চার্লি ও চ্যাপলিন— জীবন গতিশীল, তাই প্রগতি

শুভদীপ ঘোষ

 


প্রকৃতপক্ষে চলচ্চিত্রের আদি যুগে যে কজন বিরল প্রতিভাধর স্রষ্টার সৃষ্ট চলচ্চিত্রকে নাটক ও সাহিত্যের মধ্যবর্তী স্থানে উপনীত করেছিল চ্যাপলিন তাঁদের মধ্যে প্রধান বললেও অত্যুক্তি হয় না। ভঙ্গি, বেশভূষা, চরিত্রচিত্রণ সব কিছুর মধ্যে শুরু থেকেই তার স্রষ্টা-সুলভ সাক্ষর বিদ্যমান, রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, “বানিয়ে তোলা জিনিশ নয়, হয়ে ওঠা পদার্থ।” শিল্পের এই আদ্যন্ত মৌলিক রূপ তাঁর চলচ্চিত্রগুলিকে যেমন দিয়েছে বিশুদ্ধতার স্বীকৃতি তেমনই তাঁর প্রতিভাকে করে তুলেছে শেক্সপিয়ারের সমতুল্য! কারণ তিনিও শেক্সপিয়ারে মতোই বাণিজ্যের চলতি সবগুলি প্রথা মেনে নিয়েও স্তর-বহুল শিল্পী হতে পেরেছিলেন

 

চার্লির কথা ১

বাবা ছিল গায়ক ও অভিনেতা। ভালো গানের গলা ছিল, নামডাক ছিল। আমাদের এখানে বাণিজ্যিক রঙ্গমঞ্চ যেরকম ছিল কতকটা সেরকমই ছিল লন্ডনের মিউজিক হল বা আমেরিকার ভদেভিল। শিক্ষিত বুদ্ধিজীবীদের গ্রুপ থিয়েটারের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা জাতের। সাধারণ মানুষের আনাগোনা লেগে থাকত, সারা শহর ঘুরে ঘুরে হত নাটক, গান, সার্কাস, মাইম, বক্তৃতা, জিমনাস্টিক এমনকি সম্মোহন-জাতীয় ব্যাপার-স্যাপারও। ভীষণ জনপ্রিয় এই প্রদর্শনগুলিতে দর্শকরা নেমে এসে বিপুল উৎসাহে শিল্পীদের সঙ্গে যোগ দিত, চলত দেদার মদ্যপান। বাবা ছিল এইরকমই ঘোর মদ্যপ। নাম চার্লস স্পেন্সার চ্যাপলিন সিনিয়র। চার্লির যখন বারো বছর বয়স তখন তার বাবা এই মদ্যপানজনিত অসুখে মারা যায়, মৃত্যুর সময় বাবার বয়স ছিল সাঁইত্রিশ। সম্পর্ক বলতে যা বোঝায়, বাবার সঙ্গে চার্লি ও তার দাদা সিডনির তা একেবারেই ছিল না। কয়েকবারের কিছু সাক্ষাৎ বাবার স্মৃতি হিসেবে থেকে গিয়েছিল তাদের মনে। তথাপি চ্যাপলিনের ছবিতে তাঁর বাবার প্রভাব আছে নানাভাবে। মা ছিল বাবার মতোই ব্রিটিশ মিউজিক হলের গায়িকা ও অভিনেত্রী। মাত্র ষোলো বছর বয়সে তার শিল্পীজীবন শুরু হয়। নাম হানা পেডলিংহাম চ্যাপলিন। বিজ্ঞাপনে বা হ্যান্ডবিলে ‘লিলি হার্লি’ নাম দেখা যেত। ওই কম বয়সেই হানা চ্যাপলিন সিনিয়রের প্রেমে পড়ে। ১৮৮৩ নাগাদ সিডনি হকস বলে একজনের সঙ্গে তার সম্পর্ক হয়, হকস তাকে সোনার খনি-সমৃদ্ধ সাউথ আফ্রিকার উইটওয়াটারস্ট্রান্ডে নিয়ে যায়। এখানে তাকে বেশ্যাবৃত্তি করতে বাধ্য করা হয়। এর অল্পকাল পরেই হানা অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় পুনরায় ব্রিটেন ফিরে আসে। জন্ম হয় সিডনি হকসের ছেলে সিডনি চ্যাপলিনের। উত্তর ফ্রান্সের লে হেভরের রয়াল মিউজিক হলে শুরু হয় পুনরায় গান গাওয়া। ব্রিস্টল, ডাবলিন, গ্লাসগো, বেলফাস্টে তার গান ও অভিনয় শুরু হয় সিনিয়র চ্যাপলিনকে বিয়ে করার পর। ১৮৮৬ সালের ১৬ এপ্রিল জন্ম হয় চার্লি চ্যাপলিনের (চার্লস স্পেন্সার চ্যাপলিন জুনিয়ার)। মা-বাবার সম্পর্ক কেমন ছিল চার্লির সেটা বোঝার বয়স হওয়ার আগেই মা-বাবার মধ্যে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। চার্লি ও সিডনি মায়ের সঙ্গে আলাদা থাকত লন্ডনের লাম্বেথ অঞ্চলে। হুইলার ডাইড্রেন নামে মায়ের আরেক ছেলের কথা তারা জানতে পারে অনেক পরে! এই গম্ভীর রোগা ডাইড্রেনকে চার্লির শেষের দিকের কিছু ছবিতে অভিনয়ও করতে দেখা গেছে। বাবার মাত্রাতিরিক্ত মদ্যপান, উত্তর আমেরিকা ভ্রমণের সময়কার অজানা কিছু ঘটনা, অন্য এই ছেলের রহস্য, না কি মায়ের কখনও ঠিক না হওয়া মানসিক অপ্রকৃতিস্থতা, প্রকৃত কারণ কী ছিল ছাড়াছাড়ির? চার্লিদের কাছে রহস্যই থেকে গেছে গোটা ব্যাপারটা। পরবর্তীকালের গবেষণা থেকে জানা যায় হানা চ্যাপলিনের সম্ভবত সিফিলিস হয়ে ছিল। অস্বাভাবিক মাথাব্যথা, মাঝেমাঝেই গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোনো বন্ধ হয়ে যাওয়া, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক অসুস্থতা, সার্বিক স্বাস্থ্যের অবনতি-সহ শেষাবধি ডিমেন্সিয়া এই সিফিলিসের কারণেই হয়েছিল বলে সন্দেহ করা হয়!

