আমার অনুবাদ (না) শেখানো

অরুণাভ সিংহ

 


ভালবাসাই একজন অনুবাদককে তাঁর কাজে প্রবৃত্ত করতে পারে। ফলে, অনুবাদের প্রথম পাঠ হল— ভালবাসা। কেমন করে একটা বই, একটি সাহিত্য, একজন লেখক, একটি ভাষার ওপর ভালবাসা জন্মায়, যাতে একজন সেই বইটি অনুবাদ করার একটা তাড়না অনুভব করেন। আর বাদবাকিটার জন্য তো অনেক তরজমা-সূত্র রয়েইছে

 

কাউকে কি ভালবাসতে শেখানো যায়? পাঠক, দয়া করে এই ভালবাসা-কে লাভমেকিং-এর সঙ্গে গুলিয়ে ফেলবেন না। কারণ, শেষ বিচারে, লাভমেকিং জিনিসটা আসলে একটি প্রকৌশল-বিশেষ। অন্যদিকে, ভালবাসা বিষয়টা একটা শূন্যস্থানে ঝাঁপ দেওয়ার মতো— যেখানে আশা ও আশঙ্কা প্রায় সমান-সমান— যেখানে মনে হতে থাকে মানুষ যেন নিজের পছন্দের চৌহদ্দির বাইরে বেরিয়ে এসেছে। আর এইরকম ভালবাসাই একজন অনুবাদককে তাঁর কাজে প্রবৃত্ত করতে পারে। ফলে, অনুবাদের প্রথম পাঠ হল— ভালবাসা। কেমন করে একটা বই, একটি সাহিত্য, একজন লেখক, একটি ভাষার ওপর ভালবাসা জন্মায়, যাতে একজন সেই বইটি অনুবাদ করার একটা তাড়না অনুভব করেন। আর বাদবাকিটার জন্য? আছে— অনেক তর্জমা-সূত্র আছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি আমার ট্রান্সলেশন ওয়ার্কশপের ক্লাসে যাই তাই একজন মদনদেবের কৃপাদৃষ্টি সঙ্গে নিয়ে। আমার প্রতিটি ছাত্রছাত্রীকে এই মদনদেবের তত্ত্বাবধানে রাখতে হবে, যাতে তারা অন্তত একটি বইয়ের প্রেমে পড়ে। অন্তত একটি বই— যে বইটিকে তারা যতক্ষণ না অনুবাদ করে উঠতে পারছে ততক্ষণ শান্তিতে ঘুমাতে পারবে না। এইভাবে কি ওরা ভালবাসা শিখতে পারবে? কোনও পাঠ সম্পর্কে তাদের মধ্যে এই প্রেমবোধ জাগ্রত করার জন্য কোন শর আমাকে নিক্ষেপ করতে হবে, কেমন আবহ আমাকে নির্মাণ করতে হবে, প্রেমের কোন সঙ্গীত আমাকে পরিবেশন করতে হবে?

আমার সামান্য একটু ধারণা আছে। আমাকে প্রথমেই নিশ্চিত করতে হবে যেন এই ছাত্রছাত্রীরা নিবিড় পাঠক হয়। তারা যেন তাদের ‘মন’ দিয়ে পড়ে। এই বাংলা ‘মন’ শব্দটি কিন্তু ইংরেজি ‘মাইন্ড’-এর প্রতিশব্দ নয়। বরং বলা যায় ‘মন’ হল ইংরেজি মাইন্ড, দেহ, হৃদয় এবং আত্মার একটি ইন্টারসেকশন সেট। ছাত্রছাত্রীরা যেন সেই ‘মন’ দিয়ে পড়ে, তাদের প্রতিটি জ্ঞানেন্দ্রিয়কে, প্রতিটি স্নায়ুতন্তুকে, তাদের সত্তার প্রতিটি অংশকে এই পাঠকার্যে সামিল করতে পারে। তখনই, কেবলমাত্র তখনই, তারা সেই পাঠের এতটাই প্রেমে পড়বে যে তখন অনুবাদ-টা একটা প্রয়োজনীয়তা হয়ে দাঁড়াবে।

 

“তাহলে, প্রফেসর, আমরা কেমন করে অনুবাদ শুরু করব? আমরা কি লেখকদের সম্পর্কে আগে প্রচুর পড়ে নেব? তাঁদের সব বইগুলি প্রথমে পড়ে নিতে হবে? সমালোচনামূলক নিবন্ধগুলিও?” এস যথারীতি প্রশ্নে পরিপূর্ণ। বাকিরাও খুশি। তাদের মনেও এই প্রশ্নগুলিই ঘুরপাক খাচ্ছে।

