শেভ্রন বনাম স্টিভেন ডনজিগার— বৃষ্টি-অরণ্যের জন্য অসম লড়াই

শুভাশিস ঘোষাল

 



লেখক নর্থ ক্যারোলাইনা স্টেট ইউনিভার্সিটিতে রাশিবিজ্ঞানের শিক্ষক

 

 

 

গত বছর পয়লা অক্টোবর আমেরিকার খবরের কাগজে ছোট শিরোনামের একটা খবর থেকে জানা গেল, স্টিভেন ডনজিগার নামে এক আইনজীবীর ছ মাসের কারাদণ্ড হয়েছে। কোনও ফৌজদারি মামলা নয়, সেই আইনজীবী আদালতকে তাঁর কম্পিউটারে রাখা তথ্য জানাতে অস্বীকার করেছেন, তাই। কিন্তু, কে সেই আইনজীবী? কার করা মামলার ভিত্তিতে, আদালত কেন তাঁর কম্পিউটারে রাখা তথ্য দেখতে চাইছে? খবরে প্রকাশ, মামলাকারী একটি সুবৃহৎ আমেরিকান বহুজাতিক তেল কোম্পানি, শেভ্রন। তা, শেভ্রনের এক ব্যক্তিবিশেষের প্রতি এ-হেন বিদ্বেষের কারণ কী? আদালতই বা ডনজিগারকে এত কড়া শাস্তি দিচ্ছে কেন?

আসলে ইনি কোনও সাধারণ আইনজীবী নন, একজন পরিবেশ আন্দোলনকারী তারকা আইনজীবী, যিনি ২০১১ সালে শেভ্রনের বিরুদ্ধে ইকুয়েডরের আদালতে সাড়ে নশো কোটি ডলারের একটা মামলা জেতেন। তেল কোম্পানির গাফিলতির ফলে তেল ছড়িয়ে পড়েছিল। ইকুয়েডরে আমাজন বৃষ্টি-অরণ্যকে মারাত্মকভাবে দূষিত করার, ও সেখানকার আদিবাসীদের জীবন বিপন্ন করার জন্য আদালত এই আদেশ দেয়। ঘটনার সূত্রপাত অবশ্য ১৯৭০ সাল থেকে, যখন টেক্সাকো তেল কোম্পানি ইকুয়েডরের জাতীয় সংস্থা পেট্রোইকুয়েডরের সঙ্গে একযোগে ড্রিলিং করত আমাজন বৃষ্টি-অরণ্যে। বর্জ্যদ্রব্য বিন্যস্ত করার সুরক্ষাবিধি অনুযায়ী মাটির গভীরে পুঁতে রাখার বদলে ওয়েস্ট পিটগুলো উপচে পড়া রুখতে তারা আমাজন বাস্তুতন্ত্রে বর্জ্য ঢেলেছে, স্রেফ খরচ কমানোর উদ্দেশ্যে। কুড়ি বছর ধরে টেক্সাকো অন্তত ষোলোশো কোটি গ্যালন বর্জ্য ছড়িয়েছে। তার ফলে সেখানে বসবাসকারী তিরিশ হাজার আদিবাসীদের জীবন ও জীবিকা বিপন্ন হয়েছে। এমনকী যেসব জায়গা তেল-দূষণের থেকে নিরাপদ মনে করা হত, সেখানে পর্যন্ত মাটি খুঁড়লে বর্জ্য তেল পাওয়া যাচ্ছে। বেঞ্জিন ও পারদের মতো দূষিত পদার্থ জলে মিশে তা পানের অযোগ্য হয়ে গেছে। এখন সেখানে ঘরে ঘরে ক্যান্সার, বাচ্চাদের বৃদ্ধি বন্ধ হয়ে গেছে অনেক ক্ষেত্রে, গবাদি পশু মারা গিয়েছে অসংখ্য। এই ঘটনা ‘আমাজনের চের্নোবিল’ বলে আখ্যায়িত হয়েছে।