চার্লির ছোটবেলা

 

হানা সুন্দরী কতটা ছিল, তেমন জানা না গেলেও, মায়ের রূপে-গুণে চার্লি ও সিডনি ছিল মুগ্ধ। অনেক রাত করে মা বাড়ি ফিরত, ফিরে দেখত ছেলেরা ঘুমিয়ে পড়েছে। সকালে উঠে ছেলেরা দেখত মা ঘুমোচ্ছে, টেবিলে সাজিয়ে রাখা আছে তাদের খাবার। দাদু-দিদারা এসে মাঝেসাঝে থাকত ওদের সঙ্গে। হানার রোজগারে আধপেটা খেয়ে কষ্ট করে চলে যেত। ছুটির দিনে কখনও লাম্বেথের ফুটপাথে, কখনও কেনিংটন রোডের ধারে, কখনও-বা, ওয়েস্টমিনিস্টারের ব্রিজের ধারে, মায়ের সঙ্গে লাইলাক গাছের ডাল ধরে সুন্দর কেটে যেত তাদের বিকেলগুলি। গান গেয়ে, নেচে, কদাচিৎ আইসক্রিম কিনে দিয়ে অভাব-অনটন কিছুক্ষণের জন্য ভুলিয়ে দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করে যেত মা। কিন্তু এরই মধ্যে দুঃস্বপ্নের একটি রাত চার্লি কোনওদিন ভোলেনি।

প্রথম দৃশ্য: লাম্বেথে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। মায়ের সাজপোশাকের প্রিয় পেটিটা খুলে বসেছে দুই ভাই, মা সাজগোজ করে বেরোবে, গন্তব্য অ্যালডারসটের ক্যান্টিন মিউজিক হল। চার্লির কথায়, “ভাড়াবাড়িতে একা রেখে যাওয়ার চাইতে মা সাধারণত আমাকে থিয়েটারে নিয়ে যেতেই বেশি পছন্দ করত।”

দ্বিতীয় দৃশ্য: জমকালো পোশাকে মোহময়ী হানা গান ধরেছে। অ্যালডারসটের ক্যান্টিনে তুমুল হইচই হচ্ছে, দর্শক-শ্রোতারা অধিকাংশই সৈনিক, তুমুল বিশৃঙ্খলা, চিৎকার চেঁচামেচি চলছে, শিস পড়ছে, উড়ে আসছে অশ্লীল শব্দ ও চুমু ‘চার্মিং লিটল চান্টার’ হানার প্রতি। দু-একজন মদ্যপ পায়ের কাছে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে বদমায়েশি করে, গান গাইতে গাইতেই হানা হাত দিয়ে বাড়ি মেরে দূর করে দিচ্ছে তাদের। নেপথ্যে দাঁড়িয়ে সব দেখছে শুনছে পাঁচ বছরের চার্লি।

তৃতীয় দৃশ্য: হঠাৎ গানের আওয়াজ বন্ধ হয়ে গেল, এদিকে মা প্রাণপণ চেষ্টা করছে গলা দিয়ে আওয়াজ বের করতে! অর্কেস্ট্রা বন্ধ হয়ে গেছে। নাঃ! মা লজ্জায় মুখ লুকিয়ে তড়িঘড়ি দৌড়ে বাইরে বেড়িয়ে গেল আর কিছু বোঝার আগেই হিড়হিড় করে টেনে মঞ্চে তুলে দেওয়া হল পাঁচ বছরের চার্লিকে!

চতুর্থ দৃশ্য: চারপাশ ধোঁয়া ধোঁয়া, তার মুখের উপর এসে পড়েছে স্পট-লাইটের আলো। আবার শোনা যাচ্ছে যন্ত্রের আওয়াজ! অর্কেস্ট্রা বেজে উঠেছে, আর কিছু করার নেই, গান বেরিয়ে এল মানুষের গলা দিয়ে। স্বভাবকবিদের মতো স্বভাবঅভিনেতা-গায়ক চার্লি গান গাইছে, জ্যাক জোন্সের গান!

পঞ্চম দৃশ্য: শুরু হয়ে গেছে পয়সার বৃষ্টি, পুচকে চার্লি গান গাইতে গাইতে মায়ের ভাঙা গলা নকল করছে মাঝেমাঝে আর অদ্ভুত মুখভঙ্গি করতে করতে তাড়াতাড়ি কুড়িয়ে নিচ্ছে পয়সাগুলো যাতে কর্তৃপক্ষ ঝেড়ে না দিতে পারে! এই কাণ্ড দেখে দর্শকরা হেসে কুটিপাটি।

ক্যানটারবেরি হল, ল্যাম্বেথ

 

