দিলীপ ঘোষ
আমরা পশ্চিমবঙ্গে ১৯৬২ সাল থেকে ভোটারসংখ্যা বাড়া-কমার ইতিহাস দেখার চেষ্টা করেছি এই নিবন্ধে, এবং পাশাপাশিভাবে তুলনীয় আরও কয়েকটি রাজ্যেও এই বাড়া-কমার পরিমাণ কীরকম ছিল সেই সংখ্যাগুলিও দেখেছি। তুলনার জন্য আমরা পশ্চিমবঙ্গ এবং ভারতের অন্য তিনটি বৃহৎ রাজ্যের উপর আলোকপাত করব, যেগুলি ১৯৬২ সালের পর থেকে পশ্চিমবঙ্গের মতোই তাদের ভৌগোলিক অখণ্ডতা বজায় রেখেছে এবং নতুন রাজ্য সৃষ্টির উদ্দেশ্যে বিভক্ত হয়নি। এই তিনটি রাজ্য হল— রাজস্থান, ওডিশা এবং তামিলনাড়ু
নানা রাজ্যে নির্বাচক তালিকায় চলমান বিশেষ নিবিড় সংশোধন (স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন SIR–২০২৬)-এর সাম্প্রতিক উদ্যোগ নিয়ে জলঘোলা হয়েছে বিস্তর।
আমরা এই বিতর্কে অংশ নেওয়ার জন্য এই প্রসঙ্গের অবতারণা করিনি। ভারতে ১৯৫২ সালের প্রথম সাধারণ নির্বাচনের পর থেকে মোট ১৩টি নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধন (intensive revision) করা হয়েছে। এই সংশোধনগুলি হয়েছিল ১৯৫২-৫৬, ১৯৫৭, ১৯৬১, ১৯৬৫, ১৯৬৬, ১৯৮৩-৮৪, ১৯৮৭-৮৯, ১৯৯২, ১৯৯৩, ১৯৯৫, ২০০২, ২০০৩ এবং ২০০৪-এ, ভারতের সংবিধানের ৩২৪ অনুচ্ছেদ এবং ১৯৫০ সালের জনপ্রতিনিধিত্ব আইন (Representation of the People Act, 1950)-এর ২১(৩) ধারার অধীনে ইলেকশন কমিশন অফ ইন্ডিয়ার ক্ষমতাবলে। এছাড়াও সব রাজ্যেই বড় সাধারণ নির্বাচনের আগে সংক্ষিপ্ত সংশোধন করা হয় ভোটার তালিকার, ভোটারদের সংখ্যা কমে বাড়ে।
আমরা পশ্চিমবঙ্গে ১৯৬২ সাল থেকে ভোটারসংখ্যা বাড়া-কমার ইতিহাসটাই দেখার চেষ্টা করেছি এই নিবন্ধে, এবং পাশাপাশিভাবে তুলনীয় আরও কয়েকটি রাজ্যেও এই বাড়া-কমার পরিমাণটা কীরকম ছিল সেই সংখ্যাগুলিও দেখেছি।
তুলনার জন্য আমরা পশ্চিমবঙ্গ এবং ভারতের অন্য তিনটি বৃহৎ রাজ্যের উপর আলোকপাত করব, যেগুলি ১৯৬২ সালের পর থেকে পশ্চিমবঙ্গের মতোই তাদের ভৌগোলিক অখণ্ডতা বজায় রেখেছে এবং নতুন রাজ্য সৃষ্টির উদ্দেশ্যে বিভক্ত হয়নি। এই তিনটি রাজ্য হল— রাজস্থান, ওডিশা এবং তামিলনাড়ু।
রাজ্যগুলির বিশদে যাওয়ার আগে একটা সাধারণ বিষয় নজরে রাখা প্রয়োজন। সেটা এই যে, রাজ্যভিত্তিক তথ্যগুলি দেখার সময়ে সবাই খেয়াল করবেন যে ১৯৮৯ সালে বা তার অব্যবহিত পরে সব রাজ্যেই ভোটার সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছিল অনেকটা। ১৯৮৯ সালের ভোটার তালিকা সংশোধন ভারতের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এর মূল কারণ ছিল সংবিধানের একষট্টিতম সংশোধনী, যার মাধ্যমে ভোট দেওয়ার বয়স ২১ বছর থেকে কমিয়ে ১৮ বছর করা হয়। ১৯৮৭-৮৯ সময়ে ভারতের নির্বাচন কমিশন সারা দেশে নিবিড়ভাবে ভোটার তালিকা হালনাগাদ করেছিল ঠিকই, কিন্তু সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি এসেছিল তরুণদের ভোটাধিকার দেওয়ার সিদ্ধান্তের ফলে।
