২০২২ কাতার ফুটবল বিশ্বকাপ— ফেভারিটদের লড়াই, সোনার লড়াই

শৌভিক চক্রবর্তী

 

২০ বছর, ব্রাজিল আর কিছু প্রলাপ

মাটি ধরিয়ে ছোট্ট ডজে গোল হয়েছিল সেই বছর ২০ আগে। তখনকার শ্রেষ্ঠ গোলকিপার অলিভার কান শুধু দাঁড়িয়ে দেখেছিলেন কীভাবে একটা লোক শুধু একটা হাঁটুর উপর নির্ভর করে একটা গোটা বিশ্বকাপ জিতিয়ে দিতে পারে। কিন্তু সেই ঝর্না ঘি আর টাটার নুন দিয়ে খাওয়া ভাতের গন্ধ বহুদিন আগেই শুকিয়ে গেছে। তারপর ৯ নম্বরের আকাল। একদিকে অদ্ভুত(?) ফরোয়ার্ড লুইস ফ্যাবিয়ানো, অপরদিকে অসাধারণ সম্ভাবনাময় রবিনহো, যার কথা মনে পড়লেই বুকের ভেতরটা কেমন মুচড়ে ওঠে। ফেলিপে মেলোর পাস থেকে হল্যান্ডের এগেন্সটে যে গোলটা ও করেছিল, সেটা তো আর ভোলার নয়। তারপর তো ওই দুই দানব— স্নেইডার আর রবেন মিলে ফুটে ফুলকপি করে দিল। ২০১৪ আর ২০০৬ না হয় বাদই রাখলাম। যদিও ২০০৬-তে মনখারাপ আরও বেশি হয়েছিল, কিন্তু আগুনে অঁরি আর শৈল্পিক জিদানের কাছে তখন কিই বা করার। জুনিনহোর ফ্রিকিক বাইরে যাচ্ছে, রোনাল্ডিনহোর ডজ আটকে যাচ্ছে, সে মানে যা তা একেবারে!

২০১৮-তে অবশ্য চান্স ছিল। এবং ফার্নান্দিনহোর আত্মঘাতী গোলের পরেও অনেকটা সুযোগ ছিল। সেখানে বেলজিয়াম ট্যাক্টিক্যালি হারাল, সৌজন্যে গত চার-পাঁচ বছর ধরে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অ্যাটাকিং মিড কেভিন দে ব্রয়েন। কিন্তু ওসব থাক, সে বেলজিয়াম স্যামুয়েল উমতিতির গোলে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিয়েছিল, আজকে তো আর ঠিক সুস্থ মস্তিষ্কে ভাবা যায় না! তাই পুরনো কথা বাদ দিয়ে একটু সামনের দিকে তাকানো যাক। আর সেটা অবশ্যই রিও ডি জেনেইরো, কোপাকাবানা তটকে ঘিরেই।

কোচ তিতে আস্তে আস্তে টিমটাকে রিবিল্ড করেছেন। আগে তাড়িয়ে ছেড়েছেন সব ঝরতি-পড়তিদের। তাই এ বছর আরও অপশন বেড়েছে তিতের হাতে। যদি ধরেই নিই ৪-২-৩-১-এ খেলা হতে চলেছে, সেক্ষেত্রে উপরে জেসুস/ববি ফিরমিনো/রিচার্লিসন। মানে একসঙ্গে তিনটে সেন্টার ফরোয়ার্ড, কে যে শুরু করবে সেটাই একটা দূরূহ ব্যাপার। বাঁয়ে লেফট উইংয়ে ভিনি/রড্রিগো, ডানে রাফিনহা/অ্যান্টনি। এই ত্রিভুজের মাঝে বল পায়ে ছন্দে ছন্দে রং বদলানোর কাজটা চালাবে একমেবাদ্বিতীয়ম ১০ নম্বর নেইমার। পিওর অ্যাটাকিং মিড যার কাজই হবে নিজে কখনও কখনও চকিতে গোলের মুখ খোলার থেকেও গোল করানো বেশি। এবং সেটা পিএসজিতে বেশ ভালই করছে নেই। সঙ্গে লুকাস পাকেতা। এ বছর লিঁও থেকে ইপিএলে ওয়েস্ট হ্যামে আসলেও পারফরম্যান্সে কিন্তু ঘাটতি নেই বলা চলে। আসল খেলা কিন্তু এখানেই, কারণ গোলের মুখ খুলবে এখান থেকে। বাকি তিন পয়েন্ট অ্যাটাকে সঙ্গ দেবে, চেন ক্রিয়েট করে বল পজেশন ধরে রেখে ফরোয়ার্ডে ক্রস করবে কিন্তু ১০ নম্বরের জায়গা ওলোটপালট হলেই চিত্তির! তবে, ব্রাজিলের সার্বিক আক্রমণবিভাগ নিয়ে আশাবাদী হওয়াই যায় এ বছর। কারণ রিসেন্টলি ফিরমিনো গোলে ফিরেছে, জেসুস তো রীতিমতো নিজের পজিশন পেয়ে ভয়ঙ্কর।

এবার ডিফেন্স। এবং তার আগে ডিফেন্সিভ স্ক্রিন। অর্থাৎ প্রতিরক্ষাবাহিনির সামনে কুম্ভ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা দুজন। যাদের একজনের নাম কাসেমিরো, অপরজন ফ্রেড। এই শেষোক্ত নামটা নিয়েই চিন্তার। এবং কাসেমিরোও সে চিন্তার বাইরে নয়। প্রথমত লোকটা অসম্ভব ভাল ব্লকার হলেও বল ডিস্ট্রিবিউটার হিসেবে ততটা পোক্ত নয়। মাদ্রিদে এতকাল দুই সেরা মিড ক্রুস আর মদ্রিচের একটু নিচ থেকে অপারেট করত বলে বোঝা যায়নি, কিন্তু সাজিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে মদ্রিচ বৃহস্পতি হলে কাসেমিরো কচ। সঙ্গে থাকল ফ্রেড, যার ছোট পাসে ড্রিবল করে বেরোনোর ক্ষমতা থাকলেও অধিকাংশ সময় বল হারানোর প্রবণতা এবং মিসপাস। ফ্যাবিনহো থাকছে, কিন্তু তিতের প্রথম পছন্দ যে এই দুজন। ডিফেন্সিভ মিড হিসেবে এই দুজন বিশ্বকাপে কতটা গুরুত্বপূর্ণ হবে সেটা সময় বলবে, কিন্তু না ইম্পর্ট্যান্ট হয়েও তো উপায় নেই। পিভটে গেলে এদেরকেই লাগবে, আবার যদি নেইমার আর কাসেমিরোর মধ্যে একটা লম্বা গ্যাপ হয়ে দাঁড়ায় তবে কেঁচো খুঁড়তে কেউটে, ওই সুযোগের সদ্ব্যবহার করেই বেলজিয়াম আগের বছর এগিয়ে গেছিল, এবারেও তাই হলে ‘আসছে বছর আবার হবে!’

বরঞ্চ এর থেকে দুই সেন্টার ব্যাক নিয়ে ততটা চিন্তা নেই। একদিকে বর্তমান পিএসজি ক্যাপ্টেন মারকুইনহোস, একদিকে প্রাক্তন পিএসজি ক্যাপ্টেন আর দেশের ক্যাপ্টেন থিয়াগো সিলভা। যাদের কর্মদক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশই নেই। ৩৭ পেরিয়েও ইয়ং থিয়াগো সিলভা এখনও দেশের জন্য নিবেদিতপ্রাণ, যদিও বয়সটা একটা ফ্যাক্টর। কিন্তু সেটা নিয়েও মনে হয় তত চিন্তার কিছু নেই কারণ হাতে তিনটে ব্যাক আপ আছে। এক, রিয়ালের মিলিতাও; দুই, জুভেন্তাসের ব্রেমের; আর তিন, আর্সেনালের গ্যাব্রিয়েল। তবে গ্যাব্রিয়েল কি কাতারে যাচ্ছে? সেন্টার ব্যাকে ব্রেমেরের উপস্থিতি অনেকটাই বল-ভরসা জোগানোর মতো। এখন জুভেন্তাসের ফার্স্ট ইলেভেনেও অটোমেটিক চয়েস, কাতার যাচ্ছে কি না সেটা যদিও নির্ভর করছে তিতের উপর। রাইটব্যাকে দানি আলভেস কি থাকবে? দানিলো মেন চয়েস, আর সেখানেই একটু ভ্রূ কোঁচকানো থেকেই যাবে। কারণ দানিলোর ফর্ম ততটা সুবিদিত নয়, এই আর কি। লেফটব্যাকে শুরু করবে হয়তো জুভেন্তাসের অ্যালেক্স সান্দ্রো, আর ব্যাক আপ থাকবে সদ্য ম্যান ইউনাইটেড থেকে সেভিয়াতে লোনে যাওয়া টেলেস। ব্যক্তিগতভাবে টেলেসকেই দেখতে চাইব কারণ ছেলেটা দুমদাম কাটিয়ে হঠাৎ ওভারল্যাপে চলে যেতে পারে, আর ক্রসটাও মাপে রাখে। মার্সেলো লেভেলের নয় এখনও একেবারেই, তবু এর উপর ভরসা করা যায়। কিন্তু ওই রেনান লোদিকে না খেলালেই খুশি হব। গোলকিপারের জায়গা দুজনের জন্যই বরাদ্দ, সেখানে আর অপশন নেই।

প্রথম সার্বিয়া ম্যাচটাই ধরা যাক। কেমন খেলল ব্রাজিল? ব্রাজিল-সার্বিয়া ম্যাচ নিয়ে কিছু বলার আগে প্রথমেই কিছু কথা বলে নেওয়া ভাল। পাঁড় ব্রাজিল সাপোর্টার হিসেবে বেজায় খুশি আসলে। তার অনেক কারণের মধ্যে একটা, এই ব্রাজিলটা বহুবছর পরে একটা বিশ্বকাপ খেলতে এসেছে স্ট্রংগেস্ট টিম হিসেবে। স্কোয়াডটাকে তিতে গড়তে শুরু করেছিলেন ২০১৭ থেকে। ২০১৬ কোপাতে হারার পর থেকেই যা রিবিল্ড শুরু। পাওলিনহা, ফেলিপে, দান্তে… কে না খেলেনি! ছোট-বড়-মাঝারি, সব ধরনের প্লেয়ার নিয়ে টানা এক্সপেরিমেন্টের পর কাতারে এসেছে এই স্কোয়াডটা। যেখানে ফিলিপ কুটিনহো নেই, রবার্তো ফিরমিনো নেই, গ্যাব্রিয়েল বারবোসা নেই। টুর্নামেন্ট, ফ্রেন্ডলি… কিছুতে বাদ ছিল না এক্সপেরিমেন্ট। একটা সেট আপ ধীরে ধীরে গড়ে লাস্ট চার-পাঁচ বছর ধরে তবে আজ এই জায়গায়। আর শুরুতেই ডমিনেট করে জয়। কেন? খেলায় তাকানো যাক।

