কৌশিক সেন
প্রতি রাজ্যের নিজস্ব গাছ, পশু, পাখি, ফল, সবজি, মাছ সব কিছুই বিদ্যমান, কিন্তু এই শর্ট রিল-এর যুগে অধিকাংশেরই তা অজানা। আমরা জানতে চেষ্টা করি না, শুধু চটজলদি যা সোশাল সাইটস আমাদের দেখতে বাধ্য করে, ঘনঘন স্ক্রোল করে নিবিড়ভাবে তাতেই মন দিই। ইন্ডাকশন আর মাত্র কয়েকটা পড়ে আছে, বুক করে দিতে হবে
আমাদের জেন জি-র মা-বাবার এখন একটাই চিন্তা— গ্যাস কত কম খরচ করে রান্না সারা যাবে আর গাড়ির তেলের ট্যাঙ্ক ফুল রাখতে হবে। তেনারা যখন ছোট ছিলেন, ম্যাপ পয়েন্টিং-এর ক্ষেত্রে অঙ্গরাজ্য দিল্লি মোটামুটি অন্য কোনও রাজ্যে ঢুকে পড়ত, রাজ্যপাল আর রাষ্ট্রপতির নাম মোটামুটি একই উত্তর হত। তবে পরীক্ষা খারাপ হলে মা-বাবা ভার্বাল বা ফিজিক্যাল থার্ড ডিগ্রি ব্যবহার করতেন। আর মাস্টারমশাইদের উপরে উঠে কোনও মন্ত্রী বলতেন না— পরীক্ষা খারাপ তাতে কী হয়েছে, পাশ করানোর দায়িত্ব আমার।
তখন খাল-বিল-নদী-নালার সঙ্গে মাটির যোগাযোগ ছিল, ঘুড়ি ওড়াতে নিজের হাতে দেশি মাঞ্জা চলত; চাইনিজদের শুধু পেট-টেপা ঝর্ণাকলম ছিল, আর আধিপত্য নয়। যখন ভরাট ছিল কোচবক, কাক, চিল, শালিক, ঘুঘুর দল, মনে হত ওটাই নিয়ম। ওরা থাকবে আমাদের সঙ্গেই, আমরাও ওদের মাঝেই।
যবে ভোরে মেলছি আঁখি
দেখি ডুমুরের গাছে ভোরের দোয়েলপাখি,
চারিদিকে পল্লবের স্তূপ
জাম-বট-কাঁঠালের-হিজলের-অশথের করে আছে চুপ;
ফণীমনসার ঝোপ, শটিবন— সবকিছুই যেন শিল্পী বিধাতার আঁকা ছবি। কিন্তু বাধ সাধল ঘোর কলি। কবি জীবনানন্দের কবিতার মূল ভাবের সম্মান মাথায় রেখে একটু অন্যভাবে বলা যায়—
সময়ের অবিরল শাদা আর কালো
বনানীর বুক থেকে এসে
মাছ আর মন আর মাছরাঙাদের ভালোবেসে জীবন চলার কথা ছিল।
তবু চোখ ঝলসানো আলো আর গতি
চারপাশের ক্ষতি
ভালোবেসে ষোলো আনা নাগরিক যদি
না হয়ে বরং হতে ধানসিঁড়ি নদী, বাঁচতে তুমি,
বাঁচত বাসযোগ্য আগামী ভবিষ্যৎ।
বাংলার বন, বাংলার গাছ
বাংলার জল, বাংলার মাছ…
প্রতি রাজ্যের নিজস্ব গাছ, পশু, পাখি, ফল, সবজি, মাছ সব কিছুই বিদ্যমান, কিন্তু এই শর্ট রিল-এর যুগে অধিকাংশেরই তা অজানা। আমরা জানতে চেষ্টা করি না, শুধু চটজলদি যা সোশাল সাইটস আমাদের দেখতে বাধ্য করে, ঘনঘন স্ক্রোল করে নিবিড়ভাবে তাতেই মন দিই। ইন্ডাকশন আর মাত্র কয়েকটা পড়ে আছে, বুক করে দিতে হবে।
নাদুস-নুদুস বাঘরোল