এই পরিবর্তনের সংখ্যাগত প্রভাব ছিল বিস্ময়কর। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৯৮৪ সালে নিবন্ধিত ভোটারের সংখ্যা ছিল প্রায় ৩৭.৯৫ কোটি। ১৯৮৯ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৯.৮৯ কোটি। অর্থাৎ মাত্র পাঁচ বছরে প্রায় ১১.৯৪ কোটি ভোটার বৃদ্ধি পায়।
২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে Centre for Youth Policy-র এক গবেষণায় বলা হয়েছে,
এই সংশোধনের ফলে প্রায় ৫০ মিলিয়ন নতুন যোগ্য ভোটার অন্তর্ভুক্ত হন, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭ শতাংশ এবং ভোটদানের উপযুক্ত জনসংখ্যার প্রায় ১৩.৫ শতাংশ।
এই সাংবিধানিক পরিবর্তনের প্রক্রিয়াটিও ছিল খুব দ্রুত। সংবিধানের একষট্টিতম সংশোধনী বিলটি ১৯৮৮ সালের ডিসেম্বরে সংসদে উত্থাপিত হয় এবং মাত্র চারদিনের মধ্যে প্রায় সব বড় রাজনৈতিক দলের সমর্থনে পাশ হয়ে যায়। ১৯৮৯ সালের ২৮ মার্চ রাষ্ট্রপতির সম্মতি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এটি কার্যকর হয়।
তামিলনাড়ু
তামিলনাড়ুর ভোটার তালিকায় ১৯৬২ সালে যেখানে মোট ভোটারের সংখ্যা ছিল ১,৮৬,৭৫,৪৩৬, সেখানে ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬,২৪,০৪,৯৪৭। অর্থাৎ তিনগুণেরও বেশি বৃদ্ধি। তবে এই বৃদ্ধি একটানা সরলরেখায় ঘটেনি। সময়ে সময়ে ইলেকশন কমিশন অফ ইন্ডিয়া (ইসিআই)-র নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়ার ফলে কখনও প্রকৃত ভোটার সংখ্যা দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতার খুব কাছাকাছি থেকেছে, আবার কখনও তা উল্লেখযোগ্যভাবে ওপরে বা নিচে সরে গেছে।
১৯৬৫ ও ১৯৬৬ সালের নিবিড় সংশোধনের পর ১৯৬৭ সালে ভোটারের সংখ্যা বেড়ে হয় ২,০৭,৯৬,৭০০। এই সময় প্রকৃত সংখ্যা দীর্ঘমেয়াদি বৃদ্ধির ধারা অনুসরণ করছিল। ১৯৮৩-৮৪ সালের সংশোধনের পর ১৯৮৪ সালের নির্বাচনে ভোটার সংখ্যা দাঁড়ায় ৩,০৯,৫৮,০৮০— যা দীর্ঘমেয়াদি বৃদ্ধির প্রবণতার সামান্য উপরে। কিন্তু ১৯৮৯ সালে ভোটারের সংখ্যা এক লাফে বেড়ে হয় ৪,০০,২৭,২১২।
১৯৯০-এর দশক জুড়েও এই ঊর্ধ্বগতি বজায় থাকে। ১৯৯২, ১৯৯৩ ও ১৯৯৫ সালে নিবিড় সংশোধন হলেও ভোটার সংখ্যা প্রবণতার উপরে অবস্থান করে— ১৯৯৬ সালে ৪,২৪,৮৮,০২২; ১৯৯৮ সালে ৪,৫৫,৭৭,৭৮৮; এবং ১৯৯৯ সালে ৪,৭৭,৩৩,৬৬৪। অর্থাৎ তালিকা ক্রমশ বিস্তৃত হচ্ছিল। কিন্তু ২০০০-এর দশকের শুরুতে আবার বড় পরিবর্তন আসে। ২০০২, ২০০৩ ও ২০০৪ সালের সংশোধনের পর ২০০৯ লোকসভা নির্বাচনের আগে ব্যাপক যাচাই-বাছাই চালানো হয়। দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া-র ২০০৯ সালের একটি প্রতিবেদনে দেখতে পাচ্ছি, ২০০৪ সালের ভোটার সংখ্যা প্রায় ৪.৬৬ কোটি, তা কমে ২০০৯ সালে হয় ৪.১৬ কোটি— অর্থাৎ ৫৩ লক্ষ ভোটার বাদ পড়ে, যা মোটের প্রায় ১১.২ শতাংশ হ্রাস। সংখ্যাটা এত বড় ছিল যে তুলনা টানা হয়েছিল প্রায় চেন্নাই শহরের সমান জনসংখ্যা তালিকা থেকে বাদ যাওয়ার সঙ্গে।