‘পৃথিবীর ফুসফুস’ আমাজন বৃষ্টি-অরণ্য শুধু ইকুয়েডর বা ব্রাজিলই নয়, সারা পৃথিবীর পরিবেশের জন্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তথ্যচিত্র পরিচালক জো বার্লিংগার ২০০৯ সালে ‘Crude’ নামে একটা তথ্যচিত্র বানান এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে, তাতে ওই অঞ্চলের প্রকৃতির ক্ষতি ও অদিবাসীদের দুর্দশার কথা তুলে ধরা হয়েছে। তবে কুড়ি বছর ধরে কিছুই সুরাহা হয়নি। পরিশুদ্ধির জন্য নাম-কা-ওয়াস্তে চার কোটি ডলার খরচ করে টেক্সাকো হাত ধুয়ে ফেলে, বিপর্যয়ের কোনও রকম আইনি দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করে।

এই প্রসঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই ১৯৮৪ সালের ভোপাল গ্যাস দুর্ঘটনার কথা মনে পড়ে। ডাউ কেমিক্যাল অত্যন্ত বিষাক্ত মিক গ্যাস তৈরির কারখানা বসিয়েছিল ঘন জনবসতিপূর্ণ এলাকায়। কারখানার সুরক্ষা ব্যবস্থাতেও অনেক গাফিলতি ছিল। একদিন দুর্ঘটনা ঘটে, গ্যাস ছড়িয়ে পড়ে চার হাজার (অন্য হিসেব অনুযায়ী ষোলো হাজার) লোক প্রাণ হারান, পাঁচ লক্ষেরও বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হন। আদালতে মামলায়, এবং পরে আদালত-বহির্ভূত ফয়সালায়, খুব সামান্য অর্থ খরচ করে ডাউ কেমিক্যাল পার পেয়ে যায়। তবে প্রচুরসংখ্যক লোকের ক্ষতি হলেও এবং দুর্ঘটনার মূল কারণ রক্ষণাবেক্ষণের অভাব হলেও, এক্ষেত্রে অন্তত যা ঘটেছিল তা নিছকই দুর্ঘটনা, ইকুয়েডরের ঘটনার মতো সচেতনভাবে বর্জ্য ফেলে দূষণ ছড়ানো নয়।

১৯৯৩ সালে পাঁচটি আমাজন আদিবাসী গোষ্ঠী সহ তিরিশ হাজার স্থানীয় অধিবাসী টেক্সাকোর বিরুদ্ধে পরিবেশ দূষণের অভিযোগে নিউ ইয়র্কের আদালতে মামলা দায়ের করে। স্থানীয় অধিবাসীদের হয়ে মামলায় অংশগ্রহণ করেন স্টিফেন ডনজিগার ও গোল্ডম্যান পরিবেশ পুরস্কারজয়ী আইনজীবী পাবলো ফাহার্দো। তবে টেক্সাকো সেই মামলা নিউ ইয়র্ক থেকে ইকুয়েডরে সরিয়ে আনে, কারণ তাদের ধারণা ছিল, ইকুয়েডরে বিচারব্যবস্থায় জুরি না থাকায় তাদের নিজেদের পক্ষে রায় পাওয়ার সম্ভাবনা নিউ ইয়র্কের চেয়ে বেশি।

ইতিমধ্যে ২০০১ সালে টেক্সাকোকে কিনে নেয় শেভ্রন, ফলে মামলার দায় শেভ্রনের ওপর বর্তায়। ২০০৬ সালে বামপন্থী অর্থনীতিবিদ রাফায়েল কোরিয়া ইকুয়েডরের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর মামলাটি বিশেষ প্রচার পায় ও মানুষ সচেতন হয়। প্রচুর বিখ্যাত মানুষ এসে পরিবেশের ক্ষতি নিজের চোখে দেখে যান। শেভ্রনের পরিকল্পনা ছিল, মামলা টানতে টানতে অভিযোগকারীদের নিঃস্ব করে দেওয়া, যা শেভ্রনের মতো বিরাট বহুজাতিক কোম্পানিরা প্রায় সবসময়ই করে থাকে। সেই সঙ্গে শেভ্রন প্রচারকাজ শুরু করে নিজেদের বৈজ্ঞানিকদের দিয়ে নিজেদের সপক্ষে যুক্তি সাজিয়ে। তাদের স্থির বিশ্বাস ছিল, আদালতকে টাকা ঢেলে হাত করে দুর্নীতি-অধ্যুষিত তৃতীয় বিশ্বের দেশ ইকুয়েডরে হওয়া মামলাকে কব্জা করতে তাদের বিশেষ বেগ পেতে হবে না। চিরকাল তারা সেভাবেই নিজেদের অনুকূলে সিদ্ধান্ত আদায় করেছে।

