মধুমালতি ডাকে

মধুমালতি ডাকে | শৈলেন সরকার

শৈলেন সরকার

 

‘মধুমালতি ডাকে আয়—’ কানে আসা মাত্রই দোকান মাথায় উঠল। পাঞ্চালীদি। দুজন কাস্টমার ঘুগনির প্লেট নিয়ে টেবিলে বসে, পাউরুটি সেঁকে দেওয়া বাকি তখনও। লোকদুটোকে বললাম, রুটি নেই আর।

ফাংশানের পরে যাত্রা। ভিড় শুরু হয়নি এখনও। এখান থেকেই দেখতে পাচ্ছি পাঞ্চালীদিকে। নীল রঙের চুড়িদার, সাদা ওড়না। হারমোনিয়মে হাত রেখে বসে। পাশে তবলা নিয়ে সেই সাদা পাঞ্জাবি। ঝাঁকড়া চুল, মুখভরা দাড়ি।

হুড়োমুড়ি হচ্ছে জায়গা নিয়ে। হুড়োমুড়ি, ঝগড়া। যাত্রার জন্যই। বাড়ির লোকের জন্য জায়গা রাখবে বলে কেউ চট পাতছে, কেউ আবার সেই জায়গা নিজের বলে ঢুকতে দিচ্ছে না কাউকে। মোটকথা প্যান্ডেলে কী হচ্ছে, তা নিয়ে গা নেই কারও। আর গা করারই বা কী আছে, এ তো পাঞ্চালী। শনিবারের বাজারে যেতে শিট ডাক্তারের চেম্বারের উল্টোদিকে মাইতিবাড়ির ছোট মেয়ে। শনিবারের বাজারের দিকে ভোর ভোর গেলে গলা শুনতে পাবে। ‘আ-আ-আ-আ-।’

পাঞ্চালীদি গান শোনাবে আমাকে। যে ফাংশানেই হোক, গান গাইতে এসে খুঁজবে। সেবার বিনোদপুর গঙ্গামেলায় একেবারে আমার দিকে তাকিয়ে—। না, এখনও দেখতে পায়নি আমাকে। এত দূর পর্যন্ত চোখ আসবেই বা কীভাবে? আমাকে সুতরাং আরও সামনে যেতে হবে। দোকান ছেড়ে প্যান্ডেলের দিকে যেতে দেখে বাপি অবাক হল খুব। বলল, যাচ্ছিস কোথায়? সিগারেটের কথা বললাম। হায়দারদের দোকান থেকে আনতে হবে, শেষ হয়ে গেছে। বাপি বলল, ভাবলাম, পাঞ্চালীদিকে দেখার জন্য—। এত রাগ উঠল আমার, বললাম, সবাইকে কি নিজেদের মতো ভাবিস নাকি?

আমাকে সুতরাং একবার হলেও হায়দারদের দোকান ঘুরে আসতে হবে। ‘যুথি কামিনী কত কথা, যুথি কামিনী কত কথা-আ-আ গোপনে বলে মলয়া আ আ আয়—।’ গা শিরশির করে। দেখি হারমোনিয়ামে হাত রেখে পাঞ্চালীদি আমার দিকেই তাকিয়ে। বাপি কি লক্ষ রাখছে? খেয়াল না করেই মাড়িয়ে দিয়েছি কাউকে। কী সব বলল একজন। দাড়িওয়ালা লোকটা তবলা বাজাতে বাজাতে আড়চোখে দেখল পাঞ্চালীদিকে, আর পাঞ্চালীদির দিকে চোখ রেখেই যেন টের পেল কিছু। পাঞ্চালীদির চোখ ধরে ধরে বাঁধের গায়ে কার্তিকদের জিলিপির দোকানের দিকে তাকিয়েই দেখতে পেয়ে গেল আমাকে। আর অমনি তবলায় তাল তুলতে শুরু করল এমন যেন থামবেই না, যেন আর গাইতেই দেবে না পাঞ্চালীদিকে। লোকটার উপর আমার রাগ খুব। সারাক্ষণ পাঞ্চালীদির পাশে—। রাগ আছে তমালেরও। বলে, ইট মেরে ওর—।

