Take Your Own Tours

জঁ লুক গোদার

 

[চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম-এর অক্টোবর সংখ্যার প্রচ্ছদ ভাবনা ছিল সদ্যপ্রয়াত (ইচ্ছামৃত) প্রবাদপ্রতিম চলচ্চিত্রকার জঁ লুক গোদার-এর চলচ্চিত্র জীবন। তাঁর জীবন ও কাজের স্মরণ এবং মূল্যায়নে প্রকাশিত হয়েছিল একগুচ্ছ নিবন্ধ। দীর্ঘ এক মাস পরেও আমরা সেই তীব্র গোদার-আবহ থেকে বেরোতে পারিনি। এত বিপুল ও বহুস্তরীয় তাঁর ভাবনা ও কাজের ক্ষেত্র, তাঁকে নিয়ে কোনও আলোচনাই আমাদের যথেষ্ট বলে মনে হয়নি। এই সংখ্যায় আমরা আরেকবার ফিরে দেখতে চেয়েছি গোদার-কে, দেখেছি তাঁরই লেখালেখির মধ্যে দিয়ে। আমাদের স্টিম ইঞ্জিন বা উজ্জ্বল উদ্ধার বিভাগের জন্য অনুবাদ করা হয়েছে গোদারের বহুচর্চিত ‘Godard on Godard’-এর থেকে নির্বাচিত একটি নিবন্ধ। ফরাসি শব্দ ও অনুষঙ্গের ব্যবহারে লেখাটির বাংলা অনুবাদ দুরূহ ছিল, চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম-এর জন্য কাজটি পরম যত্নে সম্পন্ন করেছেন সোমরাজ ব্যানার্জি।]

শর্ট ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল আবারও লাইভ ফিল্মমেকিং-এর উপর বাজে কৌশল খাটিয়ে একটা অ্যানিমেটেড ছবিকে পুরস্কার দিল।

কিন্তু এই চলচ্চিত্র উৎসব নিয়ে বলার আগে, প্রথা ও নম্রতার খাতিরে আমাদের এই শহরের আন্তরিক স্তুতিবিবরণী করা দরকার যা এই শহর নিজেই নিজেকে নিয়ে করে থাকে। যেমনভাবে, ভেনিস নিয়ে লেখা প্রত্যেকটা প্রবন্ধই শুরু হয় সেন্ট মার্ক্সের পায়রার কথা দিয়ে, বার্লিনের ক্ষেত্রে যা পূর্ব ও পশ্চিম ব্লকের মিলন (কারলোভি ভ্যারি-র বিষয়টাও এক) এবং কানের ক্ষেত্রে তারকাদের আকর্ষণ (পুনতা দেল এস্তে এবং লোকার্নো-র জন্যও যা সত্যি)।

তাই, তুহ উৎসবের ব্যাপারে বলার সময় একজন কীরকমের মজাদার ক্লিশে ব্যবহার করবে? বিষয়টা হল, অলৌকিকভাবে, তুহ এমন একটা রহস্যহীন শহর যার ব্যাপারে কোনও ক্লিশে থাকা অসম্ভব। যার ফলে, আমি তোমাদের এটা বলতে পারি।

 

তুহ, আমার কাছে

আমি কোনও দূর দেশ থেকে তোমাকে লিখছি না। ও সবকিছুই আমাদের আলাদা করে রেখেছে। প্যারিসে সব বাড়িগুলো কেমন যেন অন্ধকার। ঘরের ভেতরের সজ্জা ভিসকন্সিয়ান। বাড়িগুলোর রং সাদা। সজ্জা বার্গম্যানের ছবির দৃশ্যের মতো। সব রাস্তাই শরতের উদ্দেশ্যে তাদের যাত্রা শুরু করেছে, যাদের সজ্জা অপালসিয়ান। সকল ছাত্রদের দেখে লা মন্তের কথা মনে পড়ে। প্রেমিনগেরিয়ান সজ্জা তাদের। স্কুলের বালিকাদের দেখে মনে হয় তারা হয়ত এখনও ফ্রাঁসোয়া সাগানের উপন্যাসের বাইরে পা ফেলেনি।

এখন তুমি বুঝতে পারবে কেন তুহকে এত আনন্দবিহ্বল মনে হয়। কারণ এটা একটা আধুনিক আঞ্চলিক শহর। আমার প্যারিসিয়ান বন্ধু, তুমি হয়ত জানো না, আমাকে সেইনের লা কুঁকর্দ-এর আলোর জগৎ থেকে তারকাদের নিয়ে তিনদিনের জন্য লোয়ায় পাঠানো হয়েছে, অথবা রু ওয়াশিংটনের স্ন্যাক বারের স্লট মেশিন থেকে দূরে তুহ-এর গ্রান্দ্ তার্কে পাঠানো হয়েছে, তুমি এটাও জানতে না যে ওই দু ঘন্টার ট্রেনযাত্রায় বোদলেয়ারের বদলে আমি তরুণ কবি রোসার হাত ধরেছি, শহুরে কবিতার ছাইভস্ম ও একঘেয়ে আধুনিকতা ছাড়িয়ে আমার মন ছুঁতে চেয়েছে আঞ্চলিক কাব্য ও তারুণ্যে ভরা আধুনিক জগৎকে। এখানে, সবকিছুই নতুন। তুমি কখনওই বুঝতে পারবে না তুহ থেকে প্যারিসকে কতটা একঘেয়ে, অশ্লীল ও বিমর্ষ মনে হয়। অথবা, ব্রেস্ত, লা হেব, নান্তেস বা সেন্ত নাজয়াহ থেকে দেখলে।

তোমরা, মানে আমার সব বন্ধুরা, যারা এই আপ টু দ্য মিনিট আধুনিকতা নিয়ে এত উন্মত্ত, এটা বুঝতে পারো না যে, তোমরা স্বাধীনতার পর এই অঞ্চল থেকেই পালিয়ে গিয়েছিলে, বলেছিলে, ‘আমার জন্য প্যারিস’। আজকে তার আসল রূপ ক্রমশ বেরিয়ে আসছে। কোনটা? যে বিষয়টাকে তুমি তোমার সব ছবিতে মরিয়া হয়ে ধরার চেষ্টা করছ, পাসি থেকে লাতিন কোয়ার্টারে যাওয়ার জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে পুরনো রাস্তা সঁজ এলিজে। সেকারণেই ‘প্যারিসে যাওয়া’, রাস্তন্যাক ও রুবমপে যে ‘লাইন অব অ্যাট্যাক’-এর অভিব্যক্তি ব্যবহার করেছিল, গেয়া দু’স্তারলিজ-এর ট্রেনে ওঠার আগে আমার কাছে আরও অর্থহীন মনে হয় আমার। তুহ ভ্রমণের পরে ধূসর ধোঁয়ার শহর প্যারিসে ফিরে তাই আমি আর বিজয় ও রৌদ্রের আনন্দ উপভোগ করিনি। বরং, দু’স্তারলিজে ফিরে আসা আমাকে একটা পরাজয়ের কথা মনে করায়, আমার দুঃখ হয় লোয়ার তীর ছেড়ে প্যারিসে ফিরে আসার জন্য।