আগেই বলেছি স্কোয়াড ডেপথ মারাত্মক ভাল। বিশেষত অ্যাটাক। যদি তাকাই অ্যাটাকের দিকে তাহলে দেখতে পাব, এই টিমের আক্ষরিক অর্থে নাম্বার নাইন গ্যাব্রিয়েল জেসুস। ম্যান সিটিতে ডানদিকে সরে খেলা জেসুস অ্যাটাক বিল্ড-আপে মেনলি হেল্প করত, ট্র্যাঙ্গেল প্লে হোক কি হোল্ডিং, রাইট মিড আর ব্যাকের সঙ্গে ত্রিভুজ তৈরি করে স্পেস ক্রিয়েশন— সবই করত সিটিতে। কিন্তু আর্তেতা আর্সেনালে ওকে নিয়ে আসার পর জায়গা দিল প্রপার নাম্বার নাইন হিসেবে আর তখনই নিজের সহজাত খেলা খেলতে শুরু করল জেসুস। কিন্তু তিতের টিমে নাম্বার নাইন টটেনহ্যামের রিচার্লিসন। এবং যে ফর্মে নেই। এভার্টনে থাকাকালীন এক সিজনে ১০ গোল। তাহলে রিচা কেন? কারণ জেসুস শুধুই স্ট্রাইকার নয়। জেসুস পিভটে প্লে খেলে, দুটো সেন্টার ব্যাককে চাপে রাখে এবং নিচে নেমে খেলা তৈরিতেও হেল্প করে। আর রিচা শুধুই গোলটা চেনে। প্লাস, হেড ভাল, ভিশন ভাল, দু-পায়ে শট আছে। নেইমারের সঙ্গে বক্স প্লেতে ভয়ানক কার্যকরী। জিততে গেলে গোল দরকার আর সেটার জন্যই এই নয়া ব্রাজিলে রিচার্লিসন নাম্বার নাইন।

সার্বিয়া ৩-৫-১-১ তে নেমেছিল। ৩ ব্যাক সিস্টেমে দুটো সাইডব্যাক ম্ল্যানডেনোভিচ আর জিপকোভিচ ওভারল্যাপে উঠে বক্স মিডের সঙ্গে এক-দুটো টাচে ওয়াল খেলে বহুবার বেরোতে চেষ্টা করেছিল। বাঁয়ের ওয়াইড মিড মিলিঙ্কোভিচ-স্যাভিচ আর ডানদিকে একটু ওপরে অ্যাজাক্সের ডুসান ট্যাডিচ। দুটো ওভারল্যাপিং উইংব্যাকের কারণে ড্রাজান স্টয়কোভিচ আর ব্লাহোভিচকে নামাননি। চার ব্যাকের মাঝের ওয়ালে একটা চোরা পাস দিলেই ইনফর্ম স্ট্রাইকার মিত্রোভিচ ছিলই।

কিন্তু সে স্ট্র্যাটেজি ধোপে টেকেনি। অন দ্য বল ব্রাজিল তিন ব্যাক সিস্টেমে চলে আসছিল। বাঁয়ে আলেক সান্দ্রো লেফটব্যাক থেকে ফুলব্যাক হওয়ার ফলে ইনভার্টেড ফুলব্যাক হিসেবে ডানদিক থেকে মিডে জয়েন করছে দানিলো। ব্রাজিল-সার্বিয়া ম্যাচটা দেখলেই বোঝা যাচ্ছে তিতে কোন ফর্মে চালাচ্ছেন টিমটাকে। প্লাস, নিচের গ্রাফে প্রথম হাফে নেইমারের পজিশন। নাম্বার টেন থেকে নাম্বার এইট হয়ে দুটো ডিফেন্সিভ মিডের সামনে দেখে বল হোল্ড করে আপফ্রন্টে পাস জোগানো যার কম্মো। আর এইসঙ্গে অপোনেন্টের দুটো ম্যানকে টেনে নিচে নামানো যাতে বাঁদিকে ইনভার্টেড উইঙ্গার ভিনিসিয়াস অনেকটা স্পেস পায়। ইনফ্যাক্ট, ম্যাচে সেটাই হল। খেয়াল করলে দেখা যাচ্ছে, নেইমার বেশিরভাগ সময় বল ধরছে জোন ১০, ১১ নয় ১৩। ১৪তে উঠছে। অর্থাৎ নেইয়ের অন দ্য বল পজিশনিংয়ের উপর নির্ভর করে ডিফেন্সিভ মিড পাকেতা উপরে উঠে আসছে এবং একটু নিচে ব্লকার হিসেবে লুজ বল ধরার ক্ষেত্রে রয়ে যাচ্ছে কাসেমিরো। পাকেতার পাশে দানিলো এবং ওয়াইডে রাফিনহা। এইসময় সার্বিয়া হয়ে যাচ্ছে ৫-২-২-১ ফর্মে, যেখানে দুটো ইনভার্টেড উইঙ্গার কাট ইন করে ঢুকতে গেলেই বাধা পাচ্ছে এবং ডিফেন্সিভ লাইনের সাথে মাঝমাঠের দূরত্ব বেশি নেই বলে সেকেন্ড বলটা ধরতে ছুটে আসছে দুটো মিড। পাকেতা একবার সেখান থেকেও রাফিনহার সাথে একটা টাচে স্পেস বার করে দিল, আর রাফিনহা বল জমা করল কিপারের হাতে।

সার্বিয়া টিমটা ভালই শক্তিশালী। অ্যাডভান্টেজ হল সবকটা প্লেয়ার লম্বা এবং হেডে পারদর্শী। যেটা দেখতে পাই সেকেন্ড হাফের একটা কর্নারে। কিন্তু শেষমেষ হার স্বীকার করতে হয় বৈচিত্র্যের কাছে। প্রথম গোলটার ক্ষেত্রেই ধরা যাক। পাকেতার কাছ থেকে নেইমার বলটা ধরার সময় সার্বিয়া ৪-২-৩-১। চার ব্যাকের দুটো ওয়াইডে ভিনি আর রাফিনহা, মাঝে রিচা। এই সময় নেইমার বলটা ধরেই দৌড় লাগাল দুটো মিডের মাঝখান দিয়ে। বল গেল ভিনির কাছে আর সেখানে জমা হল তিনটে ম্যান। এর ফলে গোলের কাছে খোলা জায়গায় ঢুকে পড়ল রাফিনহা আর রিচা। ভিনির শট প্রতিহত, সেকেন্ড বলে রিচার গোল। দ্বিতীয় গোলটা আউটস্ট্যান্ডিং, কিন্তু তার আগে যদি তাকাই তাহলে নজর পড়বে নেইয়ের পজিশনে। সেই আট নম্বর জায়গা থেকেই নেই বল ধরে ভিনির কাছে পাঠায়। সামনে দুটো ম্যান, রিচা একটা স্পেসে। ভিনি তিনটে ম্যানের মধ্যে দিয়ে বল পাঠায়, আর তারপর তো…

তিতের এই অন দ্য বল তিন ব্যাকে চলে যাওয়ার সিস্টেমটা খুব কার্যকরী হয়ে উঠেছে। লাস্ট ইয়ার কোপাতেও তিতে এমনটা করেছিলেন ভেনেজুয়েলা ম্যাচে। আর হবে নাই বা কেন! এত এত অপশন নিয়ে তিতে এসেছেন কাতার জয় করতে। ভিনি উঠে মার্টিনেলি নামল, রাফিনহা উঠে অ্যান্টনি। যে দুজনেই ড্রিবলে ওয়ান অন ওয়ান সিচুয়েশনে অসম্ভব ভাল। কিন্তু স্টার্ট করেনি কারণ ট্র্যাকব্যাকে সমান সাবলীল নয়। সেখানে ভিনি লাস্ট সিজনে ম্যাঞ্চেস্টার সিটির এগেন্সটে যে গোলটা করেছিল সেটা ওই ট্র্যাকব্যাকেরই ফসল। প্লাস, পাকেতা। লিঁও থেকে ওয়েস্ট হ্যামে এল এবছর। এত ভাল বক্স টু বক্স মিড, পজিশনিং সেন্সওয়ালা মিড ব্রাজিল অনেকদিন পর পেয়েছে। বদলি আছে ফ্রেড, যার ফর্ম খারাপ চললেও স্পেস ক্রিয়েট করার একটা চোরাগোপ্তা ব্যাপার আছে। আগেই বলা আছে এই বিশ্বকাপের শ্রেষ্ঠ স্কোয়াড ব্রাজিলের। প্লাস, কাতারে ওয়েদার একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিচ্ছে। ইউরোপিয়ান টিমগুলোর পক্ষে তো বটেই, লাতিন আমেরিকান টিমগুলোর ক্ষেত্রেও পুরো ৯০ মিনিট টানা প্রেসিং সম্ভব হচ্ছে না। যেটা পুরোমাত্রায় দেখা গেল জাপান-জার্মানি ম্যাচে। আর তাই ৫ সাবস্টিটিউটশন খুব মারাত্মক একটা রোল প্লে করতে চলেছে নকআউট স্টেজ থেকে। যার স্কোয়াড ডেপথ যত ভাল, সে বাজি মারবে। এই কারণেই ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, স্পেন এবারে এগিয়ে।

সুইটজারল্যান্ড ম্যাচে যদিও নেইমারকে পায়নি। বদলে সেই পজিশনে লুকাস পাকেতাকে খেলানো হল। পাকেতা ঠিক নাম্বার ১০ নয়, তাই দুটো উইংয়ে বল ডিস্ট্রিবিউট না হতে খেলার ছন্দ কিছুটা হারায়। তবু এত কিছু পরেও টিমের জেতার খামতি নেই। সামনেই নকআউট, আরও বড় পরীক্ষা।

মোটামুটি এই নিয়ে তিতে ২০২২-এ কাতার এসেছেন। ইতিমধ্যেই রাউন্ড অফ সিক্সটিনে উঠেও গেছেন। এবারে সব হিসেব নিকেশ তুলে রেখে খেলা হবে। আর সেটা এমন একটা জায়গা যেখানে কষে রাখা উত্তর একেবারেই মিলবে না। অনেক কিছুই পাল্টে যাবে। তবু আগে থেকে জাগিয়ে রাখা আশা, এই আর কি। সময় বলবে ঠিকঠাক প্ল্যানমাফিক সব কিছু হবে কি না, তবু মহীনের ঘোড়াগুলির মতো ‘আবার বছর কুড়ি পর’ হলে মন্দ কী!