কিন্তু কিমাশ্চর্যম! ছোট্ট ইকুয়েডরের এক আদালত কিনা অগাধ অর্থ ও প্রভাবের অধিকারী শেভ্রনের বিরুদ্ধে রায় দিয়ে বসে! চার হাজার পাতার রায়ে বিচারপতি জানান, এই পরিবেশ বিপর্যয়ের দায়ভার পুরোপুরি শেভ্রনের। তাদের দু হাজার সাতশো কোটি ডলার ক্ষতিপূরণ দিতে হবে আমাজন বাস্তুতন্ত্রকে পরিষ্কার করা, আর ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের চিকিৎসা আর পুনর্বাসনে। পরে অবশ্য রায় পুনর্বিবেচনায় ক্ষতিপূরণের দায় কমিয়ে প্রথমে আঠারোশো কোটি, ও আবার পরে তাও কমিয়ে সাড়ে নশো কোটি ডলার করা হয়। আর এই রায় পেতে সওয়াল করেছিলেন স্টিভেন ডনজিগার। অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে তিনি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও সাক্ষী সংগ্রহ করেছিলেন। তিনি এবং তাঁর সহকারী আইনজীবীরা বহুদিন ধরে ধৈর্য ধরে ক্ষতিগ্রস্ত অধিবাসীদের তালিম দিয়েছিলেন, কী করে শেভ্রনের বাঘা বাঘা আইনজীবীদের জেরার জবাব দিতে হবে। বিচারের রায় জানার পর অধিবাসীরা ডনজিগারকে ঘিরে উচ্ছাসে-আবেগে ভেসে যায়।

 

এই লেখাটা এভাবেই শেষ করতে পারলে খুব ভাল হত। কিন্তু বাস্তবের পৃথিবীতে শেভ্রনের মতো বড় কোম্পানিদের এত টাকা, এত প্রভাব যে, তাদের বিরুদ্ধে কোনও প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরকে তারা দাঁড়াতে দেয় না। সাড়ে নশো কোটি ডলার শেভ্রনের পক্ষেও অনেক টাকা। তা ছাড়া এভাবে ক্ষতিপূরণ দিতে হলে পৃথিবীর অন্যত্র তারা যে দূষণ করে থাকে, সেসব জায়গাতেও আওয়াজ উঠবে ক্ষতিপূরণের। আর সবচেয়ে বড় কথা, এই রায় তাদের আত্মাভিমানে এক বিরাট ঘা। স্রেফ এক আইনজীবী আর ছোট্ট ইকুয়েডরের এক আদালত কিনা তাদের নাকে খৎ দেওয়াবে? তা কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না। ডনজিগারকে এমন শিক্ষা দিতে হবে যে, ভবিষ্যতে আর কেউ যেন তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে না পারে।

এরপর শেভ্রন কোনও ক্ষতিপূরণ দিতে অস্বীকার করে বলে যে, বাস্তুতন্ত্রকে পরিস্কার করার জন্য টেক্সাকো চার কোটি ডলার আগেই খরচা করেছে, তাই এই জরিমানার কোনও যুক্তি নেই। ইকুয়েডর থেকে তারা তাদের ব্যবসা গুটিয়ে ফেলে ও যাবতীয় সম্পদ তুলে নেয়। শেভ্রনের আইনজীবী রিকার্ডো ভেইগা দাবি করেন, ডনজিগার সাক্ষ্যে জালিয়াতি করেছেন শেভ্রনের থেকে টাকা আদায়ের উদ্দেশ্যে। সাক্ষীদের ঘুষ দিয়ে জোগাড় করেছেন। ডনজিগার সেই অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেন। শেভ্রন এমনকী আমেরিকার সরকারের কাছে উমেদারি করে ইকুয়েডরের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ করে দিতে, তবে সেই চেষ্টা ফলপ্রসূ হয়নি।

