ইতিহাস খুব সহজ বিষয়

অম্বরীশ বিশ্বাস

 

ডাক্তারি করতে পারে ডাক্তারেরা, ব্রিজ বানায় ইঞ্জিনিয়ার, চাষ করেন চাষি, কেবলমাত্র ইতিহাস ঐতিহাসিকদের একচ্ছত্র সম্পত্তি নয়, ইতিহাস নিয়ে সবাই বলতে পারেন, লিখতে পারেন। ইতিহাস বিষয়টা বড্ড এলেবেলে। অমিয়ভূষণ এখন কম্পিটিটিভ পরীক্ষা দেয়, রামনবমীর মিছিলে পাগড়ি পরে হাঁটে, ফেসবুকে নানান বক্তব্যের মাঝে ইতিহাস নিয়েও নাতিদীর্ঘ বেশ কিছু বক্তব্য পেশ করে থাকে। সেদিন টিউশনের মক টেস্টে প্রশ্ন এসেছিল—

মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধিকে ‘জাতির জনক’ কে আখ্যা দেন? অপশন ছিল a) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর b) আবুল কালাম আজাদ c) জওহরলাল নেহরু d) সুভাষ চন্দ্র বসু।

অমিয়ভূষণ খুব নিশ্চিত মনে c) অপশন দাগিয়ে এসে বইমেলায় লাইনে তিনঘন্টা দাঁড়িয়ে নেতাজি বিষয়ক বই কিনেছে এবং অনতিবিলম্বে ইন্সটাগ্রামে স্টোরি আপলোড করেছে।

ভালো ছেলে-পুলে ইতিহাস নিয়ে পড়ে না। বেকার একটা আর্টসের সাবজেক্ট। যার নেই কোনও আশ, সে-ই পড়ে ইতিহাস। ইতিহাস নিয়ে পড়ার জন্য কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় নিদেনপক্ষে হোম টিউটরিং করতে হয় নাকি? যে কেউ ইতিহাস নিয়ে কথা বলতে পারে, ডাক্তার-মোক্তার-কমপাউন্ডার-অমিয়ভূষণ, যে কেউ। বিষয়টা বড্ড ফ্যালনা।

অমিয়ভূষণের পিতা কনভার্টেড হিন্দুত্ববাদী। পরিবার বাংলাদেশে থাকত, দেশভাগের পর এপারে। একসময় দাঙ্গাবিরোধী মিছিলে সাইকেল হাঁটিয়ে খানিক পথ চলেছেন। স্বাভাবিক নিয়মেই হেঁটেছেন। যারা মাতৃভূমি থেকে ছিন্নমূল হয়, তারা অন্য কাউকে ঘর হারাতে দেখলে দুঃখ পায়, এটাই স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। অমিয়ভূষণের পিতা এখন বুলডোজার জাস্টিসে বিশ্বাস করেন। ঘর ভাঙতে দেখলে দুঃখ নয়, শিহরণ হয়। চামড়া টান টান হয়ে ওঠে।

“বেশ হয়েছে। দেখ কেমন লাগে।”