সাম্বা হবে। হতেই হবে।

 

আলবিসেলেস্তের নীলসাদার গর্জন

১৯৭৮, পুকুরচুরির বিশ্বকাপ। একরাশ বিতর্ক, লেলিহান আগুনের মধ্যে দিয়ে হার্ডল পেরিয়ে আসা ক্রুয়েফহীন নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে উঠে এল নতুন স্টার মারিও কেম্পেস, দানিয়েল পাসারেল্লার মতো প্লেয়ার। বিতর্কের মধ্যে দিয়ে হলেও আদতে সেটাই ছিল আর্জেন্টিনার প্রথম বিশ্বজয়। এর আগে প্রথম বিশ্বকাপ ফাইনাল (উরুগুয়ে ৪-২-এ হারায় আর্জেন্টিনাকে) খেললেও জয়ের মুখ দেখতে গিয়ে পেরিয়ে গেছে মাঝে একটা বিশ্বযুদ্ধ, আর ৪৮টা বছর।

এরপর ১৯৮৬। বাংলায় ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা বিভেদের প্রাইম বছর। দিয়েগো আর্মান্দো মারাদোনা নামধারী এক ছোটখাটো চেহারার ঝাঁকড়া চুলের বিস্ময়। ফকল্যান্ড যুদ্ধের শয়ে শয়ে নিহত আর্জেন্টিনীয়র হয়ে বদলার ম্যাচে একইসঙ্গে ভুল-ঠিকের পরিমাপ বুঝিয়ে দেওয়া মারাদোনার বিশ্বকাপ। ৭ জনকে কাটিয়ে পিটার শিল্টনের পাশ দিয়ে গোলে বল জড়িয়ে দৌড়ের বিশ্বকাপ। ভালদানো, বুরুচাগা থাকতেও ইন্ডিভিজুয়াল ব্রিলিয়ান্সে প্রথম ও শেষবারের মতো জার্মানির ফাইনাল পরাজয়। তারপর কেটে গেল কত বছর। ৯০-এর ফাইনালে মারাদোনার কান্না নায়াগ্রা জলপ্রপাতের ধারার মতো বয়ে চলল একাই। রোজারিও, বুয়েনস আয়ার্সের পথে পথে আঁকা ফুটবলারদের কেউই আনতে পারল না সোনার বিশ্বকাপ। ২০০২-এ দক্ষিণ আমেরিকা গ্রুপের যোগ্যতা অর্জন পর্বে প্রথম হয়ে তৎকালীন কোচ মার্সেলো বিয়েলসার অধীনে খেলা আয়ালা, বাতিস্তুতারা গোলের পর গোল করলেও, টুর্নামেন্টের শুরুতেই ছিটকে যেতে হল। ২০০৬-এ ১-০ থাকা অবস্থায় কোচ জোসে পেকারম্যান তুলে নিলেন সেবারের সবচেয়ে আকর্ষণীয় মিডফিল্ডার এবং গোটা দলের চালিকাশক্তি রিকেলমেকে। ফল? জার্মানি সেবার সেমিফাইনালে।

২০১৪। একই প্রতিপক্ষ, সেই একই রোজারিওর ১০ নম্বর জার্সির ছোটখাটো চেহারার বিস্ময়। কিন্তু রিপিটেশন হল ১৯৯০-এর, ১৯৮৬-র নয়। লিওনেস মেসির সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে কাপ নিয়ে গেল সেই জার্মানিই।

কিন্তু ২০২২-এ এসে গল্প ধীরে ধীরে পাল্টাচ্ছে। যে আলবিসেলেস্তে সমর্থকরা এতদিনের মেসিনির্ভর টিম দেখে অভ্যস্ত, তারাই আশায় বুক বাঁধছে এই নয়া আর্জেন্টিনাকে দেখে। মাঝে সার্জিও রোমেরো ভরসার হাত বাড়ালেও, বহুবছর পর এমিলিয়ানো মার্টিনেজের কিপিং অনেকটাই বল-ভরসা যোগাচ্ছে নীল-সাদাদের। ডিফেন্সে বলার মতো নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে ইতিমধ্যেই ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো এবং লিসান্দ্রো মার্টিনেজ। এই বছরই অ্যাজাক্স থেকে ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেডে যোগ দেওয়া এই সেন্টাল ব্যাক লিসান্দ্রো অলরেডি দুবার ম্যান অফ দ্য ম্যাচ। টটেনহ্যামের নির্ভরযোগ্য সেন্টার ব্যাক রোমেরো এই সিজনে দারুণ ছন্দে। এছাড়া যোগ্য সহায়ক হিসেবে রয়েছে বেনফিকার অভিজ্ঞ সেন্টার ব্যাক নিকোলাস ওটামেন্ডি। রয়েছে আগের সিজনে ভিয়ারিয়ালের হয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ সেমিফাইনাল খেলা জুয়ান ফয়েথ, অ্যাথলেটিকো মাদ্রিদের রাইট ব্যাক মলিনা। ডিফেন্স নেহাত খারাপ নয় একেবারেই, যেহেতু স্কালোনির হাতে অপশন আছে এবং ডিফেন্স লাইনকে ভালভাবে ব্যবহার করতে জানেন তিনি। তার প্রমাণ গত কোপা আমেরিকাতেই পাওয়া গেছে।

বরং দেখার যে, ৪-২-৩-১ ছকে শুরু করলে চার ব্যাকের সামনে দুই হোল্ডিং ডিফেন্সিভ মিডের চলাফেরা। এখানে দুই নির্ভরযোগ্য প্লেয়ারের একজন অ্যাথলেটিকো মাদ্রিদের মিড রদ্রিগো দে পল, অন্যজন জুভেন্তাসের লিয়ান্দ্রো পারাদেস। পারাদেসের ফর্ম একটু ডাউন, অন্যদিকে অ্যাথলেটিকো চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ও ইউরোপা— দুটো মেজর কম্পিটিশন থেকেই ছিটকে গিয়ে চাপে। তাই দেখার, বিশ্বকাপে এই দুজনের ফর্ম। স্কালোনি নিশ্চিত অন্য কিছু ভেবেছেন, কোপা আমেরিকার ফাইনাল কিন্তু অন্য গল্প বলে গেছে।

ওপরের তিন অ্যাটাকিং মিডফিল্ডারের মধ্যে বাঁদিকে সেভিয়ার পাপু গোমেজ এবং ডানদিকে জুভেন্তাসের অভিজ্ঞ উইঙ্গার অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়া শুরু করতে পারে, যদি ডি মারিয়ার চোট সেরে থাকে তবেই। যে কারণে টিমের সবচেয়ে দরকারি সেন্ট্রাল হোল্ডিং মিডফিল্ডার জিওভান্নি লো সেলসোকে পাচ্ছে না আর্জেন্টিনা। টটেনহ্যাম থেকে এই সিজনে ভিলারিয়ালে যাওয়া লো সেলসো শেষ মুহূর্তে বাজে চোট পেয়ে টিম থেকে ছিটকে যাওয়ায় নীল-সাদারা একটা ধাক্কা পেয়েছে সেটা নিশ্চিত। এখন ডি মারিয়া এবং আরেক অ্যাটাকার রোমার পাওলো ডিবালাও চোটগ্রস্ত। কিন্তু যেহেতু তারা টিমে আছে, তাই ধরে নেওয়া যায় বিশ্বকাপের আগে ফিট হয়ে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে সবচেয়ে বড় আশার জায়গা স্ট্রাইকার। গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা এবং কিছুটা গঞ্জালো হিগুয়েনের পর যার অভাবে ভুগতে হত, সেই স্থান ইন্টার মিলানের লাউটারো মার্টিনেজ এসে পূর্ণ করেছে। এদের তিনজনের নিচে জীবনের শেষ বিশ্বকাপ খেলতে চলেছে লিওনেল মেসি। যার আর্জেন্টিনার জার্সিতে একটা কোপা আমেরিকা ও একটা অলিম্পিক গোল্ড মেডেল ব্যতীত ট্রফি ধরা দেয়নি। মেসি জিততে মরিয়া, সঙ্গে গোটা আর্জেন্টিনাও ইতোমধ্যেই স্বপ্ন দেখছে এবারের বিশ্বকাপ মেসির পায়ে পায়ে হোক। অন্তত শেষবার, দ্য লাস্ট ডান্স হোক নীল-সাদা জার্সিতেই।

কিন্তু ঝটকা এল প্রথম ম্যাচেই। তৃতীয় দিনের শুরুতেই মেসিবধ কাব্য। আরবি মরুঝড় আউট অফ সিলেবাস এসে পড়ায় শুধু প্রশ্ন পড়তে পড়তেই কেটে গেল সব সময়টা। ওই নিরন্তর প্রেসিংয়ের সামনে ছত্রভঙ্গ না হলেও, ট্যাকটিক্যালি খেলতেও পারল না। ৪-১-৪-১ থেকে শুরুটা করেছিল সৌদি, আর অন দ্য বল ৪-৪-২ হয়ে গিয়েই ঝামেলা পাকিয়ে দুটো উইং কার্যত খুলে দিচ্ছিল অপোনেন্টের সামনে। আর এর ঠিক উল্টোটা মানে ৪-২-৩-১ ব্যবহার করে বাঁয়ে পাপু গোমেজ সমানে ব্যতিব্যস্ত করে রাখছিল সৌদি ডিফেন্স। সুযোগ খুঁজে দু-একটা শট ডি মারিয়াও নিল, মেসিও নিল। পেনাল্টি পেল, রাইট ডিসিশনে। তারপর নিউ টেকনোলজির দৌলতে পরপর মেসি, লাউটারোর দুটো গোল বাতিল। টেকনিক্যাল কচকচি বাদ দিয়ে হারের কারণ নাম্বার ১, প্রথম ম্যাচে তিন বাতিল গোলে তলিয়ে যাওয়া মেন্টালিটি। ১-০ ব্যবধানটা কিছুই নয়, এক গোলে খেলা ঘুরে যাবে— এই মেন্টালিটি নিয়েই সৌদি নেমেছিল সেকেন্ড হাফে। আর কিছু খেলেছে সৌদি ডিফেন্স আর গোলকিপার! অনবদ্য বললেও কম। তিনটে গোললাইন সেভ, মেসি আর জুলিয়ান আলভারেজের হেড সেভ… পরপর ঝড় আটকে দিয়ে গেছে। যেটা আরও ফ্রাস্ট্রেটেড করে দিল শেষে। উইং চ্যানেল বন্ধ করে দিয়ে বল উড়িয়ে দিতে লাগল, যাতে ডিফেন্সিভ পজিশনে প্লেয়ারগুলো চট করে চলে আসতে পারে। আর্জেন্টিনার ওই অ্যাটাকিং লাইন আপকে কাউন্টার অ্যাটাকে নিয়ে এসে অফসাইড ট্র্যাপে ফেলে গেল বারবার। সৌদিকে নিয়ে আজ যত বলব ততই কম বলা হবে!

