অর্ধনারীশ্বর

প্রতিভা সরকার

 

হাউজিং-এ তাদের আস্তানার সামনে ডালপালা ছড়ানো বড় নিমগাছটার নিচে দাঁড়িয়ে রিমা ফটাফট পুড়ে যাচ্ছিল। তবে দোতলার বারান্দা থেকে দাউদাউ আগুন দেখতে পায়নি সুমিত, শুধু কেমন যেন ধিকিধিকি করে জ্বলে যাওয়া। পুড়তে থাকা রিমাকে দেখে ওই অবস্থাতেই তার ছোটদের রামায়ণে সীতার অগ্নিপ্রবেশের ছবিগুলোর কথা মনে পড়ে। ছবিতে জনকনন্দিনীর হাত জোড় করা, মুখে বড় প্রশান্তি। যেন আগুন থেকে অব্যাহতি মিলবে সে-কথা জানাই আছে। কাপড়চোপড় সব জায়গামতোই রয়েছে, খোলা চুল বাঁকেনি একটুও, শুধু শরীরের আউটলাইন ঘিরে কাঁচা হাতে হলুদ রঙের প্রজ্জ্বলিত শিখা আঁকা। পুড়ে গেলে যে মর্মান্তিক যন্ত্রণা হয়, পাঁজর ফাটিয়ে যে চিৎকার বেরিয়ে আসে তার বিন্দুমাত্র চিহ্ন নেই সস্তার ছাপা ছবিটায়। সেরকমটা দেখা যায় নরকে তেলে ভাজা হওয়ার ছবিগুলোতে। অসহ্য কষ্টে চিৎকার করতে থাকা বাঁকাচোরা অবয়বগুলোর সঙ্গে যেন সুমিতের এখনকার মুখেরই বেশি মিল।

সীতামাইয়ার সঙ্গে রিমার সবচেয়ে বড় অমিল, তার মুখচ্ছবি অত প্রশান্ত ক্ষমাসুন্দর নয় মোটেই। আবার তীব্র যন্ত্রণায় তার মুখ বেঁকে গেছে এরকমও নয়। রিমি কেমন যেন ভাবলেশহীনভাবে পুড়ছিল, মনে হল সুমিতের। প্রবল তাপের মধ্যে সে ভাজা ভাজা হচ্ছিল নিশ্চয়ই, কেরোসিন তেলের নাছোড় মলিকিউলগুলো তাকে শক্ত আলিঙ্গনে বেঁধে ফেলছিল। কিন্তু মুখ দিয়ে টুঁ শব্দ বার করেনি, কিছু সে দেখছিলও না, স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল চোখগুলো তার একেবারে ফাঁকা।

অথচ মণি-টনি গলে যায়নি তখনও, কারণ সুমিতের চিৎকার শুনে সে একবার ওপরে তাকিয়েছিল, সুমিত তখনই ভালোমতো দেখে নিয়েছে বড় বড় চোখগুলো সেইরকমই আছে, কিন্তু সেখানে কোনও দৃষ্টি নেই। যেন সুমিত তার কেউ নয়। উলঙ্গ রিমাকে দেখে হাউজিং-এর ভেতর বাচ্চা দেওয়া হাভাতে বেড়াল আর নেড়িকুত্তাগুলোর চিৎকার এবং দোতলার রেলিং মুঠোয় চেপে সুমিতের আর্তনাদ যেন একই বস্তু।

তারপর রিমা বড় রাস্তার ধারে মেইন গেটের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়েই রইল, যেন তার কাছে কারও আসবার কথা আছে। সেই মানুষটি এইরকম কাণ্ডের কথা জানতে পারলেই পড়িমরি করে ছুটে আসবে, রিমাকে পুড়তে দেবে না, আগুপিছু না ভেবেই বালতি অথবা হোস পাইপ থেকে ঠান্ডা জল ছিটিয়ে দেবে জায়গায় জায়গায় চামড়া উঠতে শুরু করা খোলা শরীরটার ওপর। সুমিতের হঠাৎ মনে হল, সেই মানুষটি কি তারই ভাই প্রমিত, যে দাদার বিয়ের পর পনেরো বছর এই সংসারে কাটিয়ে পিএসসির পরীক্ষা পাস করে বছর পাঁচেক হল কলকাতায় পোস্টেড?

