‘একটি মোমবাতি জ্বলে আছে কবিতায়’

বর্ণালী কোলে

 

নির্লিপ্তি বর্তমান সমাজের বৈশিষ্ট্য। নির্বিকারত্বই চালিকাশক্তি। সাধারণ মানুষ থেকে সূক্ষ্ম অনুভূতির মানুষ— প্রত্যেকেই এই রোগের শিকার। ব্যার্গম্যানের ‘পার্সোনা’ ছবিতে একটি চরিত্র চুপ হয়ে যায়। অথচ জীবনের কাকলি তো কম নয়। অগণন হৃদয়। একবিংশ শতাব্দীর প্রেক্ষাপটে কোনও শিল্পীর ‘বিপন্ন বিস্ময়ে’ মূক হয়ে যাওয়া খুব স্বাভাবিক। অথচ এইসব যুগলক্ষ্মণ থেকে সমান্তরালে একটি প্রস্ফুটিত উদ্যানের মতো চেয়ে রয় হিন্দোল ভট্টাচার্যের শ্রেষ্ঠ কবিতা। ২০০২ সাল থেকে ২০২২ পর্যন্ত দীর্ঘ একুশ বছর ধরে প্রকাশিত চোদ্দটি কাব্যগ্রন্থের ধারাবাহিক যাত্রাপথ এই গ্রন্থ। কবিতাগুলির রচনাকাল ১৯৯৫ থেকে ২০২২।

২০০২-এ প্রকাশিত ‘তুমি অরক্ষিত’ কাব্যগ্রন্থের ‘শিকার’ কবিতায় কবি লিখেছেন, ‘আয়ু, ইশারার মতো, আসে, চলে যায়।’ ফোনবুক ঘিরে বন্ধুনাম। তবুও বিষাদ-আক্রান্ত মানব। ‘আবার হেমন্তকাল’ কাব্যগ্রন্থের ‘হিংসার আগের দিনগুলি’ কবিতা জানায়, ‘বাতাসে প্যাডেল ঘুরছে…/নিঃসঙ্গতার’। ‘তারামনির হার’ কাব্যগ্রন্থ ছোট ছোট কবিতার সমাহার। নির্জন দর্শন ছুঁয়ে থাকার লিপি। এই অবাক-করা কথা এখানেই বলা হয়েছে, ‘ফুচকাওয়ালার কাজ ভাল। এক-একটি কিশোরী আসে তার কাছে,/দিগন্ত যেমন…’

‘উপনিবেশের ভাষা এই রাজবাড়ির দেওয়ালে’— এইভাবেই শুরু হয় চতুর্দশপদী ‘জগৎগৌরী কাব্য’। দিগনগর, বিন্দোন, লাওদা, সিঙারকোন গ্রামের মন্দির চিত্রের প্রতিচ্ছবি এই কাব্য। স্মৃতিমেদুর জলহাওয়ায় এই কাব্যের পথ চলা। কখনও রাধাগোবিন্দ জিউ ধামে উনবিংশ শতাব্দীতে, কখনও অষ্টাদশ শতাব্দীর বাবুর বিলাসগৃহে, কখনও ‘জগৎগৌরীর কোলে প্রথম জাতক’। বিভিন্ন শতাব্দীর কোলাজ। লেখকের সঙ্গে সঙ্গে ভ্রমণ হয় পাঠকের। বহু তীর্থের পুণ্যসলিল প্রবাহিত এই কাব্যে।

২০১২ সালে প্রকাশিত ‘মেডুসার চোখ’। ‘জাতক’ কবিতাটি এই কাব্যগ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত। জাতকের প্রচলিত কাহিনির থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। তবুও এ এক জন্মেরই গল্প। গৌতম বুদ্ধের মুখের কথা ভাবলে স্নায়ু, চোখ শান্ত হয়ে আসে, গৌতম বুদ্ধের মুখের কথা ভাবলে ভেসে ওঠে কাহিনি, এই কবিতা বলে, ‘ঘুমন্ত মুখের দৃশ্য বুদ্ধের হাসির মতো শান্ত ও সহজ’।

ঘুমন্ত মুখের দৃশ্য, মনে করায় রাঁবোর কবিতা, ‘আ্যস্লিপ ইন দ্য ভ্যালি’। মৃত সৈনিক। মনে হচ্ছে ঘুমাচ্ছে। ঠোঁটের কোণে তখনও শিশুর মতো হাসিস্পর্শ। এই কবিতা ইঙ্গিত দেয়, সেই দৃশ্যও জাতক।

