দুর্নীতির শিকড়ে থাকা দুষ্ট নীতি

অহনা গাঙ্গুলি

 

 

রাজনৈতিক কর্মী, প্রবন্ধকার

 

 

 

নির্বাচিত এবং নির্বাচনের ফলাফলে গণতন্ত্রের সুবাদে মেনে নেওয়া জনপ্রতিনিধিরা মানুষের কাছে “চোর”। এমনকি “শাসকদলের সবাই চোর” জাতীয় কথাগুলো বা ঘটনাগুলোও এখন স্বাভাবিক, নর্মালাইজড হয়ে উঠেছে। এর পরিণতি কিন্তু ভয়ানক। এতটাই ভয়ানক যে শাসকদল সিদ্ধান্ত নিয়ে দুর্নীতির প্রতিবাদ করা এবং দুর্নীতির শিকার হওয়া মানুষদের নির্বিকারে পুলিশি অত্যাচার করিয়ে উৎখাত করতে পারে। একদল যুববয়সি মানুষ, সন্তান কোলে তরুণী মা, শারীরিকভাবে অসক্ষম নির্বিশেষে তারা প্রথমে ন্যায্যভাবে উত্তীর্ণ হওয়া অর্জিত চাকরির অধিকার থেকে উৎখাত হয়েছে; এই সীমাহীন অন্যায়, দুর্নীতির প্রতিবাদ করতে গিয়ে তারা দ্বিতীয়বারের জন্য, আরও ভয়াবহ নির্যাতনের মধ্যে দিয়ে নিজেদের আন্দোলনক্ষেত্র থেকে উচ্ছেদ হয়েছে। এমন বহুগুণিতকে চলতে থাকা অত্যাচারের সামনে “তৃণমূল তো এরকমই”, “নেতা মাত্রেই ঘুষ খায়”— এসব কথাগুলো স্বভাবতই স্বাভাবিক, সাবলীল এবং সঠিক হয়ে উঠেছে। অথচ পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাস তো এমন কথা বলে না।

দুর্নীতি এই মুহূর্তে একটা বিশ্বজোড়া উদ্বেগের বিষয়। নয়া উদারবাদের ঢালহীন, আবরণহীন বাজারে রাজনীতি আর ব্যবসাকে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে নেওয়া হয়েছে; পলিটিকাল বিজনেস/স্ট্রাটেজিস্ট ইত্যাদি নানা ধরনের গালভরা নাম দিয়ে আসলে ঠিক কিসের কেনাবেচা চলছে, আমাদের বোঝা দরকার। সুদূর মেক্সিকোর দিকে তাকাই বা পাশের পাড়া বেহালায়— ডানপন্থী রাজনীতির কর্মকর্তাদের বা মন্ত্রীদের বা আমলাদের— পলাতক হওয়া বা কারাগারে বসে থাকার খবরের ছয়লাপ। এতে আমাদের সকলের সমাজ, রাজনীতি, সংস্কৃতি, মূল্যবোধ, পরিশ্রম করে রোজগার করা টাকা, মিড ডে মিলে শিশুর মুখের এক টুকরো ডিম সবকিছুর ক্ষয় আর অপচয় হচ্ছে। কিন্তু এটা ক্ষণস্থায়ী সমস্যা, তুলনামূলকভাবে। সর্বসাধারণের সম্মিলীত প্রতিরোধের মধ্যে দিয়ে রাজনৈতিকভাবে আমরা একে পরাজিত করতে পারব। কিন্তু চিন্তা এর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবটা নিয়ে— যেটা অনেক বেশি ভয়ের— যেটার কথা বললাম শুরুতেই।

