ভারত-এর ধারণা

রোমিলা থাপার এবং গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক

 

হিস্ট্রি ফর পিস’ কনফারেন্সের তৃতীয় বার্ষিকীর বিষয় ছিল ভারত-এর ধারণা। তারই অংশ এই কথোপকথনটি। হয়েছিল কলকাতায় আইসিসিআর-এর সত্যজিৎ রায় অডিটোরিয়ামে ২০১৭ সালের ১৪ আগস্ট। ২০১৯-এর ১৫ এপ্রিল এই কথোপকথানের ট্রান্সক্রিপশন হিস্ট্রি ফর পিস-এর ওয়েবসাইটে দেওয়া হয়। আমরা সেটিরই বঙ্গানুবাদ তিন পর্বে প্রকাশ করছি। প্রথম পর্ব এবং দ্বিতীয় পর্ব গত দুই সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে। এ-মাসে তৃতীয় তথা শেষ পর্ব।

রোমিলা থাপার: হ্যাঁ, ঠিকই বলেছ… এটা একটা পরিপূর্ণ ক্ষেত্র, এবং সে সম্পর্কে সবাই ওয়াকিবহাল। কিন্তু বিষয়টা অবশ্যই যে তুমি এটার ভেতরে রয়েছ। আমি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে বা বৈশ্বিক মানদণ্ডে যাচ্ছি না— কারণ তার ব্যাপ্তি বিশাল। এটাও তুমি খুবই ঠিক বলেছ যে এটা এমনই একটা সমস্যা যাকে সমাধানের অতীত বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু আমাদের… মানে আমরা কি সেইরকম একটা ভবিষ্যতের দিকে যাচ্ছি, যেখানে, এই যে এই শয়ে শয়ে ভাষা, যাদের মধ্যে কারও হয়তো বর্ণমালাই নেই, কিন্তু সেইসব ভাষায় কথা বলা হয়— কী হবে সেই ভাষাগুলোর সঙ্গে? মুন্ডা-ভাষী জনগোষ্ঠীকে কি বাঁচার তাগিদে পুরোপুরি হিন্দিভাষী হয়ে যেতে হবে? নাকি তাঁরা দ্বিভাষী হয়ে থাকতে পারবেন, তাঁদের এক-ভাষা-ভাষী এলাকার বহু দূরের মানুষের সঙ্গেও সম্পর্ক তৈরি করতে পারবেন? আমি বলতে চাইছি, এটাও কিন্তু ডেমোগ্রাফির একটা সমস্যা। আর আজ অভিবাসন এমন মাত্রায় আমাদের সামনে আসছে যেমনটি আমরা আগে কখনও দেখিনি। ভূমিহীন কৃষিমজুররা বিশাল পথ পাড়ি দিচ্ছেন। কেরল থেকে পাঞ্জাবে, পাঞ্জাব থেকে অসমে— কী বিশাল দূরত্ব! আবার ধরো, সেই ভাষাগুলির পরিণতিই বা কী হতে চলেছে যেখানে একজন এমন একটা পরিবেশে বড় হয়, যেখানে তার পরিবারে এক ভাষায় কথা বলা হয়, আর বাইরে সবাই অন্য ভাষায় কথা বলে? আবার ধরো তুমি তৃতীয় কোনও ভাষাও জানো না— তৃতীয় ভাষাটা কিন্তু এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ— ফলে তুমি বাইরে বেরোতেই পারছ না। কী হবে তখন? তোমার কাছে কি সবসময় কিছু অন্তর্মুখী লোকজনই কেবল থাকবে? কালচারগুলির কি বেড়ে না উঠতে পারা পায়ের নখের মতো দশা হবে?

গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক: না।

রোমিলা: না?