রাজ্য-পশু হল বাঘরোল/বাঘডাসা বা মেছো বিড়াল। ২০১২ সালে এই প্রাণীকে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য-পশুর স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এর ইংরেজি নাম ফিশিং ক্যাট (Fishing Cat)। সহাবস্থান একটি সোজাসাপ্টা অর্থবাহী শব্দ। ফিশিং ক্যাট শুনলেই বোঝা যায় এই প্রাণীর প্রধান খাবার মাছ। তবে খাবারের প্রয়োজনে এরা ব্যাং, কাঁকড়া, ইঁদুর, বিভিন্ন ধরনের পাখি এবং ছোট আকারের স্তন্যপায়ী প্রাণীও শিকার করে খেয়ে থাকে।
আগে সহজে লোকালয়ের কাছে আসত না, উপকূলীয় বন-বাদাড়ে থাকত। জলাভূমি এবং জলজ পরিবেশের আশেপাশে থাকাই তাদের পছন্দ ছিল। ইঁদুরের মতো ফসল বা শস্যদানা রাতারাতি সাবার করার মতো ক্ষতিকারক রোডেন্টসদের (Rodents) বংশের বাড়বাড়ন্ত নিয়ন্ত্রণে রাখত এই বাঘরোল। কিন্তু কপালে সুখ কই! মাঠেঘাটে প্যাঁদানি খেয়ে মরতে হয় এই রাজ্য-প্রাণীটিকে। এর কারণ অবশ্যই মানুষ নিজে। জনবসতি বাড়াতে বাড়াতে সুরক্ষিত বনের আরও ভেতরে আধিপত্য বিস্তার করছে মানুষ।
শিল্পায়ন এবং উন্নয়নমূলক প্রকল্পের জন্য মেছোবিড়ালের আবাসস্থল যেমন নলখাগড়া ও জলাভূমি ব্যাপকভাবে দখল করা হচ্ছে। বেড়েছে মধুসংগ্রহ এবং কাঁকড়াশিকার। মুক্তাঙ্গনে খাবার শিকারের সুযোগ কমেছে এবং লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে পেটের জ্বালায়। ছোট হাঁস, মুরগি, শূকরের বাচ্চা, পুকুরের মাছে থাবা বসছে। তা মানুষ মেনে নেবে কেন! নেহাতই নিরীহ এরা। সাধারণ বিড়ালের থেকে গতরে বড় হওয়ায় এবং গায়ে ডোরাকাটা দাগ থাকায় অনেকেই গোঁড়ামি বা ভুল ধারণার বশবর্তী হয়ে বাঘ বলে ভেবে নিচ্ছে এবং সুযোগ বুঝে পিটিয়ে মারছে।

ব্যবসার ক্ষতির আশঙ্কায় মাছচাষিদের একাংশ বাঘরোলকে মেরে ফেলে। এছাড়া ফলহারিণী কালীপূজা বা বুদ্ধপূর্ণিমায় শিকার উৎসবে বাঘরোল মারা পড়ছে। এক গবেষণায় গত কয়েক বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় কমপক্ষে ৭০টি মেছোবিড়াল মারা গেছে। কমছে দ্রুতহারে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপ্রাণীর তকমাধারীর সংখ্যা। অথচ মানুষ খাওয়া বা মানুষকে খুব বাধ্যতা বা ভয়ে আক্রমণ করার বাস্তব পরিসংখ্যানও নগণ্যতম। বিপদ শিয়রে; আইইউসিএন-এর তালিকায় লাল হিসেবে চিহ্নিত এই প্রাণী অর্থাৎ ভালনারেবল।
