আইরিন শবনম
কোনও দল যদি মনে করে ভোটব্যাঙ্ক মানেই অচল অনড় কোনও একরৈখিক বস্তু, তাহলে ভুল হবে। সবকিছুর উপরে মানুষ তো মানুষই, নইলে অভয়ার ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা মানুষকে বিশেষত মহিলাদের প্রচণ্ড বীতশ্রদ্ধ ও হতাশ করে কেন? সবচেয়ে বড় কথা, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কোনও গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়কে ভোটব্যাঙ্ক হিসেবে দেখা বা ভোটব্যাঙ্ক করে রাখার অর্থই হল তাদের ব্যক্তিসত্তাকে অস্বীকার করা কিংবা তাদের ব্যক্তি হিসেবে গড়ে উঠতেই না দেওয়া, যা একটি বিকাশশীল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পক্ষে লজ্জার
কোনও একটা গোষ্ঠী বা সম্প্রদায় ভোটব্যাঙ্কে পরিণত হওয়ার অর্থই হল সেই বিশেষ গোষ্ঠীটি এমন কোনও বাধ্যবাধকতার মধ্যে আছে যা তাদের যূথবদ্ধ থাকতে বাধ্য করছে এবং সেই কারণেই ভোটের মতো একটা ব্যক্তিগত পছন্দের ব্যাপার সমষ্টিগত পছন্দে পরিণত হচ্ছে। আর এই বাধ্যবাধকতাকেই ব্যবহার করছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলো। দেশভাগের পর থেকেই এক-একটি বিশেষ গোষ্ঠী এই বাধ্যবাধকতায় দিন কাটাচ্ছে। কিন্তু সম্প্রতি আইডেন্টিটি পলিটিক্সের নব উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে ভোটব্যাঙ্কের পুরনো ধারণায় বদল এসেছে। এখন ইউরোপ-আমেরিকা থেকে ভারত, সমস্ত জায়গাতেই পপ্যুলিস্ট রাজনীতির একটা অন্যতম অস্ত্র মেরুকরণ। তা হতে পারে ধর্মীয়, এথনিক, লিঙ্গভিত্তিক ইত্যাদি নানারকমের। ২০১৬-তে ডোনাল্ড ট্রাম্পের উত্থানের পেছনে প্রধান শক্তি হিসেবে কাজ করেছে অভিবাসী সমস্যাকে আমেরিকার সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে তুলা ধরা। অভিবাসী শ্রমিকরা বিভিন্ন দেশ থেকে এসে আমেরিকার ‘আসল’ অধিবাসীদের চাকরিতে ভাগ বসাচ্ছে এবং তাদের দীর্ঘলালিত সাংস্কৃতিক পরিচয়কে নষ্ট করছে, এই ছিল তাদের প্রধান অভিযোগ। অর্থাৎ চাকরি হারানোর বা না-পাওয়ার মূল কারণ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে তার জন্য একটি বিশেষ গোষ্ঠীকে দাগী বলে চিহ্নিত করা হল। পুঁজিবাদের সংকট থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায় হিসবে ডানপন্থীদের প্রধান অস্ত্র এখন পরিচয়বাদী রাজনীতি।
একইরকমভাবে আমাদের দেশেও চরম ধর্মীয় মেরুকরণ ঘটিয়ে প্রতিটি সম্প্রদায়কে এক-একটি ভোটব্যাঙ্কে পরিণত করা হয়েছে; সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার ভোটে যার প্রতিফলন ঘটেছে। সুতরাং আধুনিক ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী মানুষ আবার সমষ্টিগত পরিচয়কেই প্রধান হিসেবে দেখতে শুরু করেছে, অন্তত ভোটের ক্ষেত্রে।