গায়ত্রী: না। এটা আসলে খুবই লিঙ্গ-সম্পর্কিত প্রশ্ন। এই যে তৃতীয় ভাষার বিষয়টা, এটি সরাসরি লিঙ্গ-সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত। কারণ কোনও একটা ভাষার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার বিষয়টা লিঙ্গবৈষম্যের ওপর খুবই নির্ভরশীল (রোমিলা: হ্যাঁ হ্যাঁ…)। এখন এখানকার ছাত্ররা… এই যে যারা সব কেরলে পাথর ভাঙতে বা কফি প্যাকিং করার কাজে যায়, তুমি জানো, এদের মধ্যে অনেকেই আমার ছাত্র। কারণ ওখানে কোনও কাজ নেই। তুমি ওদের টাটা ইত্যাদিদের সম্বন্ধে কথা বলতে শুনতে পাবে। যাই হোক, আমি আর তাতে এখন ঢুকতে চাই না।

রোমিলা: হ্যাঁ এটা কাহিনির আরেকটা দিক।

গায়ত্রী: না না ওদিকে যাওয়ার দরকার নেই, দরকার নেই। ওরা কিন্তু সুখে নেই। কিন্তু এটা এমনই একটা ঘটনা যেটা আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। এ এক সাধারণ উপলব্ধির বিষয়, কিছুটা সময় লাগে, কারণ এ একেবারে ঊনবিংশ শতক কি প্রথম-বিংশ শতকের ভাষাগত ধারণা। ভাষাকে যখন বক্স, নাম, অর্থোগ্রাফি ইত্যাদি দিয়ে প্রকাশ করা হত। ১৯৮৬ থেকে আমি এই তথাকথিত আদিম মানুষগুলির সঙ্গে আছি। এরা আবার ঘটনাচক্রে দ্বিভাষী। মানে এরা মাগধী, প্রাকৃত এইসব ভাষায় কথা বলে। শহরের বেশিরভাগ লোকজনের যে ধারণা আছে এরা খেড়িয়া ভাষায় কথা বলে, আসলে তা কিন্তু নয়। আর ওরা তো আমার সঙ্গে সমানে বাংলাতেই কথা বলে। বলে, ‘দিদি, আমাদের ভাষাটা শিখে নাও।’ বীরভূমের মুন্ডা বা ওঁরাওদের কথা যদি বলি। তারাও এখন কিছু কিছু চমৎকার ওঁরাও কাজ করছেন। কিন্তু সমস্যাটা হল, বাস্তবে এই যে একটা দ্বান্দ্বিক ধারাবাহিকতা একটা বহুভাষী অভ্যাসের অস্তিত্ব রয়েছে, আমরা সেটা জানিই না। এরকম নয় যে এখানে একটা সাধারণ ক্রোলাইজেশন রয়েছে। অনেকটা জঙ্গলের বাস্তুতন্ত্রের মতো। বিষয়টা যেটা হয়ে দাঁড়িয়েছে, রাষ্ট্রপুঞ্জ বলছে, ‘ওহো! এই ভাষাটা বিপন্ন? এটা সংরক্ষণ করো!’ কিন্তু আদৌ বাস্তবে তা হয় না। বাস্তবে আমাদের পরিপাটি ভাষাশাস্ত্র এইসব অলিখিত ভাষাগুলিকে এখন দ্বান্দ্বিকভাবে বহমান, বহুভাষিক ইত্যাদি ইত্যাদি বলে স্বীকৃতি দিচ্ছে। এদিকে এগুলি আবার জুলু, সোয়াহিলি ইত্যাদির মতো বড় লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা নয়। এই ভাষাগুলি বেঁচে রয়েছে, বাঁচিয়ে রাখছে। প্রাক-বিজ্ঞান যুগের ডিজিটাইজ করা এদের, সরাসরি মেমোরিতে লিখে রাখা। ফলে বাক্সের মধ্যে নাম লিখে রাখার পুরনো ধারণার সঙ্গে এরা খাপ খায় না। এই ভাষাবিদরা প্রকৃতই এ নিয়ে রীতিমতো কাজ করছেন। ফলে এইগুলিকে সেই অসংখ্য ভাষাগুলির মধ্যে ফেলা যাবে না, যেগুলি সম্পর্কে আমরা জিজ্ঞেস করে থাকি: এগুলি দিয়ে কী করব? বিশ্বায়নের উদ্দেশ্যে তো আমাদের ইংরাজি আর ফরাসি আর রুশ আর চিনা আর ইত্যাদি ইত্যাদি রাখলেই হবে।