মোদ্দা কথা হল: ফরাসি সিনেমাকে আত্মম্ভরী হওয়া কমিয়ে শিক্ষাগতভাবে আরও বেশি শহুরে হয়ে উঠতে হবে। যে বিষয়গুলোর সমসাময়িক প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে, তার তিন-চতুর্থাংশই প্যারিসের জগতের বাইরে অবস্থিত। সেকারণেই হয়ত নড়বড়ে পরিচালনা সত্ত্বেও লু ভিভে এই বছরের শ্রেষ্ঠ ফরাসি ছবি। দ্বিতীয় কথা, যেহেতু সবসময় এরকমটা শোনা যায় যে শর্ট ফিল্মের মধ্যে সিনেমার যৌবন ও নান্দনিক ভবিষ্যৎ ফুটে ওঠে, তাই তুহ-এ এই বিশ্ব প্যানোরোমা আয়োজন করা একটা অত্যন্ত ভাল ও মৌলিক ভাবনা কারণ তুহ একটি যৌবনে পরিপূর্ণ শহর যার ভবিষ্যৎ বেশ উজ্জ্বল। হ্যাঁ, কিন্তু….! শর্ট ফিল্ম কি সত্যিই, যেমনটা বলা হয়, সিনেমার ভবিষ্যৎ? বা আরও ভালভাবে বললে, এটা কি আদৌ সিনেমা?

 

শর্ট ফিল্ম পরিত্যাগ করো

শর্ট ফিল্ম নিয়ে কাইয়ে-তে খুবই কম লেখা হয়, এবং কিছু পাঠক এ ব্যাপারে খোলা মনে তাদের মত দিয়েছেন। ‘তুহ ১৯৫৮’ আমাদের এই ফাঁকটা ভরাট করার এবং এই বিষয়টাকে ব্যাখ্যা করে বোঝানোর সুযোগ করে দিয়েছে। সত্যি কথা বলতে, আমাদের কেউই শর্ট ফিল্ম নিয়ে খুব একটা আশাবাদী নই। অর্থাৎ, আমরা কোনওদিনই এটা বিশ্বাস করিনি যে একদিকে শর্ট ফিল্মের যেমন নিজস্ব ধর্ম ও নান্দনিক দিক রয়েছে, অন্যদিকে ফিচার ফিল্মের ধর্ম ও নান্দনিক দিক আলাদা। আমরা যদি শর্ট ফিল্ম নিয়ে খুব কম আলোচনা করে থাকি, বা এমনকি যেগুলো ভাল লেগেছে সেগুলোর নামও উল্লেখ না করে থাকি, তার পেছনে কারণ হল এর মধ্যে দিয়ে একজন চলচ্চিত্রকারের প্রকাশ বা অনুমোদন হয় না— পল প্যাভিওট, জ মিত্রি, আলবার্ট লামরিস, হেনরি গ্ৰুয়েল প্রমুখরা বাদে আমাদের কারওই শর্ট ফিল্মের প্রতি খুব একটা আস্থা নেই। এর মানে আমি এটা বলছি না যে ওঁরা শুধু শর্ট ফিল্মেই বিশ্বাস করেন। ওঁদের ফিচার বানানোর বাসনাও রয়েছে। আমি সেটা জানি এবং সেইজন্য ওঁদের শুভেচ্ছাও জানাই। কিন্তু আমি ওঁদের শর্ট ফিল্মের প্রতি বিশ্বাসকে ভুল বলছি কারণ আমার মনে হয় ওঁদের শর্ট ফিল্মের বিশেষ কার্যকারিতার প্রতি বিশ্বাস অমূলক। ক্লদে মৌরিয়াক বা বাসিন হয়ত বলবেন যে শর্ট ফিল্মের অস্তিত্বের তত্ত্ব ফিচার ফিল্মের থেকে অনেকটাই আলাদা। আমার মতে, শর্ট ফিল্মের অস্তিত্ব নয়, বরং তার সারবস্তু নিয়ে ওঁদের ধারণা ভুল।

কাইয়ে-তে আমরা আজকাল আর এটা সেরকম বিশ্বাস করি না যে আমরা গত কয়েক বছর ধরে সেলুলয়েডের অপব্যবহার করছি। এর কারণ হল, আলা রেনে-র তুত লা মেমোয়ার দু মন্দ নিয়ে আমরা যদি একটু বেশি কথা বলে থাকি, আমরা হিরোশিমা মন আমর নিয়েও সেটাই করব এবং বিষয়টা একই হবে। একইভাবে, আমরা যদি জা ড্যানিয়েল পলের পুভু কু’ন এইট লি’ভরস নিয়ে সেরকম আগ্রহ না দেখাই, আমরা লা লিজ দে মিরে নিয়ে আলোচনায় সেই ফাঁক পূরণ করে দেব। আমরা জর্জ ফঁজুর লা প্রিমিয়ের নুই নিয়ে বেশি কথা বলিনি, কারণ ইতিমধ্যেই লা তেত কন্ত্রে লা মিউহ নিয়ে আলোচনা করেছি। আমরা হয়ত জা হুঁসের শর্ট ফিল্মকে অবহেলা করেছি, কিন্তু লা ইউ ভিভে নিয়ে প্রশংসা করতে কার্পণ্য করিনি— এভাবেই আমরা ত্রিচভিলেরও উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছি। আবার, টু ক্যাচ আ থিফ এবং ভের্তিগো-তে প্রকৃতি নিয়ে কথা বলার মধ্যেই আনেস ভেরদা ও ফ্রাঁসোয়া রেইসেনবাখের কাজের তারিফ নিহিত ছিল, অথবা জুভেনাইল প্যাশন নিয়ে আলোচনায় ফুটে উঠেছে ব্লু জিন্স নিয়ে প্রশংসা। এবং আমরা খুব খুশি হব যদি রজার লিনহার্ট আবার ফিচার ফিল্ম বানানোর দিকে ফিরে যান। তখন আমরা তাঁর বানানো তথ্যচিত্রগুলোর সূক্ষ্মতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে কথা বলতে পারব। কারণ উৎপাদনগত দিক থেকে দেখতে গেলে একটা শর্ট ফিল্ম ও একটা ফিচারের মধ্যে ডিগ্রির কোনও পার্থক্য নেই। অথবা, সেটা থাকা উচিতও নয়। কিন্তু একটা পার্থক্য নিশ্চয়ই দেখা যায়। সেটা কেন হয় আমরা বোঝার চেষ্টা করব।