তবে পশ্চিমবঙ্গের বনদপ্তরের প্রশাসনিক শীর্ষে থাকা প্রধান মুখ্য বনপাল (PCCF)-এর বক্তব্য আশাব্যঞ্জক। জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (JICA)-র সঙ্গে মিলে ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে বাঘরোলের সমীক্ষা ও সংরক্ষণ-সহ একাধিক কাজ শুরু করেছে রাজ্য। বাঘরোল বা মেছোবিড়ালের উপরে গবেষণা করছে রাজ্য জীববৈচিত্র্য পর্ষদও। পশ্চিমবঙ্গকে দেশের মধ্যে মেছোবিড়ালের শেষ দুর্গ হিসেবে অভিহিত করা যেতে পারে। মৌখিক যোগাযোগের পাশাপাশি সোশাল মিডিয়াতেও বাঘরোল শব্দটি কম ব্যবহার করা হচ্ছে এবং অন্য নাম ব্যবহার করা হচ্ছে।
নলভূমি এবং জলাভূমির মতো মেছোবিড়ালের আবাসস্থলের তীব্র সঙ্কোচন এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়। বাঘরোল বন্যপ্রাণী সুরক্ষা আইন ১৯৭২-এর অধীনে তফসিল ১ সুরক্ষার আওতায় আসে এবং তাদের হত্যা করলে ১০ বছরের কারাদণ্ড বা ৩০,০০০ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে। বিড়ালদের হত্যা না করার কারণ হিসেবে বলা যায় তারা ইঁদুর এবং সাপ হত্যা করে পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখে। বিড়াল ও মাছের চিরন্তন সম্পর্ক নিয়ে টমাস গ্রে-এর বিখ্যাত কবিতা ওড অন দ্য ডেথ অফ আ ফেভারিট ক্যাট বিশ্বজুড়ে সমাদৃত, যেখানে একটি বিড়ালের মাছ ধরতে গিয়ে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনার গল্প বর্ণিত হয়েছে। প্রশ্ন জাগে, সামান্য একটু খাবারের জন্য আজ রাজ্যপ্রাণীর সঙ্গে মানুষের সংঘাত! সহাবস্থানের কথা ছিল সহজাত এবং প্রকৃতিনির্ভর; মানুষই কি তাদের জীবনের করুণ পরিণতির বিধাতা!?
শরতের শিউলি
রাজ্য-ফুল শিউলি (বৈজ্ঞানিক নাম: Nyctanthes arbor-tristis)। এই বাংলার সাধারণ এক তারকাকৃতির ফুল শিউলি বা শেফালি। খ্রিস্টপূর্ব ৫৬ অব্দে জন্ম নেওয়া কবি কালিদাসের কাব্যে শিউলির কথা আছে। শিউলি এই উপমহাদেশেরই নিজস্ব উদ্ভিদ। হিন্দু পুরাণে পারিজাত নামে প্রসিদ্ধ। শ্রীকৃষ্ণের হাত ধরে মর্ত্যে আগমন করে শিউলি। রাতের আঁধারে ফোটে, বাতাসে বিলায় সুবাস। আর ভোরের আলো ফুটলেই ঝরে পড়ে নিচে তৈরি করে সাদা-কমলার গালিচা। মাটিতে ঝরে পড়ার পরও দেবতার উদ্দেশে নিবেদন করা যায় এই ফুল। লাতিন Nyctanthes-এর অর্থ হচ্ছে ‘সন্ধ্যায় ফোটা’ এবং arbor-tristis-এর মানে হচ্ছে ‘বিষণ্ণ গাছ’। কবি নজরুলের ভাষায়— ‘শিউলিতলায় ভোরবেলায় কুসুম কুড়ায় পল্লী-বালা।’