অমিয়ভূষণের পিতা সাধারণ মানুষ, ‘ওদের’ জন্য দেশভাগ হয়েছে এমন প্রছন্ন ধারণা একটা বরাবরই ছিল। তিনি পুরনো হিন্দি গান শুনতে ভালোবাসেন, প্রিয় গায়ক মহম্মদ রফি এবং আরডি বর্মন। বই-টই পড়তে কোনওদিনই সেরকম ভালোবাসেন না। তিনি অল ইন্ডিয়া আজাদ মুসলিম কনফারেন্সের ব্যাপারে জানেন না। না জানতেই পারেন। ১৯৪১ সালে অল ইন্ডিয়া মোমিন কনফারেন্সের ব্যাপারে তৎকালীন সিআইডি রিপোর্ট কী ছিল? সেটাও উনি না জানতে পারেন। ২৩ এপ্রিল, ১৯৪০ সালে মুসলিম লিগ লাহোর রেজোলিউশনের মাধ্যমে পাকিস্তানের দাবি তোলে, এর বিরুদ্ধে আজাদ মুসলিম কনফারেন্স ১৯ এপ্রিল, ১৯৪০ সালে ‘হিন্দুস্থান ডে’ পালন করে, সে কথা উনি না জানতেও পারেন। সব কথা সবাইকে জানতে হবে এমন কোনও ব্যাপার নেই। রকেট ফুয়েল কেমনভাবে তৈরি হয় সেটা সবাই জানে না, কিডনি স্টোন কীভাবে অপারেশন করে বের করতে হয় সেটাও সবাই জানে না। সবাই না জানলেও কোনও সমস্যা হচ্ছে না। কিন্তু সমস্যা বেশি করে শুরু হয়েছে বেশ কিছু বছর আগে স্মার্টফোনটা কেনার পর থেকে। সমাজমাধ্যমে অ্যাকাউন্টগুলো খুলতে অমিয়ভূষণ সাহায্য করেছিল। তারপর বিশ্বের জ্ঞানভাণ্ডার হাতের মুঠোয়। অমিয়ভূষণের বাবা এখন প্রায় সব ব্যপারে কিছু না কিছু জানেন। খানিক চিকিৎসাবিদ্যা থেকে স্থাপত্যকলা, পাতিহাঁসের মাংস রান্না থেকে ইতিহাস। শরীর খারাপ হলে অবশ্য তিনি ডাক্তারের কাছে যান, তিনতলার ছাদের পাশে নতুন ঘর বানাতে ইঞ্জিনিয়ার, রাজমিস্ত্রিদের শরণাপন্ন হন। এক রবিবারের দিন পাতিহাঁস রান্না করেছিলেন। তারপর থেকে ওনাকে রান্নাঘরের আশেপাশে যেতে দেওয়া হয় না। কিন্তু ইতিহাস বিষয়ে তিনি এখন প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠেছেন। প্রাচীন যুগ থেকে মধ্য যুগ হয়ে, আধুনিক ইতিহাস, সবেতেই ভদ্রলোকের অবাধ বিচরণ। বিশেষ ব্যুৎপত্তি ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং আধুনিক বিশ্ব-ইতিহাসে। কে দেশপ্রেমী আর কে দেশদ্রোহী সে বিষয়ে অমিয়ভূষণের বাবার এখন বেশ একটা স্বচ্ছ ধারণা হয়েছে। কে বীর এবং কে ভীরু সে বিষয়ে সম্যক ধারণা এসেছে। সৌজন্যে চালাক মুঠোফোন। মানুষের জন্য এখনও অমিয়ভূষণের বাবার মন কাঁদে, দুঃখ হয়, তবে সেই মানুষটির নাম এবং পদবি দেখে।

অমিয়ভূষণ ইস্কুলে রচনা লিখেছিল ‘যুদ্ধ নয়, শান্তি চাই’। বাংলাটা অমিয়ভূষণ বরাবরই ভালো লিখত।

“যুদ্ধ পৃথিবীর বুকে এক অভিশাপ। সমগ্র মানব সমাজের উন্নতির পক্ষে প্রবল অন্তরায়। যুদ্ধের বিরুদ্ধে আগামী পৃথিবীর শান্তিকামী মানুষের শপথ দৃঢ়তর হোক।”

এইভাবে উপসংহার টেনেছিল রচনার। বাংলার মাস্টারমশাই আলাদা করে প্রশংসা করেছিলেন। উচ্চ নিনাদে খবরের চ্যানেলের ভেরীঘোষ শুনতে শুনতে অমিয়ভূষণের এখন হিমোগ্লোবিনে হিল্লোল ওঠে। শিশুদের মৃতদেহ এখন আর মনে দাগ কাটে না অমিয়ভূষণের।

