জয়দীপ সরকার
৩০ মে। দিনটি এলেই মনে হয়, আবেগের এক নিবিড় মেঘসন্ধ্যা নৈঃশব্দ্যের গায়ে এসে বসে। অনুভূতির ঘনকুহেলি যেন মহাশূন্যের অতল প্রান্তর ছিঁড়ে অন্তঃকরণে স্তূপীভূত হয়, আর দূরে কোথাও বৃষ্টির পূর্বলক্ষণ এক বিষণ্ণতায় সব চরিত্র কাল্পনিকে দরজা খুলে দেয়। আকাশের এই মেঘমেদুরতা, আচমকা বর্ষণ, সিক্ত বাতাসের অবসন্ন গন্ধ, সবই যেন এক অভীষ্ট বেদনার ভূদৃশ্য; যে বেদনা থেকে মুক্তি চাই না, বরং তাকে দীর্ঘায়িত করতে ইচ্ছে হয়। কারণ এই দিনেই পুষ্পবরেণ্য পরিচালক ঋতুপর্ণ ঘোষ তাঁর স্বর্ণাভ রথে আরোহন করে নক্ষত্রপথে বিলীন হয়েছিলেন। অদ্ভুতভাবে, তাঁর জন্মদিনের থেকেও এই মৃত্যুদিবসটিই অধিক অন্তরঙ্গ মনে হয়; হয়তো গভীরতম সত্যেরা উদ্যাপনের আলোকমালায় নয়, অনুপস্থিতির সিক্ত অবকাশেই বেশি উন্মোচিত হয়। তাই বৃষ্টি নামলেই কোথা থেকে যেন ভেসে আসে, “মেঘপিওনের ব্যাগের ভিতর মনখারাপের দিস্তা”, আর মনে হয়, ঋতুপর্ণ আসলে কোনও মানুষ নন, এক দীর্ঘস্থায়ী মনখারাপের নন্দনতত্ত্ব।

তবু ঋতু ফিরে আসেন। বারংবার ফিরে আসেন, জানালার কাচে জমে থাকা বৃষ্টিবিন্দুতে, মনস্তাপের অন্তঃপুরে, নৈঃশব্দ্যের দখলখেলায়। কখনও চিত্রাঙ্গদা-র দেহাভিনয়ে, কখনও চোখের বালি-র অন্তরালবাসিনীর দীর্ঘশ্বাসে, কখনও বা মেমোরিজ ইন মার্চ-এর নিঃসঙ্গ ডাইনিং টেবিলে জমে থাকা অনুচ্চারিত শোকের ভিতর। সেই চলচ্চিত্র যেন শেখায় স্মৃতি আসলে কখনও অতীত নয়; তা নীরবে বসবাস করে ব্যবহৃত কাপের গায়ে, খোলা আলমারিতে, কিংবা মৃত মানুষের স্পর্শে রয়ে যাওয়া বাতাসে। মনে হয়, এই বর্ষণমুখর ইউটোপিয়ায় ঋতুপর্ণ কোথাও আছেন সেই ফল্গুনদীর মতন অন্তঃসলিলা, সেই সোজাসাপ্টা অথচ অনির্বচনীয় সংবেদনশীল ছবির কারিগর, যাঁর আলো-আঁধারির মহাফেজখানায় দাঁড়িয়েই প্রথম শিখেছিলাম, যন্ত্রণাও কখনও কখনও আশ্রয় হয়, আর কিছু অভাব এমন থাকে, যাকে হারাতে নয়, বহন করতেই ইচ্ছে করে। ঠিক যেমন চিত্রাঙ্গদা-র অন্তর্লীন আর্তি ফিসফিসিয়ে বলে ওঠে— “গুরু গুরু গুরু গুরু ঘন মেঘ গরজে পর্বত শিখরে।”
ঋতুপর্ণ ঘোষ বাঙালি ঘরানার সেই বিরল চিত্রনির্মাতা, যিনি অন্তর ও বাহিরের সূক্ষ্ম ব্যবধানটুকুকেই জীবনের প্রকৃত নন্দনতত্ত্ব হিসেবে দেখতে শিখিয়েছিলেন। অথচ সেই তফাত আবার সম্পূর্ণ তফাতও নয়; কারণ অন্তর-বাহিরের সেই ক্ষীণ ফাঁক গলিয়েই তো রৌদ্র প্রবেশ করে, সেখানেই সুখ, সেখানেই দুঃখ। আদৌ কি সুখ ও দুঃখ পৃথক কোনও অনুভব, নাকি তারা পরস্পরেরই অবিচ্ছেদ্য প্রতিধ্বনি? ঋতুপর্ণের সিনেমা যেন এই প্রশ্নগুলিরই দীর্ঘ, নৈঃশব্দ্যময় অনুসন্ধান। কখনও সেই অনুসন্ধান “পিয়া তোরা কাইসা অভিমান”-এর মতো অনুচ্চারিত অভিমানে থমকে থাকে, কখনও বা “বাঁধ ভেঙে দাও”-এর মতো সমস্ত সামাজিক বিন্যাস ভেঙে আত্মস্বীকারের দিকে এগিয়ে যায়। আর কোথাও যেন ভেসে ওঠে— “সখি চির অভাগিনী হম, বৈঠে একাকিনী পোহানু রজনী, তবু না আইল শ্যাম”, যেন ভালোবাসা, শরীর, স্বীকৃতি ও আত্মপরিচয়ের সমস্ত আকাঙ্ক্ষাই শেষ পর্যন্ত এক গভীর মানবিক ভিক্ষাবৃত্তিতে এসে মিশে যায়।