এই ভুল শোধরানো গেল পরের মেক্সিকো ম্যাচে। স্কালোনি যে মেক্সিকোকে শেষবার নিজে খেলেছিল, সেই মেক্সিকো আর কালকের মেক্সিকোর মধ্যে অ্যাটাকিং সাইডে অনেক পার্থক্য। রাফায়েল মার্কোয়েজ, জাভিয়ের হার্নান্ডেজের সেই মেক্সিকো ম্যাচে ২০০৬-এ স্কালোনির টিমে হারনান ক্রেসপো, পাবলো আইমাররা ছিল। রিকেলমের কর্নার থেকে গোল শোধ করে ক্রেসপো। আর্জেন্টিনা ফুটবলের একটা বৈশিষ্ট্য, বিশ্বকাপ এলে টগবগে থাকা দলটাকে কেমন ঝিমুনিতে ধরে। স্কালোনি ফুটবলার থাকার সময় কোয়ার্টার ম্যাচে কিপার আবানদাঞ্জিয়ারি চোট পেয়ে ছিটকে গেল। রিকেলমেকে তুলে নেওয়া হল। বরাবর কিছু না কিছু ভুল ডিসিশন, ভাগ্য, ট্যাকটিক্স আর্জেন্টিনার বিপক্ষে গেছে। আর যখনই গেছে, তখন ছন্দে থাকা গোটা টিম (২০১০ এক্সপেক্টেড ছিল) ছন্নছাড়া হয়ে গেছে। সৌদি আরব ম্যাচটাই ধরা যাক। শেষ ৩৫টা ম্যাচ অপরাজিত টিমটা, শুধু একটা ম্যাচ লেগেছে ট্যাকটিক্যালি নতি স্বীকার করতে। তাও সেই সৌদি, যারা শেষ তিনটে ম্যাচের একটাও জেতেনি। আপাতদৃষ্টিতে ১-০ হয়ে যাওয়া সিচুয়েশনে সেদিনের প্লেয়ার আর আজকের কোচ স্কালোনি সৌদিকে হালকাভাবে নিয়েছিল ঠিকই কিন্তু এছাড়াও পেছনে অনেক যুক্তি-তক্ক রয়ে যাচ্ছে যে!

আনফিট রোমেরোকে নামানো। যার কোমর ঘুরতে ঘুরতেই প্রথম গোল করে হাত ছড়িয়ে সেলিব্রেশনে মত্ত আরবরা। ১০০ শতাংশ ফিট রোমেরো আনপ্লেয়েবল, নিজের সেরা দিয়ে দেবে মাঠে। অসাধারণ সেন্টার ব্যাক। কিন্তু সদ্য হ্যামস্ট্রিং অপারেশন থেকে ফেরা রোমেরো? নৈব নৈব চ। বদলে মেক্সিকো ম্যাচে লিসান্দ্রো নামল এবং তুখোড় খেলল। একটা সেন্টার ব্যাক হিসেবে ও ডেস্ট্রয়ার রীতিমতো। দুই, এতদিন ধরে এই আর্জেন্টিনা ডিফেন্সিভ থার্ডের সামনে খুবই ভাল হোল্ডার এবং পাসার হিসেবে খেলা রড্রিগো দে পলের সুইচ অফ হয়ে যাওয়া। আর তাই ও মাঝে মাঝে অনেক ওয়াইড হয়ে যায়, ফাঁকে অপোনেন্ট ঢুকে পড়লে দখল করতে বেমক্কা ফাউল করে বসছে। ৪-৪-২ যে অন পেপারে শুরু করে ৪-৩-৩ হয়ে গেছিল মেসিকে ফলস নাইন করে— দুটো সিডিএম নিজেদের পজিশনই ভুলে যাচ্ছিল অফ দ্য বল। ডিপ্লয়মেন্ট বলে কোনও বস্তু চোখে পড়ছে না, আদতে ভীষণরকম ছন্নছাড়া ফুটবল। যেটা সদ্য কোপা চ্যাম্পিয়ন কোচের কাছ থেকে এক্সপেক্টেড নয়। তাই, বদলে এঞ্জো ফার্নান্ডেজ। যার এক-দুটো টাচে মেসি নিজের স্পেসে ঢুকে বক্সের কাছাকাছি চলে যাবে। নিজের জোনটা ফিরে পাবে।

মেক্সিকোর সঙ্গে প্রথম গোলটার ক্ষেত্রে দে পলের কিছুটা ভূমিকা যদিও আছে। সামনে থাকা তিনটে ম্যানের মধ্যে একটাকে নিজের দিকে টেনে খুলে যাওয়া স্পেসে মেসিকে পাস করল। গোলটা নিয়ে কথা বলা উচিতই না। কোনও উচ্চ পর্যায়ের অ্যানালিসিসও ওটা মাপতে পারবে না। তিনটে ডিফেন্ডারের মাঝখান দিয়ে বলটাকে মাটি ঘেঁষিয়ে গোলটা করে এল। আর যেই গুইডো উঠে এঞ্জো নামল, লাউটারো উঠে জুলিয়ান নামল, খেলা ঘুরে গেল আর্জেন্টিনার। ঘুরতই। এই সিজনে চোটের কবলে থাকা পারাদেস জুভেন্তাসের হয়ে হাতে গোনা কয়েকটা ম্যাচ পেয়েছে। অ্যাথলেটিকো মাদ্রিদে আর ফার্স্ট ইলেভেনে নিয়মিত নয় দে পল। বদলে ম্যাচ প্র্যাকটিসেই থাকা প্লেয়ার তিনটে নামল আর ধ্বংসাত্মক পারফরম্যান্স দিয়ে ম্যাচ নিয়ে বেরিয়ে গেল। আমার নিজের কাছে এই ম্যাচে দুজন ম্যান অফ দ্য ম্যাচ। এক, লিসান্দ্রো মার্টিনেজ। ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেডের সমর্থকগণ আস্তে আস্তে বুঝছে লিচা কি জিনিস। ওই হাইট নিয়ে মোশনে বডি এনে এরিয়াল বলে ওয়ান ইস্টু ওয়ান ডুয়েল জিতছে অহরহ। সেন্টার ব্যাক হিসেবেও লাইন ব্রেকিং পাসটা দারুণ খেলে লিচা। আর্জেন্টিনাকে নকআউট কোয়ালিফাই করতে গেলে লিচাকে প্রথম ইলেভেনে রাখতেই হবে। মেক্সিকো ৫-৩-২ তে শুরু করে ৩-৪-৩ এ ওয়াইড দিয়ে ভালরকম প্রেস করছিল, যার জন্য মিডল থার্ডে বহু সংখ্যক মিসপাস করছিল আর্জেন্টিনা। এটা কাটল এঞ্জো নামতেই। এঞ্জোকে যে- কোনও মূল্যে পারাদেসের জায়গায় খেলান স্কালোনি। আর ভবিষ্যতে রোমেরো-লিসান্দ্রো আর্জেন্টিনা ডিপ ডিফেন্সের রক্ষাকর্তা।

মার্সেলো বিয়েলসা, জোসে পেকারম্যান, দিয়েগো মারাদোনা হয়ে কোচের ব্যাটন গেছিল আলেজান্দ্রো সাবেয়ার হাতে। ফাইনালে হিগুয়েনের মিস, ডি মারিয়ার না থাকা এবং মেসির শট পোস্টে লেগে যাকে বিশ্বকাপ ছুঁতে দেয়নি। তুমুল ব্যর্থ জর্জে সাম্পাওলির পর লিওনেল স্কালোনিই একমাত্র, যার হাত ধরে ২৮ বছর পর কোনও আন্তর্জাতিক ট্রফি ঢুকেছিল আলবিসেলেস্তে শিবিরে। পরপর দুটো কোপা ফাইনাল হারা আর্জেন্টিনাকে একসময় বলা হত— “দেয়ার স্ট্র্যাটেজি ইজ পাস দ্য বল টু মেসি!” সেই জায়গা থেকে লিওনেল স্কালোনি টিমটাকে ধীরে ধীরে গুছিয়েছেন। লাউটারো মার্টিনেজ, পাপু গোমেজ, লিসান্দ্রো মার্টিনেজ, ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো, কোরেয়া— যারা অবদান রেখে গেছিল ২০২১ কোপা আমেরিকায়। ২০২২-এ কাতারে তাই বহুবছর পর ফেভারিট হিসেবে নেমেছে আর্জেন্টিনা। স্কালোনি জানেন, এই শেষবার মেসি নামছে কোনও আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে। মেসির মতো স্কালোনিরও তাই কাতারে অগ্নিপরীক্ষা।

 

ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নদের নজর

ফ্রান্সের কথা বললেই মনে পড়ে যায় ব্রাজিলের দর্পচূর্ণের কথা। সে ১৯৯৮ ফাইনাল হোক কি ২০০৬ কোয়ার্টার। ছ ফুটের জিনেদিন জিদান সামনে পড়লেই সমস্ত জারিজুরি খতম। তা সেই ফ্রান্স জিদানের হাত ধরে ১৯৯৮-এর পর শেষ বিশ্বকাপ ২০১৮-তেও জয়ী। সৌজন্যে বহু ভাল প্লেয়ার এবং তাদের অসাধারণ ফর্ম। এনগ’লো কন্তে, পল পোগবা, আঁতোয়া গ্রিজম্যান সহ জমদার টিমটা বিশ্বকাপ ডিজার্ভ করত এবং তা পেয়েওছিল। রাউন্ড অফ ১৬-তে আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে রাইট ব্যাক বেঞ্জামিন প্যাভার্ডের গোল ভোলার নয়। সেই প্যাভার্ড এবারও দারুণ ফর্মে। রিসেন্ট বায়ার্নের হয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ কোয়ার্টার ফাইনাল খেলেছে, সঙ্গে বুন্দেশলিগা চ্যাম্পিয়ন। এ হেন প্যাভার্ডের পাশে ফ্রান্সের ডিফেন্সের মূল ভরসা আরেক বায়ার্ন সেন্টার ব্যাক উপমেকানো আর ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেডের রাফায়েল ভারান। লেফট ব্যাকে এসি মিলানের থিও হার্নান্ডেজ। আপাতত প্রথম এগারোতে মনে হয় এরাই শুরু করবে। ব্যাক আপে থাকছে পিএসজি সেন্টার ব্যাক কিমপেমবে এবং এই মরসুমে আর্সেনালের হয়ে দারুণ ফর্মে থাকা উইলিয়াম স্যালিবা। লিভারপুলের ইব্রাহিম কোনাতেও সুযোগ পাওয়ার দাবি রাখে। সব মিলিয়ে ডিফেন্স অতি চমৎকার গতবারের বিজয়ীদের। ভারানের যদিও চোট, তবু সেটা অতটা গুরুত্বপূর্ণ নয় বলে প্রথম একাদশে স্থান পাবে নিশ্চিত। গোলে অবশ্যই অধিনায়ক হুগো লরিস।