আমন উঠে গিয়ে মাঠ এখন ফাঁকা। বর্ষার ধান পড়ার আগে মাস দুইয়ের মধ্যে মেলা আছে অনেক। বনবিবির মেলা, চণ্ডীমেলা। আমাদের অবশ্য বনবিবির মেলাটাই বড়। পুজোর জন্য নদী পার হয়ে ঢুকতে হবে জঙ্গলে। ওই একদিনই। দূর-দূরান্তের অনেক লোক শুধু জঙ্গল দেখার জন্যই আসবে তখন। হঠাৎ দেখি ঘাড়ে হাত পড়ল কার। তাপস। বলল, তুই এখানে? ওকে সিগারেটের কথা বললাম। হায়দারদের দোকানের কথা। ও বলল, হায়দারদের দোকানে যাবি তো এখানে কী? আমার কানে তখন ‘আলো ভরা কালো চোখে কি মাধুরী গো কি মাধুরী’, আমি তখন অপেক্ষা করছি, একেবারে পাঞ্চালীদির দিকে ঠায় তাকিয়ে অপেক্ষা করছি সেই কথাগুলির জন্য, আমি জানি কথাগুলি শুধু আমার জন্যই, আমার দিকে তাকিয়েই বলবে পাঞ্চালীদি। বলে উঠবে, ‘মন চাহি যে ধরা দিতে-এ-এ, তবু সে লাজে সরে যা-আ-আ-আয়।’ তাপস যেন সহ্য করতে পারছিল না, বলল, কিরে, বললাম কানে গেল না, তমাল আর সিরাজ পাঠাল আমাকে। তাপস চলে যেতেই দেখি আসল লাইনগুলিই হারিয়ে গেছে। কথাগুলি এই ফাঁকে বলা হয়ে গেছে। কথাগুলি বলে দিয়েছে পাঞ্চালীদি। আমার দিকে তাকিয়ে, আমাকে ওর দিকে তাকাতে না দেখে—। হায়দারদের দোকানে দাঁড়িয়েছি যখন, পাঞ্চালীদি যেন কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছে না আমাকে। কোথাও খুঁজে না পেয়ে এবার হারমোনিয়মের দিকে চোখ রেখেই গাইছে, ‘জানি জানি কে মোর হিয়া-আ-আ, রাঙালো রাঙা কামনা-আ-আয়—।’

রাতে বিছানায় শুয়ে জানালার বাইরে তাকাই। আকাশ চোখে পড়ে। অনেক দূর একেবারে জঙ্গলের গায়ে নেমে পড়া। টিপ টিপ তারা। বাঁধের ওপাশে জঙ্গল ছাড়িয়ে কোথাও একটা নৌকা স্টার্ট দিচ্ছে নদীতে।

ফি-বারই দোকান দিতে হত মেলায়। ঘুগনি, পাউরুটি। ঘুগনিটা মা-ই বানিয়ে দিত। বাবা কেরালা থেকে ফোনে বিক্রির খোঁজ নিত। বলত, ও যখন ব্যবসা বোঝে তো ব্যবসাই করুক, জঙ্গলে যেতে ভয় পায় যখন। একদম ঠিক। বাবার সঙ্গে সেই টাইগারের জঙ্গল পর্যন্ত গিয়ে আমার শিক্ষা হয়ে গেছে। মরলেও আমি আর—। আমি তবে কী করব? পড়া না পারলে অখিলস্যার এখন টোটো-ভ্যানের কথা বলে। বলে, বাপকে বল লাখখানেকে হয়ে যাবে। আর মেয়েদের বেলা বলবে বিয়ের কথা। বলবে, সামনের পুজায় মহারাষ্ট্র-কেরালা থেকে পাড়ার দাদারা ফিরলেই ঝুলে পড়।

