আশরাফ আহমেদ
প্রতিভাবানরা শিশুকালেই তাঁদের মেধার স্বাক্ষর রাখেন বলে শুনেছি। মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ এক দৌড় প্রতিযোগিতায় উলটোদিকে দৌড়ে বন্ধুকে হারিয়ে দিয়েছিলেন। শের-এ বাংলা একে ফজলুল হক এক বসায় চল্লিশটি আম খেয়ে ফেলতে পারতেন। ডঃ মোহাম্মদ ইউনুস নিজের নাম বদলে অন্য প্রাপকের উদ্দেশে পাঠানো ম্যাগাজিনের মালিক হয়েছিলেন। এর সবই বইয়ে পড়েছি। তাঁরা পড়াশোনাতেও ছিলেন ক্লাসের সেরা। আমি কখনও এমন মেধাবী ছিলাম না; ‘মাকাল ফল’ বলে আম্মার ভর্ৎসনা শুনে শুনেই বড় হয়েছি। মাকাল ফল দেখতে খুব সুন্দর হলেও ভেতরটা কালো, কোনও কাজের না। প্রায় সাত দশক পর আজও এ ধরনের দোষারোপ শুনতে হয় স্ত্রীর মুখে।
কুমিল্লা আওয়ার লেডি ফাতেমা স্কুলে কেজি ওয়ান থেকে কেজি টুতে উত্তীর্ণ না হতে পারা দিয়ে যে শুরু হয়েছিল, প্রতি পরীক্ষায় তিন-চার বিষয়ে ফেল করে করেই ক্লাস এইট পর্যন্ত আসতে পেরেছিলাম। ইতোমধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়া অন্নদা হাইস্কুলে ক্লাস সিক্সের ছাত্রাবস্থায় একদিন সবাইকে অ্যাসেম্বলিতে জড়ো করা হল। নিজের দুই পাশে দীর্ঘদেহী চারজনকে দাঁড় করিয়ে হেডমাস্টার বললেন, এরা চারজন এই স্কুলের গর্ব; কারণ এরা ম্যাট্রিক পরীক্ষায় ফার্স্ট ডিভিশন পেয়েছে। তাদের সম্মানে আজ স্কুল ছুটি দেওয়া হল। সেদিনই প্রথম বুঝেছিলাম ম্যাট্রিকে ফার্স্ট ডিভিশন পাওয়া একটি ভালো ব্যাপার। তার ওপর এই চারজনের একজনের নাম ছিল আশরাফ, আমার নাম। কাজেই আরও চার-পাঁচ বছর দেরি থাকলেও সেদিন থেকে আমিও ম্যাট্রিকে ফার্স্ট ডিভিশন পাব বলে বিশ্বাস করতাম। কিন্তু প্রতি বছর কয়েকটি বিষয়ে আমার ফেল করা কেউ ঠেকাতে পারছিল না।
তখন গল্প-উপন্যাস পড়ার দিকে আমার খুব ঝোঁক হয়েছে। স্বপনকুমারের রহস্য গল্পের চার আনা সিরিজ, ছয় আনা সিরিজ শেষ করে দস্যু বাহরামের সবগুলো বই শেষ করেছি। নীহারঞ্জন গুপ্তের অনন্য সৃষ্টি তুখোড় ডিটেকটিভ কিরীটি রায়কে নিয়ে কোনও বই বেরোলেই পড়ে ফেলি। আরও ছিল শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়, জরাসন্ধ, তারাশঙ্কর, আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, ধীরাজ ভট্টাচার্য, এবং তেমন আরও অনেকের বই। এরপর হাতে এল শরৎচন্দ্রের দত্তা। বইটি এতই ভালো লেগেছিল যে পরপর দুইবার পড়ে ফেলেছি। ক্লাস এইটের নয়মাসিক পরীক্ষায় ছয় সাবজেক্টে ডাব্বা মারলেও আমার কোনও ভ্রূক্ষেপ নেই। গল্পের নায়িকা বিজয়াকে কোনওমতেই মাথা থেকে ঝাড়তে পারছি না। অনিচ্ছাসত্ত্বেও পিতৃমাতৃহীন এই যুবতীর আসন্ন বিবাহের যন্ত্রণায় ক্ষতবিক্ষত হই। ঠিক এমন সময়ের একটি সন্ধ্যা।
