স্মৃতি-বিষাদ-স্বপ্ন ও কাফকার সঙ্গে সান্ধ্যভ্রমণ

কাঞ্চন দাস

 

ব্যপারটা কদিন ধরেই লক্ষ করছিল সন্দীপ। তাদের নন-গভর্নমেন্ট হাউসিং এস্টেটে এত অজস্র কুকুর ঘুরে বেড়ায় যে আজকাল শয়নে স্বপনে কুকুর ছাড়া কিছুই চিন্তা করতে পারে না সে। কথাটা এভাবেই বলা যায় যে ‘কুকুর’ নামক একটি জন্তু তার চিন্তাশক্তির একশো মাইল অঞ্চল দখল করে ফেলেছে। খাবার টেবিলে বসে জানালা দিয়ে বাইরে থাকতেই হয়, আর তাকালেই কুকুরের গড়াগড়ি খুনসুটি অশ্লীলতা বেআব্রু উদ্দেশ্যবিহীন ঘুরে বেড়ানো-হিংস্র ক্রূরতা দাদাগিরি— আরও আরও কত কি! পর্দা টেনে চোখে মুখে জল দিয়ে দরজা ঠেলে ব্রিফকেস হাতে সিঁড়িতে পা দিতেই ছানাপোনা শুদ্ধু মাদি কুত্তা, অফিস থেকে ফিরে খেয়েদেয়ে বিছানার উপর শরীর ছড়িয়ে দিয়ে চোখ বুজতেই বাজখাঁই গলার কুত্তাটা ডেকে ওঠে— একজন দুজন করে বাড়তে বাড়তে হাউসিং-এর সমস্ত কুকুর গলা ছেড়ে চিৎকার করতে থাকে— দলাদলি মারামারি। ঘুম আসে আর ভেঙে যায়। এইভাবে যাওয়া আসা করতে করতে ঘুমের রাজকন্যা যখন সন্দীপের চোখে এসে ঠোঁট রাখেন তখন বাস্তবের কুকুররা উঠে আসে স্বপ্নের জগতে। স্বপ্ন জুড়ে তাদের রাজত্ব, একদিন এইভাবে সন্দীপের মাথায় কয়েক লক্ষ কুকুর সারারাত জুড়ে তাণ্ডব চালায় এবং সকালে ঘুম ভেঙে গেলে সন্দীপ দেখে কোমরের নীচ থেকে সে কুকুর হয়ে গেছে— একটু পাশ ফিরতেই লাফিয়ে ওঠে লেজটা। স্বপ্ন নয় তো! চোখ রগড়ে বিছানা থেকে নেমে হাতে চিমটি কেটে দেখে, নাঃ তার মনের ভুল। কাজের মেয়েটা এখনও আসেনি, আজ একটু সকাল সকালই ঘুম ভেঙে গেছে, ঘড়িতে সাড়ে পাঁচটা। মেয়েটা আসে ছটায়। ঘরগুলো ধুয়ে মুছে বাসন কটা মেজেই ‘আসছি দাদাবাবু’ বলে সেকেন্ড ফ্লোরের বারীনবাবুদের রুমে। দিনে চার পাঁচটা বাড়ির কাজ। দম ফেলার সময় নেই মেয়েটার। চেহারাটাও দেখবার মতো। শ্যামবর্ণ, চোখগুলো টানাটানা, মাদকতা মেশানো। কিন্তু কিছু বলবার কেউ সাহস পায় না। সেবার সন্দীপ ঝুলবারান্দার টবে জল দিতে দিতে দেখেছিল নীচে ‘এল-আই-জি’-র দাদাগোছের একটা মস্তানকে, নামটা বোধহয় টুবুন— কথাকাটাকাটির পর সোজা একটা থাপ্পর মারতে ছেলেটা হতচকিত হয়ে বাইকশুদ্ধু পড়ে যাচ্ছিল— সামলে নিয়ে টুনির হাত ধরতে গেল। কী একটা বলছিল দাঁত কিরমির করে। সন্দীপ অবাক হয়ে দেখল টুনি চকিতে একটা রিভলবার তুলে নিল মস্তানটার কোমর থেকে তারপর সোজা এক লাথি— দুর্গা, না লেডি টারজান! মুখের কাছে হাত নিয়ে ডাকল ‘এই নেপিদা…’ বাইকের চাকাটা ঘুরছে, মস্তানটা পা আটকে বাইকশুদ্ধু পড়ে গেছে, কোনওমতে সেটাকে উঠে খোঁড়াতে খোঁড়াতে স্টার্ট দিয়ে ‘দাঁড়া রেন্ডির বাচ্চা, বস্তির বাইরে চল……’ বলে ফুল স্পিডে হাওয়া। সামনের ফ্ল্যাটের তিনতলার জানালায় তাকিয়ে দেখল পাঁচ ছটা জানালার পর্দা নিঃশব্দে সরে গেছে। দুজন ওদিকের ফ্ল্যাটের লম্বা বারান্দায় এসে দাঁড়াল কাক তাড়াবার ছুতোয়। মিসেস সোমদের বাথরুমের জানালাটা বুজে গিয়ে একটা সরু ফালিপথ হয়ে রইল দুটো পাটের মাঝখানে। ছেলেটার সম্বন্ধে খুব বেশি ধারণা নেই সন্দীপের। তবে হাউসিং–এর লোকেরা সমীহ করে, সেটা ভালোবাসায় না ভয়ে সে বিষয়ে সন্দেহ হয়। টুনিদের বস্তিতেই তো পড়ে থাকে দিনরাত। ওর সবকিছুই কেমন রহস্যে ঢাকা। ছুটির দিনে সন্দীপ লক্ষ করেছে ওকে বেলা বারোটায় ব্রাশ করতে— একটার সময় হাউসিং-এর গেটে এক কাপ চা নিয়ে জটলা করতে। রাত্রি আড়াইটায় গোটা হাউসিং যখন তন্দ্রাচ্ছন্ন তখন ওদের কিচেনরুমে হাতাখুন্তির আওয়াজ, লাইট অফ হতে হতে তিনটে, ছেলেটার প্রতিদিনকার রুটিনই বোধহয় ওরকম। একবার রজত ওই নেপিকে দেখিয়েই সাবধান করে দিয়েছিল ‘কথা বললে তুমি বুঝতেও পারবে না সন্দীপদা, ও কী জিনিস! খবরদার ঘরে ঢুকিও না।’ রোগা পাতলা চেহারা, কী আর বয়স হবে! সন্দীপ ওকে বরাবর এড়িয়ে থাকে, লম্বা চওড়া কথা। তবে মাঝে মাঝে ওদের বাড়ি থেকে একটা মিষ্টি গম্ভীর সুর ভেসে আসে। শব্দটা সরোদের, দু একবার এই শহরের একজন বিখ্যাত পরিচালকের সঙ্গে লেবার রুমে নেপি আর ওর বাবাকে কী একটা আলোচনা করতে দেখেছিল সন্দীপ— লোকটি একাধারে ডাইরেকটর এবং ডাকসাইটে প্রমোটার। আর একজনকে মাঝে মাঝেই দেখা যায় সোনার চেন গলায় মোটরবাইকে ঘুরে বেড়াতে, বোধহয় নেপির ভাই— কী করে ছেলেটা! তাহলে যে বিবাহিত মহিলাটি জুলজুল করে ফাঁক পেলেই জানালায় এসে রাস্তার ছেলেগুলোকে দেখে সেটা ওই ভাইয়েরই বউ! হবে হয়তো। আর একজন পড়ন্ত বিকেলের মতো মুখ নিয়ে চোখে হাইপাওয়ারের চশমা পড়ে খুব বিষণ্ণভাবে চারিদিকে তাকায়, তিনি কি ওদের মা! ফ্যামিলিটাকে ঠিক বুঝে উঠতে পারে না সন্দীপ, ধন্দে পড়ে যায়। অত সব জেনে দরকার কী! হাউসিং-এর কেউ কারও ব্যপারে মাথা ঘামায় না, যদিও কৌতূহল আকাশছোঁয়া। আর হাউসিং-এর চত্বরে কেউ যদি এসে পড়ে তাকে ধরেই নিতে হবে যে অদৃশ্য এক সুপ্রিমকোর্টের মাঝখানে সে এসে পড়েছে এবং আসামির কাঠগড়াতে তাকে দেখা না পর্যন্ত এবং ফাঁসি না হওয়া পর্যন্ত কারও শান্তি নেই।