এই নতুন পরিস্থিতিতে নারীরাও তাদের স্বতন্ত্র পরিচয় ও দাবিদাওয়া নিয়ে সোচ্চার। নারী হিসেবে তাদের যে বঞ্চনা সেই বঞ্চনার বোধই তাদের একত্র করেছে। শ্রেণিভেদে তার রকমফের থাকলেও মিলের ক্ষেত্রও আছে অনেক। এই জায়গা থেকেই নারীবাদী আন্দোলন গড়ে উঠেছে। এদের প্রধান দাবি সমাজে নারী ও পুরুষের মধ্যে বৈষম্য দূর করা। নারীসমাজের এই ক্ষোভের জায়গা থেকেই হোক কিংবা নারীদের বিশেষ প্রবণতার (সংসার ও সন্তানের উপর কিছু নেই) কথা ভেবেই হোক, পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মেয়েদের হাতে প্রতি মাসে কিছু টাকা পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। যদিও প্রথমে এই টাকার পরিমাণ খুব কম ছিল কিন্তু তাতেও দেখা গেল মেয়েরা বেদম খুশি। যদিও এর আগে ছাত্র-যুব, ক্লাব, স্বনির্ভর গোষ্ঠী এবং সমাজের আরও নানা প্রান্তিক গোষ্ঠীকে তিনি ভাতা দেওয়া শুরু করেন; এমনকি ইমাম এবং চাপে পড়ে পুরোহিত ভাতাও চালু করেন। তবে কন্যাশ্রী এবং লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের মতো সফল বোধহয় আর কিছু হয়নি।
তিনি ছাত্র যুব, ক্লাব, স্বনির্ভর গোষ্ঠী, সম্প্রদায় সবাইকেই ভোটব্যাঙ্ক হিসেবে নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন। যদি অবশ্য আমরা আর্থিক অনুদান দেওয়াটাকে ভোটব্যাঙ্ক করার প্রধান শর্ত হিসেবে দেখি। মুসলিম ভোটব্যাঙ্কের ব্যাপারটা অবশ্য আলাদা, ওখানে অন্য হিসেব— সংখ্যালঘু তাস। কেউ নিরাপত্তা দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে, কেউ বা নিরাপত্তাহীনতার ভয় দেখিয়ে গোটা মুসলিম সমাজকে কিনে রাখতে চায়। তাদের জন্য আর কিছু লাগে না, শুধু নিজের দেশে বেঁচে থাকার অধিকারটুকু ছাড়া। তবে মুসলিম ছাড়া অন্যান্য যে ভোটব্যাঙ্কগুলো তৈরির চেষ্টা হয়েছে তাদের মধ্যে সবচেয়ে সফল মহিলা ভোটব্যাঙ্ক। এই ভাবনার মধ্যে দূরদর্শিতা আছে যে মহিলাদের হাতে টাকা দিলে তা সংসারের কাজে লাগবে, সন্তানের কাজে লাগবে, টাকাটা আর অপচয় হবে না। যখন ভাতা বা ভিক্ষা ইত্যাদি বলে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারকে আমরা তথাকথিত বুদ্ধিজীবীরা হ্যাটা করেছি, তখন মাঝেমধ্যে এক-একটা অভিজ্ঞতা চিন্তায় ফেলে দিয়েছে। মনে হয়েছে, আমাদের ভাবনায় একটা বড় ফাঁক থেকে যাচ্ছে। হয়তো বাস্তবের সঙ্গে সংলগ্নতার অভাব এর প্রধান কারণ। একদিন টোটোয়ে চেপে কর্মস্থল থেকে ফিরছি, দুজন মহিলা উঠলেন মাঝরাস্তায়, শাশুড়ি-বৌমা। দুজনেই যাচ্ছেন কাছের ব্যাঙ্কে, লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের টাকা তুলতে। জিজ্ঞেস করলাম, কী করবেন এই টাকা দিয়ে? বৌমা বললেন, মেয়ের টিউশনের টাকাটা আমিই দিই। ওর বাবা দিতে পারে না। বলে বন্ধ করে দাও পড়া। মেয়েকে অত পড়িয়ে কী হবে? সেই তো গরু-জমি বিক্রি করে বিয়ে দিতে হবে। কিন্তু আমি মেয়েকে পড়াতে চাই, ওর মাথা ভালো। আমার খুব ইচ্ছে, ও আপনাদের মতো দিদিমণি হোক। আমি দমে না নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, সরকার যে এই টাকাটা আপনাদের দিচ্ছে এটা তো ভিক্ষা, নিতে