তামিলনাডুর তৎকালীন মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক শ্রীনরেশ গুপ্ত টাইমস অফ ইন্ডিয়া-কে জানান, ২০০৫ সালে শতভাগ ক্ষেত্রসমীক্ষার মাধ্যমে অচিহ্নিত ও ভুয়ো নাম বাদ দেওয়া হয়। প্রায় ২৫-২৭ লক্ষ ভোটারকে শনাক্ত করা যায়নি বলে মুছে ফেলা হয়। একই EPIC নম্বরযুক্ত একাধিক নাম এবং স্থান পরিবর্তন করেও পুরনো ঠিকানায় থেকে যাওয়া নামগুলিও সংশোধন করা হয়।
তবে এই পতন স্থায়ী হয়নি। ২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের সময় ভোটারসংখ্যা বেড়ে প্রায় ৪.৭১ কোটিতে পৌঁছায়, আগের উচ্চতম সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে যায়। স্বাভাবিক জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নতুন ১৮ বছর বয়সিদের অন্তর্ভুক্তি এবং নিয়মিত সংশোধন প্রক্রিয়া এর পেছনে প্রধান কারণ ছিল বলে মনে হয়। ২০১৪ সালে ভোটারসংখ্যা ৫ কোটির গণ্ডি অতিক্রম করে; ২০১৬ সালে তা দাঁড়ায় ৫.৮২ কোটি। পরবর্তী বছরগুলিতে ঊর্ধ্বগতি আরও স্পষ্ট হয়— ২০১৪ সালে ৫,৫১,১৪,৮৬৭; ২০১৯ সালে ৫,৯৯,৪১,৮৩২; এবং ২০২৪ সালে ৬,২৪,০৪,৯৪৭। অর্থাৎ ২০০৯ সালের বড় পতনের পর তালিকা শুধু পুনরুদ্ধারই হয়নি, বরং নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে।
এই পর্বে নারীদের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য বলে মনে করেন অনেকে। ২০১১ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে ৩৪ লক্ষ নতুন নারী ভোটার যুক্ত হন, যেখানে পুরুষ ভোটার যুক্ত হন ৩১ লক্ষ। বহু কেন্দ্রে নারী ভোটারের সংখ্যা পুরুষদের ছাড়িয়ে যায়। ভোটদানের হারেও নারীরা এগিয়ে— ২০১১ সালে নারীদের ভোটদানের হার ছিল ৭৮.৫৪ শতাংশ, পুরুষদের ৭৭.৭১ শতাংশ; বহু কেন্দ্রে নারীদের অংশগ্রহণ ৮০ শতাংশেরও বেশি। নারীকেন্দ্রিক নানা প্রকল্প— বিনামূল্যে বাসযাত্রা, মাসিক আর্থিক সহায়তা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প, একক মহিলাদের রেশন সুবিধা ইত্যাদি— চালু করে নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়াতে সহায়তা করেছে। কিন্তু ভোটারদের সংখ্যাবৃদ্ধির পেছনে এটাই একমাত্র কারণ বলে মনে হয় না।

রেখচিত্র ১: তামিলনাডুতে ভোটার সংখ্যা বৃদ্ধি। লাল বিন্দু দিয়ে আঁকা রেখাটি দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা চিহ্নিত করে
ওডিশা
