নহি যন্ত্র— নয়

সৈকত ভট্টাচার্য

 

পূর্ব প্রকাশিতের পর

এমন দীর্ঘ বর্ষা-বিহীন গ্রীষ্ম এই লন্ডন শহরে আগে কখনও এসেছে কি না জানা নেই। অন্তত থমাস ফেরিনার তাঁর অর্ধশতাব্দীর বেশি জীবদ্দশায় তো দেখেননি। লন্ডন শহরের স্বাভাবিক আবহাওয়াই হল ঠান্ডা বাতাস আর তার সঙ্গে ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি— সময় অসময় নেই তার— সুযোগ পেলেই বর্ষাচ্ছে।

অবিশ্যি গরমকালে যে একেবারে গরম পড়ে না তা নয়। কিন্তু এবারের গ্রীষ্ম একেবারেই অন্যরকম। গতবছর প্লেগ মহামারির পর একটু স্বস্তির শ্বাস ফেলতে না ফেলতেই প্রবল জলকষ্ট ভুগিয়েছে রাজধানীর পুরবাসীদের। বহমান টেমসও কিছুটা যেন নির্জীব হয়ে পড়েছিল এমন ঘোর গরমে। লন্ডন শহরে জনবসতির ঘনত্ব ইদানীং বেশ বেড়েছে। আর মেয়র পরিষদের অপদার্থতার সৌজন্যে তাতে না আছে রাশ টানার চেষ্টা— নেই কোনও পরিকল্পিত নগরায়ন। ফলে একটা বাড়ির ঘাড়ের উপর আর একটা বাড়ি উঠে অমন সুন্দর শহরটাকে একেবারে ঘিঞ্জি করে তুলেছে। এই সমস্ত বাড়িই কাঠের তৈরি। আর প্রবল গ্রীষ্মে সেই কাঠের বাড়িগুলো শুকিয়ে একেবারে চ্যালাকাঠের দশাপ্রাপ্ত হয়েছে। শহরের মেয়র স্যার থমাস ব্লাডওয়র্থ অবিশ্যি এ ব্যাপারে নিতান্তই নিস্পৃহ। রাজার কাছ থেকে একটা নাইটহুড বাগিয়ে নিজেকে খুব একটা কেউকেটা মনে করেন। যদিও এ রাজ্যে ‘মিস্টার’-এর থেকে ‘স্যার’-এর সংখ্যা বেশি। দ্বিতীয় চার্লস, অলিভার ক্রমওয়েলের হাতে তাঁর বাবার পতন থেকে যথেষ্ট শিক্ষা নিয়েছেন। শহরের গণ্যমান্যদের খুশি রাখার প্রচেষ্টায় সর্বদা রত থাকেন। ফলে মেয়রসাহেবের ‘স্যার’ হয়ে পায়াভারি হওয়া আটকায়নি। থমাস ফেরিনার শহরের অন্যান্য গণ্যমান্য মানুষজনকে সঙ্গে নিয়ে মেয়রের কাছে একবার দরবার করেছেন— প্রবল অগ্নিকাণ্ডের হাত থেকে বাঁচার জন্য জন্য অচিরেই একটি ব্যবস্থা গ্রহণ প্রয়োজন— এরকম শুষ্কং কাষ্ঠং-নির্মিত ঘিঞ্জি ঘরবাড়ি আদতে একটি স্ফুলিঙ্গের অপেক্ষায় থাকা চিতার মতো হয়ে আছে।

মেয়রসাহেব সব শুনে নিজের কায়দার পাইপে অগ্নিসংযোগ করতে করতে বলেছেন— অমন আগুন তো কতই লাগে— আমাদের যথেষ্ট আঁকশি মজুত আছে, আছে বালতি— টেমসের জল— আগুন লাগলে সেসব নিয়ে সকলে মিলে নেভানোও যাবে।

—কিন্তু আগে থেকে যদি একটি ব্যবস্থা করে রাখা যায় তাহলে কি ভালো হয় না?— প্রিকশান ইজ অলওয়েজ…

কথা শেষ না করতে দিয়েই ব্লাডওয়র্থ সাহেব বলেন, আগে থেকে কী ব্যবস্থা করা যায়? যদি বলেন আমরা সকলে প্রচুর জলপান করে শুতে যাই প্রতি রাতে— দরকার পড়লে না হয়… একটা অশালীন ইঙ্গিত করে হেসে ওঠেন নিজেই।

