মতাদর্শের খোঁজে ভগৎ সিং: মাঝের কথা

কণিষ্ক চৌধুরী

 


শিক্ষক, প্রাবন্ধিক, সমাজবিজ্ঞানের উৎসাহী ছাত্র ও গবেষক

 

 

 

পূর্ব প্রসঙ্গ: মতাদর্শের খোঁজে ভগৎ সিং — গোড়ার কথা

বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে শুরু হয় সশস্ত্র বিপ্লব প্রস্তুতির দ্বিতীয় পর্ব। বিশেষ করে যখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪-১৮) শুরু হয়, তখন দেশের মধ্যে ও দেশের বাইরে ভারতীয় বিপ্লবীরা জাতীয় স্তরে নিজেদের সংগঠিত করে বিপ্লবের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। নলিনীমোহন মুখোপাধ্যায় লিখেছেন: “১৯১৩ খৃষ্টাব্দে ইউরোপের রাজনৈতিক আকাশ ঘোর অন্ধকারাচ্ছন্ন হইয়া উঠে। ইহার মধ্যে আমরা [বিপ্লবীরা] বিদেশি গবর্নমেন্টকে আঘাত দিবার একটা উপযুক্ত সুযোগ দেখিতে পাই। আমাদের কর্মস্থলের প্রসার বৃদ্ধি হয়। আমরা সশস্ত্র বিপ্লবের কথা বলিয়া সর্বসাধারণের মধ্যে বৈপ্লবিক ভাব প্রচার করিতে লাগিলাম। ইহাতে উত্তর-ভারতের ছাত্রসমাজের মধ্যে বেশ সন্তোষজনকভাবেই সাড়া পাওয়া যায়। কিন্তু জনসাধারণ ইহা হইতে তফাৎ হইয়া থাকে। তখন বিশেষ সমস্যা ছিল অস্ত্রপ্রাপ্তির কথা। কিন্তু জার্মান গবর্নমেন্টের কাছ হইতে অস্ত্রপ্রাপ্তির প্রতিশ্রুতি পাওয়া যায়।” (দত্ত, ভূপেন্দ্রনাথ। ১৩১০ বাংলা : ১২১)। ১৯০৯-এ ব্রিটিশ দমন-পীড়নের মুখে ভারতে বিপ্লব প্রচেষ্টা কিছুটা স্তিমিত হয়ে পড়লেও, পুরোপুর নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়নি। দেশে ও বিদেশে বিপ্লবী কর্মকাণ্ড স্বল্পসংখ্যক হলেও সচল ছিল। এই পর্বেই আমেরিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ভারতের স্বাধীনতার সপক্ষে বিভিন্ন সংগঠনের আবির্ভাব ঘটতে শুরু করে। দেশের মধ্যেও চলতে থাকে নানা বিপ্লবী কার্যকলাপ। ১৯০৯ থেকে ১৯১৪ পর্যন্ত ভারতের মধ্যেকার বিপ্লবীদের কার্যকলাপের একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ প্রয়োজন৷

মানিকতলা ষড়যন্ত্র মামলাকে কেন্দ্র করে ব্রিটিশ সরকার ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে অনুশীলন সমিতিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ওই মামলাতে পুলিশ রাসবিহারী বসুকে জড়িয়ে নিয়ে গ্রেফতার করে, কিন্তু অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই প্রমাণের অভাবে তিনি মুক্তি পান। তিনি চলে যান দেরাদুনে, বনবিভাগের প্রধান করণিকের চাকরি নিয়ে।  প্রকৃত লক্ষ্য ছিল উত্তর-পশ্চিম ভারতে বৈপ্লবিক সংগঠন করে তোলা। প্রাথমিক পর্বে কিছুদিন নিষ্ক্রিয় থাকলেও, দ্রুত কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন। বৈপ্লবিক গুপ্ত সংগঠন স্থাপনের ক্ষেত্রে তাঁকে সাহায্য করেছিলেন আমিরচাঁদ, দীননাথ, অবোধবিহারী, বালমুকুন্দ প্রমুখ। এঁরা প্রত্যেকেই ছিলেন তরুণ। এই গুপ্ত সমিতির শাখা-প্রশাখা দ্রুত বিস্তার লাভ করতে থাকে। ছাত্রদের মধ্যে নিয়মিতভাবে বৈপ্লবিক প্রচারপত্র বিলি করার ব্যবস্থা হয়। এই সময় লাহোর ও দিল্লির বহু ছাত্র গুপ্ত সমিতির সদস্য হন। নতুন সদস্য সংগ্রহের পাশাপাশি নির্বাচিত সদস্যদের বোমা বানানো ও রিভলবার-বন্দুক চালানোর শিক্ষা দেওয়া হয়। রাসবিহারী বসু কলকাতার যুগান্তর দলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রেখে কাজ করতেন। যুগান্তর থেকে প্রকাশিত নানা বৈপ্লবিক ইস্তাহার তিনি লাহোর ও দিল্লির যুব-ছাত্রদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। ১৯১২-র মধ্যেই সমিতির কাজ বেশ পরিণত হয়ে ওঠে রাসবিহারীর নেতৃত্বে।

রাসবিহারী বসু

একটি বড় ধরনের ঘটনা ঘটানোর জন্য রাসবিহারী বসুর নেতৃত্বে বিপ্লবীরা প্রস্তুতি নিতে থাকেন। রাসবিহারী বসু ও বিপ্লবী সংগঠনগুলির স্বপ্ন ছিল দেশব্যাপী অভ্যুত্থান ঘটানো। কিন্তু পরিস্থিতি অনুকূল না থাকায় তাঁরা ব্যক্তিহত্যার পথই বেছে নিলেন। ১৩ অক্টোবর ১৯১২, লাহোরের ‘আগরওয়ালা আশ্রম’-এ বিশ্বস্ত দলীয় কর্মীদের নিয়ে সিদ্ধান্ত নিলেন ২৩ ডিসেম্বর (১৯১২) লর্ড হার্ডিঞ্জের ওপর বোমা ফেলা হবে। বোমা ছোড়ার দায়িত্ব থাকবে বসন্ত বিশ্বাস ও অবোধবিহারীর উপর। পরিকল্পনা অনুযায়ী নির্দিষ্ট দিনে দিল্লির রাজপথে হার্ডিঞ্জের উপর বসন্ত বিশ্বাস বোমা ছুঁড়লেন ঠিকই, কিন্তু তাতে হার্ডিঞ্জ আহত হয়, মারা যায়নি। কিছুকালের মধ্যেই বিপ্লবী বসন্ত বিশ্বাস, বালমুকুন্দ, আমিরচাঁদ, অবোধবিহারী পুলিশের হাতে ধরা পড়ে যান। বিচারে তাঁদের ফাঁসি হয় (৮ ও ১১ মে ১৯৫৫)। (দ্রষ্টব্য: মৈত্র, স্বপন। ২০০৭ : ২০, ৩৭-৩৮)।

বাংলায় ১৯০৮-এ অনুশীলন সমিতি নিষিদ্ধ হল। রাজনীতির গুরু প্রাণ বাঁচাতে ধর্মের ভেক ধরলেন। বিপ্লবী কাজকর্ম ছেড়ে অরবিন্দ ঘোষ আধ্যাত্মিক গুরু হলেন। হেমচন্দ্র কানুনগো লিখেছেন: এই বৈপ্লবিক কাজ অত্যন্ত ভীষণ। হাতে-কাজে এ কাজ করতে গেলে আকস্মিক ভীষণ বিপদে, জেলে, দ্বীপান্তরে, অন্তরীণে পচবার ও ফাঁসিতে ঝুলবার ভয় সদাই থাকে। এইরকম ভীষণ বিপদের সম্ভাবনা যখন ঘনিয়ে আসে, তখন বিপ্লবের কাজকর্ম ছেড়ে দিয়ে My mission is over বলে প্রাণটা বাঁচানোর প্রবৃত্তি স্বভাবত অত্যন্ত প্রবল হয়ে পড়ে। আমাদের দেশের লোকের পক্ষে এরূপ স্থলে ধর্ম বা আধ্যাত্মিকতা হচ্ছে সেই পরম গৌরবজনক পন্থা” যা একদিকে প্রাণ বাঁচায় আবার “লোক সমাজে পূজা গৌরব অর্জন করা যায়।” (কানুনগো। ২০১৬ : ৮৬)। এই নেতা বাঁচলেন ঠিকই কিন্তু তরুণ বিপ্লবীরা ছাড় পেলেন না। জেল, দ্বীপান্তর সহ নানা ধরনের যন্ত্রণা ভোগ তাদের করতে হল। বিপ্লবীরা বুঝলেন ‘এ জগৎ মায়া নয়’। ব্রিটিশ দমন-পীড়নের মুখে বিপ্লবী আন্দোলন দুর্বল হল ঠিকই, কিন্তু নির্মূল হল না। কারণ ততদিনে নতুন প্রজন্মের বিপ্লবীরা আবির্ভূত হয়েছেন। যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় (বাঘাযতীন) এঁদের মধ্যে অন্যতম।