ছেলেটার সঙ্গে একসঙ্গে ফুটবল খেলত অমিয়ভূষণ। ছেলেটা ব্যাকে খেলত, অমিয়ভূষণ সেন্টার ফরওয়ার্ড। গোললাইন থেকে ছেলেটার লম্বা বল পায়ে লুফে নিয়ে অনেকগুলো গোল করেছে অমিয়ভূষণ। ব্যাক থেকে মাঝেমাঝে বল নিয়ে মাঠের ওপরে উঠে আসত ছেলেটা। চোখ বন্ধ করেও জানত সেন্টার ফরওয়ার্ড অমিয়ভূষণ কোন পজিশনে থাকতে পারে। নিখুঁত পাস এবং অনবদ্য গোল। একসঙ্গে ছেলের দল ঘেমো গেঞ্জি গায়ে গোল করে বসে থাকত খেলার পর। অস্তমিত সূর্যের শেষ আভায় বড্ড মায়াবী লাগত সোনাডাঙার মাঠ। ক্লান্ত শরীরে কতরকমের গল্প হত। তারপর দল বেধে সাইকেল চড়ে বাড়ি ফেরা।

দিন পনেরো আগে সেই ছেলেটিকে সমাজমাধ্যমের কমেন্ট বক্সে ‘জেহাদি’ এবং ‘বাংলাদেশি’ বলে সম্বোধন করেছে অমিয়ভূষণ।

সঙ্গে আরেকটি তথ্য দিয়ে রাখা অবশ্যকর্তব্য, অমিয়ভূষণরা যে মাঠটিতে খেলত সেই মাঠে এখন বিশালাকৃতি ফ্ল্যাটবাড়ি গজিয়েছে। ল্যাটা চুকে গেছে খেলাধূলার। বেশ হয়েছে। খেলাধূলা করলে সব বখে যাবে। এর চেয়ে ‘ফ্রি ফায়ার’ খেলা স্বাস্থ্যসম্মত।

অমিয়ভূষণের ভাইয়ের মনে বন্দুক ঢুকেছে, কাউন্সিলারের পকেটে মাল্লু। সমানুপাতিক সম্পর্ক। এই যেমন ছিল পুকুর, হয়ে গেল একটা আস্ত শপিং মল। তবে মুশকিল কিছু নেই। ছিল একটা হাওয়াই চটি, হয়ে গেল দিব্যি একটা গঁকগঁকে গরু। এ তো হামেশাই হচ্ছে৷

অমিয়ভূষণের মা একজন ধর্মপ্রাণ গৃহবধূ। উনি জিরাফে নেই, শুধু ধর্মে আছেন। ছোটবেলা থেকেই আছেন পারিবারিক সূত্রে। এটা অস্বাভাবিক ঘটনা নয়, সমস্যা হল, ওঁর নিজস্ব কোনও মতামত নেই। পতিদেবের মতামতই ওঁর মতামত। সংসারের প্রায় সব কাজ সামলে উদ্বৃত্ত শ্রমের মজুরি না পেয়ে অবসর সময়ে অমিয়ভূষণের মা রিলস দেখেন। অ্যালগরিদমের জাদুবলে ওঁর মুঠোফোনে দেব-দেবী-স্বামীজি-গুরুজির রিলস বেশি আসে। বাবাজিরা কখনও সখনও ধর্ম ছেড়ে ইতিহাস বিষয়েও প্রবচন দেন। ইতিহাস সর্বজনীন, এই বিষয়ে সকলে নিজেদের বক্তব্য রাখতে পারেন। সোচ্চারে রাখতে পারেন। সেলাই মেশিন চালানোর জন্য ছয় মাসের ট্রেনিং নিতে হলেও বিনা প্রশিক্ষণে ইতিহাসবিদ হওয়া যায়। ব্যাপারটা বড্ড সহজ। ইদানীং অমিয়ভূষণের মায়ের মনে একটা ধারণা বেশ বদ্ধমূল হয়েছে। এক্ষেত্রে পতিদেবের মতামতের প্রভাবের চেয়ে প্রবচনের মাঝেমাঝে রাজনৈতিক ভাষ্যের সংমিশ্রণ বেশি প্রভাবিত করেছে। ওঁর একটা বেশ বদ্ধপরিকর ধারণা হয়েছে যে বিড়ি নয়, ভোটের বোতামই স্বর্গের সিঁড়ি। সঠিক বোতাম না টিপতে পারলে বুঝি ধর্মচ্যুত হতে হয়। পুণ্যের রথ বুঝি ভূমিস্পর্শ করে! অমিয়ভূষণের মা আমিষ খাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন। সে অবশ্য ভালো কথা, বেশি মানুষ নিরামিষ ভক্ষণ করলে পাঁঠার মাংসের দাম কম হবে। কেউ নিরামিষ খাদ্যাভ্যাস গ্রহণ করতে চাইলে সব সময় তাঁকে উৎসাহিত করা একজন নাগরিকের অবশ্যকর্তব্য। সমস্যাটা হল ইলিশ মাছ খেয়ে ভালো করে হাত না ধোয়া অমিয়ভূষণের মা এখন নিরামিষ বাসনে খান, সবার হাতের রান্না খান না, বাড়িতে আমিষ ঢোকা বারণ। বাইরে থেকে খেয়ে এলে আপত্তি নেই, তবে বাড়িতে চলবে না। বাবাজিদের প্রবচন শুনে ওঁর এই ধারণাটাও প্রবল হয়েছে যে আমিষের সংস্পর্শে ধর্ম থাকে না। কয়েকশো বছর আগেও এই বাংলায় সমুদ্রযাত্রা করলে জাত থাকত না।