ওডিশার ভোটারসংখ্যার তথ্য ১৯৬২ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত এক দীর্ঘমেয়াদি ও ধারাবাহিক ঊর্ধ্বগতির ছবি তুলে ধরে। এই ছয় দশকে ভোটারের সংখ্যা প্রায় ৮৭ লক্ষের কিছু বেশি থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ কোটিরও বেশি। অর্থাৎ মোটামুটি চারগুণ বৃদ্ধি। তবে এই বৃদ্ধি পুরো সময়জুড়ে একইভাবে ঘটেনি; বিভিন্ন সময়ে প্রকৃত ভোটারসংখ্যা দীর্ঘমেয়াদি পরিসংখ্যানগত প্রবণতার সঙ্গে কখনও খুব কাছাকাছি থেকেছে, কখনও আবার তা ছাড়িয়ে গেছে বা নিচে নেমেছে।
১৯৬০-এর দশকে, বিশেষ করে ১৯৬৫ ও ১৯৬৬ সালের নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধনের সময়, প্রকৃত ভোটারসংখ্যা প্রবণতার সঙ্গে প্রায় পুরোপুরি সামঞ্জস্য রেখে চলছিল। ১৯৬২ সালে ভোটারসংখ্যা ছিল ৮,৭৮৫,৫১৯, যা ১৯৬৭ সালে ধীরে ধীরে বেড়ে দাঁড়ায় ৯,৮৮৩,১৭১। এই সময়ে বৃদ্ধির হার ছিল স্থিতিশীল ও অনুমিত ধাঁচের।
কিন্তু ১৯৮০-র দশকে চিত্রটি বদলাতে শুরু করে। ১৯৮৩ ও ১৯৮৪ সালের নিবিড় সংশোধনের পর ১৯৮৪ সালের নির্বাচনে ভোটারের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৪,৯৪৩,৪৫৬— যা দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতার তুলনায় সামান্য উপরে। এর পর ১৯৮৭-৮৯ সময়কালে আরও বড় পরিবর্তন দেখা যায়। এই সময় ভোটারসংখ্যা প্রায় ৪৫ লক্ষ বেড়ে ১৯৮৯ সালে পৌঁছে যায় ১৯,৪৪০,৭৫৮-এ। ফলে প্রকৃত সংখ্যা প্রবণতার তুলনায় কিছুটা ওপরে উঠে যায় এবং একটি স্পষ্ট ব্যবধান তৈরি হয়।
এই উচ্চ বিচ্যুতির ধারা ১৯৯০-এর দশকেও বজায় থাকে। যদিও ১৯৯২, ১৯৯৩ ও ১৯৯৫ সালে নিবিড় সংশোধন হয়, তবুও ভোটারের সংখ্যা দীর্ঘমেয়াদি গড়ের চেয়ে বেশিই থাকে। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে ভোটারসংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২২,৪১৯,১১৮। অর্থাৎ প্রকৃত তথ্য পরিসংখ্যানগত প্রবণতার উপরে অবস্থান করছিল।
তবে ২০০০-এর দশকের শুরুতে আবার এক বড় পরিবর্তন দেখা যায়। ২০০২, ২০০৩ ও ২০০৪ সালের নিবিড় সংশোধনের পর ২০০৪ সালের নির্বাচনে ভোটারের সংখ্যা দাঁড়ায় ২৫,৬৫১,৯৮৯। দীর্ঘ কয়েক দশকের মধ্যে এই প্রথমবার প্রকৃত সংখ্যা প্রবণতার নিচে নেমে আসে। এই নিম্নমুখী বিচ্যুতি ২০০৯ সালেও বজায় থাকে, যখন ভোটারের সংখ্যা ছিল ২৭,১৯৪,৮৬৪, এবং ২০১৪ সালেও তা ছিল ২৯,১৯৬,০৪৫— যা দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতার নিচেই ছিল।
শুধুমাত্র সাম্প্রতিক দশকেই আবার পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেছে। ২০১৯ সালে ভোটারের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩২,৪৯৭,৭৬২ এবং ২০২৪ সালে তা পৌঁছায় ৩৩,৭১৬,৯৬৫-এ। এই পর্যায়ে এসে প্রকৃত সংখ্যা আবার দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতার উপরে উঠে গেছে।
সব মিলিয়ে, ওডিশার ভোটার তালিকার ইতিহাস দেখায় যে দীর্ঘমেয়াদে ধারাবাহিক বৃদ্ধি থাকলেও, প্রত্যাশিত গড়ের চেয়ে আশপাশেই থেকেছে।