দত্তা বইটি তৃতীবারের মতো পড়ছি ক্লাসের খোলা বইয়ের ওপর রেখে। একই টেবিলের অপর প্রান্তে ছোটআপা পড়ছেন। ভেতরের ঘর থেকে তজবিহ জপতে থাকা আমার আম্মা যখনতখন এসে দেখে যেতেন আমরা পড়ছি কিনা। ছোটআপার দায়িত্ব ছিল আম্মা এলে টেবিলে মৃদু দুটি টোকা দিয়ে আমাকে সাবধান করে দেওয়া যেন গল্পের বইটি পড়ার বইয়ের নিচে চালান করে দেই। এই কাজটি আমরা পালাবদল করে করতাম। সেদিন যে কী হয়েছিল, তিনি টোকা দিতে ভুলে গেলেন। ক্লাসের পড়া ছেড়ে গল্পের বই পড়ছি দেখে আম্মা তজবিহ জপার কথা ভুলে গেলেন। এক হাতে দত্তা-কে টেনে নিয়ে আরেক হাতে কান ধরে বসা অবস্থা থেকে আমাকে টেনে তুললেন। কল্পনা করুন পঞ্চাশ পাউন্ডের একটি দেহের ভার ছোট ও পাতলা একটি কান কি বইতে পারে? কানটি কড়কড় শব্দে ব্যথায় কঁকিয়ে উঠল। দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে আম্মা প্রচণ্ড শক্তিতে আমার কান বরাবর থাপ্পড় লাগালেন। ঝিন ঝিন করে উঠল মাথা। আমার সেই বয়সের কথা ভাবুন, ১৩/১৪ বছরের বালক হলেও আত্মসম্মানবোধ আমার যথেষ্ট হয়েছে। বিদ্রোহ করে উঠল দেহমন।
প্রতিবাদ করতে যাচ্ছি এমন সময় শুনতে পাচ্ছি আম্মা বলছেন— বেতমিজ, বেশরম, বেহায়া, তোর শরম নাই, লজ্জা করে না, ছয় সাবজেক্টে ফেল করছস, দুদিন পরে ম্যাট্রিক পরীক্ষা, এখনও তুই গল্পের বই পড়তাছস! যে গতিতে আমি কানটানা ও থাপ্পড়ের প্রতিবাদ করতে উদ্যত হয়েছিলাম কথাগুলো শুনে একই গতিতে শান্ত হয়ে গেলাম।
আম্মা সত্যিই বলেছেন, আর দুদিন পর ম্যাট্রিক পরীক্ষা, দুই বছর আগে সেই পরীক্ষায় ফার্স্ট ডিভিশন পাব বলে নিজেই প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, অথচ আমি ছয় সাবজেক্টে ফেল করেছি! সেদিন থেকে যতদিন স্কুলের ছাত্র ছিলাম আমি আর গল্পের বই পড়িনি। দু-বছর পরের ম্যাট্রিক পরীক্ষায় আমাদের স্কুল থেকে মোট ছয়জন ফার্স্ট ডিভিশন পেয়েছিলাম। ক্লাস ফাঁকি দিয়ে প্রতি সপ্তাহে বলাকায় একটি করে সিনেমা দেখেও ঢাকা কলেজের ৭৫ শতাংশ ফার্স্ট ডিভিশনওয়ালাদের ভিড়ে লুকিয়ে থেকে আমিও তাদের একজন হয়ে গিয়েছিলাম।