সন্দীপ সেদিন গলার টাই বাঁধতে বাঁধতে জিজ্ঞাসা করে, ‘হ্যাঁরে টুনি, তুই সেদিন মস্তানটাকে ওরম হেনস্থা করলি, তোর কোনও বিপদ হয় যদি।‘ টুনি ঘর মোছার বালতিটা টেনে নিয়ে মুখে একটা ইঁদুরের মতো তাচ্ছিল্যের ‘চিক’ আওয়াজ করে বলে— ‘ছাড়ো তো! ওটা এলআইজি-র ছুঁচো, বেশি কিছু করলে চালিয়ে দেব।’ ‘চালিয়ে দিবি মানে!’ সন্দীপ হাঁ হয়ে যায়— কী বলছে মেয়েটা! ‘মেশিন গো মেশিন, বিহারের মাল নেপিদা দিয়েছে। পাঁচবাড়ি যাই, কার মনে কী আছে, আর কী বলেছে জানো— ‘বাঁদরের মতো যেন টিগার টিপে দিস না, মেয়েদের যা বুদ্ধি!’ শালা হারামি কাঁহেকা, খুব ভালো ছেলে জানো!’ ‘ভালো ছেলে না ছাই, বড় বড় লেকচার খালি।’ টুনি হেসে বলে ‘তা যা কয়েচ, আমরা তো লেকচার মাস্টার বলি, কিন্তু নেপিদা ছাড়া এখানে চোখে সবাই আঁধার দেখে জানো! তুমি তো মাস চার হল এয়েচ— একদিন বুঝবে। পেথম পেথম নেপিদাকে সবাই গাল পাড়ে…।’ বলে এমন হেসে উঠল যেন সন্দীপকে এর মধ্যেই মেপে নিয়েছে। হাসলে টুনিকে বেশ দেখায়। এত তেজিয়ান চেহারার মেয়ে খুব একটা দেখা যায় না, ওর শরীরের বিভঙ্গ লক্ষ করে সন্দীপ— সে কথা কি টুনি বুঝতে পারে, তাই ‘মেশিন’-এর কথা ওভাবে জানিয়ে দিল— সবসময় ধন্দে পড়ে যায়।

