পেত্রিন পাহাড় ও প্রাগ

নিরুপম চক্রবর্তী

 

পেত্রিন পাহাড় থেকে সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসে জনা ছয় বিপন্ন মানব। অবিকল এক তারা: বিধ্বস্ত ও অঙ্গচ্যুত— যে যত পিছনে আছে তার অঙ্গে ততোধিক গ্লানি আর বিকৃতির অমোঘ স্বাক্ষর। ছ’জন বিপন্ন লোক নেমে আসে চেকিয়ার ইতিহাস বেয়ে।

ফানিকুলারেতে করে পেত্রিন পাহাড় বেয়ে ওঠে নামে ট্যুরিস্টের ঝাঁক। দিন শেষ। টাওয়ারেতে জ্বলে ওঠে আলো। তার নিচে আধো অন্ধকার। ছদ্মবেশে ঘুরে ফিরে তমিস্রায় কারা যেন চুপিসারে বাংলাভাষা বলে!

তারপর দিন কোনও গোপন চক্রান্তে প্রাগে পেত্রিন পাহাড়চূড়া থেকে বাংলাভাষা উচ্চারিত হলে, গবাক্ষে এসেছে ভেসে একদল কৌতূহলী মেঘ। রিলিফ ম্যাপের মতো টাওয়ারের পদপ্রান্তে পাহাড়ের নিচে শুয়ে আছে শহরের আদুরে শরীর। রোদ হাসে দিগন্তের কোলে। এঁকেবেঁকে বয়ে যায় মসৃণ ভাল্তভা নদী। সেদিকেই ভেসে গেল অবশেষে মেঘগুলি: মায়াবী টালির চালে বৃষ্টির ফোঁটার সঙ্গে ঝরে পড়ে বাংলা বর্ণমালা। সোহাগী শহর আজ বঙ্গীয় সবুজে সেজে ওঠে। আর বৃষ্টির ধারার মতো অবিরত বেজে যায় রবীন্দ্রসঙ্গীত বুঝি রাজেশ্বরী দত্তের গলায়:

‘আজি   তোমায় আবার চাই শুনাবারে
যে কথা শুনায়েছি বারে বারে॥’

পেত্রিন পাহাড় শেষে সিঁড়ি দিয়ে নেমে এসে ছ’জন বিপন্ন চেক কান পেতে বাংলাভাষা শোনে।

এসব জাদুর দিন, এসব আশ্চর্য দিন, কখনও কখনও ফিরে আসে
কখনও কখনও জাগে, মধ্য ইউরোপে প্রাগে নস্টাল্‌জিক দিবাস্বপ্নরাজি
এ শহরে বিবিক্ত প্রবাসে।

 

প্রাগ শহরের মিলেনা ইয়েসনেস্কা

হে পাঠক! নতুন শহর কিংবা নোভে মেস্তো অঞ্চলেতে প্রাগে, সুরম্য শহরে এক আলিশান অট্টালিকা আছে। তাহাতে করিত বাস মিলেনা ইয়েসনেস্কা নামী এক প্রাণবন্ত উচ্ছল কিশোরী। কাব্যকর্মে রত হয়ে তাহার আখ্যান আমি ভনি।

এ মুহূর্তে মুস্টেক অঞ্চলে প্রাগে মিলেনা হাঁটিছে আনমনে। তথাপি সে সচেতন পিছুপিছু হেঁটে আসে কোনও এক গোয়েন্দাপ্রবর। গেস্তাপোর লোক বুঝি? নাকি ওই কৈশোরের ভয়াবহ উন্মাদ আশ্রমে বাস কালে, কভু বা দুঃস্বপ্নে দ্যাখা দানবীয় কোনও মুখ পিছুটানে আজও ফিরে আসে? মিলেনা জানে না তাহা, আনমনে শুধু হেঁটে যায়, ২০২৩ সালে কাফকা নগরে। চতুর্দিকে কাফকা স্তুতি: বাণিজ্য ও প্রগলভ ট্যুরিস্ট। ইহুদি অঞ্চলে তার ফাঁপা মূর্তি, কাফকার জাদুঘর এবং তাহার নামে নামাঙ্কিত নমেস্তি বা প্লাজ়া, কাফকা মূর্তি ক্রমাগতে ভাঙে আর গড়ে, অতীব সমীপে ওই কোয়াড্রিও মলের সকাশে দাভিদ চার্নির করা কাইনেটিক আর্টে।

শীতঘুম থেকে উঠে এসকল ঘুরে দ্যাখে যুবতী মিলেনা। এ শহরে কেহ কি রেখেছে মনে তাকে? কেহ কি এখনও খোঁজ রাখে সেইসব আশ্চর্য চিঠির, যাহা ফ্রান্জ় কাফকা লিখে গেছে তাকে, অবিরত উন্মাদের মতো? কেহ কি এখনও পড়ে কাফকার গল্পগুচ্ছ তার করা চেক অনুবাদে? ম্যাক্স ব্রড একা নয়, সেও তো সবার আগে জহুরির চোখ দিয়ে চিনেছিল সেই রত্নখনি।

সমস্ত শহর জুড়ে দুর্নিবার পুঁজির প্লাবন। কাফকা বুঝি পণ্যমাত্র। সেইখানে হেঁটে যায় মিলেনা নাম্নী নারী: কম্যুনিস্ট, পার্টিসান, বন্দিনী গেস্টাপোর হাতে। কে তারে রাখিবে মনে? ১৯৪৪ সালে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে ইনমেট ৪৭১৪ চিরতরে লুপ্ত হয়ে গেছে!

কোথাও ফলক নেই, তবু তার বাসস্থান কীভাবে যে খুঁজে পেল গোয়েন্দাপ্রবর! সে লোকটা এতক্ষণে মিলেনার মুখোমুখি চলে আসে। না সে কাফকা নয়, বাদামী রঙের ত্বক, অবিন্যস্ত শ্বেতশুভ্র ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি, রোদচশমা ভেদ করে দৃষ্টিতে মুগ্ধতা ঝরে পড়ে। ‘আমি তো রেখেছি মনে, আমি কভু ভুলি নাই, আইস আমার সঙ্গে, দেশান্তরে, কালান্তরে যাব।’

১৯৭১ সাল। কলিকাতা শহরেতে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে মিলেনা দাঁড়ায়ে আছে। অগ্নিগর্ভ সত্তরের দিনগুলি পার হয়ে, দগ্ধ কিশোর এক তার দিকে হেঁটে আসে, হাতে তার পত্রগুচ্ছ: কাফকার লেটার্স টু মিলেনা!

প্রেম নিভে গেলে তার স্মৃতিচিহ্ন জ্বলে ওঠে অনেক নিবিড়ে
মিলেনা সস্নেহে চেয়ে থাকে।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4721 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

2 Comments

  1. গ্লোবাল প্রেক্ষাপটে কিছু লোকাল আবেগ ও ভালোবাসা । উত্তাল সত্তর দশকের কলকাতার অবাক কিশোরটির সঙ্গে কাফকা ও মিলেনা মিশে যায়। লঘু তুলনায় বলা চলে ফিউশন খাবারের মত স্বাদু ও ইনোভেটিভ!

  2. এই সিরিজের কবিতাগুলি আগেও মুগ্ধ হয়েছি, এবারও মুগ্ধ হলাম। দুটিই দারুণ সুন্দর। এইভাবে ইতিহাস আর ভুগোলের অক্ষরে কবিতার সৌধমালা নির্মাণ, মনে হয় একমাত্র এই কবির হাতেই সম্ভব।

আপনার মতামত...