তিষ্য দাশগুপ্তের ফেবু দেওয়াল থেকে

তিষ্য দাশগুপ্ত 

 

একেকটা দিন একেকরকম গন্ধ মেখে হাজির হয় মনপলাশের রাতদুপুরে। কোনওটায় রামধনুকের পাখনা আঁকা, আবার কখনও মেঘপিয়নের চিঠির ভাঁজে গহন গোপন বিষণ্ণতায় মোড়া। একেকটা দিন একেকরকম স্মৃতির সরণি বেয়ে নিয়ে চলে উজানগঞ্জে আয়নামহলের সন্ধানে। কুষ্টিয়ায় বিলের ধারে, সাঁঝের বেলা বক শালিকেরা যখন ঘর খুঁজে ফেরে ক্লান্ত, ঝিমধরা আলোয় গোঁসাই ঠাকুর ধরেছেন গান, সন্ধান করছেন রূপসাগরের জাদুকরের, দেহমহলের মুর্শিদের। আরেকটা ক্লান্ত বিকেলে গোধূলির বিষণ্ন হলুদ হয়ে আসা পাতার ভাঁজে, বর্ষাকালে অল্প হ্যারিকেনের আলোয় স্পষ্ট দেখা যায় ছপ ছপ শব্দ তুলে ওই আসছেন দাদামশাই, আড়িয়ালের বুক চিড়ে সশব্দে ভাঙছে পাড়। ইকোস্পেসের আইকার্ডের ভিড়ে চেপ্টে থাকা শহরতলিতে তখন ধুঁকছে গোধূলি, নদীর স্রোতের অল্প আঁচে ঘোমটা ঢাকা মা সেঁকছেন হাতে গড়া রুটি, কলমি শাকের পাতায় এখনও গুগলির ঘ্রাণ লেগে আছে। শ্মশানের রেজিস্টারে মেয়ের বয়স লিখতে কলম সরে না, বাপের কথা একবারও ভাবল না? ওইটুকু বকাতেই…… আলীদের বাগানে পেকেছে কাঁঠাল, কাঁঠালের আঠামাখা হাতে কালশিটে ছয় মাসের, সুদূর কোলকাতা থেকে বাড়ি ফিরছিলেন বাবা। রসুল মাঝি নৌকা বায় উজান পানে, শ্মশান ঘাটে মায়ের ভাঙা শাখা কুড়িয়ে রাখে আসগর– এবার আর হারানো যাবে না নশীপুরের ছেলেদের, সুবল না থাকলে গোল দেবে কে?

আরেক মনখারাপের বাদলা দুপুর শহরে যখন বিষণ্ণতার কালচে রঙের আনাগোনা, গোয়ালন্দে পার হতে হবে স্টীমার, ছোট্ট নিতাই বুঝে পায় না, বেচারা গরুগুলোর দোষ কী, গোয়ালঘরটা পুড়ে গেলে রোদে জলে বেচারারা থাকবে কোথায়। পেরিয়ে যায় চৌধুরীদের বাগানবাড়ি, খেলার মাঠ, কবরখানা। যাদবপুরের ভাঙা টালির ঘরে তুলসীতলায় মৃদু প্রদীপের আলোয় চোখের কোণা হয়তো চিকচিক করে ওঠে কখনও, মনে পড়ে যায় মুংলির কথা, মা ছাড়া কেউ খড় বিচালী দিলে ছুঁয়ে পর্যন্ত দেখত না, গোহাটায় খুব কষ্ট দিয়ে মারে ওরা। কোনও কোনও নিকষ কালো মে মাসের সন্ধ্যায় আধোচেতনে সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালের তেরো নম্বর বেড তোলপাড় করে তোলেন পিসিদাদু, দাঙ্গা হচ্ছে নোয়াখালীতে, মাথায় লাঠির আঘাতটা লাগার আগের মুহূর্তে মনে পড়ে কাল সন্ধেবেলাতেই জামালের সাথে আম চুরির কথা মণ্ডলদের বাগান থেকে, অবাক হওয়ার সময়টুকুও মেলে না, তার আগেই সব ঝাপসা। রাত যেন আজ ভীষণ ভয়ের, আকাশ কালো ঘন মেঘে ছাওয়া, চেম্বারে ডেকেছেন ডাক্তারকাকা…. “প্রস্তুত হও এবার”…. গলাটা হয়তো কেঁপে যায় খানিক। দাদুর কাছে রূপসার জলে সেই কাতলা ধরার গল্পটা আর শোনা হল না। পরদিন ক্লান্ত দুপুরে দুই নম্বরে লাইন, বড়জোর চল্লিশ মিনিট, একটা মাটির সরায় গোটা “দ্যাশ”-এর গল্প এঁটে যায়?

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 5395 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.