শতবর্ষে বিশ্বভারতী: পঞ্চম বর্ষ, দশম যাত্রা

স্টেশনমাস্টারের কলম

 

তিনটে বাজতে হঠাৎ এক সময়ে গুরুদেবকে সবাই মিলে নীচে নিয়ে গেল। দোতলার পাথরের ঘরের পশ্চিম দিকের বারান্দা হতে দেখলাম— জনসমুদ্রের উপর দিয়ে যেন একখানি ফুলের নৌকা নিমেষে দৃষ্টির বাইরে ভেসে চলে গেল।

দৃষ্টির বাইরে চলে যাওয়া আশি পেরিয়েছে। স্বয়ং ফুলের নৌকার মাঝির আয়ুষ্কালের মতোই। আর মাঝির খোদ গাঙুর, কপোতাক্ষ বহু জল পেরিয়ে আজ সে নিজেই একশোয়। নদী কতটা বেড়েছে? কতটা ছাত্রসংখ্যা, প্রাচুর্যে বড়, গর্বে ফুলে ফেঁপে ভয়ঙ্কর? নাকি শীর্ণ, জল যেটুকু ছিল, অন্তর্হিত? ভেতরে হাড়গোড়, পাঁজর একাকার? বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠার একশো বছরের রাস্তায় সেসব চিন্তাভাবনা স্বাভাবিকভাবেই চলে আসে। ইতিহাসচর্চার যেদিকগুলি ধরা হয়নি, সেসবের পাশাপাশি ভাবতে ইচ্ছে হয় বদলের স্বরূপগুলোও। ঠিক দোষবিচার নয়, দোষের উৎসকে খোঁজা, কারণ রোগের লক্ষণ তো ওখানেই।

স্মৃতিকথায় সৈয়দ মুজতবা আলী লিখছেন, “Through ages India has sent her voice— অন্ধকার ঘরে রবীন্দ্রনাথের মূর্তির আলোকোদ্ভাসিত প্রতিচ্ছবি। কণ্ঠস্বর রবীন্দ্রনাথের— না তপোবনের ঋষির— শৃন্বন্তু বিশ্বে— ভারতবর্ষের সেই চিরন্তন বাণী।” তেমনই এক চিরন্তন বাণীর স্মারকরূপে বিশ্বভারতীকে দেখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ, যেখানে শিক্ষার উৎপাদন মুখ্য, দান গৌণ। সেই উৎপাদনের ভেতর এক আনন্দ, এক উৎসবযাপন। বোম্বাই থেকে আসা পেস্তোনজি বা খোদ ফ্রান্সের পল রিশারের ফরাসি, নরসিংহভাই প্যাটেলের জার্মান, ভীমরাও বা নকুলেশ্বর মিশ্রের সঙ্গীত, মাস্টারমশাই নন্দলাল বা সুরেন করের তুলি, অথবা শাস্ত্রীমশাই বা ক্ষিতিমোহনের কণ্ঠ— একের ক্লাসে চলে আসছেন অন্যজন— ছাত্র, অধ্যাপক মিলিয়ে এক ম্যাক্রোকজম উইদিন এ মাইক্রোকজম। বর্তমান সামাজিক নেটওয়ার্কে সেই স্পিরিট ধরে যে রাখা অসম্ভব, সেকথা বাহ্য, তবু কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় পরিণত হয়ে আজ অবধি যে দীর্ঘ পথ বিশ্বভারতীর, সেখানে এই আনন্দের, এই উৎসবের বিবর্তন কেমন? ছাত্ররা মন থেকে গাছ লাগান, তাদের গাছের তলায় বসে জিরোতে শেখান মাস্টাররা? এই বোধগুলোর তো বিবর্তন হয় না, যদি না মন থেকে সেই বদল চান কেউ? ওই যে তিনি বলেছিলেন, “বিশ্বাসে আনন্দ— এটা সহজেই হতে পারে, কিন্তু এই ইচ্ছেটাই যে হয় না সবসময়…”

রানী চন্দকে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, “তোকে উপলক্ষ করে বিশ্বের নারীদের লিখেছি। রোগী তোদের কাছে দেবতার মতো। যে নারী কর্তব্যকে নিজের মধ্যে নেয়— তাঁর উপরেই পড়ে বিশ্বের সেবার ভার— পালনের ভার। সেখানে নারীরা universal। বিশ্বের পালনী শক্তি তোদের মধ্যেই যে আছে।” বিশ্বভারতীতে এই পালনী শক্তির যথোপযুক্ত পরিচর্যা বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের সক্রিয়তা ছিল চোখে পড়ার মতো। কালের যাত্রার ধ্বনি এবং সেইসম্পর্কিত আর চার-পাঁচটা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে পার্থক্যটুকু ক্রমশ ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে যাওয়ার মাইলের পর মাইল জুড়ে সেই মেয়েদের গল্পগুলো আস্তে আস্তে ছোট হতে থাকে, বলা ভালো, বলা হয়ে ওঠে না আর। বিশ্বভারতীর অসুখ ও চিকিৎসাহীনতার অন্যতম একটা লক্ষ্মণের ভেতর এও এক, বিশ্বভারতী তার নিজস্ব কথাগুলো বলা বন্ধ করে দিচ্ছে। মেয়েরাও…