আমি উত্তর দিই না। বরং ছাত্রছাত্রীদের রেওয়াজ শুরু করাই। তাদের একটি হ্যারি পটারের উপন্যাসের ইংরেজি থেকে নিজেদের মাতৃভাষায় তর্জমা করতে বলি। উত্তেজনাটা অনুভব করা যায় বেশ। তারপর আমরা প্রত্যেকের তর্জমা প্রত্যেকের সঙ্গে তুলনা করে দেখি, এবং শেষে তুলনা করি মূল পাঠটির সঙ্গে। আমরা যেটা শিখলাম, অবশ্যম্ভাবীভাবেই, ইংরেজি থেকে ভারতীয় ভাষায় অনুবাদ করেছে যে অনুবাদকরা তারা এমন কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছে যা ব্যাখ্যাতীত। একটা জীবন্ত আলোচনা শুরু হল, শিক্ষালাভও হতে শুরু করল ধীরে ধীরে।

এই রেওয়াজ আমরা আরও অনেকগুলি ক্লাসে চালাব। আমরা গদ্য, পদ্য, সংলাপ এবং আরও অন্যান্য ফর্ম নিয়ে কাজ করব। আমরা কোনও সুস্পষ্ট পুরুষালি পাঠের নারীবাদী অনুবাদের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করব— এবং তা চেষ্টা করেও দেখব। এই অনুবাদগুলি খুবই কল্পনাশ্রয়ী হবে— ছাত্রছাত্রীদের মনে অপার সম্ভাবনার দিগন্ত খুলে দেবে।

আর তারপরে আমরা সিদ্ধান্ত নেব যে এখন সময় এসেছে শুধু শব্দটাকেই অনুবাদ করার— অর্থ জানার দরকার নেই। আমরা তখন পাখির গান অনুবাদ করব। হ্যাঁ, অনুবাদ— শব্দগুলোকে সংলাপে রূপ দেব। পি একটু বিমর্ষ হয়ে মাথা নাড়ে। ফিসফিস করে, ‘অনুবাদ এত ম্যাজিক্যাল… আমার মনে হচ্ছে না আমি একে সামলাতে পারব।’

 

ক্লাস আবার শুরু হওয়ার আগে তিনটি হাত সিলিঙের দিকে উত্তোলিত হয়ে রইল।

—আরও এগোনোর আগে আমাদের একটা বিষয় নিয়ে একটু কথা বলতে হবে। পাঠের কোনও কিছু যদি আমরা বুঝতে না পারি, তখন কী হবে?
—বা, কোনও শব্দের যদি একাধিক অর্থ থাকে? তখন কি আমরা অনুবাদ করার সময়ে যে-কোনও একটি বেছে নেব?
—আমরা কি এটা বের করার চেষ্টা করব যে লেখক কী অর্থ করতে চেয়েছেন, নাকি আমাদের যে-অর্থ মনে হচ্ছে সেটাকেই ধরব?

 

কে-র একটা সমস্যা হয়েছে। ‘আমি যে গল্পটা অনুবাদ করছি, সেটাকে আমি ভালবাসি। সেটাকে আমি এতটাই ভালবাসি যে আমি নিশ্চিত আমি সেটা খুব ভাল করে অনুবাদ করতে পারব না।’ কে যদি ঘরে একবার নজর বুলিয়ে নিত, দেখতে পেত বাকি সবাই এই একই সম্ভাবনার কথা ভেবে বিমূঢ় হয়ে পড়েছে (এমনকি আমিও— এই এত বছর পরেও— যখনই কোনও নতুন বই আমি পড়া শুরু করি। বইটা কিন্তু তখনও আমি শেষ পর্যন্ত পড়েই উঠিনি)।

সুতরাং, অনুবাদ করতে শেখানোটা হল অনুবাদককে তার সঙ্কল্প এবং আশার ভাণ্ডারের কাছে পৌঁছতে শেখানো। তাদের বেশি দূরের কথা ভেবে মুষড়ে না-পড়তে শেখানো। ওরকম বেশি দূরের কথা ভাবার চাইতে ভাল হচ্ছে অনুবাদ আদৌ না-করা। কেমন করে আমি শেখাই এ-সব? আমি তাদের কেবল বড় বড় অনুবাদকদের গল্প বলি। বলি, তাঁরা কিন্তু কোনও স্বর্গীয় প্রতিভা দ্বারা তাড়িত হননি। তাঁদের তাড়না ছিল এক নেশাগ্রস্তের তাড়না। যে তাড়না তাঁদের ভালবাসতে, পড়তে এবং অনুবাদ করতে প্রবৃত্ত করেছিল।