রোমিলা: না না আমি কিন্তু এক মুহূর্তের জন্যও মনে করি না যে এটা বিংশ শতাব্দীর মতো হবে— বস্তুত, এটা আলাদা হতে বাধ্য। কিন্তু খুব নির্দিষ্ট করে এটা বলা দরকার যে আমাদের অবশ্যই এই পার্থক্যটা উপলব্ধি করতে পারতে হবে। আর পার্থক্য শুধু ভাষাতে নয়। দ্বিভাষী হওয়াতেই এর সমাধান নেই। ভাষাগুলোর খিচুড়ি বানিয়েও কিছু উপকার হবে না। এ তোমারে কাজের জগতে ঢুকবে, তোমার দাম্পত্য সম্পর্কে ঢুকবে— কতদূর এর সঙ্গে অভিবাসন করতে পারবে তোমাকে ঠিক করতে হবে। এটা একটা জটিল বিষয়। আমি যেটা বলতে চাইছি, যেকোনও একটা কিছুতে নজর দেওয়ার চাইতে আমাদের কিন্তু সামগ্রিকতাকে লক্ষ করতে হবে। এই একটা কিছু অর্থনৈতিক বৃদ্ধি, জাতপাত যা কিছুই হতে পারে। সামগ্রিকতার দিকে নজর দেওয়াটা আমরা কিন্তু ভুলে গেছি এখন। ৬০-এর দশকে, যদিও সে সময় অর্থনৈতিক বৃদ্ধি নিয়ে একটা অবসেশন ছিল, তবুও, সামান্য হলেও, সব দিকে তাকানোর একটা প্রয়াস ছিল। এই যে এখন ধর্ম শিক্ষা, আইনকানুন, পেশাদারি কাজকর্ম সব জায়গাতেই ঢোকার ছাড়পত্র হয়ে উঠছে, এ-নিয়ে লোকজন খুবই উদ্বিগ্ন। ধর্মের খুবই বাড়বাড়ন্ত হচ্ছে। কিন্তু কোনও সমাধান নেই। বা, বলা যায়, লোকে এখনও ততটা তীব্রভাবে, ততটা দৃঢ়ভাবে এ-নিয়ে ভাবছে না। এখন এটা ঠিক যে সব কিছু নিয়ে একসঙ্গে ভাবা যায় না। ফলে যা যেমনভাবে বাড়ছে, তাকে সেভাবেই বাড়তে দেওয়া হচ্ছে। কেউ কেউ হয়তো ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করছে, “আচ্ছা মানুষ কি জানে এই বাড়তে দেওয়া-টা তাদের কোথায় নিয়ে যেতে চলেছে?” তুমি দেখো, একটা সমাজ বানানোর কথা ভাবলে যেসব আন্তঃসম্পর্কগুলিকে আমরা মৌলিক হিসেবে ভেবে থাকি, সেই ধরনের আন্তঃসম্পর্কগুলির অস্তিত্বই বিলুপ্ত হয়েছে। মানুষ এই লাইনে ভাবছেই না।

গায়ত্রী: বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম-এর ডিরেক্টর শোয়াবের ‘চতুর্থ শিল্প বিপ্লব’ বইটিতে একটা লাইন ছিল: ‘এগুলো আমাদের ওপরেই নির্ভর করে।’ আমার মত অনুযায়ী এই বিষয়টাই পালটে গেছে। আমার মনে হয় না আমাদের ওপর সত্যি সত্যি সমাজ গঠনের দায়িত্ব বর্তেছে। বরং আমাদের কাজ হচ্ছে ঘটমান আন্তঃসম্পর্কগুলিকে স্বীকার করা। কিন্তু আমাদের যে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে তা দিয়ে আমরা সেই আন্তঃসম্পর্কগুলিকে পুরোপুরি কল্পনা করে উঠতেই পারছি না। এই বিষয়গুলিকে শেখার জন্য আমি একটু মার্কস উদ্ধৃত করতে চাই। আপত্তি নেই তো?