শরৎ আর শিউলিফুল যেন একে অপরের দোসর। এর ইংরেজি নাম ‘নাইট জেসমিন’, আর হিন্দি ও উর্দুতে একে ডাকা হয় ‘রাত কি রানি’। ফুলটির সংস্কৃত নাম হল পারিজাত, হারসিংগার, শেফালিকা, নিশিপুষ্প, রজনীহাস, প্রাজক্তা, শীতমঞ্জরী, শ্বেতসুরসা, শুক্লাঙ্গী, রংলাসিনী, রক্তবৃন্তা, মাসিকা, নীলিকা ইত্যাদি। বাংলাদেশি প্রকৃতিবিদ ও জীববিজ্ঞানী দ্বিজেন শর্মা শিউলিবন্দনায় বলেছেন— ‘কোনো বাগানই পূর্ণতা পায় না শিউলি না থাকে যদি।’
শিশিরসিক্ত শিউলিফুলের সৌরভের কথা উল্লেখ না করলে শরতের অপরূপ প্রকৃতির বর্ণনাই অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিউলিবন্দনা অনবদ্য। কলাপাতার মোড়কে বাজারের ফুলের দোকানে কিছু ফুল মেলে। শিউলির বোঁটা থেকে সংগ্রহ করা রং দিয়ে কাপড় রাঙানো যায়। ফুলের বোঁটাগুলো শুকিয়ে গুঁড়ো করে পাউডার করে হালকা গরম জলে মেশালে চমৎকার রং উৎপন্ন হয়। ফুল থেকে তৈরি হয় সুগন্ধি। শিউলিপাতার রস কৃমিনাশক। ইমিউনোস্টিমুল্যান্ট, হেপাটোপ্রোটেক্টিভ, অ্যান্টি-লেশম্যানিয়াল, অ্যান্টিভাইরাল এবং অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধ তৈরি করতে শিউলির বীজ, পাতা ও ফুল ব্যবহার করা হয়। এর পাতা সায়াটিকা, আর্থ্রাইটিস, জ্বর ও নানারকম যন্ত্রণাদায়ক সমস্যার চিকিৎসার জন্য ওষুধ বা বড়ির মতো করে আয়ুর্বেদিক ওষুধ তৈরি করতে ব্যবহার করা হয়। মাথার খুশকি দূর করতে শিউলি-বীজ উপকারী। এর পাতায় থাকে ডি-মানিটল ও ফ্লাভানোল গ্লুকোসাইডেজ-এর মতো কেমিক্যাল কম্পাউন্ড। তাই আর্থ্রাইটিস বা সায়াটিকার ব্যথায় এই পাতা ফুটিয়ে চায়ের মতো খেলে উপকার মেলে।
চিন্তার বিষয়, শহরাঞ্চলে নগরায়ণ এবং পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে শিউলিগাছ কমে যাচ্ছে। এই গাছ মূলত গ্রাম বা প্রাকৃতিক পরিবেশে বেশি ভালো থাকে। কম পরিসরে শহরের পরিবেশে নিজ বাড়িতে বা বারান্দায় টবে একটি চারাগাছ রোপণ করা পরিবেশরক্ষায় ইতিবাচক ভূমিকা নিতে পারে। জ্যোতিষশাস্ত্র এবং ধর্মীয় বিশ্বাস অনুসারে এই ফুল দেবী লক্ষ্মীর অত্যন্ত প্রিয়। বাস্তুশাস্ত্র অনুসারে বাড়ির উত্তর এবং উত্তর-পূর্ব দিকে এই গাছ থাকলে তা সৌভাগ্যসূচক, শান্তিরক্ষাকারী এবং ইতিবাচক। গাছ লাগানোর আদর্শ দিন সোম, বৃহস্পতি বা শুক্রবার। তবে আধুনিক নগরোন্নয়নের প্রকোপে মাটি ব্রাত্য; শিউলি ফুল এখন মোবাইল বা কম্পিউটার স্ক্রিনের স্ক্রিন-সেভার হয়ে থাকছে মানুষের কাছে। ভোরবেলা বেরিয়ে পথে হেঁটে খুঁজে আমরা কবে শেষ শিউলি কুড়িয়েছি মনে নেই। কটা ঘর তার উঠোনে, ব্যালকনি বা ছাদে শিউলি ফোটাতে পারছে!?