আর এইখানেই আমি এসে দাঁড়াই সবচেয়ে অমোঘ বিষয়টির সামনে। বিষয়টি এতটাই অমোঘ, যে সেটা প্রায় সাধারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে— সত্য। একটি টেক্সট অনুবাদ করার অর্থ পৃথিবীর অন্য যে-কারও চাইতে সেটাকে নিবিড়ভাবে পড়া। সম্ভবত, স্বয়ং লেখকের চাইতেও। লেখক একটি বাক্য লেখেন, চলে যান। আর অনুবাদককে বারংবার প্রতিটি বাক্য, প্রতিটি বাক্যাংশ, প্রতিটি ছন্দের কাছে ফিরে ফিরে আসতে হয়।

আমার ছাত্ররা এই স্তরে এখনও এসব জানে না। কিন্তু আগামী অনেকগুলি ক্লাসেই আমরা তাঁদের অনুবাদগুলি পড়ব। পড়ব একটি এবং একটিমাত্রই লক্ষ্য নিয়ে। মূল রচনাটি পড়ে আমার ছাত্রছাত্রীদের হৃদয় যেভাবে উদ্বেল হয়েছিল, অনুবাদটি পড়েও কি তাদের সেই একই অনুভূতি হচ্ছে? এই একটিমাত্র প্রশ্নের উত্তরের উপরেই অনুবাদটির বিশ্বস্ততা চূড়ান্তভাবে পরীক্ষিত হবে।

 

ওয়াই একদিন সকালে ছুটতে ছুটতে আমার অফিসে এল। সে তখন উত্তেজনায়, একই সঙ্গে সংশয়ে, কাঁপছে। সে জানত না যে, তাকে তখন যা অস্থির করে তুলেছে সেটি কার্যত অনুবাদ-শিক্ষার একটি প্রধান বিষয়। ‘প্রফেসর’— সে হামলে পড়ল প্রায়— ‘এটা কি সম্ভব যে, অনুবাদকরা যে বইগুলি অনুবাদের জন্য বেছে নেন, সেগুলি সবসময়ে যে ভাল বই হবে তার কোনও মানে নেই? তাঁরা হয়তো সেগুলি বেছেছেন কারণ কোনও নির্দিষ্ট সংজ্ঞায় সেগুলি লাগসই? যে-সব তামিল বইগুলি অনূদিত হয়েছে, তামিল সাহিত্যকে কোনও-না-কোনওভাবে প্রতিনিধিত্ব করার জন্য সেগুলিই কি একদম উপযুক্ত?’

প্রশ্নটি অবশ্যই ‘কেমন করে অনুবাদ করতে হয়’, এই প্রশ্নের চাইতেও ‘কেমন করে অনুবাদক হতে হয়’ প্রশ্নের সঙ্গে বেশি সংযুক্ত। ধরেই নেওয়া যায়, একজন অনুবাদক একাধিক বই অনুবাদ করবেন। ফলে তাঁদের এই অনুবাদ-সফরে যেসব জিনিসগুলি শিখতে হয় তার মধ্যে এটি একটি প্রধান জিনিস— কোন বইটি অনুবাদ করার জন্য বেছে নেব। কিন্তু এখানে তো বিষয়টি তা নয়। এখানে অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে শেখার সম্ভাবনাটা নেই। প্রশ্নটা এসেছে মননশীল একজন ছাত্রীর কাছ থেকে। তাকে তো এক্ষুণি এর একটা জবাব দিতে হবে। সেটা এড়িয়ে যাওয়া যাবে না।

বস্তুত, আমার অনুবাদ শেখানোর ক্লাসগুলিতে এটাই প্রথম প্রশ্ন হিসেবে বেশিরভাগ সময়ে আমার সামনে হাজির হয়েছে— “কেমন করে আমি জানব কী অনুবাদ করতে হবে?” আমার মাথায় একটা উদ্ভট জিনিস ঘোরে। ভাল করেই জানি এটা অবাস্তব, তবুও। এমন যদি হত, যে আমি এমন একটি গ্রুপকে অনুবাদ শেখাচ্ছি যারা ইতিমধ্যেই তাদের মাতৃভাষার যাবতীয় সাহিত্যে অবগাহন করে বসে আছে, বা অন্তত সেই ভাষায় যা-সব বইপত্র আছে সে-সম্পর্কে তারা সম্যক অবহিত! কিন্তু বাস্তবে আমাদের কাছে আসে একদল ছেলেমেয়ে যারা সৃজনশীল, বিশ্লেষণাত্মক এবং অনুবাদ করতে ক্ষুধার্ত… কিন্তু কী অনুবাদ করতে? সেটা তাদের জানা নেই।