আপনাদের খারাপ লাগে না? “আপনারা অনেক রোজগার করেন, আপনাদের এরকম মনে হতে পারে, আমাদের অবস্থা আপনারা বুঝবেন না। আর আমরা তো মনে করি এই সরকার এটা আমাদের মর্যাদা দিচ্ছে। এই প্রথম আমরা গরিব মেয়েরা মেয়ে বলে একটা মর্যাদা পাচ্ছি। আমরা যে সংসারে এত গাধার খাটুনি খাটি, কোনওদিন স্বামী দুটো টাকা হাতে তুলে দিয়ে বলে, রাখো, এটা নিজের মতো খরচ করো? স্বামীর রোজগারে আমাদের কোনও অধিকার আছে? আমরা তো বিনে পয়সার চাকরানি,” বলল সে বউটি। গালে একটা সপাটে চড় খেলাম যেন। উচ্চশিক্ষা আর আত্মমর্যাদার অভিমান নিয়ে কত সহজে কত কিছুকে নাকচ করতে পারি। যাকে ভিক্ষা ভেবে হতচ্ছেদ্দা করেছিলাম, তাই একজন নিম্নবিক্ত মহিলাকে আত্মমর্যাদা এনে দিয়েছে। এই টাকাটাকে সে নিজের উপার্জন, মহিলা হওয়ার সম্মান বলে ভাবছে এবং সবচেয়ে বড় কথা, টাকাটা সে নিজের ইচ্ছেমতো খরচ করতে পারছে।
সরকারি প্রচারে অবশ্য একে বরাবরই নারীর ক্ষমতায়ন হিসেবেই দেখানো হয়েছে। বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, এর কিছুটা অন্তত সত্যি। কিন্তু এই অর্থ তো তারা উপার্জন করছে না। অর্থাৎ কোনও সামাজিক শ্রমের বিনিময়ে সে এটা অর্জন করছে না। তাহলে এই প্রাপ্তিকে কীভাবে দেখব? এর উত্তর লুকিয়ে আছে মহিলার ক্ষোভের মধ্যে। সংসারের জন্য গাধার মতো খাটি। তাহলে কি একে তারা গৃহশ্রমের মর্যাদা হিসেবে দেখছে? অনেকটা যে তাই, তা বোঝা যায় মধ্যবিত্ত গৃহবধূদের কথা থেকেও। তারা যে যথেষ্ট পরিশ্রম করেও কোনও মূল্য বা মর্যাদা পায় না, এটা তাদের একটা খুবই দুঃখের জায়গা। লক্ষ্মীর ভাণ্ডার হয়তো তাদের সেই ক্ষতে কিছুটা প্রলেপ দিয়েছে। কিছুটা স্বীকৃতি, কিছুটা মর্যাদা তারা পেয়েছে। আমি কোনও কোনও মহিলাকে জিজ্ঞেস করেছি, তোমার স্বামী তো চাকরি করে, তুমি কেন এই টাকা নিচ্ছ? সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দেয় তারা— স্বামীর টাকা স্বামীর, কিন্তু এই টাকা আমার। আমরা নিশ্চিত করে বলতে পারি না যে সত্যিসত্যিই নারীর আত্মমর্যাদা জাগানো সরকারের উদ্দেশ্য ছিল কিনা। কিন্তু এর ডিভিডেন্ড সরকার রীতিমতো পেয়েছে। এবং সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে বর্তমান সরকারের ক্ষমতায় আসার পেছনেও কিন্তু মহিলা ভোটব্যাঙ্কের একটা বড় অবদান আছে। এই সরকার নীতিগতভাবে যাই বিশ্বাস করুক না কেন, পশ্চিমবঙ্গের ভোটে তাদের গুচ্ছ গুচ্ছ উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিতে হয়েছে। তার মধ্যে ‘অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার’ অন্যতম। বিহারের ভোটেও আমরা দেখেছি মহিলা ভোটব্যাঙ্ক অটুট রাখার আপ্রাণ চেষ্টা।