এই ভাঁটার সময়েও বিপ্লবী কর্মকাণ্ড থেমে থাকেনি—

  • ১৯০৮-এর ৩১ আগস্ট বিশ্বাসঘাতক নরেন গোঁসাইয়ের প্রাণদণ্ড হয় বিপ্লবী কানাইলাল দত্ত ও সত্যেন্দ্রনাথ বসুর দ্বারা।
  • ১৯০৮-এর ৭ নভেম্বর বিপ্লবী জিতেন্দ্রনাথ চৌধুরী ছোটলাট অ্যান্ড্রু ফ্রেজারকে হত্যার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন।
  • ১৯০৮-এর নভেম্বরে বিপ্লবীদের অন্যতম শত্রু অত্যাচারী বাঙালি পুলিশ অফিসার নন্দলাল বন্দ্যোপাধ্যায়কে গুলি করে শাস্তি দেওয়া হয়।
  • ১৯০৮-এর নভেম্বরে পুলিশের গুপ্তচর সুকুমার চক্রবর্তীকে বিপ্লবীরা প্রাণদণ্ড দেন।
  • ১৯০৯, ১০ ফেব্রুয়ারি সরকারের ধূর্ত উকিল আশু বিশ্বাসকে গুলি করে শাস্তি দেন চারুচন্দ্র বসু।
  • ১৯১০, ২৪ জানুয়ারি পুলিশ ইন্সপেক্টর সামস-উল-আলমকে গুলি করে হত্যা করেন বীরেন্দ্রনাথ দত্তগুপ্ত। পুলিশের দ্বারা প্রতারিত হয়ে বীরেন্দ্রনাথ বিপ্লবী যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের নাম প্রকাশ করে দেন। কিন্তু প্রমাণের অভাবে যতীন্দ্রনাথ ছাড়া পেয়ে যান।
  • ১৯১১, ২ মার্চ বিপ্লবী ননীগোপাল মুখোপাধ্যায় (১৬ বছর বয়স) পুলিশের বড় মাপের অফিসার ডেনহামকে হত্যা করবার উদ্দেশ্যে ডালহৌসি স্কোয়ারে তার গাড়িতে বোমা ছোড়েন, কিন্তু সে বোমা ফাটেনি। ডেনহাম বেঁচে যায়, আর বিচারে ননীগোপালের দ্বীপান্তর হয়।

(ঘোষ, কালীচরণ। ২০১৭ : ২ : ৫৫-১০২)

যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় (বাঘাযতীন)

এইরকমই আরও বেশকিছু কার্যকলাপের পাশাপাশি স্বদেশি ডাকাতিও চলতে থাকে। বলাই বাহুল্য, এইসব কাজের ক্ষেত্রে যতীন্দ্রনাথের পরিকল্পনা ও নেতৃত্ব একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। বিপ্লবীরা গুলি-বন্দুক-বারুদ লুটের কাজটিও চালিয়ে যান সমানতালে। সশস্ত্র বিপ্লবের জন্য এগুলি অপরিহার্য। কিন্তু এই সশস্ত্র বিপ্লব পরিচালনার জন্য তাঁদের কাছে সুসংগঠিত কোনও মতাদর্শ ছিল না। দেশ সম্পর্কে সীমাহীন ভালোবাসা ও ইংরেজদের প্রতি প্রবল ঘৃণাই ছিল তাঁদের চালিকাশক্তি। তাঁদের সন্ত্রাসের একমাত্র লক্ষ্য ছিল ব্রিটিশদের অত্যাচারী শাসনের অবসান ঘটানো। কিন্তু ব্যক্তিহত্যার রাজনীতি যে তাদের উদ্দেশ্য সাধনের সহায়ক হবে না, এটা তাঁরা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। ধর্মীয় চিন্তা দ্বারা তাঁদের মতাদর্শ প্রবলভাবে প্রভাবিত হওয়ায়, যুক্তির বদলে আবেগই তাঁদের চিন্তাচেতনাকে নিয়ন্ত্রণ করত। ফলে পূর্ববর্তী বিপ্লবীদের মত তাঁরা ভ্রান্ত পথের কানাগলিতে ঘুরপাক খেয়েছেন। তাঁরা ভারতের স্বাধীনতা চাইলেও সাধারণ ভারতবাসীকে, বিশেষ করে শ্রমজীবী মানুষকে এই আন্দোলনে যুক্ত করতে ব্যর্থ হন। ফলে তাঁদের সংগ্রাম হয়ে পড়ে জনবিচ্ছিন্ন। তাছাড়া এই বিপ্লবীদের সামাজিক উৎস ছিল মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণি এবং বর্ণগত দিক থেকে উচ্চবর্ণভুক্ত। ফলে তাঁদের মধ্যে একদিকে নায়কোচিত আত্মত্যাগের বাসনা যেমন প্রবল ছিল, তেমনই অশিক্ষিত, অজ্ঞ, নিম্নবর্ণভুক্ত শ্রমজীবী মানুষদের প্রতি ছিল প্রচ্ছন্ন অবজ্ঞা ও উদাসীনতা। পরিশেষে, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির অভাবে তাঁরা সাবেকি ধ্যানধারণাকেই বেশি বেশি করে আঁকড়ে ধরেন, নতুন পথের সন্ধান করতে ব্যর্থ হন। শুধু তাই নয়, তাদের সংগ্রামগুলি ছিল মূলত আঞ্চলিক, বড়জোর প্রাদেশিক।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪-১৯১৮) কিন্তু বিপ্লবীদের মধ্যে নতুন একটি চিন্তার জন্ম দিয়েছিল— তা হল সর্বভারতীয় স্তরে একটি অভ্যুত্থান সংগঠিত করা। রাসবিহারী ও বাঘাযতীনের চিন্তায় ও কর্মে এর প্রতিফলন ঘটে। আরও একটি চিন্তা তাঁদের মাথায় উদয় হয়। ভারতের স্বাধীনতার জন্য কেবল ভারতীয়দের সংগ্রামই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন বৈদেশিক সাহায্য। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানি ছিল ইংল্যান্ডের শত্রু। তাই বিপ্লবীরা জার্মানির সাহায্য পাওয়ার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এই পরিস্থিতির স্পষ্টতার জন্য আমেরিকা ও ইউরোপে ভারতীয় বিপ্লবীদের কর্মকাণ্ডের দিকে নজর দেওয়া দরকার।

১৯০৭ খ্রিস্টাব্দে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়াতে কয়েকজন ভারতীয় ছাত্র ‘ভারতীয় স্বাধীনতা সঙ্ঘ’ গঠন করেন। এঁদের মধ্যে অগ্রগণ্যরা হলেন খগেন্দ্রচন্দ্র দাস, পান্ডরঙ্গ খানখোজে, তারকনাথ দাস, অধরচন্দ্র নস্কর। এঁরা ক্যালিফোর্নিয়ার শিখদের মধ্যে বিপ্লবী ভাবধারা প্রচার করতেন। একই সঙ্গে সামরিক শিক্ষালাভের লক্ষ্যে ‘মাউন্ট কামালপাইস মিলিটারি অ্যাকাডেমি’তে ভর্তি হন। ক্যালিফোর্নিয়া ছাড়াও তাঁরা প্রচার চালান অরিগন, ওয়াশিংটন এবং ব্রিটিশ কলাম্বিয়া (কানাডা) রাজ্যসমূহে। তাঁরা ভারতের স্বাধীনতার সপক্ষে প্রচারপত্র ও পুস্তিকা ছাপাতেন ও বন্টন করতেন। ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে পোর্টল্যান্ড এই ধরনের কাজের কেন্দ্রে পরিণত হয়। এখানকার নেতা ছিলেন কানশিরাম। এই সময়েই সোহন সিং গ্রন্থীলে যোগদান করেন। ১৯১১-১২তে এই সঙ্ঘটি খুবই শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ১৯১৩তে লালা হরদয়াল ও ভাই পরমানন্দ ক্যালিফোর্নিয়া আসেন। লালা হরদয়াল সানফ্রান্সিস্কোতে ‘হিন্দুস্থানি স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন’ নামে একটি সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন। ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে ‘হিন্দুস্থানি অ্যাসোসিয়েশন অফ অ্যাস্টোরিয়া’ গড়ে ওঠে। করিম বক্স, নবাব খান, বলবন্ত সিং, সুনসি রাম, কেশর সিং, কর্তার সিং সারাভা ছিলেন এই সংগঠনের সদস্য। ঠাকুরদাস এবং তাঁর বন্ধুরা মিলে সেন্ট জন-এ বসবাসকারী ভারতীয়দের নিয়ে একটি সমিতি গড়ে তুললেন। ১৯১৩তে শিকাগোয় গড়ে উঠল ‘হিন্দুস্থানি অ্যাসোসিয়েশন অফ ইউনাইটেড স্টেটস অফ আমেরিকা’। (ভার্মা। ২০০৬ : ২৫)

লালা হরদয়াল

লালা হরদয়াল অনুভব করলেন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়েছিটিয়ে থাকা বিপ্লবী সংগঠনগুলির কাজকর্মের মধ্যে সমন্বয় ঘটানো প্রয়োজন। এই লক্ষ্যেই আমেরিকা ও কানাডায় বসবাসকারী ভারতীয় বিপ্লবীদের একটি সভা ডাকলেন তিনি। সভায় সিদ্ধান্ত হল যে ‘হিন্দুস্থানি অ্যাসোসিয়েশন অফ দি প্যাসিফিক কোস্ট’ নামে একটি সংগঠন গড়া হবে। নতুন সংগঠনের সভাপতি নির্বাচিত হলেন বাবা সোহন সিং ভাকলা এবং সম্পাদক হলেন লালা হরদয়াল। (পূর্বোক্ত)। এই বছরই (১৯১৩) মার্চ মাসে সংগঠন সানফ্রান্সিসকো থেকে ‘গদর’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করে। পরবর্তীকালে এই পত্রিকাটির নাম অনুসারে সংগঠনটির নাম হয় ‘গদর পার্টি’।

ইতিমধ্যে ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। যুদ্ধে জার্মানির কাছে ইংরেজরা বারবার পরাজিত হতে শুরু করলে বিপ্লবীদের মধ্যে উদ্দীপনার আবির্ভাব ঘটে। তাঁরা এই সুযোগে ভারত থেকে ইংরেজ তাড়ানোর একটা ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করার কথা ভাবতে থাকেন। গদর পার্টির নেতারা আমেরিকায় বসবাসকারী ভারতীয়দের আহ্বান জানিয়ে ‘গদর’ পত্রিকায় লেখেন:

য়ুরোপে যুদ্ধ চলিতেছে, তোমরা এই সুযোগে প্রস্তুত হও। নির্ভীক বন্ধুগণ, অবিলম্বে প্রস্তুত হও, বিদ্রোহের দ্বারা তোমাদের প্রতি সকল অত্যাচারের অবসান ঘটাও…

ভারতে ফিরিয়া চলো, ইংরেজকে পরাজিত করিয়া তাহাদের হস্ত হইতে শাসনক্ষমতা কাড়িয়া লও।

(রায়, সুপ্রকাশ। ১৯৯৩ : ২৬০)