এইরকম মনে হওয়ার একশো কারণ থাকলেও এই মুহূর্তে সুমিত কেবল ভাবতে পারল, গতকালই হোয়াটস্যাপে প্রমিতের মেসেজ এসেছে, সে তার কলিগকে রেজিস্ট্রি করে বিয়ে করেছে, কারণ তারা আড়ম্বরপূর্ণ সামাজিক বিবাহে বিশ্বাস রাখে না। প্রমিত এইরকমই, একবার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললে কোনও কাজ সে ফেলে রাখে না।

যাই হোক, কারও জন্য অপেক্ষা করতে করতে রিমা পুড়ে যাচ্ছিল চড়বড় করে। মানে লকলকে আগুন দৃশ্যমান না হলেও, তার শরীর ঘিরে একটা পোড়ার আওয়াজ, বিশেষ করে উদ্ভট একটা গন্ধ উঠে আসছিল যেন নিমগাছের তলা থেকে দোতলার বারান্দা অব্দি। ঝুঁকে পড়ে সুমিত দেখছিল রিমার গায়ে কাপড়চোপড় কেন, একটা সুতোও নেই। যেমন সে ছোটবেলায় দেখেছে, মা এমব্রয়ডারিতে শেডের সুতো ব্যবহার করলে এক-একখানে একেকরকম রং গাঢ় হয়ে ভেসে উঠত, তেমনি রিমার হাঁটু বেয়ে ওঠা শিখাগুলো ঈষৎ নীলচে ছিল, আবার তলপেটে পৌঁছতেই সেগুলো হয়ে গেল ধোঁয়া ওঠা লাল, রাগী চোখের মতো। সবচেয়ে অন্যরকম ছিল ওর দুই স্তনের নিচের আগুনের টুকরোটা। সেটা পেটের সঙ্গে সমান্তরাল হয়ে বুকের নিচের খাঁজে ধিকিধিকি জ্বলছিল, সবুজ রং, যেন যত গাঢ় দুঃখ হতাশা রিমা এই পঁয়তাল্লিশ বছর অব্দি বুকের মধ্যে পুষে রেখেছিল, তাদের সবগুলোকে শুকিয়ে একেবারে ঘিয়ের খড়খড়ে চাঁছির মতো করে দেবে এই আগুন। কেউ হাতে নিয়ে দেখতে চাইলে কালো গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে যাবে।

কেন, কেন, কেন— সুমিত চেঁচিয়েই যাচ্ছিল। আর কোনও কথা তার মুখে আসছিল না। কেন-র উত্তর দেওয়ার মতো অবস্থায় রিমা ছিল না, তারপর সুমিতও গলা শুকিয়ে চুপ করে গেল, কিন্তু তার নজর সরল না একচুল। ছুটে যে সিঁড়ি বেয়ে নামবে, পায়ের সঙ্গে লোহার চেনে বাঁধা একটা অদৃশ্য বিরাট পাথর সেটা অসম্ভব করে তুলেছিল। হঠাৎ হাউজিং-এর লাগোয়া বস্তির ফুটবল মাঠফেরত ছেলেগুলো ছুটে এল, কোত্থেকে এক বালতি জলও জোগাড় হয়ে গেল। “এইটা কী করলেন বৌদি”— বলে চিৎকার করে তাদের মধ্যে কেউ একজন দূর থেকে রিমার গায়ে সেটা ছুঁড়ে দিতে জলবিন্দুগুলো ঠিক পাখা মেলা স্ফটিকের পাখি হয়ে দূর থেকে উড়ে এল। উড়ে এসে তাকে প্রবল ঝটকায় ছুঁতেই রিমা কাটা কলাগাছের মতো হাঁটু ভেঙে মাটিতে অবশ পড়ে গেল।

সুমিতের মনে হল লাল টিশার্ট পরা ছেলেটার হাতের জলে জ্বালা জুড়োতে চায় না বলেই রিমা অভিমানে অমন আছাড় খেয়ে পড়ল। তার দগ্ধ না হওয়া ফাঁপা কালো চুল চারদিকে ছড়িয়ে গেল। দুই মাটির কলসির মতো শ্রোণি অল্প অল্প কাঁপছিল যেন, উপুড় হয়ে পড়া শরীরের সঙ্গে সমান্তরাল উঠে যাচ্ছিল অল্প সাদা ধোঁয়া আর সেই কটু গন্ধটা।

এইবার পায়ের শেকলটা লাথি মেরে সরিয়ে দিয়ে সুমিত দৌড়ল, দুম করে তার দুপাশে আছাড় খেল কাঠের দরজা, সিঁড়িতে তার খালি পায়ের শব্দ ধুলো উড়িয়ে উড়িয়ে নিচে নামতে লাগল। কেন, কেন, কেন— চিৎকারটা তখন আবার ফিরে এসে তার কণ্ঠনালী চিরে আকাশ ফাটিয়ে দিচ্ছিল।

 

২.