 

শর্ট ফিল্ম = অ্যান্টি সিনেমা

বিশদে বলতে গেলে, সবকিছুই একটা ক্লাসিকাল দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখা যায়— যা কমবেশি ফুটিয়ে তোলা সম্ভব এভাবে: শর্ট ফিল্মকে সাহিত্যের ছোট গল্পের সমতুল্য হিসাবে দেখা এবং তাকে সমর্থন করা, যেটা পুরোপুরি ভুল নয়। শতাধিক উপায়ে এটা প্রমাণও করা সম্ভব। প্রথমত, আজ অবধি কেউ উপন্যাসের নিরিখে ছোট গল্পের সমর্থনে কলম ধরেননি। দুসেস দে লঁজে লেখার সময় লেখক নিশ্চয়ই লি’স্টোয়ার দে ত্রেজ-এর একটি পর্বের পরিকল্পনা করেন। তাহলে, এটা বোঝা যায় যে ছোট গল্প-নির্ভর ছবিগুলোর মান যথেষ্ট খারাপ, বিশেষ করে যখন সেটা একটা শর্ট ফিল্মের কাঠামোয় ফেলা হয়। যেমন, মেরিমের লা দুবলো মেপহিস থেকে যদি শর্ট ফিল্ম বানানো হয়, তাহলে তা অবধারিতভাবে ব্যর্থ হবে, তার প্রাথমিক কারণ হল একটা শর্ট ফিল্মের স্বল্প পরিসরে কোনও চরিত্রের গভীরতাকে ধরা বা কোনও ক্রিয়াকে পরিপূর্ণভাবে দেখানো সম্ভব নয়।

উই… দ্য ওমান-এ ইনগ্রিড বার্গম্যান ও তাঁর মুরগিকে নিয়ে রোসেলিনির স্কেচ এবং Les Sept péchés capitaux-এ তাঁর ‘এনভি’কে শ্রেষ্ঠ বলা যেতে পারে? কারণ রোসেলিনি কোনও কৃত্রিম প্লটের উপর ভিত্তি করে কোনও কৃত্রিম সাসপেন্স তৈরি করতে চাননি, তিনি একটি অনুভূতিকে ফুটিয়ে তোলার মধ্যেই সন্তুষ্ট ছিলেন, সেটাকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেননি। যদি তিনি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করতেন, তাহলে সেটা হয়ত আর একটা ইউরোপ ৫১ বা ফিয়ার-এ পরিণত হত।

একটা শর্ট ফিল্মের কোনও বিষয়কে নিয়ে গভীরভাবে চর্চা করার পরিসর থাকে না। লা দু বয় দে বুলন-এ ম্যাদাম দে লা পমেয়ায়-এর মেকিনেশন ৯ মিনিটে ফুটিয়ে তোলা যায়— যে সময়টা দিয়েদু-র টেক্সট পড়তে লাগে। কিন্তু ব্রেসোঁর পরিচালিত ছবিটা সত্যিই একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ, নয় মিনিটের শর্ট ফিল্মটা নয়। তাহলে, একজন পরিচালকের বানানো স্কেচ ফিল্ম যেমন, Le Plaisir এর গুরুত্ব কী? কিন্তু এটা নিশ্চিত যে মার্ক অরফিউস একটা ‘triptych’ বানানোর কথাই ভেবেছিলেন, অন্তত সেরকমটা করতেই সম্মত হয়েছিলেন। প্রত্যেকটা প্যানেলই স্বমহিমায় নিজের জায়গা করে নেবে, তারা যতই বাকিদের থেকে আলাদা হোক না কেন, যেমনটা দেখা যায় গ্রানওয়াল্ড-দের ইসেনহেইম অল্টারপিসের মিউজিক প্যানেলে। আবার, পুরো বিষয়টাকে সার্বিকভাবে দেখলেও অসাধারণ মনে হয়। কারণ সব শেষে, ভালবাসা ও মৃত্যু ছাড়া আনন্দ আর কীসেই বা আছে?

এই একই যুক্তি প্রয়োগ করা যায় ফ্লাওয়ার্স অফ ফ্রান্সিস, পাইসা এবং ইন্ডিয়া ৫৮-র ক্ষেত্রেও। কিন্তু দ্য মিরাকল-এর প্রসঙ্গে কী এক কথা বলা যাবে, বা দ্য হামিং ভয়েস-এর ব্যাপারে? আমি আবার পরে জ্যাক ডেমিসের লে বেল আন্দিফেয় নিয়ে কথা বলার সময় এই প্রসঙ্গে ফিরে আসব। দ্য মিরাকল বা এই ধরনের ছবিগুলো শর্ট ফিচার বা প্রচ্ছন্নভাবে পূর্ণদৈর্ঘ্যের ফিচার ধারার মধ্যে পড়ে। এই ছবিগুলোর মধ্যে একটা অভিপ্রায়, একটা দর্শন, পৃথিবীর সম্পর্কে একটা ধারণা— কমিক হোক বা ট্র্যাজিক, ইতিবাচক বা নেতিবাচক, যা আমরা চাই। একটা ফিচার ফিল্মের মধ্যে দিয়ে একজন পরিচালক কোনও একটা তত্ত্বকে প্ৰতিষ্ঠা করে, শর্ট ফিল্মে সেই তত্ত্বের ফলাফল নিয়ে কাজ করা হয়।

উপসংহার হিসেবে বলা যায়: শর্ট ফিল্মে চিন্তার কোনও পরিসর নেই। এটা তাই ইমপিওর সিনেমার একটা অংশ, আন্দ্রে ব্রেসোঁ যার দীর্ঘায়ু দাবি করেছিলেন। এই অশুদ্ধতার থেকে একপ্রকার বৈপরীত্যের জন্ম হয়, যেটার মধ্যে দিয়ে অনেক পরিচালক তাঁদের প্রতিভা প্রমাণ করতে পারেন। তাই শর্ট ফিল্মের কার্যকারিতা নিশ্চয়ই রয়েছে, ঠিক যেমন চিকিৎসার ক্ষেত্রে অ্যান্টিবডির ভূমিকা অপরিহার্য। কারণ, দিনের শেষে এটা একরকম সিনেমাই, এবং প্রাথমিকভাবে বলা যায়, এটা অ্যান্টি-সিনেমা। ফোর্থ ইন্টারন্যাশনাল অফ শর্ট ফিল্ম এর যথার্থ সাক্ষ্য বহন করে। আমরা কী দেখলাম?