‘মিথ ও ঈশ্বর’ কাব্যগ্রন্থ সঙ্গীত। ‘ভক্তি পদাবলী’ নামাঙ্কিত কবিতাগুচ্ছ এখানেই আছে। কবি লিখছেন, ‘যন্ত্রণার অনুবাদ হয়? বলো? চোখ নোনা হয়’ যন্ত্রণার সঙ্গে অনুবাদ শব্দটি জুড়ে গিয়ে অভিনবত্ব এসেছে। দৃশ্যের জন্ম হয়। দেখা যায়, আবছা বিকেল। সামনে টাইপরাইটার। খটখট শব্দ। অনূদিত হচ্ছে যন্ত্রণা। তার চোখে জল গড়িয়ে পড়ছে। নোনা।

‘বারবার তোমাকে ফোন করবে কেন পোস্টঅফিসগুলি?’ লিখেছেন হিন্দোল ভট্টাচার্য ২০১৫ সালে প্রকাশিত ‘তালপাতার পুঁথি’ কাব্যগ্রন্থে। পোস্টঅফিসগুলি কীভাবে তাকে বারবার ফোন করে? ‘হেমন্তের অরণ্যের পোস্টম্যান’ বেরিয়ে পড়েন পথে পথে? বিকেল রাস্তা হলুদ পাতায় ঢাকা। দলে দলে চলেছেন পিয়ন। তাকে বিকেলের ডাকে পৌঁছে দেবে রঙিন খাম। এইভাবেই হয়তো তাকে ফোন করে পোস্টঅফিসগুলি। অভিমানী প্রেমিকের সামনে নদী। তার কাছেই এই নিরুপায় স্বগতোক্তি।

২০১৭ সালে প্রকাশিত ‘তৃতীয় নয়নে জাগো’ কাব্যগ্রন্থের ‘সূর্যমন্দির’ কবিতার শেষে আছে, ‘নশ্বর জীবন/ধ্বনি আর প্রতিধ্বনি হয়ে থাকে পাথরে পাথরে’। সূর্যমন্দির দেখার অভিজ্ঞতা অনেকেরই আছে। কবির মতো হয়তো অনেকেই তাকে প্রথম ছুঁয়ে দেখেছেন আদিম হাওয়ায়। কবির মতো কেউ দেখেছেন, পাথরে খোদিত শ্রম? এই সাধনা দেখতে দেখতে অলৌকিক আবছায়া সৃষ্টি হয়। সরে যায় চারপাশের জগৎ। অতীন্দ্রিয় শক্তি ভর করে। সম্মোহিত দর্শক ছুঁয়ে দেন নিপুণ শ্রম। জেগে ওঠেন শ্রমিক। সদ্য মে দিবস পার হয়েছে। অগণিত শ্রমিকের দলে সেইসব শিল্পীও। কবি লেখেন, ‘ধ্বংসস্তুপের মধ্যে হাওয়া ঘোরে, হাওয়া জন্ম নেয়’।

‘লুকিয়ে রেখেছ কেন/মুখ ও মুখোশ পাশাপাশি?’ ‘যে গান রাতের’ কাব্যগ্রন্থে ‘হাসি’ কবিতায় এই প্রশ্ন রাখা হয়েছে। এই কবিতায় আরও একটি জিজ্ঞাসা আছে, ‘প্রসাধন কতটুকু সত্যি কথা বলে?’ এই উচ্চারণ মেকি সমাজের গতিময়তাকে এক মুহূর্তের জন্যও থমকে দেয়। আত্মানুসন্ধান বিলুপ্ত। ‘সত্য’ এই শব্দ মরীচিকা এখন। সত্য কেউ জানতেও চায় না। সত্য কেউ হতেও চায় না। ‘এই বেশ ভাল আছি’ গোছের মনোভাব নিয়ে দিব্যি আছে সকলে। মুখ নেই। মুখোশ-ই সব। মুখের বিপন্নতা জানে কবিতা, মনোবিদ। ফেসবুক মুখ না মুখোশ? এই কবিতার মধ্যভাগে লিখিত, ‘বিষাদ আসলে/হাসির আড়ালে আরও নিয়তির হাসি।’

২০২০ সালে প্রকাশিত ‘এসো ছুঁয়ে থাকি’ কাব্যগ্রন্থের একটি কবিতা ‘রাস্তায় কিছুক্ষণ’। এই জীবন কার যে কখন থেমে যাবে কেউ জানে? বেঁচে থাকা রাস্তায় কিছুক্ষণ। কবিতাটি শুরু হয় এইভাবে, ‘এত তাড়াতাড়ি ক্লান্ত হলে চলে? বন্ধু, পা চালাও।’ কবিতাটি যেন আকাশপথে সাঁতার কাটা কোনও মানবের ধারাবিবরণী। কৃষ্ণ যেমন অর্জুনকে বিশ্বরূপ দর্শন করিয়েছিলেন, তেমনভাবে কবিতাটি দেখিয়ে দেয় বহুমুখী জীবন। শ্বাসকষ্টের পাহাড়, অঘোর সন্ন্যাসী, ছাইভস্ম করোটি, মৃতের মাংসের গন্ধ— পার হয়ে জীবন চলেছে। এই কবিতায় ঘুমকে বলা হয়েছে লুনাটিক। অসহ্য যন্ত্রণায়, অসহনীয় ক্লান্তির পর শোক, উচ্ছ্বাসকে পরাজিত করে আসে ‘লুনাটিক ঘুম’। হয়ত অনেকেরই এই অভিজ্ঞতা আছে। কবিতাটি এক নিঃশ্বাসে উচ্চারিত কোনও গাথা। সঙ্গীতের সরগম। সা থেকে সা-এ পৌঁছে আবার ফিরে আসা। শান্ত বৃষ্টি, চোখ ভরে আসে স্নিগ্ধতায়, দূরে শস্যক্ষেত। লিখিত হয় সত্য, ‘জীবন অনেক বড় বন্ধু, মৃত্যুর চেয়েও তাকে সহ্য করো..’