বিষয়ের প্রতি আকর্ষণে নয়, ডঃ কামালউদ্দিন আহমাদের ক্যারিশমার কথা শুনে শুনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ফর্মে প্রাণরসায়ন বা বায়োকেমিস্ট্রি লিখে দিয়েছিলাম। ইন্টারভিউ দিতে গিয়ে ডঃ নুরুল হক খানের ইস্পাতকঠিন চেহারা দেখে অথবা জীবনে প্রথমবারের মতো এয়ারকন্ডিশনের ঠান্ডা বাতাসে বসে ঠকঠক করে কাঁপছিলাম। তিনি ইথাইল অ্যালকোহল (বা মদ) এবং অ্যাসেটিক অ্যাসিড (বা সির্কা)-এর বিক্রিয়ার সমীকরণ লিখতে বললেন। নিষিদ্ধ ফল ভক্ষণ করে আদম স্বর্গ থেকে বিদায় নিয়েছিলেন। তাঁর সুযোগ্য বংশধর হিসাবে কলেজে থাকতেই আমি আকৃষ্ট হয়ে কোরানে নিষিদ্ধ মদের অনেক কিছুই জেনে নিয়েছিলাম। ফলে হাত কাঁপতে থাকলেও সমীকরণটি আমি ঠিকই লিখেছিলাম। তিনি অদৃশ্য এক হাসি দিয়ে একটি সাদা কাগজ বাড়িয়ে দিলেন। অন্য কোনও বিভাগে সুযোগ পেলেও প্রাণরসায়ন ছাড়া আর কোথাও যাব না মর্মে দিন, তারিখ ও সাক্ষী-সহ সই করতে বললেন। ভাবছিলাম স্যার নিশ্চয়ই মদের নেশায় সবকিছু ভুলে আছেন। কারণ কোর্টের স্টাম্প ছাড়া এই ধরনের সইয়ের যে কোনও মূল্য নেই তা তিনি যেমন জানেন, আমারও অজানা ছিল না।
ক্লাস শুরু হলে সহপাঠীদের মাঝে চারটি মাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ডের মেধাতালিকার ন্যূনতম চারজনকে পেয়ে বেশ ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। ক্লাস শুরুর এক সপ্তাহের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ত্রাস, এনএসএফের গুণ্ডা পাঁচপাত্তু নিহত হলে বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে যায়। ভাবলাম, বাঁচা গেল, মেধাবীদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পড়াশোনা আর করতে হবে না। ডিসেম্বরে বিশ্ববিদ্যালয় খুললেও ক্লাস না করার অজুহাতে বিখ্যাত ‘ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে’ ভিড়ে গেলাম— শুনেছিলাম ছাত্ররাজনীতিতে একবার নাম লেখাতে পারলে আর পড়াশোনার দরকার নেই, সেই পরিচয়েই সরকারি বড় বড় পদ বাগানো যায়। আমাকে সুযোগ দিয়ে পুরো আন্দোলনের সময়জুড়ে শিক্ষকরা হাতে গোনা কয়েকটি ক্লাস নিয়েছিলেন। দেখতে দেখতে গ্রীষ্মের ছুটি এসে গেল। ছুটি ফুরালেই বার্ষিক পরীক্ষা।
পড়াশোনা তো কিছুই করিনি, অথচ পরীক্ষায় পাশ করতে হবে। প্রস্তুতির জন্য পরীক্ষার দুই সপ্তাহ আগেই ফজলুল হক হলে ফিরে এলাম। রুমমেট ছিল ফার্মেসি বিভাগের ছাত্র খুলনার বিহারি-অভিবাসী ইলিয়াস মল্লিক। ব্যাচমেট হলেও নাদুসনুদুস দেহগতরে ও বয়সে আমার চেয়ে অনেক বড়, দিনের অধিকাংশই বিছানায় ঘুমিয়ে কাটায়। সেও আমার মতো একই দিনে ফিরে এসেছে। আমার হাতে কয়েকটি হালুয়ার বোতল দিয়ে কোনটি পেটের জন্য ভালো, কোনটি মস্তিষ্কের জন্য ভালো, প্রতিটির গুণাগুণ বর্ণনা করে খেতে বলল। একটি থেকে কিছুটা চেখে ফেরত দিতে গেলে সে