সব মিলিয়ে আমরা দেখলাম, ফরাসি শর্ট ফিল্মগুলো— অ্যানিমেটেড ফিল্ম বাদ দিয়ে— সব আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে এবং খুব সহজেই অন্য সব দেশের ছবির মানকে ছাপিয়ে যেতে পেরেছে। কেন? কারণ, একটা ছবির চিত্রনাট্য, দৃশ্য, এডিটিং, সবকিছু খারাপ হলেও দিনের শেষে সবাই মনে করেন যে সেই ফরাসি ক্যামেরার পেছনে যিনি আছেন তিনি একজন শিল্পী। অন্যদিকে, অন্যান্য দেশের ছবিতে চিত্রনাট্য, দৃশ্য, এডিটিং সবকিছু ভাল হলেও মানুষের ধারণা হয় যে যিনি ছবিটা বানাচ্ছেন তিনি একজন কারিগর ছাড়া কিছুই নন। সেই অর্থে, সিনেমার ইতিহাসবিদরা স্কুল অফ ফ্রেঞ্চ শর্ট ফিল্মমেকিং-এর উৎকর্ষ উদযাপন করেন, যেমনভাবে তাঁদের আর্ট কলিগরা উদযাপন করেন বিখ্যাত স্কুল অফ প্যারিসের সাফল্য।

আজকাল শর্ট ফিল্ম ‘প্রাইজ ফর কোয়ালিটি’ ব্যবস্থার মাধ্যমে আর্থিক সাহায্য পায়— এটা স্বীকার করতে কোনও লজ্জা নেই। ইতালিয়ান রাজপুত্ররা তাঁদের প্রজ্ঞার দ্বারা একসময় রোমান ও ফ্লোরেন্টাইন স্কুলকে আর্থিক সাহায্য দিতেন। এর একটা রেওয়াজ আছে, নিয়ম আছে, বাণিজ্যিক ও নান্দনিক কার্যকারিতা আছে, এবং এর ফলে অন্যান্য আত্মনির্ভর স্কুলের মতো এই স্কুলগুলোও সাহায্য পেয়ে তাদের অ্যাকাডেমিক যোগ্যতা বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়। কিন্তু একজন আর্টিস্টের ক্ষেত্রে, অ্যাকাডেমিক হলেও একজন উৎকৃষ্ট কারিগরের চেয়ে একটা কম গুরুত্বপূর্ণ। এটা ভুললে চলবে না যে প্রথা হল বিপ্লবের কন্যা। একজন খুব সাধারণ শিল্পীর এই পরিচয়ই তাঁকে একজন প্রতিভাবান কারিগরের থেকে এগিয়ে রাখে। বুনুয়েলের একটা খারাপ ছবি সেকারণেই অত্যন্ত দক্ষ রেনে ক্লিমঁ-র একটা ভাল ছবির থেকে এগিয়ে থাকে, যেমনটা আঁতোয়া লারার সবচেয়ে ভাল ছবি ভিসকন্তির একটা খারাপ ছবির কাছে হেরে যায়। একজন আর্টিস্টের কাছে সবাই প্রত্যাশা করে যে তিনি সবসময় নিজেকে ছাপিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবেন যেটা একজন কারিগর কখনওই করবেন না। কারণ কারিগর মানে সে নিতান্তই শিল্পের একজন কর্মী। তুহ-তে দেখানো সব ছবি দেখে আমার এটাই মনে হয়েছে যে বিদেশি ফিল্মগুলো এই শিল্পকর্মীরাই বানিয়েছেন। যদিও আমরা সেগুলো ভাল লাগেনি, তবুও অন্তত প্যাভিও ও লামরিসের ছবিগুলো আমার ভেতরে কোনও অবসাদের জন্ম দেয়নি।

আমি আগে যেটা বলছিলাম, এখানে তার প্রমাণ পেয়েছি। শর্ট ফিল্মের মানকে তাঁরা এতটাই গুরুত্ব দেন যে অন্যান্য দেশের তথ্যচিত্র তাঁদের কাছে খুব একটা সন্তোষজনক নয়। উদাহরণ হিসেবে রবার্ট মেনগজের তথ্যচিত্র ট্রিজ আ লাগরকে ধরা যাক, যেটা ল্যাক গ্যাসের বিষয় নিয়ে নির্মিত। আমার মতে এটা আলা রেনের পেশিনারি রিফাইনারির উপর বানানো তথ্যচিত্র লা চান্ত দু স্তাইরিনের থেকে অনেক নিম্নমানের। মৌলিকতার দিক থেকে প্রথাগত হলেও ব্রুনো সেফ্র্যাঙ্কা পরিচালিত চেক ডেঞ্জারাস ট্রেডস ছবির থেকে এই কাজের মধ্যে সূক্ষ্মতা ও বুদ্ধিমত্তার প্রতিফলন বেশি। বলতে গেলে, সেফ্র্যাঙ্কার কাজ যেমন মেনগজের থেকে নিন্মমানের, সেরকমই মেনগজের কাজ রেনের তুলনায় ফিকে। এটা বোঝানোর জন্য আমি চেক, পোলিশ, বেলজিয়ান, জার্মান— যেকোনও ভাষার ছবিই নির্বাচন করতে পারি, এবং সেগুলোকে এদোয়ার্দ লগেরু, জাঁ লোতে, চার্লস প্রোস্ট, জর্জ বোর্ডেলন-এর ছবির সঙ্গে তুলনা করতে পারি, আবার এই পরিচালকদের কাজকে তাদের থেকে আরও উঁচু মাপের কাজের সঙ্গে তুলনা করে দেখতে পারি, যেমন জ্যাক ডেমির লে বেল ইনডিফারেন্ট, আনেস ভেরদার কোত দ্যা’জিও বা লোয়ার, জ্যাক রোসিয়ের-এর ব্লু জিন্স অথবা আমার ব্যক্তিগত পছন্দের রানার-আপ ছবি, স্টাইরিন, তার কোনও তুলনা চলে না।

 