এই দুর্নীতিকে একটা সামাজিক ঘা হিসেবে প্রত্যাখ্যান করা এবং নিন্দা করা ভীষণ জরুরি, তা বড় পরিসরে বামপন্থীরা যত্ন সহকারে করার চেষ্টা করেও চলেছেন, কিন্তু এটাই যথেষ্ট নয়। সমস্যাটি শুরুতেই যুক্তিসঙ্গতভাবে বোঝার প্রয়োজন। অপরাধীদের শাস্তি দিতে হবে এ নিয়ে কোনও প্রশ্নের জায়গা নেই, এক তিল কথোপকথনেরও অবকাশ নেই; তবে আমাদের অবশ্যই সমস্যাটিকে এর মূলে গিয়ে আক্রমণ করতে হবে। একটি সিস্টেম যার উদ্ভব এবং টিঁকে থাকাই চুরির উপর ভিত্তি করে, অর্থাৎ শ্রমিকরা তাদের দৈনন্দিন শ্রম দিয়ে যে সম্পদ তৈরি করে, একটা দৈত্য-ব্যবস্থা কলার উঁচু করে তা চুরি করে— সর্বোচ্চ ঘৃণা দিয়ে আক্রমণ করতে হবে সেই ব্যবস্থাকে। তাই আমাদের যেতে হবে এই দানবীয় ব্যবস্থার মূলে; পুঁজিবাদের মূলে।

দুর্নীতি পুঁজিবাদের একটি স্বাভাবিক পণ্য। এটি এমন একটি ব্যবস্থার মধ্যে থেকে বেড়ে ওঠে যা টাকার অধিগ্রহণকে চরমতম ক্ষমতার উৎসে পরিণত করেছে। যে কোনও কেনা-বেচা এই ব্যবস্থায় অনুমোদিত হয় এবং এমনকি বিপুলভাবে প্রশংসিত হয় যদি সেটি সম্পদের পুঞ্জিভবন ঘটাতে পারে; আরও চলতিভাবে বললে ‘Money making’-ই সব। উদাহরণস্বরূপ, যদি একজন পুঁজিপতি একটি রাইস মিল প্রতিষ্ঠা করে, মুনাফা না হলে ওটি বন্ধ হয়ে যাবে। অথচ এমন অগণিত মানুষ চতুর্দিকে ছড়িয়ে আছেন যাদের বেঁচে থাকার জন্য ভাতের প্রয়োজন। অর্থাৎ দুর্নীতি এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থার এমন একটি অন্তর্নিহিত অংশ যেখানে কর্পোরেটের কর ফাঁকি দেওয়াকে স্বাভাবিক এবং অনিবার্য বলে মনে করা হয়। এরকম একটি স্পষ্ট দুর্নীতিকে অলঙ্কৃত করা হয় “বৈধ”, “ফাঁকিবাজি শিল্প” ইত্যাদি বলে।

লক্ষণীয় বিষয় হল, আজকের ক্রোনি পুঁজি অযৌক্তিক দরগুলি অনেকসময়েই যুক্তিসঙ্গত দরদাতাদের বাইরে রাখে যারা আরও দক্ষ সরবরাহকারী হতে পারে। তবুও, অযৌক্তিক দরদাতাদের তাদের প্রতিশ্রুতি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করার অনুমতি দিয়ে সরকার তাদের পুরস্কৃত করতে থাকে। ক্রমাগত নানান কর্মসূচিতে তারা একত্রিতভাবে কাজ করার বার্তা দেয়। এটি অন্তত অন্যায্য বলা বাহুল্য, এমনকি অবৈধ না হলেও, কারণ দুর্নীতির কোনও স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এটি আরও একটি উদাহরণ যেখানে অন্যায্য ব্যবসায়িক অনুশীলন এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা রাজকোষের ব্যয়ে বেসরকারি খাতের অংশগুলিকে বিপুল মুনাফা অর্জনের অনুমতি দেয়। কিন্তু দুর্নীতির কোনও অভিযোগ ওঠে না।