—ফায়ার ব্রিগেড জাতীয় একটা কিছুর পরিকল্পনা করা যায় না?
—ফায়ার ব্রিগেড! সে আবার কী জিনিস!— শুনুন এসব আজগুবি জিনিসের পিছনে অর্থ নষ্ট করার যে কোনও অর্থ হয় না— তা আপনারা নিশ্চয় বোঝেন। সুতরাং সরকারি সময় কেন বৃথা অপচয় করা?— চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে ঘরের দরজা খুলে বাইরের পথ দেখিয়ে দেন মেয়র।

ফলে সে আলোচনার সেখানেই ইতি ঘটে যায়।

তবে এখন শীত সমাগত। বাতাসে শিরশিরে ভাব। আর মাসদুয়েকের মধ্যে লন্ডন শহরে আসবে শীত। গুঁড়ি গুঁড়ি তুষার চাদরে নিজেকে মুড়িয়ে নিয়ে এই ফেলে আসা দীর্ঘ গ্রীষ্মের যাবতীয় তৃষ্ণা মেটাবে এই দু-হাজার বছরের যুবতী লন্ডন।

গায়ের কম্বলটা টেনে শরীরটা গরম করার চেষ্টা করলেন থমাস ফেরিনার। মধ্যযাম অতিক্রান্ত। গোটা লন্ডন শহর গভীর ঘুমে। রাস্তায় কয়েকজন মাতাল এবং ভবঘুরে যে জেগে নেই— সে কথা অবিশ্যি বলা শক্ত। আশপাশের দু-একটা পানশালা থেকে মাঝেমধ্যেই অস্পষ্ট চিৎকারের শব্দ ভেসে আসছে। সম্ভবত অধিক পানের পর পয়সা দিতে অপাগরগতার দোষে তাদের পোশাক-পরিচ্ছদ বন্ধক রেখে ছুড়ে ফেলা হচ্ছে রাস্তায়। এইসব তাদেরই নিষ্ফল আক্রোশের সামান্য বহিঃপ্রকাশ।

পুডিং লেনের এই বাড়িতে বর্তমানে চারটি প্রাণী। এই কদিন আগে অবধিও ছয়জন মানুষে গমগম করত লন্ডনের শ্রেষ্ঠ রুটি-বিক্রেতার বাড়ি। রুটি-বিক্রেতা? নাহ, এ শব্দ-বন্ধ বোধকরি ইংরাজ সমাজে থমাস ফেরিনারের স্থান বোঝানোর জন্য যথাযথ হল না। তিলে তিলে গড়ে তোলা এই বেকারির রুটি এবং কেক আজ স্বয়ং দ্বিতীয় চার্লসের ভোজের টেবিলে স্থান পায়। শুধু তাই নয়, ব্রিটিশরাজের নৌবাহিনীর নিয়মিত রুটির জোগানের দায়িত্বও এই ফেরিনারের স্কন্ধেই অর্পিত। সুতরাং, তাঁকে সামান্য রুটিবিক্রেতা না বলে বরং তাঁর নব-লব্ধ উপাধি ‘কিং’স বেকার’ বলে সম্বোধন করাটাই সমীচীন হবে।

এক পুত্র আর দুই কন্যাকে থমাসের হেফাজতে রেখে এক অজানা অসুখে চলে গেছেন হানা ফেরিনার। দেখতে দেখতে একবছর হয়ে গেছে থমাসের এই বিরহ-যাপন। ছোট মেয়ে মেরি এখন শ্বশুরালয়ে। এখানে সঙ্গে আছে শুধু ছেলে থমাস জুনিয়র আর মেয়ে হানা জুনিয়র। আর নিচের তলার ঘরে আছে মিস অর্চার্ড— এক অর্থে সে-ই এ বাড়ির বর্তমান গৃহকর্ত্রী। তার কড়া নজর এড়িয়ে এ বাড়িতে কিচ্ছুটি হওয়ার জো নেই। সকাল থেকে রাত অবধি বাবু, দাদাবাবু এবং মেজ-দিদিমণির সমস্ত চাহিদা হাতের কাছে জোগান দিয়ে যাওয়াই শুধু নয়— মিস অর্চার্ড এ বাড়ির প্রতিটি কোণা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে রেখে চলেছে প্রতিনিয়ত। তার হাতে এই সংসার ছেড়ে গিয়ে হয়তো প্রতি রাতে কবরের মধ্যে স্বস্তির শ্বাস ফেলেন মিসেস হানা ফেরিনার।

