অমর্ত্য বন্দ্যোপাধ্যায়
মিথোজীবী পুষ্টি হল এমন এক ধরনের পুষ্টি, যে পুষ্টি-ব্যবস্থায় ভিন্ন দুই জীব একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে বসবাস করে এবং একে অপরের থেকে উপকৃত হয়।
মানবসভ্যতাও এহেন মিথোজীবিতারই উদাহরণ। কেবল যে বাস্তুতন্ত্রে, পুষ্টি-সংক্রান্ত বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এমন মিথোজীবিতার দৃষ্টান্ত উঠে আসে তাই নয়, এর পাশাপাশি সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিসরেও এমন ব্যবস্থার প্রভূত নিদর্শন রয়েছে। সেই ভাবনা থেকেই হতাশার জন্ম। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের পর থেকেই যে কায়দায় সহনাগরিকদের একাংশ অপর সহনাগরিকদের প্রতি লাগাতার বিষোদ্গার করে চলেছেন— বিশেষত, উচ্চ-মধ্যবিত্তদের তরফে নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তদের প্রতি যেন এতকালের জমে থাকা পূঞ্জীভূত ক্ষোভ ও বিরক্তির উদ্গীরণ প্রকাশ্যে উঠে আসছে, তা ক্রমশই প্রত্যেক সচেতন নাগরিকের কাছে অস্বস্তিকর ও পীড়াদায়ক হয়ে উঠেছে। আমি এখানে রাজনৈতিক বিশ্বাসের কথা আনছি না। ধর্মপরিচয় ও আর্থিক শ্রেণির নিরিখে সমাজের মাঝামাঝি যে আড়াআড়ি একটি বিভাজন ক্রমশ তৈরি হচ্ছে, সেই ভাগের কারণে উচ্চবিত্তেরা আপাতত রেহাই পেলেও, উচ্চ-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি যে উচ্ছ্বাসের ফানুসে আকাশবিহারে মেতেছেন, অদূর ভবিষ্যতের নিরিখেই, তাদেরও আশু অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হতে হবে বলে আমাদের আশঙ্কা। কঠিন থেকে কঠিনতর এই সময়ে পরস্পরকে আরও বেঁধে বেঁধে রাখার পরিবর্তে আমরা সার্বিক অপরায়নের প্রক্রিয়াতেই গা ভাসিয়েছি, এবং এর অনাগত বিপদ সম্পর্কে আমাদের অধিকাংশেরই কোনও ধারণা নেই।
পরিবেশ দিবসের আলোচনায় প্রাকৃতিক পরিসরে মিথোজীবিতার উল্লেখ কার্যত বাধ্যতামূলক। বিরাট এই বাস্তুতন্ত্রে এহেন মিথোজীবিতার মাধ্যমেই সমস্ত প্রজাতির বিকাশ ও পুষ্টি ঘটে। সেই সূত্রেই, নাগরিক সমাজেও মিথোজীবিতার অস্তিত্ব ও তার গুরুত্ব প্রসঙ্গে নিবন্ধের সূচনায় দু-এক কথা বলা জরুরি বোধ করেছি। প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রে কীভাবে একেকটি প্রজাতি আরেক প্রজাতির উপর নির্ভরশীল হয়ে জীবনধারণ করে, সেই বিষয়ে আমরা বিবিধ উদাহরণ দেখেছি। তবু এক সাম্প্রতিক গবেষণায় এমনই এক আশ্চর্য উদাহরণ আলাদা করে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
ইথিওপিয়ার শহর হারার। এই শহরের বাসিন্দাদের কয়েকজন আজও এক অদ্ভুত পেশার সঙ্গে জড়িয়ে। এই পেশার উত্তরাধিকার সরাসরি পেরিয়ে এসেছে কয়েক প্রজন্মের ব্যবধান। এমনকি সন্ধানে জানা গেছে, কোনও কোনও ক্ষেত্রে এমন এক অদ্ভুত সহাবস্থানের ইতিহাস পেরিয়ে এসেছে প্রায় পাঁচশো বছর অথবা তারও বেশি সময়! সভ্য মানুষ ও অরণ্যচারী হায়নাদের এ এক অবাক মিথোজীবী সম্পর্কের ইতিহাস।