রেখচিত্র ২: ওড়িশাতে ভোটারসংখ্যা বৃদ্ধি। লাল বিন্দু দিয়ে আঁকা রেখাটি দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা চিহ্নিত করে
রাজস্থান
রাজস্থানে ১৯৬২ সালে যেখানে মোট ভোটারের সংখ্যা ছিল ১,০৩,২৭,৫৯৬, সেখানে ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫,৩৫,০৮,০১০। অর্থাৎ পাঁচগুণেরও বেশি বৃদ্ধি।
১৯৬০-এর দশকের মাঝামাঝি, বিশেষ করে ১৯৬৫ ও ১৯৬৬ সালের নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধনের সময়, প্রকৃত ভোটারসংখ্যা ধারাবাহিকভাবে অনুমিত প্রবণতার চেয়ে বেশি ছিল। ১৯৬২ সালের ভিত্তিসংখ্যা থেকে বাড়তে বাড়তে ১৯৬৭ সালে ভোটার সংখ্যা দাঁড়ায় ১,২১,৭৬,২৬৫। এই সময় থেকেই প্রকৃত বৃদ্ধি পরিসংখ্যানগত অনুমানের তুলনায় দ্রুত ঘটছিল।
এই প্রবণতা ১৯৮০-এর দশকেও বজায় থাকে। ১৯৮৩-৮৪ সালের নিবিড় সংশোধনের পর ১৯৮৪ সালের নির্বাচনে ভোটারের সংখ্যা হয় ২,০১,১৭,২৮৫— যা দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতার সামান্য উপরে অবস্থান করছিল। কিন্তু ১৯৮৭-৮৯ সময়কালে ভোটারসংখ্যা দ্রুত বেড়ে ১৯৮৯ সালে পৌঁছে যায় ২,৫৮,১৪,৫১৫-এ। ফলে প্রকৃত ভোটারসংখ্যা ও দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতার মধ্যে একটি বড় ব্যবধান তৈরি হয়।
১৯৯২, ১৯৯৩ ও ১৯৯৫ সালের নিবিড় সংশোধনের পর পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে এবং এক ধরনের সংশোধন-এর পর্যায় দেখা যায়। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে ভোটারের সংখ্যাও সামান্য বেশি ছিল— ৩,০৩,৮৮,৩৫৭। কিন্তু এরপর ১৯৯৮ সালে তা নেমে আসে ২,৯৭,৫১,৪০০-এ। এই প্রথমবার প্রকৃত সংখ্যা দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতার নিচে চলে যায়।
এই নিম্নমুখী অবস্থান ২০০০-এর দশকের শুরুতেও বজায় থাকে। ২০০২, ২০০৩ ও ২০০৪ সালের নিবিড় সংশোধনের পর ২০০৪ সালের নির্বাচনে ভোটারের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩,৪৭,১২,৩৮৫ এবং ২০০৯ সালে তা হয় ৩,৭০,৬০,০১১— দুটিই দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতার নিচে।
কিন্তু সাম্প্রতিক দশকে ভোটারসংখ্যা আবার দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকে। ২০১৪ সালে ভোটারের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৪,২৯,৯৪,৬৫৭, ২০১৯ সালে ৪,৮৯,৫৫,৮১৩ এবং ২০২৪ সালে পৌঁছে যায় ৫,৩৫,০৮,০১০-এ। এই সময় প্রকৃত সংখ্যা আবার দীর্ঘমেয়াদি পরিসংখ্যানগত গড়কে অনেকটাই ছাড়িয়ে যায়।
সম্প্রতি স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (SIR) শেষ হওয়ার পর প্রকাশিত রাজস্থানের চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় আবার একটি উল্লেখযোগ্য হ্রাস দেখা গেছে। সংশোধনের আগে ভোটারের সংখ্যা ছিল ৫,৪৬,৫৬,২১৫; সংশোধনের পরে তা কমে দাঁড়ায় ৫,১৫,১৯,৯২৯। অর্থাৎ ৩১ লক্ষের বেশি ভোটার কমেছে, যা মোটের প্রায় ৫.৭৪ শতাংশ হ্রাস।