কুকুরগুলো অকারণে আকাশের দিকে তাকিয়ে চেঁচাচ্ছে, ঝালাপালা লেগে যায় কানে। সব কিছু গুছিয়ে জুতোয় ফিতে বাঁধতে গিয়ে সন্দীপ টের পায় গলায় ঘর্ঘর আওয়াজ। কার সঙ্গে যেন মিল আছে আওয়াজটার। মনে পড়ে, বেপাড়ার একটা কুকুরকে এই পাড়ার কুত্তাগুলো ঘিরে ধরেছিল গত রবিবার। সন্দীপ একটা ফোন করে ফিরছিল। কুকুরটা ভয় পায়নি। ঠিক এইরকম ঘর্ঘর আওয়াজ করতে করতে দাঁত খিঁচিয়ে রাস্তা করে নিচ্ছিল। যে মাদিটার প্রলোভনে পড়ে সে এসেছিল দেখতে পেয়ে লেজ নাড়তে নাড়তে সেই সুন্দরী পাশে গিয়ে দাঁড়াতেই তার কি মেজাজ! ঘাড়ের লোম খাড়া করে একেবারে হিটলারি মূর্তি। সন্দীপ দাঁড়িয়ে পড়েছিল, লজ্জায় মাথাকাটা যাচ্ছিল। ছিঃ ছিঃ! একটা বেপাড়ার কুত্তার কাছে এতগুলো তরুণ তুর্কি ভয় পাচ্ছে! ঠিক সেই মুহূর্তে কোত্থেকে একটা যমদূতের মতো কালো কুত্তা ছুটে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল বেপাড়ার কুত্তার ওপর, সে কি তুলকালাম মারামারি। লঙ্কা কাণ্ড! অন্য কুকুরগুলোও যোগ দিল তার সঙ্গে। বোধহয় ওই ওদের লিডার। শেষে বেপাড়ারটা পালাতে পথ পায় না, কিন্তু মাদিটাকে তো আর দেখা যাচ্ছে না। খুশি মনে ফ্ল্যাটে ঢোকার মুখে সন্দীপ দেখে সিঁড়ির তলায় বসে বসে সে লক্ষ করছে কে তার প্রেমিক হবার উপযুক্ত। কেলোটাও দলবল নিয়ে খুঁজতে খুঁজতে চলে এসেছে। সন্দীপকে ঘিরে সবার সে কি লেজ নাড়ানাড়ি! কেলোর মাথায় হাত বুলিয়ে সন্দীপ বলেছিল— ‘সাবাস ব্যাটা, বাঘের বাচ্চা!’

 

অফিস

অনেক চেষ্টা করেও সন্দীপ এগারোটার আগে কিছুতেই অফিস পৌঁছতে পারে না। সাধারণত সবাই যায় সাড়ে দশটার মধ্যে, অন্তত তাদের বস্‌ আসার আগে। কিন্তু সন্দীপের সঙ্গে বসের এই নিয়ে তিনদিন দেখা হল লিফটে। রুমে ডেকে সেদিন প্রথমেই চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল— ‘হ্যালো মিস্টার গুহ, সিট ডাউন হিয়ার প্লিজ! আই হ্যাভ নো রাইট টু সিটিং ওভার দিস।’ রিভলভিং চেয়ারটা তখনও দুলছে, ‘নেক্সট মর্নিং, আই উইল কাম বিফোর ইউ্য’— সন্দীপ মাথা নিচু করে লেজ গুটিয়ে থাকে। ‘অল রাইট, চেক ইউরসেলফ অর অফিস ডোর ইজ অলওয়েজ ওপেন’…

‘ভেরি মাচ সরি স্যার’।

রেগে গেলে কুমারের গাল দুটো আপেলের মতো দেখায়, গতজন্মে বোধহয় ব্রিটিশ ছিল। ‘শালা আপেলের বাচ্চা’, সন্দীপ মনে মনে ভাবে।

‘ওকে। এবারকার মতো তুমাকে এক্সকিউজ কোরা হোলো— যাও। শুনো, ডোন্ট মাইন্ড।’ সন্দীপ প্রায় ঝাঁপ দিয়ে দরজা ঠেলে বাইরে বেরিয়ে আসে। তার দিকে না তাকিয়েই রঞ্জনদা বলে ‘সিট ডাউন সন্দীপ— রিল্যাক্স।’

রঞ্জনদা মিঃ কুমারের ম্যানেজার। সন্দীপকে ভালোবাসে, পাশে বসিয়ে বলে, ‘এখন নো কথা, তোমার সামনের ফাইলটা খুলে ডেটাগুলো এন্ট্রি করো।’