এটা প্রত্যাশিত যে উদারীকরণের অধীনে এই ধরনের দৃষ্টান্ত বাড়বে কারণ রাষ্ট্র ক্রমবর্ধমানভাবে একটি এজেন্ট হিসাবে তার ভূমিকাকে হ্রাস করে দেবে বা ছেড়ে দেবে যা ব্যক্তিগত বিনিয়োগের সুবিধাজনক হওয়ার জন্য ব্যক্তিগত কার্যকলাপের প্রকৃতি এবং স্কেলকে প্রভাবিত করে এবং নিয়ন্ত্রণ করে। প্রকৃতপক্ষে, একটি আরও “উদার” শাসনব্যবস্থায় রূপান্তরের প্রক্রিয়াটিই দুর্নীতির সম্ভাব্য দৃষ্টান্তে পরিপূর্ণ, কারণ পাবলিক এন্টারপ্রাইজগুলির বিনিয়োগ প্রক্রিয়ায় সরকারি সম্পদের কম মূল্য নির্ধারণের অভিযোগগুলি চিত্রিত করে। ডিকন্ট্রোল এবং ডিরেগুলেশনের প্রক্রিয়ার সঙ্গে বেসরকারি বিনিয়োগের প্রচারের প্রচেষ্টা, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব জড়িত এবং বেসরকারি ক্ষেত্রকে জমি এবং উপাদান এবং আর্থিক সংস্থান অর্জনে সহায়তা করা হয়। ফলস্বরূপ, পুরনো ধরনের দুর্নীতির পাশাপাশি যেখানে রাষ্ট্রীয় কর্মীরা ক্রয় আদেশ বা অনুমতি এবং ছাড়ের সঙ্গে স্বতন্ত্র সংস্থাগুলির পক্ষপাতী হওয়ার জন্য একটি মূল্য দাবি করে, সেখানে একটি নতুন ফর্ম রয়েছে যেখানে রাষ্ট্রীয় সহায়তা থেকে উপকৃত ব্যক্তিরা তাদের প্রাপ্ত স্থানান্তরগুলি ভাগ করে নেওয়ার জন্য আহ্বান করা যেতে পারে।

এইভাবে, নতুন উদারীকৃত অর্থনৈতিক পরিবেশের একটি বৈশিষ্ট্য হল কথিত দুর্নীতির ঘটনা বৃদ্ধি। কিন্তু এই বৈশিষ্ট্যটি বারবার অবহেলা করা হয়. এমন একটি বিশ্বে যেখানে মুনাফা অর্জন এবং সম্পদ আহরণকে উদযাপন করা হয় এবং পুরস্কৃত করা হয়, পরিস্থিতি সেখানে সহজেই জালিয়াতি সনাক্তকরণ বা আইন লঙ্ঘনের দিকে নিয়ে যায়, একটি সম্পদের বৃদ্ধি প্রাইভেট সেক্টর প্লেয়ারকে সাধারণত একটি গুণ এবং “উদ্যোক্তা” এবং “উদ্ভাবন”-এর প্রতিফলন হিসাবে দেখা হয়।

এটি দুর্নীতির সমস্যাকে যে মাত্রায় মোকাবেলা করা যেতে পারে তা সীমিত করে। যদি দুর্নীতি জমা হওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্যে এম্বেড করার প্রবণতা থাকে তবে এটি প্রত্যাশিত যে এটি অন্যথায় হওয়ার চেয়ে অনেক বেশি উপস্থিত হবে। যখনই কর্পোরেট বা রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে সম্ভবত “ফাঁস” হওয়ার কারণে দুর্নীতির অভিযোগ উঠে আসে, তখনই বিতর্ক শুরু হয় এবং তদন্ত শুরু হয়, কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ ফলাফল খুব কম। এটি দুর্নীতির প্রমাণিত মামলাগুলির তদন্ত এবং শাস্তি প্রদানের আরও ভাল উপায়ের দাবিকে বিশেষভাবে যুক্তিযুক্ত করে তোলে। কিন্তু একা এই কাজ হবে না. মূলধনের আদিম সঞ্চয়ের জন্য রাষ্ট্রের রূপান্তরকে বৈধতা দেয় এমন নীতি শাসনের একটি পরিবর্তন একান্ত প্রয়োজন। বেসরকারি ক্ষেত্রের অংশগুলির দ্রুত এবং যথেষ্ট সমৃদ্ধির প্রমাণ উদযাপন করার সময়ও সতর্কতা প্রয়োজন।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4046 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...