দেশে ফিরে গিয়ে গদরকর্মীদের বিপ্লবী সাহিত্য বিক্রয় ও বিপ্লবী ভাবধারা প্রচার করতে হবে। জনসাধারণকে নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধের জন্য উৎসাহিত করতে হবে। সর্বত্র রেলপথ তুলে ফেলতে হবে, ব্যাঙ্ক থেকে টাকা তুলে নেওয়ার জন্য জনগণকে বোঝাতে হবে, শয়তান ইংরেজদের নির্মূল করার জন্য দেশীয় সৈন্যবাহিনিকে উৎসাহিত করতে হবে। এভাবেই ব্রিটিশদের তাড়িয়ে ভারতীয়রা নিজেদের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারবে বলে গদর পার্টি ঘোষণা করে। (পূর্বোক্ত)। গদর পার্টির এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও ব্রিটিশ কলম্বিয়ার প্রবাসী শিখ, মুসলিম ও হিন্দুরা হাজারে হাজারে ভারতবর্ষে ‘গদর’-এর জন্য ফিরে যেতে শুরু করে।

আমেরিকার মতো ইউরোপে প্রবাসী ভারতীয় বিপ্লবীরাও মহাযুদ্ধের সুযোগ ছাড়তে চাননি। জার্মানিতে বসবাসকারী ভারতীয় বিপ্লবী বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে জার্মান সরকারের সংযোগ ঘটে। জার্মানি ভারতীয় বিপ্লবীদের সাহায্য করতে রাজি হয়। কিন্তু শর্তহীনভাবে এই সাহায্য গ্রহণে ভারতীয় বিপ্লবীরা রাজি হননি। যে শর্তগুলি তাঁরা উপস্থিত করেন সেগুলি এইরকম:

(১) বৈপ্লবিকেরা জার্মান গভর্নমেন্ট-এর নিকট একটা জাতীয় ঋণ (national loan) গ্রহণ করিবেন। তাঁহারা এক দলিলে দস্তখত করিয়া দেন যে বৈপ্লবিকেরা কৃতকার্য হইলে স্বাধীন ভারতের গভর্নমেন্ট এই ঋণ পরিশোধ করিবে।

(২) জার্মানেরা অস্ত্রশস্ত্র সরবরাহ করিবে ও তাহাদের দেশেবিদেশে যত প্রতিনিধি (consuls) আছে সকলে বৈপ্লবিকদের কর্মসহায়তা করিবে।

(৩) তুর্কি গভর্নমেন্ট— যাহা তখন নব্য তুর্কিদের দ্বারাই সংঘটিত হইয়াছিল তাহা— তখনও নিরপেক্ষ (neutral) থাকিলেও, জার্মানের পক্ষ হইয়া মিত্রশক্তির বিপক্ষে যুদ্ধ ঘোষণা করিবে এবং সুলতান মিত্রশক্তির বিরুদ্ধে ‘জেহাদ’ ঘোষণা করিবেন। এই ধর্মযুদ্ধ ঘোষণার ফলে ভারতীয় মুসলমানেরা ইংরেজের বিপক্ষে অস্ত্রধারণ করিবে ও তাহাতে ভারতে বিপ্লব চেষ্টার সুবিধাই হইবে।

(দত্ত, ডাঃ ভূপেন্দ্রনাথ। ১৩১০ বাংলা : ৩)

জার্মান সাহায্য ও ভারতের বৈপ্লবিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটেই ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দের শেষদিকে গঠিত হয় ভারতীয় বৈপ্লবিক কমিটি (Indian Independence Committee) বা বার্লিন কমিটি। জার্মানিতে বসবাসকারী ভারতীয় বিপ্লবীরা জার্মান সরকারের সাহায্যে বোমা, টাইমবোমা, ল্যান্ডমাইন সহ নানা ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র সম্বন্ধে জ্ঞানলাভ করেন। এই ভারতীয় নেতারাই আবার গদর পার্টির সঙ্গে বার্লিন কমিটির সংযোগ সাধন করেন। এটাই হল ভারতীয় বিপ্লব প্রচেষ্টার বৈদেশিক প্রেক্ষাপট।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পর্বে বিপ্লবীরা ব্যক্তিহত্যার রাজনীতি থেকে সরে আসতে থাকেন। পূর্ববর্তী ধর্ম ও হিন্দুপ্রভাবিত ভাবনাও বেশ কিছু পরিমাণে হ্রাস পায়। কারণ নেতৃবৃন্দ বুঝতে পারেন যে হিন্দু-মুসলিমের ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম ছাড়া স্বাধীনতা সম্ভব নয়। লক্ষ করার বিষয় হল ভারতের বাইরে ও ভেতরে হিন্দু-মুসলিম-শিখ সম্প্রদায়ের মানুষ এই ইংরেজবিরোধী সংগ্রামে অংশগ্রহণ শুধু নয়, নেতৃত্বও দিতে শুরু করে। আরও একটি বিষয় এখানে তাৎপর্যপূর্ণ— তা হল এই প্রথম (১৮৫৭-৫৮র পর) সারা ভারতজুড়ে অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা গ্রহণ করার লক্ষ্যে নেতৃবৃন্দ উদ্যোগ নেন। এই সশস্ত্র গণঅভ্যুত্থানের পথ বিপ্লবীদের জনবিচ্ছিন্নতার হাত থেকে বেশ কিছুটা মুক্ত করতে পেরেছিল। বাংলায় বিপ্লবী কার্যকলাপের বেশিরভাগটাই যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় (বাঘাযতীন) এবং বাংলার বাইরে রাসবিহারী বসু ও শচীন্দ্রনাথ সান্যালের নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছিল। এই বিপ্লবী প্রচেষ্টার সঙ্গে যুক্ত হয় গদর পার্টির আহ্বানে সাড়া দিয়ে বিদেশ থেকে আসা গদর বিপ্লবীরা ও বিদেশিদের সাহায্যের সম্ভাবনা।

যুদ্ধ পরিস্থিতি বিপ্লবীদের বিদ্রোহ সংঘটিত করার ক্ষেত্রে একটা বিরাট সুযোগ এনে দিয়েছিল। সুমিত সরকারের পর্যবেক্ষণটি এইরকম:

যে বিপ্লবীরা অবিলম্বে পূর্ণ স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করছিলেন তাঁদের মনে হয়েছিল, এই যুদ্ধে এক দৈবদত্ত সুযোগ। ভারত থেকে [ব্রিটিশ] সেনাদলের অপসারণ (একটা সময়ে শ্বেতাঙ্গ সৈন্যের সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছিল মাত্র ১৫০০০[1]) এবং ব্রিটেনের শত্রুপক্ষ জার্মান ও তুর্কিদের কাছ থেকে আর্থিক ও সামরিক সাহায্যের সম্ভাবনাও দেখা দিয়েছিল। এই ছিল একসময় যখন একটা সফল রাষ্ট্রঘাত (ক্যুদেতা) অসম্ভব বলে মনে হয়নি। তুর্কির (সব মুসলমানের ধর্মীয়-রাজনৈতিক নেতৃত্বের দাবীদার খলিফা-র জায়গা) সঙ্গে ব্রিটেনের যুদ্ধ গড়ে তুলল হিন্দু জাতীয়তাবাদী ও সর্ব-ইসলামবাদী জঙ্গি মুসলমানদের মধ্যে নিবিড় সহযোগিতা, আর দেখা দিলেন গদর-এর বরকতুল্লাহ এবং দেওবন্দ মোল্লা মাহমুদ হাসান ও ওবেইদুল্লা সিন্ধির মতো গুরুত্বপূর্ণ মুসলমান বিপ্লবী নেতা।

(সরকার, সুমিত। ২০১৩ : ১২৪-৫)

এরকম একটি পরিস্থিতিতে বাংলার বিপ্লবীরা উঠেপড়ে লাগলেন।[2] বাংলায় এসময় অনেকগুলি বিপ্লবী গোষ্ঠী থাকলেও তাদের অধিকাংশই ইতিমধ্যে বাঘাযতীনের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। তাঁদের পরিকল্পনার মধ্যে ছিল— রেলযোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা, কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম দখল করা (সেখানে তখন ছিল ষোড়শ রাজপুত বাহিনি, সেই বাহিনির সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল), জার্মানি থেকে অস্ত্র আমদানি করা ইত্যাদি। এ কাজের জন্য প্রয়োজন প্রচুর অর্থ ও অস্ত্র। অর্থ সংগ্রহ করা হল ডাকাতির মধ্য দিয়ে। এই সময় অস্ত্র সংগ্রহের জন্য বাঘাযতীন ও হেমচন্দ্র ঘোষের নেতৃত্বে বাংলার বিপ্লবীরা একটি দুঃসাহসিক কাজ করেন— রডা কোম্পানির অস্ত্র লুট। ২৬ আগস্ট ১৯১৪। অস্ত্র লুটের মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন শ্রীশচন্দ্র পাল। ইনিই প্রফুল্ল চাকীর গ্রেপ্তারকারী পুলিশ কর্মচারী নন্দলাল ব্যানার্জীকে কলকাতার সার্পেন্টাইন লেনে গুলি করে প্রাণদণ্ড দেন। অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে কৌশলে রডা কোম্পানির থেকে ৫০টি মাউজার পিস্তল ও ৪৯২০০ রাউন্ড বুলেট হাতিয়ে নেয়। যদিও পরবর্তীকালে ১২ রাউন্ড গুলি পুলিশ উদ্ধার করে বিপ্লবীদের গোডাউন থেকে। (রক্ষিত-রায়। ২০১৫ : ২২, ২৪)। এত প্রস্তুতি, এত আত্মত্যাগ সব ব্যর্থ হয়ে গেল দুর্বল সমন্বয়, শক্তিশালী রাজনৈতিক সংগঠন ও গণসংযোগের অভাবে। ওডিশার বুড়িবালাম নদীর কাছে বিপ্লবীদের সঙ্গে ব্রিটিশ বাহিনির সংঘর্ষ এরই করুণ পরিণতি। ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দের ৯ সেপ্টেম্বর বাঘাযতীন, চিত্তপ্রিয় রায়চৌধুরী, মনোরঞ্জন সেনগুপ্ত, নীরেন দাশগুপ্ত ও জ্যোতিষ পালকে টেগার্টের নেতৃত্বে এক বিরাট পুলিশবাহিনি (জনতা সহ) দুদিক থেকে ঘিরে ফেলে। শুরু হয়ে যায় এক অসম সংগ্রাম। একদিকে দেশপ্রেমিক পাঁচ বীর, আর অন্যদিকে সাম্রাজ্যবাদের পেয়াদারা। লড়াই চলল ঘন্টার পর ঘন্টা। সংঘর্ষ চলাকালীন চিত্তপ্রিয় শহীদ হলেন, যতীন্দ্রনাথ হলেন আহত। পুলিশের হাতে বন্দি হলেন চার বিপ্লবী। পরদিন ভোর পাঁচটায় মহাবিপ্লবী যতীন্দ্রনাথের মৃত্যু হয় বালেশ্বর হাসপাতালে। মনোরঞ্জন ও নীরেনের জন্য অপেক্ষা করছিল ফাঁসির দড়ি (২২ নভেম্বর ১৯১৫)। জ্যোতিষ পালকে পাঠানো হল দ্বীপান্তরে ১৪ বছরের জন্য। (বিস্তৃত বিবরণের জন্য ঘোষ, কালীচরণ। ২০১৭ : ২ : ১৩৩-৩৮ এবং রক্ষিত-রায় ২০১৬ : ১০৯-১৩)।