এই ছিল চার্লির প্রথম রঙ্গমঞ্চের অভিজ্ঞতা। কান্না-হাসির দোল-দোলানো এই শৈশব, হাসির অন্তরালে বিষাদের উৎস-ভূমি ছিল। কৌতুক ও বিষাদের সংমিশ্রণ না ঘটলে মানুষ হাসে না ও হাসির শেষে মানুষের চোখে জল আসে না। এসব বোঝা হয়ে গিয়েছিল চার্লির অনেক ছোটবেলায়। দারিদ্র্য দুর্দশা ওইটুকু ছেলেকে শিখিয়ে দিয়েছিল নিজের প্রাপ্যটুকু বুঝে নিতে। তাই প্রথম রঙ্গমঞ্চের কুড়িয়ে নেওয়া টাকার মতো চার্লি ঐশ্বর্যের শিখরে পৌঁছেও ছিল সমান হিসেবি।

শিল্পীজীবনকে চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার মত সুস্থতা মায়ের আর আসেনি। জামাকাপড় সেলাই করে মা কোনওরকমে সংসার চালাত। তারা পাউনিল টেরাসের বস্তিতে উঠে আসে ভাড়াবাড়ি ছেড়ে দিয়ে। দুই ভায়েরই স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায় এবং শুরু হয় রোজগারের নানারকম চেষ্টা। বাড়ির সব জিনিস বেচে দিতে হয় একে একে। এমনকি তাদের সবচেয়ে প্রিয় মায়ের সাজগোজের পেটিটা পর্যন্ত! এরপর দেনার দায়ে সেলাইয়ের মেশিনটাও নিয়ে যায় পাওনাদার। লাম্বেথের ওয়ার্ক-হাউসে গরিব ও অনাথ বাচ্চাদের সঙ্গে দুই ছেলেকে ভর্তি করে দেওয়া ছাড়া হানার আর কোনও উপায় থাকে না। রোজগারের বৈধ ও নিষিদ্ধ বিভিন্ন উপায়ে কাটতে থাকে হানার জীবন।

 

চ্যাপলিনের কথা ১

মানুষকে দেদার সাহায্য করার সময়ও আমরা আত্ম-সচেতন এক চ্যাপলিনকে দেখি তাঁর ছোট-বড় সমস্ত ছবিতে। পয়সা রোজগার করার কত ফিকির আমরা দেখতে পাই তাঁর ছবিতে। ধনসম্পদের বৈষম্যই যে ধনতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থাকে কায়েমি রাখার মূল চাবিকাঠি এই বোধ চ্যাপলিন যেরকম চার্লির জীবন থেকে পেয়েছিলেন সেই মতো তাঁর প্যান্টোমাইম চলচ্চিত্রযাত্রার শুরুর চলচ্চিত্রটির নামও অদ্ভুতভাবে মেকিং এ লিভিং (১৯১৪)। এই মেকিং এ লিভিং-এর চ্যাপলিন কিন্তু আমাদের চেনা ঢোলা প্যান্ট, ছোট গোঁফ, ছড়ি-টুপির ভবঘুরে আর্কিটাইপ চ্যাপলিন নন। ওই চরিত্রটিকে খুঁজে পেতে তাঁকে পরের ছবি কিড অটো রেসেস অ্যাট ভেনিস (১৯১৪) অব্দি অপেক্ষা করতে হয়েছিল। এরপর একে একে হিজ নিউ প্রফেশান (১৯১৫), হিজ নিউ জব (১৯১৫), ওয়ার্ক (১৯১৫), দি পন শপ (১৯১৬), এ ডগস লাইফ (১৯১৮) জুড়ে শুধু ঢোলা প্যান্ট, ছেঁড়া টাইট কোট, ছড়ি, টুপি, ছোট গোঁফ আর হাঁসজুতোটুকুও যাতে চলে না যায় সেইজন্য রোজগারের নানান ধান্দা। এ ডগস লাইফ-এ এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জে লোক-ভর্তি বেঞ্চের একধারে বসে থাকা চ্যাপলিন মাটিতে পড়ে যান, যখন অন্য প্রান্তে একটি মোটা লোক এসে বসে। সমাজের বিস্মৃত মানুষের সর্বোত্তম প্রতিনিধি চ্যাপলিনকে এরপর বিশ্বাসযোগ্যভাবে অভিনয় করতে দেখি এমন এক প্রাহসনিক দৃশ্যে, যেখানে বেঞ্চ থেকে উঠে এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জের জানালায় তাঁর পৌঁছনোর আগেই অন্য কেউ না কেউ পৌঁছে যাচ্ছে! সমাজের একেবারে নিচুতলার মানুষের অবস্থা নিয়ে এরকম শ্লেষাত্মক বিবৃতি চলচ্চিত্রের ইতিহাসে বিরল!

চার পয়সা ধার দিয়ে ফাঁকতালে এক পয়সা নিজের জন্য সরিয়ে রাখেন তিনি, কিংবা সিটি লাইট (১৯৩১)-এ জলে ডুবন্ত সেই উন্মাদ ধনকুবেরকে বাঁচাতে গিয়ে সে নিজে আগে জল থেকে ওঠার চেষ্টা করে! ‘Be brave! Face life!’, স্বগতোক্তির মতো শোনায়, বুক চাপড়ে এ-কথা বলতে গিয়ে চ্যাপলিনের আত্মপ্রবঞ্চনায় কাশির দমক আমাদের হাসিতে ভরিয়ে দেয়। ‘Tomorrow the bird will sing’, আত্মহত্যা করতে যাওয়া যে মানুষকে চ্যাপলিন এ-কথা বলছেন সে একজন ধনকুবের! উদ্বৃত্ত অর্থের স্রোত, সমস্ত-ভোগ ভোগ করে ফেলার পর মানুষের বুঝি এই অবস্থা হয়! অথচ উল্টোটাই তো কথা ছিল, কিন্তু ভবঘুরে আধপেটা খাওয়া চ্যাপলিন ভাবেননি সে-কথা, এখানেই ব্যক্তি চার্লির দুর্মর আশাবাদ চলচ্চিত্রের চ্যাপলিনের প্রতিভায় বিকশিত হয়েছে। এই ধনকুবের চরিত্রটির মধ্যে নিহিত আছে চার্লির বাবার ছায়া। মদ্যপ ধনকুবেরটি যেন চ্যাপলিনের বাবার ইগো আর নেশা ছুটে যাওয়া দাম্ভিক ধনকুবেরটি যেন তাঁর বাবার অল্টার ইগো।