মর্গ, পুলিশ, প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন, এত সব সামলে উঠতে সুমিতের প্রচুর সময় গেল। সে কেমন একটা ঘোরের মধ্যে কাটিয়েছে এতদিন। এখনও কারও চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারে না। সমবেদনা, করুণা আর কৌতূহলে ভরা সেইসব চাহনি জাগন্ত তাকে ফালাফালা করে কাটে, আবার ঘুমের মধ্যেও দুঃস্বপ্ন হয়ে তাড়া করে। যেন পৃথিবীতে আর কারও বৌ কোনওদিন সুইসাইড করেনি, অন্য সম্পর্কে জড়ায়নি, সতীসাবিত্রী সব, অবৈধ টান কাকে বলে জানেই না। লজ্জায়, হিংসেয়, রাগে, অপমানে, আরও কিসে কিসে কে জানে, সুমিত রোগা হয়ে যাচ্ছিল, রাতে খাওয়ার আগে তাকে কড়া ঘুমের ওষুধ খেতে হচ্ছিল।

অথচ সুমিত চিরকালের শান্ত ভদ্র। চড় খেলে উলটো চড় মারতে পারে না। নিজের ভেতর ঢুকে থাকাই তার স্বভাব। স্কুলের বন্ধুরা তার নরম স্বভাব আর হাবভাবের জন্য তাকে ছক্কা বলে ডাকলেও সে সাড়া দিত, আর হাসির হুল্লোড়ে টের পেত এবারও ভুল করে ফেলেছে। টিফিনটাইমে আচার খেয়ে ওরা আঙুল ডলে ডলে মুছত তার বুকে। সুমিত শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকত।

সে শামুকস্বভাবের হলে, প্রমিত কিন্তু বাঘ। কাছে থাকলে কিছু না ভেবেই ছেলেগুলোর ওপর দাদার অপমানের প্রতিশোধ নিতে ঝাঁপিয়ে পড়ত। আঁচড়ে কামড়ে বিধ্বস্ত ভাইকে সরিয়ে নিয়ে আসতে আসতে সুমিতের চোখের নোনতা জল জিভে এসে ঠেকত। কিন্তু তার মতো মানুষেরা খুব সহজেই ভুলে যেতে পারে, ক্ষমা করতে পারে, বস চূড়ান্ত অপমান করার পরেও রবীন্দ্রসঙ্গীত ভাঁজতে ভাঁজতে সেসব উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে।

প্রমিত কিছু ভোলে না, সমস্ত ব্যাপারের হেস্তনেস্ত তার তখন-তখনই করে ফেলা চাই। মার খেয়েও রাগ ভুলত না, লাল চোখে দাদাকে বলত,

–তুই অমন মেয়েদের মতো করে হাঁটিস কেন রে? ওরা তোকে নিয়ে ঠাট্টা করে, বুঝিস না? এই দ্যাখ, এভাবে হাঁটবি এখন থেকে।

দাদাকে ঠিকঠাক চলন শেখাবার জন্য প্রমিত বাড়ির বারান্দায় লেফট রাইট বলতে বলতে প্রায় কুচকাওয়াজের ভঙ্গিতে হেঁটে যেত।

কিন্তু আজ রিমার মৃত্যুর প্রায় একমাস পরেও তার কথা ভাবলেই আজন্ম শান্ত সুমিতের চোখ রাগে ঠেলে বেরিয়ে আসছিল। কখন যে টয়লেটে ঢুকে এক জ্যারিকেন কেরোসিন গায়ে ঢালল, সুমিত টেরই পেল না! আবার পুড়তে পুড়তে হেঁটে গিয়ে বাইরে গাছতলায় দাঁড়াবার কী দরকার ছিল! নিজের উলঙ্গ শরীরটা সবাইকে দেখিয়ে ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে দগ্ধ রিমার সেই বেভুল চলন এখনও সুমিত চোখ বুজলেই দেখতে পায়। অদ্ভুত যে, তখনই পাশাপাশি তার মগজে ভেসে ওঠে রিমার গোল নথ পরা বধূবেশের ছবি। কী টলটলে দুই চোখ! যেন সন্ধেবেলার মিঠে হাওয়া ওঠবার ঠিক আগের মুহূর্তে দীঘির জলের বিস্তার! তফাতের মধ্যে চোখজোড়ার টলটলানিতে ঈষৎ লালচে রং মাখা! হতে পারে নতুন আবেশের রং ওইরকমই। কিন্তু সুমিতের কপালে সে রং বিয়ের পর একমাসও টেঁকেনি।