বাংলায় যেমন অভ্যুত্থানের আয়োজন শুরু হয়েছিল যতীন্দ্রনাথ মুখার্জী, হেমচন্দ্র ঘোষ প্রমুখের নেতৃত্বে, তেমনই বেনারসে মুখ্য ভূমিকা নিয়েছিলেন শচীন্দ্রনাথ সান্যাল। শচীন্দ্রনাথ সান্যাল ছিলেন সর্বভারতীয় নেতা রাসবিহারী বসুর ডানহাত। রাসবিহারী বসুকে যদি বিপ্লব প্রচেষ্টার মস্তিষ্ক বলা হয়, তাহলে শচীন্দ্রনাথ সান্যাল হলেন ‘হৃদয়’। শচীন সান্যালের নেতৃত্বে ছাত্র-যুব মধ্যবিত্ত সমাজের একাংশের মধ্যে বিপ্লবী আলোড়ন সৃষ্টি হয়। ১৯১৮-এ গঠিত ‘যুবক সমিতি’র প্রাণপুরুষ ছিলেন শচীন সান্যাল। এই সংগঠনটি ছাড়াও তাঁর সক্রিয় উদ্যোগে গড়ে উঠেছিল ‘দি স্টুডেন্টস ইউনিয়ান লিগ’। এইসব সংগঠন ছাড়াও সেবক সমিতির মধ্যে দিয়েও শচীন্দ্রনাথ সান্যাল ও অন্যান্য বিপ্লবীরা বেনারসে বিপ্লবী ধ্যানধারণা প্রচার করতেন। (বন্দ্যোপাধ্যায়, বিজয়। ২০০৪ : ২৬-৩১)। তিনি পূর্ববর্তী বিপ্লবীদের মত সম্পূর্ণ আবেগ দ্বারা পরিচালিত হননি। তিনি ছিলেন অনেক পরিমাণে বাস্তববাদী। ধর্মবিশ্বাস ছিল তাঁর প্রবল, কিন্তু তাই বলে যুক্তিকে বর্জন করেননি। ফলে তাঁর মধ্যে একটি আদর্শগত দ্বন্দ্বের আবির্ভাব ঘটে। তিনি তাঁর ‘বন্দী জীবন’-এর ভূমিকায় লিখেছেন:

বন্ধুর কথামতো আমি স্বামী বিবেকানন্দ ও শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের জীবনী পড়লাম। তাঁদের সমস্ত বাণীগুলি নিয়ে একাগ্র মনে একান্ত গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করলাম। অনুবাদের সাহায্যে উপনিষদ ও গীতা বারবার পড়লাম, সাধুসঙ্গও করতে লাগলাম। এভাবে অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে আমি হিন্দু সমাজের মর্মকথা ভালোভাবে অনুধাবন করার চেষ্টা করলাম। সাধু-সন্তদের সংসর্গে জীবনে প্রভূত লাভ হয়েছে এ ব্যাপারে কোনও সংশয় নেই। কিন্তু কোথাও তৃপ্তি পেলাম না। আমার এটা কিছুতেই বোধগম্য হল না, সমাজের শ্রেষ্ঠ মহাপুরুষগণ সমাজে কেন আসেন না, সামাজিক কাজে কেন অগ্রণী হন না? সাধু-সন্তদের সংসর্গে এসে দেখতে পেলাম, সাধন-ভজন ছাড়া এঁরা এক পাও এদিক-ওদিক নড়েন না। … । তাঁদের মধ্যে ত্যাগ আছে, অধ্যয়নশীলতা আছে, একাগ্রচিত্তে কোনও কাজে লেগে থাকার শক্তি আছে, কিন্তু সমাজসেবা সংক্রান্ত কোনও কাজে তাঁরা আসতে চান না। … বিবেকানন্দের বাণীতে কর্মযোগ ও সন্ন্যাস- দুরকমের কথাই পেলাম। কিন্তু সুস্পষ্টভাবে কোনও প্রমাণ পেলাম না যে কর্মের মার্গই একমাত্র সত্যপথ বলা হয়েছে কিনা। তখন স্থির করলাম, আমরা নিজ নিজ প্রকৃতি অনুযায়ী যে পথ গ্রহণ করব সেই পথই আমাদের পক্ষে সঠিক ও অন্যগুলি ভুল।

(সান্যাল। ২০১৭ : ৭)

শচীন্দ্রনাথ সান্যাল

জীবনে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার ক্ষেত্রে তিনি তিনটি পথের কথা বলেন— নিজস্ব বিচারবুদ্ধি, সদগুরু ও শাস্ত্র বচন। এই তিনটির মধ্যে বিচারবুদ্ধিকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেন (পূর্বোক্ত)। তিনি লক্ষ করেছিলেন যে ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতার নামে বেশ কিছু মানুষ আত্মস্বার্থ রক্ষাতেই বেশি উৎসাহী। ধর্মের আড়ালে এই প্রতারণা তাঁকে বিরক্ত ও বিক্ষুব্ধ করেছিল:

… আমি দেখেছি, আমাদের অনেক ভাই-বন্ধু ভারতীয় আদর্শের দোহাই দিয়ে, অন্য দিকে আধ্যাত্মিকতার আড়ালে স্বার্থবুদ্ধির দ্বারা প্রণোদিত হয়ে ও তামসিক বৃত্তির বশবর্তী হয়ে ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে দূরে থেকেছেন। এই ধরনের আধ্যাত্মিকতার জন্য গৃহস্থালীর কাজ করতে বাধা নেই, বহাল তবিয়তে তাঁরা খাওয়া-দাওয়া করেন, বাজার করেন, পরিবার প্রতিপালনের নিমিত্ত নানা ধরনের কাজ করেন, বিবাহ করেন, সন্তান- উৎপাদন ও সন্তান পালনও করেন, অর্থাৎ গার্হস্থ্য আশ্রমের সব কাজ করেন, শুধু রাজনীতিতে অংশগ্রহণের সময় ধার্মিক জীবন ব্যতীত কাজ করার দোহাই পেড়ে ভারতীয় অধ্যাত্মবাদের আড়ালে নিজেদের কাপুরুষতা ঢাকেন।

(পূর্বোক্ত: ৮)

শচীন্দ্রনাথ সান্যাল এই ধর্মজীবীদের চরিত্র সঠিকভাবেই বুঝেছিলেন। ফলে এই সব ধর্মবিশ্বাসী প্রতারকদের বিপরীতে বিচার-বুদ্ধি অনুযায়ী দেশের কাজ করাকেই সঠিক পথ বেছে নিয়েছিলেন। ধর্মকে তিনি পরিত্যাগ করলেন না ঠিকই, কিন্তু ধর্মীয় সহিষ্ণুতাকে গ্রহণ করতেও তারা অসুবিধা হল না। জীবনের নানা বাঁকে হিন্দু-শিখ-মুসলিম বিপ্লবীদের সঙ্গে মোলাকাতের নানা অভিজ্ঞতা তাঁর হয়েছে। তিনি মুসলিম ও শিখ বিপ্লবীদের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা ও সমালোচনা করেছেন। তা ধর্মীয় বিদ্বেষ বা অনুরাগের থেকে নয়, বিচার-বুদ্ধির দ্বারা। তিনি নিজে ধর্মপ্রাণ বৈষ্ণব হওয়া সত্ত্বেও দ্বিধাহীনভাবে বিধর্মীর আত্মত্যাগ ও দেশপ্রেমকে সম্মান জানিয়েছেন। লাহোরের দুই সৈনিক— লছমন সিং ও অপরজন সৈনিক যিনি ধর্মে মুসলমান (শচীন্দ্রনাথ তাঁর নাম ভুলে গিয়েছিলেন)— উভয়েরই ফাঁসির আদেশ হয়। “যখন লছমন সিং-এর ফাঁসির হুকুমের পর সেই মুসলমান হাবিলদারটিকে জীবনদানের প্রলোভন দেখাইয়া কিছু গোপন কথা আদায় করিবার চেষ্টা করা হয় ও বলা হয় সে কি এক কাফেরের সহিত একত্র ফাঁসি যাওয়া পছন্দ করিবে? উত্তরে সেই মুসলমান হাবিলদারটি বলে, ‘যদি আমি লছমন সিং-এর সহিত একত্রে ফাঁসি যাই তো আমার স্বর্গবাস হইবে।’ সেই মুসলমানটিরও ফাঁসি হয়।” (সান্যাল, শচীন্দ্রনাথ। ২০১৭ : ৬৭)।