রোমিলা: আমার আপত্তি নেই।

গায়ত্রী: ওকে…

রোমিলা: এখন শ্রোতারা কী বলেন…

গায়ত্রী: আরে কথা তো আমরা বলছি। ওঁরা তো আড়ি পেতে শুনছেন মাত্র (হলময় হাসি)। তুমি নিশ্চয়ই জানো এই উদ্ধৃতিটা আমি সবসময়েই ব্যবহার করে থাকি: “ঊনবিংশ শতাব্দীর বিপ্লবের সারবস্তু এসেছিল ভবিষ্যতের কাব্য থেকে।” এই হচ্ছেন কার্ল মার্কস— ভবিষ্যতের কাব্য। তাই, এই যে ধারণাটা যে আমরা আন্তঃসম্পর্কগুলিকে ঠিকঠাক চিনতে পারছি না— তুমি এ নিয়ে পুরোপুরি বিরূপ কথা বললে— কিন্তু এই বিষয়টিতে আমি লেগে থাকতে চাই। এটা খুবই সম্ভব যে এই আন্তঃসম্পর্কগুলি ঘটবে, মোটেও সব ভালো হবে না, অনেকগুলিই ঘটবে রীতিমতো ভয়ঙ্কর, তবু, যেহেতু আমরা একটা নতুন সমাজ বানাচ্ছি, আমরা সেগুলিকে বাদ দিয়ে চলে যেতে পারব না।

রোমিলা: আন্তঃসম্পর্কগুলি কিন্তু রয়েছে…

গায়ত্রী: আমি সেটাই বলতে চাইছি…

রোমিলা: আমরা ভাবি এগুলি কখন ঘটবে— কিন্তু এগুলি ইতিমধ্যেই রয়েছে। আমার বক্তব্য এটাই যে, এই বিষয়টার প্রতিই আমরা যথেষ্ট মনোযোগী হচ্ছি না যে এগুলি ইতিমধ্যেও রয়েছে। আমরা একটা সুতো ধরছি। আর সেটাতেই পাক খেতে থাকছি। অন্যদিকে তাকাচ্ছিই না। সে ধর্ম, জাত বা অর্থনীতি যা-ই হোক না কেন।

গায়ত্রী: আমরা একই কথা বলছি। বলো বলো…

রোমিলা: এই আন্তঃসম্পর্কগুলি খুব তীব্রভাবেই রয়েছে, কিন্তু কোনওভাবে আমরা এই সংযোগগুলি করে উঠতে পারছি না। এই ‘আমরা’-র অর্থ কিন্তু এ নিয়ে যারা কথা বলছে তারা। এই সংযোগটা যে করা হচ্ছে না, সেটাই কথা।