ওই চোখগুলোকে মাথা থেকে হটাবার জন্য তার একমাত্র বন্ধু দীপেশকে নিয়ে সুমিত গত রাতে মদ্যপান করল। তার হাবভাব দেখে সিগ্রেটের ধোঁয়া মুখের ওপর ছড়িয়ে দীপেশ হাসিমুখে বলল— শালা তোর জন্য এক কৌটো ব্রিজার কিনলে পারতাম। ফলের রস দেওয়া, চুকচুক করে টানতিস।

মাল টানার জন্যই কিনা কে জানে, ভোর ভোর সুমিত টের পেল তার ব্লাডার ফুলে ঢোল হয়ে আছে। পর্দার ফাঁকে একটা নরম আলোর আভাস, খুব ভোরে আনাজপাতি ভর্তি ঠেলা নিয়ে যে মানুষগুলো বেরিয়ে পড়ে, রাস্তা থেকে তাদের কথাবার্তা এই দোতলার ফ্ল্যাটেও উঠে আসছে। সুমিত ঘুমচোখেই হাঁটু ভাঁজ করে ঘষটে খাটের কিনারার দিকে যাচ্ছিল। হঠাত নরম তুলতুলে কিছুতে তার পা ঠেকে গেল। চমকে উঠে সে দেখল তার পাশের বালিশে মাথা রেখে লম্বা টান টান হয়ে রিমা ঘুমুচ্ছে!

রিমা মানে ঠিক রিমাই কিনা পাতলা হয়ে আসা অন্ধকারে তা বোঝা যাচ্ছে না। কিন্তু প্রমিত চাকরি পেয়ে কলকাতায় চলে গেলে এবং বাড়িতে তার যাওয়াআসা ক্রমশ কমতে থাকলে, খালি বাড়িতে ভূতের ভয় পেয়ে বা ঘন ঘন বজ্রপাতের শব্দে জেগে উঠে রিমা এ ঘরে শুতে এসে যেমন করত, ঠিক সেইরকম তার দিকে পাশ ফিরে হাতের ওপর হাত, পায়ের ওপর পা রেখে টান টান হয়ে কেউ বিছানায় শুয়ে আছে। রিমার মতোই ধবধবে গাত্রবর্ণের কেউ, কারণ অন্ধকারেও মনে হচ্ছে এক টুকরো লম্বা সাদাটে আলো যেন বালিশে মাথা রেখে নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে।

সুমিত আতঙ্কে পাথর হয়ে গেল। নিশ্চিন্তে ঘুমোনো রিমাকে না জাগিয়ে সে কী করে নামবে খাট থেকে! কেন সেদিন তাকে বাঁচাবার জন্য সুমিত ততটা তৎপর হয়নি, কেন অত দেরি করে নিচে নেমেছিল, রিমা যদি উঠে বসে পাথুরে মুখে এইসব প্রশ্ন করতে থাকে সুমিত কী উত্তর দেবে? তার পেচ্ছাপের বেগ বন্ধ হয়ে গেছে, এ ঘর থেকে কী করে পালাবে এই চিন্তায় কান মাথা থেকে গরম ভাপ বেরুচ্ছে। ইষ্টদেবতার নাম জপতে জপতে পাছা ঘষে নিশব্দে নামতে গেল সুমিত, সেই ঘষটানিতে বিছানার চাদরে টান পড়ল, আর পাশের ঘুমন্তজন তার দিকে ঘাড় তুলে তাকাল, মিহি সুরে বলল, মিঁয়াও।

পাড়াবেড়ানো সাদা মেনিটা! প্রায়ই পেটভর্তি বাচ্চা থাকত বলে রিমাই ওকে আশকারা দিয়ে মাথায় তুলেছিল। একবার বিছানায় হেগে নখে চাদর কুঁচকিয়ে নরম হাগা ঢেকে রাখার ব্যর্থ চেষ্টা করে শয়তানি সটকে পড়েছিল। মিনমিন করে সুমিত সেটা রিমাকে দেখাতে বিশাল মুখঝামটা খেয়েছিল—

–তোমার কী! তুমি পরিষ্কার করো? আমার কোনও কাজে লাগো তুমি?