মিডফিল্ডে সবচেয়ে বড় ধাক্কা, এ বছর কন্তে এবং পোগবার না থাকা। চোটের কারণে দুজনেই এবার বিশ্বকাপ থেকে সরে দাঁড়িয়েছে। বদলে সুযোগ পেয়েছে এই মুহূর্তের রিয়াল মাদ্রিদের দুই ইয়ংস্টার এদুয়ার্দো কামাভিঙ্গা এবং অরলিয়েন চুয়ামেনি। দুজনেই দুর্দান্ত ফর্মে, রিয়াল থেকে কাসেমিরোর চলে যাওয়ার অভাব পূরণ করছে চুয়ামেনি। কামাভিঙ্গাও অসাধারণ, বিশেষত ফার্স্ট টাচে ড্রিবল দেখার মতো। সঙ্গে রয়েছে জুভেন্তাসের আদ্রিয়ান রাবিয়ট, মোনাকোর উঠতি তরুণ প্লেয়ার ইউসুফ ফফোনা।

তবে এই মূহূর্তে ফ্রান্সের সবচেয়ে বড় শক্তি, বল-ভরসা যাই বলা হোক, সেটা হল তাদের অ্যাটাকিং বিল্ড আপ প্লেয়ারদের তালিকা। আপফ্রন্টে অবশ্য থাকছে না নাম্বার নাইন করিম বেঞ্জিমা, এই মূহূর্তে ওয়ান অফ দি গ্রেটেস্ট স্ট্রাইকার এবং এই মরসুমে ব্যালঁ ডি অর জয়ী। আগের মরসুমে দেশ ও ক্লাব মিলিয়ে ৫০ গোল সহ লা লিগা এবং চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ট্রফি যার ক্যাবিনেটে শোভা পাচ্ছে। নিঃসন্দেহে এটা একটা বড় ধাক্কা। অতএব ভরসা গত মরসুমে এসি মিলানের হয়ে সিরি এ জেতা অলিভার জিরু। বাঁদিকে গ্রিজম্যান এবং ডানদিকে পিএসজির সুপারস্টার কিলিয়ান এমবাপেই শুরু করবে। ব্যাক আপে থাকছে বায়ার্নের কিংসলে কোম্যান (কোম্যান হয়তো খেলবে একটু নিচ থেকে, জোন-১৪ পজিশন থেকে), বার্সেলোনার অসাধারণ ড্রিবলার ওসমানো ডেম্বেলে এবং গত মরসুমে জার্মান কাপ ডিএফবি-পোকাল জেতা আর বি লিপজিগ্-এর ক্রিস্টোফার এনকুঙ্কু। অ্যাটাক অসাধারণ ফ্রান্সের, ঠিকমতো ধারাবাহিকতা প্রকাশ করতে পারলে এই ফ্রান্সকে রোখার সাধ্য কারও তেমন নেই। আগেরবারের মতো এবারেও তারা অন্যতম ফেভারিট।

ইতিমধ্যে দুটো ওপেনিং ম্যাচেই যার ঝলক দেখা গেছে পুরোমাত্রায়। ওপরে জিরু, বাঁয়ে ডেম্বেলে আর ডানে এম্বাপেকে রেখে ঠিক মাঝখানে গ্রিজম্যান ঘুরে বেড়াচ্ছে। ৪-২-৩-১-এর দুটো সিডিএমে র‍্যাবিও একটু ওপরে উঠে ডানদিকে ত্রিভুজ গড়েছে। ডিফেন্সে প্রেস্নেল কিম্পেম্বের না থাকাও আর ফ্যাক্টর হচ্ছে না। ফল? ৪-১, ২-১। ফ্রান্স নকআউটে।

 

জার্মান রাজ্যপাটের হুঙ্কার

কথায় বলে, জার্মানরা হারার আগে হারে না। শেষ বাঁশি বাজার সময় পর্যন্ত লড়ে যায়। ‘অ্যাটাক টিল ডাই’ মন্ত্রে বিশ্বাসী জার্মান রক্তগণ বিশ্বকাপ ফাইনালই খেলেছে আটবার। তাতে আবার চারবারের বিজয়ী। ১৯৫৪-তে বার্নের রূপকথার পর ১৯৬৬‌-তে ইংল্যান্ডের জোচ্চুরি বিশ্বকাপে রানার্স। তার আট বছর পরেই ক্রুয়েফের টোটাল ফুটবলকে হারিয়ে কাইজার বেকেনবাওয়ারের হাতে ওঠে বিশ্বকাপ। শেষবার জার্মানি বিশ্বকাপ পায় ২০১৪ ব্রাজিল বিশ্বকাপে, মেসির স্বপ্ন ভাঙচুর করে। ‘ডার বম্বার’ গার্ড মুলার বহুবছর নিজে বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় প্রথম স্থানেই ছিলেন।

এহেন লড়াকু জার্মানির স্কোয়াড কিন্তু অন্যান্য দলের তুলনায় খুব ভারী নয়। তবুও বেশ কিছু বড় নাম হ্যান্সি ফ্লিকের তালিকায়। আগের কোচ জোয়াকিম লো দায়িত্ব ছেড়েছেন শেষ ইউরো কাপের পরেই। বদলে প্রাক্তন বায়ার্ন মিউনিখ কোচ হ্যান্সি ফ্লিক এসে ধীরে ধীরে খোলনলচে বদলাচ্ছেন। গোলে বায়ার্ন ও জার্মান কিংবদন্তিতে পরিণত হয়ে যাওয়া অভিজ্ঞ ম্যানুয়েল নয়্যার, ব্যাক আপ হিসেবে থাকছে বার্সেলোনার এক নম্বর কিপার মার্ক-আন্দ্রে টার স্টেগেন। ডিফেন্সে এবার ম্যাট হুমেলস নেই, নেই জেরম বোয়াতেং কিংবা হেক্টর। বদলে থাকছে সদ্য চেলসি থেকে রিয়াল মাদ্রিদে যাওয়া অ্যান্টোনিও রুডিগার, এফসি ফ্রয়বার্গের ম্যাথিয়াস গিন্টার, বরুসিয়া ডর্টমুন্ডের অনফর্ম ডিফেন্ডার নিকলাস সুল এবং গত মরসুমে অসাধারণ ফর্মে থাকা লিপজিগের লুকাস ক্লোস্টালম্যান। হ্যান্সি ফ্লিক চার ডিফেন্ডারেই খেলতে পছন্দ করেন, ফলে রাইট ব্যাকেই ক্লোস্টারম্যানের খেলার সম্ভাবনা। রুডিগার এবং গিন্টারই হয়তো শুরু করবে, যদিও ব্যাক আপে থাকছে ওয়েস্ট হ্যামের সেন্টার ব্যাক থিলো কেহের। সুযোগ পেয়েছে সাউদাম্পটনের তরুণ ডিফেন্ডার আর্মেল বেলা-কোচাপও।

হোল্ডিং মিড হিসেবে অবশ্যই প্রথম এগারোয় থাকছে বায়ার্নের জোশুয়া কিমিখ এবং লিও গোরেৎজকা। ব্যাক আপ থাকছে বরুসিয়া মনচেনগ্ল্যাডব্যাখের অনফর্ম মিড জন হফম্যান। লিংক আপ প্লে এবং সাপ্লায়ার হিসেবে অন দ্য ফিল্ড কিমিখের দিকে বিশেষ নজর থাকবে। বিশেষ করে চ্যানেল ক্রিয়েট করার দিকে। এছাড়া থাকছে ম্যাঞ্চেস্টার সিটির অভিজ্ঞ সেন্ট্রাল মিড ইকের গুন্দোগান। টনি ক্রুজ আর এবছর নেই, বদলে বহুবছর পর দলে কামব্যাক করেছে অধুনা পিএসভি আইন্দোভেনে থাকা মারিও গটজে, ২০১৪ ফাইনালের একমাত্র গোলদাতা। আপফ্রন্টে তিন অ্যাটাকিং মিড হিসেবে মাঝে থাকবে দলের সবচেয়ে এক্সপিরিয়েন্সড এবং নিজের প্রথম বিশ্বকাপেই গোল্ডেন বুটজয়ী টমাস মুলার। ডানদিকে বায়ার্নের সের্জিও গ্যান্যাব্রি এবং বাঁয়ে লেরয় সানে। ব্যাক আপ হিসেবে বায়ার্নের তরুণ সুপারস্টার জামাল মুসিয়ালা (ফ্লিকের বিশেষ পছন্দের প্লেয়ার)। এছাড়া বরুসিয়া ডর্টমুন্ডের তরুণ প্লেয়ার ইউসুফা মৌকোকো দলে রয়েছে।

জার্মানির মূল সমস্যা, প্রপার নাম্বার নাইন। সেখানে প্রথম অপশন চেলসির কাই হাভের্টজ। সানে বা গ্যান্যাব্রিও ঐ পজিশনে খেলতে সক্ষম। হয়তো রোটেশনালি হবে, কিন্তু ফ্লিকের হাতে অপশন না থাকায় একমাত্র গোলের লোকের অভাবে ভুগতে হতে পারে। তাই পারফেক্ট অ্যাটাক রয়েছে জার্মানির— এমন কথা জোর দিয়ে বলা যাচ্ছে না।