ইতিহাস ব্যাপারটা অনেকটা মোড়ের মাথায় রাখা একটা ঢাকের মতো। কেউ এসে টাক ডুমা ডুম করছে, কেউ হুক্কা হুয়া করছে, কেউ বা এসে ঢাকটার ওপর বসে পডকাস্ট বানাচ্ছে। বলছে সবাই, কিছু না কিছু বক্তব্য সবার আছে ইতিহাস বিষয়ে। শুধু বক্তব্য নয়, রীতিমতো পাণ্ডিত্য রয়েছে। এক-একজন গড়ে এক ডজন রোমিলা থাপার ব্রেকফাস্টে গিলে খান এবং ঢেঁকুর তোলেন।

মোদ্দা কথাটা হল অমিয়ভূষণ ইতিহাস লিখছে। রচনা তো ভালোই লিখত, এখন ইতিহাস রচনা করছে। নতুন ইতিহাস রচনা। যেমন ইতিহাস রচনায় প্রতিবেশী দেশের অনেক মানুষ ত্রিশ লক্ষ বাঙালির লাশের ওপর দাঁড়িয়ে পাকিস্তানকে মিত্রশক্তি হিসেবে মনে করে।

টি-শপ ইউনিভার্সিটি থেকে আমরা সফলভাবেই হোয়াটসঅ্যাপ ইউনিভার্সিটিতে উত্তরণ করেছি। টি-শপ ইউনিভার্সিটিতে অবশ্য ডায়লগ হত, হোয়াটসঅ্যাপ ইউনিভার্সিটিতে ডায়লগের মোড়কে অবশ্য ব্যাপারটা মনোলগ বা ডুয়োলগ। ইউনিভার্সিটির স্বঘোষিত বা নিযুক্ত প্রফেসরদের নোট এবং ছাত্র-ছাত্রীদের দাড়ি-কমা-সহ সেই নোট মুখস্থ। তারপর নবলব্ধ জ্ঞানের বিপুল প্রচার। রমরমিয়ে চলছে বিশ্ববিদ্যালয়। অমিয়ভূষণের, অমিয়ভূষণের সুযোগ্য পিতার মতো একদা এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক ছাত্রই এখন নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের সদ্যনিযুক্ত বা স্বনিযুক্ত অধ্যাপক। অমিয়ভূষণের পরিবার বাংলার এক আদর্শ পরিবার। অনেক বছরের স্বপ্ন এইরকম পরিবার বাংলার কোণে কোণে ছড়িয়ে দেওয়ার। তা হবে প্রায় একশো বছর।

 

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 5395 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...