অতএব, অনুশীলনের দ্বিতীয় পাঠ। বা হয়তো প্রথম, এমনকি শূন্য-তম। আর খুব অবিশ্বাস্যভাবে আমি লক্ষ করি, বিষয়টা একটা জনপ্রিয় মনোবিশ্লেষণের বিষয় হয়ে দাঁড়াচ্ছে। প্রতিটি ছাত্রছাত্রীই তাদের পাঠ করা ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে যে টেক্সটটি তারা অনুবাদের জন্য বেছে নেবে তার একটা মিলন খুঁজছে। আমি তো এটা নিশ্চিতভাবেই আশা করতে পারি না যে তারা সপ্তাহে এক ডজন বই পড়বে আর একটা বেছে নেবে। ফলে, আমি গোলপোস্টটা একটু সরিয়ে দিই। আমি তাদের বলি, গল্প বা চরিত্রদের দিকে মন না দিয়ে ভাষার ভিত্তিতে টেক্সট বেছে নিতে।

এখানে আমার অনুবাদক-বন্ধু ভিআর-এর কথা মনে পড়ে। ভিআর শপথ করে বলে যে সে যে-সব বই অনুবাদ করেছে সেগুলির সাহিত্যিক মূল্য বা ঐতিহ্য সম্পর্কে সে বিন্দুমাত্র অবগত নয়— তার একমাত্র প্রবেশদ্বার হল ভাষা। আমি তার কৌশলটাই হাতাই, এবং আমার ছাত্রছাত্রীদের বলি এক সপ্তাহ ধরে তারা যেন তাদের পছন্দমতো উৎস-ভাষার যতজন সম্ভব লেখকের বই থেকে একটি করে অংশ অন্তত পড়ে ফেলে। তাদের সমবেত হাহাকারের মধ্যেই আমি বলে দিই, যে এই সাতদিনে তারা অন্তত ২৫টি বইয়ের একটি করে অংশ পড়ে ফেলতে পারবে, আর এই ২৫টি বই হতে হবে ২৫ জন বিভিন্ন লেখকের।

এক সপ্তাহ পরে তারা ফিরে এল। তারা এই ক্র্যাশ কোর্সটা করে এসেছে বলে, বা তারা সৌভাগ্যবান বলে— প্রত্যেকেই অনুবাদ করার জন্য একটি করে টেক্সট বেছে নিয়েছে। তারা সেটার কিছুটা পড়েও ফেলেছে, কেউ-কেউ তো পুরোটাই পড়ে ফেলেছে। এবং এখন তারা সেই প্রশ্নটা করছে সেটা আমি জানতাম আজ-বা-কাল আমার দিকে ধেয়ে আসবেই। ‘প্রফেসর, অনেক অনুবাদকই বলেছেন অনুবাদ করার আগে তাঁরা সেই বইটি পড়েনইনি! এটা কেমন করে সম্ভব?’

আর এগিয়ে এল— ‘এমনকি গ্রেগরি রাবাসা-ও ওয়ান হানড্রেড ইয়ারস অফ সলিচিউড নাকি পড়েছিলেন সেটা অনুবাদ করার সময়েই! কিন্তু এটা কী করে সম্ভব? আমার যদি আদৌ সেই বইটা পছন্দ না হয় তখন কী হবে? আপনি তো বলেছেন, আমরা যেটা অনুবাদ করব সেটাকে আমাদের আগে ভালবাসতে হবে।’ প্রথম দর্শনে প্রেম নিয়ে প্রচলিত ঠাট্টাটা আমার মুখে এসে গেছিল প্রায় (ডজনখানেক সিনিয়র টিন-এজার আপনাকে ঘিরে গোল গোল চোখে দাঁড়িয়ে থাকলে তাতে খুব দোষ দেওয়া যায় কি?), কিন্তু আমি সংযত হলাম, আর প্রশ্নটা তাদের দিকেই ঘুরিয়ে দিয়ে এর সম্ভাব্য ব্যাখ্যাগুলি কী হতে পারে জানতে চাইলাম। ঠোঁট কামড়ে এস বলল, ‘আপনি কি বলতে চাইছেন একজন অনুবাদকের জন্য প্রথম পাঠটাই সেরা পাঠ?’ পি আপত্তি করল— ‘কিন্তু আমরা তখন তার কনটেক্সট, টীকাটিপ্পনি বা সূক্ষ্ম রেফারেন্সগুলি সম্পর্কে তখন জানব কী করে? অনেকবার না পড়লে এগুলি আমাদের কাছে ধরা পড়বে কী করে?’