আমাদের যখন ক্লাস এইট পাঞ্চালীদি সেবারই মাধ্যমিক পাশ করে স্কুল ছাড়ল। শনিবারের বাজারে গেলে চোখে পড়ত কখনও। শনিবার শনিবার হাফপ্যান্ট আর সেই সাদার ওপর গোলাপী ছিটের জামা গায়ের আমাকে দেখতে পেত পাঞ্চালীদি। আমি অবশ্য তাকাতে পারতাম না কিছুতেই। গৌর শিটের চেম্বারের কাছাকাছি এসে আমি যেন জানি না কিছুই। আমি তখন একেবারে উলটোদিকের পালান মাইতিদের পানের বরজের দিকে তাকিয়ে, আমি তখন বরজের মাথা ছাড়িয়ে দূরের উড়তে থাকা চিলের দিকে, আমি তখন একেবারে কোলে কোলে ভাসতে থাকা মেঘের দিকে—। জানি আমাকে দেখেই গাইছে কেউ, আমাকে তাকাতে না দেখে ঠিক রাগ করছে, জানালায় মুখ রেখে ‘ফুলফাগুনের এ খেলায়—।’

টেন-এ উঠে তমাল একদিন জানাবাড়ির তাপসীর কথা বলল। ও নাকি ভালবাসে তমালকে। চিঠি দিয়েছে। তাপসী তখন আমাদের অম্বিকানগর স্কুলেরই। ক্লাস এইট। চিনি মেয়েটিকে। নগেনাবাদের। তাকালাম তমালের দিকে। কোথাও যেন হিংসে হল খুব। চিনচিন করে উঠল বুকটা। তমাল কি আমার থেকে ভাল দেখতে? একটি মেয়ে, নগেনাবাদের সেই চুপচাপ হাঁটা মেয়ে তাপসী এখন থেকে তমালের। সেই মেয়ে নাকি তমালের জন্য অপেক্ষা করবে। সন্ধের আগে আগে গরু তোলার নাম করে সেই মেয়ে নাকি ওদের মন্দিরের পাশে এসে দাঁড়াবে। বললাম, তুই না বলতি পাঞ্চালীদির জন্য জান লড়িয়ে দিবি, ওই দাড়িওয়ালা তবলচির মাথা ফাটাবি ইট মেরে, আর এখন—। ও বলল, পাঞ্চালীদির কথা জানিস না তুই?

—কেন কী হয়েছে?
—পাঞ্চালীদি পালিয়েছে বাড়ি থেকে জানিস না? ওই দাড়িওয়ালা তবলচির সঙ্গেই।

জানি, ও ঠিক মিথ্যা কথা বলছে। আমাকে না জানিয়ে কোথাও যেতেই পারে না পাঞ্চালীদি। কিন্তু তমালকে মুখ ফুটে বলতেও পারি না সে কথা। বাপি আসেনি সেদিন। তাপসও না। ক্লাস টেনের সঙ্গে নাইনের ফুটবল ম্যাচ। বললাম, কে বলল তোকে?

—কে আবার বলবে, জানে তো সবাই। বাপিকে জিজ্ঞেস করিস। কিশোরীমোহনপুরের মনসামেলায় এবার ওর গান হয়নি তো। যাসনি?

আমাদের স্কুল বাড়ি থেকে হেঁটে অন্তত এক ঘন্টার পথ। ইটরাস্তা ধরে দশ নম্বর ঘাট, এবার বাঁধ ধরে ধরে। বাঁদিকে নদী, নদী ছাড়িয়ে জঙ্গল আর ডানদিকে গ্রাম, আমাদের বোসের চক। বাঁধের ঢাল ধরে বানি, গরান, গেঁওয়া। আর গাছপালার ফাঁক দিয়ে জলের চিকচিক। নদীঠাকুরান। দশ নম্বর ঘাট থেকে শ্মশান পর্যন্ত গিয়েই বাঁধ বাঁক নেবে নদীর মতো করেই, আর আমরাও। শনিবারের বাজারের রাস্তা পাকা হওয়ার আগে এই দশ নম্বর ঘাট ছাড়া আর কোনও উপায়ই ছিল না শহরে যাওয়ার। ভোর সাড়ে পাঁচটার নৌকা ধরো, সাড়ে চার ঘন্টা ভুটভুটিতে চেপে যাও রায়দিঘি, এবার তুমি বাস পেলে বাস বা পরে বাস ছেড়ে মথুরাপুর গিয়ে ট্রেন। সেইসব ঝামেলার দিন এখন অবশ্য নেই আর। এখন টোটো, মোটর ভ্যান, শনিবারের বাজারে বাস। ঘর থেকে বেরিয়ে টোটো বা মোটর ভ্যানে শনিবারের বাজার পর্যন্ত গিয়ে দাঁড়াও বাসের জন্য। বেশি হলে মিনিট ত্রিশ, সোজা জয়নগর। বাঁধের রাস্তা সুতরাং ওই স্কুলে যাওয়ার জন্যই। যারা যায় এখন। নীল প্যান্ট সাদা জামার ছেলে বা নীল পাড় সাদা শাড়ির মেয়েরা।