ঘন্টাখানেক পর বাইরে বেরিয়ে আসে কুমার। রঞ্জনদার সঙ্গে এক্সপোর্ট ফ্যাক্টরির কথাবার্তা বলে চলে অনেকক্ষণ। মাথা নিচু করে ডাটা এন্ট্রি করে সন্দীপ। কুমার একটা সিগারেট ধরিয়ে বলে ‘কাম’— তৎক্ষণাৎ উঠে দাঁড়াতে গিয়ে কাঁচের গ্লাসটা পড়ে যায় ঝনঝন করে। ওদিকের লম্বা করিডোরে টেবিল চেয়ার নিয়ে যে এমপ্লয়িরা বসে আছে, তারা ব্যপারটায় বেশ মজা পায়। রঞ্জনদা বলে ‘আমি দেখছি তুমি যাও।’ কুমারের ভ্রূক্ষেপ নেই। সোজা গটগট করে এগিয়ে যাচ্ছে মেন ডোরের দিকে। সন্দীপ তাড়াতাড়ি পা বাঁচিয়ে লেজ নাড়তে নাড়তে ফাইল হাতে কুমারের পেছন নেয়; কিন্তু ডোরের সামনে গিয়েই দাঁড়িয়ে যায় কুমার। দুজন তাঁবেদার গোছের লোক দরজা খুলে ভিতরে ঢুকতেই কুমার উচ্চগ্রামে তাদের সঙ্গে দুই হাত নেড়ে উত্তেজক কথাবার্তা আরম্ভ করে। ঘেউ ঘেউ ঘেউ ঘরর-র-ঘরর ঘেউ। ফাইল হাতে নিয়ে কী করবে ভেবে পায় না সন্দীপ। সন্দীপের ভীতুভীতু চোখ, নিজেকে আলাদা ও নির্জন করে রাখার অ্যাবনর্মালিটি এখানকার অন্য কর্মচারীরা বেশ এনজয় করে। দেখতে দেখতে দশ মাস হল। এখনও বসার চেয়ার নেই কোনও। তার চেয়ারটা আসলে অফিস পিওনের, সে লোকটা ঠেটিয়া; সন্দীপকে সে এই অফিসের যোগ্য বলেই মনে করে না। তার চেয়ারটাও ছাড়তে চায় না, তখন পায়চারি করতে হয় তাকে। রঞ্জনদার কিছু করার নেই। তবু সান্ত্বনা দেয় ‘সবুরে মেওয়া ফলে সন্দীপ, মাথা গরম করে ফেলো না।’ মেওয়াটা যে কি জিনিস তা জানে না সে, তবে মেওয়া খাওয়ার ফল যা দেখতে পাচ্ছে— তাতে বলা শক্ত যে সেটা অমৃত না বিষ। রঞ্জনদা বোধহয় বুঝতে পারে মনের কথা। ‘তবে এর চেয়ে ভাই ডিউটি আওয়ার্সের পুরো সময় যদি কান ধরে ওঠবোস করতে হত সেটা অনেক সম্মানজনক ছিল, বুঝতাম স্যালারি এগেন্সট লেবার।’

চল্লিশ মিনিট হয়ে গেল, কুমার যেমন হঠাৎ করে গরম হয়ে গিয়েছিল তেমন দুম করে ঠান্ডা হয়ে সন্দীপের দিকে ফিরে একটা পঞ্চাশ টাকার নোট পার্স থেকে বের করে বলল— ‘উইলস্‌।’ ফাইলটা সন্দীপের বাঁ হাতে ছিল। সেটা একবার ডান হাত আর একবার বাঁ হাতে তারপর আবার ভুল করে ডান হাতে, ভুল বুঝতে পেরে আবার বাঁ হাতে নিয়ে ডান হাতটা বাড়াল, কিন্তু কুমার টাকাটা শক্ত করে ধরে রেখে বিরক্ত হয়ে বলল— ‘হাউ ফুল আর ইউ! ফাইলটা নিয়ে এসেছ কেন!’ যে দুজন একটু আগে কুমারের অপমান মুখ বুজে সহ্য করছিল সুযোগ বুঝে তারা হেঁ হেঁ করে হেসে উঠল। সন্দীপের মনে পড়ল সেই কুকুরগুলোর কথা। আত্মসম্মানবোধ বিসর্জন দিয়ে স্রেফ একটা পরম্পরা মেজাজের কাছে কিংবা মাদিটার কৃতজ্ঞতা ও কৃতজ্ঞতাসঞ্জাত সান্নিধ্য এবং সান্নিধ্যের পথে ইন্দ্রিয়ের আদিম প্রবৃত্তির চরিতার্থতা অর্থাৎ স্বার্থসিদ্ধির নিয়তির কাছে তাদের সমস্ত স্বাধীনতাবোধ ও বিপ্লবকে যারা বিসর্জন দিয়েছিল।

