সঙ্ঘমিত্রা ঘোষ

পাঁচটি কবিতা

 

স্পর্শ

আসলে সবার কিছু স্পর্শ লাগে,
যে স্পর্শ আলতো ভিজে বাতাসের মতো।
কোনও খোলা মাঠের নিচে বসে তারাদের আলো গায়ে মাখার মতো।
সবার কিছু স্পর্শ লাগে যে স্পর্শের কোনও দেওয়াল থাকে না।
তুলসীগাছে প্রতিদিন জল দেওয়ার মত পবিত্র স্পর্শ,
বা কোনও পাকদণ্ডী পথে আলুথালু লুটোপুটি করা মেঘের মত স্পর্শ,
এইসব স্পর্শ যারা দিতে পারে তারাই বৃক্ষ হতে পারে।
তারাই ধীরে ধীরে ঈশ্বর হয়ে যায়,
আর আমি আমার দিনলিপিতে আতর মেখে রাখি,
ঈশ্বরের নাম লিখব বলে।

 

বসন্ত এলে

চোখের উপর গড়িয়ে পড়ছে মেঘ,
বাতাসটি বড় এলোমেলো বইছে।
আমিও কেমন আকাশ রাখছি ধরে,
ছায়াপথ তার অন্ধকার আঁকছে।

অন্য মনের যত্ন করছে খুব,
নিজের ভিতর ছোট একটা ঘরে।
ভয় লাগছে আগুন মারছি গায়ে,
অথচ দেখো অন্য মনটি দূরে।

চাওয়াটি থাকুক আগের মতোই অলীক,
দেওয়াল যেমন জড়িয়ে থাকে ঘর।
দিনের শেষে ভুলের নদীটি ঘুমোলে,
বসন্ত ঠিক দিয়ে যাবে তার স্বর।

না পারাটুকু সামলে রেখেছি খুব,
উল্টোদিকে নৌকো টানছি ধরে।
হেরে যাওয়াটুকু জিতে যাওয়া হলে পরে,
পলাশ ফোটাব সারাটা উঠোন জুড়ে।

 

শিকার

প্রতিদিন তোমাকে আমি বাঘ বানাই।
আমি হরিণ হলে,
তোমার শিকার করতে,
ভালো লাগে জানি।
প্রতিদিন তুমি বাঘ আর আমি হরিণ।
আমি প্রাণপণে ছুটি, আর পিছন ফিরে, মাঝেমাঝে দেখি, তোমার ক্ষিপ্রতা,
তুমি ঠিক বিরাট লাফ দিয়ে করে ধরে ফেলো আমায়,
তারপর আরামে চোখ বুজে আসে,
তোমার পেট ভরার পর
ঘুমিয়ে পড়লে,
আমি নদীতে যাই।
জলের উপর নিজেকে দেখি,
আমার ভিতরের বাঘটাকে, শান্ত করি ধীরে ধীরে।
তারপর শালুক ফুলের মালা গলায় দিয়ে,
গুল্ম ঝোপের গায়ে পিঠ এলিয়ে দিই।
প্রজাপতিদের এপাশে-ওপাশে ছুটোছুটি করতে দিই।
বনের মধ্যে তৈরি করে ফেলি রূপকথাদের।
আমি যেকোনও দিন বাঘ হয়ে যেতে পারি তোমারই মতো।
তবে সেদিন আর রূপকথা জন্ম নেবে না পৃথিবীতে।

 

সারাদিন দৃশ্যরা…

সারাদিন দৃশ্যরা লুটোপুটি খায় মাথার ভিতর,
সারাদিন শব্দ ভেসে আসে আকাশ থেকে আকাশ হয়ে, আমার ঘরে।
আমি আমার ওডিকোলন মাখানো সাদা রুমালের গন্ধ মিশিয়ে,
এইসব দৃশ্য আর শব্দদের নিয়ে নির্মাণ করে ফেলি আমার নিজস্ব পৃথিবী।
আর এই পৃথিবী গড়তে গড়তে একসময় বুঝতে পারি—
শব্দ আর দৃশ্যদের ভিতর আমি অন্ধ হয়েছি কবেই,
আসলে শব্দ, আর দৃশ্যের বাইরে অনন্ত দেখা থাকে মানুষের।
সেইসব দেখায় জড়াজড়ি করে থাকে অজস্র মুখ, মুখেদের যাপন,
সেইসব যাপনে শব্দ ছাড়াও বুকের ভিতর ছবি আঁকে চোখ,
আসলে মুঠোর মধ্যে ধরে ফেলা কথা আর দৃশ্যদের বাইরেও কিছু দেখা থাকে।
খিদে, ঘুম, প্রেম, করুণার নিজস্ব ভাষা থাকে,
সে ভাষা দেখতে পাওয়াকেই আমি দৃষ্টি বলি।
সেইসব দৃষ্টি দিয়ে গড়ে ওঠা যাপনকেই আমি প্রেম বলি।
শব্দ আর দৃশ্যরা, আমাকে পুরোপুরি অন্ধ করার আগে,
আমি আমার দৃষ্টির জন্য আকুল হতেই পারি।
সেই দৃষ্টি যার তরঙ্গ শব্দ আর দৃশ্যদের আলোর মতো সত্য করে দিতে পারে,
অন্ধ হওয়ার আগে চোখ থেকে আলো ঢালতেই পারি,
মানুষের যাপনের ভাঁজে ভাঁজে।

 

আকাশ যেমন…

কিছু কিছু জানলা বড় হতে হতে আকাশ হয়ে যায়।
কিছু কিছু দিঘি ছোট হতে হতে
ডোবা।
আমি ছোট হওয়া দীঘির দিকে
মুখ ফিরিয়ে,
হেঁটে যাই ধূসর কুয়াশা নিয়ে।
আমার ঘরময় শুধু সেইসব জানলা আলো দেয়

যারা আকাশ হতে পারে।

 

Facebook Notice for EU! You need to login to view and post FB Comments!
About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3842 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...