রেখচিত্র ৩: রাজস্থানে ভোটারসংখ্যা বৃদ্ধি। লাল বিন্দু দিয়ে আঁকা রেখাটি দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা চিহ্নিত করে
পশ্চিমবঙ্গ
পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকার ইতিহাস গত ছয় দশকে এক বিশাল সম্প্রসারণের ছবি তুলে ধরে। ১৯৬২ সালে যেখানে মোট ভোটারের সংখ্যা ছিল ১,৮০,০৫,৬৩৫, সেখানে ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭,৬১,২৪,৭৮০। অর্থাৎ চারগুণেরও বেশি বৃদ্ধি।
১৯৬০-এর দশকের মাঝামাঝি, বিশেষ করে ১৯৬৫ ও ১৯৬৬ সালের নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধনের সময়, প্রকৃত ভোটারসংখ্যা ধারাবাহিকভাবে দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতার চেয়ে বেশি ছিল। ১৯৬২ সালের ভিত্তিসংখ্যা থেকে বেড়ে ১৯৬৭ সালে ভোটারের সংখ্যা দাঁড়ায় ২,০২,৪৯,১৬৯। অর্থাৎ শুরু থেকেই বাস্তব বৃদ্ধি অনুমিত প্রবণতার তুলনায় দ্রুত ছিল।
এই ধারা ১৯৭০-এর দশক পেরিয়ে ১৯৮০-এর দশক পর্যন্ত বজায় থাকে। ১৯৮৩-৮৪ সালের নিবিড় সংশোধনের পর ১৯৮৪ সালের নির্বাচনে ভোটারের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩,২৯,৫৫,৬৪৩— যা দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতার তুলনায় স্পষ্টভাবে বেশি। প্রত্যাশিতভাবেই ১৯৮৯ সালে ভোটারের সংখ্যা বেড়ে হয় ৪,০৪,১৪,৭৬১।
১৯৯২, ১৯৯৩ ও ১৯৯৫ সালে নিবিড় সংশোধন হয়, তবুও ভোটারসংখ্যা দীর্ঘমেয়াদি অনুমানের উপরে অবস্থান করে। ১৯৯৬ সালে ভোটার সংখ্যা ছিল ৪,৫৫,৮৩,০৫৪; ১৯৯৮ সালে ৪,৬৮,৪৬,৫২৪; এবং ১৯৯৯ সালে ৪,৭৬,৪৯,৮৫৬— সব ক্ষেত্রেই প্রকৃত সংখ্যা প্রবণতা-রেখার উপরে ছিল।
২০০২, সালের নিবিড় সংশোধনের পর ২০০৪ সালের নির্বাচনে ভোটারের সংখ্যা নেমে আসে ৪,৭৪,৩৭,৪৩১-এ, যা ১৯৯৯ সালের তুলনায়ও কম। এর ফলে প্রথমবার প্রকৃত সংখ্যা দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতার নিচে চলে যায়। এই প্রবণতা ২০০৯ সাল পর্যন্ত বজায় ছিল— সেই বছরে ভোটারের সংখ্যা ছিল ৫,২৪,৯৩,১৬৮, সংখ্যাটা অনুমিত প্রবণতার নিচেই।
এরপর সাম্প্রতিক দশকে আবার দ্রুত বৃদ্ধির ধারা ফিরে আসে। ২০১৪ সালে ভোটারের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৬,২৮,৩৩,১১৩; ২০১৯ সালে ৭,০০,০১,২৮৪; এবং ২০২৪ সালে পৌঁছে যায় ৭,৬১,২৪,৭৮০-এ। ফলে প্রকৃত ভোটারসংখ্যা আবার দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতার উপরে উঠে যায় এবং নতুন করে দ্রুত সম্প্রসারণের ইঙ্গিত দেয়।

রেখচিত্র ৪: পশ্চিমবঙ্গে ভোটারসংখ্যা বৃদ্ধি। লাল বিন্দু দিয়ে আঁকা রেখাটি দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা চিহ্নিত করে
চারটি রাজ্যের তুলনামূলক চিত্র