ইকুয়েডরের আদালতে তারা বিচার পাবে না, এই বলে শেভ্রন সেই রায়ের বিরুদ্ধে নিউ ইয়র্কের আদালতে মামলা করে। এই মামলার বিচারকের নাম লুইস কাপ্লান। বিচারক হওয়ার আগে তিনি বহুবছর কর্পোরেশনদের আইনজীবী হয়ে কাজ করেছেন। শেভ্রনে তাঁর বড়সড় বিনিয়োগও আছে। তিনি যে শেভ্রনের পক্ষপাতী, তা গোপন করার বিন্দুমাত্র চেষ্টাও করেননি। বরঞ্চ মন্তব্য করেন, “অর্থনীতিতে শেভ্রনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ,” যার মর্মার্থ হল তাদের শাস্তি দেওয়া মানে আমেরিকার অর্থনীতির ক্ষতি করা, তা তারা যা-ই করে থাকুক না কেন! তিনি ‘Crude’-এর পরিচালক জো বার্লিংগারকে তাঁর সমস্ত ফুটেজ জমা দিতে বলেন। ফুটেজে দেখা যায় ডনজিগার মন্তব্য করেছেন, “আমাদের রাজনৈতিক আন্দোলনের মাধ্যমে আদালতের উপর চাপ সৃষ্টি করতে হবে, কারণ আদালত শুধু আইন নয়, বাদী-বিবাদীপক্ষ কতটা শক্তিশালী, তাও দেখে।” শেভ্রন এই মামলায় আলবার্তো গুয়েরা নামক এক ইকুয়েডরীয় বিচারককে সাক্ষী হিসেবে উপস্থাপনা করে। গুয়েরা জানান, ডনজিগারের আইনি দল ইকুয়েডরের বিচারপতিদের ঘুষ দিয়েছে। এই দুই বক্তব্যের উপর ভিত্তি করে কাপ্লান ২০১৪ সালে রায় দেন, ডনজিগার ইকুয়েডরে শেভ্রনের বিরুদ্ধে যে রায় পেয়েছেন, তা অবৈধপথে পাওয়া, তাই অসিদ্ধ। শেভ্রনের তাই ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আর কোনও দায় নেই।

দেখা যাক, এই রায়ের ভিত্তি কতটা জোরালো। ডনজিগারের ‘রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করার’ যে মন্তব্য তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবহার হল, তাতে ভুল বা অনৈতিক কিছু নেই। অসাম্য, রাজনৈতিক জোর আর বৃহৎ পুঁজির সামনে দেশ-বিদেশের আদালতগুলি যে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ক্রীড়নক মাত্র, তাতে বিন্দুমাত্র অতিকথন নেই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই ফৌজদারি মামলাগুলোর রায় প্রায়ই বিসদৃশভাবে গরিব ও কৃষ্ণাঙ্গদের বিরুদ্ধে যায়। তারা জনসংখ্যার অনুপাতে বেশি হারে দোষী সাব্যস্ত হয় তো বটেই, একদম একই অভিযোগে শাস্তির মাত্রার বিরাট তফাৎও হয়। সাম্প্রতিককালে কাইল রিটেনহাউস বলে একটি সতের বছরের শ্বেতাঙ্গ ছেলে পাশের রাজ্যে গিয়ে ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ আন্দোলনকারীদের দুজনকে অ্যাসল্ট রাইফেল থেকে গুলি চালিয়ে খুন করে এবং একজনকে মারাত্মকভাবে জখম করেও এই যুক্তিতে পার পেয়ে যায় যে, সে নিজেকে বিপন্ন মনে করেছিল প্রতিবাদকারী জনতার সামনে। একদল উগ্র সমর্থককে উসকে আইনসভার ওপর হামলা করিয়ে, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচনের ফলাফলকে উলটে দেওয়ার চেষ্টা করে সরাসরি দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ডনাল্ড ট্রাম্প এখনও বহাল তবিয়তে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। আদালতে অভিযুক্ত হলেও তাঁর জেল হবেই, এমন কথা জোর দিয়ে বলা যাচ্ছে না। আমাজনের এই মামলায় যেখানে তিরিশ হাজারেরও বেশি প্রান্তিক মানুষ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত এবং আরও বহু মানুষের ভাগ্য জড়িত, সেখানে আর্থিকভাবে অসীম ক্ষমতাশালী এক কর্পোরেশনের বিরুদ্ধে সমানে সমানে লড়তে হলে গণআন্দোলনের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা আছেই, কারণ সেটা কোনও সাধারণ মামলা নয়, অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জনস্বার্থ সম্পর্কিত মামলা।