১৯৬৩ সালের ৩১ আগস্ট কলকাতায় জন্ম নেওয়া সৌরনীল (পরবর্তীতে ঋতুপর্ণ) ছোটবেলা থেকেই শিল্প-সাহিত্যের আবহে বেড়ে ওঠেন। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি নিয়ে পড়াশোনার পর বিজ্ঞাপনের জগৎ থেকে চলচ্চিত্রে প্রবেশ করেন। উনিশে এপ্রিল, দহন, বাড়িওয়ালি, চোখের বালি, রেনকোট, দোসর, আবহমান, মেমোরিজ ইন মার্চ থেকে চিত্রাঙ্গদা, প্রতিটি চলচ্চিত্রেই তিনি মধ্যবিত্ত জীবনের নৈঃশব্দ্য, অন্তর্লীন বেদনা এবং সম্পর্কের সূক্ষ্ম মনস্তত্ত্বকে এক কাব্যময় চলচ্চিত্রভাষায় নির্মাণ করেছিলেন। জীবনের শেষদিকে তিনি কেবল চলচ্চিত্রকার নন, বাংলা সংস্কৃতির এক সাহসী জনবুদ্ধিজীবী হয়ে ওঠেন; কুইয়ার পরিচয়, শরীর-রাজনীতি এবং সামাজিক পৌরুষের প্রচলিত ধারণাকে নিজের জীবন ও শিল্পের মাধ্যমে প্রশ্ন করেছিলেন।
তাঁর চলচ্চিত্রজগতে নিঃসঙ্গতা কখনও নিছক একাকিত্ব নয়; বরং তা এক গভীর অস্তিত্বগত অবস্থা, যেখানে নারী, শরীর, আকাঙ্ক্ষা ও কুইয়ার সত্তা পরস্পরের ভিতর দ্রবীভূত হতে থাকে এবং ছুটে চলে কোনও এক অজানা মুক্তির ঝরনাতলায়। তাঁর সিনেমার সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্তগুলি কোনও উচ্চকিত সংলাপে নয়; বরং বন্ধ দরজার ভিতর, আধখোলা জানালার পাশে, কিংবা দীর্ঘ নৈঃশব্দ্যের মধ্যে জন্ম নেয়। তাঁর প্রাপ্তবয়স্ক আবেগময় জগতে নারীসত্তা কখনও সম্পূর্ণ পরিতৃপ্ত নয়; তারা অপেক্ষমান, অপূর্ণ, দগ্ধ, অথচ ভীষণভাবে সচেতন। যেন দূরে কোথাও বাজতে থাকে, “আমার সকল নিয়ে বসে আছি সর্বনাশের আশায়।” বাড়িওয়ালি-র বনলতা সম্ভবত ঋতুপর্ণের নিঃসঙ্গ নারীমনস্তত্ত্বের সবচেয়ে করুণ নির্মাণ। বিশাল, প্রায় মৃতপ্রায় জমিদারবাড়ির ভিতরে তার একা ঘুরে বেড়ানো, সিঁড়ির ধাপে বসে থাকা কিংবা আয়নার সামনে নিজেকে দেখে সঙ্কুচিত হয়ে ওঠা, এগুলো নিছক দৃশ্যরচনা নয়; অবদমনের স্থিরচিত্র। বিশেষত সেই দৃশ্য, যেখানে বনলতা লাল শাড়ি পরে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করতে চায়, সেখানে লাল রং নিছক শরীরী আবেদনের চিহ্ন নয়, বরং দীর্ঘদিনের অবদমিত আকাঙ্ক্ষার অবরোধ ভাঙা। অথচ শেষ পর্যন্ত সে আবার পরিত্যক্ত।
ঋতুপর্ণ ঘোষের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল, তিনি নিঃসঙ্গতাকে কখনও অলঙ্কারময় করে তোলেননি। তাঁর নিঃসঙ্গ নারী কিংবা কুইয়ার চরিত্ররা বীরত্বপূর্ণ নয়; তারা গভীরভাবে ভঙ্গুর। তারা জানালার ধারে বসে থাকে, বৃষ্টির শব্দ শোনে, চিঠি ছিঁড়ে ফেলে, আয়নায় নিজেদের দেখে, আবার নিজেদের থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আর সেই নীরব বিপর্যয়ই তাঁর সিনেমাকে আজও এত প্রাপ্তবয়স্ক, এত ভূতুড়ে মায়াময় করে তোলে। হয়তো সেই কারণেই বর্ষণমুখর বিকেল নামলেই এখনও মনে হয়, ঋতু কোথাও যাননি; তিনি কেবল আলো-আঁধারির অন্য এক ঘরে গিয়ে বসেছেন।