চার রাজ্যে ভোটার তালিকার দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন
পশ্চিমবঙ্গ, তামিলনাড়ু, রাজস্থান ও ওডিশা— এই চারটি রাজ্যের ভোটার তালিকার তুলনামূলক বিশ্লেষণ দেখায় যে ১৯৬২ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত সময়ে সব রাজ্যেই মোট ভোটারের সংখ্যা সামগ্রিকভাবে ঊর্ধ্বমুখী ছিল। পশ্চিমবঙ্গে সবচেয়ে বড় মোট বৃদ্ধি দেখা যায়। ১৯৬২ সালে যেখানে ভোটারের সংখ্যা ছিল ১,৮০,০৫,৬৩৫, তা ২০২৪ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৭,৬১,২৪,৭৮০-এ। তামিলনাড়ু ১৯৬২ সালে পশ্চিমবঙ্গের তুলনায় সামান্য বেশি ভোটারসংখ্যা (১,৮৬,৭৫,৪৩৬) নিয়ে শুরু করলেও ২০২৪ সালে সেখানে মোট ভোটার দাঁড়ায় ৬,২৪,০৪,৯৪৭— পশ্চিমবঙ্গের তুলনায় কম। রাজস্থানে আপেক্ষিক বৃদ্ধির হার সবচেয়ে বেশি; প্রায় ১ কোটি ৩ লক্ষ ভোটার থেকে বেড়ে তা পাঁচগুণেরও বেশি হয়ে ৫ কোটি ৩৫ লক্ষে পৌঁছেছে। ওডিশা চারটির মধ্যে সবচেয়ে ছোট রাজ্য হিসেবেই রয়ে গেলেও সেখানেও ভোটারসংখ্যা ৮৭ লক্ষ থেকে বেড়ে ৩ কোটি ৩৭ লক্ষে পৌঁছেছে।
প্রবণতা-রেখা ও বাস্তব ভোটারসংখ্যার সম্পর্ক
পরিসংখ্যানগত প্রবণতা-রেখা (trend line) ও বাস্তব ভোটারসংখ্যার সম্পর্ক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে চারটি রাজ্যের অভিজ্ঞতায় কয়েকটি সাধারণ ধারা রয়েছে, বিশেষ করে নিবিড় সংশোধন (intensive revision) পর্বগুলিতে। বহু সময়েই ভোটারসংখ্যা স্বাভাবিক বৃদ্ধির ধারাকে অনুসরণ না করে হঠাৎ উল্লম্ফন বা পতনের মধ্যে দিয়ে গেছে।
১৯৮৭-৮৯ সালের উল্লম্ফন
১৯৮০-র দশকের শেষভাগে নিবিড় সংশোধনের পর চারটি রাজ্যেই বাস্তব সংখ্যা প্রবণতারেখার অনেক ওপরে উঠে যায়। পশ্চিমবঙ্গে ১৯৮৯ সালে ভোটারসংখ্যা লাফিয়ে ৪,০৪,১৪,৭৬১-এ পৌঁছায়। একই বছরে তামিলনাড়ুতে ভোটারসংখ্যা দাঁড়ায় ৪,০০,২৭,২১২ এবং রাজস্থানে ২,৫৮,১৪,৫১৫। এর কারণ আমরা আগেই আলোচনা করেছি।
২০০০-এর দশকের গোড়ায় সংশোধন ও নিম্নগতি
২০০২, ২০০৩ ও ২০০৪ সালের নিবিড় সংশোধনের পর চিত্রটি আবার বদলে যায়। পশ্চিমবঙ্গ, ওডিশা ও রাজস্থানে বাস্তব ভোটারসংখ্যা প্রবণতারেখার নিচে নেমে আসে। পশ্চিমবঙ্গে ২০০৪ সালে ভোটারের সংখ্যা (৪,৭৪,৩৭,৪৩১) ১৯৯৯ সালের সংখ্যার (৪,৭৬,৪৯,৮৫৬) চেয়েও কমে যায়। রাজস্থানে এই নিম্নমুখী ধারা শুরু হয় আরও আগে, ১৯৯৮ সাল থেকেই। তামিলনাড়ুতে পতন কিছুটা পরে এসে ২০০৯ সালে সবচেয়ে স্পষ্ট হয়, যখন ভোটারসংখ্যা কমে দাঁড়ায় ৪,১৬,২০,৪৬০— যদিও একই সময়ে মোট জনসংখ্যা বৃদ্ধি অব্যাহত ছিল।
২০১৪-২৪: সাম্প্রতিক দ্রুত বৃদ্ধি