আমার কোনও উত্তর দেওয়ার দরকার ছিল না। আমার কেবল নিশ্চিত করার ছিল, এই প্রশ্নগুলি— এবং এরকম আরও কয়েক লক্ষ প্রশ্ন— যেন জিজ্ঞাসিত হতে পারে।

 

—প্রফেসর, সব কিছুই কি অনুবাদ করা যায়?
—তোমাদের কী মনে হয়?
—হ্যাঁ, করা যাবে। হয়তো সব পুরো নিখুঁত হবে না, কিন্তু অনেকটাই করা যাবে।
—না, কিছু জিনিস অনুবাদ করা যায় না। একটা ভাষার সমগ্র সংস্কৃতিটাকে তোমরা কী করে অন্য একটা ভাষায় নিয়ে যাবে?
—কেন নিয়ে যেতে হবে? পাঠকই সেটা করতে শিখবে। ইউকে-তে বসে কেউ একটা কন্নড় উপন্যাস পড়ে কেন ভাববে যে যেহেতু সে এটা ইংরেজিতে পড়ছে, ফলত এটা তার পরিচিত সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটেই রচিত?
—বেশ… কিন্তু যদি সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটটাকে বহন করে না-ই নিয়ে যাওয়া হয়, তবে তাতে কি অনুবাদের সমৃদ্ধি কমে যায় না?
—তুমি কী বলতে চাও— প্রতিটি বাংলা উপন্যাসে যে-যে সংস্কৃতির প্রতিফলন ঘটেছে, প্রতিটি বাঙালি পাঠক সেগুলি অনুধাবন করতে পারে? এর জন্য প্রত্যেক পাঠকের নিজস্ব প্রয়াস লাগে।

বা, আরেকটা পাঁচ মিনিটের বিরতি এবং আবার ক্লাসে গিয়ে নিবিড় অনুবাদ অনুশীলন।

 

ভি-র জেদ সে তার ইংরেজি অনুবাদে বেশ কিছু মূল কন্নড় শব্দ ব্যবহার করবে। আবার একটা দীর্ঘ কথোপকথন নির্মিত হল। এবং তা থেকে প্রমাণিত হল যে, অনুবাদ শেখানো— খোদ অনুবাদ করার মতোই— একটা আলাপ-আলোচনার বিষয়, অনুবাদকের এটা উপলব্ধি করার বিষয় যে পছন্দটা যেন মননশীল হয়, তারা যেন সমর্থযোগ্য হয়, এবং তারা যেন কখনওই কোনও পূর্ব-সিদ্ধান্ত বা ডগমা না-নিয়ে অনুবাদ করতে বসে, বরং যেন টেক্সটের প্রতি নিবিড়ভাবে আন্তরিক হয়।

আর এই কথোপকথনই ভি-কে এবং আমাকেও কেমন করে অনুবাদ শুরু করতে হবে সেটা শিখতে সাহায্য করল। আমি ওকে জিজ্ঞাসা করলাম, ও যে মূল কন্নড় শব্দগুলো অনূদিত টেক্সটে রাখতে চাইছে, সেগুলি কি কোনও বিশেষ ভূমিকা পালন করবে? ‘যদি এই শব্দগুলো পড়ে পাঠক টেক্সট-কে প্রশ্ন করা শুরু করেন তখন কী হবে?’— আমি জিজ্ঞাস করলাম। এই প্রশ্নটা আসবে ভি জানত, এবং তার উত্তরও তৈরি ছিল। সে হেসে বলল— ‘পাঠক যখন মূল টেক্সটটা পড়বেন তখন নিশ্চয়ই এই শব্দগুলো তাঁদের প্রশ্ন করতে বাধ্য করবে না?’

‘কিন্তু ভাবুন প্রফেসর, পাঠক যখন একটি কন্নড় টেক্সটের ইংরেজি অনুবাদ পড়ছেন তখন কেন তিনি টেক্সটটিকে প্রশ্ন করবেন না? প্রশ্ন না-করলে টেক্সটের মূল কন্নড় ভাবটি তাঁর কাছে কেমন করে প্রতিফলিত হবে, যখন কিনা প্রতিটি শব্দই ইংরেজি? তিনি যদি ভেবে বসেন এটা আসলে একটা ইংরেজি বইই তিনি পড়ছেন, তখন কী হবে?’

