মায়ের আঁচলের মতো পৃথিবী

প্রবুদ্ধ বাগচী

 

যাঁরা বুদ্ধদেব বসুর সঙ্গ নিঃসঙ্গতা ও রবীন্দ্রনাথ বইটি পড়েছেন তাঁরা জানেন এক বিশেষ যুগমুহূর্তে, মূলত নোবেলপ্রাপ্তির পর ছাড়া বিশ্বজোড়া রবীন্দ্রনাথের যে সুউচ্চ মূর্তি তার মৌলিক ক্ষয় শুরু হয় এক-দেড় দশক পর থেকেই। দেবপ্রতিম মানুষটির পোশাক একবার মাত্র ছুঁয়ে দেখবার জন্য নেদারল্যান্ডসের একটি অখ্যাত রেলস্টেশনে একদল তরুণী বাধ্য করেছিল ট্রেন থামিয়ে দিতে, যার যাত্রী ছিলেন আমাদের কবি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের রণাঙ্গনে নিহত কবি উইলফ্রেড আওয়েনের শোকাস্তব্ধ মা হন্যে হয়ে খুঁজে ফিরছিলেন টেগোর নামের এক ভারতীয় কবিকে কারণ তাঁর নিহত সন্তানের জামার পকেটে পাওয়া গিয়েছিল রবীন্দ্রনাথের এক অমোঘ কবিতা— ‘যাবার বেলায় এই কথাটি বলে যেন যাই/যা দেখেছি যা পেয়েছি তুলনা তার নাই।’ রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, তরঙ্গ মিলায় যায় তরঙ্গ উঠে। কার্যত দেশের বাইরে তাঁকে ঘিরে উচ্চকিত এই ঊর্মি স্তিমিত হতে বেশি সময় লাগেনি। একটা সময় ইয়েটসের মতো কবিও আর রবীন্দ্রনাথের লেখা পছন্দ করতেন না। টিএস এলিয়ট প্রকাশ্যে বলেছিলেন টেগর ইজ নট মাই কাপ অফ টি। বিশ্বকবি নামক এক বিচিত্র বিশেষণে আমরা তাঁকে আগলে রাখলেও আসলে সতত পরিবর্তনশীল জগতে কেউই বিশ্বকবি শিরোপা পেতে পারেন না।

এবার আমাদের ভাবনা ঘুরে যাবে পৃথিবীর অন্যতম সেরা দার্শনিক তথা সামাজিক রাজনীতি ও রাষ্ট্রনীতির আরেক মনীষা কার্ল মার্কসের দিকে। তিনি রবীন্দ্রনাথের থেকে আরেকটু পুরনো যুগের প্রতিভা, কিন্তু ব্যাপ্তিতে ও চিন্তায় তাঁর অবস্থান আরও অন্যতর মাত্রা এনেছে মানুষের সভ্যতার কাছে। প্রাচ্যের এক বঙ্গভাষী কবি-সাহিত্যিকের কাছে সেই প্রত্যাশা সম্ভবত কারও ছিল না। মার্কসের অনুধ্যান ছিল একদম আলাদা। সমাজ ইতিহাসের ধারাবাহিকতার পথ বেছে নিয়েও মূলত তিনি গড়তে চেয়েছেন সাম্যের এক স্বপ্নিল আকাশগঙ্গা। আর তারই সূত্রে তাঁকে তন্নতন্ন করে খুঁজতে হয়েছে মানবসভ্যতার ইতিহাসের স্তরের পর স্তর, দর্শনভাবনার ধারাবাহিক বিন্যাস এবং জাতি হিসেবে মানুষের মহত্বের মাত্রাও। একজন কবি যেমন স্বপ্ন দেখেন ভাষা ও শব্দের মিলনে তিনি নির্মাণ করবেন এক সবুজ শস্যক্ষেত্র, মৌলিকভাবে মার্কসের চেতনা তার থেকে আলাদা ছিল না। কবিতা তিনিও লিখতেন, সাহিত্যের দর্শনের পাঠ নিতেন, বিতর্ক করতেন, আর ভাবতেন এমনকি কোনও স্বপ্ন-সুষমা মেলে দেওয়া যায় না মানব-ইতিহাসের সামনে, যেখানে সাম্যই হবে প্রতিটি মানুষের ডাকনাম। এই অনুসন্ধিৎসা থেকেই জেগে ওঠে তাঁর সেই উচ্চারণ, এতদিন দার্শনিকরা জগৎকে কেবল ব্যাখ্যা করেছেন আমাদের কাজ তাকে পাল্টে দেওয়া। এর চেয়ে সৌন্দর্যময় অভীপ্সা আর হয় নাকি? শুরু হল তাঁর সেই পাল্টে দেওয়ার স্পর্ধা, একদিন অনেক পথ পেরিয়ে তিনি খুঁজেও পেলেন সেই মহাসড়ক যে পথের শেষে আলোর ঠিকানা। তারপর দশক গড়াল, শতাব্দী গড়াল, দুনিয়া অনেক পাল্টে পাল্টে গেল, আর আমার দেশের রবীন্দ্রনাথের মতোই গত কয়েক দশক ধরে একদল মানুষের কাজই হল তাঁর মতাদর্শকে বর্জ্য বলে প্রমাণ করা। তারা বিশেষ চরিত্রের মানুষ, একদলকে মাথায় চড়াতে গেলে তাদের নামাতে হয় আরেক দলকে। এই খেলা মানবসভ্যতার বহু পুরনো ক্ষতের মতো।