গায়ত্রী: জানো, যে সমস্ত অশিক্ষিত লোকজন আইটি-তে আসছে— আমি টিপ-টপদের কথা বলছি না— তারা প্রকৃতপক্ষে নাউন-কে লেক্সিকালাইজ করছে! আবার অন্যদিকে পাঠক্রমের পরিবর্তন নিয়ে কথা বলছে। আমি এখন ডারবান থেকে আসছি। সেখানে এক ভাই কী চমৎকারভাবে বলছিল, যে যদি জুলু-তে বীজগণিত শেখাতে হয়, তবে তার জন্য আলাদা টার্মিনোলজি বানাতেই হবে। না না না। আমি ওকে বললাম, আমাদের সত্যি সত্যি একসঙ্গে কিছু করা দরকার। আমি বললাম, ‘দেখো, আমি কিন্তু একটা ভালো স্কুলে পড়েছি। কিন্তু সেটা ক্লাস সেভেন অব্দি বাংলা মিডিয়াম ছিল। ফলে আমি যখন বীজগণিত ইত্যাদি শিখেছি, আমরা কিন্তু সেগুলো বাংলাতেই শিখেছি। তবে সেই বাংলাতে শেখার সময়েও ইকুয়েশন, ফর্মুলা এইসব শব্দগুলো ব্যবহার করতাম কিন্তু আমরা। আমি ওকে বলছিলাম, এখন আমি যখন হাইস্কুলের ছেলেমেয়েদের কোচিং দিই— কারণ হাইস্কুলে কিছুই শেখানো হয় না— আর সেই শিক্ষার কথা ভাবলে আমার স্রেফ কান্না পায়। তাই ছাত্ররা আসছে, কিন্তু কিছুই শিখছে না। আমি তো এটাও জানতাম না যে অ্যালজেব্রার বাংলা হচ্ছে বীজগণিত। এখন জানি। ফলে ছাত্ররা আসে, কিন্তু এই স্কুলগুলি থেকে কিছুই শেখে না। তাদের শুধু কপি করতে শেখানো হয়। আমি এখনও ফর্মুলা বা ইকুয়েশন-এর বাংলা প্রতিশব্দ জানি না। আবার কর্তৃপক্ষের যদি বেশি সমালোচনা করা হয়, তবে বাচ্চাদের আত্মবিশ্বাস নষ্ট হবে। তাই আমার সুপারভাইজারকে বলতে থাকি, ‘এই পাতা উল্টো পাতা উল্টো, দেখ কোথায় প্রথমবার ব্যবহার হয়েছে। তাহলে বোঝা যাবে বাংলাটা কী। ফর্মুলার বাংলা, ইকুয়েশনের বাংলা।’

এই যে এইভাবে উন্নত কিছুকে লেক্সিকালাইজ করে একটা সম্পূর্ণ ক্রোলাইজড একটা সাধারণ ভাষাগত মাধ্যমে নিয়ে আসা— এটা তোমার-আমার পক্ষে কল্পনা করাটাই খুব শক্ত। কারণ, আমরা তো এটা করি না। আমরা যা করি তার সঙ্গে এর কোনও সম্পর্কই নেই। বিশেষত তুমি যদি কোনও ভাষার শিক্ষক হও। আমি আরও উদাহরণ দিতে পারি এ প্রসঙ্গে, কিন্তু মনে হচ্ছে আমি খুবই বেশি বকে ফেলছি। আপনারা তো প্রফেসর থাপারের কথা শুনতে চান। কিন্তু আমি যেটা বলতে চাইছি, একটা নির্দিষ্ট স্তর পর্যন্ত, পৃথিবীর সাধারণ যে ক্রোলাইটি, সেটা আমাদের এই সমাজ গঠনের প্রগতিশীল বুর্জোয়া চিন্তাভাবনা ছাড়াই, কিছু কিছু জিনিস সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। সেও এক আলাদা গল্প। আমি লাওস সীমান্তের কাছে মাটির স্কুলবাড়িগুলিতে যেতাম। ওরা চিনা ছাড়া আর কোনও বিদেশি দেখেনি কোনওদিন। সেই স্কুলগুলি— একটা লোক, একটা সম্প্রদায়, একটা স্কুল— সেগুলো সব বন্ধ হয়ে গেছে। এখন কিছু ব্যক্তি পুঁজির সহায়তায় রাষ্ট্র যে কেন্দ্রীয় বিদ্যালয়গুলি খুলেছে সেগুলি জেলখানার নামান্তর। ওরা আমার জন্য চিনা ভাষায় একটা জিনিস লিখেছিল। তাতে বলেছিল, এইসব দুর্গম প্রান্তরে— লাওসের কাছে হিমালয়ে— এই যে সব এক-সম্প্রদায়, এক-শিক্ষক স্কুলগুলি রয়েছে, সেখানে নীতিশাস্ত্র শেখানো হয়। সেই নীতিশাস্ত্র কী জানো? সমাজতন্ত্র! এই মানুষগুলির সঙ্গে কেউ কথা বলে না। ওখানে কোনও অ-চিনা বিদেশিই নেই। যে লোকটা আমাকে রবার আসা দেখাত, সে বলছিল, ‘দেখো, পাঁচ বছর আগে তোমাকে আমি এই ট্রাকগুলো দেখিয়েছিলাম রবার নিয়ে আসতে, দেখো এখনও সেই একই পরিমাণ রবার আসছে। কোনও ট্রাকে হয়তো বেড়েছে, কোনও ট্রাকে কমেছে। কিন্তু আমাদের এক কামরার মাটির স্কুলগুলো হারিয়ে গেছে।’ দেখো, ওদের কাজ কিন্তু চলছে। আমরা জেতা বলতে যা বুঝি সেই অর্থে হয়তো ওরা জেতেনি, কিন্তু এরকম ভাবাই যায় যে এই কাজগুলি থেকেই একসময় ভবিষ্যতের কাব্য জন্ম নেবে। আমি হয়তো শিক্ষিত মানুষের মতো কথা বলে ফেললাম, দুঃখিত, কিন্তু কী আর করব, আমি তো তাই-ই। চলো তার চেয়ে ইতিহাসে ফেরা যাক। নাও, তুমিই আরও কিছু বলো…