ছত্রধারী ছাতিম
রাজ্য-গাছ ছাতিম (ব্ল্যাকবোর্ড ট্রি/Devil’s Tree)। বৈজ্ঞানিক নাম: Alstonia scholaris। শব্দটির মধ্যে ‘স্কলার’ বা পণ্ডিত গভীরভাবে লুকানো। শান্তিনিকেতনের ছাতিমতলায় মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিধন্য এই গাছটি ধ্যানের এবং শান্তির প্রতীক। সবুজ পাতায়, সাদা ফুলে স্নিগ্ধ শান্তির সুর; ছাতিমগাছটি স্বপ্ন বোনে আকাশ পেরিয়ে বহুদূর। রবি ঠাকুরের প্রিয় ফুল ছিল ছাতিম। তিনি লিখেছিলেন— ‘ওই যে ছাতিম গাছের মতোই আছি/সহজ প্রাণের আবেগ নিয়ে মাটির কাছাকাছি’।
একসময় শান্তিনিকেতনের সমাবর্তনে ছাতিমের পাতা উপহার দেওয়ার চল ছিল। এর পাতাগুলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক এবং স্নাতকোত্তরদের চ্যান্সেলর দ্বারা পুরস্কৃত করা হত। আর্দ্র, কর্দমাক্ত, জলসিক্ত স্থানে ছাতিম বেশি জন্মায়। ছাতিমের মূলাবর্তে সাতটি পাতা একসঙ্গে থাকে বলে সংস্কৃত ভাষায় একে ‘সপ্তপর্ণ’ বা ‘সপ্তপর্ণা’ নামে ডাকা হয়। এটি দ্বিতীয় জৈন তীর্থঙ্কর অজিতনাথের পবিত্র গাছ। ১৭৬৭ সালে লিনিয়াস প্রথম এটি বর্ণনা করেছিলেন, যিনি এটিকে এচিটিস স্কোলারিস নাম দিয়েছিলেন। ডগার মাথায় পাতাগুলি এমনভাবে সজ্জিত থাকে যেন দেখলে মনে হয় ছাতার আকৃতি ধারণ করেছে। এই গাছের কাঠ খুব নরম, তাই এই কাঠ দিয়ে স্লেট, পেন্সিল, ব্ল্যাকবোর্ড ইত্যাদি তৈরি করা হত।

এই গাছের বাকল বা ছাল শুকিয়ে ওষুধের কাজে ব্যবহার করা হয়। দীর্ঘস্থায়ী অতিসার এবং আমাশয়ে এটি অত্যন্ত উপকারী। জ্বর ধীরে ধীরে নামায় বলে ম্যালেরিয়াতেও উপকারী। চর্মরোগ এবং সাপে কাটার চিকিৎসাক্ষেত্রেও পরিমিত মাত্রায় ব্যবহার করা হয়। গাছের কাণ্ডে এবং অন্যান্য অংশে দুধের মতো কষে বিষাক্ত অ্যালকালয়েড থাকে, যা সরাসরি অঙ্গে ঢুকলে ক্ষতি হতে পারে। সংবেদনশীল ব্যক্তিদের কাছে এর সুতীব্র ঘ্রাণ অ্যালার্জির কারণ হতে পারে। একজিমা, ঘা এবং চুলকানির চিকিৎসায় অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল এবং অ্যান্টিফাঙ্গাল হিসেবে কার্যকরী। ছাতিমের কাঠ দিয়ে খুব সাধারণ মানের আসবাবপত্র, প্যাকিং কেস, চায়ের পেটি, পেন্সিল এবং দেশলাইয়ের কাঠি তৈরি হয়। ছাতিমের হালকা কাঠ দিয়ে শ্রীলঙ্কায় কফিন বানানো হয়।
বিপদের কথা, শহরে এ ফুলের গাছ চোখে পড়ে কম। গ্রামে আগে দেখা গেলেও এখন কমে গেছে। এ গাছ ৪০ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। গাছটি বহু শাখাবিশিষ্ট। এর ছাল গন্ধহীন, অসমতল ও ধূসর। ঝাঁকড়া পত্রপল্লব নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা উঁচু ছাতিমগাছের শাখা-প্রশাখায় ভরা সবুজ পাতা আর থোকায় থোকায় অগুনতি ফুলে প্রকৃতির কী নিসর্গ তা না দেখলে অনুভব করা যায় না। কিন্তু সেই অনির্বচনীয় অনুভূতি আজ দুষ্প্রাপ্য। জেন জি-র ধারণায় ধরা পড়ছে কি এই রাজ্যের নিজস্ব প্রাণের গাছটি!?