রাসবিহারী বসু, শচীন্দ্রনাথ সান্যাল, যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় (বাঘাযতীন) প্রমুখ ব্যক্তিহত্যার রাজনীতির মধ্য দিয়ে যে স্বাধীনতা লাভ সম্ভব নয়, তা বোধহয় বুঝতে পেরেছিলেন। আর সেই কারণেই তাঁরা দেশব্যাপী অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা করতে শুরু করেন। ইতিমধ্যে আমেরিকায় গদর পার্টি গঠিত হয়েছে (১৯১৩)। উত্তর আমেরিকা ও কানাডা থেকে বিভিন্ন দলে প্রায় ছয়-সাত হাজার শিখ সহ নানা পরিচয়ের প্রবাসীরা ভারতে ফিরে আসেন। তাঁদের লক্ষ্য ভারতে বিদ্রোহ (গদর) সংঘটিত করে ব্রিটিশদের তাড়িয়ে ভারতকে স্বাধীন করা। কিন্তু তাঁদের মধ্যে দক্ষ সংগঠক ও কেন্দ্রীয় স্তরে নেতৃত্ব দেওয়ার মত কেউ তখনও গড়ে ওঠেনি। তাই তাঁরা রাসবিহারী বসুকে নেতা হিসেবে গ্রহণ করতে চাইলেন। তাঁরা দিল্লি ষড়যন্ত্র মামলার প্রধান অভিযুক্ত বিপ্লবী রাসবিহারী বসুর কথা আমেরিকায় থাকাকালীন অবস্থাতেই জানতে পেরেছিলেন।

প্রবাসীরা ভারতে ফিরে আসায় পাঞ্জাবের পরিবেশে যে গুণগত পরিবর্তন ঘটতে শুরু করেছে এখবর রাসবিহারীও পেয়েছিলেন। স্থির হয় পরিস্থিতি বোঝার জন্য তিনি পাঞ্জাব যাবেন। কিন্তু নানা কাজে আটকে পড়ায় তাঁর যাওয়া সম্ভব হয়নি। তাই তাঁর পরিবর্তে শচীন্দ্রনাথ সান্যালকে সেখানে পাঠানো হয়। জলন্ধরে শচীন্দ্রনাথ সান্যালের সঙ্গে দেখা হয় তরুণ বিপ্লবী কর্তার সিং সারাভার। এছাড়াও আলাপ হয় পৃথ্বী সিং, অমর সিং রামরাখা ও আরও অনেকের সঙ্গে। শচীন্দ্রনাথ সান্যাল লিখেছেন: “ইহাদের সহিত কথাবার্তায় বুঝিলাম যে ইহাদের বিপ্লবায়োজনের সর্বপ্রধান অবলম্বন হইল পাঞ্জাবের শিখ সৈন্য। কারতার সিংয়ের নিকট শুনিলাম যে, আমেরিকা প্রত্যাগত শিখদের সর্বপ্রথম দলেই তিনি এদেশে আসিয়াছেন [১৯১৪] এবং সেপ্টেম্বর মাস হইতে এই কার্যের আয়োজন করিতেছেন ইত্যাদি।” (সান্যাল, শচীন্দ্রনাথ। ২০১৭ : ৩৫-৩৬)। একই সঙ্গে তিনি কর্তার সিংকে বোমা জোগানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসেন। কাশীতে ফিরে রাসবিহারীকে পাঞ্জাবের পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি যা জেনেছেন তা উপস্থিত করলেন। এবং তাঁর সঙ্গে পরামর্শ করে রাসবিহারী স্থির করলেন অবিলম্বে যুক্তপ্রদেশ ও বাংলাতেও সৈনিকদের মধ্যে বিপ্লবের প্রচার শুরু করে দিতে হবে। সময়টি নভেম্বর-ডিসেম্বর ১৯১৪।

বিপ্লব সংক্রান্ত আলোচনার লক্ষ্যে এই সময় বাঘাযতীন কাশীতে যান। পাঞ্জাবের উত্তাল পরিস্থিতির কথা তাঁকে জানানো হয়। যতীন মুখোপাধ্যায়ের মত ছিল, হাতে যথেষ্ট অর্থ না নিয়ে এ কাজে নামা উচিত নয়। তাছাড়া বাংলায় প্রস্তুতির জন্য বেশ কয়েকমাস সময় প্রয়োজন। তাঁর এই অনুরোধ রাখা যায়নি। বাঘাযতীন শেষ পর্যন্ত সম্মত হন।

পাঞ্জাব, বিহার, যুক্তপ্রদেশ ও বাংলার বিভিন্ন সেনানিবাসে বিপ্লবীরা আনাগোনা শুরু করেন এবং সৈন্যদের বিপ্লবের পক্ষে নিয়ে আসেন। ইতিমধ্যে ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯১৫ অভ্যুত্থানের দিন স্থির হয়। কিন্তু দেশ জুড়ে এই বিদ্রোহ প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়ে গেল কৃপাল সিং-এর বিশ্বাসঘাতকতায়। কৃপাল সিং পুলিশকে সব কিছু জানিয়ে দেয়। পাঞ্জাবের বিপ্লবীরা তা জানতে পেরে অভ্যুত্থানের দিন স্থির করে ১৯ ফেব্রুয়ারি। কিন্তু সে সংবাদ সর্বত্র পৌঁছনো যায়নি। শুধুমাত্র সিঙ্গাপুরে বিদ্রোহের স্ফুলিঙ্গ দেখা গেল। আর তা সহজেই দমিত হল ব্রিটিশ সরকার দ্বারা। স্বপ্নভঙ্গের যন্ত্রণা নিয়ে রাসবিহারী দেশত্যাগ করলেন। বিপ্লবীরা একের পর এক বন্দি হলেন। কারও সাজা হল ফাঁসি, কারও বা যাবজ্জীবন। ২৬ জুন ১৯১৫ শচীন্দ্রনাথ গ্রেপ্তার হলেন। ১৮ আগস্ট ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে তাঁকে যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর দেওয়া হয়। ১৯২০-র ফেব্রুয়ারিতে তিনি মুক্ত হন। শুরু হয় বিপ্লব প্রচেষ্টার নতুন উদ্যোগ।

ফেব্রুয়ারি ১৯২০। আন্দামানের সেলুলার জেল থেকে মুক্তি পেয়ে শচীন্দ্রনাথ ভারতে ফিরে আসেন। শুরুতে তিনি উপার্জনের চেষ্টা করলেও বিশেষ সুবিধা করে উঠতে পারেননি। বেশ কয়েক হাজার টাকা নিয়োগ করে তিনি ইটের কারবার খুলে বসেন৷ কিন্তু লাভের বদলে লোকসান হয়। এই সময় কালনায় থাকাকালীন তিনি তাঁর ‘বন্দী জীবন’ লেখা শুরু করেন। অবশেষে ইটের কারবার ত্যাগ করে বি এন রেলওয়েতে একটি চাকরি জোগাড় করেন৷ কিন্তু চাকরির গোলামি তাঁর সহ্য হচ্ছিল না। তিনি চাকরি ছাড়লেন। এর পরে পরেই জামশেদপুর শ্রমিক সংগঠন দেখাশুনার একটি কাজ পেয়ে গেলেন। তিনি আনন্দের সঙ্গে কাজে যোগ দিলেন (১৯২১)। এই সময় সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, “নয় মাস দিন-রাত কাজ করে শ্রমিক সংগঠন সম্পর্কে আমি যথেষ্ট অভিজ্ঞতা অর্জন করি। জামশেদপুরে কাজ করাকালীন কংগ্রেসের নাগপুর অধিবেশনে অংশগ্রহণ করি। সেই সুযোগে ভারতের সমস্ত প্রদেশের বিপ্লবীদের সঙ্গে পরিচয়, মেলামেশা হয়।” (পূর্বোক্ত: ১৯০)। এই অভিজ্ঞতা একদিকে তাঁর চিন্তার প্রসার ঘটিয়েছিল, মধ্যবিত্ত শিক্ষিত ছাত্র-যুবর ভূমিকা ছাড়াও শ্রমিক ও শ্রমজীবী মানুষের সামর্থ্য ও শক্তির উপর আস্থা রাখতে সাহায্য করেছিল। কিন্তু শ্রমিকশ্রেণির পক্ষে কোনও ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করা সম্ভব— তা তাঁর চিন্তায় আসেনি।

১৯২১-এর শুরুতে তিনি জামশেদপুরের শ্রমিক সংগঠনের কাজ করাকালীন সময়েও ‘বন্দী জীবন’ লেখা থামাননি। এই সময়েই এই লেখাগুলি চিত্তরঞ্জন দাশ সম্পাদিত ‘নারায়ণ’ নামে একটি মাসিক পত্রিকায় প্রকাশিত হতে থাকে। পরবর্তীকালে গ্রন্থ আকারে প্রকাশিত হয়— ‘বন্দী জীবন’ (প্রথম খণ্ড) নামে। ‘বন্দী জীবন’-এর দ্বিতীয় খণ্ডের লেখাগুলি প্রকাশিত হয় ‘বঙ্গবাণী’ পত্রিকায়, ধারাবাহিকভাবে। ১৯২১ ছিল একটি উত্তাল পর্ব। শুরু হয়ে গিয়েছিল অসহযোগ আন্দোলন। হাজার হাজার মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়েছিল মুক্তির লক্ষ্যে। তারা বিদ্যালয়, লোভনীয় চাকরি ছেড়ে দিল। বরণ করে নিল জেলখানার অন্ধকার। এই পর্বটি সম্পর্কে শচীন্দ্রনাথের ভাবনাটি ছিল এইরকম:

..মহত্মাজীর আন্দোলনে যোগ দিলে অল্প ত্যাগ ও অল্প কষ্ট সহ্য করতে পারলেই কাজ চলত। তাই মহাত্মাজীর আন্দোলনে হাজার হাজার ভারতবাসী যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর কর্মসূচি অনুযায়ী কিভাবে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা পাওয়া যাবে, এটা আমার মতো যুবকদের বোধগম্য হত না। হাজারে হাজারে জেলে গেলেই যে কী করে প্রজাগণের হাতে দেশের রাজশক্তি এসে যাবে, আমাদের মাথায় ঢুকত না। তাই আমার মতো যুবকরা ঠিক করে নিয়েছিল যে সশস্ত্র বিপ্লবের প্রস্তুতি করতেই হবে।