রই রই করে উঠল, বলল, মেরে আম্মিজাননে আপনা হাতসে পাকায়া আওর বোল দিয়া, ক্যায়া তোমারা রুমমেটকো খিলাও। রুমমেট, ইয়ে সব আপ কে লিয়ে হ্যায়। ইয়ে হ্যায় ব্রেইন টনিক, আভি ইয়ে খাইয়ে। ইয়ে খানেসে ইমতিহান আসান হো জায়েগা। পড়াশোনা না করে শুধু ব্রেইন টনিক খেয়েই যদি পরীক্ষায় ভালো করা যায় সে তো মন্দ নয়। যেমন ভাবা তেমন কাজ। দেড় দিনেই ব্রেইন টনিকের বোতলটি শেষ করে ফেলেছিলাম।
কিছু বুঝে উঠতে পারার আগেই হলের বাসিন্দারা বাথরুমের একটি পায়খানা আমার নামে বরাদ্দ করে দিলে লজ্জায় শুধু কান নয়, সারা শরীরই আগুনের ন্যায় গরম হয়ে গেল। আমি জ্ঞান হারালাম। জ্ঞান ফিরলে নিজেকে আবিষ্কার করলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বিছানায়, জানলাম দুদিন আগে অ্যাম্বুলেন্সে করে আমাকে আনা হয়েছে। পাঁচদিন পর হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে একজনের কাঁধে ভর দিয়ে অধ্যাপক কামালউদ্দিনের সামনে হাজির হলাম। ডাক্তারের চিঠি দেখিয়ে বললাম স্যার, শরীরের সঙ্গে সঙ্গে আমার ব্রেইনের বারোটা বেজে গেছে, পরীক্ষা দিতে পারব না, ডাক্তার বলেছে বাড়িতে মা-বাবার তত্ত্বাবধানে পূর্ণ বিশ্রাম নিতে হবে দুই সপ্তাহ। কাজেই আর দশদিন পরের বার্ষিক পরীক্ষা থেকে আমাকে রেহাই দেওয়া হোক। স্যার বিচক্ষণ ব্যক্তি, রোগের জীবাণু যেন তাঁর বা অন্য ছাত্রের মাঝে ছড়িয়ে না পড়ে, আমাকে রেহাই দিয়ে সঙ্গে সঙ্গেই বিদায় করলেন। সবচেয়ে বড় কথা তাঁর নিজের ব্রেইনটি রক্ষা পাওয়া বেশি জরুরি ছিল।
রাতদিন বিছানায় শুয়ে, আম্মার বানানো পথ্য খেয়ে খেয়ে শীঘ্রই তরতাজা হয়ে উঠলাম। ঢাকায় ফেরার পথে তিনি বললেন, কপালে ফেল থাকলে হাসিমুখে ফেল করো কিন্তু বাবা, ওইসব ব্রেইন টনিক ফনিক কিন্তু খবরদার ছোঁবে না। পরদিন বিভাগে গিয়ে দেখি ঘণ্টাখানেক পরেই পরীক্ষা শুরু। সবাই পরীক্ষাভীতিতে জর্জরিত। কিন্তু মুক্তবিহঙ্গের মতো আমি নির্বিকার! যেহেতু ফেল করলেও আমার হারানোর কিছু নেই, সহপাঠীদের উৎসাহ দিতে তাঁদের সঙ্গে পরীক্ষার হলে গিয়ে বসলাম। এক ঘণ্টায় তিনটি পৃথক পৃথক খাতায় বায়োকেমিস্ট্রি, অর্গানিক কেমিস্ট্রি ও ফিজিক্যাল কেমিস্ট্রির উত্তর লিখতে হবে।