পাঁচমেশালি মাছরাঙা
রাজ্য-পাখি মাছরাঙা। সুকুমার রায়ের কবিতায় মাছরাঙার চিরায়ত রূপ ও রঙের অসাধারণ প্রতিচ্ছবি দেখা যায়: “রূপ যদি চাও যাও না কেন মাছরাঙার কাছে, অমন খাসা রঙের বাহার আর কি কারো আছে?” সাদাবুক/ধলাগলা মাছরাঙা পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাখি। গাঙ্গেয় উপত্যকা এবং দক্ষিণবঙ্গের সুন্দরবনে প্রায় আটটি প্রজাতি রয়েছে। নদী, খাঁড়ি এবং ম্যানগ্রোভ জঙ্গল এই পাখিদের প্রধান আবাসস্থল। তবে বড় ঝিল, সমুদ্র অঞ্চলের ভেতরকার ছোট পুকুর বা বিলেও এই সাদাবুক মাছরাঙার যথেষ্ট খোঁজ মেলে।

মাছ ছাড়াও টিকটিকি, গেড়ি, গুগলি এদের প্রধান খাদ্য। শোনা যায়, বিশিষ্ট ভারতীয় ব্যবসায়ী বিজয় মালিয়ার কিংফিশার কোম্পানির লোগো তৈরির সময়ে এই পাখির সঙ্গে পরিষ্কার জলের সুসম্পর্ক মাথায় রাখা হয়েছিল। এই দৃষ্টিনন্দন পাখিটি জলাশয়ের ক্ষতিকারক পোকামাকড়, ব্যাং এবং বিভিন্ন ছোট জলজ প্রাণী খেয়ে পরিবেশ পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে। এছাড়া বনাঞ্চলে বসবাসকারী মাছরাঙারা ক্ষতিকর ইঁদুর ও অন্যান্য ছোট প্রাণী শিকার করে প্রাকৃতিক কীটনাশক হিসেবে কাজ করে।
বিপদের কথা, মাছরাঙা পাখি বিভিন্ন কারণে বিপন্ন। এদের বাসস্থান ধ্বংস, জলবায়ু পরিবর্তন এবং শিকারের কারণে এদের সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে। এদের বাসস্থান রক্ষা করা এবং শিকার বন্ধ করা গুরুত্বপূর্ণ। মাছরাঙা পাখিদের সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এরা রোগাক্রান্ত ছোট মাছ খেয়ে প্রাকৃতিকভাবে রোগের প্রাদুর্ভাব কমায়। বিভিন্ন জলভাগে অতিরিক্ত ওষুধ বিষের মতো বিরূপ প্রভাব ফেলছে মাছরাঙাদের ওপর। গ্রিক পুরাণের সেই কিংবদন্তি হ্যালসিওন (Halcyon) পাখি বা মাছরাঙা বৈশ্বিকভাবে বিপদগ্রস্ত বলে বিবেচিত। জলদূষণ, বন উজাড় এবং জলাভূমি কমার ফলে মাছরাঙার আবাসস্থল হুমকির মুখে পড়েছে।
আশার কথা, ২০১৫ সালে আইইউসিএন-এর সর্বশেষ তালিকায় এটি বিপন্মুক্ত বলে গণ্য। যেহেতু জুলাই মাস মাছরাঙাদের প্রজননকাল, তাই ‘বার্ড ওয়াচার্স সোসাইটি’ প্রতি বছর জুলাই মাসে ‘মাছরাঙা সপ্তাহ’ পালনের মতো উদ্যোগ নেয়, যা পাখিপ্রেমীদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে। প্রণয়ের টানে দুজনে কাছে বসলেও মাছরাঙা পাখিদের নীড় বাঁধার কোনও সুযোগ কি আছে এ নগরীতে! সুউচ্চ কংক্রিটের জঙ্গল আর রাজপথে ঠাসাঠাসি এ নগরীর মাটি তো এখন পাথর-কঠিন। প্রশ্ন জাগে, সহাবস্থানের কথা ছিল বিধাতার লিখনে, কোথাও কি একটু নিরাপদ মাটি খুঁজে পাবে না রাজ্যপাখিটি!?