স্ক্যাভেঞ্জার বার্ড, এই বিশেষণেই আমরা কাক-চিল-শকুন প্রভৃতি পাখিদের ভূষিত করে থাকি। খাস কলকাতায় আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে চিলেদের আনাগোনা তবু নজরে এলেও, শকুনেরা বহুদিনই অদৃশ্য। শহরের প্রান্তে খোলা ডাম্পিং গ্রাউন্ড চত্বরে হয়তো এখনও তাদের অল্পবিস্তর যাতায়াত দেখা যায়। শহুরে প্রাকৃতিক বর্জ্য নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে এমন স্ক্যাভেঞ্জার পাখিরা যথেষ্টই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই ভূমিকার বাস্তব প্রভাব নিয়ে নিবিড়, তথ্যনির্ভর গবেষণা প্রয়োজন। (বিশেষত এই সূত্রে বেলঘরিয়া অঞ্চলের উন্মুক্ত ডাম্পিং গ্রাউন্ডটির অবস্থান মনে পড়ছে। জনবসতির এত কাছাকাছি এমন এক উন্মুক্ত বর্জ্য অঞ্চলের উপস্থিতি নাগরিক স্বাস্থ্যের পক্ষে এক চূড়ান্ত ক্ষতিকর বিজ্ঞাপন।)
গবেষকেরা লক্ষ্য করেছেন আফ্রিকা মহাদেশের অন্তর্গত ইথিওপিয়ায় অরণ্যচারী হায়নাদের দল একাধিক শহরের প্রাকৃতিক বর্জ্য নিয়ন্ত্রণে বহুকাল যাবৎ এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এসেছে। এর পাশাপাশি, হয়তো এক অবাক মিথোজীবিতার উদাহরণস্বরূপ, সেই সব শহরের নাগরিক সমাজের বিশেষ একাংশের সঙ্গেও সেই অরণ্যচারী হায়নাদের এক পারস্পরিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। বাস্তুতন্ত্র বিশারদ ডঃ গিদে ইরগা গত পনেরো বছর ধরে ইথিওপিয়ার এহেন ‘শহুরে’ হায়নাদের বিষয়ে নিরন্তর গবেষণা করে চলেছেন। তাঁর গবেষণায় তিনি লক্ষ্য করেছেন, ক্রমশ যতই আফ্রিকার নগরায়ন সম্পন্ন হচ্ছে ততই শহরের প্রান্তিক পরিসরে অরণ্যচারী হায়নাদের দল সংঘবদ্ধ হচ্ছে। রাতের অন্ধকারে তারা নিজেদের আস্তানা থেকে বেরিয়ে শহরের জঞ্জাল ফেলার জায়গাগুলিতে হানা দিচ্ছে। তিনি দেখেছেন, এহেন হায়নাদের সমাজ যূথবদ্ধ ও মাতৃতান্ত্রিক; আর তাদেরই সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপিত হচ্ছে শহরের প্রান্তিক মানুষদের। ইরগা তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন, ইথিওপিয়ার মেকেলে শহরে অরণ্যচারী হায়না ও রাস্তার সারমেয়কুলের মিলিত কার্যকলাপের কারণে বছরে প্রায় ৫০০০ মেট্রিক টন প্রাকৃতিক বর্জ্য পদার্থ শোধিত হয়! এর ফলে শহরের পুর-খরচে সাশ্রয়ের পরিমাণ প্রায় এক লক্ষ মার্কিন ডলার! স্পটেড হায়নারাই মোট এই বর্জ্য পদার্থের প্রায় ৯০ শতাংশেরও বেশি পরিমাণ অংশ পরিষ্কারের দায়ভার নিয়ে থাকে। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, এই বিপুল পরিমাণে বর্জ্য পদার্থ, প্রধানত খাদ্যবস্তু হিসেবে গ্রহণের মাধ্যমে হায়নারা পরিষ্কার করে বলে, এহেন স্তূপীকৃত প্রাকৃতিক বর্জ্য থেকে কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ কমে। খোলা পরিসরে প্রাকৃতিক বর্জ্য পচনের সম্ভাবনা হ্রাস পায়। এমনকি যক্ষা, অ্যানথ্রাক্স-সহ নানাবিধ প্রাণঘাতী অসুখেরও প্রকোপ কমে আসে। একটি সমীক্ষায় মেকেলে শহরের সাধারণ মানুষও তাঁদের পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্র রক্ষায় হায়নাদের এমন ভূমিকার কথা মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করেছেন।

যদিও, দীর্ঘ সময় ধরে চলে আসা এই গবেষণায় ইরগা নিজেও লক্ষ করেছেন স্থান ও কালভেদে এমন সহাবস্থান কোনও কোনও ক্ষেত্রে বাধার সম্মুখীন হয়েছে। সর্বক্ষেত্রে মিথোজীবিতার স্পষ্ট উদাহরণ দেখা যায়নি। বিশেষত টাইগ্রে-র যুদ্ধের পর সে অংশের হায়নারা যুদ্ধ ও দুর্ভিক্ষের কারণে নরমাংসের প্রতি আকৃষ্ট হয়। পাশাপাশি দুর্ভিক্ষ ও যুদ্ধপীড়িত মানুষেরা কখনও-সখনও তাদের সহজ লক্ষ্য হয়ে ওঠে। হারার শহরে আবার মানুষ ও হায়নার মিথোজীবিতার এক সর্বোৎকৃষ্ট উদাহরণ উঠে আসে। প্রাচীন শহরগুলির নিরিখে ইউনেস্কোর তালিকাভুক্ত শহর হারার। ইথিওপিয়ার এই শহরে মানুষ ও হায়নার সহাবস্থানের ইতিহাস পেরিয়ে এসেছে প্রায় পাঁচ শতক।