আজকেও মিস অর্চার্ডের নিত্যকর্মে কোনও ভুল হয়নি। রাতে ডিনারের পর শুভরাত্রি জানিয়ে মেজ-দিদিমণি সবার শেষে উপরে গিয়ে নিজের শয়নকক্ষে যখন দোর দিল, অর্চার্ড তখন এঁটো বাসন-কোসন সরিয়ে রাখছিল। এরপর নিজের খাবারটুকু খেয়ে সমস্ত বাড়ির সকল প্রদীপ নির্বাপণ করে রান্নাঘরের পাশের ছোট্ট ঘরটির মধ্যে শুতে যাবে সে। শুধু ধিকিধিকি আঁচে জ্বলতে থাকবে একটিমাত্র চুলা— তার উপরে সারারাত ধরে বেক হবে রুটি— কাল ইংল্যান্ডেশ্বরের টেবিলে স্থান পাওয়ার জন্য।

মিস অর্চার্ডের ঘুম এমনিতে পাতলা। কাল রবিবার। সকালে চার্চে প্রার্থনার পর নিজের বাড়ি যাওয়ার ইচ্ছে আছে একবার। মিস্টার ফেরিনারের কাছে একবেলার ছুটি প্রার্থনা করে রেখেছিল আগেই। সে ছুটি বলামাত্র মঞ্জুর হয়ে গেছে। বোধকরি সে ছুটিতে গেলে এরা একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে— সমস্তক্ষণ সংসারের কোনও খড়কুটো পাছে অগোছালো করে ফেলে, সেই ভয়ে থাকতে হয় না। মিস অর্চার্ড অবিশ্যি মিসেস ফেরিনারের পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলে শুধু। মৃত্যুশয্যায় তার হাত নিজের হাতদুখানির মধ্যে নিয়ে এ সংসারের দায়িত্ব অর্পণ করে গেছিলেন তিনি। সঙ্গে সবার অলক্ষ্যে দিয়ে গেছিলেন আর একটি জিনিস। তার আঙুলের আংটিখানি। বলে গেছিলেন এ আংটি নিছক আংটি নয়— এই সংসারের দায়স্বরূপ। যেদিন মিস অর্চার্ড এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে সেদিন যেন এই আংটি সে দিয়ে যায় মেরি কিংবা হানার হাতে। মিসেস ফেরিনারের নিজে হাতে দিয়ে যাওয়া সে দায় বা দায়িত্ব সে কী করেই বা উপেক্ষা করে!

একটা প্রবল পোড়া গন্ধে মিস অর্চার্ডের ঘুম ভাঙল। তবে কি চুলার আগুনে রুটি পুড়ছে? কিন্তু মিস্টার ফেরিনার নিজে হাতে চুলার আঁচ একেবারে কমিয়ে দিয়ে গেছিলেন— এ তার স্পষ্ট মনে আছে। রুটি তো পোড়ার কথা নয়। তাহলে?

বিছানা ছেড়ে দরজা খুলে বাইরে আসে মিস অর্চার্ড। বাইরে আসা মাত্র প্রচণ্ড তাপে তার মুখটা প্রায় ঝলসে গেল। দাউদাউ করে জ্বলছে প্রায় গোটা রান্নাঘর…

—দরজা খুলুন… মিস্টার ফেরিনার। দরজা খুলুন…

দরজায় প্রচণ্ড করাঘাতে থমাস ফেরিনারের ঘুম ছুটে যায়। মিস অর্চার্ডের গলা। তাড়াতাড়ি শয্যা ত্যাগ করে নাইটগাউনটা জড়িয়ে তার ফাঁস বাঁধতে বাঁধতে দরজা খোলেন গৃহস্বামী।

—কী ব্যাপার…

কথা শেষ হওয়ার আগেই মিস অর্চার্ডের এই উত্তেজনার কারণটা আঁচ করতে পারেন ফেরিনার সাহেব। সত্যি বলতে গেলে, আক্ষরিক অর্থেই ‘আঁচ’ পান— নিচের তলা থেকে আসা গনগনে আগুনের।

—এ কী! কী করে?