দ্বিতীয় অভিযোগটা অবশ্যই গুরুতর, তবে তা প্রমাণিতভাবে মিথ্যার উপর প্রতিষ্ঠিত। গুয়েরা এই সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য শেভ্রনের কাছ থেকে কুড়ি লক্ষ ডলার নিয়েছিলেন, এবং পরে চাপের মুখে স্বীকার করেন যে, তিনি টাকা নিয়ে ডনজিগারের বিরুদ্ধে মিথ্যে ঘুষের অভিযোগ করেছিলেন। অথচ এই একটিমাত্র সাক্ষীর অভিযোগের ভিত্তিতে বিচারক কাপ্লান শেভ্রনকে অব্যাহতি তো দিলেনই, তার ওপর বেনজিরভাবে ডনজিগারকে ঘুষ দেওয়ায় অভিযুক্ত করলেন, যদিও এই মামলা আদৌ ঘুষ সম্পর্কিত ছিলই না। ডনজিগারের আইনচর্চার অধিকারও কেড়ে নেওয়া হয়। ২০১৮ সালে কাপ্লানের রায় অনুমোদিত হয়।

শেভ্রন অবশ্য এখানেই থেমে রইল না। বিচারক যখন পকেটে, তখন ডনজিগারকে সম্পূর্ণ শায়েস্তা করতে হবে। ব্যক্তিবিশেষের বিরুদ্ধে এক বৃহৎ কর্পোরেশনের বেমানান প্রতিহিংসায় শেভ্রন কাপ্লানের এজলাসে আবেদন করে, ডনজিগারকে তাঁর কম্পিউটারের যাবতীয় তথ্য জমা দিতে হবে। কাপ্লানও সঙ্গে সঙ্গে সম্মতি দেন সে আবেদনে। কিন্তু ডনজিগার আপত্তি জানিয়ে বলেন, এতে এক আইনিজীবী আর তাঁর মক্কেলদের যোগাযোগের গোপনীয়তার অঙ্গীকার ক্ষুণ্ণ হবে, শেভ্রন অনৈতিকভাবে তথ্য পাবে। তিনি জানান, তিনি আদালতের এই নির্দেশ মানতে অস্বীকার করছেন, তবে যদি মক্কেলের তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষার রীতিনীতি মানা হয়, তবে তিনি ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের তাঁর কম্পিউটার পরীক্ষা করতে দেবেন।

এর পর সম্পূর্ণ নজিরবিহীন এক নির্দেশে কাপ্লান একটি বেসরকারি আইনি সংস্থাকে নিয়োগ করেন ডনজিগারকে আদালত অবমাননার ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত করতে। যে সরকারি কৌঁসুলিকে দায়িত্ব দেওয়া হয় চার্জশিট দিতে, তিনি যে আইনি-সংস্থায় আগে কাজ করেছেন, তারা শেভ্রনের হয়ে মামলা লড়েছে। মামলাটি নিউ ইয়র্কের আর একটি জেলা আদালতে বিচারক লরেটা প্রেসকার এজলাসে দায়ের করা হয়। এই বিচারক ফেডারেশন সোসাইটি নামে শেভ্রনের অর্থপুষ্ট একটি সংস্থার উপদেষ্টা পদে আসীন ও শেভ্রনের দ্বারা আর্থিকভাবে উপকৃত। তা সত্ত্বেও তিনি এই মামলায় বিচারক নিযুক্ত হলেন! আইন ও বিচারব্যবস্থার ওপরতলায় প্রভাব খাটানো অন্য বেশিরভাগ দেশে গর্হিত দুর্নীতি বলে গণ্য হবে, কিন্তু আমেরিকায় ‘লবিইং’ নাম দিয়ে আইনসিদ্ধভাবে কর্পোরেশনগুলি তাদের প্রভাব খাটিয়ে চলে বছরের পর বছর। ফলে তাদের স্বার্থবিরোধী আইন বা রায় বেরোয় না। কাপ্লান, প্রেসকা এবং শেভ্রনের আইনজীবীদের মধ্যে একাধিক বৈঠক হয়েছিল বলে প্রমাণ আছে। বিচারকের আসনে বসে প্রেসকার আচরণ খুবই দৃষ্টিকটু। মামলার শুনানির সময় তাঁকে খবরের কাগজ পড়তে দেখা গেছে। বার বার করে ডনজিগারের আইনজীবীদের চুপ করতে বলেছেন। রায় দেওয়ার সময় অদ্ভুতভাবে জাতীয় পতাকায় মুখ ঢেকে রেখেছিলেন। বোঝাই যাচ্ছে, খুবই পরিকল্পনামত ডনজিগারকে শিক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে এই মামলাগুলো সাজানো হয়েছিল। ডনজিগারও বিচারকের আচরণ দেখে প্রেসকার এজলাসে সাক্ষ্য দিতে অস্বীকার করেন।