স্কুলের অখিলস্যার ঠিকই বলত, আমার দ্বারা সত্যিই কিছু হওয়ার নয়। হলও না। মাধ্যমিকে তিন বিষয়ে ফেল। বাবা বলে পাঠাল, স্কুলে যেতে হবে না আর। বরং কেরালায়—। বাবার ওখানে প্যান্ডেলের কাজ, থাকা আর সকাল-দুপুরের খাওয়া ফ্রি। মাস গেলে হাজার দশ জমানোটা ব্যাপার নয় কোনও। তমালটা কীভাবে কীভাবে পাশ করে গেল কে জানে? আমাদের দশ ক্লাসের স্কুল। ও নাকি সাইকেল করে সেই তাপসী নামের মেয়েটিকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে—। কাল সন্ধের পরপরই তমালের ফোন এল হঠাৎ করে। বলল, কোথায় তুই?

—মাইতি মোড়ে, পবিত্রর চায়ের দোকানে। কেন?
—পড়াশোনা করবি না আর? পরীক্ষা দিবি না?
—কী হবে পরীক্ষা দিয়ে, ফোন করলি কেন বল?
—পাঞ্চালীদি ফিরে এসেছে জানিস?

ধক্‌ করে উঠল বুকটা। পবিত্রর দোকানের সবকটা বেঞ্চেই ভিড়। চা, পান, বিড়ি। টিভিতে সিনেমা চালিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশি। দোকানের বাইরে রাস্তার ওপর পড়ে থাকা একটা লাইটপোস্টের উপর আমরা চার-পাঁচজন বসে। পেছনে পুকুর। আব্দুল কীসের ভিডিও দেখছে একটা। শ্রীপতি ওর এক কাস্টমারের সঙ্গে ভ্যানভাড়া নিয়ে গণ্ডগোলের গল্প করছে সুনীলকে। ভ্যান থেকে নামার পর বলছে পনেরোর বেশি দেবে না।

—হ্যালো, কিছু বলছিস না যে?
—কী বলব? আছি নিজের ঝামেলায়, আর তুই পাঞ্চালীদিকে নিয়ে—।
—কেন ঝামেলা কীসের?
—কেরালা যেতে বলছে বাবা।
—তো ঝামেলাটা কথায়, তুই কি বিদ্যাসাগর হবি নাকি? যাচ্ছে তো সবাই।

দু-এক কথার পর তমালই বলল, ছাড়ি তাহলে। ফোনটা ছাড়ার পরপরই মনে হল, আরে, একটা কথা জিজ্ঞেস করলে হয় তো ওকে। কল করলাম ফিরে। ফোন ধরেই ও বলল, কী হল?  বললাম, সেই গানটা শুনতে পাস আর?

—কোন গানটা?
—ওই যে ‘মধুমালতি ডাকে আয়—।’
—ধুর, ওইসব গান কে শুনবে এখন, আমাদের মতো গ্রামের দিকেই শুধু।

ওর দেখলাম মনেই নেই কিছু, মনে থাকলে পালটা কিছু জিজ্ঞেস করত ঠিক। বা, হঠাৎ করে কেন জিজ্ঞেস করলাম গানটার কথা।

চাঁদ উঠব উঠব করছে। পুবের বাদার মাথায় মেঘের গায়ে হালকা হলুদ। একটা ভুটভুটির শব্দ হচ্ছে কোথাও। ভট্‌ভট্‌—। যাচ্ছে হয়তো টাইগারের জঙ্গলের দিকেই। বা বড় গাঙে। মাছ নিয়ে ফিরবে দিন সাত কি দশ পার করে। কারও নৌকায় চলে গেলে হত। রমজান খুব করে বলছিল কাল। খারাপ হলেও অন্তত হাজার তিনেক টাকা তো ভাগে পড়ত। শ্রীপতির গল্প দেখি চলছে এখনও। হয়তো অন্য কোনও প্যাসেঞ্জার। পবিত্র চায়ের কথা জানতে চাইল। লিকার দিতে বললাম। শ্রীপতিকে বললাম, তুই কি লিকার না কি—। লিকার— বলে বিড়ি বাড়াল একটা।