শহরের চারপাশ ঘিরে ষোড়শ শতাব্দীতে গড়ে ওঠা যে দেওয়ালের অংশগুলি এখনও বিদ্যমান, সেই সব দেওয়ালের নিচেও খোঁদলের আকারে একেকটি করে গর্তের উপস্থিতি লক্ষ করা গেছে। ইতিহাস বলে, প্রাচীন সময় থেকেই এই সব খোঁদলের সাহায্যে নিশাচর হায়নারা শহরের ভিতরে প্রবেশ করত। রাস্তার উপর বা নোংরার ভ্যাটে কসাইদের ফেলে যাওয়া মাংসের টুকরোতেই তাদের ক্ষুধানিবৃত্তি হত। সচেতনভাবে নিজেদের পালিত পশুপাখিকে রক্ষা করতে হায়নাদের জন্য নাকি স্বেচ্ছায় এমন মাংসের টুকরো ছড়িয়ে রাখারও প্রচলন ছিল। এই সম্পর্কের কারণে প্রাকৃতিক অন্যান্য বর্জ্য নিয়ন্ত্রণেও হায়নাদের উপস্থিতি কার্যকরী হয়ে উঠত। সেই সঙ্গে বহু প্রজন্ম ধরেই এই হারার শহরে থেকে গিয়েছেন এমন এক পেশার সঙ্গে জড়িত কিছু মানুষ, যাঁদের গবেষক ইরগা তাঁর গবেষণায় হায়না-ম্যান অথবা হায়না-মানব হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এই হায়না-মানবেরা সরাসরি রাতের অন্ধকারে হায়নাদের কাছাকাছি গিয়ে উপস্থিত হন এবং কার্যত নিজে হাতে হায়নাদের মাংস পরিবেশন করেন। এর ফলে তাঁরা যেন, নিজেদের বৃহত্তর সমাজের সঙ্গে অরণ্যচারী হায়নাদের এই পারস্পরিক সম্পর্ককে লোকায়ত স্বীকৃতি জানান। হায়নারাও সেই মিথোজীবিতার ডাকে সাড়া দেয়। সাম্প্রতিক প্রজন্মের হায়না-মানবেরা উৎসাহী পর্যটকদেরও কখনও-সখনও এমন প্রথার সরাসরি প্রত্যক্ষদর্শী হতে আহ্বান জানান। হারার শহরে হায়না-মানবেরা তাঁদের এলাকায় প্রায় কিংবদন্তিসম গুরুত্ব পেয়ে থাকেন। এঁরা একেকজন অরণ্যচারী হায়নাদের নিজেদের দেওয়া নাম ধরে অবধি সম্বোধন করেন। হায়নারাও তাঁদের সেই ডাক শুনে ক্রমশ সহজ হয়ে আসে।

হারার শহরের মানুষেরা বিশ্বাস করেন কেবল বাহ্যিক পরিবেশ বা বাস্তুতন্ত্রের পরিচ্ছন্নতাই নয়, আত্মিক শুদ্ধির দূত হিসেবেও তাঁদের শহরে হায়নাদের আগমন ঘটে। সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করেন কেবল প্রাকৃতিক বর্জ্যপদার্থই নয়, তার পাশাপাশি দুষ্ট জিনেদেরও এই হায়েনারা নাকি সটান গলাধঃকরণ করে। এরফলে জিন-দৈত্যদের উৎপাত থেকে শহরের মানুষ রক্ষা পায়। স্থানীয় ভাষায় তাঁরা তাই হায়নাদের ‘ওয়ারাবা’ অথবা ‘পরকালের দূত’ হিসেবে বর্ণনা করেন।
কিন্তু, কাক-চিল অথবা শকুনের মতোই, হায়নাদের পরিচিতিও যে অরণ্যচারী, এক কুৎসিত বীভৎস রূপেই গড়পড়তা মানুষের কাছে স্বীকৃত হয়ে রয়েছে। তাই শকুন অথবা হায়না-সংরক্ষণের প্রসঙ্গ কোথাও তেমন গুরুত্ব পেয়ে উঠতে পারে না। মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতেই আজ বদল আনা প্রয়োজন। ঠিক যেভাবে অনায়াস ঔদাসীন্যে শ্রেণিবিশেষ থেকে উঠে আসা সহ-নাগরিকদের প্রতি আমাদের এক উন্নাসিক অবজ্ঞা, একইরকমে গুবলুস পাণ্ডাভালুক অথবা রাশভারী রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার সংরক্ষণে মানুষের উৎসাহ যত না— শকুন, হায়না অথবা সমতুল প্রজাতির প্রতি তেমন সহানুভূতি অথবা আর্থিক বরাদ্দের ছিটেফোঁটাও অবশিষ্ট থাকে না। এমন প্রজাতিদের সংরক্ষণের প্রশ্নে তাই, বারেবারেই প্রকল্পে বরাদ্দ-ঘাটতির পরিস্থিতি তৈরি হয়। বাস্তবিকই আমাদের ‘শোচ’ বদলানো জরুরি।
সূত্র: https://edition.cnn.com/world/africa/bone-crushing-hyenas-cleaning-ethiopian-streets-spc
চিত্রঋণ: আন্তর্জাল

