীরতর অর্থ। দাঙ্গা-গণধর্ষণ-বন্দিদশা-মৃত্যুভয়ের মধ্যে দিয়ে এক কিশোরীর যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, সে কিছুই ভোলেনি, কিন্তু এক অপরিসীম, সর্বব্যাপী ভালবাসায় বিদ্বেষের মরুঝড়কে পরাহত করেছে। তাঁর প্রেমের শক্তির সামনে মাথা নোয়াতে হয়েছে কালাশনিকভ-ধারী সৈন্যকেও। রাষ্ট্রের মারণশক্তির সামনেও অকুতোভয় সেই প্রেম দেখিয়ে দেয় শহুরে শিক্ষিতের ‘লিবারাল’ ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য কত ঠুনকো। বৃদ্ধার লেখক-সাংবাদিক কন্যার চরিত্রের অসহায় পরাভবে তা ফুটিয়ে তুলেছেন গীতাঞ্জলি। সীমান্ত হল দিগন্ত— বিপরীতের মিলনের জায়গা, আরও দূরে যাওয়ার আহ্বান, তা মানুষের যাতায়াতের বাধা হবে কেন? কাহিনির কেন্দ্রীয় চরিত্রের বয়ানে গীতাঞ্জলি এ কথাগুলো লিখছেন এমন সময়ে যখন সীমান্ত আর সার্বভৌম রাষ্ট্রের সীমানায় আটকে নেই, তা তৈরি হচ্ছে দেশের মধ্যেই, প্রতি দিন, প্রতি রাজ্যে, প্রতি মহল্লায়। এমন সাহিত্যই সেই সীমানাকে নস্যাৎ করতে পারে।

Penguin Books
2022
725 pages

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4046 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...