কোনও দরকার ছিল না, মানে শনিবার ছাড়া বাজারে যাইই না কখনও, তবু। মাকে বললাম, বাজার যাচ্ছি কিছু লাগলে বলো। মা অবাক হল খুব। বলল, আজ বুধবার না? তুই তো শনিবার শনিবারই—।

শ্যামলের মোটর ভ্যান। ও বলেই রেখেছিল তুলে নেবে বাড়ি থেকে। শ্যামলের সঙ্গে গল্প করতে করতে কখন যে একদিকে গৌর শিটের চেম্বার অন্যদিকে মাইতিদের সেই বাড়ি পার করে দিয়েছি টেরই পাইনি। ও আসলে কাজের কথা বলছিল। এই ভ্যানের কাজে নাকি ওরও পোষাচ্ছে না। ওর কোন জামাইবাবু নাকি গুরগাঁও-এর…। শ্যামলকে বললাম,  তুই তাহলে দেখ তো আমার জন্যও, আমি শালা মরলেও বাবার কাছে কেরালায় যেতে পারব না।

এমনকী ফেরার সময়েও ভুলে গিয়েছিলাম। ফিরব সেই শ্যামলের ভ্যানেই। ওর লাইন পাঁচ নম্বরে। দাঁড়াতে হবে কিছুক্ষণ। শিবুদার চায়ের দোকানে চা শেষ করে বিড়ি ধরিয়েছি একটা, হঠাৎ দেখি নীল চুড়িদার আর সাদা ওড়না। দেখি সেই মাইতিবাড়ির গেটের বাইরে একটি মেয়ে তাকিয়ে আমার দিকে। তাকিয়েই। হাসল একটু। বা, কিছু বললও। যেন অনেক দিন পর দেখা হওয়ায় জানতে চাওয়া, ‘ভাল আছ?’ বা ‘কথা আছে, দাঁড়াও।’

আমার হাত থেকে বিড়ির টুকরোটা পড়ে গেছে কখন। পাঞ্চালীদি আসছে আমার দিকেই। সঙ্গে ইটের রাস্তা ঘষটাতে থাকা ট্রলি ব্যাগ। দূর থেকেই হাত উঁচু করে কী বলতে চাইল। যেন চলে যাব বলে ভয় পাচ্ছে। আমার রাগ, আমার অভিমান পাঞ্চালীদির না-জানার কথা নয়। ‘আমাকে না বলে কেন তুমি, কেন—?’

একটা মোটর ভ্যান একেবারে হুড়মুড় করে এসে থামল। আমাদের বোসের চকের দিক থেকেই। ডিফেন্সার। অন্তত জনা কুড়ি প্যাসেঞ্জার তো হবেই। এমনভাবে দাঁড় করাল গাড়িটাকে, আর একটু হলেই পাঞ্চালীদিকে—।

—কী করছিস কার্তিক, দেখে চালাবি তো।

কথাটা হয়তো একটু বেশি জোরেই বলে ফেলেছিলাম। কার্তিক দেখি অবাক খুব। ও অবশ্য গুরুত্ব দিল না খুব একটা। ভাড়া নিতে হবে এতগুলি লোকের থেকে। শুধু বলল, আমি তো এপারে, তুই ওপারে চায়ের দোকানে, তোর কী করলাম আমি?