কিন্তু কার্ল মার্কসের যে বহুবিধ গবেষণা ও মতাদর্শ নিয়ে গভীর নিরীক্ষা, তার ঠিক কোন অংশটা এত দূর অপাংক্তেয়? যাদের সমস্ত চিন্তা মার্কস-বিরোধিতায় নিমজ্জিত এবং যে কোনও ছলে-বলে-কৌশলে তারা মানবজাতির নিবিড়তর ইতিবাচক উল্লম্ফনের জন্য মহামতি মার্কসকে প্রধান বেড়া বলে মনে করে, তাদের বাগাড়ম্বরের মধ্যে মূল যুক্তিটা বেশ ধোঁয়ামাখা ও অস্বচ্ছ। ‘ইজম’ ব্যাপারটা ভালো কি মন্দ— সে বিষয়ে মানবসভ্যতা এখনও কোনও সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি। কিন্তু সভ্যতার ধাপে ধাপে নানান ‘ইজম’ এসেছে, আজও আছে। মার্কস তেমনই এক মতাদর্শের আবিষ্কারক, যার পেছনে আছে তাঁর গহীন পঠন, নিবিড় অন্বেষণ, সামাজিক বহমানতা ও ইতিহাসের তন্নিষ্ঠ অবলোকন। সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক-অর্থনীতি নামক এক নতুন বিশ্ববিদ্যার প্রতিষ্ঠা। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক দর্শন দুনিয়ায় ভাববাদী একাধিপত্য খণ্ডন করে বস্তুবাদী তথা যুক্তিবাদী দর্শনের ভূমিকাকে প্রশস্ততর করা। এতে আপত্তির কী আছে? আপাততভাবে এতে আপত্তির কিছু না থাকলেও, এগুলোকে ঘিরেই প্রধান ‘সমস্যা’। কারণ নিছক অ্যাকাডেমিক গবেষণা বা তত্ত্বগামী শ্রম নয়— মার্কসের সারা জীবন আসলে এক লড়াই, যার একমাত্র অভীষ্ট শোষণমুক্ত এক সামাজিক মরূদ্যান। সাম্যের ধারণা মানুষের সভ্যতার আদিকাল থেকেই ছিল। কিন্তু তাকে একটা সুস্থায়ী তাত্ত্বিক কাঠামোয় বেঁধে, তার শিকড়ের সন্ধান— মার্কসের সবচেয়ে বড় জয়। সাম্যবাদের স্বপ্ন দেখানোর পাশাপাশি, আসলে কেন অসাম্য, কেন কেবল বড়লোকরাই মোটরগাড়ি চড়বে আর গরিবেরা কেনই বা তার তলায় চাপা পড়বে— কেন ‘পিঠেতে টাকার বোঝা, তবু সেই টাকাকে যাবে না ছোঁয়া’— এই প্রশ্নগুলোর একটা ঐতিহাসিক সমাধান গড়ে তুলতে পারলেন তিনিই। আর উদ্বৃত্ত শ্রমের ‘ভূতের বেগার’ কীভাবে সম্পদের বোঝা বাড়ায় আর সংহত করে শ্রেণি-আধিপত্য, কেমনভাবে এই আত্মসাৎ করা শ্রম পুঞ্জিত হয় অতি-উৎপাদনের সংকটে, কীভাবে উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত শ্রমজীবী ক্রমশ মানবিক সত্তাহীন এক অস্তিত্বে রূপান্তরিত হতে থাকে— এর সবই তাঁর চিন্তার ফসল। এবং এর একটাও বেঠিক নয়। ইউরোপের শিল্পবিপ্লবের ভিতর যা তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন আজকের দেড় শতকে সামাজিক উৎপাদনের প্রকরণ আকাশপাতাল পাল্টে গেলেও মৌলিক কোনও বদল হয়নি। পুঁজি তার নিজের ভাগ কড়ায় গণ্ডায় বুঝে নিয়ে আজও ‘রাজার এঁটো’ করে রেখে দিয়েছে একদল মানুষকে। ছাঁটাই হওয়া শ্রমজীবী থেকে ভূমিহীন কৃষক হয়ে গিগ-কর্মীরা কেউ এর বাইরে নয়। আসলে যন্ত্রটা একই আছে, গায়ের লেবেলটা বড়জোর একরঙা থেকে বহুরঙা হয়ে উঠেছে যুগের ফেরে।