জাপান ম্যাচেই যার এফেক্ট স্পষ্ট। কেন জিতল জাপান? কী জাদু করল মাঠে? একটু ঘাঁটলে উত্তর বেরিয়ে আসে। ইদানিংকালের ফুটবলে এশিয়া থেকে অনেক এক্সপোজার হয়েছে। কেইসুকে হন্ডার পর ভাল স্ট্রাইকার ওরা পায়নি ঠিকই, কিন্তু পেয়েছে তাবড় কিছু মিডফিল্ডার। যাদের অধিকাংশই ওই দ্বীপ থেকে সূদূর ইউরোপে পাড়ি জমিয়েছে। টমিয়াসু অনেকদিন খেলছে আর্সেনালে এবং ফার্স্ট ইলেভেনে প্রায় নিয়মিত। জাপানের ক্যাপ্টেন এবং সেন্টার ব্যাক মায়া য়োসিদা এককালে সাউদাম্পটনে খেলার পর এখন চলে গেছে জার্মান সিস্টেমে, শালকেতে। কামাডা, তানাকা, শিবাস্কি— খেয়াল করলে দেখা যাচ্ছে, এবারের বিশ্বকাপ স্কোয়াডে জাপানের ২৬টা প্লেয়ারের মধ্যে মাত্র ৭ জন জাপান লিগের ফসল। তাও তাদের ৪ জন রিজার্ভ। বাকি সবাই ইউরোপের নানা দেশে ছড়িয়ে এবং বেশিরভাগ জার্মানিতে সেটলড। অনেক বছর ধরে একই সিস্টেমে অভ্যস্ত এই জাপান আগে থেকেই জানে কাউন্টার প্রেসিং কী জিনিস। সুতরাং, ফুটবলায়ঃ নমঃ।

শুরুতেই ডানদিক থেকে ক্রস তুলে একটা ঝটকা দিয়েছিল তাই। লাইন ব্রেকে অফসাইড বলে গোলটা হল না। আর জার্মানি শুরু থেকে হাই ব্যাকলাইনে খেলে এল, গুন্দোগান একাই বক্স টু বক্স মিডে লিঙ্ক আপ প্লে খেলতে শুরু করল। যার ফলস্বরূপ বাঁদিকে প্রচুর বল পেতে থাকল রাউম আর ওয়াল খেলে চট করে মাঝে ঢুকছিল মুসিয়ালা। দারুণ স্ট্র্যাটেজি। রাউম তখন আর লেফট ব্যাক নেই, লেফট ওয়াইড মিড। ৪-২-৩-১ ছকে শুরু করে ৩-৫-২ হয়ে গেল, ডানদিকে সাইডব্যাক থেকে ফুলব্যাক হয়ে গেল সুল। আর এই সময়েই জার্মান প্রেসিংয়ের ধারাবাহিকতা দেখাল গোটা টিম। কিন্তু যে শঙ্কাটা ছিল, মানে গোল করার লোক তো নেই উপরন্তু নাম্বার টেন হিসেবে মুলার প্রায় অচলই একটু, তাই ফিনিশিংয়ে মার খাচ্ছিল।

ঠিক এটার সুযোগ নিল জাপান আর লাইন ব্রেকিং পাসে মিড থেকে আপফ্রন্টে দরজা খুলতে শুরু করল। জার্মানিরই আমদানি কাউন্টার প্রেসিংয়ে এল প্রথম গোল। বাঁদিক থেকে যখন শট নিচ্ছে তখন অলরেডি মাঝে প্লেয়ার ঢুকে গেছে। গোলের সামনে একটা সেন্টার ব্যাক ছাড়া কেউ নেই তখন। দ্বিতীয় গোলটায় টাইট অ্যাঙ্গেল থেকে শট। জার্মানির নিউমেরিক্যাল সুপ্রিমেসি ঘেঁটে ঘ! ব্যক্তিগত মত, ১-০ অবস্থায় গুন্দোগানের মতো বক্স মিডকে তুলে অপেক্ষাকৃত স্লো এবং ডিফেন্সিভ ব্লকার গোরেৎজকাকে নামানো চরম ভুল ফ্লিকের। রিজার্ভ বেঞ্চ যে তৈরি নেই বোঝা গেল। দ্বিতীয়, জামাল মুসিয়ালাকে তুলে আনফিট গটজেকে নামানো। গোল পাওয়ার তাগিদে গটজেকে নামানো হলেও পুরো আনফিট একটা প্লেয়ারকে ব্লকেজে ফেলতে খুব বেশি খাটতে হল না জাপান ডিপ ডিফেন্সকে। ফলে মাঝখান থেকে কিমিখের চ্যানেলটা পুরোপুরি গেল বন্ধ হয়ে!

জাপান এশিয়ার বেস্ট টিম। কাগজে-কলমে নয়, অন দ্য ফিল্ড জাপানের স্ট্রেংথ যে কোনও ইউরোপিয়ান টিমকে পাল্লা দেওয়ার জন্য কাফি। আজকের পর তো আরও বেশি করে মালুম হবে এটা। জার্মানি আর স্পেনের সঙ্গে একই গ্রুপে বিরাজমান জাপান এই গ্রুপ থেকে চ্যাম্পিয়ন হয়ে নেক্সট রাউন্ডে যাওয়ার ক্ষমতা রাখে। আসলে এটা একদিনের ফসল নয়। দিনের পর দিন জে-লিগের মতো একটা ধারাবাহিক জিনিসকে চালিয়ে প্লেয়ার সেখান থেকে তৈরি করে নিতে পেরেছে জাপান। ইউরোপ থেকে নামজাদা প্লেয়াররা এখন জাপানে খেলতে গেছে। জাপানের কোয়ালিটির উপর নির্ভর করে ইউরোপ ডাকছে তাদের। শুধু কি জাপান? সাউথ কোরিয়া নিজেদের ফূটবল লিগকে উত্তরোত্তর শক্তিশালী করার দিকে ভালই এগোচ্ছে। এর আগেও আমরা শিনজি কাগওয়া, পার্ক জি সুংদের দেখেছি। দেখছি সন হিউন মিনকে, মিনামিনোকে। অনেকদিনের একনিষ্ঠ সাধনার ফল হিসেবে এখন দৃশ্যমান হচ্ছে। হতেই হত, যে মানের ইনফ্রাস্ট্রাকচার তাতে করে না হলেই বরং অবাক হওয়ার ছিল।

স্পেন ম্যাচে বারবার দুটো উইংয়েই খেলা ছড়াতে চাইছিল তাই। কিন্তু স্পেনের গোছানো মাঝমাঠে মার খেল। সেই একই ফিনিশারের অভাবে তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে গ্রুপের শেষ ম্যাচের দিকেই।

জার্মানির কাছে শেষ সুযোগ, শেষ ম্যাচে কোস্টারিকাকে বড় ব্যবধানে হারানো। জানা নেই কী হতে পারে। যদিও এ মঞ্চ বিশ্বকাপের, তায় টিমের নাম জার্মানি।

হিসেব উল্টে দিতে কতক্ষণই বা সময় লাগে!

 

ইউসেবিওর দেশে

১৯৬৬ বিশ্বকাপ আদতে ইউসেবিওর বিশ্বকাপ। একাই ৯ গোল করে পর্তুগালকে প্রায় জিতিয়ে দিতেন, কিন্তু তীর পর্যন্ত তরী আর আসেনি। এবং তারপর থেকে কার্যত কোনও ইন্টারন্যাশনাল ট্রফিই ঢোকেনি নাভেগেদোরেস (পর্তুগাল জাতীয় ফুটবল দলের ডাকনাম, দ্য নেভিগেটরস) শিবিরে। কিংবদন্তি লুইস ফিগো, ম্যানিশ, ডেকো, তৎকালীন তরুণ উঠতি তারকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো, নুনো গোমেস, রিকার্ডো কার্ভালহো, হেল্ডার পস্টিগো সমৃদ্ধ দলটা সেমিফাইনালে পৌঁছেও অবিশ্বাস্য ফ্রান্সের কাছে হারতে হয়। বিশ্বকাপে একবার তৃতীয়, একবার চতুর্থ – আদতে এই হল পর্তুগালের সর্বোচ্চ বিশ্বকাপ যাত্রা। তাও কত বছরের গ্যাপে? ১৯৬৬ এবং  ২০০৬ – ৬০ বছর!

২০১৬-তে এসে অবশ্য অভিশাপের কিছুটা ঘোচানো গেছে। ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো অ্যান্ড কোং এডেরের করা গোলে ইউরো কাপ জিতল, ফের ২০১৯-এ নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে তুলে নিল উয়েফা নেশনস লিগ।

সেই পর্তুগালের এবারের বিশ্বকাপের শুরুতেই ধাক্কা। চোটের জন্য তারা পাচ্ছে না লিভারপুলের অনফর্ম অ্যাটাকার দিয়েগো জোটাকে। জোয়াও মুটিনহোও চূড়ান্ত দলে নেই। গোলে রুই পাত্রেসিওর সঙ্গে পোর্তোর তরুণ কিপার দিয়েগো কোস্তা ভালই ফর্মে আছে এবং শুরু হয়তো সে-ই করবে। রিসেন্টলি এই মরসুমে পোর্তো চ্যাম্পিয়ন্স লিগের শেষ ষোলোতেও পৌঁছে গেছে। ডিফেন্সে ম্যাঞ্চেস্টার সিটির রাইট ব্যাক জোয়াও ক্যানসেলো শুরু করবে, ব্যাক আপ থাকছে ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেডের দিয়েগো ডালট (ডালট আর ক্যানসেলো দুজনেই শুরু করতে পারে, সেক্ষেত্রে ক্যানসেলো হয়ে যাবে লেফট ব্যাক)। সেন্টার ব্যাকে বহুদিনের অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার পোর্তোর পেপে, সঙ্গে থাকছে প্যারিস সাঁ জাঁর নুনো মেন্ডেস, বরুসিয়া ডর্টমুন্ডের রাফায়েল গুয়েরো। সাইডব্যাকে পিএসজির দানিলো হয়তো ব্যাক আপ হিসেবেই রয়েছে।

মিডফিল্ডে তিন ভরসার নাম ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেডের ব্রুনো ফার্নান্ডেজ, ম্যাঞ্চেস্টার সিটির বার্নার্ড সিলভা এবং উলভারহ্যাম্পটনের রুবেন নেভেস। তিনজনেই চলতি মরসুমে দুর্দান্ত ফর্মে। ৪-৩-৩ ছকে শুরু করলে এদের ব্যাক আপে থাকছে বেনফিকার হোল্ডিং মিড জোয়াও মারিও, পিএসজির তরুণ মিড ভিটিনহা। ভিটিনহা সুযোগ পেলে তার দিকে বিশেষ নজর থাকবে।

ফরোয়ার্ডের নাম্বার নাইন হিসেবেই শুরু করবে অধিনায়ক এবং সুপারস্টার ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো, ২০২২ কাতার যার শেষ বিশ্বকাপ হতে চলেছে। কোচ ফার্নান্দো স্যান্টোস সহ গোটা টিম রোনাল্ডোর শেষ বিশ্বকাপে কিছু ভাল করার প্রচেষ্টায় ঝাঁপাবেই। ডানদিকে গত বছর এসি মিলানের হয়ে সিরি এ জেতা রাফা লিয়াও এবং বাঁয়ে অ্যাথলেটিকো মাদ্রিদের জোয়াও ফেলিক্স থাকছে।