কিন্তু পাঞ্চালীদি গেল কোথায়? একেবারে ভুল হয়ে গেল। কেন শুধু শুধু কার্তিককে—। দেখি, কয়েক পা এগিয়েই দাঁড়িয়ে পড়েছে পাঞ্চালীদি। অপেক্ষা করছে আমার জন্য। বাজারের ব্যগটা চায়ের দোকানে রেখে হাঁটা শুরু করতেই বাস ঢুকে পড়ল একটা। ওই মোটর ভ্যান আর পাবলিক আর ব্যাপারীদের হট্টগোলের মধ্যেই হেল্পারের চিৎকার, ‘জামতলা, জয়নগর—।’ যেন এক্ষুনি না উঠলেই…।

শ্যামল ধরল আমাকে। বলল, বাসরাস্তার দিকে যাচ্ছিস কোথায়, বাজার করবি বললি। বলল, চা খাবি চল। ও নাকি চা খেতে খেতেই ফোনে ধরবে ওর জামাইবাবুকে। গুরগাঁওয়ের। ওর নিজেরও নাকি আর সহ্য হচ্ছে না। সারাক্ষণ ভাড়া নিয়ে—। শ্যামল বকবক করেই যাচ্ছে। জয়নগরের বাস দাঁড়িয়ে তখনও। লোক ডাকছে। আর সেই নীল চুড়িদার-সাদা ওড়নার পাঞ্চালীদি জায়গা পেয়েছে একেবারে জানালার পাশেই। দেখতে পাচ্ছে আমাকে। তাকিয়েই আছে আমার দিকে। যেন জায়গা রেখেছে। কন্ডাকটার গা থাবড়াচ্ছে বাসের, চিৎকার জুড়েছে লাস্ট বাস, লাস্ট বাস…। কিছু বলল যেন পাঞ্চালীদি, যেন ‘কী হল, বাস ছেড়ে দেবে তো?’ যেন অনেক বলেকয়ে কন্ডাকটারকে অনেক বুঝিয়ে আমার জন্যই বাসটাকে দাঁড় করিয়ে রাখা। সেই কন্ডাকটর ছেলেও এবার অধৈর্য খুব, বাসের এপাশে এসে ভ্যানের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আমার দিকে তাকিয়ে গলা ঝঁঝিয়ে উঠল। টাইম নেই আর, লাস্ট বাস, লাস্ট বাস— বলেই ফের থাবড়াতে শুরু করল বাসটাকে।

শ্যামলকে বললাম, দেরি হয়ে যাচ্ছে, এসে শুনছি। বাসের দিকে হাত তুলে বললাম, দাঁড়াও একটু, এই—। বাসের ড্রাইভার লোকটি একবার তাকাল আমার দিকে, কিছু বলল নিজের মনে, তারপর স্পিড তুলল। কিন্তু জানালার পাশে সেই সাদা ওড়না–নীল চুড়িদার দেখলাম না তো! পাঞ্চালীদি কি উঠে দাঁড়াল? বাস থামাতে বলল কন্ডাকটারকে? নেমে পড়বে সামনে? ফিরে আসবে? যদি সামনের নকুলের মোড়ে নেমে উলটোদিক থেকে আসা বাসে—। শ্যামলের ওপর রাগ উঠল খুব, বললাম, তোর জন্য…

শ্যামল বলে উঠল, আমার জন্য মানে, তুই কি বাস ধরতিস নাকি? বাজার করবি না?

মায়ের কথামতো আলু বা লাউ-চিংড়ি কিনে ভ্যানের লাইনের দিকে যেতে রাস্তা পার হচ্ছি, হঠাৎ শুনি হর্ন পড়ছে খুব। বাসেরই। একেবারে জয়নগরের দিক থেকে আসা। তবে কি পাঞ্চালীদি? সামনের নকুলের মোড়ে নেমেই উলটোদিকের বাসে—। বাসটারও যেন তাড়া খুব, হর্ন মেরেই যাচ্ছে, যেন বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছানোর তর সইছে না, বাস থামতে না থামতেই কেউ যেন—।

শ্যামলের লাইন আসেনি তখনও। আরও একটি ভ্যান গেলে, তবে। দেখি ফোন করছে কাকে। হাতে বিড়ি। ইশারায় দাঁড়াতে বলল ওর পাশে গিয়ে। আগের ভ্যান প্যাসেঞ্জার নিয়ে রওয়ানা হতে যেন সময় হল ওর ফোন ছাড়ার। বলল, গুরগাঁওয়ের সেই জামাইবাবুর সঙ্গেই নাকি কথা হচ্ছিল ওর। বলল, চেনে তোকে। দারুণ নাকি চান্স এসেছে। মুর্শিদাবাদের কারা নাকি দেশে ফিরছে, সামনের সপ্তাহেই ঘর ফাঁকা হবে একটা। তার মানে টিকিট কাটতে হবে ট্রেনের, দেরি করা যাবে না আর।