কাচের দরজা ঠেলে বাইরে আসে সন্দীপ। কাচটা স্বচ্ছ নয়, ভেতরটা ঘোলাটে দেখায়। রঞ্জনদার মুখে মনে হচ্ছে কেউ এনামেল রং মাখিয়ে দিয়েছে, সুন্দরী রিসেপশনিস্টের দুটো নগ্ন পা এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে চলে গেল। গম্ভীর প্রকৃতির বিজন সরখেলকে সাদা জামা প্যান্টে রাজহাঁসের মতো দেখাচ্ছে।

নীচে নেমে সিগারেট নিয়ে আসে সন্দীপ। তারপর আবার টেবিলে বসে ডেটা এন্ট্রি করে লেজার বুকে তোলে। মৃদু হেসে রঞ্জনদা আবার একটা ফাইল ঠেলে দিয়ে বলে ‘একটা গুড নিউজ আছে।’ সন্দীপ মুখ তোলে, খুদ খুঁটতে খুঁটতে মুরগি যেমন মাথা তুলে দেখে সেরকম। ‘আগে ফাইল শেষ করো। তারপর বলছি।’ উৎসাহিত হয়ে দ্রুত হাত চালায়— আবার একটা ফাইল আসে বাসন্তী রঙের, পরেরটা সবুজ, তার পরেরটা ধূসর, তারপর নীল। মাঝে মাঝে খুদগুলো ছড়িয়ে দেয় রঞ্জনদা— ‘গুড নিউজ’— ফাইল আর শেষ হয় না— বয়স বাড়ে সন্দীপের, মাথার চুল পাতলা হয়, চোখে চশমা। পাহাড়ের নীচে বুড়ো ঝাউগাছের মতো দেখায় গাদা গাদা ফাইলের নীচে বসে থাকা সন্দীপকে। কিংবা ভগ্ন-স্তুপের মধ্যে একটা ঘুরঘুরে পোকা। ‘আই ফিল ইউ সন্দীপ, বাট মাইন্ড ইট, ‘স্বাধীনতা’ হচ্ছে একটা অদৃশ্য শব্দ, তাকে কোনও দিন ষোল আনা ছুঁতে পারবে না।’ সন্দীপ দেখে ডান হাতটা আর তার আয়ত্তে নেই…

 

ফুটপাথ

সাত নম্বর বাসের প্যাসেঞ্জাররা ভীড় করে দাঁড়িয়ে থাকে এসময়ে। কিন্তু আজ কী হয়েছে বাসটার, দশটা বাজতে দশেও তার দেখা নেই। ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙে গেলে ভীড় পাতলা হতে হতে দুজনে মাত্র ঠেকল, তাও একটা মিনি এসে দাঁড়াতেই উঠে গেল তারা। সন্দীপ একা তবু দাঁড়িয়ে থাকে। ফুটপাতের যে দিকটায় অন্ধকার থাকে সেখানে শেষ চুম্বন খেয়ে দুজন দুদিকে চলে যাচ্ছে। কামনা-বাসনা মেটাতে যারা সেই ভোরবেলা বেরিয়েছে কিংবা অফিস ছুটির শেষে অথবা স্কুল থেকে পালিয়ে এসে সারাদিন ভূতের মতো ঝোপঝাড়ে বসে কাটিয়েছে তারাও এতক্ষণ বাসের মধ্যে কিংবা ট্যাক্সিতে। সন্দীপ তবু দাঁড়িয়ে থাকে— কেন দাঁড়িয়ে থাকে সে নিজেও জানে না। বাসগুলো সাঁ সাঁ করে টার্মিনাল ঘুরে গিয়ে দাঁড়াচ্ছে ওদিকের স্ট্যান্ডে। যদিও সংখ্যাটা কমে আসছে, বাড়ছে ট্যাক্সি। অন্ধকারে সবই মনে হচ্ছে জ্বলন্ত চোখের মতো, সারা কলকাতার রাস্তায় যেন ছুটে বেড়াচ্ছে একপাল কুকুর কিংবা নেকড়ে কিংবা শেয়াল। টলতে টলতে যে ছেলেটা লাইটপোস্ট ধরে দাঁড়িয়ে গেল তাকে সন্দীপ চেনে। ছবি আঁকে। সাত কুলে কেউ নেই। হরিশ মুখার্জী রোডে খুপড়ির মতো একটা ঘর। ওর ঘরে গিয়েছিল একবার, চারিদিকে কাগজ, রং ছড়ানো। একপাশে স্টোভ, দুটো থালা বাটি, একটা তোবড়ানো গ্লাস আর জলের বোতল— কিন্তু জলের রংটা যেন কেমন কেমন। দুটো বাঁধানো ছবি ঝুলছিল দেওয়ালে, একটা ‘ভিনসেন্ট ভ্যান গঘের ‘আত্মপ্রতিকৃতি’, অন্যটা তারই আঁকা ‘সানফ্লাওয়ার’। আশ্চর্য্য, কোন্‌ সুদূর হল্যান্ডের একজন ডাচ শিল্পী— যার আত্মহত্যার বয়স একশো পেরিয়ে গেছে— জীবদ্দশায় যার প্রায় একটা ছবিও বিক্রি হয়নি— ফ্রান্সের প্যারিসের মতো জায়গাতেও, যাকে শিল্পী বলার চেয়ে পাগল-উন্মাদ বলাতেই ছিল সবার উৎসাহ— বঞ্চিত অবহেলিত সেই মহান শিল্পীর ছবির প্রিন্ট পরম যত্নে একটুকরো হৃদয়ের মতো ঝুলিয়ে রেখেছে কলকাতার হরিশ মুখার্জী রোডের একটা খুপরি ঘরে আর এক হতশ্রী মাতাল দিকভ্রান্ত শিল্পী। ভ্যানগঘ আজ সব শিল্পীরই নয়নের মণি। সন্দীপকে নিয়ে ছেলেটা কী করবে ভেবে পাচ্ছিল না, মদ খেয়েছিল সেদিনও। কথা বলে যাচ্ছিল অনবরত, কেঁদে ফেলল হাউ হাউ করে, তারপর সন্দীপের কাছে সরে এসে বলল— ‘আজ রাতটা আমার কাছে শুবি?’ প্রশ্নটা এড়িয়ে গিয়ে সন্দীপ বলল— ‘ছবি দেখাবি না!’ ছবির কথা বলতেই তড়াক করে একলাফ দিয়ে ট্রাঙ্কের কাছে গিয়ে সজোরে এক লাথি মেরে জড়িয়ে জড়িয়ে বলল— ‘ডোন্ট মাইন্ড, মাঝে মাঝে আমি এটাকে লাথি মারি, না হলে ভিতরের ছবিগুলো ভূত হয়ে যাবে’… যা সব দেখাল সন্দীপ তার কিছুই বুঝল না। শেষে হঠাৎ সব ছবি একসঙ্গে ধরে ছুড়ে ফেলে হো হো করে হেসে উঠল— ‘পরে গুছিয়ে নেব, এখন বহুত খিদে পেয়েছে। তুই বোস, আমি রুটি নিয়ে আসি, তরকা খাস না আলুর তরকারি’— বলেই আঙুল তুলে বলল ‘খবরদার, পালাবি না!’ বলে বাইরে গিয়ে কিছু বলার আগেই শেকল তুলে দিল। ঘটনার আকস্মিকতায় সন্দীপ ভেবে পাচ্ছিল না কী করবে, শেষে দু-চারবার ধাক্কা দিতেই শেকলটা খুলে গিয়েছিল ভাগ্যিস্‌! বাইরে বেরিয়ে অন্ধকারে চুপি চুপি পালিয়ে এসেছিল সেদিন।