কোনও মীমাংসা হল না, এবং আদৌ তার দরকারও ছিল না। আমরা দুজনেই যেটা শিখলাম (আবারও), যে অনুবাদকের কোনও পূর্বনির্ধারিত পছন্দ থাকতে পারে না। অগুনতি বিকল্প রয়েছে, এবং প্রতিটি বিকল্পই যুক্তিযুক্ত, কারণ প্রত্যেকের পেছনেই সুনির্দিষ্ট কিছু যুক্তিশৃঙ্খল রয়েছে। এটা আসলে এই ধারণা থেকে শুরু করা, যে প্রতিটি টেক্সটের একটিমাত্রই নিখুঁত অনুবাদ রয়েছে, এবং প্রতিটি অনুবাদকের কাজ হল সেই খুঁতহীনতায় পৌঁছনোর জন্য লড়ে যাওয়া।

একদিন ক্লাস চলার সময়ে সবাই যখন এই আলোচনায় ব্যস্ত তখন আর সোজাসুজি আমার দিকে তাকাল। সেদিন ক্লাসে ফিল্ম সাবটাইটেল অনুবাদের যে-কাজ দেওয়া হয়েছিল, সেটা বাদ দিয়ে সে আমাকে বলল— ‘প্রফেসর, আপনি তো আমাদের অতলে ফেলে দিয়ে বলছেন যে এইভাবেই অনুবাদ হয়। সঠিক উত্তর একটাই, এবং আমাদের প্রচেষ্টা যেন হয় সেই উত্তরটাতে পৌঁছনো— এটা না বলে আপনি বলছেন আমরা যেন নিজেরাই আমাদের পছন্দের দায়িত্ব নিই। এটা কেমন হচ্ছে? আমি তো ভেবেছিলাম অনুবাদ আসলে একটা ক্রসওয়ার্ড পাজলের মতো বিষয়, এখন তো আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে এটা অনেকটা কবিতার মতো।’

অনুবাদ শেখানোর আনুষঙ্গিক উপকারগুলি আমার চোখে হঠাৎ স্পষ্ট হয়ে উঠল। আমার ছাত্রছাত্রীরা অনুবাদের কৌশলগুলি সম্পর্কে আমার চেয়েও অনেক স্পষ্ট ধারণা রাখে। আমি এক দশকেরও বেশি আগে কোনও গভীর চিন্তাভাবনা ছাড়াই অনুবাদে স্রেফ ঝাঁপ দিয়েছিলাম। এখন আমি ওদের কাছ থেকে শিখছি।

 

ক্লাসরুমে ঢুকতেই পি আমার কাছে দৌড়ে এল। ‘প্রফেসর, আমি ভয়েসটা পাচ্ছি না।’ তার গলা ভেঙে গেছে। সে প্রায় কেঁদে ফেলবে। আমি একজন অনুবাদকের হৃদয়বিদারণের সমস্যার মুখোমুখি হলাম। একজন অনুবাদক, যে তার উৎস-পাঠটিকে ভালবেসে ফেলেছে, কিন্তু অনুবাদ করতে গিয়ে দেখছে সেটা তার সাধ্যের বাইরে। সে প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি বাক্যাংশ, প্রতিটি বাক্য, অর্থের প্রতি চূড়ান্ত বিশ্বস্ততা নিয়ে ভাষান্তরিত করেছে। এমনকি প্রতিটি স্বরকেও উদ্দিষ্ট ভাষায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে। তারপর যখন সে নিজে নিজেই জোরে জোরে অনুবাদটি পাঠ করেছে, তার মাথায় মূল টেক্সটটি পাঠের অনুরণন আসেনি। সে আতঙ্কিত। সে ভাবছে, সে সেটা পেরেই উঠবে না।

এখানে আমি তাকে কী শেখাব? সে অনুবাদের এমন একটি অংশে পৌঁছেছে, যেটা শেখানো সম্ভব নয়। একজন লেখকের ভয়েস-টাকে অন্য ভাষায় অন্তরিত করা। আরও অনেক কিছুর মতোই আমার কাছে কোনও সুলভ নির্দেশিকা বা ইউটিউব ভিডিও নেই যে আমি তাকে সেটা দেখে নিতে বলব। ফলে আমি তাকে একটা কথাই বলতে পারি— অনুবাদ বারংবার করে যেতে হয়, এমনকি পুরোটা ফেলে দিয়ে নতুন করেও শুরু করতে হয়, যতক্ষণ না অনুবাদক এই উপলব্ধিতে পৌঁছচ্ছেন যে তিনি লেখকের ভয়েসটা ধরতে পেরেছেন।