মাত্র পাঁচ বছর বয়সে অপ্রস্তুত চার্লিকে একদা ঘাড় ধরে তুলে দেওয়া হয়েছিল মঞ্চে, এই অভিজ্ঞতা বিভিন্ন রূপ নিয়ে ফিরে ফিরে এসেছে চ্যাপলিনের ছবিতে। দি সার্কাস (১৯২৭) ছবিটিতে পুলিশের তাড়া খেয়ে চ্যাপলিনকে আমরা ঢুকে পড়তে দেখি সার্কাসের মঞ্চে, তারপর পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে শুরু হয় ট্রাপিজের হাজার কসরত! ছবিতে সার্কাসের দর্শকরা সেসব দেখে হেসে অস্থির, তাঁদের কাছে প্রকৃত সত্য জানা নেই। আর আমরা, ছবির দর্শকরাও হেসে অস্থির কিন্তু আমাদের অবস্থান চ্যাপলিনের সঙ্গে। ছবির এক জায়গায় সার্কাসের ম্যানেজারের মন্তব্য ভেসে উঠতে দেখি ইন্টার-টাইটেলে, “He’s a sensation but he doesn’t know it…” এতকাল বাদে এই স্বতঃস্ফূর্ত স্ল্যাপস্টিকগুলির দিকে ফিরে তাকালে ওই সময়ের প্রেক্ষিতে এ-কথা কৌতুকপূর্ণভাবে সর্বৈব সত্য বলে মনে হয়। আবার প্রথম দিকের এ নাইট ইন দ্য শো (১৯১৫)-তে আমরা দেখা পাই ব্রিটিশ মিউজিক হল বা আমেরিকার ভদেভিল জাতীয় রঙ্গমঞ্চের! ছবির এক জায়গায় মদের নেশায় চ্যাপলিন আচমকা গিয়ে রঙ্গমঞ্চের উপর উঠে পড়েন, তারপর শুরু হয় তার চিরাচরিত স্ল্যাপস্টিক মারপিট! অনেকে বলে থাকেন চ্যাপলিনের ছবি আসলে মানুষের আজীবনলালিত সুপ্ত শৈশবকে প্রাণিত করে, তাই তাঁর ছবির বয়সে ছোট দর্শকের চেয়ে বয়সে বড় দর্শকের সংখ্যাই বেশি। মদ্যপ চ্যাপলিন, আরও বেশি করে যেন ওই শৈশবে প্রণত। তাই ভদেভিল রঙ্গমঞ্চে মদ্যপ চ্যাপলিন যেন স্বতঃপ্রণোদিত ভাবে উঠে পড়েন, যেন এ তাঁর অনেক ছোটবেলার অভ্যাস! এখানে ছবির ভদেভিলের দর্শকদের থেকে ছবির দর্শক হিসেবে আমাদের অবস্থান অনেক বেশি ব্যক্তি-চ্যাপলিন নিষ্ঠ। হিজ ফেভারিট পাসটাইম (১৯১৪), দ্য রাউন্ডার্স (১৯১৪) থেকে সিটি লাইট মাতাল চ্যাপলিনের মগ্নচৈতন্যের শৈশব-যাপন। যুক্তিবুদ্ধির ধার না ধেরে, মুক্ত বিহঙ্গের মতো শরীরটাকে ছেড়ে দিয়ে যা খুশি করা। কিছুক্ষণের জন্য শিশুসুলভ দুষ্টুমি করে চলা। স্ল্যাপস্টিক প্রদর্শনের এরকম সুযোগ চ্যাপলিন কখনও ছাড়েননি।

চিরাচরিত স্ল্যাপস্টিক, ‘এ নাইট ইন দ্য শো’ (১৯১৫)

 

চার্লির কথা ২

বন্দিত্ব ও একাকিত্ব বস্তিবাসীদের নিত্যদিনের সঙ্গী। লাম্বেথের ওয়ার্ক-হাউসে একদিন তার মাথা মুড়িয়ে দেওয়া হয়। জেরেমি বেন্থাম, রাষ্ট্রের ক্ষমতা ও কর্তৃত্বকে বলেছিলেন প্যান-অপটিকনিয়ান! বলা নেই কওয়া নেই, সমাজসেবী পাদ্রির দল কোথা থেকে এসে নিয়ম নামক কবচ ঝুলিয়ে তার সাধের চুল কেটে দিয়ে চলে গেল! গণতান্ত্রিক বা সমাজতান্ত্রিক, সমস্তরকম সমাজব্যবস্থায় মানুষ যে একটা সংখ্যার বেশি কিছু নয় চার্লি সেটা ওই কম বয়সেই টের পেয়েছিল যখন সে দেখল, আসলে নিজের শরীরটাও নিজের নয়! যে শরীরকে সে চিরকাল ব্যবহার করেছে মানুষকে আনন্দ দিতে, যে শরীর তার শিল্পের যাপন-ভূমি, সেইখানেই ঘটে গেল অতর্কিত হামলা। তার এই অভিজ্ঞতার কথা জানা থাকা দর্শক হিসেবে তার ছবি সমাদর করার প্রাক-শর্ত।