বেড়ালটা ঘাড় তুলে সুমিতকে দেখল একবার, তারপর আবার শুয়ে পড়ল, শুধু তার ল্যাজের ডগাটুকু ওপর নিচ হতে লাগল, যেন ঐ অঙ্গের নিজস্ব প্রাণ আর চিন্তাভাবনা আছে। ও জানে সুমিতকে ভয় পাওয়ার কোনও অর্থ হয় না। রিমার হাবভাব থেকে এইটুকু বুঝে নেওয়ার মতো বুদ্ধি এই ধূর্ত প্রাণীটির ছিল। এখনও আছে বলেই রিমার অনুপস্থিতিতে ও নিজের জায়গা কায়েম রাখতে এসেছে।

খাট থেকে নামতে নামতে প্রচণ্ড রাগ হচ্ছিল সুমিতের। শালার বিল্লি, এঁটো কুড়িয়ে খাস, আবার শোওয়ার জন্য বালিশ বিছানা চাই! আজ এটাকে উচিত শিক্ষা দেব, এই ভেবে টয়লেট থেকে ফেরার পথে সে দরজার পেছনে দাঁড় করিয়ে রাখা লাঠিটা তুলে নিল। এমন মার মারব, হাগা তো দূরের কথা, এই ফ্ল্যাটের ত্রিসীমানায় হারামজাদিকে আর দেখা যাবে না।

কিন্তু পা টিপে টিপে ফিরে আসতে গিয়ে যতটুকু দেখা যায় সে দেখল বেড়ালটা বিছানায় নেই। তাজ্জব ব্যাপার, বেড়াল তো আর মানুষের মনের কথা পড়তে পারে না রে বাবা। আলো জ্বেলে খাটের তলে ঝুঁকে পড়ল সুমিত, ড্রেসিংটেবিলের পেছনে, টিভিটেবিলের পাশে, কিন্তু দরজা বন্ধ ঘরের ভেতর থেকে বেড়ালটা যেন একেবারে উবে গেছে!

এবার সুমিত চেয়ারের ওপর ডাঁই করে রাখা জামাকাপড় ছুড়ে ছুড়ে মাটিতে ফেলতে লাগল, লাঠি দিয়ে বুকর‍্যাকের পেছনটা ঢকঢক করল। জানালার ভারী পর্দা তুলে ধরল। কিন্তু জন্তুটা কোথাও নেই।

হঠাৎ তার নজরে পড়ল দেওয়ালে আটকানো স্টিলর‍্যাকটার দিকে। মাসতুতো বোন জয়তী এই সেদিন রিমার একটা হাসিমুখের ছবি বড় করে ফ্রেমে বাঁধিয়ে ওখানে ঠেসান দিয়ে রেখে গেছে। রাখতে রাখতে কেঁদেওছে প্রচুর। আঁচলে ঘন ঘন চোখ মুছে সুমিতদা একা কী করে থাকবে এবাড়িতে সেই আশঙ্কায় ডুকরে উঠেছে আর তার ফাঁকে ফাঁকেই জিজ্ঞাসা করে নিয়েছে সুইসাইড নোট না থাকা সত্ত্বেও পুলিশ কী করে সাততাড়াতাড়ি তার দাদাকে রেহাই দিল! টাকাপয়সা খাওয়াতে হয়েছে কিনা!

সেই থেকে রিমা মাঝদেওয়ালে ঝুলতে ঝুলতে সুমিতের দিকে তাকিয়ে হেসেই যাচ্ছে।

এবার সুমিতের নজরে পড়ল র‍্যাকে বসানো ছবির ওপর দিকটা ঠেসান দিয়ে পেছনের সবজেটে দেওয়াল ছুঁয়ে আছে,আর নিচের দিকটা খানিক সামনে এগিয়ে রাখা, ফলে একটি সমকোণ তৈরি হয়েছে, আর সেই অন্ধকার কোণের একপাশ থেকে বেরিয়ে আছে একটি ভয়ার্ত বেড়ালের মাথা। অতর্কিত আক্রমণের সম্ভাবনায় তার ছুঁচলো কানদুটো মাথার ওপর লেপটে আছে, দুটো মার্বেলের মতো চোখ ঠিকরে বেরিয়ে এসেছে, নাকের দুপাশে গভীর কুঞ্চন তার দাঁতগুলোকে ন্যাংটো করে দিয়েছে, একটা ভয়ার্ত অথচ হিংস্র বেড়াল ঝাঁপিয়ে পড়ার অপেক্ষায় টান টান হয়ে রয়েছে সুমিতের সদ্যমৃতা স্ত্রীর বাঁধানো ছবির পেছনে।