রোমিলা: এই বিষয়টা নিয়েই প্রশ্ন হয়। সমাজের ধারণা সম্পর্কে প্রশ্ন হয় না, কিন্তু যদি ছোট করেও সেদিকে এগোনো যেতে পারত, খুব ভালো হত। যা চলছে, তার মধ্যে কিন্তু এই ধরনের এগোনো-গুলিকে দেখা সম্ভব নয়। এটা জাস্ট হচ্ছে না। একজন যতই সংলাপ চালাক, যতই বেরিয়ে গিয়ে লোকের সঙ্গে কথা বলুক, কিন্তু কোনওভাবেই এই বিষয়টা উপলব্ধিতে আসছে না। আমার কাছে সবচেয়ে হতাশাজনক এটাই। নইলে দেখো, এমনিতে এখন আমরা এমন একটা অবস্থায় পৌঁছেছি যে সেই ৬০-এর দশকে যে পরিবর্তনগুলির কথা আমরা ভেবেছিলাম, তার কিছু কিছু এখন কিন্তু করতেই পারি। কিন্তু এই যে ঘটনাগুলিকে আমরা চিনেই উঠতে পারছি না, সেই বিষয়টাই আমাদের সঙ্কুচিত করে রেখেছে।

গায়ত্রী: আমরা এটাই মানতে চাইছি না যে আমাদের ক্লাস-ফোকাসটা যতটা সম্ভব সরানো উচিত। তুমি আমার চেয়ে বয়সে বড়, কিন্তু আমার এটা খুবই মনে হয় জানো, যে আমারও তো বয়স কম হল না…

রোমিলা: বাবা! আমি তো বহুদিন এটা টেরই পাচ্ছি না!

গায়ত্রী: তোমার এনার্জি ঈর্ষণীয়, রোমিলা…

রোমিলা: না না সত্যি! আমি কামনা করি যেন পরবর্তী প্রজন্ম অনেক বেশি দক্ষ হয়।

গায়ত্রী: তাহলেই আমরা একটা মহান ভারত দেখতে পাব। তাই না? সেটা একটা আলাদা জিনিস হবে। সত্যি! কী বলব আমরা সেটাকে তখন?

রোমিলা: আমরা কি এই সুরেই শেষ করব?

গায়ত্রী: হ্যাঁ, তাই করি চলো। তুমি জানো, এখন এয়ার ইন্ডিয়াতে প্রতিটা ঘোষণার পরে ওরা কী বলে? বলে, ‘জয় হিন্দ!’

রোমিলা: ভালো…

গায়ত্রী: ভালো…

রোমিলা: আরও ভালো যে ‘ভারত মাতা কি জয়’ বলে না!

গায়ত্রী: দেখো আমরা কিন্তু আক্ষরিকভাবে এই দুটোই বলেছি।

রোমিলা; সেটাই তো জাতীয়তাবাদ!

গায়ত্রী: যতই হোক আগামীকাল কোট-আনকোট ‘স্বাধীনতা’। ধন্যবাদ…

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3090 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...