বায়োকেমিস্ট্রির পরীক্ষা ছিল খুবই সহজ। যেমন কয়েকটি প্রশ্ন ছিল ডিম, মাছ, মাংস, চাল, ফলমূল ও শাকসবজিতে আমিষ, শর্করা, ভিটামিন, মিনারেল ও পানি কী পরিমাণে আছে সে সম্পর্কিত। প্রতিটি প্রশ্নে সম্ভাব্য চারটি উত্তরের একটি বেছে নিতে হবে। ছাত্ররা মৃদু গুঞ্জনের মাঝে পরস্পরের দিকে অসহায়ের মতো তাকাচ্ছে, এসব তো আমাদের পড়ানো হয় নাই, বইতেও দেখিনি! দেখলাম পরীক্ষা তদারকিতে নিয়োজিত শিক্ষক মোহাম্মদ শওকত আনোয়ার স্যার অভিযোগকারীদের সামনে গিয়ে সঠিক উত্তরটি বলে দিচ্ছেন। কিন্তু আমি ভাবলাম এ আর এমন কী? এসব জানতে তো আর পড়াশোনা করতে হয় না। কাজেই ডিমে আমিষের পরিমাণ লিখলাম ৯০ শতাংশ, দুধে আমিষ ৯০ শতাংশ, চালে পানির পরিমাণ ০ শতাংশ, ইত্যাদি। শওকতস্যার আমার খাতাটি দেখে বললেন এসব কী লিখেছ, কাটো, সব কাটো। ডিমে লেখো ১০ শতাংশ, দুধে লেখো ৩ শতাংশ, চাউলে লেখো ১০ শতাংশ (এখানে আমার লেখা সংখ্যাগুলো সঠিক নাও হতে পারে)। আমিও বিনা বাক্যব্যায়ে তাঁর কথামতো সব লিখে গেলাম।
পরীক্ষার হলে শিক্ষক ছাত্রদের উত্তর বলে দিচ্ছেন, দুজনের ক্ষেত্রেই তা অনৈতিক হলেও তিনি যেহেতু শুধু আমাকেই অনুগ্রহ করছেন না তা দেখে সান্ত্বনা পেলাম। অন্যদিকে ঊনসত্তরের গণআন্দোলনের জোয়ারে এক বছরে মোট দুই মাসও আমাদের ক্লাস হয়েছিল কিনা সন্দেহ! তা স্মরণে রেখে মাত্র ছাত্রত্ব শেষে হওয়া শিক্ষক সহানুভূতিশীল হয়ে যদি আমাদের সাহায্যে এগিয়ে আসেন, তাঁকে কি খুব দোষারোপ করা যায়? অপরিচিত এই শিক্ষক যে তাঁর সহজাত গুণেই ছাত্রদের সাহায্য করছিলেন তা বলার আর অপেক্ষা রাখে না।
সপ্তাহ খানেক পর এক সকালে সবাই পরীক্ষার ফল জানতে উদগ্রীব হয়ে আছে। একটি ঘরে শিক্ষকরা ফলাফল যোগবিয়োগে ব্যস্ত। ভেতরে যাওয়া-আসা করা এক পিওনকে সবাই ঘিরে ধরছে নিজের নম্বরটি সম্পর্কে অগ্রিম জানতে। কিন্তু আমার আগ্রহ মোটেও নেই, কারণ ধরেই নিয়েছি ফেল আমি করবই, তথাপি প্রোমোশন আমার হবেই! কিছুক্ষণ পর বোর্ডে প্রত্যেকের প্রাপ্ত নাম্বারের লিস্টি টানিয়ে দেওয়া হলে সবাই তাতে হুমড়ি খেয়ে পড়ল। একজন এসে বলল এই তুমি তো সেকেন্ড হয়েছ! একেবারেই অবিশ্বাস্য! কেজি ওয়ানের পরীক্ষার মতো ফেল করার আশায় যেখানে অপেক্ষা করছি, সেখানে সেকেন্ড হওয়া অসম্ভব! ভাবলাম, এই সুযোগে শিক্ষকদের একটি শিক্ষা দিয়ে দিই, এত বড় ভুল তাঁরা কীভাবে করলেন? পরীক্ষা কমিটির প্রধান ডঃ আশরাফুল আলম স্যার বললেন নাম্বার তো আমি আর একা দিইনি, আমি যোগ করেছি মাত্র! এই বলে সব দোষ তিনি তিন পরীক্ষকের কাঁধে দিয়ে নিষ্কৃতি পেতে চাইলেন।