২০১৪ সালের পর থেকে চারটি রাজ্যেই ভোটারসংখ্যা আবার দ্রুতগতিতে বাড়তে শুরু করে এবং বহু ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা রেখাকে ছাড়িয়ে যায়। পশ্চিমবঙ্গে বর্তমান ৭ কোটি ৬১ লক্ষ ভোটার দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতার তুলনায় সবচেয়ে বড় ব্যবধান তৈরি করেছে। রাজস্থানেও সাম্প্রতিক বৃদ্ধি অত্যন্ত খাড়া; ২০২৪ সালে ভোটারসংখ্যা ৫ কোটি ৩৫ লক্ষে পৌঁছেছিল, যা ঐতিহাসিক পরিসংখ্যানগত গড় বৃদ্ধির হারকে উল্লেখযোগ্যভাবে অতিক্রম করেছিল। সাম্প্রতিক সংশোধনের পরে এটা কমে দাঁড়িয়েছে ৫,১৫,১৯,৯২৯। অর্থাৎ ৩১ লক্ষের বেশি ভোটার কমেছে, যা মোটের প্রায় ৫.৭৪ শতাংশ হ্রাস।
জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও ভোটারসংখ্যার তুলনা
জনগণনার তথ্যের সঙ্গে ভোটার তালিকার এই পরিবর্তন তুলনা করলে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য সামনে আসে। ১৯৫১ থেকে ২০১১ পর্যন্ত চার রাজ্যেই জনসংখ্যা ধীরে, স্থির ও পূর্বানুমেয় গতিতে বেড়েছে। পশ্চিমবঙ্গে জনসংখ্যা ২ কোটি ৬৩ লক্ষ থেকে বেড়ে ৯ কোটি ১২ লক্ষে পৌঁছেছে; তামিলনাড়ুতে তা ২০১১ সালে ৭ কোটি ২১ লক্ষ; রাজস্থানে ১ কোটি ৫৯ লক্ষ থেকে বেড়ে ৬ কোটি ৮৫ লক্ষ; এবং ওডিশায় ৪ কোটি ১৯ লক্ষে পৌঁছেছে। এই বৃদ্ধির রেখা মোটামুটি মসৃণ ও ধারাবাহিক।
কিন্তু ভোটার তালিকায় একই ধরনের স্থিরতা দেখা যায় না। পশ্চিমবঙ্গে ২০০৪ সালের পতনের পর অল্প সময়ে দ্রুত বৃদ্ধি ঘটে। তামিলনাড়ুতে জনসংখ্যা বাড়লেও ২০০৯ সালে ভোটারসংখ্যায় বড় ধস দেখা যায়। রাজস্থানে ওঠানামার পর সাম্প্রতিক দ্রুত সম্প্রসারণ লক্ষ করা যায়।

রেখচিত্র ৫: সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলিতে জনসংখ্যা বৃদ্ধি
সব তথ্য একত্রে বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয় যে ভোটারসংখ্যার বৃদ্ধি সবসময় জনগণনার জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে সরাসরি প্রতিফলিত করে না। জনগণনা যেখানে ধীর ও স্বাভাবিক জনসংখ্যা পরিবর্তনের ধারাবাহিক চিত্র তুলে ধরে, সেখানে ভোটার তালিকায় বারবার প্রশাসনিক সংশোধন, তালিকা “পরিশোধন”, এবং আকস্মিক বৃদ্ধির প্রবণতা দেখা যায়। ফলে বোঝা যায়, ভোটার তালিকার পরিবর্তন শুধুমাত্র জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের ফল নয়। এই নিবন্ধে ভোটার বাড়া-কমার কার্যকারণ ব্যাখ্যা করার কোনও চেষ্টা করা হয়নি। সমাজবিজ্ঞানীরা যদি এই লেখা থেকে কারণ অনুসন্ধানে নেমে পড়েন, তবেই এ লেখা সার্থক।


শ্রী দিলীপ ঘোষ ভারী সুন্দর ভাবে তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ করেছেন ভোটার সংখ্যার বৃদ্ধির হার, জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার এবং লিঙ্গ ভিত্তিক বিভাজনের হার। স্পষ্টতঃই দেখা যাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের বেলায় অঙ্কটা কোন নিয়মে খাপ খাচ্ছে না। রাজস্থান ও তামিলবাড়ুর ক্ষেত্রে সামান্য ব্যতিক্রম থাকলেও অস্বাভাবিক নয়। তবে উড়িষ্যা কিন্তু অঙ্কের মধ্যেই আছে।
ভাবনার বিষয়।