ফরাসিতে অসম্ভব বলে কোনও কথা নেই

এই ছবিগুলো ১৯৫৮ সালে তুহ-তে তাদের ছাপ রেখে গেছে এবং আমার মতে তার একটা কারণ হল প্রত্যেকটা ছবিই শর্ট ফিল্মের নান্দনিক পরিসরের চারটে পথের যেকোনও একটাকে ছুঁয়ে গেছে। বর্তমানে একটা শর্ট ফিল্মকে আসল সিনেমার পর্যায়ে উন্নীত হতে গেলে আগের থেকে অনেক বেশি বুদ্ধিদীপ্ত হয়ে উঠতে হবে। গ্রিফিতের দ্য নিউ ইয়র্ক হ্যাট বা চ্যাপলিনের দ্য ফ্যায়ারম্যানের মতো কাঁচা কাজ আর চলবে না। মানে আমি বলতে চাইছি যে, সেনেটের সময়ে সিনেমাটোগ্রাফিক উদ্ভাবন অনেকটাই স্বতঃস্ফূর্ততার উপরে নির্ভর করত এবং যেকোনও নান্দনিক প্রচেষ্টার এটাই ছিল সূত্রপাত যা বর্তমানে হয়ে গেছে ঠিক উল্টোটা। ফুটেজ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এটা আরও বেশি জটিল ও সুচিন্তিত মাধ্যম হয়ে উঠেছে এবং স্বভাবতই এর স্বতঃস্ফূর্ততা কমে গিয়েছে। ঐতিহাসিক দিক থেকে গেলে গেলে বলতে হয়, আজকের দিনে একটা শর্ট ফিল্ম বানানো মানে সিনেমার শুরুর দিকে ফিরে যাওয়া।  তাই, এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই যে প্রতিভাবান রজার লিনহার্তের বানানো প্রথম দিকের শর্ট ফিল্মগুলোর একটিকে লা নিসস দু সিনেমা বলে অভিহিত করা হয়। এই স্বাভাবিক স্বতঃস্ফূর্ততার বদলে আজকে দরকার সুচিন্তিত বুদ্ধিমত্তা। এই অন্তর্নিহিত বৈপরীত্যের জন্যই বহুদিন যাবৎ শর্ট ফিল্মকে একটা ভুল ধারার ছবির পর্যায়ে নামিয়ে রাখা হয়। শর্ট ফিল্ম বানানো এখন অসম্ভবকে সম্ভব করার চেষ্টারই সামিল।

ধরা যাক, তোমাকে রেলওয়ে নিয়ে একটা ছবি বানাতে বলা হল। আমরা ইতিমধ্যেই দেখেছি, লা’ভেইভে এন গেয়ার দে লা সিওতা-এর সময়ে একটা ছবির বিষয়ে ছিল ট্রেন— প্রামাণ্য হিসেবে বলা যায় যে লুমিয়ের এই ছবিটা বানিয়েছিলেন। কিন্তু বর্তমানে একটা ট্রেন কোনওভাবেই একটা ছবির বিষয় হতে পারে না, এটা বরং একটা থিম হিসেবে কাজ করতে পারে যাকে নিয়ে কাটাছেঁড়া করা যায়। তাই এটা একটা খুব কঠিন কাজ হয়ে দাঁড়াবে কারণ তখন তোমাকে আর একটা কোনও বিষয় নয়, বরং সেই বিষয়ের ছায়া বা তার প্রতিলোমকে ক্যামেরাবন্দি করতে হবে। এবং এভাবেও তোমাকে সিনেমা বানানোর চেষ্টা করতে হবে যদিও তুমি আগেই জেনে গিয়েছে যে তুমি অ্যান্টি-সিনেমা বানাচ্ছ। সে কারণেই সেরা শর্ট ফিল্ম সেগুলোই হয় যেগুলো নান্দনিক বিষয়ের ঘেরাটোপে নিজেকে আবদ্ধ করে রাখে না। কীভাবে? ট্রাভেল স্কেচের স্বাধীনতার মাধ্যমে— যেমন, আনেস ভেরদার (?) কোত দে লা কোত, তাত্ত্বিক কাঠামোর কাঠিন্যের মাধ্যমে— যেমন, জ্যাক ডেমির লে বেল ইন্ডিফারেন্ট, প্রাণবন্ত মূকনাট্যের মাধ্যমে— যেমন, জ্যাক রোসিয়ের-এর ব্লু জিন্স, অথবা অসীমের অন্বেষণ— যেমন, আলা রেনের লা চান্ত দু স্তাইরিন।

 

ক্যামেরাউম্যানের হাতে

আনেস ভেরদার শর্ট ফিল্ম নিয়ে অনেকরকম আলোচনাই করা যায়। প্রথমে তাঁর ছবিগুলোকে কালানুক্রমে সাজানো যাক— ও সাইসন্স, ও সাতু— ১৯৫৭ সালের শরতে নির্মিত, গত বসন্তে অপেরা মুফ, গত গরমকালে দু কোত দে লা কোত। বিজোড়গুলো রঙিন ছবি, মন্ত্রক বা অন্য কোথাও থেকে সাহায্যপ্রাপ্ত এবং সবকটাই তুহতে দেখানো হয়েছে। এভাবেও বলা যায় যে, ও সাইসন্স, ও সাতু রোসার্দিয়ান নন্দনের মাধ্যমে কবিতাকে প্ৰকাশ করে, অপেরা মুফ ব্রেখট-এর ধারায় নির্মিত আর দু কোত দে লা কোত প্রুস্ত-এর শিরোনামে সাহিত্যের বহিঃপ্রকাশ, যা গিয়দু-র লেখা দৃশ্য ছবিতে ফুটিয়ে তোলে। কিন্তু এই কাজগুলোর মধ্যেকার প্রভেদ সরিয়ে রেখে আমরা যদি সাদৃশ্যগুলো লক্ষ্য করার চেষ্টা করি আমরা বুঝতে পারব কেন তারা নান্দনিক ঘেরাটোপ থেকে নিজেদের মুক্ত করতে পেরেছে।