উত্তরের অপেক্ষা না করেই দৌড়ন অপরদিকে যেখানে পাশাপাশি দুটি ঘরে ঘুমিয়ে আছে থমাস জুনিয়র এবং হানা জুনিয়র। মিস অর্চার্ড পিছুপিছু একটা কৈফিয়ত দিতে দিতে আসতে থাকে— স্যার, আমি কিন্তু সব কিছু বন্ধ করেই শুয়েছিলাম। আমার যদ্দূর মনে হচ্ছে ওভেনের আগুন থেকেই স্ফুলিঙ্গ ছিটকে গিয়ে…

মিস্টার ফেরিনার এসব কথায় বিশেষ পাত্তা না দিয়ে জলের বালতির দিকে নির্দেশ করেন— জল দিন মিস অর্চার্ড। অবিশ্যি এই লেলিহান শিখা যে নিছক জল দিয়ে শান্ত করা যাবে সেকথা তিনি নিজেও সম্ভবত বিশ্বাস করছিলেন না।

—টম, হানা… শিগগির বের হয়ে এসো।—ছেলেমেয়ের দরজায় ঘা দেন ফেরিনার। মিস অর্চার্ড আগুনের শিখার মধ্যে নিচে দৌড়লেন। ঘরে যেটুকু জল ছিল সেটা নিঃশেষিত হয়েছে অনেক আগেই— থমাস ফেরিনারের ঘুম ভাঙারও আগে। তাই মিস অর্চার্ডের লক্ষ্য এখন আগুন নেভানোর চেয়েও বেশি এই পরিবারকে বাঁচানো। যেটুকু সঙ্গে না নিলেই নয়, নিজের ঘর থেকে নিজের সেই সামান্য কিছু জমানো টাকা আর মিসেস ফেরিনারের দেওয়া আংটিটি নেওয়ার জন্য আগুনকে অগ্রাহ্য করে তারই মধ্যে ঝাঁপালেন মিস অর্চার্ড।

আগুনকে কেন ‘সর্বগ্রাসী’ অভিধায় ভূষিত করা হয়, সেটা বুঝি এমন প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ছাড়া বোঝা সম্ভব নয়। প্রায় নিমেষের মধ্যে ধিকিধিকি আগুন বাড়ির একতলাকে গ্রাস করে তার লেলিহান শিখা বাড়িয়ে দিয়েছিল দ্বিতলের দিকে। একটা বাড়ি তো নিছকই আবাস নয়— এর মধ্যে জুড়ে থাকে কত স্মৃতি, কত ভুলে যাওয়া কথা লুকিয়ে থাকে ঘরের আনাচেকানাচে, কত না-বলা কথা, দুঃখ শোক, পরিতাপের সাক্ষ্য বহন করে ওই সব নির্বাক দেওয়ালেরা— কতই না দীর্ঘশ্বাসের শব্দ মুখ গুঁজে থাকে এই সব কাঠের তক্তার ফাঁকেফোকরে। আগুনশিখা যখন একে একে এই সমস্ত কিছুকে কেড়ে নিতে থাকে, সেই সব অব্যক্ত ইতিহাস, স্মৃতিও হারিয়ে ফেলতে থাকে তাদের নীরব সাক্ষীদের। শুধু পড়ে থাকে ভস্মীভূত কার্বনের স্তূপ।

মিস্টার ফেরিনার প্রাণপণে চেষ্টা করছিলেন পশ্চিমের দেওয়ালের বড় জানলাটি ভেঙে ফেলার। ওটাই হতে পারে একমাত্র পালাবার পথ। থমাস আর হানা ব্যস্ত হাতের কাছে যা আছে সংগ্রহ করে নেওয়ার— জীবন তো থেমে থাকবে না— থেমে থাকবে না জৈবিক চাহিদাগুলিও। হানা প্রাণপণে চিৎকার করছে মিস অর্চার্ডের নাম ধরে। কিন্তু আগুনের তাপে কাঠফাটার শব্দকে অতিক্রম করে সে আওয়াজ নিচের তলায় পৌঁছচ্ছে কি না বোঝা যাচ্ছে না।

ক্রমশ ফুরিয়ে আসছে শ্বাস নেওয়ার বাতাস। আগুনের গরমে, ধোঁয়ায় ফুসফুসটা ফেটে যাবে মনে হচ্ছে এবার। মিস্টার ফেরিনার শেষ সমস্ত শক্তিটুকু দিয়ে হাতের খিল দিয়ে আঁট হয়ে বসা জানলায় আঘাত হানলেন।