মাছেভাতে বাঙালি
পশ্চিমবঙ্গের মানুষের এক কথায় রাজ্য-খাবার— ভাত-মাছ। সমস্যা এখানেই। কর্পোরেট হাওয়া শিক্ষা, দীক্ষা, অনুভূতি, বিবেক, বোধ— সব উড়িয়ে ভাসিয়ে নিয়ে চলেছে এক মহাশূন্যের দিকে। ছোটখাটো ডোবা, পুকুর বা ঝিলের উপরে বাণিজ্যিক কারণে অবাধে জালের ঘের দেওয়া হচ্ছে। এতে সামান্য কিছু মাছ বাঁচানো গেলেও মাছরাঙারা সেই জালে জড়িয়ে পড়ে মরছে। এছাড়া রয়েছে চাইনিজ মাঞ্জা সুতো, যার নিরন্তর বলি হচ্ছে বিহঙ্গরা। জলাশয়ের সৌন্দর্যায়ন হচ্ছে, কিন্তু বাসা তৈরি করতে পারছে না পাখিরা।
মাছ চাষ বা অ্যাকোয়াকালচার একটি লোভী ব্যবসা। দক্ষিণ কলকাতার অনেক ভেড়িতে বাণিজ্যিক নিয়ম মেনে চাষ হয়। দ্রুত বৃদ্ধি এবং রোগ সারানোর উদ্দেশ্যে ফ্লোরফেনিকল, এরিথ্রোমাইসিন, অক্সোলিনিক অ্যাসিড বা সিপ্রোফ্লক্সাসিনের মতো কড়া অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হচ্ছে। এই “ককটেল প্রভাব” জলদূষণ বাড়াচ্ছে এবং সেই বিষাক্ত মাছ খেয়ে পাখিরা মরছে। এই অনিয়ন্ত্রিত অ্যান্টিবায়োটিক মানুষের শরীরে প্রবেশ করে ‘অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স’ তৈরি করছে, যা মানবস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। মৎস্য-বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ছাড়া এমন চাষ পরিবেশ ও মানবসমাজের কফিনের পেরেক।

মেছোবিড়াল, উল্লুক, ভোঁদড়, ঘড়িয়াল, শকুন, কাক, ছোট মদনটাক, গাঙ্গেয় ডলফিন— একদা আমাদের সাহিত্যের অপরিহার্য অংশ ছিল। আজ যেন তারা কেবল শিশুপাঠ্য কাহিনিতে সীমাবদ্ধ। বনাঞ্চল ছোট হওয়ায় খাদ্যশৃঙ্খল ভেঙে পড়ছে, প্রাণীরা লোকালয়ে চলে আসছে এবং প্রাণ হারাচ্ছে। গ্রামাঞ্চলে এদের নাম ‘জল-বিলাই’। এদের শরীরের দ্বিস্তরীয় লোম জলে ভিজতে দেয় না। একটি প্রাণীকে তার চেনা এলাকা থেকে বিচ্যুত করা মানে অস্তিত্বরক্ষার সংকট শুরু হওয়া। জলাভূমি ও ঝোপঝাড় না বাঁচালে ল্যাবরেটরিতে এদের উৎপাদন সম্ভব নয়। বাঙালি সংস্কৃতিতে পারস্পরিক সহাবস্থান একটি ইতিবাচক গুণ; তাই রাজ্য-প্রতীকদের এই অস্তিত্ব হারানো মানে প্রতি বাঙালিরই হার।
অবাক লাগে ভ্যালেন্টাইনে জোগাড় হয়ে যায় লাল গোলাপ, রাজ্য-ফল হিমসাগর আমের চাহিদা থাকে তুঙ্গে, অথচ নজরের অগোচরে মনখারাপ শিউলি-ছাতিম!
এ হেন হাল কেন গর্বের বঙ্গে!?