মায়ের মধ্যে পাগলামির লক্ষণ দেখা দিলে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় মানসিক চিকিৎসাকেন্দ্রে। হানার পরিবারে মানসিক অসুস্থতার বেশ কিছু নজির আছে। হানার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া না কি সিফিলিস-ঘটিত তা আজও পরিষ্কার নয়। মা হাসপাতালে চলে গেলে সরকারি নিয়মে চার্লি ও সিডনি কেনিংটনে তার বাবার বাড়িতে গিয়ে ওঠে। বলা-বাহুল্য গৃহকর্ত্রী বাবার দ্বিতীয় স্ত্রী লুইস, ব্যাপারটা একেবারেই মেনে নিতে পারেনি। খাদ্য জুটত, কিন্তু তার থেকেও বেশি জুটত অবহেলা ও তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য। পরে মা সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে বেরোলে তারা মায়ের সঙ্গে পাউনাল টেরাসের বাড়িতে গিয়ে ওঠে। এখানে থাকাকালীন দারিদ্র্য চরমে পৌছয়। আগের মতো উপার্জনের নানা পন্থা এবং উপায় না থাকায় রাস্তায় রাস্তায় ভিক্ষা করে বেড়িয়ে কাটত মায়ের নিত্যদিন। এই সময়েরই একটি ঘটনার কথা চার্লি অনেক জায়গায় বলে গেছে।

প্রথম দৃশ্য: মা বেরিয়েছে উপার্জনের জন্য। সিডনি কোথায় সে জানে না। ছাদের কড়িকাঠে শেষ বিকেলের আলো এসে পড়েছে। সেই দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ঘুমে চোখ জড়িয়ে এসেছে চার্লির।

দ্বিতীয় দৃশ্য: বাইরে হঠাৎ হইচইয়ের শব্দ। চার্লির তন্দ্রা ছুটে গেছে, সে এক দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে এসেছে।

তৃতীয় দৃশ্য: একটা আধপাগল ধরনের লোক মুখে অদ্ভুত আওয়াজ করতে করতে একটা ভেড়াকে তাড়া করে রাস্তার সামনে দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। রাস্তার ধারের লোকজন বিশেষত চার্লির বয়সি ছোটরা দারুণ উপভোগ করছে ব্যাপারটা আর হাততালি দিচ্ছে। চার্লিও দারুণ মজা পেয়েছে, সে অন্যদের সঙ্গে হাততালি দিতে দিতে দৌড়চ্ছে লোকটার পিছন পিছন।

চতুর্থ দৃশ্য: রাস্তার শেষ মাথায় পৌঁছে গেছে সবাই, লোকটা ভেড়াটাকে টেনে ঢুকিয়ে দিল একটা বাড়িতে। চার্লি চোখ তুলে দেখে সেটা একটা কসাইখানা! এই অনভিপ্রেত ঘটনার অভিঘাতে চার্লি ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে, মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে, “ওরা একে মারতে নিয়ে যাচ্ছে!!”

১৯০১ সালে বাবা মারা যায়। দাদা সিডনি জাহাজে কাজ নিয়ে দূরে। চার্লি এই সময় মুদি-দোকান থেকে মুচিগিরি সমস্তরকম কাজে নিজেকে যুক্ত করছে। রঙ্গমঞ্চে গান-অভিনয়ও চলছে পাশাপাশি। বিদ্যালয়েও মাঝেমাঝে। আর শ্যেনদৃষ্টিতে দেখছে, উপলব্ধি করছে মানুষের স্বভাব ও মানুষের সমাজ। একদিন জানতে পারে মা সম্পূর্ণ পাগল হয়ে গেছে, তাকে আবার মানসিক চিকিৎসাকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। এই অসুখ তার আর কোনওদিনও সারেনি।

১৯১০ সাল নাগাদ চার্লি ব্রিটিশ মিউজিক হলের বিখ্যাত অভিনেতা ও স্ল্যাপস্টিক কৌতুকাভিনেতা ফ্রেড কার্নোর দলে যোগ দেয়। পরবর্তীকালে চ্যাপলিনের ছবিতে এর-ওর মুখে বড় কেক বা পেস্ট্রি ছুড়ে মারার যে দৃশ্যগুলি দেখতে পাওয়া যায় সেই স্ল্যাপস্টিক প্রকরণটি এই ফ্রেড কার্নোর মস্তিষ্কপ্রসূত। একে custard-pie-in-the-face gag বলে। ইনি ছিলেন স্ল্যাপস্টিক কমেডি এবং সাইলেন্ট কমেডির প্রবর্তকদের অন্যতম। এঁর হাত ধরেই চার্লির আমেরিকা যাত্রা ও ‘কমেডির রাজা’ ম্যাক সেনেটের ‘কিস্টোন স্টুডিও’তে যোগদান। এই বছরগুলিতেই স্ল্যাপস্টিক কমেডির উপযোগী শারীরিক দক্ষতা সে রপ্ত করে ফেলে, প্রায় স্প্রিঙের মতো বানিয়ে ফেলে শরীরটাকে। সঙ্গে লন্ডনের ‘ককনি’ বাচনভঙ্গিরও পরিবর্তন ঘটতে থাকে যা মার্কিন রঙ্গমঞ্চের জন্য একেবারেই উপযোগী ছিল না। পরে ‘এসানে স্টুডিও’, ‘মিউচুয়াল ফিল্ম কর্পোরেশন’ হয়ে সবশেষে নিজে ‘ইউনাইটেড আর্টিস্ট’ তৈরি করে খ্যাতি ও সমৃদ্ধির শিখর ছোঁয়। মা তার সঙ্গেই ছিল আমেরিকাতে। ছেলের সাফল্য ও খ্যাতিতে যদিও সে নিস্তেজই থাকত। অবশেষে ১৯২৮ সালে মায়ের মৃত্যু হয়।

 