নিজের কোনও কৃতিত্ব ছাড়া সেই যে ‘ভালো ছাত্র’ আমি হয়ে উঠেছিলাম তা ভাঙিয়ে গত ছয়টি দশক কাটিয়ে দিয়েছি। ভালো ভালো চাকরি করেছি, সংসার পেতেছি। দুটি সন্তান মানুষ করেছি। তিনটি নাতিনাতনির দাদা হয়েছি। ১৯৬৯ সালের পরীক্ষার হলে শওকত আনোয়ার স্যার সেদিন যদি ডিম, দুধ ও চালের পুষ্টিগঠনের সঠিক উত্তরগুলি না বলে দিতেন তাহলে অনেক স্ট্যান্ড করা ছাত্রদের পেছনে ফেলে সেই যে আমি ‘ভালো ছাত্র’ হয়ে উঠেছিলাম, তা আর সম্ভব হত না— স্বামী, বাবা ও দাদা হলেও আজকের মতো এত গর্ব করে হয়তো বলতে পারতাম না। অথচ শওকত আনোয়ার স্যারের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা জানানো হয়নি আজও। এই লেখার মাধ্যমে তা করার চেষ্টা করছি।
১৯৬৮ সালে আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন বিভাগের অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্র হয়ে ঢোকার পরপরই কয়েকজন দীর্ঘদেহী সুপুরুষকে দেখতে পাই। তাঁরা ভালো ফলাফল-সহ সদ্য এমএসসি পাশ করা, অনেকে শীঘ্রই বিদেশে চলে যাবেন। তাঁরা করিডরের এপাশ থেকে ওপাশে যাওয়ার ভান করে আমাদের ক্লাসের দিকে তাকাতে তাকাতে কয়েকবার হেঁটে যেতেন। হয়তো বিয়ের পাত্রীর খোঁজে, কিন্তু আমরা ঈর্ষাবোধ করতাম। হেঁটে যাওয়াদের একজন ছিলেন মোহাম্মদ শওকত আনোয়ার, মুখে মিশ্চিভিয়াস মিটিমিটি হাসি, সদ্য এমএসসিতে প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়ে বিভাগের শিক্ষক হয়েছেন মাত্র। কিছুদিনের মাঝেই ভালো কোনও স্কলারশিপ নিয়ে বিদেশে চলে যাবেন। আমার চোখে তিনি আদর্শ পুরুষ ছিলেন। তখনই জেনেছিলাম ফার্স্ট ক্লাস পেলেই বিভাগের শিক্ষক হওয়া যায়, বিদেশে যাওয়া যায় এবং নতুন ছাত্রছাত্রীদের চোখে আদর্শ পুরুষ হওয়া যায়। তিনি আমাদের কোনও ক্লাস নেননি। কিন্তু ভালো ছাত্রের খাতায় আমার নাম তুলে দিয়ে ১৯৬৯ সালের কোনও একদিন সত্যিসত্যিই তিনি বিদেশে চলে গেলেন। আর দেশে ফিরেছিলেন বলে শুনিনি।
তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করে এরপর আমি বিভাগের শিক্ষক হলাম। স্কলারশিপ নিয়ে বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণশেষে আমেরিকায় থিতু হলাম। দীর্ঘ একুশ বছর পর, ১৯৯০ সালে আটলান্টায় আমেরিকান বায়োকেমিস্টদের (FASEB) এক সম্মেলনে তাঁকে দেখে আমার চিনতে মোটেও ভুল হয়নি। তিনি তখন বোস্টনে টাফট ইউনিভার্সিটিতে পড়াচ্ছেন। উৎসাহ নিয়ে আমার পোস্টার বুথে এসে আমার গবেষণা সম্পর্কে জানতে চাইলেন। আবার দীর্ঘ বিরতির পর জানতে পারলাম তিনি ডুবানার (DUBANA-Dhaka University Alumni Association in North America) একজন নিবেদিত শুভাকাঙ্ক্ষী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চলে এলেও বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগের সঙ্গে আমার এখনও বলতে গেলে নিবিড় যোগাযোগ আছে। সেই টানে জন্মলগ্ন থেকেই ডুবানার সঙ্গে আমার সম্পর্ক। কিন্তু প্রতি বছরই শুনতে পাই শওকত আনোয়ার স্যারের যোগাযোগটা আরও অনেক অর্থবহ ও ফলপ্রসূ।