আজ যেভাবে ছেলেটা লাইটপোস্ট ধরে দাঁড়িয়ে পড়েছে এখন ওকে গঘেরই কোনও স্কেচের মতো দেখাচ্ছে। সন্দীপ এবার বাসের জন্য অস্থির হয়ে উঠেছে। একা একা ফুটপাথ পার হয়ে যে পাগল পাগল মেয়েটা ওর দিকে এগিয়ে আসছে ওর নামটা কী যেন, হ্যাঁ, অনুভাতি। সন্দীপের কাছে এসে বাচ্চাদের মতো হেলেদুলে বলল— ‘আমি আসব কী করে বুঝলে!’ যেন ওর জন্যই দাঁড়িয়েছিল সন্দীপ। কী উত্তর দেবে ভেবে পায় না। দূরে আকাশের দিকে তাকায়, আজ একটুও মেঘ নেই, তাই তারাগুলো জ্বলজ্বল করছে। একটা প্লেন, লাল আলো ফ্ল্যাশ করতে করতে উড়ে যাচ্ছে, চলমান নক্ষত্রের মতো দেখাচ্ছে তাকে। সেখানে থেকে চোখ নামিয়ে কোনো সঙ্কোচ না করেই অনুভাতির কাঁধে হাত রাখে সন্দীপ। অন্যদিন হলে হাত সরিয়ে বাংলা শব্দকোষ-অজন্তার ছবি হয়ে বেলগুঁড়ো খাবার গুণাগুণের দিকে যেত মেয়েটা, কিন্তু আজ কাঁধে রাখা হাতটাকে প্রশ্রয় দিয়ে চোখ বন্ধ করল। সন্দীপ নেশা করেছে, অনুভাতির রাতের আকাশের মত পিঠের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে তার ঠোঁট, আদিম গন্ধে সেই নেশা আরও চেপে ধরে সন্দীপকে। গাড়ি বাসের সংখ্যা বাড়তে থাকে, ওপাশে বোধহয় ‘নো এন্ট্রি’ বোর্ড পড়েছে, সদন থেকে রাশি রাশি মানুষে বেরিয়ে আসছে পিঁপড়ের মতো। চোখে স্বপ্ন, মনে তখনও গুনগুন, নাচের ছন্দ, নাটকের সংলাপ। যেন একদল ক্ষুধার্ত উদ্বাস্তু রাতের খাবার খেয়ে হাত চাটতে চাটতে উঠে আসছে। এতক্ষণ যে জায়গাটা নির্জন বলে আকাশ দেখছিল সন্দীপ, কয়েক মুহূর্তে সেটা মানুষ আর গাড়ির ভীড়ে চঞ্চল হয়ে ওঠে। কিন্তু অনুভাতি গেল কোথায়! মাথাটা অসম্ভব ভারী লাগছে। লাইটপোস্ট ধরে তখনও মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে সেই ছবি আঁকিয়ে। গঘের স্কেচ, নাকি মাইকেল অ্যাঞ্জেলোর ভাস্কর্য, না রেমব্রান্টের আলো ছায়ার রহস্য! এলোমেলো ছন্দে সেইদিকেই যেতে গিয়ে কতক্ষণ এবং কোনদিকে সন্দীপ সেদিন হেঁটেছিল তার মনে নেই, তবে একটা ট্যাক্সি ধরে কাঁচটা নামিয়ে গান করেছিল অনেকদিন পর— ‘এই আকাশে আমার মুক্তি আলোয় আলোয়..’— কেউ শোনেনি। শুধু একটা ঝড় এসে সে গান উড়িয়ে নিয়ে গিয়েছিল, বিনা মেঘে আচমকাই বৃষ্টি নেমেছিল ঝুমঝুম করে। মাঝপথে ট্যাক্সি দাঁড় করিয়ে, আর একটা নিব আনিয়ে ড্রাইভারের সঙ্গে ভাগ করে খেল সে, নেশায় পেয়ে বসেছে আজ সন্দীপকে। আসলে নেশাটা মদের নয়, নিজের মধ্যে ফিরে আসা আপসের অরণ্যে হারিয়ে যাওয়া ব্যক্তিত্বের মৃগশিশুকে খুঁজে বেড়ানো। মদ উদরস্থ হতেই মারাত্মক জোরে ট্যাক্সিটা চালাতে আরম্ভ করে ড্রাইভার, নিষেধ করে না সন্দীপ। বরং আরও উৎসাহ দেয়। একসময় গালিবের অনেক শের মুখস্থ ছিল, মাথার ভিতর থেকে তারই একটা বিদ্যুতের মতো চলে আসে মুখে—