চ্যাপলিনের কথা ২

বিশুদ্ধ চলচ্চিত্রের কাহিনি বলার কোনও দায় নেই, বলেছিলেন বেলা বালাজ বা জিভা ভের্তভের মতো চলচ্চিত্রতাত্ত্বিকেরা। সেক্ষেত্রে মানতেই হবে, চ্যাপলিনের সাইলেন্ট কমেডিগুলি বিশুদ্ধ চলচ্চিত্রের আদর্শ নিদর্শন। আর চ্যাপলিন সেখানে অবাঞ্ছিত অনুপ্রবেশকারী, একটা দাগ একটা ক্ষত যেন! কিড অটো রেসেস অ্যাট ভেনিস-এর কথা ভাবুন। অভিজাতদের বাচ্চাদের গাড়ির রেসের ভিডিও তোলা হচ্ছে সেখানে চ্যাপলিন ধুঁকে পড়ছেন বারবার! লাথি, গলাধাক্কা যা-ই দেওয়া হোক তিনি নাছোড়বান্দা। একদম শেষে তাঁকে ভেংচি কাটতে দেখা যায় ক্যামেরার সামনে এসে। কর্তৃপক্ষ ও বড়লোকদের যাবতীয় ব্যবস্থাকে তিনি যে সারাজীবন বুড়ো আঙুল দেখাবেন এখানেই তার সূচনা হয়ে যায়। অবাঞ্ছিত অনুপ্রবেশের পর নানান অশান্তি করে ছবির মূল বিষয়বস্তুতে পরিণত হওয়া চ্যাপলিনের অনেক ছবিরই নিত্যদিনের ব্যাপার। এই ছবি থেকেই ভবঘুরে ঢোলাপ্যান্ট টুপি ছড়ি ছোট গোঁফের আর্কিটাইপ চ্যাপলিনের দেখা পাই আমরা। শোনা যায়, ম্যাক সেনেটের নির্দেশে তিনি নিজেই তাঁর এই রূপকল্প তৈরি করেছিলেন। অনেকে আবার বলে ঝড়জলের সন্ধ্যায় এইরকম দেখতে একটি মানুষের সন্ধান পেয়েছিলেন তিনি।

সেই বিখ্যাত ভেংচি, ‘কিড অটো রেসেস অ্যাট ভেনিস’ (১৯১৪)

 

ইজি স্ট্রিট (১৯১৭)-এর একটি দৃশ্য আছে, চ্যাপলিন বাক্স থেকে খাবার বের করে বাচ্চাদের মধ্যে এমনভাবে ছড়িয়ে দিচ্ছেন যেন তারা মানবশিশু নয়, তারা মুরগির ছানা! সের্গেই আইজেনস্টাইনকে এই দৃশ্যের কথা মনে করিয়ে দিয়ে চার্লি বলেছিলেন, “জানেন তো— আমি এটা কেন করেছিলাম? কেননা শিশুদের আমি অপছন্দ করি। তাদের আমার ভালো লাগে না।” আপাত নির্মম এই কথার পিছনে লুকিয়ে আছে চার্লির বিপর্যস্ত শৈশব। প্রকৃতপক্ষে শিশু নয়, চার্লি অপছন্দ করতেন শৈশবকে। শিশুরা ছিল সেই অপছন্দের শৈশবের প্রতিমূর্তি।

‘শান্তি ও সমৃদ্ধির’ প্রতীক শ্বেতশুভ্র স্তম্ভের উদ্বোধন হবে। শহরের গণ্যমান্যরা উপস্থিত দলবল-সমেত। পাইক-বরকন্দাজ-পাদ্রি কেউ বাকি নেই। ঢাকা সরতেই দেখা যায় শ্বেতশুভ্র স্তম্ভের গায়ে কালো আঁচড়ের মতো কী একটা লেগে আছে যেন! ওঃ, ওই শালা ভিখিরি ভবঘুরেটা! ঘুম ভেঙে উঠে চ্যাপলিন হতভম্ব! তাঁকে যত নেমে আসার হুমকি দেওয়া হয় তত একবার তাঁর প্যান্ট আটকে যায় মার্বেলের তলোয়ারে, একবার তিনি বসে পড়ে একটা মূর্তির মুখের উপর নিতম্ব রেখে! এদিকে বিউগল বেজে উঠতেই বাকিদের সঙ্গে তিনিও ওই অবস্থাতেই স্যালুটের ভঙ্গি নেন। বোঝা যায়, ব্যাপারটা সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত নয়। সমাজ যাদের ভুলে থাকতে চায় তাদের এরকম অবাঞ্ছিত উপস্থিতি দিয়েই শুরু হয় সিটি লাইট। ঝাঁ চকচকে শহরের অভ্যস্ত আলো নয়। যেসব মানুষ বা যেসব অঞ্চল ইচ্ছাকৃতভাবে ব্রাত্যই থেকে গেছে, এই আলো সেই বাইরের নগরের। বস্তুত সিটি লাইট-এর সময়ে হলিউডে বাক্-চিত্র এসে গেছে। কিন্তু নৃত্যগীতবাদ্যমুখর কর্ণভেদী বাক্-চিত্রের বিপরীতে মাঝেমাঝে কিছু আওয়াজ ও নেপথ্য-সঙ্গীত ছাড়া সিটি লাইট-এর নির্বাক চলমান চিত্রমালায় এমন একটা সুখ ছিল যা এই ছবিটিকে শেষপর্যন্ত প্রায় মন্ত্রের শান্তিতে উন্নীত করে দেয়!