তো, প্রেসকা কী রায় দিলেন? আদালত অবমানয়ায় ডনজিগার দোষী, তাঁকে ছ মাসের জেল হেফাজতে পাঠানো হবে। তার আগে গৃহবন্দি হয়ে থাকতে হবে, যতদিন না রায়ের এই আদেশ অনুমোদিত হয়। এছাড়াও আট লক্ষ ডলারের বেল বন্ড সই করতে হয়েছে তাঁকে। ২০২১ সালের অক্টোবরে ডনজিগারের কারাদণ্ড অনুমোদন হয় ও ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে এই দণ্ডাদেশ কার্যকর হয়। অবশ্য ৪৫ দিন জেলে কাটানোর পর নিউ ইয়র্ক রাজ্যের কোভিড নীতির জন্য জেল থেকে ছাড়া পেয়ে বাকি মেয়াদ গৃহবন্দি কাটাচ্ছেন।

জেলে যাওয়ার আগে ছেলের কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছেন স্টিভেন ডনজিগার

যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নেওয়া হয় ডনজিগার মিথ্যা সাক্ষ্যপ্রমাণের জোরে মামলার সুবিধাজনক রায় পেয়েছিলেন, তা হলেও এই অপরাধে ছ মাসের বেশি কারাদণ্ড হয় না, কারণ এটি একটি ‘মিসডেমিনার’ মাত্র, ‘ফেলোনি’ নয়। ডনজিগারকে দু বছরেরও বেশি গৃহবন্দি থাকতে হয়েছে, যা এই ধরনের মামলায় আইন অনুমোদিত সর্বোচ্চ শাস্তির চেয়ে বেশি, অর্থাৎ এতদিন অন্তরীণ রাখার আদেশটাই বেআইনি। নতুন করে তাঁর আর কারাদণ্ড তো হয়ই না। তবে বিচারক প্রেসকা মানতেই চাননি যে, গৃহবন্দি থাকাটাও একটা শাস্তি, কারণ তাঁর মতে “আইনের সবক শিখতে ডনজিগারের জেলে যাওয়া দরকার।” আর মিসডেমিনারের জন্য আট লক্ষ ডলারের বেল বন্ড নজিরবিহীন। এতসব না সত্ত্বেও তবু এরকম ঘটল, আমেরিকারই মাটিতে, যে দেশ সংবিধানে “সকল মানুষের সমান অধিকার আর আইনের চোখে সবাই সমান, কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়”— এই নীতিগুলোর কথা গলা বাজিয়ে বলে। আসলে এই ধরনের নীতিগুলো মানা হয় ততক্ষণই, যতক্ষণ তা প্রভাবশালী শক্তির বিরুদ্ধে না যাচ্ছে।

 