তাহলে কি আমরা ধরে নেব যে সার্বিকভাবে মহিলাদের অবস্থার উন্নতির ব্যাপারে সত্যিই সরকারের সদিচ্ছা আছে? নাকি মোট জনসংখ্যার অর্ধেক অংশকে হাতে রাখার এটা একটা কৌশলমাত্র? যদি তা না হত তাহলে কি পার্ক স্ট্রিট বা কামদুনি নিয়ে মহিলা মুখ্যমন্ত্রীর মুখ থেকে এমন অসংবেদনশীল কথা শোনা যেত? আরজিকরের মতো ঘটনা যা সারা দেশকে তোলপাড় করে দিল, তাকে ধামাচাপা দিতে এতটা সক্রিয়তা দেখা যেত? সরকারি চাকরিতে মেয়েদের জন্য কোনও সংরক্ষণের ব্যবস্থা হয়েছে কি? না, তেমন কোনও প্রকল্প সরকারের দিক থেকে আসেনি। সামগ্রিকভাবে এই ভাতা কি সমাজে মেয়েদের অবস্থানের কিছুটা পরিবর্তন ঘটিয়েছে? স্বীকার করতেই হবে যে ভাতার ফলে না হোক, স্বনির্ভর গোষ্ঠী চালায় যে মহিলারা, তাদের অবস্থার পরিবর্তন কিন্তু ঘটেছে। তারা কিছুটা স্বনির্ভর তো হয়েইছে। যারা স্বামী বা কোনও পুরুষ অভিভাবক ছাড়া চলতে পারত না, তারা দলের অন্য মেয়েদের উপর নির্ভর করতে শিখেছে, ব্যাঙ্কের কাজকর্ম করতে শিখেছে। এর ফলে তারা কিছুটা দলবদ্ধ হয়েছে।

যখন কোনও একটা গোষ্ঠী ভোটব্যাঙ্ক হিসেবে বিবেচিত হয়, তখন অবশ্যম্ভাবীভাবে ধরে নেওয়া হয় যে তারা দলবদ্ধভাবে কোনও একটা নির্দিষ্ট দলকেই ভোট দেবে। এই দলবদ্ধ ভোটকে নিশ্চিত করতেই ভোটব্যাঙ্ক তৈরি করে রাজনৈতিক দলগুলো। সেজন্য তারা সেই গোষ্ঠীটিকে নিজের দলের প্রতি অনুগত রাখতে বিভিন্ন কৌশল গ্রহণ করে। সংখ্যালঘুর ক্ষেত্রে সে কৌশল যেমন, মহিলাদের ক্ষেত্রে ঠিক সেরকম নয়। এক্ষেত্রে কিছু সুবিধে, বাসভাড়া মকুব বা ভাতা, নিরাপত্তা ও মর্যাদার বিনিময়ে স্বীকৃতি দেবে। বিনিময়ে তারা ওই দলটিকে ভোট দেবে। রাজনৈতিক দলটি ওই বিশেষ গোষ্ঠীটিকে তাদের প্রতি এমনভাবে নির্ভরশীল করে তোলে যে দলের অনেক নীতির বিরোধী হয়েও তারা যেন কোনও অদৃশ্য কৃতজ্ঞতার দায়ে ওই দলের সঙ্গে বাঁধা পড়ে থাকে। তারা ভাবে, ওই দলটি ছাড়া তারা নিরাপদ নয়, আর কেউ তাদের রক্ষা করতে পারবে না। এই নিরাপত্তাবোধের অভাব বা ভয় তাদের কোনও বিশেষ রাজনৈতিক দলের অনুগত রাখে। আর এই জায়গাটাকেই ব্যবহার করে থাকে রাজনৈতিক দলগুলো। তাই লক্ষ্মীর জায়গায় অন্নপূর্ণার আশ্বাস দিতে হয়। শুধু সাম্প্রদায়িকতার কার্ডে চিঁড়ে ভেজে না।
কিন্তু কোনও দল যদি মনে করে ভোটব্যাঙ্ক মানেই অচল অনড় কোনও একরৈখিক বস্তু, তাহলে ভুল হবে। সবকিছুর উপরে মানুষ তো মানুষই, নইলে অভয়ার ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা মানুষকে বিশেষত মহিলাদের প্রচণ্ড বীতশ্রদ্ধ ও হতাশ করে কেন? এমন কথাও অনেককে বলতে শুনেছি— ‘চাই না লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, মেয়েরা যদি না-ই বাঁচে, কী হবে টাকায়! সরকার কী মনে করেছে, টাকা দিয়ে আমাদের কিনে নিয়েছে?’ সবচেয়ে বড় কথা, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কোনও গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়কে ভোটব্যাঙ্ক হিসেবে দেখা বা ভোটব্যাঙ্ক করে রাখার অর্থই হল তাদের ব্যক্তিসত্তাকে অস্বীকার করা কিংবা তাদের ব্যক্তি হিসেবে গড়ে উঠতেই না দেওয়া, যা একটি বিকাশশীল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পক্ষে লজ্জার।