শুধু তাই বা বলি কেন, নিজের প্রসাধিত তত্ত্বকে নিয়ে কীভাবে এগোনো যায় সেই আরাধ্যের ব্রতযাত্রায় তাও দেখালেন মার্কস। কমিউনিস্ট দলের ধারণা ও তাদের ঐতিহাসিক ভূমিকা যে এই রক্তাক্ত পথের শেষে উড়িয়ে দেবে জয়পতাকা, এই প্রতীতি মানুষের মনে বুনে দিয়ে গেলেন মার্কস। প্রায়োগিক মার্কসবাদের সমাজতন্ত্রকে মার্কস দেখে যেতে পারেননি— সম্ভবত এখানেই সেই উদ্যত আক্রোশের সূচি নিহিত, যা সংগঠিতভাবে মার্কসের সমালোচনা আর নিন্দাবাদকে জোরালো করে। ফলিত মার্কসবাদের প্রয়োগ যে গত দেড়শো বছরে সামাজিক সম্পদের সুষম বণ্টন ও মানুষের মৌলিক অধিকারকে আগলে রেখেছে, তা জোর করে বলাটা ঠিক নয়। কিন্তু মূলত এই বিচ্যুতিগুলিকে সামনে রেখেই সমালোচনা করা হয় মার্কসের, কারণ সেটাই সহজতর পথ। কিন্তু তা বলে কি মার্কসের অভিনিবেশ ব্যর্থ? তা তো নয়। তাঁর বিপুল গবেষণা ও লিখিত ভাবনাকে ১০০ খণ্ডে প্রকাশিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল একসময়। এত বিপুল লিখেছেন তিনি, এত সুবিস্তৃত তাঁর এষণা। এর মধ্যে সবটাই কালান্তরে প্রাসঙ্গিক থাকবে, এটা হতেই পারে না। রবীন্দ্রনাথের প্রথম জীবনের লেখা পড়লে আমাদের এখন নুন ছাড়া তরকারির মতোই মনে হয়। শেক্সপিয়ারের সব রচনাই কি সমান ভালো বা কালজয়ী? তাই বলে রবীন্দ্রনাথ বা শেক্সপিয়ার অবান্তর হয়ে যান না। হন না কার্ল মার্কসও। হতেই পারে, তাঁর শ্রেণিসংগ্রামের তত্ত্ব বা ব্যক্তিগত সম্পত্তির অবলুপ্তি নিয়ে আজ আমাদের কিছু কিছু জিজ্ঞাসা জাগে। ‘উইদারিং অ্যাওয়ে অফ স্টেটস’, বা রাষ্ট্রের অবলুপ্তির চিন্তাকে আজকের বিশ্বে মিলিয়ে নেওয়া মুশকিল। তবু সেটা একটা গভীর নিহিত স্বপ্নের উপকূলে নোঙর ফেলার অকৃত্রিম বাসনা। ‘সভ্যতার সংকট’-এ রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, “আজ আশা করে আছি, পরিত্রাণকর্তার জন্মদিন আসছে আমাদের এই দারিদ্র্যলাঞ্ছিত কুটীরের মধ্যে; অপেক্ষা করে থাকব, সভ্যতার দৈববাণী সে নিয়ে আসবে, মানুষের চরম আশ্বাসের কথা মানুষকে এসে শোনাবে এই পূর্বদিগন্ত থেকেই।” সত্যি কি কেউ এসেছেন কবির চার আনা আশা পূর্ণ করে? তার মানে কি তিনি অর্থহীন? অথচ তাঁরই লেখা: জয় হোক মানুষের, ওই নবজাতকের, ওই চিরজীবিতের— এই উচ্চারণের  মর্মবাণী আমাদের স্বপ্ন দেখার স্পর্ধা বাড়িয়ে দেয় নাকি? হয়তো নিজেদের সবটুকু বিশ্বাস দিয়ে ছুঁতে পারি না, তবু ভাবতে ভালো লাগে। ভালো লাগে— মানুষের একদিন আর কোনো শাসক লাগবে না, রাষ্ট্র লাগবে না, প্রয়োজন ফুরিয়ে যাবে সীমান্তের। পাখির জন্য কোনো কাঁটাতার থাকে না, মানবজাতিরও থাকবে না।