আমেরিকায় বিচারব্যবস্থার একটা খুব খারাপ দিক হল পার্টিজানশিপ— বিচারকদের প্রতিটি রায়ই নির্ভর করে তিনি উদারপন্থী না রক্ষণশীল— তার ওপর। সাম্প্রতিককালে গর্ভপাতের অধিকার নিয়ে আমেরিকার সুপ্রিম কোর্টের রায় বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়। রিপাবলিকান এবং ডেমোক্র্যাটিক দল উভয়েই বিচারপতির মনোনয়নে এবং নিয়োগে সম্মতি ভোট দিতে নিজেদের লোককে দেখে। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা, বড় কর্পোরেশনগুলো তাদের বিপুল আর্থিক ক্ষমতার জোরে দুই তরফেরই প্রায় সব বিচারকদের এবং বিভিন্ন সরকারি দফতরকে নিজেদের প্রভাবে এমন আচ্ছন্ন করে রেখেছে যে, তাদের স্বার্থবিরোধী রায় কোনও বিচারক প্রায় কখনওই দিতে পারেন না। একমাত্র প্রবল জনমতের চাপ এলে তবেই কর্পোরেট স্বার্থবিরোধী রায় পাওয়া সম্ভব হতে পারে। নিজের সম্ভাব্য শাস্তির কথা জেনেও মক্কেলের অধিকার রক্ষা করতে আদালতের অনৈতিক নির্দেশ না মানার এই দৃঢ়তা সহজ নয়।

আমেরিকায় বেশিরভাগ সংবাদপত্র আর টেলিভিশন চ্যানেল ডনজিগারের মামলা নিয়ে তেমন উচ্চবাচ্য করেনি। ‘পুঁজিবাদের দৈনিক বাইবেল’ বলে পরিচিত মাল্টি-বিলিয়নেয়ার রুপার্ট মার্ডকের সংবাদপত্র ‘ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’ বেশ উল্লসিত “তাঁর প্রাপ্য শাস্তি পাওয়ায়”। তারা ডনজিগারকে জালিয়াত বলে চিহ্নিত করেছে সেই প্রমাণিত মিথ্যা সাক্ষ্যকে ভিত্তি করে। দক্ষিণপন্থী ছোটখাট সংবাদপত্র ও টেলিভিশন চ্যানেলগুলো ডনজিগার দুর্নীতিগ্রস্ত, লোভী, উদারপন্থীদের চোখের মণি, বামপন্থী নৈরাজ্যবাদী বলে মুণ্ডপাত করতে লেগেছে। বলা বাহুল্য, এইসব সংবাদমাধ্যম কর্পোরেট দাক্ষিণ্যে চলে, এদের মালিকেরা সাধারণত কোনও বড়সড় শিল্পপতি হয়ে থাকেন। এমনকি উদারপন্থী প্রতিষ্ঠান বলে পরিচিত, যার জন্য রক্ষণশীলদের ক্রমাগত আক্রমণের লক্ষ্য যারা, সেই ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’ও সাত বছর ধরে চলা ডনজিগারের মামলা নিয়ে মাত্র দুটো প্রবন্ধ লিখেছে, এবং শেষ প্রবন্ধে প্রকারান্তরে “দুপক্ষই দোষী” ধরনের গা বাঁচানো মন্তব্য করেছে। তাদের মতে, ডনজিগার নাকি স্বীকার করেছেন যে, তিনি ইকুয়েডরে মামলা পুরো সোজা পথে লড়েননি, এবং তার ফলেই নাকি ইকুয়েডরের ক্ষতিগ্রস্তরা তাদের প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত হয়েছে। সেই প্রবন্ধে নিউ ইয়র্ক টাইমস স্পষ্ট করে বলেনি, কী কারণে তারা এরকম মতামত পোষণ করে, তবে সেই প্রবন্ধ থেকে মনে হচ্ছে তারা ডনজিগারের বলা একটা কথা “ইকুয়েডরে আমাদের মামলা সাজানোতে দুয়েকটা ভুল হয়েছে, না হলে আমরা আরও ভালভাবে ওই মামলা জিততে পারতাম” বোঝাতে চেয়েছে। এই কথা থেকে কিন্তু মনে হয় একজন মানুষের নিজের কাজের পর্যালোচনা করছেন, যেমন একজন লেখক, শিল্পী বা খেলোয়াড় করে থাকেন— বেআইনি পথ নেওয়ার স্বীকারোক্তি বলে মনে হয় না। কিন্তু নিউ ইয়র্ক টাইমসের এইরকম অবস্থান নেওয়ার কারণ কী? আসলে তারাও তো কর্পোরেট সংস্থাই। তবে নিউ ইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে ডনজিগারের প্রতি প্রতিহিংসায় শেভ্রন বড় বেশিদূর এগিয়েছে, যা আদপে ডনজিগারকেই নায়ক করে তুলবে।