আমরা যেটা সবাই মিলে শিখলাম সেটা হল যে কেমন করে একটা ‘ভয়েস’-কে চিনতে হয়, কী কী বৈশিষ্ট্য সেই ভয়েসটিকে চিনতে সাহায্য করে, কেমন করে সেগুলি শুনতে হয়। শেখার জন্য আমরা সেই একটিই পরিচ্ছেদ বিভিন্ন ভয়েসে অনুবাদ করলাম— একটি রাগী ভয়েস, একটি বিভ্রান্ত ভয়েস, একটি উত্তেজিত ভয়েস, একটি নির্জীব ভয়েস, একটি অনাগ্রহী ভয়েস…। মূলত আমরা যাতে সেগুলি আলাদা-আলাদাভাবে বলতে পারি। শিক্ষাটা পি-এর খুবই কাজে দিল। কারণ, সে বুঝে গেল সেই নির্দিষ্ট টেক্সটটির জন্য যে ভয়েসটি প্রয়োজন, সে সেটা কোনওদিনই অনুবাদ করতে সক্ষম হবে না।

 

‘কবিতা অনুবাদ করতে গেলে কি কবি হতেই হবে?’ এই প্রশ্নটাকে আমি ভয় পাই। কারণ প্রশ্নটা কবি কাকে বলা যেতে পারে সে-নিয়ে একটা বিস্তারিত আলোচনার জন্ম দেবে, এবং তারপরই, অনিবার্যভাবে, কবিতার মতো দেখতে করে গদ্য লেখেন এমন লেখকদের একটি তালিকা উঠে আসবে যাঁরা নিজেদের কবি মনে করলেও আসলে তা নন। আর তারপরই এস সেই অবশ্যম্ভাবী প্রশ্নটি করল— ‘এটা কেবল কবিতার ক্ষেত্রেই কেন? একটা উপন্যাস অনুবাদ করতে গেলেও কি ঔপন্যাসিক হতেই হবে?’

এখন আমার ক্লাস নিজেদের উত্তর নিজেরাই খুঁজে নিতে পছন্দ করছে। আমার ভূমিকা হয়ে দাঁড়িয়েছে একটি কথা-বলা বোর্ডের মতো। যখন কোনও সমস্যা তিনরকম সমাধান নিয়ে উপস্থিত হচ্ছে, তখন ওরা আমার কাছে জানতে চাইছে এগুলির মধ্যে কোনটা আমার সবচেয়ে অপছন্দ। (আমি প্রায়ই এরকম বলেছি, যে অনুবাদের এমন কিছু ধরন আছে, যেগুলি যতই সঠিক হোক না কেন, সেগুলি মেনে অনুবাদ করলে অনূদিত টেক্সটে সাহিত্যের কোনও স্পর্শই থাকে না, একটা প্রাণহীন, শুষ্ক, অভিধান-চালিত বস্তু প্রসব হয় কেবল।) এই ভূমিকায় আমি স্বচ্ছন্দ। কারণ— যদিও এখনও আমার ছাত্রছাত্রীরা জানে না— সেমিস্টারের শেষে আমি ওদের কোনও মূল্যায়ন করব না। ওদের কাজের মূল্যায়ন করবে ওরা নিজেরাই, বিচার করবে ওদের কাজে ওরা কতদূর এগোতে পারল। অন্য কেউই এটা ওদের বলে দিতে পারবে না।

ফলে, একটা তীব্র বাক্যবিনিময়ের সূত্রপাত ঘটল, কিন্তু সিদ্ধান্তে পৌঁছনো গেল অস্বাভাবিক দ্রুততায়। ওরা বিষয়টাকে একদম গোড়ায় গিয়ে ধরে ফেলল। ওদের বক্তব্য, অনূদিত কবিতার মানই ঠিক করে দেবে অনুবাদক কবি, না কবি নন। ডি খুব অপ্রত্যাশিত দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা করল, তাকে সমর্থন করল, যে একটা কবিতাপত্রিকায় লেখা ছাপা হয়েছে মানেই কেউ কবি হয়ে যায় না। সারাজীবন এক লাইন কবিতা না-লিখেও কেউ কবি হতে পারে— লেখেনি, কারণ বিষয়টা এখনও তার জানা নেই তাই। ফলে, তোমার অনুবাদ যদি ভাল হয়, তুমি স্বাভাবিকভাবেই একজন কবি (বা ঔপন্যাসিক, বা প্রবন্ধকার, বা অন্য যা কিছু তোমার হতে ভাল লাগে)।

তাহলে?!