বেদম রাগে অন্ধ হয়ে না থাকলে সুমিত ভয় পেত। কোণঠাসা প্রাণী যে কত ভয়াবহ নিজের জীবন দিয়ে সুমিত তা আগেও বুঝেছে!

নিজের মাথার ওপর শন শন লাঠি ঘোরাল সুমিত। ছবিটা কাচে বাঁধানো না হলে এতক্ষণ অব্যর্থ লক্ষ্যে সেটা গিয়ে পড়ত গোল মাথাটার ওপর। নাক মুখ দিয়ে রক্ত বেরিয়ে আসত, ছুঁচলো দাঁতগুলো ছেতরে গিয়ে ঢুকে যেত ওরই মাড়ির ভেতরে, ফুটো করে দিত নাকের দুপাশের ফুলে ওঠা গোঁফের অংশটুকু।

যত ভাবছিল, ততই উত্তেজিত বোধ করছিল সুমিত। হাত নিশপিশ করছিল মোক্ষম আঘাতটি নামিয়ে আনার জন্য। ওই ওপর থেকে বেড়ালটা হাত পা ছড়িয়ে তার পায়ের কাছে ছেতরে এসে পড়লে শান্ত হবে সুমিত, যেন সদাবৈরী জগৎসংসারের ওপর এক চমৎকার প্রতিশোধ নেওয়া হবে।

উত্তেজনায় শত্রুবধের আনন্দে সুমিত বিকট আওয়াজ করল গলায়, হাউউউউউউস! বন্ধ ঘরে তিনগুণ জোরে সেটা প্রতিধ্বনিত হলে বেড়ালটা এক লাফে ছবির পেছন থেকে বিছানায় এসে পড়ল, তারপর সুমিতের লাঠি লক্ষ্যভ্রষ্ট হলে জানালার পর্দার ফাঁকে সে কেমন করে পালাল, সেইই জানে।

হাঁপাতে হাঁপাতে ফাঁকা ঘরের চারদিকেই চোরা চাহনি ছোঁড়ে সুমিত। আরও একবার গোহারা হেরে যাওয়ার লজ্জা অদৃশ্য কারও কাছ থেকে লুকোতে চায় যেন! লাঠিটা জায়গামতো রেখে লাইটের সুইচে হাত দেওয়া মাত্র সে আবার শোনে মিঁউ। এবার আরও আবছা, আরও অস্ফূট!

ছিটকে উঠে হাত সরিয়ে নেয় সুমিত। চোখ সবার আগে আছড়ে পড়ে রিমার ছবিতে। পেছন থেকে টালমাটাল চারটে পায়ে বেরিয়ে আসছে দুধরঙের একটা বেড়াল বাচ্চা। নীল চোখ তার, লাল মুখ। চোখ ফুটে যাওয়া এই দুধের বাচ্চাটাকে মুখে নিয়েই তাহলে পাইপ বেয়ে দোতলায় উঠে এসেছে ওর মা। যে শাবকটি টিঁকে আছে তার জন্য নিরাপদ নিশ্চিন্ত আশ্রয়ের খোঁজে। এইজন্যই হয়ত গত রাতে ভয়াবহ চেঁচামেচি করেছিল পাড়ার হুলোটা। বেশি মাল খেয়ে মাথা ঘুরছিল বলে ঘরের আলো নিভিয়ে ব্যালকনিতে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়েছিল সুমিত। পাঁচিলের ওপর হুলোর দর্পিত পদচারণা আর বিকট ডাক তখনই খেয়াল করেছে সে। তার অন্যমনস্কতার সুযোগেই হয়ত জানালা দিয়ে ঢুকে সোজা বিছানায় গা এলিয়ে দিয়েছিল ক্লান্ত বেড়ালটা। বাচ্চাটা নিশ্চয়ই বুক আঁকড়ে ছিল সবসময়ই, অন্ধকারে সুমিত খেয়াল করেনি।