এক ঝলক রাতের ঠান্ডা বাতাস যখন তার মুখে এসে ঝাপটা মারল— মিস্টার ফেরিনারের ক্ষণেকের জন্য হারানো চৈতন্য আবার ফিরে এল। টম আর হানা তার দুহাত ধরে টানছে বাইরে নিয়ে যাওয়ার জন্য। উঠে দাঁড়ালেন মিস্টার ফেরিনার। কিন্তু মিস অর্চার্ড? নিচের তলা থেকে সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসা একটা শব্দ কানে এল। জানলা দিয়ে বাইরে যাওয়ার আগে থমকে দাঁড়ালেন মিস্টার ফেরিনার। এত বছর এই বাড়ির পরিচর্যার ভার যার হাতে দিয়ে তিনি নিশ্চিন্ত ছিলেন, তার জন্য বিপদের মুখেও ক্ষণেক অপেক্ষা করা যেতেই পারে। কিন্তু এই মুহূর্তের অপেক্ষার শেষে যে এমন ভয়ঙ্কর দৃশ্য দেখতে হবে— তা বুঝি তিনি ভাবনাতেই আনেননি। সিঁড়ি দিয়ে যে মূর্তিটি কোনওক্রমে উঠে এল, তাকে মিস অর্চার্ড বলে চেনা যাচ্ছে না— সর্বাঙ্গে জ্বলন্ত আগুনে তার কণ্ঠও স্তব্ধ হয়ে গেছে। মিস্টার ফেরিনার মিস অর্চার্ডের ওই অগ্নিমূর্তি দেখে প্রচণ্ড ভয়ে কোনওক্রমে জানলা গলে বাইরে, পাশের ছাদে এসে পড়লেন।

টম আর হানা বাবাকে কোনওরকমে ধরে ছাদের ঢাল বেয়ে নিচে গড়িয়ে পড়ার হাত থেকে বাঁচাল। তারা দুজনও বুঝে গেছে যে মিস অর্চার্ড এত বছর যে বাড়ির পরিচর্যার পিছনে নিজের জীবনের অধিকাংশ সময় বিলিয়ে দিয়েছিলেন, সেই জতুগৃহের সঙ্গে তার নিজের ভাগ্যও বুঝি বাঁধা পড়ে গেছিল একই সুতোয়।

হঠাৎ ওই আগুনের মধ্যে থেকে কিছু একটা এসে পড়ল হানার পায়ের কাছে। হানা তাড়াতাড়ি নিচু হয়ে দেখল, এ তার মায়ের সেই আংটি— যা এতদিন সংসারের কাণ্ডারি মিস অর্চার্ডের কাছে গচ্ছিত ছিল। নিজে যখন আর এই অগ্নিসমুদ্র থেকে পরিত্রাণের উপায় দেখেনি, সংসারের দায়স্বরূপ এই আংটিটি ছুড়ে দিয়েছে উত্তরাধিকারিণীর পায়ের কাছে। হানা দেখল, আগুনরাঙা হয়ে আছে সেই সোনার ছোট্ট আংটি। পূব আকাশ থেকে ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে শুরু করেছে তারার দল। জ্বলতে থাকা এই বাড়ির রং বুঝি লেগেছে সেখানেও।

এর কিছুদিন পর কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকবিভাগে একটি চিঠি এসে উপস্থিত হল। সঙ্গে একটি মোটা আর বড় খাম। বাইরে থেকে দিব্যি বোঝা যাচ্ছে যে এর ভিতরে বেশ কয়েক দিস্তে কাগজ আছে। প্রেরক লন্ডনের এক প্রকাশক। প্রাপক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নবীন গবেষক। বয়সে নবীন হলেও তাঁর কর্মকাণ্ড ইতিমধ্যে বেশ খ্যাতি লাভ করেছে। তার ফলে ভদ্রলোকের নাম গোটা ইংল্যান্ডের শিক্ষিত মানুষের বাইরেও ইংলিশ চ্যানেল পার করে পোঁছে গেছে ফরাসিদের দেশ অবধি।