 

—প্রফেসর, টেক্সটের কোনও-কোনও জায়গা কি আমি পরিবর্তন করতে পারি?
—কেন করতে চাইছ সেটা?
—এই জায়গাগুলো খুবই অস্বস্তিকর…
—তাহলে তুমি কী করবে?
—অস্বস্তিগুলো… একটু কমাব…

এই কথার সঙ্গে সঙ্গে খুব স্বাভাবিকভাবেই বাকি ক্লাস এম-এর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। আর বলল, ‘আমি জানি, কোথা থেকে তুমি এই কথাটা বলছ। কিন্তু ভাই, এটা তো লেখকের লেখা, তোমার নয়। যদি মূল লেখা অস্বস্তিকর হয়ে, তবে তার অনুবাদকেও অস্বস্তিকর হতে হবে।’

‘নিজে অনুবাদ না-করলে এরকম বলা সহজ। তুমি কি ভাবতে পারছ এইরকম অস্বস্তিকর জায়গায় নিজের শব্দ বসাতে কেমন লাগে?’

আগের মতোই, এখন ওরা সমস্যার সমাধান নিজেরাই করে নিচ্ছে।

 

প্রখ্যাত অনুবাদক ডিএইচ ক্যাম্পাসে এসেছেন। তিনি এত বই অনুবাদ করেছেন, অনুবাদ-বিষয়ে এত পুরস্কার জিতেছেন, এত অনুবাদককে মেন্টর করেছেন, অনুবাদ সংক্রান্ত এত কথা বলেছেন যে কারও পক্ষেই, এমনকি তাঁর নিজের পক্ষেও, মনে রাখা সম্ভব নয়। তিনি অনুবাদ করার জন্য একটি টেক্সট— প্রকৃত অর্থে একটি প্যারাগ্রাফ— কেমন করে পড়তে হয়, দেখাচ্ছিলেন। প্রথমে, তিনি সেটা পড়লেন। এক মিনিট, কি তারও একটু কম, সময় লাগল। তারপর, তিনি পুরোটা হোয়াইটবোর্ডে লিখে ফেললেন। আমি আড়চোখে দেখলাম শ্রোতাদেরও অনেকেই নিজের নিজের নোটবুকে সেটি লিখে নিচ্ছে। এই কাজটা আমিও করি। অনুবাদ করার আগেই মূল প্যারাগ্রাফটা একবার লিখে ফেলি। এতে টেক্সটের আরও কাছাকাছি পৌঁছনো যায়।

এবার ডিএইচ প্রতিটি শব্দ ধরে ধরে পরীক্ষা করা শুরু করলেন। জোরে জোরে তাদের অর্থ, উচ্চারণ, গুরুত্ব, অন্য শব্দের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক, ওজন, এবং আরও বিভিন্ন জিনিস বলতে লাগলেন। এক ঘন্টা পর দেখা গেল তিনি মাত্র ২১টি শব্দ পর্যন্ত এগোতে পেরেছেন। একটা টেক্সটকে অনুবাদ করার পদ্ধতিটি তিনি ক্রমাগত ভাঙছিলেন, আর আমি দেখছিলাম আমার ছাত্রছাত্রীরা ক্রমশ হতাশ হয়ে পড়ছিল। শেষমেশ ওদের একজন কাঁপা-কাঁপা গলায় জিজ্ঞেসই করে ফেলল, ‘আমরা কি…’

ডিএইচ ইঙ্গিতটা বুঝতে পারলেন। ‘আরে না না, যখন তোমরা অনেক অনুবাদ করে ফেলবে, এগুলি তোমাদের মাথার মধ্যে আপনা-আপনিই হয়ে যাবে। কিন্তু শুরুতে…’

চারিদিকে উৎসাহব্যঞ্জক মাথা নাড়া দেখতে পেলাম। এই নির্দিষ্ট প্যারাগ্রাফটি, তার সমস্ত সম্ভাবনার কারণে, আমার ছাত্রছাত্রীদের নিজের প্রেমে ফেলে দিয়েছে। আমি দেখলাম তাদের চোখ চকচক করছে। কারণ, তারা বুঝতে পারছে এই একই জিনিস তারা নিজের-নিজের টেক্সটগুলির সঙ্গেও করতে পারবে। চোখগুলিতে ভয় আছে, সংশয়ও আছে… সব মিলিয়ে যেটা আছে, সেটা হল ভালবাসা।

 

‘প্রফেসর, অনুবাদ আমি ভালবেসে ফেলেছি। আমি কি আরও অনুবাদ করতে পারি?’

এবার আমার কাজ শেষ।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4710 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...