ঘরে বাজার রেখে বাইরে বের হলাম ফের। রাত নামব নামব করছে। আমাদের বাড়ির লাগোয়াই রাস্তা। রাস্তার ওপারে ধানজমি। মেলার মাঠ। ধান কাটার টাইম হয়ে এসেছে। এরপর মেলা, ফাংশান, যাত্রা। অখিল দাসও নিশ্চয়ই মেলার মিটিং ডেকে দিয়েছে এতদিনে। মেলার মাঠ ছাড়িয়ে বাঁধ। বাঁধের ওপারে জঙ্গল। জঙ্গল, নদী, জঙ্গল।

পবিত্রের দোকানে চা নিলাম একটা। চা, বিড়ি। বিড়ি না ধরিয়েই হাঁটতে শুরু করি বাঁধবরাবর। জানি চাঁদ উঠবে কিছুক্ষণের মধ্যেই। পূবের বাদার মাথায় ঘুরতে-ফিরিতে থাকা মেঘের গায়ে এর মধ্যেই হলুদ লাগছে একটু-আধটু। বাঁধের গায়ে গায়ে জঙ্গল থাকায় আমাকে এখন আর কেউ দেখতে না পেলেও আমি কিন্তু অস্পষ্ট হলেও দেখতে পাব সবাইকেই। শুনতে পাব সবার কথা। আমাদের দ্বীপ-এলাকার সুবিধা এটাই। দু-তিনটে ধানমাঠ ছাড়িয়েও দূরের কোনও কথা একেবারে স্পষ্ট হয়েই তোমার কানে আসবে, যেন এই একেবারে পাশে বসেই কেউ, আর মাইকের আওয়াজও। দূরের অন্য কোনও দ্বীপ বা দ্বীপ ছাড়িয়ে অন্য আরও কোনও নদী ছাড়িয়ে কোনও ফাংশানের গানও বাতাসের ধাক্কায় হঠাৎ করেই তোমার গায়ের উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। হঠাৎ করেই কোনও ঝমঝম ধ্বনি। হঠাৎ করেই ‘মন চাহি যে ধরা দিতে-এ-এ-।’ তোমাকে না বুঝতে দিয়েই জেগে উঠল কোথায়—। বাকি কথাগুলি শোনার জন্য আর একটা ঝাপটের জন্য অপেক্ষা তো তোমাকে করতেই হবে। আকাশের গায়ে হলুদ হয়ে ছড়িয়ে থাকা দূরের কোনও মন্দির বা মেলার আলো। গ্রাম, নদী, জঙ্গল পেরিয়ে বাতাস—। কে গাইছে গো? কোথায়?

শ্যামলকে জানিয়ে দিই ফোনে, বলি, তোর জামাইবাবুকে বলে দিস, যাওয়া হবে না আমার, মনে করিস না কিছু।

জঙ্গল ছাড়িয়ে নদীর দিক থেকে আলো ঘুরছে একটা। হলুদ। ফরেস্টর বোট। অন্ধকারে খুঁজছে কাউকে। বা এমনি, নিয়মমাফিকই। হয়তো করার নেই কিছু। একেবারে উত্তরের দিক থেকে ভট্‌ভট্‌ ধ্বনি জেগে উঠছে একটা। বেশ তাড়াহুড়া করা। যেন এক্ষুনি জোয়ার শুরু হবে। আমাকে না উঠতে দেখে পাঞ্চালীদি সিট ছেড়ে উঠেছে নিশ্চিত। কন্ডাকটরকে নিশ্চিত বাস থামাতে বলেছে। হয়তো কন্ডাকটরের জন্যই, বা জামতলা গিয়েই ফেরার বাস, বা জয়নগর বা সোনারপুর গিয়ে কালই হয়তো—।

শ্যামল বলল, এই এত করে বললি, বাইরে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই কোনও, আমি আরও জামাইবাবুর সঙ্গে কথা বলে—। কী এমন হল?

বললাম, কিছু না, এমনি।

আমাকে অপেক্ষা করতে হবে। একদিন না একদিন পাঞ্চালীদি—, আমি ঠিক জানি।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4726 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...