রোনাল্ডো নির্ভর না হলে এই টিমের ক্ষমতা আছে সেমিফাইনাল খেলার। মাঝমাঠে তিন মিড ব্রুনো, বার্নার্ড এবং রুবেন নেভেস— পাসিং এবিলিটি আর আপফ্রন্টে সাপ্লায়ার হিসেবে খেলছে। ঘানা ম্যাচে রাফা লিয়াও নামতে এবং ব্রুনো নিজের ১০ নম্বর পজিশন ফিরে পেতেই খেলা ঘুরল। ৩-২ তে জেতা ম্যাচে দুটো অ্যাসিস্টই এল ব্রুনোর পা থেকে। পরের উরুগুয়ে ম্যাচে দুটো গোলও পেল।

সব মিলিয়ে, এই পর্তুগাল দল হিসেবে মোটেও খারাপ নয়। কিন্তু নক-আউট পর্বে হোঁচট খাওয়ার আদি ইতিহাসের জন্যই এরা আনপ্রেডিক্টেবল। উপরন্তু রোনাল্ডোর শেষ বিশ্বকাপ, তাই পর্তুগালের উপর আলাদা করে নজর তো থাকবেই।

 

ডার্ক হার্স ডাচবাহিনি

তিনবারের ফাইনালিস্ট, তিনবারই অসাধারণ টিম, শক্তি নিয়ে নামা কমলা জার্সিধারীরা ঠিক শেষ মূহূর্তে গিয়েই পচা শামুকে পা কেটেছে। জোহান ক্রুয়েফের টোটাল ফুটবল দিয়ে শুরু, তারপর ১৯৭৮-এ তরুণ স্টার মারিও কেম্পেসের আগমন। শেষবার, ২০১০-এ আর্জেন রবেনের শট স্পেনের কিপার ক্যাসিয়াসের কাছে আটকে যাওয়া— তিন-তিনবার এত কাছ থেকেও খালি হাতেই ফিরতে হয়েছে ডাচ দলকে। ২০১৮-তে খেলারই সুযোগ পেল না যারা…

যদিও এবারে টিম একেবারে তৈরি। এবং বিশ্বকাপের আসরে বড় কিছূ চমক দেওয়ার জন্য টিম রেডি। অ্যাজাক্স কিপার রেমকো পাসভিরই লুই ফান গলের টিমের প্রথম একাদশের কিপার হতে চলেছে। ডিফেন্সে এতদিনের অভিজ্ঞতাকে সঞ্চয় করে জীবনের প্রথম বিশ্বকাপ খেলতে চলেছে লিভারপুলের সেন্টার ব্যাক ভার্জিল ভ্যান ডাইক। সঙ্গে এই মূহূর্তে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সেন্টার ব্যাক এবং সদ্য এই সিজনে জুভেন্তাস থেকে বায়ার্নে যোগ দেওয়া ম্যাথিয়াস ডে লিট। ব্যাক আপে থাকছে ম্যাঞ্চেস্টার সিটির সেন্টার ব্যাক নাথান একে, অ্যাজাক্সের জুরিয়ন টিমবার। সাইডব্যাকে শুরু করবে হয়তো ইন্টার মিলানের ড্যানিয়েল ডামফ্রিজ এবং অ্যাজাক্সের ডেলে ব্লাইন্ড। গোছানো ডিফেন্স নিয়ে কাতারের প্লেন ধরতে চলেছে লুই ফান গলের ডাচ দল।

মিডফিল্ডেও ভরাট সংসার। যার প্রধান বার্সেলোনার অনফর্ম মিড ফ্র্যাঙ্কি ডি য়ং। সঙ্গে লেফট মিডে অ্যাজাক্সের তরুণ উঠতি প্লেয়ার জাভি সিমন্স, ডানদিকে স্টিভেন বার্ঘুইস। ব্যাক আপে হিসেবে থাকছে অ্যাজাক্সের ডেলে ক্লাসেন এবং আটালান্টার মিডফিল্ডার টিউন কুপমেইনার্স।

সবচেয়ে দেখার যেটা, সেটা নেদারল্যান্ডসের অ্যাটাক। বার্সেলোনার মেমফিস ডিপে নাম্বার নাইন পজিশনে খেললে লেফট উইং থেকে উঠে আসবে টটেনহ্যাম থেকে এই সিজনে অ্যাজাক্সে আসা স্টিভেন বার্গওয়াইন। অথবা স্ট্রাইকার হিসেবে থাকতে পারে বার্সেলোনা থেকে পিএসভি আইন্দোভেনে যাওয়া লুক ডি য়ং। ব্যাপ আপে থাকছে উঠতি আইন্দোভেনের তরুণ কডি গ্যাকপো, যার ফর্ম দেখে অনেক বড় ক্লাবই তাকে প্রস্তাব দিতে ইচ্ছুক। অলরেডি ছেলেটার প্রথম দুটো ম্যাচে দুটোতেই গোল। মেম্ফিস ডিপে আর গ্যাকপোর একটু নিচ থেকে খেলছে ক্ল্যাসেন। সেনেগালের বিরুদ্ধে প্রথম ম্যাচে জয় এল, কিন্তু লুই ফান গোলের ৩ ব্যাক সিস্টেম দাঁড়াল না ইকুয়েডরের কাছে। ১-১ ড্র করেও অবশ্য কমলাবাহিনি পরের রাউন্ডে, যেখানে অপেক্ষা করছে কার্যত লড়ে উঠে আসা আমেরিকা।

এবারের বিশ্বকাপ তাই নেদারল্যান্ডসের কাছে হতে চলেছে অন্য কিছু, যেখানে কিছু হারানোর নেই, কিছু পাওয়ার নেই। আটবছরের গ্যাপে সম্পূর্ণ তারুণ্যের ওপর ভিত্তি করে লুই ফান গল চলেছেন কাতার, যেখানে নেদারল্যান্ডসের দিকে নজর থাকবেই। কিছু চমকের আশায়, কিছু বড় সাফল্যের আশায়। প্রতিবারের মতো শেষ মূহূর্তে হড়কে যাওয়ার ইতিহাস থাকলেও।

 

রাজার মুকুটে পালক?

তথাকথিত তাবড় টিম বরাবরই। সে ববি চার্লটন, জিওফ হার্স্ট থেকে গ্যারি লিনেকার, পিটার শিল্টন থেকে জর্ডন পিকফোর্ড— কোনওকালেই প্লেয়ারের কমতি নেই ইংল্যান্ডে। কিন্তু প্রতিবারই হয় কোয়ার্টার, না হয় রাউন্ড অফ সিক্সটিনে এসে থেমে গেছে যাত্রা। এবং ডেভিড বেকহ্যাম, জন টেরি, ফ্র্যাঙ্ক ল্যাম্পার্ড, স্টিভেন জেরার্ড, ওয়েন রুনি সমৃদ্ধ দল নিয়েও কোয়ার্টারের হার্ডল টপকাতে পারেনি বিশ্বকাপে। কিন্তু তার পরের ব্যাচ, অর্থাৎ হ্যারি কেন, ডেলে আলি, রহিম স্টার্লিং খেলে ফেলেছে বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল স্টেজ। এমনকি শেষ ইউরো কাপে রানার্সও ইংল্যান্ড। তাই গ্যারেথ সাউথগেটের টিম যে ভাল ফলের আশাতেই কাতারে রওনা হচ্ছেন, এটা বললে অত্যুক্তি হবে না।

গোলে আর্সেনালের অনফর্ম কিপার অ্যারন র‍্যামসডেল থাকলেও, সাউথগেটের প্রথম পছন্দ এভার্টনের জর্ডন পিকফোর্ড। ডিফেন্সে দুই সাইডব্যাক ম্যাঞ্চেস্টার সিটির কাইল ওয়াকার আর ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেডের লুক শ’, যদিও শুরু করবে হয়তো নিউক্যাসল ইউনাইটেডের কেভিন ট্রিপিয়ার। মাঝে দুই সেন্টার ব্যাকের একজন টটেনহ্যামের এরিক ডায়ার, অপরজন ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেডের হ্যারি ম্যাগুয়ের। ব্যাক আপে থাকছে ম্যাঞ্চেস্টার সিটির জন স্টোনস। এছাড়া টিমে রয়েছে এই মূহূর্তে দারুণ ফর্মে থাকা আর্সেনালের বেন হোয়াইট এবং লিভারপুলের ট্রেন্ট আলেকজান্ডার-আর্নল্ড।

মিডফিল্ড বেশ গোছানো ইংল্যান্ডে। মাঝে ম্যাঞ্চেস্টার সিটির কেলভিন ফিলিপস এবং ওয়েস্ট হ্যামের ডেক্লেন রাইস হোল্ডিংয়ে থাকলে ওপরে তিন অ্যাটাকিং মিড হিসেবে থাকছে বরুসিয়া ডর্টমুন্ডের উঠতি তরুণ প্লেয়ার জুড বেলিংহ্যাম, লিভারপুলের জর্ডন হ্যান্ডারসন এবং ম্যাঞ্চেস্টার সিটির তরুণ তুর্কি ফিল ফডেন। প্রসঙ্গত, ফডেন অনুর্ধ্ব ১৭-র বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন। এবার বড়দের বিশ্বকাপে বিশেষ করে নজর থাকবে ফডেনের দিকে। ব্যাক আপ হিসেবে লেস্টার সিটির জেমস ম্যাডিসন, কিন্তু নেই আরেক তরুণ তারকা ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেডের জ্যাডন স্যাঞ্চো!