ময় সে গরজ নিশাত হৈ কিস রুসিয়াহ কো।

ইকগুণা বেখুদি মুঝে দিনরাত চাহিয়ে।।

ড্রাইভারের দিকে ঝুঁকে পড়ে বলে এর মানে কী জানো। মজা লুটতে মদ খেয়েছে কোন সে মুখ পোড়া ভাই/ আমি শুধু দিবারাত্রি একটু ভুলে থাকতে চাই। সুতরাং ‘অ্যালকোহল জিন্দাবাদ’ বলে একঝাঁক পায়রা উড়ে যাওয়ার মতো হেসে উঠেছিল হো হো করে।

 

স্বপ্ন

ধীরে ধীরে চোখ বুজে এল সন্দীপের… গভীর গহন অন্ধকার থেকে এসে দাঁড়ালেন ‘ফ্রানজ কাফকা’, দুহাতে তার রক্তে ভেজা স্বপ্নের ডালি……

স্বপ্ন এক: ঝিরঝিরে বৃষ্টি। হাউসিং-এর গেট বন্ধ। ট্যাক্সি থেকে নেমে টলতে টলতে কোনওরকমে গেট অবধি পৌঁছে ঠান্ডা রডের উপর থুতনি লাগিয়ে পোস্টার হয়ে গেল সন্দীপ, তার মনে পড়ল শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার পর তার মার শরীরটাও এরকম ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল। হাউসিং-এর ভেতরটা দেখা যাচ্ছে, রাস্তার ধারের রোড লাইট থেকে বিষণ্ণ হলুদ আলোটা লম্বা হয়ে রাস্তার উপর পড়ে আছে। বৃষ্টির সুতো আর হাওয়ায় কুয়াশার মতো ধোঁয়া ধোঁয়া দেখাচ্ছে সেখানটা। আলো অন্ধকারের রহস্য মেখে দাঁড়িয়ে আছে ফ্ল্যাটগুলো। জনপ্রাণহীন হাউসিংটাকে ‘আন্দ্রেই তারকোভস্কি’র ফিল্মের মতো দেখাচ্ছে। একটা স্টিল কালারের সুমো এসে নিঃশব্দে দাঁড়াল গেটের সামনে, একজন ওজনদার মহিলা পা রাখল মাটিতে, ফর্সা পায়ে কালো জরুল, মুখের গোলাপী রং ঘামের সঙ্গে গড়িয়ে নামছে, ঠোঁট দুটো প্যারিস ব্লু। সন্দীপ লম্বা হয়ে যাচ্ছে।