সিনেমার জগতে এই ছবিগুলো অনেকটা যেন উপন্যাসের ছক বা পেইন্টিং-এর স্কেচের মতো। আসলে এগুলো সবকটাই এক একটা জার্নাল, মনে হয় যেন প্রত্যেকটা পাতা থেকে বিদ্রূপ একেবারে তিন লাফে পরের পাতায় সৌন্দর্য, আতিশয্য ও আনন্দের পায়ের কাছে গিয়ে পড়ছে। যেন আগনেস ভেরদা লোয়েরের উপর দিয়ে ভেসে যাওয়ার সময় জাহাজের রেকর্ড লিখে রাখছেন, এবং এই পৃথিবীর কোনও এক রমণীর জার্নাল যা সতর্ক চোখে ব্লইসের নরকের দিকে তাকিয়ে আছে, অথবা ট্যুরসের গাছেদের সারি, বা আজায় লে রিদু র প্রস্তরমালা। মনে হয় যেন এ এক অন্তরঙ্গ দিনলিপি, অর্থপূর্ণ, যা ছড়িয়ে আছে ডেনফার্ট থেকে কনস্টানকার্পে। এবং অবশেষে, একজন বুদ্ধিমতী মহিলার জার্নাল যে নিস আর সেইন্ট-ট্রপেজ শহরের মধ্যে ঘুরে ঘুরে তাঁর বন্ধু ক্রিস মার্কারকে পোস্টকার্ড পাঠিয়ে প্রত্যুত্তর জানাচ্ছেন।

দু কোত দে লা কোত একটা অপূর্ব ছবি। ফ্রাঁস হোস-কে ইম্প্রেশন দি’তালি-র সাতুব্রিয়ন, ক্রকি আফ্রিকাঁ-র দেলেক্রয়, দে লা’লেম্যানিয়ার ম্যাডাম দে স্টেইল, প্যাসতিস এত মেলর-এর প্রুস্ত, আনিসে উ লু প্যানোরমা-র আরাগন, লা ফ্রাঁস সেন্টিমেন্টাল-এর গিয়দু এবং আরও বেশ কিছু জিনিস দিয়ে গুণ করলে এরকম একটা ছবি তৈরি হয়। আমি এই দৃশ্য কখনওই ভুলব না যেখানে বালির উপর একটা মুচড়ে যাওয়া গাছ দাঁড়িয়ে আছে যার শাখায় ক্যামেরা প্যান করে একবার এগিয়ে যাচ্ছে আর পিছিয়ে আসছে এবং এই দৃশ্য শেষ হচ্ছে আদম আর ইভের লাল নীল জুতোয়। এখানে বলে রাখা উচিত যে আনেস ভেরদার ছবিতে অরণ্য একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবং এই ইমেজ তাঁর ছবিতে বারবার ফিরে ফিরে আসে। এই প্রসঙ্গে আরও বলা যায় যে, দু কোত দে লা কোত-এর পরে দেখা হয় বলে লা পেয়াত কোতে-র খানিক লাভ হয়ে থাকে। কিন্তু এখন আর সময় নেই। আরও অনেক কিছু বলার আছে। এটা অনেকটা হীরের মতো, যা সহস্র অভিমুখে আলো বিকিরণ করে। সেরকমই, ফরাসি ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে আনেস ভেরদার ছবিগুলো মুক্তোর মতো উজ্জ্বল উপস্থিতি বহন করে আসছে।

 

জ্যাক দেমির মেথড নিয়ে আলোকপাত

আমি সেই সমস্ত ছবি পছন্দ করি যেখানে স্রষ্টা তাঁর ছাপ রেখে যান। জ্যাক দেমির ছবির ক্ষেত্রে গাড়ি করে স্কোয়ার অফ স্টারস খুঁজতে আধঘন্টা সময় লেগে যায়। আবার, আধঘন্টা সময়ে দেখতে পাওয়া যায় একজন মুচি জুতো বানাচ্ছেন এবং একজন মহিলা বুঝতে পারেন যে তাঁর প্রেমিক তাঁর প্রতি উদাসীন। অর্থ্যাৎ, মন্থরতার প্রতি একটা অদ্ভুত পক্ষপাত লক্ষ করা যায় তাঁর ছবিতে। যেসব দর্শক মন্থরতার জন্য অরদেত ছবিটিকে পছন্দ করেন না, তাঁরা লে বেল ইনডিফারেন্ট নিয়েও একই কথা বলেন। কিন্তু তাঁদের কথা দুটো কারণে ভুল।

প্রথমত, লে বেল ইনডিফারেন্ট আদৌ খুব ধীরগতির ছবি নয়। এটা অনেকটা একটা স্পোর্টস কারের মতো যার ইঞ্জিন একে ক্রমশ চরম গতির দিকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য ক্ষমতা জোগান দিতে থাকে এবং কোনও বাধা ছাড়াই চরম টেনশনের দিকে পৌঁছে যাওয়ার পর এটি শান্ত হয়, ঠিক যেমনটা ঘটে একটা বলিডের ইন্ডিকেটর ২৪০-এ পৌঁছে যাওয়ার সময়। দ্বিতীয়ত, দ্রুত বা মন্থর হওয়ার কারণে কোনও ছবিকে ভাল বা খারাপ বলে দাগিয়ে দেওয়া যায় না। যেমন, পেনিওয়ার্থ অফ হোপ-এর কোয়ালিটি এর স্পিডের উপর নির্ভরশীল নয় (বস্তুত, এটা এমন একটা ছবি যেখানে কিছুই ঘটে না), বরং নির্ভর করে স্পিডের উপযুক্ততার উপর। একইভাবে, অৰ্দেত ছবিটির মান তার মন্থরতা নয়, বরং মন্থরতার উপযুক্ততায় প্রকাশ পায়।

জ্যাক দেমির ছবির প্রধান কোয়ালিটি হল এর প্রশংসনীয় উপযুক্ততা। এখানে আমি কথা বলব গত বছরের এপ্রিল সংখ্যার ‘ফটোগ্রাফি অফ দ্য মান্থ’ নিয়ে যেখানে প্রচ্ছদে মন অঙ্ক ছবিটার একটা শট ফিচার করা হয়েছিল— যার থেকে রং ও সজ্জার সৌন্দর্যে লে বেল ডিফারেন্ত অনেক এগিয়ে। কেন দেমির ছবি অন্যরকম হতে পারে না বা হওয়া উচিত না— এ বিষয়ে রহমারের থেকে আরও ভালভাবে ব্যাখ্যা করা অসম্ভব। ককতুর ছবির মুখ্য বিষয় আমাদের সকলেরই জানা: একজন মহিলার মনোলগ যিনি তার প্রেমিককে কথা না শোনার জন্য আটক করার চেষ্টা করছেন। দেমি, যৌক্তিকভাবে এই মনোলগ বা নাটকীয় ডিভাইসটিকে অতিরঞ্জন করে ব্যবহার করতে চেয়েছেন। কারণ এই বাহ্যিক পরিসরের প্যাসেজ থেকে বেরিয়ে দেমি সিনেমাকে আবিষ্কার করেছেন। যেমন অরফি ইউরিডাইসকে খুঁজে পেয়েছিল, ঠিক সেভাবে দেমি ককতুকেও আবিষ্কার করেন। কারণ এটা ভুললে চলবে না যে, লা ভস ইউমেনা-র লেখকের প্রতিও তাঁকে বিশ্বস্ত থাকতে হয়েছে এবং দেমির এটা উপলব্ধি করার বুদ্ধিমত্তা রয়েছে যে তিনি এই বিশ্বস্ততা বজায় রাখতে পারবেন তখনই যখন তিনি লে পাঁহ তেরিবলে-র মিসে এন সিনের থেকে সম্পূর্ণ বিপরীত অ্যাপ্রোচ নিয়ে কাজটা করবেন। ভুল তখনই হত যদি তিনি মেলভিলের ছবিতে নিকোল স্টেফিনের স্বরভঙ্গির অনুকরণ করার কোনওরকম চেষ্টা করতেন। জেন আলার্দ-এর গলায় অননুকরণীয় লাইনগুলো শোনার সময় আমার হঠাৎই মালারুর কথা মনে পড়ে— একদিন আমি একজন মানুষকে নিয়ে উপন্যাস লিখেছিলাম যে নিজের কণ্ঠস্বর শুনতে পেয়েছিল এবং আমি এর নাম দিয়েছিলাম লা কনডিসিয়ন ইউমেনা