কিন্তু পাশে পাশে এও তো সত্যি— মানবসভ্যতার প্রথম সমাজতন্ত্রের পত্তন হওয়ার সোয়া শতক পরেও মার্কসের অর্থনৈতিক সন্ধিৎসা আজও কাঠফাটা রোদের মতোই প্রখর ও প্রাসঙ্গিক। একদিকে যেমন তার প্রয়োগ নিয়ে চলেছে যুগ-যুগান্তের বিতর্ক, আলোচনা, মন্থিত হয়েছে মতের পর মত; অন্যদিকে তৈরি হয়ে চলেছে নানা বিকল্প মডেল মার্কসের মৌলিক ভাবনাকে আহত না করেই। গোড়ার দিকে লেনিন, ট্রটস্কি, স্তালিন— পরে গ্রামসি, তারপরে মাও— এমনকি লাতিন আমেরিকার বেশ কিছু দেশে বামপন্থী অভ্যুত্থান হয়েছে লিবারেশন থিওলজি নামক এক নতুন তত্ত্বের আওতায়, যার নেতৃত্ব দিয়েছেন জেসুইট পাদ্রিরা। ভেনেজুয়েলা, ভিয়েতনাম একরকমভাবে ভেবেছে নতুন গল্প। কিউবা ভেবেছে আরেকরকমভাবে। একটা তত্ত্ব যদি সজীব না থাকে, তাহলে তাকে ঘিরে এত স্তরান্তরী বিতর্ক হতে পারে কি? এটা যতটা না মার্কসবাদের জয়, তার চেয়ে বেশি জয় স্বয়ং মার্কসের।

 

রাজনৈতিক অর্থনীতি নিয়ে মার্কসের নিরীক্ষণ যে অব্যর্থ তার সবচেয়ে বড় দৃষ্টান্ত আজকের দেশ-দুনিয়া। দ্বিমেরু বিশ্বের অবসানের পর সারা দুনিয়া জুড়ে পুঁজিবাদের যে মৃগয়া,  বিশ্বায়নের নামে একতরফা ক্ষমতার দাপ ও চাপ সেখানে প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বর ঠিক কোথায়? নিজেদের চারপাশে ফিরে দেখলে বা কান পাতলে কি শোনা যায় না দরিদ্র মানুষ ক্রমশ দরিদ্রতর হয়েছেন? অসাম্য বেড়ে চলেছে গুণোত্তর প্রগতিতে, মুষ্টিমেয়র হাতে সঞ্চিত হচ্ছে অধিকাংশ সম্পদ— সমৃদ্ধির খোলা বাতাসে তাদের শরীর জুড়ে আমুদে স্নিগ্ধতা আর বাকিরা দুমড়ে-মুচড়ে ৬৯ঞ হয়ে দিনাতিপাত করছেন দুর্যোগে। তাদের বুকের উপর মুনাফার পাহাড়, নাকে মুখে বাড়তি কার্বনের নিঃসরণ— টিনের তলোয়ার নাটকের ভাষায় তাঁরা নিচের তলার মানুষ। ক্রমশ এই নিচের তলাটা গভীর গভীরতর হয়ে নিমজ্জমান মানুষের খাদান। এই ভবিষ্যতই কি উৎকীর্ণ করে যাননি মার্কস? কে বলে মহাপুরুষের উক্তিগুলি শুধুই কোলাহল করে? কোলাহল নয় মন্ত্র।