তিনি এখানে স্বয়ং পাদ্রি এবং অবশ্যই অবধারিতভাবে জালি পাদ্রি। আদতে জেলপালানো আসামি। এদিকে শহরের শেরিফ চ্যাপলিন-আসামিকে চিনতে পারে ও তাঁকে বন্দি করে। কিন্তু তাঁর উদারতায় ততক্ষণে সবাই মুগ্ধ, তাই শেরিফ তাঁকে আমেরিকা থেকে পালিয়ে মেক্সিকোতে চলে যেতে সাহায্য করতে চায়। আমেরিকার সীমানায় নিয়ে গিয়ে যতবার তাঁকে মেক্সিকোতে পাঠানো হয় ততবার তিনি ব্যাপারটা বুঝতে না পেরে (নাকি বুঝতে না চেয়ে) সীমানা টপকে ফের আমেরিকা চলে আসেন! শেষে বিরক্ত শেরিফ পশ্চাৎদেশে লাথি মেরে তাঁকে মেক্সিকো পাঠিয়ে নিজে পালিয়ে চলে যায়। চ্যাপলিনের তখন দিধাগ্রস্ত অবস্থায়, এক পা আমেরিকার দিকে আরেক পা মেক্সিকোর দিকে দিয়ে লাইনের উপর দাঁড়িয়ে থাকেন। এদিকে কী একটা গণ্ডগোল শুরু হয়েছে, খুব গোলাগুলি চলছে। তিনি কী করবেন কিছু বুঝতে না পেরে ওই লাইন ধরে দুদিকে দুই পা রেখে দিগন্তের দিকে হাঁটা দেন তাঁর বিখ্যাত পাতিহাঁসের মতো হাঁটার ভঙ্গিতে! দ্য পিলগ্রিম (১৯২৩) ছবির পরিসমাপ্তি ঘটে এখানেই। এই তাঁর চলচ্চিত্রের আন্তর্জাতিক ভাষা। প্রান্তিক মানুষের প্রতিনিধি তিনি, তাই যেখানে দু-দেশের সীমারেখা সেখানেই তাঁর বসবাস।

আমেরিকার স্টুডিও সিস্টেম থুড়ি আমেরিকার রাষ্ট্রব্যবস্থা তাঁর এই ব্যঙ্গ ভালোভাবে নেয়নি। মর্ডান টাইমস (১৯৩৬) ছবিতে যন্ত্রপাতির ভিতরে ঘুরতে থাকা চ্যাপলিন তাই যতটা বোধ-বুদ্ধিরহিত প্রযুক্তির ব্যবহারকে ব্যঙ্গ করেন, ততটাই স্টার-ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেমের জাঁতাকলে তাঁর কী অবস্থা হয়েছে সেটাকে প্রকাশ করে। ব্যাপারটা গোল্ড রাশ (১৯২৫)-এর সময় থেকেই শুরু হয়। চার্লির জবানবন্দি থেকে জানা যায় ক্লন্ডিক গোল্ড রাশের গল্পটা তাঁর মাথায় আসে চিলকূট গিরিপথে যাওয়ার সময়। নিজেকে নধর মুরগি হিসেবে ভাবার দৃশ্য-পরিকল্পনাটি তাঁর মাথায় আসে আমেরিকার পথিকৃৎ একজনের নিজের জীবনে ঘটে যাওয়া ক্যানিবলিজামের ঘটনা থেকে! চ্যাপলিন তাই মনে করতেন হাস্যরস আপাতবিরোধী, কারণ তা উত্থিত হয় বিষাদ বা দুঃখ থেকে। উপহাসের ভিতর দিয়ে যে হাস্যরস নির্গত হয় তা মানুষের অনেক অসহায়তাতে প্রলেপ দেয়— না হলে মানুষ পাগল হয়ে যেত। নরভুকবৃত্তির এহেন ব্যঞ্জনা আমাদের হাসতে হাসতে স্তব্ধ করে দেয়। এই মুরগি-অনুষঙ্গ, রাষ্ট্রের চোখে আসলে ছিল প্রান্তিক মানুষের প্রতিমূর্তি!

নধর মুরগি-রূপী চ্যাপলিন, ‘গোল্ড রাশ’ (১৯২৫)

 