(পূর্বোক্ত: ১৯৫)।

গান্ধি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এক বছরের মধ্যে স্বরাজ এনে দেবেন (পূর্বোক্ত)। গান্ধির এই আশ্বাসে আশ্বস্ত না হলেও অসহযোগ আন্দোলনের সময় বিপ্লবীরা তাঁদের কাজকে কিছুদিনের জন্য স্থগিত রেখেছিলেন।[3] শুধু তাই নয়, তাঁরাও তাঁদের শক্তি-সামর্থ্যমতো আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। যোগেশচন্দ্র চ্যাটার্জী, চন্দ্রশেখর আজাদ, ভগৎ সিং, সুখদেব, যতীন দাস, ভগবতী চরণ ভোরা, যশপাল, শিব ভার্মা, ডাঃ গয়াপ্রসাদ প্রমুখের নাম এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। গান্ধি তাঁর কথা রাখতে পারেননি। বরং যা তিনি করলেন তা সমগ্র দেশের মানুষের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা ছাড়া আর কিছুই নয়। ১৯২২-এ অসহযোগ আন্দোলন যখন তুঙ্গে, তখন একটি অকিঞ্চিৎকর ঘটনার অজুহাতে আন্দোলন তুলে নিলেন। বিপান চন্দ্র লিখেছেন:

গান্ধী যেভাবে আন্দোলন প্রত্যাহার করে নিলেন তাতে যেসব তরুণ তাঁর ডাকে স্কুল-কলেজ ছেড়ে, এমনকি ঘর-সংসার ছেড়ে ছুটে এসেছিল তাদের মধ্যে গভীর অসন্তোষ দেখা দিল। সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সর্বজনীন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যে হিন্দু-মুসলমান ঐক্য গড়ে উঠেছিল, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার উন্মত্ততা ও সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের ফলে বিষিয়ে যাওয়া পরিবেশে তা ভেঙে চুরমার হয়ে যাওয়ায় তাদের হতাশা আরো বেড়ে গেল। এইসব আদর্শবাদী তরুণ [বিপ্লবীরা] চৌরিচৌরার[4] ঘটনাকে ভুল বলে মনে করেনি। যে রাজনৈতিক ও নৈতিক চিন্তাধারা একটি শক্তিশালী গণআন্দোলনকে এক আঘাতে ভেঙে দেয় তাকেও তারা মেনে নিতে পারেনি।

(চন্দ্র, বিপান। ২০০০ : ১৯৩)।

১০ মার্চ ১৯২২ গান্ধি গ্রেপ্তার হলেন। গান্ধির ‘এক বছরের মধ্যে স্বরাজ’ প্রতিশ্রুতিটি প্রতিশ্রুতিই থেকে গেল। বাংলার কয়েকজন বিপ্লবী মোহনদাস গান্ধিকে কথা দিয়েছিলেন যে, অসহযোগ চলাকালীন তাঁরা গান্ধির কোনও কাজে বাধা সৃষ্টি করবেন না। (সান্যাল, শচীন্দ্রনাথ। ২০১৭ : ২১৩)। বিপ্লবীরা তাঁদের কথা রেখেছিলেন। এইরকম একটি প্রেক্ষাপটে একটি চিঠিতে শচীন্দ্রনাথ গান্ধিকে লেখেন:

কিছুকাল আগে আপনি যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তার কথা আপনাকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া আমার কর্তব্য বলেই আমি মনে করছি। আপনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, বিপ্লবীরা যখন তাদের নীরবতা ভঙ্গ করে আবার ভারতের রাজনীতিতে প্রবেশ করবে তখন আপনি রাজনৈতিক ক্ষেত্র থেকে অবসর গ্রহণ করবেন। অহিংস-অসহযোগ আন্দোলন নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা এখন শেষ হয়ে গিয়েছে। আপনার এই পরীক্ষার জন্য আপনি পুরো এক বছর সময় চেয়েছিলেন। আপনার সেই পরীক্ষা চলেছে পাঁচ না হলেও পুরো চার বছর ধরে। এরপরেও কি আপনি বলতে চান যে পরীক্ষাটা যথেষ্ট বেশি সময় ধরে চালানো যায়নি?

(ইয়ং ইন্ডিয়া, ১২.২.১৯২৫। উদ্ধৃত দাশগুপ্ত, ২০০৯ : ২৭)

ফলে শুরু হয় গান্ধিবাদী রাজনীতির বিকল্প অনুসন্ধান। গান্ধিবাদকে বর্জন করে তাঁরা ধাবিত হন— একদিকে সমাজতন্ত্রবাদের অভিমুখে, আর অন্যদিকে সশস্ত্র বিপ্লবের পথে। শচীন্দ্রনাথ সান্যাল এই দ্বিতীয় পথটি বেছে নিয়েছিলেন। তবে সমাজতন্ত্রবাদকে তিনি পুরোপুরি পরিত্যাগ করেননি। ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে পাঞ্জাবে সংগঠন করাকালীন সময়েই মার্কসবাদ, সমাজতন্ত্রবাদ, লেনিনের চিন্তা ও রচনার সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটে। দিল্লিতে মানবেন্দ্রনাথের সহকর্মী কুতুবউদ্দিন আহমেদ তাঁর কাছে কমিউনিস্ট ধারণাকে স্পষ্টভাবে উপস্থিত করেন। শচীন্দ্রনাথ মার্কসবাদের ইতিহাসের অর্থনৈতিক ব্যাখ্যাকে বেশ কিছু পরিমাণে গ্রহণ করেন। সম্পদের সামাজিকীকরণ ও ব্যক্তিগত সম্পত্তির বিলোপের ধারণাটিকেও তাঁর বেশ লাগে। কিন্তু দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদকে তিনি একেবারেই গ্রহণ করতে পারেননি। (সান্যাল, শচীন্দ্রনাথ। ২০১৭ : ২৩৬-২৪১)। তবুও এটা বলতেই হবে যে শচীন্দ্রনাথ পূর্ববর্তী সশস্ত্র বিপ্লবীদের থেকে অনেকটাই এগিয়ে যেতে পেরেছিলেন।

এইসময় বাংলায় বিপ্লবী সঙ্ঘগুলি নানা ধরনের জটিলতার মধ্যে ছিল। আভ্যন্তরীণ কলহই ছিল তাদের সমস্যার অন্যতম প্রধান কারণ। শচীন্দ্রনাথ লিখেছেন, “বাংলার রাজনৈতিক পরিস্থিতি দেখে আমি বুঝে গিয়েছিলাম, আমাকে একলাই উত্তর ভারতে অর্থাৎ পাঞ্জাব ও যুক্তপ্রদেশে কাজ করতে হবে। (পূর্বোক্ত: ১৯৬)। বস্তুতপক্ষে গান্ধির মত ও পথের প্রতি শচীন্দ্রনাথের কোনওদিনই আস্থা ছিল না। তাই ১৯২১ খ্রিস্টাব্দেই তিনি জামশেদপুরের শ্রমিক ইউনিয়নের চাকরি ছেড়ে এলাহাবাদে চলে যান। তিনি লিখেছেন, “প্রকৃতপক্ষে সেই দিন থেকে আমি উত্তর ভারতে বিপ্লবের কাজ শুরু করে দিই। জীবনে এবার এক নতুন অধ্যায় শুরু হলো।” (পূর্বোক্ত)। এলাহাবাদে তিনি মৈনপুরী মামলার সঙ্গে যুক্ত দেবনারায়ণজির সংস্পর্শে আসেন। শাহজাহানপুরের রামপ্রসাদ বিসমিল এই মৈনপুরী দলের সঙ্গেই যুক্ত ছিলেন। শচীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর আলাপ হয়। যোগাযোগ হয় রাজেন লাহিড়ী, আসফাকুল্লা খাঁন, জয়চন্দ্র বিদ্যালঙ্কার প্রমুখের সঙ্গে।

জয়চন্দ্র বিদ্যালঙ্কার ছিলেন লাহোরের জাতীয় কলেজ বা তিলক স্কুল অফ পলিটিক্সের অধ্যাপক। লাহোরেই জয়চন্দ্রের ছাত্র ও পরিচিত বেশ কয়েকজন তরুণের সঙ্গে শচীন্দ্রনাথের আলাপ হয়। এঁদের মধ্যে ভগৎ সিং ছিলেন অন্যতম৷ সময়টা ১৯২৩-২৪। ভগৎ সিং তখন লাহোরের জাতীয় কলেজের ছাত্র। শচীন্দ্রনাথ সান্যালের প্রতি ভগৎ সিং-এর আকর্ষণ তৈরি হয়। উভয়ের মধ্যে যোগাযোগ বাড়তে থাকে। ভগৎ সিং যখন বিএ ক্লাসের ছাত্র, তখনই বৈপ্লবিক কাজকর্মেই জীবনকে উৎসর্গ করবেন— এই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেন৷ ইতিমধ্যে  ভগৎ সিং-এর বাবা কিষেণ সিং ভগৎ-কে বিয়ে করার জন্য চাপ দিতে থাকেন এবং বাড়ি চলে আসতে বলেন। শচীন্দ্রনাথ ভগৎ সিং-এর কাছ থেকে এসব কথা জানতে পেরে ভগৎ-কে বলেন:

…যদি তুমি বিবাহ করে নাও তো ভবিষ্যতে বিপ্লবী আন্দোলনে বেশি কাজ করতে পারবে না। ভগৎ সিং বিবাহ করতে চাইছিলেন না। আমার একটা নিয়ম ছিল, দলের লোকদের যাচাই করার জন্য দেখতে চাইতাম যে ত্যাগ স্বীকারের জন্য তারা কতটা প্রস্তুত। আমরা তাদেরই আমাদের দলের লোক বলে মনে করতাম যারা যখন বলা হবে তখনই বাড়িঘর ছেড়ে কাজ করার জন্য ময়দানে নামতে প্রস্তুত। এই নীতি অনুযায়ী ভগৎ সিংকে বললাম, ‘কি ঘরবাড়ি ছাড়ার জন্য তৈরি? যদি বিবাহ করে ফেলো তো পরবর্তীকালে তোমার কাছ থেকে বেশি কাজের আশা থাকবে না, আর যদি বাড়িতেই থাকো তো বিবাহ করতেই হবে। আমি চাই না যে তুমি বিবাহ করো।’ ভগৎ সিং বাড়ি ছাড়ার জন্য তৈরি হয়ে গেলেন। একবার ভাবলাম সর্দার কিশন সিং (ভগৎ সিং-এর বাবা)-এর সঙ্গে দেখা করে নিই। কেননা আগে তাঁর সঙ্গে কিছুটা সম্পর্ক ছিল। কিন্তু ভগৎ সিং বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়াতে ঠিক করলাম যে এখন দেখা করব না। মনে আছে, একবার লাহোরের শহরতলি অঞ্চলে একটা বাংলোগোছের বাড়িতে সর্দার কিশন সিংয়ের সঙ্গে দেখা হয়েছিল, কিন্তু কোন বারে তা মনে নেই। আমার কথায় ভগৎ সিং যুক্তপ্রদেশে চলে গেলেন। প্রথমে কানপুরে মুন্নিলাল অবস্থির বাড়িতে তাঁর থাকার ব্যবস্থা করা হল।