তবে মূল ধারার সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা যাই হোক না কেন, ইউটিউবার আর ব্লগাররা কিন্তু ঘটনাপ্রবাহকে তুলে ধরেছে। তাদের থেকে জানা গেছে কীভাবে একটা বিরাট কর্পোরেট সংস্থা পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করার পর তাদের টাকার জোরে আদালতের সঙ্গে যোগসাজশে ডনজিগারের ওপর প্রতিশোধ নিচ্ছে। বিভিন্ন প্রগতিশীল সংগঠন ও পরিবেশ আন্দোলনকারীরা ডনজিগারের সমর্থনে এগিয়ে এসেছে ও শেভ্রনের বিরুদ্ধে মামলা লড়ার টাকা তুলেছে। রাষ্ট্রসঙ্ঘের আইনি বিশেষজ্ঞরা মন্তব্য করেছেন ডনজিগারের কারাদণ্ডের নির্দেশ খেয়ালখুশিমতো এবং বেআইনি— বিচারব্যবস্থা এবং প্রশাসনে বৃহৎ পুঁজির কুপ্রভাবে ঘটেছে। আমেরিকার সরকারের উচিত এই মামলায় হস্তক্ষেপ করে ডনজিগারকে ছাড়িয়ে আনা। ঊনত্রিশজন নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী ডনজিগারের মামলাকে আইনি হেনস্থা বলে উল্লেখ করে তাঁর মুক্তির দাবি জানিয়েছেন। মানবাধিকার সংগঠনগুলি শেভ্রনের করা মামলাকে জনস্বার্থের বিরুদ্ধে কৌশলী মামলা হিসেবে অভিহিত করেছে। ডেমোক্র্যাটিক দলের প্রগতিশীল অংশ আমেরিকার  অ্যাটর্নি জেনারেল মেরিক গারল্যান্ডের কাছে চিঠি লিখে আদালতে বেনিয়মের অভিযোগ তুলে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে। ট্যুইটারে #freedonzinger হ্যাশট্যাগে প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়েছে। রাষ্ট্রপতি বাইডেনকে অনুরোধ করা হয়েছে তাঁর বিশেষ ক্ষমতাবলে ডনজিগারকে মার্জনা করে কারাদণ্ড থেকে অব্যহতি দিতে। তবে ডেমোক্র্যাটিক দলের হাতে প্রশাসন থাকা সত্ত্বেও প্রশাসনের তরফ থেকে কোনও উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

স্টিভেন ডনজিগার হার্ভার্ড-এর আইনবিভাগ থেকে পাশ করেছিলেন। এই বিখ্যাত আইন বিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে কর্পোরেট সংস্থার হয়ে কাজ করে আইনজীবীরা কোটি কোটি ডলার রোজগার করে থাকেন। কিন্তু ডনজিগার পরিবেশ ও ক্ষমতাহীন মানুষদের হয়ে কর্পোরেশনদের বিরুদ্ধে লড়ার কঠিন পথ বেছে নেন। ম্যানহাটনের একটা সাধারণ দুই কামরার ফ্ল্যাটে স্ত্রী ও এক ছেলেকে নিয়ে খুব সাধারণ জীবনযাপন করেন। জেলে যাওয়ার আগে ছেলেকে আলিঙ্গন করে তাঁর বিদায় নেওয়ার ছবি দেখে বহু মানুষ আপ্লুত হয়েছেন। জেলে যাওয়ার সময় তিনি বলেছেন, “যাই ঘটুক না কেন, আমি ঠিকই থাকব, এই পর্যায় পেরিয়ে আসব। ইকুয়েডরের মানুষেরা বিচার পাননি, তাঁদের সাহায্য করা দরকার।“

কিন্তু, ইনসাফ কোথায়?


হেডার: আমাজনের আদিবাসীদের সঙ্গে কথা বলছেন স্টিভেন ডনজিগার

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 5395 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*


This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.