 

Let us see if Rozier

ব্লু জিন্স এমন একটা ক্যাটাগরির ছবি যার প্রিন্সিপাল ভুল, অর্থাৎ এটা তথ্যচিত্র ও ন্যারেটিভ ফিকশনের মাঝামাঝি কিছু একটা। এখানে শিল্প একটু কঠিন কারণ একদিকে যেমন, একটা ন্যারেটিভ ফিচারের সাসপেন্স তৈরি করার জন্য প্লট খুব গুরুত্বপূর্ণ, অন্যদিকে সেই প্লটকে ঠিকভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য পর্যাপ্ত সময়ের অভাব। কিন্তু গল্প বলার তাগিদে শুধু শুরু ও শেষকে প্রাধান্য দেওয়া অর্থাৎ প্রণালী মেনে চলা ছাড়া উপায় থাকে না যার ফলে সেই শিল্পকর্ম অনেকটাই থিওরিটিকাল হয়ে ওঠে, প্রাণময় লাগে না। সুতরাং, নাটকীয় গঠন থেকে অনেক বেশি সরল অনুভূতি তৈরি হওয়া উচিত, এতটাই সরল যে তাতে গভীরে গিয়ে পর্যালোচনার সময় যেমন থাকবে, তেমনই এই এন্টারপ্রাইজকে ন্যায্যতা দেওয়ারও শক্তি থাকবে।

আমার মনে হয় না রোজিয়ে ব্লু জিন্স বানানোর সময় এইসব কার্তেসিয়ান যুক্তি নিয়ে পর্যালোচনা করেছিলেন। কিন্তু তাঁর ছবিতে এগুলো যাচাই হতে দেখা যায়। আনেস ভেরদার মতো ইচ্ছাকৃত নৈমিত্তিকতার উপর ভরসা করা বা দেমির মতো কবিতার ক্ষমতায় আস্থা না রেখে রোজিয়ের পুরোপুরি জোর দিয়েছেন প্রাঞ্জলতার মধ্যে থেকে নানারকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানোয়। ব্লু জিন্স সেরকমই একটা সুন্দর, ঝকঝকে ও তারুণ্যে পরিপূর্ণ ছবি যেমন রাবোঁ তাঁর লেখায় যৌবনের সৌন্দর্য নিয়ে বলতেন। এখানে তথ্যের সত্যতা ন্যারেশনের চারুতার সঙ্গে মিশে একটা সাধারণ সেন্স তৈরি করে। কানের রাস্তায় মেয়েদের সন্ধানে যারা স্কুটার নিয়ে ঘুরে বেড়ায়, তাদের দুরকমের লেআউট হয়— কোয়াসেত বা রু দ’নতিবের রাস্তা ধরে সুচারু ও লম্বা ট্র্যাকিং শট, সাহসীভাবে এডিট করা একের পর এক ডিরেক্ট শট। সংলাপ ও ভঙ্গির সত্যতা, ফটোগ্রাফির বাস্তবতা এবং জানলার খড়খড়ি দিয়ে কবিতার মতো তপ্ত বালির উপর শায়িত বিকেলের সুচারু নিবেদন এই ছবির খুব বড় অংশ। আমি বুঝতে পারি না, কেন কার্লোস ভিয়াদেবোর ভিভা একটি অত্যন্ত মানবিক ছবি হিসেবে গণ্য হয়, কিন্তু রোজিয়েরের ব্লু জিন্স তা হয় না। যদিও এটা সময়ের বয়ে চলা নিয়ে বানানো একটা ছবি— কিসের বয়ে চলা? চুম্বন ও প্রতিচুম্বনের। তাই এটা নৈতিক— আনন্দ ও দুঃখদায়ক উভয়ই। লুই আরাগঁ-এর কথায়,

চুম্বনের চতুষ্পথে
সময় খুব তাড়াতাড়ি বয়ে যায়
সাবধান সাবধান সাবধান
ছিন্নভিন্ন স্মৃতিপুঞ্জ

 

সিনেমার সন্ধানে

যদি শর্ট ফিল্মের অস্তিত্ব ইতিমধ্যেই না থাকত, তাহলে আলা রেনে নিশ্চয় নিজে সেটা আবিষ্কার করতেন। একমাত্র তাঁর কাছে শর্ট ফিল্মের মানে হয়তো অনেক বেশি কিছু। ভ্যান গখ-এর অদেখা ও কম্পমান ক্যামেরা প্যান থেকে স্তাইরিন-এর রাজকীয় ট্র্যাকিং শট, এগুলোতে আমরা কী দেখতে পাই? সিনেমাটোগ্রাফিক কৌশলের সম্ভাবনার এক দুর্দান্ত প্রয়োগ, কিন্তু সেটা এতটাই যথাযথ যে তার নিজের উদ্দেশ্যকে অতিক্রম করে ফেলে, এবং যেটা ছাড়া আজকের দিনের যৌবনময় ফরাসি সিনেমা অসম্পূর্ণ। অন্যান্য যেকোনও পরিচালকের তুলনায় আলা রেনের কাজ দেখে একমাত্র মনে হয় যে তিনি শূন্য থেকে শুরু করেছেন। ভ্যান গখ এবং তাঁর পরবর্তী কাজগুলোতে ক্যামেরার ব্যবহার অনেক ক্ষেত্রেই ক্যামেরার চলনের নিগূঢ়তার অন্বেষণ হিসেবে ধরা দেয়। আর একজন একাকী এক্সপ্লোরার আন্দ্রে বাজিনের কাজেও এই শূন্য থেকে শুরু করার প্রবণতা লক্ষ করা যায়, কিন্তু তাঁর ধরনটা একটু আলাদা।