আজ থেকে ছাপ্পান্ন বছর আগে পরীক্ষার হলে অযাচিতভাবে ছাত্রদের সাহায্যে যিনি এগিয়ে এসেছিলেন, তিনি আজও একই কাজ করে চলেছেন। ২০১৬ সাল থেকে ডুবানা একটি সাইন্টিফিক অধিবেশনের মাধ্যমে ৪/৫ জন বায়োকেমিস্টের জন্য একটি সায়েন্টিফিক অ্যাওয়ার্ড প্রদান চালু করেছে। ডঃ শওকত আনোয়ার এই দুটোর খরচের সিংহভাগ বহন করে থাকেন। ২০২৩ সাল থেকে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে যেসব তরুণ পিএইচডি করতে আসে, প্রতিবছর ডুবানা তাঁদের ৩/৪ জনকে একটি স্কলারশিপ প্রদান চালু করেছে। এই স্কলারশিপ ফান্ডটি আর্থিকভাবে যেন অনন্ত স্থায়িত্বলাভ করে তার জন্য ডঃ শওকত আনোয়ার একটি নেতৃস্থানীয় ভূমিকা পালন করছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাগ্রহণ করে তিনি যে উপকৃত হয়েছেন, কৃতজ্ঞতাস্বরূপ তারই কিছুটা যেন একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের মাধ্যমে ফিরিয়ে দিতে চান। আত্মপ্রচার ও লাভলোকসানের হিসাব যেখানে আমাদের মজ্জাগত, সেখানে এই দানের জন্য তিনি কোনও পদ চান না, চান না তাঁর নামের মাহাত্ম্যপ্রচার। খাইরুল ওয়ারা এবং ডুবানার অন্যান্য নেতারা জানিয়েছেন প্রতিবার তিনি শুধু জানতে চান ডুবানার জন্য তাঁর কী করতে হবে।
শুধু ডুবানার জন্যই যে তিনি দু-হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন তা মোটেই নয়। বাংলাদেশে জনসেবার উদ্দেশ্যে স্ত্রীর সঙ্গে যৌথভাবে গড়ে তুলেছেন কামিনী হেলথকেয়ার ফাউন্ডেশন এবং আনোয়ার চ্যারিটেবল ফাউন্ডেশন। প্রথমটির উদ্যোগে ঈশ্বরদিতে ১৫ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালের মাধ্যমে প্রতি মাসে ৬০০ রোগীর সেবা দেওয়া হয়। শেষের ফাউন্ডেশনটি যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশে অলাভজনক প্রতিষ্ঠানকে সহায়তা দিয়ে থাকে।
ডঃ শওকত আনোয়ার ১৯৪৭ সালে পাবনা জেলার ঈশ্বরদিতে জন্মগ্রহণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বায়োকেমিস্ট্রিতে বিএসসি অনার্স ও এমএসসিতে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম পাশ করে একই বিভাগে স্বল্পকালীন শিক্ষকতা করেন। ১৯৬৯ সালে ফুলব্রাইট ট্রাভেল গ্রান্ট নিয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে আসেন এবং ক্যানসাস স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে ১৯৭৩ সালে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর তিনি জার্মানির মিউনিখে অবস্থিত লাডউইগ-ম্যাক্সিমিলান ইউনিভার্সিটি থেকে ১৯৮০ সালে ডক্টর অব ভেটারিনারি মেডিসিন (হাবিল) ডিগ্রি লাভ করেন। ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া সান দিয়াগো-তে তিন বছর পোস্টডক্টরাল গবেষণা শেষ করে ১৯৮৩ সালে তিনি বোস্টনের টাফট স্কুল অব ভেটারিনারি মেডিসিন-এ সহকারী অধ্যাপক নিযুক্ত হন। সেখানে ১৯৯০ সালে অধ্যাপক পদে উন্নীত হয়ে ২০০১ সালে ইউনিভার্সিটি ডিস্টিঙ্গুইশড প্রফেসরের মতো সম্মানজনক পদে অধিষ্ঠিত হন। ২০২০ সালে অবসরে গেলেও একই প্রতিষ্ঠানে তিনি ডিস্টিঙ্গুইশড প্রফেসার এমেরিটাস হয়ে আছেন।
টাফট স্কুল অব ভেটারিনারি সায়েন্সে থাকাকালীন তিনি প্রায় ২৫ জন গ্রাজুয়েট ছাত্র ও পোস্টডক্টরের গবেষণার তত্ত্বাবধান করেছেন, বিখ্যাত জার্নালে প্রকাশ করেছেন ন্যূনতম ১০৫টি গবেষণা প্রবন্ধ। গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য তিনি ন্যূনতম পাঁচটি বিখ্যাত পুরস্কার লাভ করেন। একই প্রতিষ্ঠানে বায়োলজিক্যাল সায়েন্স ডিপার্টমেন্টের চেয়ারম্যান, অ্যাসোসিয়েট ডিন, এবং আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও পালন করেছেন। এ ছাড়াও তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ভিজিটিং প্রফেসর, অ্যাডভাইসার ও কনসালট্যান্ট হিসাবেও।
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ১৯৭৬ সালে উরছুলা নাওহাইমার নাম্নী এক জার্মান মহিলাকে বিয়ে করেন। পেশায় ডাক্তার এই নারী ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটসে নিউরোলজির ডাক্তার হিসাবে নিয়োজিত থেকেও স্বামীর প্রতিটি কাজকে উৎসাহ দিয়ে যান। ২০১৮ সাল থেকে ডুবানার প্রতিটি সম্মেলনে উপস্থিত থেকেছেন সর্বক্ষণ। তাঁদের এক ছেলে ও এক মেয়ে।
ওপরে উল্লিখিত এবং আমাদের গর্ব করার মতো এত গুণাগুণ থাকা সত্ত্বেও ডঃ শওকত আনোয়ারকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খুব অল্প লোকই জানেন। পুরো বিশ্ববিদ্যালয় না হোক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণ বিভাগ, বিশেষ করে ডুবানার নবীন সদস্যরা যাতে এই মেধাবী ও মহৎ ডঃ শওকত আনোয়ারের অর্জনের কথা পড়ে অনুপ্রাণিত হন, তাঁদের উদ্দেশ্যেই আমার এই লেখা। তা করতে গিয়ে আমার অন্য যে কয়েকজন শিক্ষকের কথা এখানে লিখেছি, হাস্যরসের অবতারণা করলেও শ্রদ্ধাভরেই লিখেছি তা।
৩১ জুলাই, ২০২৫
পটোম্যাক, মেরিল্যান্ড