স্বপ্ন দুই: ‘আই’ ব্লক থেকে টানতে টানতে একটি যুবতী মেয়েকে ষন্ডামার্কা কিছু লোক জলট্যাঙ্কের ধারে নিয়ে গেল। মেয়েটা বস্তাবন্দি মুখবন্ধ শুয়োরের মতো গোঙাচ্ছে, কাছেপিঠে ফ্ল্যাটগুলোর দুএকটা আলো জ্বলে উঠে আবার নিভে গেল। সন্দীপ আশ্চর্য হয়ে দেখল লোকগুলোকে সে চেনে। সিপিএমের ব্রজদা, তৃণমূলের হারু ঘোষ, একজন কংগ্রেসের ষষ্ঠী মুখুজ্জে, আরে ওটা তো নেপির বাপ! আগে আরএসএসের গোঁড়া হিন্দু থেকে বিজেপি হয়ে বিরোধী দলের টিকিট পেয়েছে এবার বলেই জানত সন্দীপ।… হা হা হা… সে এত বোকা! আরে এটা তো অন্য কেস। এখানে রাজনীতি কেন বাওয়া!!! কোয়ালিশন সরকার, ভাই ভাই। এরপর… বিজ্ঞাপন বিরতি… একে একে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে তারা প্যান্টের চেন টানতে টানতে আর চুলগুলো পাট করে ঘন্টা দুলিয়ে, বুক ফুলিয়ে হরিনাম সঙ্কীর্তন করতে করতে এগিয়ে আসতে থাকল। অন্যদিকে একটা পুলিশের জিপ সেই বৃষ্টি, হলুদ আলো আর অন্ধকারের মধ্যে একপায়ে দাঁড়িয়ে থাকা ফ্ল্যাট আর ভিজে রাস্তার উপর দিয়ে হা হা করতে করতে উন্মাদের মতো কয়েক পাক ঘুরে ঘটমান বর্তমানের পাশে গিয়ে আলো নিভিয়ে দাঁড়াল। … উড়ে আসা একটা কাগজের টুকরোয় লেখা “আপনি কিছু দেখেননি”, ব্র্যাকেটে লেখা ‘দেখলেও বাল…’ সন্দীপ দেখল এবার সে বেঁটে হয়ে যাচ্ছে…

স্বপ্ন তিন: হাফডজন বোমা পড়ল হাউসিং-এর চারিদিকে। সন্দীপ ছিটকে গিয়ে ঝুলতে লাগল কালো হয়ে যাওয়া একটা গাছের ডালে। হাউসিং-এর বাইরের মেন রোড দিয়ে খোঁচা খাওয়া শুয়োরের মত একটা ফাঁকা মিনিবাস চলে গেল ছুটতে ছুটতে। লুঙ্গি আর গেঞ্জি পরে হাতে রিভলবার আর চোখেমুখে আতঙ্ক নিয়ে একজন ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে ফুটপাত পার হয়ে মিলিয়ে গেল বস্তির অন্ধকারে। জলট্যাঙ্কের আশেপাশে আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না। শুধু একপাল কুকুর নাচতে নাচতে চলে যাচ্ছে লেবার রুমের দিকে। আস্তে আস্তে ভোরের আলো দেখা দিল। রোদ উঠল ঝলমল করে, দলে দলে উড়ে এল কাক। শুকিয়ে যাওয়া রক্তের চারপাশে ওরা এখন এক্কাদোক্কা খেলবে।

স্বপ্ন শেষ: গাছেই ঝুলে আছে সন্দীপ। দিনের আলো কমতে কমতে একসময় সন্ধে হয়ে এল। সন্ধে পেরিয়ে আবার রাত গভীর হল। সন্দীপ এবার লাফিয়ে নামল হাউসিং-এর মধ্যে। কেউ কোথাও নেই, কেবল ওপারের রেস্টুরেন্টে আলো নিভিয়ে মদ খাচ্ছে কজন। রাস্তায় সেই আলো আঁধার শূন্যতা। এক পাও এগোতে পারছে না সন্দীপ। বুক যেন জগদ্দল পাথর, জ্বালা করছে চোখদুটোয়। সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে হাত দুটো মাটিতে ফেলে এবার আদিম মানুষের মত হেঁটে গেল সে, পারছে এবার পারছে। মনুষ্যজন্মের সব স্মৃতি স্বপ্ন বিষাদ ও বুদ্ধি লোপ পেল তার। দেখতে দেখতে লোমে ভরে গেল শরীর। রঞ্জনদা ঠিক বলেনি। ষোলোআনা স্বাধীনতার স্বাদ সে পেতে আরম্ভ করল। বহু চেষ্টাতেও সে মানুষ হয়ে উঠতে পারেনি, এবার জানোয়ার সে খুব সহজেই হয়ে উঠতে পারছে। … এত আনন্দ! এত আনন্দ! দেখতে দেখতে ফ্ল্যাটগুলো অদৃশ্য হয়ে রাস্তাঘাট ভিড় অফিস আকাশছোঁয়া বিল্ডিং মানুষ সভ্যতা বিজ্ঞান প্রযুক্তি সব অদৃশ্য হয়ে জঙ্গলে ভরে উঠল শহর। জঙ্গল কাঁপিয়ে ডেকে উঠল বাঘ, হরিণের দল জল খেতে খেতে চমকে উঠল। ভালুক উঠল গাছের উপর গাব খেতে। আর… অবিশ্রান্ত বৃষ্টির শেষে নীল নির্মল আকাশে ঝলমল করে উঠল নক্ষত্রেরা…

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3090 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...