(পূর্বোক্ত: ২১৫)

১৯২৩ খ্রিস্টাব্দের গোড়াতেই শচীন্দ্রনাথ সান্যাল যুক্তপ্রদেশ ও পাঞ্জাবে কমপক্ষে ২০/২৫টি বিপ্লবকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছিলেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল সশস্ত্র সংগ্রামের জন্য একটি সুসংগঠিত রাজনৈতিক দল গঠন করা। এই কাজটি তিনি গোপনেই করতেন। প্রকাশ্যে কংগ্রেসের সঙ্গে তাঁর সংযোগ ছিল। তিনি কংগ্রেসের বিভিন্ন অধিবেশনে যোগ দিয়ে টের পান যে কংগ্রেসের নেতারা কতদূর বিপ্লবী-বিদ্বেষী। শচীন্দ্রনাথ লিখেছেন:

…কংগ্রেসের নেতারা, বিশেষ করে মহাত্মাজী ও তার অনুগামীরা, বিপ্লবীদের যেন তাঁদের ও দেশের শত্রু বলেই মনে করেন। কংগ্রেসের প্ল্যাটফর্ম থেকে এবং সভাপতির আসন থেকে এমন বক্তব্য রাখা হত যাতে নির্মমভাবে ও প্রচণ্ডভাবে দলবাজির মানসিকতা সৃষ্টি হয়। মনে হয় এই নেতাদের হৃদয় বিপ্লবীদের প্রতি এক ধরনের উগ্র তিক্ততা রয়েছে। নেতারা কখনও বিপ্লবীদের আন্দোলনকে ইনফ্যান্টাইল অর্থাৎ শিশুসুলভ আখ্যা দিয়ে নিন্দা করতেন, তো কখনও ফ্যাসিস্ট ছাপ মেরে নিজেদের রাগ ঠান্ডা করতেন। আবার কখনও বলে থাকেন যে বিপ্লবীরা দেশের অগ্রগতিকে ৫০ বছর পেছনে ঠেলে দিয়েছে। কখনও অপবাদ দেওয়া হয়, বিপ্লবীরা জোর করে অসহায় নির্দোষ লোকদের শহীদ বানিয়ে দেয়। এমন মনোবৃত্তির পেছনে ঠান্ডা মাথার কোনও যুক্তি নেই, কোনও ঐতিহাসিক অনুপ্রেরণাও নেই, এবং সবচেয়ে বড় কথা কোনও কল্যাণকামনাও এ মনোবৃত্তির পেছনে নেই। এর পেছনে রয়েছে দম্ভের এক উগ্র রূপ।

(পূর্বোক্ত: ২১২)

তবুও শচীন্দ্রনাথ একের পর এক জাতীয়তাবাদী নেতাদের সঙ্গে কথা বলেন। চিত্তরঞ্জন দাশ, মতিলাল নেহেরু, জহরলাল নেহেরু-র সঙ্গে আলাপ-আলোচনা চালিয়ে তাঁর কাছে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, বিপ্লবী আন্দোলনকে এঁরা কোনওভাবেই সাহায্য করতে রাজি নন। সুতরাং এঁদের ছাড়াই পথ চলতে হবে। বাদ দিতে হবে সাবেকি বিপ্লবী পন্থাকেও। সন্ত্রাসবাদ কোনও কার্যকরী পথ হতে পারে না। তিনি তাঁর উপলব্ধির কথা প্রকাশ করে বলেন, “…সন্ত্রাসবাদের দ্বারা কখনও দেশ স্বাধীন করা যায় না।” বরং “…সন্ত্রাসবাদের ধাক্কায় বিপ্লবী আন্দোলনের প্রচণ্ড ক্ষতি হতে পারে।” (পূর্বোক্ত: ২১৩)। এইসময়েই (১৯২১-২৩) তিনি কমিউনিজমের আদর্শ দ্বারা ভীষণভাবে প্রভাবিত হন। যদিও তিনি বস্তুবাদকে গ্রহণ করতে পারেননি (পূর্বোক্ত: ২৪১), তবুও মার্কসবাদ ও লেনিনের প্রতি শ্রদ্ধা তাঁর কম ছিল না। সেসময় কলকাতা থেকে বিপ্লবীরা একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করতেন। নাম ‘শঙ্খ’। এই পত্রিকায় ১৯২১-এর মার্চ থেকে শুরু করে দুই বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে শচীন্দ্রনাথ লেনিনের জীবনের ওপর প্রবন্ধ লেখেন। ১৯২২-এর ফেব্রুয়ারি মাসে শচীন্দ্রনাথ লেখেন:

রাশিয়ার শহর ও গ্রামে বিচিত্র অর্থনৈতিক অবস্থার আলোচনা করিয়া তিনি [লেনিন] দেখাইয়াছিলেন কেমন করিয়া ক্রমশ রাশিয়াতে ধনী সম্প্রদায়ের অভ্যুত্থান হইয়াছে এবং কেমন করিয়া এই ধনীদেরই মূলধনে রাশিয়ার সকল কারবার, ব্যবসা-বাণিজ্য, এমনকি চাষীদের চাষবাসও নিয়ন্ত্রিত হইতেছে। … কেবলমাত্র প্রচলিত গণতন্ত্র স্থাপিত হইলেই যে দারিদ্র্য সমস্যার মীমাংসা হইবে না, কারণ তখনও প্রকৃতপক্ষে এই ধনী সম্প্রদায় ধনের বলে সর্বময় কর্তা থাকিয়া যাইব— এই কথাই লেনিন রাশিয়ায় সর্বপ্রথম খুব দক্ষতার সহিত আলোচনা করিতে আরম্ভ করিলেন। … লেনিনই বলিতে গেলে সর্বপ্রথম কার্ল মার্ক্সের সোশালিজম রাশিয়ার কর্মক্ষেত্রে কার্যকরী রূপে প্রতিষ্ঠা করেন।

(‘শঙ্খ’, ২৯ মাঘ ১৩২৯ বাংলা। উদ্ধৃত চট্টোপাধ্যায়, গৌতম। ২০১৬ : ৪৬-৭)

১৯২০-র দশকে সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনের উপর রাশিয়ার নভেম্বর বিপ্লব, মার্ক্স-এঙ্গেলস-লেনিনের যে যথেষ্ট প্রভাব পড়েছিল তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এমনকি যাঁরা মার্কসবাদ/কমিউনিজমকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করেননি, তাঁদের পক্ষেও এর প্রভাবকে অগ্রাহ্য করা একেবারেই সম্ভব হয়নি। শচীন্দ্রনাথ তাঁদের মধ্যে অন্যতম। তাঁর লেখার মধ্যে দুটি বিশেষত্বের ওপর গৌতম চট্টোপাধ্যায় আলোকপাত করেছেন:

প্রথমতঃ লেনিনকে মোটেই অবতার ধরে নিয়ে ব্যক্তিপূজা করা হচ্ছে না। বেশ রাজনৈতিকভাবেই তাঁকে শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে। দ্বিতীয়তঃ প্রবন্ধটিতে সস্তা ভাবাবেগ নেই, পক্ষান্তরে যথেষ্ট স্বচ্ছ সমাজতান্ত্রিক ধ্যান-ধারণা ও শ্রেণীচেতনার প্রকাশ রয়েছে। অর্থাৎ শোষণমুক্ত সমাজ গড়ার স্বপ্ন তখন প্রগতিশীল স্বরাজপন্থীদের মধ্যে আসতে আরম্ভ করেছে, তারই অন্যতম অভিব্যক্তি হচ্ছে লেনিনকে গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন। শচীন্দ্রনাথ সেই নতুন সমাজতন্ত্রী পথের অন্যতম প্রথম মশালবাহী।

(চট্টোপাধ্যায়, গৌতম। ২০১৬ : ৪৭)

এটা সত্য যে শচীন্দ্রনাথ লেনিনের প্রতি যথেষ্ট শ্রদ্ধাশীল ছিলেন এবং কমিউনিজমের সাধারণ পুস্তিকাগুলিও সাম্রাজ্যবাদীদের কাছে মেশিনগানের থেকেও অনেক বেশি ভয়ঙ্কর ও আপত্তিজনক— তা তিনি উপলব্ধি করেছিলেন। কিন্তু কমিউনিজমের দার্শনিক তাৎপর্য ও ভিত্তিকে তিনি গ্রহণ করেননি। তিনি ছিলেন আধ্যাত্মবাদী ও গভীরভাবে ধর্মবিশ্বাসী, তাই বস্তুবাদ তাঁর কাছে ছিল পরিত্যাজ্য। কমিউনিজম যেহেতু ধর্মকে শোষণ ও পীড়নের সঙ্গে যুক্ত করে আলোচনা করে, সেই কারণেও শচীন্দ্রনাথের পক্ষে একে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। তাছাড়া তাঁর মনে হয়েছিল কমিউনিজমের ইতিহাস সংক্রান্ত অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ পুরোপুরি ঠিক নয়। তিনি লিখেছেন: “…কেবলমাত্র অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ইতিহাসকে বোঝার চেষ্টা করাও যুক্তিসঙ্গত নয়।” (সান্যাল, শচীন্দ্রনাথ। ২০১৭ : ২৪১)। এসব সীমাবদ্ধতা লক্ষ করা সত্ত্বেও তিনি ঘোষণা করেন যে: “হিন্দুস্থান রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন অথবা হিন্দুস্থান প্রজাতান্ত্রিক সংঘের নিয়মাবলী ও কর্মসূচী বিশেষ মনোযোগ সহকারে পড়লেই যে কেউ দেখতে পাবেন যে উত্তর ভারতের বিপ্লব আন্দোলন প্রজাতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল।” (পূর্বোক্ত: ২৪৮)।