আমাদের দেশের মহাপুরুষদের মধ্যে বিদ্যাসাগরের নারীশিক্ষা ও শিক্ষাসংস্কারের মডেল সুস্থায়ী হয়নি। রামমোহনের ধর্ম-সংস্কার, রামকৃষ্ণের সর্বধর্ম-সমন্বয়ের প্রতিমা কবেই বিসর্জিত। গান্ধির গ্রাম-স্বরাজের কথা আর গোঁড়া গান্ধিবাদীরাও মুখে আনেন না। বাঙালির শিল্প-উদ্যোগের বিষয়ে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রের স্বপ্ন অস্তমিত। রবীন্দ্রনাথের নিবিড় স্বপ্ন ও কর্মকে দুরমুশ করে সেই কবেই শান্তিনিকেতন পরিণত হয়েছে স্বার্থান্বেষীদের আড়তে। এমনকি তুলনায় সংহত রামকৃষ্ণ মিশনেও অবশ হয়ে গেছে স্বামীজির মৌলিক চিন্তার স্রোত। এটা প্রতিষ্ঠানের নিয়ম। তাই মার্কসের নির্দেশিত পথে সাম্যতন্ত্রের ওঠা-পড়া, পিছিয়ে যাওয়া আসলে কিছুই প্রমাণ করে না। ১৮৯৯ সালের শেষ দিনে রবীন্দ্রনাথ তাঁর নৈবেদ্য-র দুটি কবিতায় অনুমান করেছিলেন আসন্ন বিংশ শতাব্দী কতদূর পর্যন্ত ডেকে আনতে চলেছে মানবসভ্যতার সংকট যার সূত্র নিহিত থাকবে হিংসা-বিদ্বেষ লোভ আর আগ্রাসী ধনবাদের লালসায়। কার্ল মার্কসও অন্তত তাঁর বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের ভেতর দিয়ে বুঝতে পেরেছিলেন আগামী শতকের মানুষ কীভাবে ধ্বংসের মুখোমুখি হবে— পুঁজি তার করাল ডানা নিয়ে ডেকে আনবে গভীর তমিস্রা। দু-দুটি বিশ্বযুদ্ধের মরশুম তখন অনেক দূর যাদের গর্ভসঞ্চার ঘটেছিল আসলে বিশ্বপুঁজির নিরন্তর দ্বন্দ্বের রতিক্রিয়ায়। সম্ভবত আজ এত বছর ধরে এক পৃথিবী সমালোচকেরা এত কাঁড়ি কাঁড়ি নিন্দাডিম্ব প্রসব করেছেন কারণ তাঁদের গায়ে আসলে জলবিছুটির জ্বালা— মার্কসের বীক্ষণ শুধু সত্য হচ্ছে তাই নয়, তা আজও জ্বালিয়ে রেখেছে বিকল্প এক নির্মাণের ভাষ্য। দেশেবিদেশে মানুষের প্রতিবাদ আজ সমুদ্যত, বাধাহীন। ইতিহাস শেষ হয়ে যাচ্ছে বলে যারা উত্তর-সত্যের পূজারী হয়েছিলেন তাঁরা বুঝেছেন এটা শতাব্দীর সেরা জুয়াচুরি আর মানুষের মগজে কারফিউ জারি রাখার ফিকির। ইতিহাস যে থেমে থাকছে না, আলোর পথযাত্রী মানুষের চেতনাজগতে যে নিরন্তর খুলে যাচ্ছে নতুন নতুন ফ্রন্ট— এর চেয়ে বড় ছুঁচোবাজি আর কীই বা হতে পারে? সেই অনির্বাণশিখা জ্বালিয়ে রেখেছেন ২০৯ বছর বয়সি এই শ্মশ্রুময় মনীষা।

যাঁরা তর্ক করে বলেন, মডেল সবসময় ছুঁয়ে দেখার মতো হতে হয়, তাঁরা ভুল বলেন। সমাজবিজ্ঞানের মডেল ল্যাবরেটরিতে তৈরি হয় না— বিজ্ঞানের সব মডেলও কি হয়? আইনস্টাইন যে আপেক্ষিকতার তত্ত্ব এনে বিশ্বজয় করেছেন, তারও তো কোনও পরীক্ষাগারে প্রমাণিত সত্য ছিল না; কারণ তা করা সম্ভব নয়। মহাকাশবিদ্যা বা ব্রহ্মাণ্ডবিদ্যার বহু থিওরি অনুমান, তারপর তথ্য দিয়ে তার কাঠামো তৈরি। মার্কসের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা তাই। আসল কথা হল স্বপ্নের একটা গন্তব্য নির্মাণ, সংখ্যাগরিষ্ঠের অবস্থান সম্পর্কে গভীর মমত্ববোধ। ‘এমন একটা পৃথিবী চাই/মায়ের আঁচলের মতো/আর যেন ঐ আঁচল জুড়ে/গান থাকে/যখন শিশুদের ঘুম পায়।’ সবার পিছে, সবার নিচে, সব-হারাদের মাঝে, যে মানহারা মানবের মুখ খুঁজেছেন রবীন্দ্রনাথ, কার্ল মার্কস নামক বটবৃক্ষটিও আজীবন সেই তাদেরই জন্য বিস্তার করতে চেয়েছেন ছায়ার শান্তি। সফল আর সার্থকনামা মানুষদের নিন্দে-মন্দ করার জন্যই লোক ভাড়া করতে হয়।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 5395 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...