হারানো বিপন্ন সম্পদ
সুন্দরবনের বাল্বোরক্স ও ছোট-বাল্ব অর্কিড বর্তমানে ‘অতিমাত্রায় বিপন্ন’। এছাড়া সুন্দরীগাছ, শিমুল, পলাশ, ভাঁটফুল বা ঘেঁটুফুলের মতো বাংলার নিজস্ব সম্পদগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। ভাঁটফুল নিয়ে জীবনানন্দ লিখেছিলেন— “বাংলার নদী মাঠ ভাঁটফুল ঘুঙুরের মতো তার কেঁদেছিল পায়।” ভেরেন্ডাগাছ, সিংহমুখী ফুল বা বনটেপারি আজ প্রায় বিলুপ্ত। আমাদের চিরচেনা জুঁই, চামেলি, বেলি, শিউলি, গন্ধরাজ, হাসনাহেনা বা কামিনীও দুষ্প্রাপ্যের তালিকায়।

১৮০৫ সালে গঠিত জঙ্গলমহল জেলার অরণ্যবাসী জনজীবনের প্রতিটি উৎসবের সঙ্গেই জঙ্গল জড়িত। আদিবাসী সমাজে পশুপাখির হাড় বা মাংস থেকে তৈরি পথ্য বা টোটকার চল ছিল। কিন্তু নির্বিচারে বৃক্ষচ্ছেদন সব প্রাকৃতিক সম্পদ বিলুপ্তির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। কলকাতার আশেপাশে পুকুর থেকে হারিয়ে যাচ্ছে প্রায় ৩৩ ধরনের দেশি মাছ— যেমন বেলে, চ্যালা, কুঁচে, বান, পাঁকাল, গোলচাঁদ, চ্যাং ইত্যাদি। জীববৈচিত্র্য পর্ষদ প্রতিটি ব্লকে দেশি মাছ চাষের যে লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে, তা অবশ্য আশাব্যঞ্জক।

পরিযায়ী পাখিরা একদা খাল-বিলের গাছে বাসা বাঁধত। এখন ম্যানগ্রোভ সাফ করে চলছে চিংড়িচাষ বা ভেড়ি নির্মাণ। সুন্দরবন থেকে মুখ ফেরাচ্ছে পরিযায়ী পাখিরা। কচ্ছপের হাড় বা মাংসের জন্য চোরাশিকার গাঙ্গেয় তটভূমির ১৭টি মিষ্টি জলের কচ্ছপ প্রজাতিকে হুমকির মুখে ফেলেছে। বাটাগুর বাসকা বা ব্ল্যাক সফটশেলের মতো প্রজাতিরা হারিয়ে যাচ্ছে, যদিও সুন্দরবন ব্যাঘ্র প্রকল্পের উদ্যোগে কিছু সংরক্ষণ কাজ শুরু হয়েছে।
বঙ্কিমচন্দ্রের বা জীবনানন্দের কবিতা শুনলে আজ আশ্চর্য লাগে। আজ আমরা মশা, ইঁদুর আর আরশোলার বংশবিস্তার দেখছি, কিন্তু ফিঙে-দোয়েল-টুনটুনিদের দেখা মেলা ভার। জলাশয়ের পাশে বাঁশঝাড় বা বাবলাগাছ নেই; গোবক, পানকৌড়িদের দুর্দশা চরমে। অজ্ঞতা আর অর্থের লালসায় বাঙালি তার চিরকালের বন্ধুদের হারিয়ে ফেলেছে।
আজ যার সিকি আনা মেলা ভার:
১. কেয়া ঝোপের বজ্রকীট/প্যাঙ্গোলিন।
২. শঙ্খচিল— যিনি ইঁদুর বা সাপ খেয়ে আমাদের উপকার করতেন।
৩. ফুল শকুন— ভাগাড়ের পচা মাংস পরিষ্কার করত যারা।
৪. জলপিপি।
৫. তেলতেলে গা-ওয়ালা মাছ ময়ূর শিকারী পাখি ইত্যাদি।

পরিশেষ
বিপজ্জনকভাবে বেড়েছে পায়রা। ফ্ল্যাট কালচার এবং এসির ডাক্টের সুবিধা নিয়ে এরা ব্যাপক বংশবিস্তার করছে। এদের বিষ্ঠা ও পালকের ধূলিকণা থেকে গুরুতর ফুসফুসের সংক্রমণ ও অ্যালার্জি হতে পারে। ডায়রিয়া, জ্বর বা গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল অসুস্থতাও এর কারণ। আজ প্রকৃতিকে সরিয়ে আমাদের হাতে রইল কেবল এই স্বাস্থ্যঝুঁকি আর এক রিক্ত ভবিষ্যৎ। হাতে রইল এই।
ঋণ স্বীকার:
১. গুগল সাইটস
২. সুধাংশু পাত্র। বাংলার বিপন্ন পশুপাখি ও কীটপতঙ্গ।
৩. www.natureinfocus.in
৪. www.dainikamadershomoy.com