এখান থেকে শুরু, ১৯৪০-এর দ্য গ্রেট ডিক্টেটর-এ হাঁসজুতো-টুপি-ছড়ির ভবঘুরে চ্যাপলিন অন্তর্হিত, পড়ে আছে শুধু তাঁর গোঁফটা! আসলে ১৯৩৮ সাল নাগাদ চার্লির বন্ধু ভেনডারবিল্ট জার্মানি থেকে তাকে পাঠাতে থাকে কিছু পোস্টকার্ড। সেখানেই প্রথম চোখে পড়ে গোঁফচুরির ব্যাপারটা! চার্লি লিখেছে সে কথা, “ও আমার গোঁফ চুরি করেছে! ওই গোঁফ আমি আবিষ্কার করেছিলাম! অবশ্য এই গোঁফ-সহ ওর মুখ আমার মুখের বাজে নকল— পুঁচকে ঠোঁট ও এলোমেলো চুল নিয়ে ওই মুখে ফুটে উঠেছে অশ্লীল ভাঁড়ামো। হিটলারকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা আমি ভাবিওনি। কিন্তু যখন আইনস্টাইন ও টমাস মানকে জার্মানি ছেড়ে চলে যেতে হল, তখন হিটলারের ওই মুখ আর কমিক না থেকে হয়ে উঠল ভয়ঙ্কর।” দ্য গ্রেট ডিক্টেটর শুরুর সময়ে খবর আসতে থাকে জার্মানি রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে। আমেরিকা-ইংল্যান্ড জল মাপতে শুরু করে, নাৎসি জার্মানিকে আপাতত চটানো যাবে না। ছবিটার বিরোধিতা শুরু হয়। বলা হয় ছবিটার মুক্তি এই দুটি দেশে চিরকালের মতো নিষিদ্ধ করতে হবে। এদিকে ফ্রান্সের আন্দ্রে ম্যাজিনোর নামে নামাঙ্কিত ‘ম্যাজিনো লাইন’ নামক যুদ্ধের জন্য তৈরি দুর্গ ধূলিসাৎ হয়। ফ্রান্স অধীনস্থ হয় হিটলারের। অতঃপর ডানকার্কের দিকে এগিয়ে চলে রণতরী যুদ্ধ-বিমান। আমেরিকা প্রমাদ গোনে ও ডাক পড়ে দ্য গ্রেট ডিক্টেটরের! বলা হয় “তোমার ছবি তাড়াতাড়ি করো, সবাই অপেক্ষা করছে এটার জন্য!” কিন্তু ডিক্টেটর হ্যানকেল (হিটলারের নকল)-রূপী ইহুদি নাপিতের শেষ সম্ভাষণ মনঃপূত হয় না প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট-সহ গোটা মার্কিন সাংবাদিককুলের, বিশেষত, “in the name of the democracy— let us use that power— let us all unite…” রাষ্ট্রশক্তি বুঝতে শুরু করে যা আগে কেবল সন্দেহ ছিল আজ তা প্রমাণিত হচ্ছে, এ লোকটি খুবই বিপজ্জনক। ১৯৪৭-এ মঁসিয়ে ভের্দু ঝড় বইয়ে দেয় আমেরিকা জুড়ে। বন্ধ করে দেওয়া হয় ছবির মুক্তি! নিজে বিবাহিত হয়েও, বড়লোক মহিলাদের বিয়ে করা ও তারপর তাদের হত্যা করা এই এখন চ্যাপলিনের কাজ! সরাসরি পুঁজি-রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই ফতোয়া ম্যাকার্থি-যুগে চ্যাপলিনকে দেগে দেয় আমেরিকা-বিরোধী হিসেবে! দেশদ্রোহী হিসেবে! কম্যুনিস্ট হিসেবে! যদিও তিনি এইচজি ওয়েলসকে বলেছিলেন, “আপনি যদি সমাজতন্ত্রী হন তাহলে বিশ্বাস করুন, পুঁজিবাদ বিনষ্ট, পৃথিবীর জন্য আর কী আশা থাকবে যদি রাশিয়ায় সমাজতন্ত্র ব্যর্থ হয়?” ১৯৫২ সালে তাকে স্থায়ীভাবে মার্কিন দেশ ছাড়া করা হয়।

ডিক্টেটর হ্যানকেল (হিটলারের নকল), ‘দা গ্রেট ডিক্টেটর’ (১৯৪০)

 

প্রকৃতপক্ষে চলচ্চিত্রের আদি যুগে যে কজন বিরল প্রতিভাধর স্রষ্টার সৃষ্ট চলচ্চিত্রকে নাটক ও সাহিত্যের মধ্যবর্তী স্থানে উপনীত করেছিল চ্যাপলিন তাঁদের মধ্যে প্রধান বললেও অত্যুক্তি হয় না। ভঙ্গি, বেশভূষা, চরিত্রচিত্রণ সব কিছুর মধ্যে শুরু থেকেই তার স্রষ্টা-সুলভ সাক্ষর বিদ্যমান, রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, “বানিয়ে তোলা জিনিশ নয়, হয়ে ওঠা পদার্থ।” শিল্পের এই আদ্যন্ত মৌলিক রূপ তাঁর চলচ্চিত্রগুলিকে যেমন দিয়েছে বিশুদ্ধতার স্বীকৃতি তেমনই তাঁর প্রতিভাকে করে তুলেছে শেক্সপিয়ারের সমতুল্য! কারণ তিনিও শেক্সপিয়ারে মতোই বাণিজ্যের চলতি সবগুলি প্রথা মেনে নিয়েও স্তর-বহুল শিল্পী হতে পেরেছিলেন। অর্থাৎ, ভোক্তার তারতম্য অনুযায়ী তাঁর আবেদনের স্তরও আলাদা-আলাদা— কিন্তু নিম্নতম স্তরেও বঞ্চিত হতে হয় না, যেহেতু নিছক বিনোদন-উপভোগের সমান অংশীদার সবাই।

উপলব্ধি কী? চার্লির জবানবন্দি থেকে পাওয়া যায়, “লাইম লাইট (১৯৫২) ছবির চূড়ান্ত পর্যায়ে কমেডিয়ান ক্যালভেরোর উপলব্ধিই আমার উপলব্ধি: জীবন গতিশীল এবং তাই প্রগতি।” লাইম লাইট ছবির শেষে পিয়ানোবাদকের ভূমিকায় যে অভিনেতার দেখা পাই তার নাম ‘বাস্টার কিটন’। চ্যাপলিনের সমতুল্য প্রতিভার এই স্ল্যাপস্টিক কমেডিয়ানের সুদিন তখন পড়ে আসছে কিন্তু ক্যালভেরোর ভালোবাসা থেকে যায় তার প্রতি। চার্লি ও চ্যাপলিন সত্যিই কোনওদিন জীবন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়নি। কী মঁসিয়ে ভের্দু-তে কী সিটি লাইট-এ, কী প্রতিবাদে কী প্রেমে, সদা প্রাণবন্ত এই ভাঁড় এই ভবঘুরে তাই আজও আমাদের এত প্রিয়। ক্যালভেরো মারা যায় টেরিকে পাদপ্রদীপের আলোর নিচে রেখে, কিন্তু আমরা জানি আরেকজন চার্লি চ্যাপলিন (মৃত্যু: ২৫ ডিসেম্বর, ১৯৭৭) আর কোনওদিনও আসবেন না এই পৃথিবীতে!

 


*এই প্রবন্ধটির একটি আদি রূপ ‘তবুও প্রয়াস’ ওয়েবজিনে ইতিপূর্বে প্রকাশিত হয়েছিল

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 5395 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...