এই বৈশিষ্ট্যগুলো নিয়ে সুস্পষ্ট চেতনা নিয়ে কাজ করার আগে রেনেকে তাঁর রহস্যময় নিগূঢ়তাকে প্রকাশ করার উপায় আবিষ্কার করতে হয়েছিল। যেমন, যদি লেস স্তাচুস মিউরে উসি মন্তাজের মাধ্যমে ট্র্যাকিং শটকে ধরে রাখার প্রামাণ্য বহন করে, তাহলে তার উল্টোটাও হওয়া প্রয়োজন, যা তৌত লা মেমোয়ার দু মন্দ-এ কিছুটা এবং লে সন্ত দু স্তাইরিন-এ আরও বেশি করে দেখা গেছে। আমি প্রথমবার স্তাইরিন দেখার কিছুদিন আগে সিনেমাঠেকে আবার অক্টোবর দেখেছি। এবং দ্বিতীয়বার দেখার পর আমার এটা বলতে ভয় নেই যে, আলা রেনে পৃথিবীর দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ এডিটর, আইজেনস্টাইনের পরেই যাঁর স্থান। তাঁদের কাছে এডিটিং-এর মানে ছিল সিনেমাটোগ্রাফিকে সুসংহত করা, অন্য কথায়, নাটকীয় পরিকল্পনা এবং সঙ্গীতের মতো কম্পোজিশন গড়ে তোলা, সর্বোপরি, শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র নির্মাণ।

আমার মতে, আইজেনস্টাইনের পর কোনও ছবি যদি বৈজ্ঞানিকভাবে পরিকল্পিত হয়ে থাকে, তা হল লা সন্ত দু স্তাইরিন। এক্ষেত্রে একটা উদাহরণই যথেষ্ট। রবার্ট মেনগজ ল্যাক রিফাইনারিতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, যেখান থেকে তিনি একটা শর্ট ফিল্ম বানানোর উপাদান পেয়েছেন। সেখানে তিনি কয়েকজন লাল ওভারঅল পরা শ্রমিকের দেখা পান। তাঁদের মুখে ছিল গ্যাস-মুখোশ। এই দৃশ্য দেখার পর তাঁর মনে হয়েছে, ‘আরে এটা তো একদম কল্পবিজ্ঞানের মতো। আমি অবশ্যই আমার ছবিতে এই দৃশ্যটা রাখব।’ প্রায় একইদিনে আলা রেনে পেশিনারি রিফাইনারিতে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন এবং তিনিও সেখান থেকে একটা শর্ট ফিল্ম বানানোর উপাদান পান। তিনি একইভাবে কিছু গ্যাস-মুখোশ পরিহিত শ্রমিকদের দেখেন। এবং মেনগজের মতো তিনিও কল্পবিজ্ঞানের পরিকল্পনা নিয়ে ছবিতে এই বিষয়গুলো তুলে ধরেন। কিন্তু এই অ্যানালজি এখানেই শেষ হয়ে যায়। মার্সের এই শ্রমিকদেরকে ফিল্ম করার সময় তাঁর ভেতরে জারিত অনুভূতি থেকে রেনে বুঝতে পেরেছিলেন যে তিনি এই অনুভূতিকে আরও জোরদার করতে পারেন। কীভাবে? এডিটিং-এর সাহায্যে এই মুখোশ পরিহিত মানুষদের কেটে বাদ দেওয়ার মাধ্যমে, যেখানে মেনগজ সেগুলোকে ছবির মধ্যে রেখেছিলেন। আলা রেনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা হল এই যে তিনি অন্যদের থেকে সবসময় এক ধাপ এগিয়ে। এই কারণেই, মলিনারো পরিচালিত পেশিনারি কারখানা নিয়ে আর এক শর্ট ফিল্ম লেস আলকেমিস্তেস-এর ট্র্যাকিং শটগুলো একই ভ্যাট ও একই পাইপের উপর দিয়ে গেলেও তা রেনের ছবির ধারেকাছে আসে না। এর কারণ হল, রেনে আধুনিক ট্র্যাকিং শটের জনক। এর রুদ্ধশ্বাস গতি, শুরু-শেষ এবং তার বিপরীত— সবকিছু তাঁর নিজের হাতে তৈরি। কারণ, তিনি এই সমস্যা নিয়ে নিজেকে প্রশ্ন করেছিলেন এবং নিজেই তার সমাধান খুঁজে পেয়েছেন।

লা সন্ত দু স্তাইরিন প্লাস্টিক নিয়ে বানানো একটা ১৪ মিনিটের শর্ট ফিল্ম যার কাজ চলেছিল ১৪ মাস ধরে। এর উপর রেমন্ড কুয়েনোর মন্তব্য রেনওয়ারের প্রিয় বিখ্যাত ডিসলোকেশন-এর প্রবর্তনের মাধ্যমে এই ছবির প্রত্যেকটা ইমেজকে তাসলিনেস্ক বানিয়ে তোলে। এবং এর ফল: সিনেমাস্কোপ ও রং: কোনও জীবিত চরিত্রের উপস্থিতি ছাড়াই শটগুলো একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত (অর্থাৎ, কাটিং ও ড্রামাটিক এফেক্ট-এর উপাদান খুব সহজে সেখানে পাওয়া যায়)। প্রায় একশোটা শট এমন অভূতপূর্বভাবে একে অপরের সঙ্গে জুড়ে আছে যেন দেখে মনে হয় একটাই লম্বা শট সিকোয়েন্স, অনেকটা জুপিটারিয়ান ট্র্যাকিং শটের মতো যার নামের মধ্যে জোহান সেবেস্টিয়ান বাকের মহান গীতিনাট্যের অনুরণন অনুভব করা যায়।

উপসংহারে চারটে ছবির নাম নিতে অসুবিধা হয় না— দু কোত দে লা কোত, লা বেল ইনডিফেরেন্ত, ব্লু জিন্স, লা সন্ত দু স্তাইরিন। তাই, যেকোনও শর্ট ফিল্মকে অসাধারণ হতে গেলে এই চারটের যেকোনও একটার মতো হতে হবে, নচেৎ তার কোনও সৌন্দর্য থাকবে না।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4063 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...