‘আত্মানাং বিদ্ধি’ গ্রন্থিত হয়েছে ‘অনিবার্য কারণবশত’ কাব্যগ্রন্থে। কবিতাটি বহুস্তর-অর্থবিশিষ্ট। ‘সেই তো রঙিন, যার রঙের ভিতর কোনও রাজনীতি নেই।’ রাজনীতি না করেও তো নানা রঙের মানুষ দেখা যায়। একটি কথিত গল্প, ‘পশুদের দূর থেকে চেনা যায়। তাদের স্বভাবধর্ম অনুযায়ী সতর্ক হওয়া যায়। কিন্তু সব মানুষের অবয়ব এক। মিশতে মিশতে চেনা যায় কার কী রং। সতর্ক হওয়ার আগেই খুবলে নেই কৌশল। পণ্ডিতরা বলেছেন, ‘নিজেকে জানো, নিজেকে জানো’। বহুশ্রুত রবীন্দ্রসঙ্গীত, ‘আমার এ ঘর বহু যতন করে ধুতে হবে মুছতে হবে’— আত্মার পরিচর্যা। ‘আত্মানাং বিদ্ধি’ কবিতার সূচনায় অন্যভাবে আসে সেই ঘর, ‘আয়নার ভিতর এক তালাবদ্ধ ঘর।’ প্রতিবিম্বই সব নয়। প্রতিবিম্বের ভিতর বন্ধ হৃদয়। যদিও ঘরের চাবি পরের হাতে, তবুও চাবি ফিরে পাওয়ার খোঁজ চলতেই থাকে ভিতরে ভিতরে।

২০২২ প্রকাশিত তিনটি কাব্যগ্রন্থ থেকে সঙ্কলিত হয়েছে কবিতা। যেন তিনটি নদী, গতিপথ আলাদা। ‘উত্তরপুরুষ, তুমি’-র নেমেসিস কবিতায় বলা হয়, ‘কোথাও না কোথাও মানুষ নিজের পাপের কাছে মাথা নীচু করে আছে/তারও ছায়া পড়ছে জলে… ক্ষমা চাইছে স্বয়ং শয়তান।’ এমন একদিন আসুক। পৃথিবীর সব আদালত ব্যর্থ হয়ে যাক। হাঁটু মুড়ে সক্রেটিস নন, ক্ষমা চাইবেন শয়তান। পাপবোধে শুরু হোক জন্ম। ‘মাক্স ব্রড’ কবিতা গ্রন্থিত হয়েছে ‘একটি গোপন বাঘ’ কাব্যগ্রন্থে। জাদুবাস্তবতা। যেন প্ল্যানচেট। মুখোমুখি মাক্স ব্রড ও কাফকা। বাইরে শ্রাবণ। ভিতরে শ্রাবণ। কাফকা বলছেন, ‘আলোই অন্ধকার, অন্ধকার আলো।’

২০২৩ কলকাতা বইমেলায় দেজ পাবলিশিং থেকে প্রকাশিত হল হিন্দোল ভট্টাচার্যের শ্রেষ্ঠ কবিতা। ‘যে পথ বাউল’ কাব্যগ্রন্থের শেষ কবিতা ‘বিন্দু’। লেখা হয়েছে, ‘একটি মোমবাতি জ্বলে আছে কবিতায়…’। মোমবাতি জ্বলে থাক। শিখায় তার আশাবাদ। শ্রেষ্ঠ কবিতার ভূমিকায় লেখা কবির কথা অনুসারে বলা যায়, এই কাব্যগ্রন্থের বারবার জন্মান্তর ঘটুক পাঠক হৃদয়ে। এই গ্রন্থে হিন্দোল ভট্টাচার্য ত্রিকালদর্শীর মতো দেখে গেছেন এই জল, এই বাতাস, এই মাটি, এই গান, এই বিষাদ। এই গ্রন্থ মৃত্যুকে অতিক্রম করে জীবনেরই জয়গান।

শ্রেষ্ঠ কবিতা
হিন্দোল ভট্টাচার্য
দে’জ পাবলিশিং। ৩৫০ টাকা

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4710 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...