অ্যাটাকিং সাইডে বরং ইংল্যান্ড অনেকের তুলনায় শক্তিশালী। মেন স্ট্রাইকার টটেনহ্যামের হ্যারি কেনের সঙ্গে এই সিজনে চেলসির রহিম স্টার্লিং, ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেডের মার্কস র‍্যাশফোর্ড। ডানদিকে এই মূহূর্তে ইংল্যান্ডের সেরা রাইট উইং আর্সেনালের বুকায়ো সাকা, যার ফর্মে আর্সেনাল এই সিজনে এখন লিগ টেবিলে সবার ওপরে। ব্যাক আপে থাকছে ম্যাঞ্চেস্টার সিটির জ্যাক গ্রিলিশ এবং নিউক্যাসল ইউনাইটেডের ক্যালম উইলসন।

ইংল্যান্ড ইতিমধ্যেই রাউন্ড অফ সিক্সটিনে উঠে গেছে, কিন্তু আমেরিকার কাছে আটকানো সাউথগেটকে একটু হলেও চিন্তায় রাখবে। সেকেন্ড ডে অফ বিশ্বকাপ, ইংল্যান্ডের প্রথম ম্যাচ ইরানের সাথে। ইরানের ডিপ ডিফেন্সের দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে অনেকবার লেফটব্যাক লুক শ আর রাইটব্যাক কেভিন ট্রিপিয়ার বক্স টু বক্স মিডের সাথে জোন ওয়াইস এক-দুটো ওয়াল খেলে ভেতরে ঢুকে শট নিয়েছে। কিংবা, জোন ১০-এর কাছাকাছি নিউমেরিক্যাল সুপ্রিমেসিতে ব্যাকলাইন ভাঙা পাস, থ্রু খেলেছে। মাঝমাঠে পাস খেলছে যখন, হ্যারি কেন নিচে নামার সাথে দুটো ম্যানকে নিজের দিকে টেনেছে। ফলে আপফ্রন্টে স্পেস খুলেছে, উইংব্যাকরা তার মধ্যে ঢুকেছে বা ইনভার্টেড উইঙ্গাররা কাট ইন করে শট নিয়েছে (সৌজন্যে: রাশফোর্ডের গোল)। থ্রু পাসে গোলের দরজা খোলা গেছে কারণ ফাইনাল থার্ডে ইরান লো ব্লক প্রায় ব্যবহার করতেই পারেনি।

এবার চোখ ঘোরানো যাক আমেরিকা ম্যাচে। সেই একই দুটো উইংব্যাকের ব্যবহারিক কার্যকলাপ অ্যাটাক থেকে পরিণত হয়েছে প্রায় ট্র্যাকব্যাকার হিসেবে। লো ব্লকে আপফ্রন্ট বারবার ধাক্কা খেয়েছে, ডানদিক থেকে পাস খেলে ওপরে ওঠার সুযোগই পায়নি তেমন কারণ ইউএসএর উইঙ্গার রবিনসন কাউন্টার প্রেসিংয়ে নাভিশ্বাস তুলে দিচ্ছিল। হাই প্রেসে স্টোনস আর ম্যাগুয়ের মিডলাইন বরাবরা উঠতেই পারেনি গোটা ম্যাচে। মাউন্ট পজিশন চেঞ্জ করতে করতে একবার স্পেস খুলেছিল, নিচে দেখা যাচ্ছে লুক শয়ের থ্রু। যেটা অনবদ্য সেভ করল ম্যাট টার্নার। অর্থাৎ সেকেন্ড গ্রাফটা থেকে পরিস্কার বোঝা যাচ্ছে যে ইউএসএ ইংরেজদের সাধের দুটো উইং খুব যত্ন নিয়ে চেপে দিয়েছে। ফলে যে লব পাসগুলো ট্রিপিয়ারের কাছ থেকে এক্সপেক্টেড ছিল, রাইট আউটে মাউন্ট, ট্রিপিয়ার আর সাকা এবং লেফট আউটে স্টার্লিং, বেলিংহ্যাম আর শ মিলে যে পাসগুলো খেলে ছোট ছোট স্পেস ক্রিয়েট করত, যার মধ্যে অনায়াসে ঢুকে ফাইনাল বলটার জন্য অপেক্ষা করত কেন— সেই সাপারটা সার্ভ করতেই দেয়নি ইউএসএ ডিপ ডিফেন্স। উইং চেপে দেওয়াতে পাস খেলা বন্ধ, আর সেন্ট্রাল মিডে টাইরাল অ্যাডামস ডেক্লেস রাইসের চ্যানেলটা বন্ধ করে দেওয়ায় ইংল্যান্ড বল পজিশন পেলেও অ্যাটাক তুলতেই পারেনি। আর সেটার সুযোগে দুটো উইং দিয়ে রবিনসন আর ম্যাককিনে অনবরত কাট ইন করে ঢুকেছে, আমেরিকার দুই ওভারল্যাপিং উইংব্যাক সময়ে সময়ে উঠে গিয়ে ট্র্যাঙ্গল তৈরিতে হেল্প করে গেছে। ভাগ্য খারাপ ছিল বলে ড্র করল ম্যাচটা আমেরিকা। অথচ শুরুতে ইংল্যান্ড কিন্তু ভালই প্রেস করছিল। ফার্স্ট হাফের শুরুর দিকে দুটো উইংব্যাকের পাস ডিস্ট্রিবিউশন দেখলেই মালুম হচ্ছে যে টিমটা নিরাশ করতে আসেনি। কিন্তু যেই আমেরিকা উইং চাপা শুরু করল অমনি বন্ধ হল রাইসের চ্যানেল। বেলিংহ্যাম স্বভাবসুলভ উপরে উঠে নিজের খেলাটা খেলতে পারল না। বাধ্য হয়ে হ্যান্ডারসনকে নামাতে হল সাউথগেটকে। ওখানেই খেলা শেষ ইংল্যান্ডের। উল্টোদিকে পুরো সেকেন্ড হাফ জুড়ে অসাধারণ প্রেসিং করে গেল আমেরিকা, খুব স্বাভাবিক কারণেই।

তবু আশা করাই যায় যে, আগেরবারের মতো এবারেও চমকে দেবেই গ্যারেট সাউথগেটের টিম।

 

স্প্যানিশ আর্মাডার স্লোগান

২০০৮-২০১২, ডমিনেন্স শব্দটার আসল অর্থ কী, তা মর্মে মর্মে টের পেয়েছে বাকি বিশ্ব। সৌজন্যে লাল-নীল জার্সি পরিহিত স্পেন ফুটবল টিম। যাদের সেই সময় প্রতিটি পজিশনে শ্রেষ্ঠতম ফুটবলার বিরাজ করত। ভিসেন্তে দেল বস্কের তত্ত্বাবধানে গোলকিপার-ডিফেন্স-মিডফিল্ড-অ্যাটাক… প্রতিটি জায়গায় টপ প্লেয়ারদের বাস। এবং সেই সুবাদেই দুটো ইউরো কাপ আর একটা বিশ্বকাপ তাদের ট্রফি কেবিনে শোভিত। কিন্তু ২০১৪ থেকে সেই যে গল্প পাল্টাতে শুরু হল, ২০১৮-তে ন্যক্কারজনক বিদায়ের পর প্রাক্তন বার্সেলোনা কোচ লুইস এনরিকে হাতে তুলে নিলেন জাতীয় দলের দায়িত্ব। আর প্রথম টুর্নামেন্টেই টিম সেমিফাইনালে (২০২১ ইউরো কাপ)।

এনরিকের টিমের আসল উদ্দেশ্য বিল্ড আপ প্লে। যাতে গোটা টিম পাসিং গেমে বিপক্ষকে নাজেহাল করে। সে কারণে বল প্লেয়িং গোলকিপার অ্যাথলেটিক বিলবাওয়ের উনাই সিমন একনম্বর কিপারের স্থান দখল করে নিয়েছে এই মূহূর্তে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কিপার দাভিদ দ্য হিয়ার পরিবর্তে। ডিফেন্সে এবার আর সের্জিও র‍্যামোস নেই, বদলে ভিয়ারিয়ালের পাও তোরেস এবং বার্সেলোনার এরিক গার্সিয়া। সঙ্গে দুই সাইডব্যাকে অভিজ্ঞ চেলসি অধিনায়ক সিজার অ্যাজপিলিকুয়েতা, রিয়াল মাদ্রিদের দানি কার্বাহাল এবং বার্সেলোনার জর্দি আলবা। ব্যাক আপে থাকছে ম্যাঞ্চেস্টার সিটির এরেমিক লাপোর্তে এবং ভ্যালেন্সিয়ার হুগো গিউলামন।

মিডফিল্ডে এনরিকের আস্থা বার্সেলোনার দুই তরুণ প্রতিভাবান তারকা পেদ্রি ও গাবির উপর। গত দু বছর ধরে দুজনে সমাল তালে পারফর্ম করে চলেছে। সঙ্গে অধিনায়ক এবং অভিজ্ঞ বার্সেলোনার সের্জিও বুস্কেটস, অ্যাথলেটিকো মাদ্রিদের কোকে, ম্যাঞ্চেস্টার সিটির রড্রি। ব্যাক আপ হিসেবে অ্যাথলেটিকো মাদ্রিদের মার্কস লরেন্তে এবং পিএসজির কার্লোস সোলের।

অ্যাটাকিং সাইডে গত ইউরোতে ভাল পারফরম্যান্সের সুবাদে দলে জায়গা পেয়েছে অ্যাথলেটিকো মাদ্রিদের আলভারো মোরাতা। সঙ্গে দুদিকে রিয়াল মাদ্রিদের মার্কো অ্যাসেন্সিও এবং বার্সেলোনার আনসু ফাতি। যদিও প্রথম একাদশে জায়গা পেতে পারে বার্সেলোনার ফেরান তোরেস এবং পিএসজির পাবলো সারাবিয়া। ব্যাক আপ হিসেবে থাকছে ভিয়ারিয়ালের হয়ে গত মরসুমে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ সেমিফাইনাল খেলা য়েরেমি পিনো, লিপজিগের ড্যানি ওলমো এবং বিলবাওয়ের নিকো উইলিয়ামস। তারুণ্যে ভরা স্প্যানিশ আর্মাডা প্রথম ম্যাচেই কোস্টারিকাকে ৭-০ গোলে পরাস্ত করে, যে ম্যাচে সর্বাধিক সংখ্যক পাস খেলে বিশ্বরেকর্ড করে স্পেন। দ্বিতীয় ম্যাচে জার্মানির সঙ্গে ১-১ ড্র করে স্বস্তিতেই। শেষ ম্যাচে জাপানকে হারাতে বা ড্র করতে পারলেই সেকেন্ড রাউন্ড নিশ্চিত।

 

ফেভারিট হিসেবে এই আটটা টিমই যাচ্ছে কাতারের উদ্দেশে। দু সপ্তাহও আর বাকি নেই বিশ্বকাপের দামামা বাজতে। সব হিসেব-নিকেশ পাল্টে দেওয়ার প্রতিযোগিতার নামই ফুটবল বিশ্বকাপ, যেখানে প্রতিবারই ঘটবে কিছু অঘটন, কিছু বিতর্ক, কিছু ইতিহাস। আর অংশগ্রহণ করা প্রতিটা টিমের কাছেই ‘ওয়ান চান্স ইন আ মিলিয়ন।’ তাই, আশায় বুক বেঁধে, লেটস সি, হোয়াট উইল হ্যাপেন ইন কাতার ২০২২!

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4063 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...