—স্যার, আপনার নামে একটি চিঠি আছে।

খাম এবং চিঠিটি সামনের টেবিলের উপর রাখে ডাকহরকরা উইলিয়াম। এই ছোকরাকে সে ভালোই চিনে গেছে এতদিনে। অফিসের জন্য নির্দিষ্ট চিঠির বাক্সে যেন তাঁর চিঠি ফেলে যাওয়া না হয়, এ ব্যাপারে উইলিয়ামকে কড়া নির্দেশ দিয়ে রেখেছেন তিনি। তাঁর নামে আসা যে কোনও কাগজপত্র, চিঠি-চাপাটি সোজা হাজির হওয়া চাই তাঁর টেবিলে। প্রতিদিন ডাকবাক্স খুলে শতেক কাগজপত্র ঘেঁটে নিজের নামে চিঠি আছে কি না, দেখার অত সময় নেই তাঁর। তাই উইলিয়াম সোজা হাজির হয় গবেষকের ঘরে। আর এই অতিরিক্ত কাজের জন্য কিছু শিলিং তো জুটেই যায় কপালে।

—বেশ। রেখে যাও।

টেবিলের ওপারে বসে একগাদা কাগজপত্র নিয়ে কীসব আঁক কষতে কষতেই মুখ না তুলে বললেন যুবক। তারপর, ওহ, দাঁড়াও, বলে সেই অবস্থাতেই পকেট হাতড়ে একটা মুদ্রা নিয়ে ছুড়ে দিলেন উইলিয়ামের দিকে। মুদ্রাটা টেবিলের এপার থেকে ওপারে শূন্যে একটা অধিবৃত্তাকার পথ রচনা করে গিয়ে পড়ল। অবিশ্যি নিচে পড়ার আগেই ধরে ফেলল উইলিয়াম। মুখে হাসি ফুটল তার। যুবক মুখ তুলে তাকালেন। তাঁর মুখেও একটা হাল্কা হাসির আভা। কিন্তু তার কারণটা বুঝতে না পেরে হাল্কা মাথা ঝুঁকিয়ে ঘর ছেড়ে বের হয়ে গেল উইলিয়াম। গবেষক হাত বাড়িয়ে চিঠিটা হাতে নিয়ে খাম ছিঁড়ে পড়তে শুরু করলেন। প্রকাশক কয়েক ছত্র ক্ষমাপ্রার্থনা করে জানিয়েছেন যে লন্ডনে সম্প্রতি হয়ে যাওয়া বিধ্বংসী অগ্নিকাণ্ডে তাঁর প্রভূত ক্ষতি হয়েছে। অফিস পুরো ভস্মীভূত। তাঁর পাঠানো পাণ্ডুলিপিটা নেহাত নিজের বাড়িতে রেখেছিলেন, তাই সেটা অক্ষত আছে— তিনি ভাগ্যবান। পরিস্থিতির একটু উন্নতি হলে তিনি এই পাণ্ডুলিপিটা পুনরায় চেয়ে পাঠাবেন এবং তখন তিনি পুস্তকাকারে সেটি প্রকাশ করবেন। আপাতত এটা লেখকের কাছেই গচ্ছিত থাক।

যুবক সম্ভবত আশা করেছিলেন যে এমনটাই হবে। বেশ কিছুদিন আগেই এক বিধ্বংসী অগ্নিকাণ্ডে লন্ডন শহরের অর্ধেকের বেশি ঘরবাড়ি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। আগুন নেভাতে হিমসিম খেয়েছে সবাই। ইংল্যান্ডেশ্বর নিজে পথে নেমে বালতি করে জল ঢেলেছেন। শহরের মেয়র ব্লাডওয়ার্থের উপর তিনি এখন বেজায় খাপ্পা। শহর ছেড়ে বিত্তবানেরা চলে যাচ্ছেন গ্রামের দিকে। এই কেমব্রিজেও কয়েকটা পরিবার এসেছে। তাদের মুখেই বিস্তারিত জেনেছে সবাই।

ছেলেটা চিঠিটিকে টেবিলের এক কোণায় সরিয়ে রেখে কাজে মন দিলেন। তাঁর মন জুড়ে এখন টেবিলের এপাশ থেকে লাফিয়ে ওপাশে উইলিয়ামের হাতে পৌঁছনো মুদ্রার গতিপথ। মানসচক্ষে সেটাকে কল্পনা করে সেদিকেই তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর ফের হাতে কলম তুলে নিয়ে অঙ্কের মধ্যে ডুবে গেলেন। মানসপটে আঁকা রইল একটি অধিবৃত্ত আর টেবিলের অন্যদিকে পড়ে রইল খামবন্দি পাণ্ডুলিপি— তার উপরে সযত্নে লেখা লেখকের নাম— মিস্টার আইজ্যাক নিউটন।

 

[আবার আগামী সংখ্যায়]

 

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 5395 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...