বাচ্চাটা টলমল করতে করতে র‍্যাকের একেবারে ধারে চলে এলে সুমিত তাকে নিজের ছড়ানো পাঞ্জায় লুফে নেয়। ল্যাজে সবটা লোম গজায়নি এখনও, তবু হাতের ওপর তাই আছড়ে পড়তে থাকে। আর অনবরত মিউ মিউ ডাক।

বুকের একেবারে ভেতরে তাকে টেনে নেয় কিছুক্ষণ আগের মারমুখো সুমিত। এই মা-কে খুঁজতে থাকা দুধের ছানাটাকে নিয়ে সে এখন কী করে! আ চু চু করে ডাকবে ওর মাকে, নাকি রান্না ঘরে গিয়ে কৌটোর দুধ গুলে নিয়ে আসবে খানিকটা!

কিছু ঠিক করে উঠবার আগেই বাচ্চাটা তার বুকের মধ্যে নিবিড় হয়ে আসে। মুখে টেনে নেয় সুমিতের বুকের ওপর উঁচিয়ে থাকা অন্য পুরুষের তুলনায় একটু বেশি স্ফীত মাই। চুক চুক করে টানতে থাকে, যেন এ তার মায়েরই স্তনবৃন্ত ! তার খরখরে জিভের টানে সুমিতের জ্বলন্ত চোখ নরম হয়ে আসে। মনে হয় তার বুকের অনেক গভীরে সমুদ্রমন্থনে তোলপাড় তুলে তৈরি হচ্ছে সাদা তরল দুধ। বাচ্চাটা খেয়ে বাঁচবে।

যে নারীর সঙ্গে তার দেহমিলন কখনও হয়নি, হওয়া সম্ভব ছিল না, যে তাকে চূড়ান্ত ঝামেলায় ফেলে পুড়ে মরেছে, সেই রিমার সঙ্গে কোথায় যেন এতদিন পরে সুমিতের একটা চূড়ান্ত যোগাযোগ গড়ে ওঠে। রিমা বিশ্বাস করেনি এই কথা যে বিয়ের আগে যতভাবে পারা যায় সুমিত বাধা দিয়েছিল। কিন্তু তার মায়ের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল বিয়ে দিলেই ছেলের এই আনমনা ভাব কেটে যাবে, সে পূর্ণ পুরুষ হয়ে উঠবে।

কিন্তু সুমিত আজ যেন রিমাকে সবটা বুঝতে পারছে। আগেও তার তেমন রাগ ছিল না রিমার ওপর, এখন আর বিন্দুমাত্রও নেই। বরং প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য রিমা যে সব কাণ্ড ঘটিয়েছে, সেসব মনে পড়ায় কল্পিত বুকের দুধের মতোই তার মস্তিষ্কে অচেনা মায়ার ক্ষরণ হতে থাকে।

ছবির রিমার দিকে সরাসরি তাকিয়ে ফিসফিস করে সুমিত— শুধু বেঁচে থাকার আনন্দের জন্যই বেঁচে থাকা যায় রিমা। নাহলে আমি আছি কী করে! তুমি যে কেন সেটা বুঝলে না।

বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার সময় না থাকায় সে বাচ্চাটাকে বিছানার ওপর ছেড়ে দেয়, তারপর ওর পালিয়ে যাওয়া মায়ের আসবার পথ সুগম করতে হাট করে দরজা খুলে দেয়। সবে ভোর হয়েছে তখন, আকাশ প্রথম দেখা রিমার চোখের মতোই লালচে টলটলে। তার হাতে বুকে তখনও লেগে আছে বাচ্চাটার নরম ছোঁয়া, সে জায়গাগুলোতে হাত বোলায় সুমিত, তারপর আশ্চর্য হয়ে দেখে রিমা যার নিচে দাঁড়িয়ে অকাতরে পুড়ে গিয়েছিল, সেই ন্যাড়া নিমগাছের ডালে ডালে এক রাতের মধ্যেই অজস্র সবুজ কচি পাতার আভাস।

 

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4046 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Comment

  1. একটি ‘ভয়াবহ’ মানবিক গল্প। যথারীতি স্পর্শ করে। জয় হোক …

Leave a Reply to শিবাংশু দে Cancel reply