যদি সংগঠনটি সমাজতান্ত্রিক নীতিকেই অনুসরণযোগ্য বলে মনে করত, তাহলে সংগঠনের নামের সঙ্গে সমাজতন্ত্র শব্দটিকে যুক্ত করা হল না কেন? শচীন্দ্রনাথ এর জবাব দিতে গিয়ে বলেছেন:

…কমিউনিস্ট দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কর্মসূচিটি তৈরি করা হলেও সংস্থার নামের সঙ্গে কমিউনিজম বা সোশালিজম শব্দ জোড়া হয়নি। এর থেকে যদি কেউ মনে করেন যে, আমরা সোশালিজম সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলাম না কিংবা সোশালিজমের নীতি গ্রহণ করতে পারিনি, তো তিনি ভুল করবেন। আমরা ভেবেছিলাম যেসব ধনী তখন আমাদের সাহায্য করছিলেন তাঁরা সোশালিজম নামে আমাদের প্রতি বিমুখ না হয়ে যান, কেবলমাত্র এই চিন্তা থেকেই আমরা আমাদের নামের সঙ্গে সোশালিজম কথাটা জুড়িনি।

(পূর্বোক্ত: ২৫০)

এখানে শচীন্দ্রনাথ কৌশলগত কারণের উপরেই জোর দিয়েছেন। তাঁর নিজের হয়তো সোশালিজম শব্দটির সংযোজনে কোনও আপত্তি ছিল না। কারণ তিনিও এই শব্দটি যুক্ত করার কথা ভেবেছিলেন। কিন্তু জয়চন্দ্র বিদ্যালঙ্কার-এর আপত্তিতে তা করা যায়নি। (পূর্বোক্ত)। পরবর্তীকালে মূলত ভগৎ সিং-এর উদ্যোগে/প্রচেষ্টায় এইচআরএ-র সঙ্গে সমাজতন্ত্র শব্দটি যুক্ত করা হয় ১৯২৮-এ। পুনর্গঠিত এই সংগঠনের নাম হয় হিন্দুস্থান সোশালিস্ট রিপাবলিক অ্যাসোসিয়েশন বা এইচএসআরএ।  যথাসময়ে এই বিষয়ে আলোচনা করা হবে। এটা ঘটনা যে সমাজতন্ত্রের প্রতি শচীন্দ্রনাথের আগ্রহ যথেষ্ট ছিল। কিন্তু বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র-র মূল ধারণাটি কী— সে বিষয়ে শচীন্দ্রনাথের ভাবনাটি সম্পর্কে সংশয় থেকেই যায়। তিনি মনে করতেন বড় বড় কারখানা, শিল্প-বাণিজ্য ইত্যাদির ওপর রাষ্ট্রীয় মালিকানা স্থাপন করাই সমাজতন্ত্র। (পূর্বোক্ত)। অর্থাৎ ব্যক্তিমালিকানার পরিবর্তে রাষ্ট্রীয় মালিকানা প্রতিষ্ঠা করলেই সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা যাবে। বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রবাদের মূল নীতিটি কিন্তু অন্যরকম: ‘প্রত্যেকে তার সাধ্যমতো শ্রম করবে এবং প্রয়োজন অনুসারে পাবে।’

আরও একটি সমস্যার কথা এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দুই দশকে সশস্ত্র বিপ্লবীদের মধ্যে প্রাচীন ভারতের ‘হিন্দু সভ্যতা’ সীমাহীন গৌরব ছিল। এই চিন্তা তাঁদের মধ্যে সঙ্কীর্ণতা ও মুসলিমদের সম্পর্কে অনুদারতার জন্ম দিয়েছিল। এটা সেই মহান বিপ্লবীদের একটা অস্বস্তিকর দিক। শচীন্দ্রনাথও এর থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারেননি। তিনি চেয়েছিলেন এইচআরএ ‘অতীতকালের গৌরবময় যুগের ভারতীয় ঋষিবৃন্দ এবং আধুনিককালের বলশেভিক রাশিয়ার পদাঙ্ক অনুসরণ করবে।’ (পূর্বোক্ত: ২৫১)। ১৯২৩/২৪-এ এইচআরএ-র ইস্তাহার রচনার সময় শচীন্দ্রনাথের মধ্যে একদিকে যেমন ছিল কমিউনিজম ও রুশ বিপ্লবের প্রতি আগ্রহ ও সমর্থন, তেমনি একইসঙ্গে প্রাচীন ভারতের প্রতি অসীম অনুরাগ। ফলে এইচআরএ-র ইস্তাহার ও গঠনতন্ত্র রচনার মধ্যে এই দুই ঝোঁকেরই প্রতিফলন দেখা গেছে। সত্যেন্দ্রনারায়ণ মজুমদার তাঁর In Search of A Revolutionary Ideology and A Revolutionary Programme গ্রন্থে শচীন্দ্রনাথের এই দুটি দলিলের দুর্বলতা বা নেতিবাচক দিকগুলি উল্লেখ করেছেন: “(ক) কমিউনিজমের প্রতি পক্ষপাত তখন পর্যন্ত সাম্যবাদী তত্ত্ব-অনুশীলনের দৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়নি। (খ) জাতীয় মুক্তিসংগ্রামে শ্রমিক-কৃষক শ্রেণীর ভূমিকা কী হবে তা তখন পর্যন্ত সুস্পষ্টভাবে অনুভূত হয়নি। (গ) ম্যানিফেস্টো রচয়িতার মনে রহস্যময়তা বা মিস্টিসিজমের প্রভাব তখনও সম্পূর্ণ কাটেনি। (ঘ) সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসের ব্যবহার করে শ্রমিক-কৃষকদের যে সংগঠিত করা যায় না, সে সম্পর্কে দূরদৃষ্টির অভাব। (ঙ) ইস্তাহারে ভুলভাবে ব্যাখ্যাত হয়েছে, ‘আমাদের সমাজের প্রতিটি স্তরে চূড়ান্ত অসহায়তা বিরাজ করছে এবং তা দূর করবার একমাত্র পন্থা সন্ত্রাসবাদ’, ইত্যাদি। অথচ সে সময় ভারতের শ্রমজীবী জনগণ দৃপ্ত পদে সংগ্রামের পথে এগিয়ে চলেছেন।” (উদ্ধৃত ভার্মা, শিব। ২০০৬ : ৩৩)।

১৯২৩ খ্রিস্টাব্দেই শচীন্দ্রনাথ এইচআরএ বা হিন্দুস্থান রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন (আর্মি)-র সূত্রপাত করেন। যার লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও গঠনতন্ত্র সুনির্দিষ্ট দলিল আকারে প্রকাশ করেন তিনি। এই দলিলগুলির বিচার বিশ্লেষণের মধ্যে দিয়ে বোঝা যায় যে তিনি ছিলেন ভারতের সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনের উত্তরকালীন পর্বের একজন সার্থক প্রতিনিধি। তিনি সাবেকি ধরনের বিপ্লবী সংগ্রাম (বিংশ শতাব্দীর প্রথম দুই দশক)-কে বেশ কিছু পরিমাণে অতিক্রম করলেন আর তার সঙ্গে গ্রহণ করলেন সমসাময়িককালের এগিয়ে থাকা ভাবনাচিন্তাকে। তাঁর লক্ষ্য ছিল পুরানোর সঙ্গে নতুনের সামঞ্জস্য বিধান করা। তাঁর এই পিছুটান তাঁর চিন্তার অগ্রগতিকে বাধা দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু নতুনকে গ্রহণ করায় তিনি বিপ্লবী আন্দোলনকে বেশ কয়েক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর ভূমিকার ঐতিহাসিক তাৎপর্য এখানেই যে, তাঁর তৈরি করা ভিতের ওপর দাঁড়িয়েই ভগৎ সিং, ভগবতীচরণ ভোরা প্রমুখ বিপ্লবীরা তাঁদের অগ্রসর চিন্তা ও সংগঠন গড়ে তুলতে পেরেছিলেন।


  1. সান্যাল, শচীন্দ্রনাথ। ২০১৭; বন্দ্যোপাধ্যায়, বিজয়। ২০১৮। সৈন্যসংখা মোট ১২০০০ (৯০০০ দেশি, ৩০০০ ইংরেজ)।
  2. ১৯১৮তে তিলক ও গান্ধি গ্রামে গ্রামে ব্রিটিশদের জন্য টাকা ও লোক সংগ্রহ করেছিলেন। (সরকার, সুমিত। ২০১৩ : ১২৭)
  3. দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের উদ্যোগে ১৯২১-এ গান্ধির সঙ্গে বিপ্লবীদের আলোচনা হয়। গান্ধিকে বিপ্লবীরা কথা দিয়েছিলেন যে গান্ধির কর্মসূচিতে তাঁরা বাধা সৃষ্টি করবেন না, এবং আন্দোলনে যোগ দিয়ে কংগ্রেসের কর্মসূচিকে সবল করে তুলতে চেষ্টা করবেন। তাঁরা তাঁদের কথা রেখেছিলেন। (সান্যাল, শচীন্দ্রনাথ। ২০১৭ : ২২০)।
  4. ৪ ফেব্রুয়ারি ১৯২২-এ উত্তরপ্রদেশের গোরক্ষপুর জেলার চৌরিচৌরাতে পুলিশের অত্যাচার ও গুলিচালনার প্রতিবাদে সংগ্রামী জনতা থানা পুড়িয়ে দেয়। মারা যায় ২২ জন পুলিশ। (বন্দ্যোপাধ্যায়, শেখর। ২০০৭ : ৩৬১)।
About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3172 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...