এই প্রতিষ্ঠানের শতবর্ষকে মনে রেখে চার নম্বর প্ল্যাটফর্মের এবারের প্রচ্ছদভাবনা— শতবর্ষে বিশ্বভারতী। বিশ্বভারতীর মূলত ইতিহাসভিত্তিক তিনটি দিক তুলে ধরেছেন অধ্যাপক মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, অধ্যাপিকা শ্রীলা বসু এবং অধ্যাপক অচিরাংশু আচার্য। আলোচনায় এসেছে নারীকণ্ঠের বিকাশ, বিদ্যাসমবায় এবং প্রকৃতিবাদ। কালের বিবর্তনে বিশ্বভারতীর ঠিক অসুখটা কোথায়? জাতীয়তাবাদ, মেকি আবেগ, অহং— যেদিকেই পাল্লা ভারী হোক না কেন, তার সবকটাই রবীন্দ্রচর্চার, রবীন্দ্রচেতনার পরিপন্থী। এই বিষয়ে দুটি ভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেছেন অধ্যাপক কুন্তল রুদ্র এবং অধ্যাপক রামানুজ মুখোপাধ্যায়। এসবের বাইরে ব্যক্তিগত রবীন্দ্রনাথ, বিশ্বভারতী এবং বিবর্তনচর্চার অন্য এক দিক নিয়ে ব্যক্তিগত গদ্যে অনির্বাণ ভট্টাচার্য

পরিশেষে যে শেষ কথা না বললেই নয়। সমালোচনা বা কঠোর কারণ অনুসন্ধান আসলে যে সেই সময়কে, সেই স্পিরিটকে ভালোবাসা, ফিরিয়ে আনা বা ধরে রাখার চেষ্টা তা বোধ করি বলে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। বিশ্বভারতী কণ্ঠস্বর পাক, মুক্ত আকাশ পাক, ভোরের আলো পাক। ভয় কাটুক, এটুকুই প্রত্যাশা।

বাঁচলুম, ভোরের আলো দেখলেই যেন প্রাণে আশ্বাস পাই। রাত্রির অন্ধকার আমার ভালো লাগে না মোটেই। কেমন যেন সব কিছুই অন্ধকারে তলিয়ে যায়। তাইতো আশায় থাকি কখন ভোর হবে। অন্ধকার কেটে গিয়ে একটা পরিষ্কার রূপ চোখে পড়ে, ভয় কেটে যায়।

সম্পাদকীয় আলাপের এই পরিসরে সম্পূর্ণ ভিন্ন কিন্তু একটু গুরুত্বপূর্ণ বিজ্ঞপ্তি ঘোষণা করে দেওয়া যাক। পাঠকের ভালোবাসায় পাঁচ পেরিয়ে ছ বছর পূর্ণ করতে চলেছে চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম। ওয়েব জীবনের এই পথটুকু পেরিয়ে এসে পত্রিকাটির কিছু কারিগরি সম্মার্জনা জরুরি হয়ে পড়েছে। এতদিন ধরে জমে ওঠা বিপুল ডেটার ভারে জর্জরিত সাইটটিকে আরেকটু নির্মেদ, দ্রুততর ও পাঠক-বান্ধব করে তোলার প্রয়োজন অনুভূত হচ্ছে। তাই সম্পাদকমণ্ডলীর সিদ্ধান্ত, বিশ্বভারতীর শতবর্ষকে মূল ভাবনা করে তৈরি এই সংখ্যা—যে সংখ্যাটিও, পাঠক বুঝবেন, কলেবরে যথেষ্টই লঘু আমাদের অন্যান্য মাসিক সংখ্যার তুলনায়— প্রকাশের অব্যবহিত পরেই চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম একটি সংক্ষিপ্ত শুশ্রূষা-বিরতি নেবে, যা তার ‘ওভারহাউল’-এর জন্য অনিবার্য। অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে বিরতির সময়ে চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম আন্তর্জালে দৃশ্যমান থাকবে না বা পূর্ব-প্রকাশিত লেখাগুলি ফিরে পড়া যাবে না। বিরতির সময়টুকুকে শুধুমাত্র নতুন কোনও লেখাযোগ করা হবে না, বাকি সমস্ত সুবিধা-পরিষেবা অপরিবর্তিত থাকবে। মাস দুই পর, আশা করছি, চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম-কে নবকলেবরে আপনাদের সামনে পুনরায় হাজির করতে পারব। আর এই বিরতির সময়টুকুতে সমাজ মাধ্যমের পাতায় চোখ রাখলেই পাঠক জেনে যাবেন নতুন কোনও বিজ্ঞপ্তি, খবরাখবর, পড়তে পারবেন পুরনো অথচ প্রাসঙ্গিক লেখাপত্র। প্রিয় পাঠক, আপনাকে আরও উন্নততর পাঠ-অভিজ্ঞতার শরিক করতে চাই বলেই চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম এই স্বল্প বিরতিটুকু চেয়ে নিচ্ছে। আমাদের সঙ্গে থাকুন।

নমস্কার।

সম্পাদকমণ্ডলীর পক্ষে,
অনির্বাণ ভট্টাচার্য

 

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3960 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...